pexels-photo- New Nazi - 111

এ বছরের সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে অনুষ্ঠিত জার্মানির নির্বাচনী ফলাফলে অ্যাঙ্গেলা মের্কেলের চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবার খবর ছাপিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে ‘জার্মানির জন্য বিকল্প’ (অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি, এএফডি) নামক কট্টর দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দলটির বিস্ময়কর উত্থান। মাত্র চার বছর আগে, ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই দল এবারের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ইউরোপের সবচাইতে বৃহৎ অর্থনীতি জার্মানির তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দলটি যেখানে মাত্র ৪.৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিল, এবার তাদের প্রাপ্ত ভোট ১২.৬ শতাংশ। গত নির্বাচনের তুলনায় তাদের ভোট বেড়েছে প্রায় ৭.৮ শতাংশ। যা অন্যসব দলের তুলনায় অনেক বেশি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, বিগত ষাট বছরের মধ্যে এই প্রথমবার জার্মানির সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছে এএফডির মতো কট্টরপন্থী নব্য নাৎসিবাদী একটি রাজনৈতিক দল। বুন্ডেসট্যাগ (Bundestag) নামে সমাধিক পরিচিত দেশটির সংসদে এবার তাদের আসনসংখ্যা ৯৪। ২০১৩ সালের নির্বাচনে ন্যূনতম ৫ ভোট পেতে ব্যর্থ হওয়ায় সংসদে তারা ছিল প্রতিনিধিত্বহীন।

স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন এসে যায়, এএফডির এই বিস্ময়কর উত্থানের পিছনের রহস্য কী? চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মের্কেলের উদার অভিবাসী মনোভাব বিশেষ করে সিরীয় শরণার্থীদের ব্যাপারে তাঁর মানবিক অবস্থান বিশ্বব্যাপী দারুণভাবে প্রশংসিত হলেও, নিজ দেশে রক্ষণশীল মহলের কাছ থেকে ব্যাপক বিরোধিতা এবং সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে তাঁকে। ভূমধ্যসাগর এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় একের পর এক মর্মান্তিক নৌকাডুবির ঘটনার প্রেক্ষিতে, চ্যান্সেলর মের্কেল জার্মানির সীমানা শরণার্থীদের জন্যে উম্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় দশ লক্ষ শরণার্থী আশ্রয় গ্রহণ করে দেশটিতে।

এই বিপুল আশ্রয়প্রার্থী জনগোষ্ঠীর খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষাসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের পিছনে ২০১৬ সালে জার্মান করদাতাদের ব্যয় করতে হয়েছে ২০ বিলিয়ন ইউরো। সরকারের শরণার্থীদের প্রতি উদার নীতির কারণে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে সেটিকে অনেকেই জনগণের উপর বাড়তি চাপ হিসেবে প্রচার করতে থাকে।

 

Frauke Petry - 111
মিজ পেট্রি একবার বহুসংস্কৃতির ধারণাটি আবর্জনার স্তূপের সঙ্গেও তুলনা করেছিলেন

 

এএফডির মতো সংগঠনগুলো ব্যাপারটা সামনে নিয়ে আসে এবং ব্যাপক প্রচারণায় নামে। অনেক ক্ষেত্রে তারা সফলকামও হয়। কেননা জনসাধারণের একটি অংশ এই বিপুল ব্যয় অপচয় হিসেবে গণ্য করতে শুরু করেছিল। বিষয়টা কেবল এ পর্যন্ত থেমে থাকে না, শরণার্থীদের জার্মানির নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখানোর প্রয়াস পায় অনেকে। দুঃখজনকভাবে ইসলামকে সন্ত্রাসী ধর্ম এবং মুসলমানদের মোটাদাগে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করার এক ভয়ঙ্কর প্রচারণায় মেতে উঠে কট্টর দক্ষিণপন্থী কিছু রাজনৈতিক শক্তি।

এভাবে জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং তথাকথিত দেশপ্রেম ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এএফডি চালাতে থাকে শরণার্থী তথা ইসলামবিরোধী প্রোপাগাণ্ডা। মে মাসে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় দলটির প্রতিনিধিরা আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের নির্বাচনী মেনিফেস্টো অনুমোদন করেন। সেখানে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়:

“ইসলামের সঙ্গে জার্মানির কোনো সম্পর্ক নেই।”

সেখানে মসজিদ, মিনার এবং বোরকা নিষিদ্ধ করার দাবি জানানো হয়। অনতিবিলম্বে সকল শরণার্থী প্রবেশের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং যারা ইতোমধ্যে জার্মানিতে আশ্রয় গ্রহণ করেছে তাদের দেশ থেকে বিতাড়ণ করার জন্যে সরকারের উপর চাপ প্রদান অব্যাহত রাখে তারা।

শুধু তাই নয়, এএফডির নেত্রী মিস পেট্রি শরণার্থীদের নিবৃত্ত করতে প্রয়োজনে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ঘোষণা দেন। তাদের মতে, জার্মানি কেবল জার্মানদের জন্য। তাই অন্য সংস্কৃতি বা জাতিগোষ্ঠীর লোকদের জার্মানিতে বসবাস তারা প্রকারান্তরে ঘৃণার চোখে দেখে। মিজ পেট্রি একবার বহুসংস্কৃতির (multiculturalism) ধারণাটি আবর্জনার স্তুপের (compost heap) সঙ্গেও তুলনা করেছিলেন।

তাদের এই উগ্র জাতীয়তাবাদী প্রচারণা জনসাধারণের একটি অংশ– যারা শরণার্থীসহ আরও বিভিন্ন কারণে বিক্ষুব্ধ ছিল– তাদের সমর্থন আদায় করতে সক্ষম হয়। ফলে ২০১৬ সালের শেষ প্রান্ত থেকে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন স্থানীয় নির্বাচনে তারা সফল হতে থাকে। ১৬টি প্রাদেশিক সংসদের ১০টিতেই তাদের প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয় এএফডি।

জাতীয় নির্বাচনে এই অভাবনীয় ফলাফলে এএফডি নেতৃবৃন্দ ভীষণভাবে উৎফুল্ল এবং অনুপ্রাণিত। দলের অন্যতম এক প্রভাবশালী নেতা আলেক্সান্ডার গাউল্যান্ড উদ্বেলিত দলীয় সমর্থকদের এক সমাবেশে বলেন:

“আমাদের দলের রাজনৈতিক ইতিহাসে আজকের দিনটি অন্যতম এক স্মরণীয় দিন। আমরা প্রথমবারের মতো বুন্ডেসট্যাগে প্রবেশ করতে যাচ্ছি এবং আমরা নিশ্চয়ই এদেশে পরিবর্তন আনব।”

২০১৫ সালে কোন আইনি ক্ষমতার বলে মের্কেল সরকার সীমান্ত উম্মুক্ত করে দিয়েছিল তা তারা জানতে চান। তারা দেশটাকে তাদের জনগণকে ফিরিয়ে দিতে চান।

 

Marine Le Pen - 1
কট্টর ডানপন্থী মেরিন লে পেনের নেতৃত্বাধীন ‘ন্যাশনাল ফ্রন্ট’ ফ্রান্সের গত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়েছিল

 

কট্টর দক্ষিণপন্থীদের উত্থান কেবল জার্মানিতে সীমাবদ্ধ নেই, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের রাজনীতিতে তাদের প্রভাব বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। মহাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র নেদারল্যান্ডে কট্টরপন্থী জাতীয়তাবাদী দল ‘পিভিভি’র (PVV) উত্থানও অতিসাম্প্রতিক ঘটনা। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত দলটি ২০১২ সালের নির্বাচনে তৃতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তারা তাদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করে। হাউস অফ রিপ্রেসেনটেটিভে তাদের অবস্থান এখন দ্বিতীয় বৃহত্তম। আদর্শগতভাবে দলটি চরম অভিবাসনবিরোধী আর তার সঙ্গে যোগ হয়েছে অন্ধ মুসলিমবিদ্বেষ। দলটির প্রধান গ্রিট উইল্ডার্স ইউএসএ টুডের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেন:

“ডাচ মূল্যবোধ খ্রিস্ট আর ইহুদি ধর্মভিত্তিক। ইসলাম এবং স্বাধীনতা সমার্থক নয়। পৃথিবীর যে সমস্ত দেশ মুসলিমশাসিত সেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের শাসন ইত্যাদির অভাব রয়েছে।”

উইল্ডার্স তার দেশে সমস্ত মসজিদ বন্ধ করতে চান, নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে চান মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরান। আর চান তার দেশের সীমান্ত একেবারে সিলগালা করে দিতে যাতে মুসলিম অভিবাসীরা নেদারল্যান্ডে প্রবেশ করতে না পারে। ওদিকে কট্টর ডানপন্থী মেরিন লে পেনের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ফ্রন্ট ফ্রান্সের গত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিশেষ সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়েছিল।

ইউরোপজুড়ে দক্ষিণপন্থীদের উত্থানের এরকম আরও বেশ কিছু নজির লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ডেনিশ পিপলস পার্টি, ইতালির লেগা নর্ড (Lega Nord), সুইডেন ডেমোক্র্যাটসরা নিজ নিজ দেশের রাজনীতিতে ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করছে।

চতুর্দিকে কেমন এক অস্থিরতা, গুমোট অস্বস্তি, জাতিগত বিদ্বেষ প্রিয় এই পৃথিবীকে করে তুলছে অনিরাপদ। জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তিতে অভাবনীয় উন্নতি সাধন করছে মানুষ। তারপরও ক্ষুদ্র গোষ্ঠীস্বার্থের উর্ধে উঠে মানবতার জয়গান গাওয়ার মতো সভ্য হয়ে উঠতে পারিনি আমরা। আর তাই বোধহয় কট্টর জাতীয়তাবাদীরা দেশে দেশে মানুষের ভোট ও সমর্থন পাচ্ছে। বিশেষত ইউরোপের মতো বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত অংশে।

এখন দেখা যাক রাজনীতির এই নতুন সমীকরণ আমাদের কোন পৃথিবী উপহার দেয়।

সাজ্জাদুল হাসানসিনজেনটা বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক

Responses -- “ইউরোপে পেট্রি, মেরিন ও কতিপয় নাৎসীপন্থীদের উত্থান কতটা বিপদ ডেকে আনবে?”

  1. মাইন উদ্দিন

    বদলে যাচ্ছে ইউরোপ। সনাতন রাজনীতির দিন শেষ হয়ে আসছে। গণতন্ত্র এখানে এখন ঝুঁকির মুখে। ভিন্ন ফর্মে উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতি ফিরে আসছে। দুটি সম্ভাবনা এখন প্রবল। এক. ইউরোপের বিভিন্ন দেশে উগ্র জাতীয়তাবাদী দলের উত্থান ও বিজয় শেঙেন চুক্তিকে এখন অকার্যকর করে ফেলতে পারে। শেঙেন চুক্তি, অর্থাৎ অবাধ চলাচলের (ইউরোপীয় ইউনিয়নে) যে অধিকার, তাতে এখন বিধিনিষেধ আসতে পারে। দুই. এ মুহূর্তে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভেঙে না গেলেও ‘ইউরো জোনে’ পরিবর্তন আসবে। সর্বশেষ ইতালির প্রধানমন্ত্রী মেটিও রেনজি গণভোটে (সংস্কারের পক্ষে) হেরে যাওয়ায় পদত্যাগ করেন। তাঁর এই পদত্যাগ ‘ফাইভ স্টার মুভমেন্ট’কে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত করেছে এবং তারা জাতীয় রাজনীতিতে অন্যতম শক্তিতে পরিণত হয়েছে। এই ‘ফাইভ স্টার মুভমেন্ট’ ইউরো জোনবিরোধী। চলতি বছর ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ২৭ দেশের (১৫টি দেশ ইউরো জোনে অন্তর্ভুক্ত) মধ্যে কিছু পরিবর্তন আসবে এবং ইউরো জোন থেকে অনেক দেশ বেরিয়ে যাবে। মোদ্দাকথা, ইউরোপের ঐক্যে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং আগামী দিনে তা আরো ‘বড়’ হবে। অর্থাৎ ইউরো জোনভুক্ত কিছু দেশ আলাদা অবস্থান নেবে। জার্মানির আগামীতে সরকার পরিচালনা করবে যে কোয়ালিশন, সেই সরকার থাকবে নড়বড়ে। ৭০৯ সিটের পার্লামেন্টে তাদের হাতে থাকবে মাত্র ৩৯৩ আসন। সুতরাং বোঝাই যায় কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেয়া মার্কেলের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। টানা চার বছর চ্যান্সেলর হয়ে ইতিহাসে নাম লিখিয়েছেন তিনি। এক সময়ের পূর্ব জার্মানিতে জন্ম নেয়া এই শিক্ষাবিদ (যার রসায়নে পিএইচডি ডিগ্রি রয়েছে) রাজনীতিতে এসেছিলেন দুই জার্মানি একত্রিত হওয়ার পরই। সঠিক নীতি, সাধারণ জীবনযাপন, শরণার্থীদের ব্যাপারে সহানুভূতি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঐক্য ধরে রাখা, ট্রাম্পের কট্টর নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান তাকে বিশ্ব রাজনীতিতে ‘অসাধারণ’ করেছে। তিনি এক সময়ের জার্মান চ্যান্সেলর উইলি ব্র্যান্ডের জনপ্রিয়তাকেও ছাড়িয়ে গেছেন। কট্টরপন্থীদের অব্যাহত উত্থানের মুখে সীমিতসংখ্যক ‘কোয়ালিশন সিট’ নিয়ে তিনি আগামীতে কীভাবে জার্মানির নেতৃত্ব দেন, সেটিই দেখার বিষয়। মানুষ কি প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আস্থা হারিয়ে এএফডিকে ভোট দিয়েছে? শুধু জাতিগত বৈষম্য, মুসলমান বিদ্বেষ কিংবা শরণার্থী-বিরোধিতাই কি এএফডিকে জনপ্রিয় করেছে? এসব খতিয়ে দেখতে হবে।

    Reply
  2. মাহবুব আলী

    নিওনাজিদের এত জনপ্রিয় হবার ফলে জার্মানিতে ও ইউরোপে কি এফেক্ট পড়বে সেদিকে যাবার আগে জার্মানিতে এদের উত্থানের কারণ সম্পর্কে আলোচনা করা জরুরি। জার্মানিতে এই নিওনাজিদের শক্তিশালী হবার একটি প্রধান কারণ হচ্ছে সেখানকার শরণার্থী সমস্যা। জার্মানিতে শরণার্থী বাড়ার সাথে সাথে এরা শরণার্থী ও মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্য দিয়ে অনেক বেশি পপুলারিটি অর্জন করে। দ্বিতীয় কারণটি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের বিজয় যা এই দক্ষিণপন্থীদের উত্থানকে আরও বেশি উৎসাহিত করেছে। তৃতীয় কারণটি হতে পারে, এদের উত্থান ঠেকাতে মেইনস্ট্রিম পলিটিকাল পার্টিগুলো কোন কৌশল গ্রহণ করে নি। এরা এই এএফডিকে তেমন কোন গুরুত্বই দেয় নি। চতুর্থ কারণ ছিল, যারা এএফডিকে ভোট দিয়েছে তাদের অনেকেই মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর উপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে কোন উপায় না পেয়ে এদেরকে ভোট দিয়েছে। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জার্মানিতে যেসব কনজারভেটিভ কনজারভেটিভ পার্টি হিসেবে মারকেলের ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক পার্টিকে ভোট দিত, তারা এই পার্টির উপর আস্থা হারিয়ে ফেললে একটা বিকল্প কনজারভেটিভ দক্ষিণপন্থি পলিটিকাল পার্টির দিকেই আকৃষ্ট হবে। এবার সেটা হবার কারণেই দেখা গেছে মারকেলের ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক পার্টির কেন্দ্রে আসন সংখ্যা আগের ৪১.৫ শতাংশ থেকে নেমে ৩৩ শতাংশ হয়ে গেছে। আসন হারানোর পর এই বিষয়টা নিঃসন্দেহেই মারকেলের কাছে বিশাল শঙ্কার কারণ। পঞ্চম কারণ হতে পারে, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, অবসর ভাতা, পরিবেশ ও ডিজিটাল রূপান্তরের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এএফডি দলের কোন স্পষ্ট অবস্থান নেই। এরা জনপ্রিয় হয়েছে কেবল শরণার্থী ও মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ দেখানোর কাছে। আমজনতার কনজারভেটিভ পোরশনের কাছে এইরকম বিশেষ অবস্থান নিয়ে খুব সহজেই জনপ্রিয় হওয়া যায়। ইতিহাস ঘেটে হিটলারের কথা একটু স্মরণ করে নিতে পারেন।
    এবার আসি এই নিওনাজিদের উত্থানের পরিণতির ব্যাপারে। আগেই বলেছি তাদের তৃতীয় শক্তি হিসেবে উত্থান সবচেয়ে বেশি ভাবাবে মারকেলকে, কারণ তার পার্টির ভোট ব্যাংকই নিওনাজিদেরকে জাগিয়ে তুলেছে। সব যদি এভাবেই চলতে থাকে তাহলে ভবিষ্যতে এটা আরও বাড়ার কথা। এর অর্থ হচ্ছে একসময় সিডিইউ এর উপর যারা আস্থা রাখতেন তারা আর তাদের উপর আস্থা রাখতে পারছেন না। মারকেল তাই নির্বাচনের পর বলেছেন যে তিনি খতিয়ে দেখবেন যে কেন তাকে ছেড়ে এত মানুষ একটা কট্টোর দক্ষিণপন্থী দলকে ভোট দিল। যাই হোক এটা প্রথমত প্রমাণ করেছে যে জার্মানিতে কট্টরপন্থীদের অবস্থান শক্তিশালী হচ্ছে। কনজারভেটিভদের তীর্থক্ষেত্র বায়ার্ন প্রদেশেও এই প্রথমবারের মত সিডিইউ খারাপ ফল করেছে। ইতিহাসের দিকে চোখ রাখলে দেখা যায়, এডলফ হিটলার ও তার নাৎসি পার্টি নির্বাচনে বিজয়ী হয়েই রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনা করেছিলেন। এখন এই এএফডি সেদিকেই যাচ্ছে কিনা দেখার বিষয়।
    দ্বিতীয়ত যে বিষয়টা আনতে পারি তা হল, ২০১৫ সালে ইউরোপে বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর (সিরীয়, ইরাকি ও আফগান) আগমন ঘটলে পুরো ইউরোপের দৃশ্যপট পালটে যায়। সেখানে কট্টরপন্থীদের উত্থান ঘটা শুরু হয়। সেই সময় ১০ লাখেরও বেশি সিরীয় শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে মারকেল সারা বিশ্বে অনেক প্রশংসিত হন। কিন্তু পার্শ্ববর্তী তিনটি দেশ হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড ও চেক রিপাবলিক এই শরণার্থীদের জন্য সীমান্ত খুলে দেবার বিপক্ষে ছিল। এই তিন দেশের সরকার প্রধান এবার যুক্তি দেবেন যে এরাই ঠিক ছিল। তৃতীয়ত এই জার্মান নির্বাচন ইউরোপের কট্টরপন্থীদেরকে আরও বেশি উৎসাহিত করবে। সবার ধারণা সামনের চেক প্রজাতন্ত্রের নির্বাচনে আন্দ্রেই বাবিস আর তার দল ভাল করবে। এই বাবিস ট্রাম্পের মত করেই রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চান। হাঙ্গেরির ভিক্টর ওরবান, পোল্যান্ডের জারুজলাভ কাসিনিস্কিও একই রকম দক্ষিণপন্থী। এদের উত্থান পুরও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দৃশ্যপট বদলে দেবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমরা ইউরোপকে নতুন রূপে পেয়েছিলাম, সভ্যতা ও মানবিকতার আলোয় এই ইউরোপ আলোকিত করেছে সারা বিশ্বকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যে নৃশংসতা দেখেছিল ইউরোপের মানুষেরা, তার বিরুদ্ধে দৃঢ় কণ্ঠে বিশ্বমানবিকতার জয়গান গেয়ে আমাদেরকে পথ দেখিয়েছে এর পরের বেশ কিছু প্রজন্ম। কিন্তু এখন কি সেই বিশ্বযুদ্ধোত্তর মানবিক চেতনা ধীরে ধীরে মলিন হয়ে যাচ্ছে? যদি তাই হয় তাহলে এতদিন যে চাকচিক্যময় ইউরোপ আমাদের সামনে আদর্শ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যার দর্পনে আমরা আমাদের কল্পনা মূর্ত হয়ে উঠত সেই ইউরোপকে আমরা হারিয়ে ফেলব। আমরা তো অনেকেই ট্রাম্প আগমনে উত্তর আমেরিকার রাজনীতির এহেন দশা দেখে গেল গেল রব তুলে মূর্ছা যাই। ইউরোপে এতগুলো জাতি রাষ্ট্রে যে এত এত ট্রাম্প, ট্রাম্পের বাপ ও ট্রাম্পের বাপের বাপ পয়দা হচ্ছে সেসব নিয়ে হয়তো ভাবার সময় এখন চলে এসেছে।

    Reply
  3. আল ফরহাদ

    ইউরোপেও ইসলামোফোবিয়া বাড়তেছে। ভবিষ্যতে আরো বাড়বে।
    আমি শুরু থেকেই বলতেছি, ট্রাম্প নতুন কিছুই না। বরং দীর্ঘ ১৫ বছর আমেরিকাতে তৈরি হওয়া ইসলামোফোবিয়ার ফেসভিউ মাত্র। যে কোন গোষ্ঠীর উপর হত্যাযজ্ঞ কিংবা ইথনিক ক্লিঞ্জিং চালানোর আগে তাদের ডিহিউম্যানাইজ করা হয় । গত বছর ফেব্রুয়ারিতে অনলাইন ম্যাগাজিন ‘দ্য উইক’-এ প্রকাশিত মাইকেল ডোহার্টির একটি নিবন্ধের শিরোনাম ছিল, ‘হোয়াই দ্য নেক্সট রিলিজিয়াস রিভাইভাল ইন দি ওয়েস্ট মে বি ইসলামিক’। পশ্চিমা বিশ্বে মুসলমান ও ইসলাম সম্পর্কে বিদ্যমান কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে তার নিবন্ধে বিশ্লেষণ করেছেন মাইকেল ডোহার্টি। সেখানে তিনি একটি তুলনামূলক আলোচনায় বলেছেন,
    In Europe, Islam comes across as streetwise and assertive. Mosques are full and thriving, the anchors of growing communities. Churches are wan, empty, scandal-ridden, and irresolute. যেখানে ইউরোপের তিরিশটি দেশের রাষ্ট্রশক্তি মিলেও মুসলমানদের রুখতে পারছে না, সেখানে ইউরোপীয় মুসলমানদের তুলনায় কয়েকগুণ বড় ভারতের মুসলমান সম্প্রদায়কে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা ও নিষ্ক্রিয় করে রাখতে চাইছে ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকরা। একেকবার একেক জিগির তুলে সেখানে মুসলিম বিদ্বেষ ও উগ্র হিন্দুত্ববাদ ছড়িয়ে দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছে সেখানকার একশ্রেণির রাজনৈতিক নেতা। ভারত বিশ্বের প্রধান গরুর গোশত রফতানিকারক দেশ। ইউরোপ আমেরিকার মতো ভারতও গণতান্ত্রিক এবং বহু ভাষা ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের ভিত্তির ওপর গড়ে ওঠা মাল্টি-কালচারিজমের দেশ। যেখানে পশ্চিমা বিশ্বে শতকরা ৩ ভাগেরও কম সংখ্যক মুসলমান জনগোষ্ঠীকে কখনো বের করে দেয়ার কথা চিন্তাও করতে পারে না। সেখানে ভারতের ২৫ কোটি মুসলমানকে যত্রতত্র নানা হুমকি ও গঞ্জনা সহ্য করতে হচ্ছে। অথচ আধুনিক ভারতের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলার পেছনে ভারতীয় মুসলমানদের অবদান অনেক বেশি। সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরেপক্ষ ভারতে এখন মুসলমানরা অনেক বেশি অনিরাপদ ও হুমকির সম্মুখীন। অথচ এই ভারত প্রায় ১০০০ বছর মুসলমানদের শাসনাধীনে ছিল। মুসলমানরা ক্ষমতাবলে হিন্দুদের ধর্মান্তরিত করেছিলেন কিনা, কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে গত বছর ভারতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতির একজন পশ্চিমা প-িত শেলডন পোলক বলেছিলেন, ‘মুসলমান শাসকরা জোর করে ধর্মান্তর করালে ভারতে একজনও হিন্দু থাকত না। কারণ মুসলমান শাসকরা ভারতে প্রায় বারোশ বছর রাজত্ব করেছিলেন।’ পাশাপাশি ভারতের লুপ্তপ্রায় সংস্কৃত ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার ও প্রসারে মুসলমান শাসকদের অবদানের কথা তুলে ধরেন নিজেকে ‘ইহুদি ব্রাহ্মণ’ বলে পরিচয় দিতে আগ্রহী শেলডন পোলক। কোনো ডিভাইসিভ (বিভাজন সৃষ্টিকারী), এক্সক্লুশনারি (কোনো সম্প্রদায়কে কাউকে বাইরে রেখে), মেজরিটারিয়ান (সংখ্যাগরিষ্ঠের) রাজনীতি তাই সংস্কৃতির অন্তরায়। দরকার সবাইকে নিয়ে মুক্ত আনন্দের সৃষ্টিশীল পরিবেশ। ’ গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে ভারতের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পতন অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। নিকট ভবিষ্যতে ইসলামোফোবিয়া যত বাড়বে, ফার রাইট ফ্যাসিস্ট মুভমেন্ট তত শক্তিশালি হবে।
    এক সময় বলতো radical Islamic terrorist
    এরপর হইলো Radical Islam
    খুব দ্রুতই সেটা Islam হয়ে যাবে, Radical অংশ বাদ যাইতে বেশি সময় লাগবে না।

    Reply
    • Sumit Mazumdar

      Response to Al Farhad: Even as it is strange to see India introduced in the context of an article on rightist move in Europe, I agree that the Muslim citizens of India are living in times of great insecurity, and that simply should not happen. However, if we all believe that the solution to the problem is to point at the “other”
      and not notice what is going on in our backyard [see today’s BDNews column by Chiraranjan Sarkar, on the plight of Bangladeshi Hindus] we will simply add to the problem. Now, more than ever, it is time for educated open minded people to reach out to their counterparts belonging to the “other” culture and to form alliances. We are on the same side, against barbarians who claim to be Hindus, Muslims or Christians. Let’s go after the barbarians, together.

      Reply
  4. Sumit Mazumdar

    One thing this article does not mention is the refusal of the Muslim immigrant community to assimilate with the majority society. It is this, rather than the expenditures incurred, that has given rise to the Islamophobia, even as the latter might be unjustified. Consider for example the quotation from Gert Wilders of the Netherlands in the article, in particular the last sentence, which says that in many Muslim countries there is absence of individual freedom and absence of rule of law. This is hard to deny. However, many refugees and immigrants, even as they are escaping from gruesome violence whose cause was absence of freedom, want to import the same bad practices that they have left behind. Muslim parents do not want their boys to shake hands with female school teachers as they want to maintain the separation of the sexes. Or they do not want their girls to swim in school swimming pools wearing bathing suits. These actions right away rile up the local community, particularly women, for whom it is regression from women’s equality after a century of fight for the same. Salafi preachers have been accused of preaching that the locals are “unclean”: British, Belgian and Italian imams have been or are in the process of being thrown out for preaching offensive items. Add to that these preachings have led European born second generation Muslims to leave their countries and to fight for ISIS in Iraq and Syria. Some have come back to Europe and have committed mass murders (think Paris, Berlin, London). Consider now that while only 6% of Belgium is Muslim, they are mostly in Brussels which is 25% Muslim. Earlier in the year, Brussels was shut down several times because of reports of impending jihadi attacks. Would these kind of things not lead to anxiety? How do the locals know that suicide bombings are not next?
    It is unfair to hold the average Muslim responsible for the atrocious activities of a few. But the average Muslim must find ways to assimilate and to strop importing the bad practices they have left behind. The Germans, the Dutch and the Swedish are notoriously secular, conflicts with the average citizens will become imperative unless the immigrants accept the separation of the state and religion in every facet of public life.

    Reply
  5. সালমান

    ইসলামোফোবিয়া আর চরমপন্থী ডান ঘরানায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন সারা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে গিয়েছে। “ইসলামোফোবিক দুনিয়ায় মুসলিমরা কোথাও-ই থাকার যোগ্য নয়। জাতিগত বিভাজনের উপর ভিত্তি করে যে বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, বৈশ্বিকভাবে মুসলিম আইডেন্টিটির উত্থান এক্ষেত্রে সীমালংঘন হিসেবে পরিণত হয়েছে; সাংস্কৃতিক সমজাতীয়তার আন্দোলনগুলোর চোখে তারা পাপী; এনলাইটেনমেন্ট টেলিওলজির চোখেও তারা পাপী।” ইসলামোফোবিয়া মুসলিম সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর প্রতি কেবল একগুচ্ছ নেতিবাচক মনোভাবের সমষ্টি না। সুবিধা ও নিষ্ঠুরতার এই বিশ্বব্যবস্থা বিনির্মানে ইসলামোফবিয়া যেভাবে ব্যবহৃত হয়েছে তাতেই এর মূল গুরুত্ব নিহিত। এটা কোন কাকতালীয় ব্যাপার নয় যে, অং সান সু চি মনে করেন রোহিঙ্গারা বহিরাগত সন্ত্রাসী। এটা কোন কাকতালীয় ব্যাপার নয় যে, ইন্ডিয়ার নরেন্দ্র মোদী সম্প্রতি সুচির সাথে রেঙ্গুনে মোলাকাত করেছেন যখন তার আর্মি রাখাইনে জাতিগত নিধন চালাচ্ছিলো, যে রাখাইনে রোহিঙ্গারা শতকের পর শতক ধরে বাস করে আসছে। এটা কোন কাকতালীয় ব্যাপার নয় যে, হত্যা, ধর্ষন ও নির্যাতনের সংবাদগুলোকে সুচি তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিচ্ছেন ভুয়া খবর হিসেবে। এই সুচি, মোদী, ও ট্রাম্প – এদের সবাই কথা বলছেন ইসলামোফোবিয়ার ভাষায়। বিশ্বব্যাপী জাতীয়তাবাদ ও জাতিরাষ্ট্র প্রকল্পের যে সঙ্কট প্রতিধ্বনিত হচ্ছে তাকে সামাল দিতে জেনোফোবিক জাতীয়তাবাদীরা ইসলামোফোবিয়ার যে ভাষা ব্যবহার করছে এটি সে-ই ভাষা। নিছক মুসলিমদের অস্তিত্বই এই দুনিয়ায় জাতীয়তাবাদী মুক্তি অর্জনের অসম্ভাব্যতার স্মারক হয়ে উঠেছে যারা কোন গোষ্ঠী বা দেশের ছোট মুঠোয় জায়গা করে নিতে পারবেনা। জাতীয় মুক্তি ও পুনর্জাগরণের প্রকল্প প্রস্তাবনায় জাতীয়তাবাদী উদ্দীপণার যে ব্যর্থতা তার জন্য নিছক মুসলমানদের অস্তিত্বকেই দায়ী করা হচ্ছে। তো এই ইসলামোফোবিক দুনিয়ায় মুসলিমরা বর্বর বহিরাগত ছাড়া কিইবা হতে পারে যারা সভ্যতাকে নিছক তাদের অস্তিত্ব দিয়েই হুমকি দিয়ে যাচ্ছে?
    জেনফোবিক আধিপত্যবাদের শক্তিশালী হওয়াটা ক্রমাগতভাবে মুসিলম বশীভূতকরণ প্রচেষ্টার উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। এই মুহুর্তে মুসলিমরা বিশ্বব্যাপী ট্রান্স-ন্যাশনালিজম বা জাতীয়তাবাদ উৎরে যাওয়ার একটি সিগ্নিফায়ার হিসেবে পরিণত হয়েছে (ভাষাবিদ ফার্দিনান্দ দ্য স্যুসুরের ভাষ্যমতে, ‘সিগনিফায়ার’ যেই অর্থদ্যোকতা হাজির করে তার উপর ‘সিগনিফাইড’ তৈরী হয় – সম্পাদক)। ট্রান্স-ন্যাশনালিজমের এই দাবীটা চিহ্নিত হয় (নৈতিকতার দিক থেকে) দ্বৈত আনুগত্য, পরদেশীতা, সীমানা-উত্তর সম্পর্ক ও সম্বন্ধ শীর্ষক চিহ্ন দিয়ে। সুতরাং জাতিরাষ্ট্রের অসম্ভব পূর্ণতার পথে বাধা হিসেবে, বিশ্বায়নের চিহ্নায়ক হিসেবে, এবং হোমোজেনাস সমাজের আকাঙ্ক্ষিত সাদৃশ্যের ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে বরাবর মুসলিমরা প্রতিফলিত হচ্ছে। বিশ্বায়ন কর্তৃক সৃষ্ট অস্থিরতা ও নয়া-উদারনৈতিক যুক্তিকাঠামোর শাসনে বিশ্বব্যাবস্থার কাঠামোগত যে রূপান্তর তার উপর থেকে নজর সরিয়ে মুসলিমদের অস্তিত্বের উপর নজর আনা হচ্ছে। এই মুসলিমরা বর্তমানে সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক ডায়াসপোরা (Diaspora) কেননা তাদেরকে কোন জাতিরাষ্ট্র নির্দিষ্ট কোন নৃতাত্ত্বিক বা জাতিগত পরিচয়ে ধারণ করতে পারেনা। জাতির শরীরে বাসা বাধা বহিরাগত বিষাক্ত উপাদানগুলো সারানোর প্রতিষেধক হিসেবে পরিণত হয়েছে ইসলামোফোবিয়া। মুসলিমরা হচ্ছে নির্দিষ্ট নৃতাত্ত্বিক কাঠামোতে (Ethnos) জনগণকে (Demos) ধারণ করার চুড়ান্ত অক্ষমতার রূপক। রাষ্ট্রনীতি আকারে ইচ্ছাকৃত নির্বিচার হত্যাকান্ড হিসেবে গণহত্যা ঘটে থাকে জাতি এবং ঐ সকল গোষ্ঠীর ছেদবিন্দুতে যারা জাতির সীমানা ভেঙ্গে দিয়ে সংকট তৈরী করে। ভূ-রাজনৈতিক বিভাজনের ফলে বিশ্বের সকল প্রধান ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে মুসলিম সংখ্যালঘু রয়েছে যারা ‘হালের নৃতাত্ত্বিক-জাতীয়তাবাদের ধারা এবং নাগরিকতা ও নৃতাত্ত্বিকতার মাঝে যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে তার সাথে জড়িয়ে পরেছে। বহুল আকাঙ্ক্ষিত নৃতাত্ত্বিকভাবে ‘বিশুদ্ধ জাতিরাষ্ট্র’ বাস্তবায়নের পথে তাই তাদেরকে প্রধান বাঁধা হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।

    Reply
    • মো: কাওসার

      অনেকে লিখছে- ‘মুসলমান তুই পালিয়ে যা, সময় তোর পক্ষে না।’
      আসলে-‘সুবোধ’ পালাতে পারে, কারণ সুবোধ মুসলমান নয়। হিন্দু বা নাস্তিক। মূলত: সুবোধ ফিগারটা তৈরী হয়েছে হিন্দু ও নাস্তিকদের উদ্দেশ্য করে । সমস্যায় পড়লে হিন্দুদের পালানোর জন্য আছে পাশের ভারত, আর নাস্তিকদের জন্য আছে ইউরোপের ভিসা।
      কিন্তু মুসলমান পালাতে পারবে না। কারণ- রোহিঙ্গা মুসলিমরা পালিয়ে বাংলাদেশে আসতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের মুসলমানরা পালিয়ে যাবে কোথায় ? তার তিনদিকে হিন্দুত্ববাদী ভারত ও বৌদ্ধ মায়ানমার আর একদিকে আছে বঙ্গোপোসাগর।
      তার মানে ‘মুসলমানের পালানোর কোন যায়গা নাই। সমস্যায় পড়লে মুসলমানকে নামতে হবে একমাত্র বঙ্গোপোসাগরে। এছাড়া পালানোর আর কোন যায়গা দেখি না।

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—