আবার ভাঙা রেকর্ডটা বাজই। এই ভাঙা রেকর্ড বাজানো ছাড়া আর কী-ই-বা করতে পারি?

(ভাঙা রেকর্ড বাজানোর অর্থ, এক কথা বার বার বলা। কথাটা কোথা থেকে এসেছে এই যুগের ছেলেমেয়েদের জানার কথা নয়। গ্রামোফোনের যুগে যে রেকর্ড বাজিয়ে গান শোনা হত সেখানে খুব সূক্ষ্ম খাঁজ কাটা থাকত। ঘুরতে থাকা রেকর্ডের বাইরের প্রান্তে গ্রামোফোনের পিন লাগানো মাথাটা বসিয়ে দিলে সূক্ষ্ম খাঁজটা অনুসরণ করে গান বাজাতে বাজাতে সেটি রেকর্ডের ভেতরের প্রান্তে এসে শেষ হত। রেকর্ড ভাঙা হলে বা সেখানে ফাটল থাকলে পিনটা একটা খাঁজে আটকে গিয়ে সেই খাঁজের অংশটুকই বারবার বাজিয়ে যেত! তাই এক কথা বার বার বলা হলে আমরা বলি ভাঙা রেকর্ড বাজিয়ে যাওয়া!)

আমি কোন ভাঙা রেকর্ড বাজানোর কথা বলছি সেটা অনুমান করা নিশ্চয়ই খুব কঠিন নয়। সেটি হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিপরীক্ষা। দেশে এখন বিয়াল্লিশটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। সব বিশ্ববিদ্যালয় যদি ভর্তিপরীক্ষার জন্য একটি করে উইক-অ্যান্ড নিতে চায় তাহলে বিয়াল্লিশটি উইক-অ্যান্ড দরকার। এইচএসসি পরীক্ষার ফল বের হওয়ার পর থেকে শুরু করে ইউনিভার্সিটির ক্লাস শুরু হওয়ার মাঝখানে বিয়াল্লিশটি উইক-অ্যান্ড নেই। তার চেয়ে বড় কথা, দেশের প্রতাপশালী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এক উইক-অ্যান্ডে পরীক্ষা শেষ করে না, তাদের বেশ কয়েকটি উইক-অ্যান্ড দরকার হয়। তারা তাদের পছন্দের উইক-অ্যান্ডগুলো বেছে নেওয়ার পর উচ্ছিষ্ট উইক-অ্যান্ডগুলো অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভাগাভাগি করে নেয়।

শুধু তাই নয়, এমন অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আছে যেখানে প্রত্যেকটা বিভাগ আলাদা করে নিজের বিভাগের পরীক্ষা নেয়। সেই সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিপরীক্ষা দিতে হলে ছেলেমেয়েদের গাট্টি-বোঁচকা নিয়ে দিনের পর দিন থাকতে হয়। তারা কোথায় থাকবে কীভাবে থাকবে সেটি নিয়ে কারও বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই।

এই সময়টা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিষ্ঠুরতা দেখার সময়। এই সময়টা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে যাওয়া ছেলেমেয়েদের কষ্ট পাওয়ার সময়। আর এই সময়টা আমার সবচেয়ে বেশি মন খারাপ হওয়ার সময়।

 

University Admission Test (CU) - 222
এই সময়টা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে যাওয়া ছেলেমেয়েদের কষ্ট পাওয়ার সময়

 

বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিপরীক্ষার এই সময়টাতে প্রতি বছরই নানা ধরনের অঘটন ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেগুলো লুকিয়ে-ছাপিয়ে রাখার চেষ্টা করে। একটা-দুটো খবর বের হয়ে যায়। সেটা নিয়ে কিছুদিন হৈচৈ হয়; তারপর সবাই সবকিছু ভুলে যায়।

এবারে সর্বশেষ ঘটনাটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের দুটি প্রশ্ন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার প্রয়োজন নেই, একেবারে খুবই সাধারণ মানুষের চোখে পড়লেও তারা বলে দিতে পারত যে, এ রকম প্রশ্ন ঠিক নয়– এটা হচ্ছে সাম্প্রদায়িক প্রশ্ন– এক ধর্মকে বড় করে দেখিয়ে অন্য ধর্মকে খাটো করে দেখানোর প্রশ্ন। কিন্তু এই প্রশ্ন দুটো কারও চোখে পড়েনি। যে কোনো পরীক্ষার প্রশ্ন কখনও একজন করেন না, বেশ কয়েক জনের একটা কমিটি প্রশ্নগুলো প্রস্তুত করেন। কাজেই সেই কমিটির সব সদস্য উগ্র সাম্প্রদায়িক হবেন তার সম্ভাবনা কম। কমিটির কারও না কারও চোখে পড়ার কথা। কমিটির সদস্যদের কারও চোখে পড়েনি দেখে অনুমান করা যায়, সদস্যদের কেউ সম্ভবত প্রশ্নগুলো পড়ে দেখেননি। তাই কেউ হয়তো জানতেন না যে, সদস্যদের কোনো একজন এ রকম একটা প্রশ্ন ঢুকিয়ে রেখেছেন।

ভর্তিপরীক্ষা মানেই হেলাফেলা– যেনতেনভাবে কিছু গাইড বই থেকে কিছু প্রশ্ন তুলে দিয়ে একটা প্রশ্নপত্র তৈরি করে ফেলা। সেই সব প্রশ্ন এত নিম্নমানের হয় যে, মাঝে মাঝে মনে হয়, পরীক্ষা না নিয়ে লটারি করে ছেলেমেয়েদের ভর্তি করার জন্যে বেছে নিলেও হয়তো তাদের প্রতি বেশি সুবিচার করা হত।

হাইকোর্ট থেকে একবার আমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ভর্তিপরীক্ষার ফলাফল প্রক্রিয়া করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। আমি তখন সবিস্ময়ে আবিষ্কার করেছিলাম, সেই পরীক্ষার প্রত্যেকটা প্রশ্ন গাইড বই থেকে নেওয়া। যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই এ রকম ঘটনা ঘটে তাহলে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একই ব্যাপার কেন ঘটবে না?

কাজেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার ভর্তিপরীক্ষায় আমরা চরমভাবে সাম্প্রদায়িক প্রশ্ন দেখতে পেয়েছি। অনেকেই হয়তো অবাক হয়েছেন, আমি মোটেও অবাক হইনি। ভর্তিপরীক্ষায় এই ধরনের ব্যাপার সব সময় ঘটে যাচ্ছে। আগে সেটা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়নি। এই বার যে কোনো কারণেই হোক এটা নিয়ে অনেকে মাথা ঘামাচ্ছে।

এবারে শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় যে সংবাদের শিরোনাম হয়েছে তা নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও হয়েছে। আমি ডেইলি স্টারে পড়েছি, তারা রাতে ভর্তিপরীক্ষার প্রশ্ন পেয়েছে– পরের দিন সেই প্রশ্নগুলো ভর্তিপরীক্ষার প্রশ্নের সাথে মিলিয়ে দেখা গেছে, সব মিলে গেছে। এটা সংবাদপত্রের খবর, এর মাঝে ভুল বা মিথ্যা হওয়ার কিছু নেই। প্রশ্নফাঁসের এর থেকে অকাট্য প্রমাণ আর কী হতে পারে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অবশ্যি পুরোটা অস্বীকার করে রেকর্ড সময়ের ভেতরে পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করে ফেলেছে। এ রকম অবস্থায় এটি হচ্ছে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। একবার ফলাফল প্রকাশ করে ফেললে আর কেউ কিছু করতে পারবে না। ফলাফলে যাদের নাম চলে আসবে এখন তারাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে অন্য সবার সাথে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করলেও আমরা সবাই জানি, আসলে সত্যিই প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। প্রশ্ন ফাঁস করার সাথে জড়িত থাকার ব্যাপারে ছাত্রলীগের নেতাদের নাম উঠে এসেছে, কাউকে কাউকে বহিস্কার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে একটা চরম ঘোলাটে অবস্থা।

ভর্তিপরীক্ষার ফলাফলে ভালো ছেলেদের সাথে সাথে পরীক্ষার প্রশ্ন যারা পেয়ে গেছে তারাও চলে এসেছে। আমি যখন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিপরীক্ষার কাজকর্মগুলোর সাথে যুক্ত ছিলাম তখন দেখেছি, কেউ যদি এক নম্বর বেশি পেত সে তিরিশ জনকে ডিঙিয়ে সামনে চলে আসত। কাজেই যারা ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্ন পেয়ে পরীক্ষা দিয়েছে, তারা অন্যান্য সকল ছেলেমেয়েদের ডিঙিয়ে অনেক সামনে এসে গেছে। তারাই এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হবে!

 

University Admission Test - 333
ভর্তিপরীক্ষা মানেই হেলাফেলা– যেনতেনভাবে কিছু গাইড বই থেকে কিছু প্রশ্ন তুলে দিয়ে একটা প্রশ্নপত্র তৈরি করে ফেলা

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিজেদের প্রশ্নগুলো দুর্বৃত্তদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেনি। ভর্তিপরীক্ষায় একটি অনেক বড় অমানবিক ঘটনা ঘটেছে জেনেও তারা দুর্বৃত্তদের হাত থেকে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের রক্ষা করেনি, তারা দুবৃর্ত্তদের অন্যায় করতে দিয়েছে, এর চাইতে হতাশার ব্যাপার আর কী হতে পারে?

মাত্র অল্প কিছু দিন আগে আমি ভর্তিপরীক্ষা দিতে ইচ্ছুক এ রকম একটি মেয়ের কাল্পনিক একটা গল্প লিখেছিলাম। সেখানে লিখেছিলাম, এক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিপরীক্ষা দিয়ে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটে যাবার সময় রাতের বাস পথে দেরি করার জন্যে মেয়েটি সময়মতো পৌঁছাতে পারেনি বলে ভর্তিপরীক্ষা দিতে পারেনি। আমরা সবাই দেখেছি, এ রকম ঘটনা এখন মোটেও কাল্পনিক ঘটনা নয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ঠিক এই ঘটনাটি ঘটেছে। শত শত ছেলেমেয়ে পথে ট্রাফিক জ্যামে আটকা পড়ে সময়মতো পরীক্ষার হলে হাজির হতে পারেনি বলে ভর্তিপরীক্ষা দিতে পারেনি।

একজন ছাত্র বা ছাত্রী সমস্ত জীবন দিয়ে পরীক্ষার জন্যে প্রস্তুতি নিয়ে যখন পরীক্ষাটি দিতে পারে না, তখন তাদের কাছে কি পুরো জীবনটি একটা অর্থহীন বিষয় মনে হয় না?

যদি সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয় মিলে একটি ভর্তিপরীক্ষা নিত তাহলে এই কোনোটিই কিন্তু ঘটত না। বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় মিলে যদি একটি প্রশ্নপত্র তৈরি করত তাহলে সেটি হত একটি অসাধারণ বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্নপত্র, মোটেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার প্রশ্ন নয়। সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয় মিলে যদি সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেই প্রশ্নপত্র ছাপাত, সংরক্ষণ করত, বিতরণ করত তাহলে সেটি কখনও ফাঁস হয়ে যেত না। যদি সবাই মিলে একসাথে ভর্তিপরীক্ষা নিত, তাহলে সবাই নিজের এলাকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিপরীক্ষা দিত– দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়াতে হত না। ট্রাফিক জ্যামে আটকা পড়ে দেরি করে পরীক্ষা কেন্দ্রে হাজির হয়ে পরীক্ষা দিতে না পারার ভয়ংকর দুর্ভাগ্যটি মেনে নিতে হত না।

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার এত বড় গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রক্রিয়া নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা নেই কেন আমি বুঝতে পারি না। আমি সংবাদ মাধ্যমে দেখেছি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে যিনি সাম্প্রদয়িক প্রশ্ন করেছেন তাকে কেন শাস্তি দেওয়া হবে না সেটি হাইকোর্ট জানতে চেয়েছে। চারুকলা বিভাগের এই সাম্প্রদায়িক প্রশ্ন থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ সব বিশ্ববিদ্যালয় মিলে একটি পরীক্ষা নেওয়া। আমি বহুদিন থেকে অপেক্ষা করে আছি কখন হাইকোর্ট সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে জানতে চাইবে কেন সবাই মিলে একটি ভর্তিপরীক্ষা নিয়ে এই দেশের ছেলেমেয়েদের উপর একটি চরম অমানবিক নির্যাতন বন্ধ করছে না।

ছয়-সাত বছর আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একবার একটা সমন্বিত ভর্তিপরীক্ষা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে তখন আমাকে অনুরোধ করা হয়েছিল দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরদের সামনে সমন্বিত ভর্তিপরীক্ষা কীভাবে নেওয়া যায় তার উপর একটা বক্তব্য দিতে। আমি গাধা টাইপের মানুষ, তাই সরল বিশ্বাসে ভাইস চ্যান্সেলরদের সামনে বক্তব্য রেখেছিলাম। সকল ভাইস চ্যান্সেলরদের সেই সম্মিলিত প্রতিক্রিয়টির কথা আমি কোনোদিন ভুলব না। সোজা ভাষায় বলে দেওয়া যায়, আমি সেদিনই বুঝেছিলাম এই দেশের অসহায় ছেলেমেয়েদের জন্যে কারও মনে বিন্দুমাত্র মায়া নেই। তাদেরকে পীড়ন করে কোনোভাবে কিছু বাড়তি টাকা আয় করা ছাড়া আর কারও মনে অন্য কোনো ইচ্ছা নেই।

সমন্বিত ভর্তিপরীক্ষার বিষয়টি অবশ্যি এর থেকেও জটিল। যেহেতু কেউ সমন্বিত ভর্তিপরীক্ষায় রাজি হতে চাইছে না, তাই তখন যশোর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরের আগ্রহে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় এবং যশোর বিশ্ববিদ্যালয় মিলে একটা সমন্বিত ভর্তিপরীক্ষা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। শুনে অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি, কমিউনিস্ট পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি, গণতন্ত্রী পার্টি এ রকম বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো মিলে সেই পরীক্ষাটি বন্ধ করার আয়োজন করেছিল।

রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের একশ বছর পূর্তি উপলক্ষে যখন বামপন্থী দলগুলো সারাদেশে সভা-সমিতি করছে তখন তাদের আমার খুবই জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয়, একেবারে নিজের ঘরে ছেলেমেয়েদের সাহায্য করার এই বিপ্লবটিকে তারা কেন গলা টিপে হত্যা করেছিলেন?

একবার বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন থেকে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদের ডাকা হয়েছিল সমন্বিত ভর্তিপরীক্ষা নিয়ে আলোচনা করার জন্যে। সেই আলোচনায় সবাই এক বাাক্যে স্বীকার করেছিলেন যে, সমন্বিত ভর্তিপরীক্ষা ছাড়া উপায় নেই। সেই বক্তব্য শুনে আমি খুবই আশাবাদী হয়েছিলাম। কিন্তু দেখা গেল যে, তারপর আর কিছুই হয়নি।

আমি একেবারে সত্যিকারভাবে আশাবাদী হয়েছিলাম যখন আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতি এবং চ্যান্সেলর সকল ভাইস চ্যান্সেলরদের একটি সভায় সম্মিলিতভাবে সমন্বিত ভর্তিপরীক্ষা নিয়ে দেশের ছেলেমেয়েদের কষ্ট লাঘব করার অনুরোধ করেছিলেন। আমি যেটুকু জানি, মহামান্য রাষ্ট্রপতির অনুরোধ দেশের আইনের মতো, সবাইকে এটি মানতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিশ্চয়ই দেশের আইনের উর্ধে। তারা রাষ্ট্রপতির অনুরোধ রক্ষা করেনি!

আমার খুবই আশাভঙ্গ হয়েছে যখন এই বছর দেখতে পেয়েছি, আবার প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয় আগের মতো আলাদা আলাদা ভর্তিপরীক্ষা নিতে শুরু করেছে।

কয়েকদিন আগে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে আমার থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। সেই সভায় বক্তব্য রাখার সময় আমি ধান ভানতে শিবের গীত গেয়ে এসেছি। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে অনুরোধ করে এসেছি যে, মহামান্য রাষ্ট্রপতির অনুরোধটি রক্ষা করে তারা যেন সমন্বিত ভর্তিপরীক্ষার একটি উদ্যোগ নেন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান তাঁর বক্তব্য দেওয়ার সময় আমাদেরকে জানালেন, প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছে। আমরা জানতে পেরেছি যে, এটি ক্রমান্বয়ে কার্যকরী করা হবে।

 

University Admission Test - 111
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে রাজি করাতে হবে জোর করে, এছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই

 

আমি ন্যাড়া এবং আমি বহুবার বেলতলা গিয়েছি। কাজেই আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, সমন্বিত ভর্তিপরীক্ষা ‘ক্রমান্বয়ে’ কার্যকরী করার বিষয় নয়, এটি ‘একবারে’ সবাইকে নিয়ে কার্যকর করতে হবে। যদি সেটি না করা হয় এবং কিছু কিছু প্রতাপশালী বিশ্ববিদ্যালয় এই প্রক্রিয়া থেকে বাইরে থেকে যায়, তাহলে তাদেরকে উদাহরণ দেখিয়ে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও এই প্রক্রিয়া থেকে দূরে সরে যাবে। আলাদা আলাদা ভর্তিপরীক্ষার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র বাড়তি কিছু টাকা উপার্জন। কাজেই হঠাৎ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষক নির্লোভ সাধুসন্ত হয়ে সমন্বিত ভর্তিপরীক্ষার জন্যে ঝাঁপিয়ে পড়বেন সেটা মনে করার কোনো কারণ নেই। কাজেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে রাজি করাতে হবে জোর করে। এছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই।

আরও একটি বিষয় নিয়ে মাঝে মাঝে আলোচনা হয় যেটি দেখে আমি বুঝতে পারি যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিপরীক্ষার প্রক্রিয়াটি অনেকেই এখনও বুঝে উঠতে পারেননি। সেই কথাটি হচ্ছে, ‘গুচ্ছ পদ্ধতি’। অর্থাৎ, এক ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় মিলে একটি গুচ্ছ তৈরি করা হবে এবং তারা মিলে একটি ভর্তিপরীক্ষা নেবে।

যে বিষয়টা অনেকেই বুঝতে পারেন না সেটি হচ্ছে ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রছাত্রীদের ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পরীক্ষা নেয় না কিংবা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও ছাত্রছাত্রীদের কৃষি বিষয়ে পরীক্ষা নেয় না। ছাত্রছাত্রীরা এখনও ইঞ্জিনিয়ার বা কৃষিবিদ হয়নি, তারা মাত্র এইচএসসি পাশ করা ছাত্রছাত্রী। বাংলা, ইংরেজি, গণিত, রসায়ন, পদার্থ বিজ্ঞান এই সব বিষয় পড়ে আসা শিক্ষার্থী। কাজেই তাদেরকে যাচাই করার জন্যে আসলে তারা যে সব বিষয় পড়ে এসেছে– বাংলা ইংরেজি, গণিত, রসায়ন, পদার্থ বিজ্ঞান– এই সব বিষয়েই পরীক্ষা নিতে হবে। গুচ্ছ তৈরি করে সেই গুচ্ছের জন্যে আলাদা পরীক্ষা নিতে হবে সেটা কে বলেছে? সবাই মিলে একই পরীক্ষায় একই বিষয়ে পরীক্ষা দেবে। কোনো বিশ্ববিদ্যালয় যদি বিশেষ কোনো বিষয়ে বেশি জোর দিতে চায় সেটি তারা করতেই পারে, তার জন্যে আলাদাভাবে পরীক্ষা নিতে হবে না।

সমন্বিত ভর্তিপরীক্ষার একটা অনেক বড় ইতিবাচক দিক আছে যেটা অনেকেই জানে না। এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়ার সাথে সাথে যদি সব বিশ্ববিদ্যালয় মিলে একটা সমন্বিত ভর্তিপরীক্ষা নিয়ে নেয়, তাহলে ছাত্রছাত্রীদের উপর ‘বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং’ নামে যে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ধরনের নির্যাতন হয় সেটি চিরদিনের জন্যে বন্ধ হয়ে যাবে। শুধু তাই নয়, ছাত্রছাত্রীরাও প্রথমবার খানিকটা সময় পাবে নিজেদের জীবন উপভোগ করার জন্যে। মা-বাবার অনেক টাকা বেঁচে যাবে তাদের ছেলেমেয়েদের আর ভর্তি কোচিং করাতে হবে না বলে।

আমি আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি দেখার জন্য কী হয়। ভর্তিপরীক্ষার চলমান এই নির্যাতন শেষ হওয়ার পর সত্যিই সমন্বিত ভর্তিপরীক্ষা নেওয়ার উদ্যোগ যদি নেওয়া হয় আমি তাহলে আশায় বুক বাঁধার জন্য প্রস্তুত হব।

যদি কিছুই না হয় তাহলে আবার শুরু করব ভাঙা রেকর্ডটি বাজিয়ে যাওয়ার জন্য।

মুহম্মদ জাফর ইকবাললেখক ও অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

১৪ Responses -- “বাজাই আমার ভাঙা রেকর্ড”

  1. খান

    নিজের স্বল্প অভিজ্ঞতা থেকে উপরে স্যারের মতামতের সাথে অনেকটা একমত। তবে কিছু ভিন্নমত-
    ক) এক সাথে এক দিনে সব পরীক্ষা নেয়াটা ঝুকিপূর্ণ। ধরি, ১লা মে সব ভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষা। হুট করে সেই সময় ছাত্র বা ছাত্রীটির অসুস্থ হয়ে পরলো এবং পরীক্ষা দিতে পারলো না কিংবা কোন কারণে নিজের মানের পরীক্ষা দিতে পারলো না, তাহলে কি সে ভার্সিটিতে ভর্তি হতে পারবে না ? কাজেই, শুধু একটি রাতের উপরে তাঁর সারাজীবনের সাধনা নির্ভর করাটা ঝুঁকির ব্যাপার। সমাধানে আমরা যা করতে পারি- ৪২ টা ভার্সিটিকে ৩ বা ৪ টা গ্রুপে ভাগ করে পরীক্ষা নিতে পারি। ৩ বা ৪ টা উইকএন্ডে ধাপে ধাপে পরীক্ষা হবে। মেডিক্যাল পরীক্ষার মত ছাত্র-ছাত্রীরা নিজের এলাকার কাছাকাছি থেকেই/ নিজের জেলা বা বিভাগ থেকেই পরীক্ষা দিতে পারবেন। পুরো দেশে দৌড়াদৌড়ি করতে হবে না। আর ৩-৪ বার সুযোগ থাকায় কোন একটা পরীক্ষা মিস করলে বাকীগুলো দিতে পারবে।

    Reply
    • Pobitro

      তাহলে পাবলিক পরীক্ষার ক্ষেত্রে কী হবে? তখন তো একই সাথে সারা দেশে একেকটি পরীক্ষা হয়। সব বোর্ডকে আলাদা আলাদা গ্রুপ করে আলাদা আলাদা সময়ে পরীক্ষা নেওয়াটা তখন কি যুক্তিযুক্ত মনে করবেন?

      Reply
  2. Muhammad Nazmul

    Thanks for writing this article regarding combined admission test in Public universities. I am living abroad and writing in English.
    I would like to draw attention of all concerned to the following. Few combined admission tests can be taken as follows:

    (1) Because of their image/glorious history/Authority’s objection, Let University of Dhaka and BUET take their admission test seperately (until they change their mind for combined admission test),

    (2) Combined admission test can be arranged for all Engineering colleges/universities (other than BUET),

    (3) Combined admission test can be arranged for all Agriculture universities/colleges,

    (4) Combined admission test can be arranged for all other public universities OR all other public universities can be listed/divided in to 2 groups and Combined admission test can be arranged for each group seperately.

    (5) Issue of question paper leak must be considered as serious issue for Bangladesh and Must be stopped immediately. We must think about the quality of our future generations and image of our country. Quoting from the comments of Mr Maksudur Rahman:

    “সমন্নিত ভর্তি পরীক্ষায়ই বরং স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত রাখা সম্ভব যদি আন্তরিকভাবে চেষ্টা করা হয়, কারণ এইটা একদিনের মামলা। ঠিকভাবে করা গেলে দারণ, প্রশ্ন ফাঁস হলে সেই বছর দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু-গাধার সাথে অল্প কিছু মেধাবীদের বাধ্য হয়ে ভর্তি হতে হবে”

    It seems that we should not put all eggs in one basket. Let us be flexible and couple of combined admission tests can be arranged for all public universities.

    Allah Hafez.

    Reply
  3. সুরুজ বাঙালি

    বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা:
    ১) এসএসসি আর এইচএসসি তে জিপিএ-৫ এর বিস্ফোরণ প্রতিবছর।
    ২) সকল পাবলিক আর ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস।
    ৩) পঞ্চম শ্রেণীর কচি বাচ্চাদের পাবলিক পরীক্ষার ভয়ে জর্জরিত করা।
    ৪) মানহীন প্রাইভেট মেডিকেল- বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায়িক প্রসার আর সরকারের এগুলাকে অনুমোদন করা।
    ৫) পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে মেধার পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রাধান্য দেয়া।
    ৬) বিশ্ববিদ্যালয় গুলো নোংরা সংস্কৃতির ছাত্র রাজনীতির আখড়া।
    ৭) বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শিক্ষা দানের চাইতে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব করে পদোন্নতি কিংবা রোজগার করা ।
    ৮) সর্বোপরি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা চাকরিদাতা তৈরী করতে পারে না তৈরী করে চাকরিপ্রার্থী। অর্থাৎ উল্লেখযোগ্য হারে উদ্যোক্তা বা Entrepreneur তৈরিতে ব্যর্থ এদেশের শিক্ষাব্যবস্থা।

    Reply
  4. জান্নাতুন

    প্রশ্ন কঠিন হলে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা কীভাবে উত্তর দিবে সেই চিন্তা করেন আবার সহজ করলে গাউডবই থেকে টুকলিফাই হয়েছে দাবি করেন। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা সমন্বিত নিয়ে ২০১৫ সালের প্রশ্ন ফাঁস বিপর্যয় ঠেকাতে পেরেছিলেন কি স্যার? সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি চালু করে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল কত পার্সেন্ট পারলেন কখনো সরেজমিনে পরীক্ষা করে দেখেছিলেন স্যার? পাতার পর পাতা খাতায় উদ্দীপক লিখে লিখে স্টুডেন্টরা পাস করছে অল্প অল্প গ্রেড পয়েন্ট নিয়ে আর এই প্রবনতার জন্য পুরা দায়ভার শিক্ষকদের দিয়ে দেন সবাই ঢালাওভাবে! কখনও দেখেছেন প্রতিটা অঞ্চলে কী প্রবনতা বিরাজ করে স্টুডেন্ট টিচারদের পড়াশুনার ক্ষেত্রে। যে ক্ষেতে যে সার বেশি লাগে সেটা নির্নয় না করে সব ক্ষেতে ইউরিয়া সার প্রয়োগ করাই মনে আপনাদের পলিসি। এর কুফল হিসেবে আপনার নির্ধারিত সময় অন্তর অন্তর ভাঙা রেকর্ড বাজানোর কিছু উপলক্ষ্য তৈরি হয়। আপনার ছোটবেলাকার ভক্ত হয়েই বলছি স্যার,, ইদানীং আপনার কিছু আবেগী লেখা খুব হতাশ করে, আপনার ভক্তদেরও হতাশ করে।

    Reply
  5. হাসান

    এই বক্তব্যের কিছু যুক্তি খন্ডন করার চেষ্টা করলাম।
    ১। ভর্তি পরীক্ষা একটা ব্যয়বহুল আয়োজন, শিক্ষকেরা শুধু টাকা কামাইয়ের জন্য এটা আয়োজন করেন না।
    ২। সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা দিতে একজন ছাত্রকে এক রাতে সব বিষয়ের প্রস্তুতি নিয়ে আসতে হবে, যা অগ্রহণযোগ্য।
    ৩। একজন ভালো ছাত্র একবার পরীক্ষা খারাপ দিতেই পারে, সমন্বিত পরীক্ষা তাকে ভুল সংশোধনের সুযোগ দেবে না।
    ৪। পরীক্ষা স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় নিজের ক্যাম্পাসে পরীক্ষা আয়োজন করে, সেজন্য ভিন্ন ভিন্ন দিনে পরীক্ষা নিতে হয়, তাদের এই প্রচেষ্টাকে এই দেশে অযৌক্তিক বলার কোন সুযোগ নেই।

    Reply
    • Prof. Dr. Muhammad Abdul Goffar Khan

      1. I agree Mr. Hasan’s point 1. Last year I received BDT 16000 as admission test remuneration, which I do not consider a big amount, compared to the work load of admission test. Specially senior teachers are compelled to remain engaged for an average of 12 hours a day, for about 5 days continuously during the question printing, packeting and answer script examination, tabulation etc.(which is a panic for me). I will be happy enough if I am allowed not to be a part of such tedious job.
      2. I strongly agree the point of sufferings of the students as well as their parents/guardians (along with the money spent/spoiled) during admission test as mentioned in the main article by Prof. J Iqbal sir. We must find a solution to the problem, acceptable to both sides, the students as well as the universities.
      (Sorry for not being able to type in Bangla)

      Reply
      • খান

        আপনার কী ধারণা আছে, মধ্যবিত্ত আর নিন্মবিত্ত ছেলে-মেয়েদের জন্য হাজার হাজার টাকার ফর্ম কেনা আর পরীক্ষার জন্য পুরো বাংলাদেশে ঘুরা- হোটেলে থাকা সব মিলিয়ে কত টাকা যায় ? আর কী পরিমান দুর্গতি হয় আমাদের ?
        আপনাদের শিক্ষকদের কী এইগুলি চোখে পরে না নাকি নিজেদের নীল রক্তের অধিকারী ভাবেন ?

    • Maksudur Rahman

      মেডিক্যাল কলেজগুলোতে সমন্নিত ভর্তি পরীক্ষা বাস্তবায়ন করা গেছে কারণ- (১) ডাক্তারদের অনেক ইনকাম আছে, ভর্তি পরীক্ষা থেকে তাদের আয় না করলেও চলে, কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বছরে সবচেয়ে বড় ইনকাম করার উৎসব হলো ভর্তি পরীক্ষা থেকে (২) মেডিক্যাল কলেজগুলোর পাঠদান প্রক্রিয়া সমমানের, তাই ভর্তি পরীক্ষায় ভাল নম্বর পেলে ইচ্ছে মত মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হওয়া যায়, খারপ নম্বর পেলে ইচ্ছার বাইরে কোন মেডিক্যালে ভর্তি হতে হয়। এই পদ্ধতি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সম্ভব নয়, কারণ তাদের পাঠদান এবং গুনগত মান সমান নয়

      সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা দিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যারয়ের ক, খ, গ, ঘ ইউনিটের মতই সব বিষয়ই পড়েই পরীক্ষা দিতে হয়, সেটা যদি সব বিষয় পড়ে দেওয়া যায় সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষাও দেওয়া যাবে।

      ভর্তি পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল করলে সুযোগ হবে কি হবে না তা বোঝা যাবে পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে। পাবনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ন্যুনতম নম্বর আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ন্যুনতম নম্বর সমন্নিত ভর্তি পরীক্ষায় এক না হওয়ারই কথা।

      সমন্নিত ভর্তি পরীক্ষায়ই বরং স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত রাখা সম্ভব যদি আন্তরিকভাবে চেষ্টা করা হয়, কারণ এইটা একদিনের মামলা। ঠিকভাবে করা গেলে দারণ, প্রশ্ন ফাঁস হলে সেই বছর দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু-গাধার সাথে অল্প কিছু মেধাবীদের বাধ্য হয়ে ভর্তি হতে হবে

      Reply
  6. আবু আমীন

    আমরা আধুনিক অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য ধর্মকে রাজনীতি থেকে আলাদা রাখার দাবি করি, কিন্তু শিক্ষাকে এবং পরীক্ষার ফল প্রকাশকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার কথা একবারও বলি না। বেশি পাস করানোর উপযোগিতা একটাই, তা রাজনৈতিক। বেশি পাসের আনন্দ সরকার জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে। ছাত্রছাত্রী কী পড়াশোনা করল এবং কী পরীক্ষা দিল সেটা বড় কথা নয়, পাস করিয়ে দেওয়া হলো কি না, সেটাই প্রধান। হয়তো শিগগিরই ফেল বলে কোনো শব্দ বাংলাদেশের অভিধানে থাকবে না।আশ্রয়হীনকে আশ্রয় দেওয়া ভালো, ক্ষুধার্তকে খেতে দেওয়া আরও ভালো, দীনের প্রতি দয়া করা খুব ভালো, অক্ষম-অসুস্থ ব্যক্তির চিকিৎসার ব্যবস্থা করা অবশ্যই ভালো। করুণা জিনিসটি জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বড় গুণ হিসেবেই গণ্য। কিন্তু কোনো শিক্ষার্থীকে প্রাপ্যের বেশি নম্বর দেওয়া মহৎ গুণ তো নয়ই, খুব বড় অন্যায়। এবং যে ছাত্রছাত্রী ন্যূনতম যোগ্যতা অর্জন করেনি, তাকে যোগ্যতরের সনদ দেওয়া ঘোরতর অন্যায়।
    পাস জিনিসটি কী এবং ফেল মানুষ কেন করে, তা সম্পর্কে সব দেশের সব যুগের মানুষের ধারণা নেই। পৃথিবীর ইতিহাসে বহু সফল ব্যক্তি পরীক্ষায় ভালো করেননি এবং কোনো না কোনো সময় ফেল পর্যন্ত করেছেন। তাতে তাঁদের কী হয়েছে? কিন্তু মনে রাখতে হবে, তাঁরা ফেলটা করেছেন অতি উঁচু মানসম্মত শিক্ষাপদ্ধতির শিক্ষার্থী হিসেবে। মানহীন শিক্ষাব্যবস্থায় পাসই কী আর ফেলই কী? থার্ড ডিভিশনই কী আর গোল্ডেন জিপিএ ফাইভ কী?
    যুগের প্রয়োজনে শিক্ষা কার্যক্রমে ও পাঠ্যসূচিতে পরিবর্তন আনতে হয়। ৫০-৬০ বছর আগে বাণিজ্য অনুষদের কোনো বিষয়ে স্নাতক মাস্টার্স করলেই কাজ চলে যেত। এখন বিবিএ, এমবিএ ছাড়া চলে না। ড. মুহম্মদ কুদরাত-ই-খুদার সময় কম্পিউটার ছিল না বলে কম্পিউটার সায়েন্স পড়ার ব্যবস্থাই ছিল না। সময়ের প্রয়োজনে নতুন বিষয় পঠিত হবে। কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থায় অর্থহীন ও খামখেয়ালি পরিবর্তন আনা চরম আত্মঘাতী।
    শিশুদের কাছে পরীক্ষা একটি আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শ্রেণিকক্ষে সাপ্তাহিক পরীক্ষাই ওদের কাছে বিরক্তির মতো মনে হয়। তার মধ্যে দেশসুদ্ধ ঘটা করে এক দিনে সব ছাত্রছাত্রীর পরীক্ষার জন্য অবতীর্ণ হওয়া অশেষ যন্ত্রণা ছাড়া কিছু নয়। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা ও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীকে শারীরিক নির্যাতনের চেয়ে কম কষ্টকর নয়। এই পদ্ধতির যাঁরা উদ্ভাবক, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার তাঁরা কী উপকার করেছেন, তা উপলব্ধি করার সাধ্য আমাদের মতো মানুষের নেই। এতে যন্ত্রণা শুধু শিক্ষার্থীর নয়, তাদের অভিভাবকদেরই বেশি। এ ব্যবস্থায় দুগ্ধপোষ্য শিশুদের মাথায় যে শুধু হাতুড়ি পেটানো হচ্ছে তা-ই নয়, রাষ্ট্রের বিপুল অর্থের হচ্ছে অপচয়।
    প্রকৃত শিক্ষার সঙ্গে বই-উৎসব, খাতা-উৎসব, পরীক্ষা-পার্বণ প্রভৃতির কোনো সম্পর্ক নেই। খাদ্য মানেই পুষ্টিকর সুখাদ্য, শিক্ষাও তাই, মানসম্মত সুশিক্ষা। নিম্নমানের শিক্ষায় ড. খুদার মতো বিজ্ঞানী হবে না, আখতার হামিদ খানের মতো প্রশাসক হবে না, ডাক্তার ইব্রাহিমের মতো চিকিৎসক হবে না, বরং মোটামুটি ভালো প্রকৌশলী, স্থপতি, কৃষিবিদ—টেকসই উন্নয়নের জন্য যাঁদের খুবই প্রয়োজন—তাও হবে না। এমনকি যে কাজে সবচেয়ে কম বিদ্যা লাগে, সেই পাঠযোগ্য কলামের লেখকও পাওয়া দুষ্কর হবে। আর কোনো কিছুই না হোক, চিন্তাশীল মানুষ এবং মানবিক গুণসম্পন্ন চরিত্রবান মানুষও যে হবে না, তাতে সন্দেহ কী? উন্নত শিল্প-সংস্কৃতিও হবে না। এই শিক্ষা থেকেই একুশের বইমেলায় কবি তাঁর ১৮তম কাব্যগ্রন্থে লেখেন, ‘আকাশে ঘাসের নদী ঘেউ ঘেউ করে’। এর অর্থ কী জানতে চাইলে সম্ভাব্য জবাব: আকাশ কী, ঘাস কী, নদী কী, ঘেউ ঘেউ করা সারমেয় কী, তাদের সঙ্গে কী সম্পর্ক, তা বুঝে নাও হে বাংলার বে-আক্কেল মানুষ।

    Reply
  7. আমরা মুক্তমনা

    আচ্ছা সৃজনশীল পদ্ধতির আগমন যেন কি কারনে হয়েছিল? প্রশ্ন আউট কমাতে, কোচিং ব্যবসা কমাতে, শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল মেধা বৃদ্ধি করতে!!??
    এর কিচ্ছুই হয়নি। কোচিং ব্যবসা বেড়েছে ২ গুন, প্রশ্ন ফাস বেড়েছে। উপকার কম ই হিয়েছে।
    এখন আবার নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি বের হয়েছে! যদিও শুনা যাচ্ছে এটা এবার হবে না কিন্তু কার উপর বিশ্বাস করব? এই পদ্ধতি অনুসারে মোট নম্বর গড় করে তা বর্গমূল করার মাধ্যমে প্রত্যেক বোর্ড এর রেজাল্ট সমতায় আনা হবে।
    এ+ নির্ধারণ করবে বোর্ড! + কমিয়ে পাশের হার বাড়ানো হবে! তবে কি শিক্ষা ব্যবস্থার মান বৃদ্ধি পাবে?
    তবে হ্যা, এই পদ্ধতির সুবিধাতো অবশ্যই রয়েছে। তবে নির্দিষ্ট গোষ্ঠির সুবিধা দিয়ে আমি কি করব? আমি যে বঙ্কিমচন্দ্রের সেই বিড়াল! ধনীর ধন বৃদ্ধি দিয়ে আমি কি করব? তাতে কি আমার ক্ষুধা মিটবে? আমার চাহিদা কি পূরণ হবে?
    ধরেন আপনার ৬ টা বিষয়ের পরীক্ষা খুব ভালো হলো। দূর্ঘটনা বশত ১ টা বিষয় খারাপ হয়ে গেল এবং নতুন পদ্ধতি অনুযায়ী আপনার এ+ ছুটে গেল, রেজাল্ট টা ৪.০০ এর নিচে নেমে এল! মেনে নিতে পারবেন?? ঠিক রাখতে পারবেন নিজেকে?
    জানি এসব বলে কিছু লাভ নেই। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখন অনেক উন্নত। তাদের নেওয়া সিদ্ধান্ত ই শ্রেষ্ঠ। তারাই সব। তারাই বাপ, তারাই দাদা, তারাই চোর, তারাই ডাকাত, তারাই শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ….

    Reply
  8. মাহবুবুল মান্নান

    আমি তখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি। সবে মাত্র সৃজনশীলের নামগন্ধ পেতে শুরু করেছি। জ্ঞানমূলক, অনুধাবন, প্রয়োগ, উচ্চতর দক্ষতা এসব ঠিকমতো বুঝতাম না। প্রশ্নের নম্বর দেখে ভাবতাম সম্ভবত উত্তর এই কয়েকয়েক লাইনের মধ্যে দিতে হবে। পরবর্তীতে বুঝলাম যে খাতা ভরিয়ে না লিখে খুব একটা লাভ নেই। উপরের ক্লাসে ওঠার পর থেকে প্রশ্নের মান পরিবর্তন হতে শুরু করলেও পদ্ধতির পরিবর্তন হয়নি।
    আমাদের পরের ব্যাচ গুলো বেশ পরিবর্তন দেখেছে। আমরা লিখতাম ছয়টা সৃজনশীল, তারা এখন লেখে সাতটা। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় ঠিকমতো বুঝতে পারিনি সৃজনশীলতা আসলে কি? এখনো সৃজনশীল প্রশ্ন নিয়ে আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক অনেক “কিন্তু” ঘুরে বেড়ায়। পাঠ্যবইগুলোতে প্রায় প্রতিবছরই পরিবর্তন আনা হয়, এবার রীতিমতো শোরগোল হয়েছে এটা নিয়ে। এত পরিবর্তনের কারণ কি? একটা ভালো এবং সময় উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা তৈরী করতে আমাদের এতগুলো পরীক্ষায় অংশ নিতে হচ্ছে, সৃজনশীলতার নামে গাইডবই পড়তে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। পাশের হার বাড়লেও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্নটা বরাবরের মতো থেকেই যাচ্ছে।
    শুনেছি শিক্ষাব্যবস্থায় আবার পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। ভালোমন্দের হিসাব আমার জানা নেই, কিন্তু প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থীদের একেক নিয়মের ভেতরে ফেলে দিলে ভালো কোনকিছু আশা করা যায় না। শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে অতিরিক্ত কাটাছেড়া না করে একটি ব্যবস্থা প্রণয়ন করাটাই ভালো কাজ হবে বলে মনে করি।

    Reply
  9. তারিকুল বাশার

    প্রশ্ন হচ্ছে, ২০১২ সালের জুন মাস নাগাদ ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং-বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা’ চূড়ান্ত করা হয়েছিল। কোথায় সেই নীতিমালা? এতে বলা হয়েছিল, সরকারি-বেসরকারি বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসার কোনো শিক্ষক তার নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে কোচিং করাতে বা প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না। এমনকি শিক্ষকেরা বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টারেও পড়াতে পারবেন না। তবে দিনে অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ শিক্ষার্থীকে নিজ বাসায় পড়াতে পারবেন। সরকার-নির্ধারিত টাকার বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানের ভিতরই পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত ক্লাস করানো যাবে (প্রথম আলো, ১৫ জুন ২০১২)। এই নীতিমালা না মানলে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে জড়িত শিক্ষকের বেতনের সরকারি অংশ বা এমপিও বাতিল বা স্থগিত করা হবে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি ও পাঠদানের অনুমতি বাতিল করা হবে। কই, চার বছর পেরিয়ে গেল, এর প্রয়োগ কি আমরা দেখেছি? প্রশ্ন হলো মাধ্যমিক এবং উচ্চম্যাধমিক পর্যায়ে পড়ানোর জন্য কজন মেধাবী শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন? সুযোগ-সুবিধার অভাবে মেধাবীরা এ পেশায় কম যাচ্ছেন। মনে রাখা দরকার, একটি রিকশাকে নিশান গাড়ির গতি দেওয়া যায় না। আর শিক্ষার যে মূলভিত্তি প্রাথমিক শিক্ষা, এটা আলোচনা থেকে সব সময় বাদ পড়ে যাচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন না করে আমরা মাধ্যমিক শিক্ষার কথা ভাবছি কীভাবে? একটু খোঁজ-খবর যারা রাখেন, তারা ঠিকই জানেন, এখানে কারা পড়াচ্ছেন, তাদের যোগ্যতা কী?

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—