ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দুই সহযোগী সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের কঠোর সমালোচনা করলেন দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। স্বেচ্ছাসেবক লীগকে তিনি অভিহিত করলেন ‘সাইনবোর্ড-সর্বস্ব’ সংগঠন হিসেবে। আর ছাত্রলীগকে নিয়ে বললেন, “আওয়ামী লীগ ও সরকার খেটেখুটে যে সুনাম অর্জন করে, তা ছাত্রলীগের একদিনের অপকর্মেই ধ্বংস হয়ে যায়।”

অভিনন্দন আপনাকে। দলের কাণ্ডারি হিসেবে এই বক্তব্য দেবার জন্য। আজকাল আমরা তোষণের রাজনীতিতে এত মগ্ন যে, আসল কথা বলতে পারি না। বললেও তা এত মিনমিনে আর দায়সারা যার মানে দাঁড়ায় না। সবাই জানি দেশের রাজনীতিতে তরুণ-তরুণীদের আসলে আর আগ্রহ নেই। থাকবে কী করে? যদি আদর্শ কাজ না করে আর সামনে কোনো উদ্দেশ্য না থাকে কীভাবে তা সম্ভব?

’৭১এ যে মহান উদ্দেশ্য নিয়ে ছাত্রসমাজ মাঠে নামত বা তারও আগে যে রাজনীতি আমাদের উদ্দীপ্ত করত তার ছিল সঠিক নির্দেশনা। একসময় আমাদের মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়া– তারপর স্বাধীনতা বা মুক্তির সংগ্রাম। মাথার ওপর বঙ্গবন্ধু– সঙ্গে তাজউদ্দীন, সৈয়দ নজরুল, মনসুর আলী কিংবা কামারুজ্জামানের মতো নেতারা। সব দলে তখন যারা নেতা তারা সবাই আদর্শকামী। আমরা মতে একমত না হতে পারি তা বলে মাওলানা ভাসানীর সততা কি অস্বীকার করা যাবে? কীভাবে আমরা ভুলব মনি সিংহ বা হাজী দানেশের কথা? সেদিনকার রাজনীতি এমনকি কয়েক যুগ আগের রাজনীতি আর আজকের বাস্তবতায় অনেক ফারাক।

আমি মনে করি, সামনে যদি নির্দিষ্ট কোনো আদর্শ উদ্দেশ্য না থাকলে এমনই হয়। এরশাদের শাসন আমলেও ছাত্ররাজনীতি আমাদের পথ দেখিয়েছিল। টগবগে যৌবনে আমি দেখেছি আমাদের সহযাত্রী বন্ধুদের ত্যাগ, তাদের প্রেরণা আর দেশপ্রেম। ক্রমে এমন এক বাস্তবতায় ঢোকানো হল যেখানে উপার্জন আর ধান্দা ছাড়া কিছুই বাকি থাকল না। আজ সে বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে ছাত্ররাজনীতির এই হাল।

কেবল ছাত্র্রলীগের দোষ? আমাদের আমলে রোকেয়া হলের ছাত্রীদের ওড়না কেড়ে নেওয়া থেকে যুবশক্তির ধ্বংসে যুবদল ছাত্রদলের ভূমিকা কম? আজ তারা মাঠে নেই বটে, সুযোগে আবার স্বরূপে আর্বিভূত হবে। বলিহারি আমাদের তারুণ্য। যারা ওড়না কেড়ে নিল তাদের বিপুল ভোটে জিতিয়ে আনা ছাত্রীরা সেদিন বলেছিলন, যে মারে সে নাকি বাঁচাতেও পারে, তাই এই সমর্থন!

বলাবাহুল্য, এই হিসাব-নিকাশে ছাত্র ইউনিয়নের মতো বা বামধারার ছাত্রসংগঠনগুলো চিরকাল হারমোনিয়াম পার্টি নামে পরিচিত হয়ে রইল। যেদিন থেকে আমাদের এই মানসিকতা সেদিন থেকে পথ হারিয়েছিল ছাত্ররাজনীতি।

এই যে ওবায়দুল কাদের বললেন, এখানে এক বর্ণ মিথ্যা আছে? স্বেচ্ছাসেবক লীগের মানে কী? স্বেচ্ছাসেবী কি যে কেউ হতে পারে না? আওয়ামী লীগ কি স্বেচ্ছাসেবা দেয় না? তাদের আরেকটি এমন সংগঠনের প্রয়োজন কী? কাদের ভাই সঠিক বলেছেন, সাইনবোর্ড-সর্বস্ব। তো এখন এই সাইনবোর্ড কি ঝুলতেই থাকবে? কে নামাবে এই সাইনবোর্ড?

বিনয়ের সঙ্গে বলি, সাইনবোর্ড ঝোলে মুদির দোকানে। আওয়ামী লীগের মতো সংগঠনের এমন মুদির দোকান দরকার আছে? কাজে না এলে কারা এই সাইনবোর্ড দেবার দোকান খুলছে তাদের চিহ্নিত করুন। এমন নামও কিন্তু আজকের ডিজিটাল দুনিয়ায় বড় হাস্যকর।

আর ছাত্রলীগ? তাদের নিয়ে এখন কিছু বলাও ভয়ের ব্যাপার। যতই ছাত্রলীগ নামধারী বলে আমরা তাদের ওপর দোষ কমানোর চেষ্টা করি না কেন আসলে বিশ্বজিৎ হত্যার পর সাধারণ মানুষের মনে এদের প্রতি ভালোবাসা আছে কী নেই সেটা দূরবীন দিয়ে দেখতে হবে। ছাত্রলীগের নাম ভাঙিয়ে যাবতীয় কুর্কীতি হচ্ছে আর সরকারি দল তা সহ্য করে যাচ্ছে এটা মানুষ নেয় না। এককালের ঐতিহ্যবাহী নামী সংগঠনের এই পরিণাম আমাদের মতো অনেকের জন্য বেদনার।

আপনার সঙ্গে একমত হয়ে বলি, এগুলো একদিনে হয়নি। কোথাও যখন কোনো আদর্শ নেই, ছাত্রলীগ আর স্বেচ্ছাসেবক লীগে থাকবে কোন কারণে? তাই শুধু বলাবলিতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, চাই প্রতিবিধান। আপনি যদি মনোযোগ দেন এবং সরকারি দল যদি চায় তাহলে এর একটা বিহিত হোক। আর তা যদি না হয় শুনতে ভালো কথাগুলো একসময় দীর্ঘশ্বাস হয়ে ঝুলতে থাকে। যারা দেখে মন খারাপ করে তখন করার আর কিছুই থাকে না তাদের।

আজকের বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতি মানে ভয় আর আতঙ্ক। এর থেকে মুক্তির পথ তাদের শুদ্ধ ধারায় ফিরিয়ে আনা। কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতির দরকার আর নেই। আছে কল্যাণ ও সংস্কৃতিমূলক কাজ করার তাগিদ। ছাত্রলীগ নাম ধারণ করেও তা করা যায় বৈকি। সে কাজ শুরু হোক। শুরু হোক মানুষের মন থকে ভয় দূর করার কাজ।

মানুষ চায় দেশের তারুণ্য তাদের স্বভাবসুলভ ভালোবাসায় দেশসেবার কাজে লাগবে। যেমন একসময় আমাদের দেশের ছাত্রেরা করেছিলেন। সূর্য সেন থেকে বঙ্গবন্ধু, সবাই তার উজ্জ্বল প্রমাণ। মানুষের জীবনে এই বয়সটা সোনালী। এই বয়সে মানুষ দেশকে ভালোবাসে, তরুণীর প্রেমে পড়ে। বই-পুস্তক পাঠ করে। গান শোনে। আগামী জীবনের জন্য তৈরি হয়।

তাদের হাতে বন্দুক বা পিস্তল তুলে দেওয়ার রাজনীতি চিরতরে বন্ধ করতে হবে। তাদেরকে জীবন ভালোবাসার পাঠ দিতে না পারলে কোনো কাজ হবে বলে মনে হয় না। একসময় আমরা যাদের বিবেক মনে করতাম তারাও আজ ঘুমিয়ে। রাজনীতি আমাদের সমাজকে এমনভাবে চেপে ধরেছে যে, চরম সত্য এমনকি জীবননাশের সংবাদও এখন তুচ্ছ। আমরা সব মেনে নিচ্ছি। এককালে একজন মানুষের ‘নেই’ হয়ে যাবার খবরে সারাদেশ তোলপাড় হয়ে যেত। এখন?

খবরে দেখলাম চাটগাঁয় এক তরুণ রাতে বড় ভাইকে মেরে সকালে গেছে দাওয়াত খেতে। হাতে রক্তের দাগ– বড় ভাইয়ের খুন– সে হাতে বিরিয়ানি মুখে উঠল কীভাবে? কতটা নির্মম ও পাষাণ হলে এমন ঘটনার পরও মানুষ স্বাভাবিক থাকতে পারে?

ঢাকায় দেখলাম মায়ে বিয়ে-বহির্ভূত সম্পর্কের জেরে স্বামী খুনের খবর। মেয়ে তা দেখে ফেলায় মা মেয়েকে খুন করতেও পিছপা হয়নি। এর আগে আমরা দেখেছিলাম মেয়ের হাতে মা-বাবার খুনের খবর। এরপরও আমরা বলব আমাদের সমাজ স্বাভাবিক আর সহজ?

অথচ দেখুন ধর্মের নামে কী জেল্লা! চারদিকে এত সংস্কার এত রাখঢাক আর এর আড়ালে চলছে মানুষের পশু হবার ধুম। এটা কেমন সমাজ? দেখবেন খোলামেলা বা উদার থাকার সময় এতসব অঘটনের খবর ছিল না। তখনও হত, তবে তা পরিমিত। যত আমরা নিজেদের সঙ্কুচিত করছি তত অপরাধ বাড়ছে। এতে সমাজের যে অবনতি আর খারাপ দিক সেটি এখন আর গোপন কিছু নয়।

সবচেয়ে বড় কথা হল, বাইরের মানুষের দরকার হচ্ছে না। ঘরের মানুষই ঘরের মানুষের দুশমন। লেখক, সাংবাদিক নেতা থেকে অভিনেতা– সাধারণ থেকে অসাধারণ, সব পরিবারে আজ এই হাল– এর মানে কী?

এর মানে যদি ধরে নিই ভাঙছে, আর এভাবে আমাদের জীবন হয়ে উঠছে এক যন্ত্রণা, তবে দায়ী কারা? আমরা কি ভুলে যাব এদেশের খুনের রক্ত প্রথম বইতে শুরু করেছিল রাজনীতির কারণে। একটি ছাত্রাবাসে সাত খুন দিয়ে শুরু। তারপর হল বঙ্গবন্ধু হত্যা। মানুষ দেখল রাষ্ট্রপ্রধানও এমন নির্মমভাবে খুন হতে পারেন, আর খুনিরা বলে নিজেরাই নাকি জাতীয় বীর!

অতঃপর জেলখানায় এই জাতির সেরা নেতাদের মারার পর সে খুন কাউকে ছাড় দেয়নি। একসময় মনে হত এ প্রক্রিয়া ছাড়া কেউ গদিতে যেতে পারবে না। সেটা আপাতত থেমে থাকলেও দূশ্চিন্তা মুছে যায়নি। গ্রেনেড মারার মতো ঘটনাও এদেশে গল্পের বাস্তবতায় শেষ হয়। কেউ দায় নেয় না। দায় নিতে চায় না। বিচার, আইন সব হাতের মুঠোয় থাকলে যা-হয় সমাজ আস্তে আস্তে দূর্বল ও নিস্তেজ হয়ে যায়। মানুষের প্রতিরোধও কমে আসে।

পথহারা অগ্রজের দেশে তারা পথ পাবে কী করে খুঁজে? এটাই এখন জানার আসল বিষয়। তারপরও এমন কঠিন বিষয়ে সত্য বলার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ জনাব ওবায়দুল কাদের।

অজয় দাশগুপ্তকলামিস্ট।

Responses -- “ওবায়দুল কাদেরের বোধোদয় ও আদর্শের রাজনীতি”

  1. হাবিবুল্লাহ চৌধুরী

    আজকের সমাজে গণহত্যাকারী, খুনী, কোটি কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনকারী, সশস্ত্র সন্ত্রাসী, দূর্নীতিবাজ, লম্পট, চরিত্রহীনরা যেন সাধু! আর নিরাপরাধীদেরকে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে মিডিয়া ট্রায়াল আর বিকৃত উপস্থাপনার মাধ্যমে রাজনৈতিক বিবেচনায় বানানো হচ্ছে জঘন্য আপরাধী! এজন্য প্রয়োজন হয়না তথ্য-উপাথ্য আর অকাট্য প্রমানাদির। প্রয়োজন পড়েনা কোন নিরপেক্ষ তদন্তের। গোয়েবলসীয় সূত্রের আলোকে চলছে সত্যপন্থীদের বিরুদ্ধে এই অসত্য প্রচারণা। বিরোধী মতকে সন্ত্রাসের দোসর বলে প্রচারণা সরকারের একটা মুদ্রাদোষে পরিণত হয়েছে।
    কি সেলুকাস এ পৃথিবী! কি অদ্ভুত আর বিষ্ময়কর আমাদের রাজনীতি! কত নিষ্ঠুর, নোংরা, কলুষিত, ক্ষমতার মোহে দিকভ্রান্ত আওয়ামী লীগের এই নেতিবাচক শিষ্টাচার বহির্ভূত অপরাজনীতি! ধিক আজকের সমাজের এই ঘৃনিত বিষবাস্পকে। ধিক্ আওয়ামীলীগের এই অমানবিক, ফ্যাসিস্ট চরিত্রকে। বি. সি. ওয়াই বলেছে- “ক্ষমতা সবচেয়ে বড় মদের নেশার মতো। যাকে একবার পেয়ে বসে তাকে জীবনে শেষ করে দেয়”।

    Reply
  2. হাবিবুল্লাহ চৌধুরী

    বিরোধী রাজনৈতিক মত, ভিন্নমতাবলম্বিনী দমনে নির্বাহী বিভাগের সাথে বিচার বিভাগ ও মিডিয়া সমানভাবে এক্ট করেছে। আর এর পরিনতিতে একটি অথরোটিয়ান, করাপটেড, হিটলারীয় শাসন যন্ত্রে পরিনত হচ্ছে দেশ। আজকে সিনহা সাহেব সামগ্রিক ব্যবস্থার শিকারই মাত্র। এর চাইতেও ভয়ংকর হলো সমস্থ রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক দলের মৃত্যু ঘটে যাচ্ছে.. এক্ষেত্রে আওয়ামীলীগের অবস্থা সম্ভবত সবচেয়ে খারাপ। গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকার নিয়ে কোন মুখে তারা কথা বলবে? যদি নাই বলতে পারে তাহলে কি নিয়ে রাজনীতি করবে তারা? যারা আজ ব্যক্তিগত ক্ষমতার মোহে এইসব প্রক্রিয়াকে সমর্থন দিচ্ছেন একদিন তারা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ববেন তা ভেবেছেন কি? অবশ্য দাস প্রবৃত্তি যখন পরতে পরতে স্বাধীনতার সুখ কি তখন উপভোগ করা যায়?

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—