Rohingya - 21111

মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর দপ্তরের একজন মন্ত্রী বাংলাদেশে একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে এলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করলেন এবং সোয়া এক ঘণ্টার বৈঠকশেষে কোনো বক্তব্য না-দিয়ে চলে গেলেন। বৈঠক হয়েছে যৌথ, কিন্তু বিবৃতি এসেছে একক। মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলরের বক্তব্য মিডিয়ার সামনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উপস্থাপন করলেন।

আশ্চর্যজনক বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশের অধিকাংশ মিডিয়া স্টেট কাউন্সিলের ওই মন্ত্রীর সফরটি উপস্থাপন করেছে ‘মিয়ানমার সরকারের প্রতিনিধিদল’ হিসেবে। প্রকৃতপক্ষে ইনি ছিলেন অং সান সুচির দপ্তরের মন্ত্রী– মিয়ানমারের রাষ্ট্র এবং ক্ষমতাকাঠামোয় তাঁর অবস্থান বাংলাদেশের যে কোনো স্টেট মিনিস্টার লেভেলের কারও চেয়ে বেশি হওয়ার কথা নয়। কেননা সু চি নিজে স্টেট কাউন্সিলের উপদেষ্টা এবং মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সুতরাং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন স্টেট মিনিস্টার এবং পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের লোকজন মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অফিসের মন্ত্রী টিন্ট সোয়েকে এটেন্ড করতে পারতেন। কিন্তু তাঁকে যেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তিনি যে সে লেভেলের নন, সেটা তাঁর নির্বাক প্রস্থানই প্রমাণ করে।

তাছাড়া তিনি মিয়ানমার সরকারের বার্তা নিয়ে এসেছিলেন কি না তা নিয়েও আমি সন্দিহান। কেননা তিনি সু চির দপ্তরের মন্ত্রী। যেখানে সু চির কথাই খুব একটা ধর্তব্যের মধ্যে রাখা হয় না– যেখানে পার্লামেন্টের পঁচিশ শতাংশ সিট বরাদ্দ থাকে সেনাবাহিনীর জন্য– সেখানে সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রাধীন সরকারের কোনো প্রতিনিধি বাংলাদেশে আসার কথা নয়। সেনাবাহিনী এ প্রতিনিধি পাঠালে বাংলাদেশে বৈঠক চলাকালে অক্টোবরের ২ তারিখেও মংডুতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটত না।

তাই, আমার কাছে মনে হয়েছে, সু চি এ প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন নিজের ক্রমবর্ধমান খসে-পড়া চামড়া বাঁচানোর জন্য। তার প্রমাণ পেতে চব্বিশ ঘণ্টা সময় লাগেনি।২ অক্টোবর উনার দপ্তরের মন্ত্রী ফিরে গেলেন আর ৩ অক্টোবর সকাল ৯ টা ৫৯ মিনিটেই উনার দপ্তরের অফিসিয়াল ওয়েব পেইজে বাংলাদেশ থেকে কীভাবে তারা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে চায় তার ফর্মূলা প্রকাশ করা হল।

প্রকৃতপক্ষে এ ফর্মূলা প্রকাশের ভেতর দিয়ে মিয়ানমার তার চতুর রাজনীতির বদ-চেহারা নতুন করে উন্মোচিত করেছে। তাদের অবস্থান থেকে দেখলে এটা তাদের কূটনীতি। কিন্তু আমরা কেন তাদের পাঁতা ফাঁদে আর পা দেব?

দেশটির স্টেট কাউন্সিলরের দপ্তর থেকে যে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে, সেটার দুটি দিক অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি:

এক. রাখাইনের অধিবাসীদের (residents from the Rakhine State) ফিরিয়ে নেওয়া হবে ১৯৯২ সালের যৌথ ঘোষণা এবং যাচাই-বাছাইয়ের ফর্মূলা (verification and repatriation) অনুযায়ী;

দুই. মিয়ামারের মন্ত্রী দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত (firm conviction) করেন যে, দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার মাধ্যমেই (bilaterally) এ সমস্যার সমাধান হবে; অর্থাৎ এখানে তৃতীয় কোনো পক্ষের নাক গলানোর সুযোগ নেই।

এ দুটি বিষয় যথেষ্ট মিয়ানমারের চালাকি ও চাতুর্য বোঝার জন্য। ১১ লক্ষের মধ্যে ১৪ হাজারকে ফিরিয়ে নেওয়ার ফন্দি। তারা যখন ১৯৯২ সালের সমঝোতা ফর্মূলার কথা বলে, তখন ধরে নিতে হবে তারা বাংলাদেশ এবং রোহিঙ্গাদের বড় একটা গ্যাড়াকলে ফেলে দেওয়ার নতুন ফন্দি আঁটছে। ১৯৯১ সালে মিয়ানমারে একটা বড় ধরনের সংঘাত হয় যেখানে সেনাবাহিনী নির্বিচারে রোহিঙ্গাদের খুন করে। তখন বাংলাদেশে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসে সরকারি হিসাব মতে প্রায় ২,৫০,৮৭৭ জন।

সৃষ্ট সমস্যার সমাধানকল্পে ১৯৯২ সালের এপ্রিলের ২৩ তারিখ থেকে ২৮ তারিখ পর্যন্ত দ্বিপাক্ষিক আলোচনা হয় এবং আলোচনাশেষে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ একটি যৌথ ঘোষণার মাধ্যমে ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৯২ থেকে ২৮ জুলাই ২০০৫ পর্যন্ত প্রায় ২,৩৬,৫৯৯ জন রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে সক্ষম হয়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ২০০৫ সালের মিয়ানমার আর ২০১৭ সালের মিয়ানমারের মধ্যে বিস্তর ফারাক। এরই মধ্যে সুকৌশলে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের আরও প্রান্তিক করে ফেলা হয়েছে। রোহিঙ্গারা যে নিজেদেরকে মিয়ানমারের স্থায়ী বা অস্থায়ী বাসিন্দা বলে প্রমাণ করবে তার কাগজপত্র রীতিমতো গায়েব করে ফেলা হয়েছে। ফলে, মিয়ানমার ১৯৯২ সালের ফর্মূলার কথা বললে ধরে নিতে হবে যে, তারা প্রকৃতপক্ষে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে চায় না। বিষয়টা আরও ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।

 

Rohingya - 17111

 

১৯৯২ সালের ফর্মূলা হচ্ছে, যাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্বের ভেরিফিকেশন কার্ড আছে, যারা কার্ড (Resident Card) প্রদর্শন করে প্রমাণ করতে পারবে, ঠিকানা এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট তথ্য দিতে পারবে তাদেরকেই ফিরিয়ে নেওয়া হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, ১৯৯২ সালের চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ তালিকা দিতে পারবে মাত্র, কিন্তু ভেরিফিকেশনের দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব মিয়ানমারের হাতে থাকবে। একই কারণে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে আসে প্রায় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা। কিন্তু মিয়ানমার ভেরিফিকেশন করে পেয়েছিল মাত্র দুই হাজার ৪১৫ জনকে যাদের তারা ফিরিয়ে নিতে রাজি হয়েছিল। তাহলে বোঝেন অবস্থা!

আমার দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা-বিষয়ক গবেষণার অংশ হিসেবে মিয়ানমারের ক্রমবিবর্তমান রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতির তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ করে দেখেছি যে, যদি ১৯৯২ সালের ফর্মূলা দিয়ে যাচাই-বাছাইয়ের একটা কাঠামো দাঁড় করানো হয়, তাহলে সর্বোচ্চ ১৪ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফিরে যেতে পারবে। যেমন এটা সবাই জানে যে, ১৯৮২ সালের মিয়ানমার নাগরিকত্ব আইন দিয়ে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অফিসিয়ালি কেড়ে নেওয়া হয়। তারপরই, ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সমঝোতা হয় যেখানে রোহিঙ্গাদের রাখাইনের অধিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অথচ ১৯৭৮ সালের সমঝোতা অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের সেদেশের নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ফলে, মিয়ানমার অনেক হিসাব-নিকাশ করেই ১৯৭৮ সালের ফর্মূলা না-এনে, ১৯৯২ সালের ফর্মূলা সামনে নিয়ে এসেছে।

এদিকে, ২০১৪ সালে মিয়ানমারে পুনরায় নাগরিকত্ব যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। সে প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গাদের মধ্যে যাদের অস্থায়ী অধিবাসী হিসেবে কার্ড ছিল, তাদেরকে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করার সুযোগ প্রদান করা হয়। তবে শর্ত জুড়ে দেওয়া হয় যে, তারা আদমশুমারিতে ‘বাঙালি’ বলে তালিকাভুক্ত করবে নিজেদের। তখন রোহিঙ্গা হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে চেয়েছিল মাত্র ৪ হাজার। এরা ছাড়া বাকিরা মিয়ানমারের চাওয়া অনুযায়ী লিপিবদ্ধ হয়েছিল। ফলে, তাদেরকে আর আদমশুমারিতে তালিকাভুক্ত করা হয়নি।

পরবর্তীতে, ২০১৫ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে তাদের কাছে যে অস্থায়ী অধিবাসী কার্ড ছিল সেটাও
বাতিল করে তাদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। কিন্তু সু চি ক্ষমতায় আসার পর, ২০১৫ সালের জুন মাসে পুনরায় যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে নাগরিত্ব প্রদানের প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু এবারও রোহিঙ্গাদেরকে
মাত্র ১০ হাজার রোহিঙ্গা নাগরিকত্ব প্রদান প্রক্রিয়ায় স্বীকৃতি পায়। কারণ তারা মিয়ানমারের শর্ত মেনে নাগরিকত্ব লাভের পথে অগ্রসর হয়েছিল। National Verification Cards (NVC) পায় কেবল এরাই।

ফলে, ২০১৪ সালে প্রায় ৪ হাজার রোহিঙ্গা অস্থায়ী অধিবাসী হিসেবে এবং ২০১৫ সালে প্রায় ১০ হাজার রোহিঙ্গা রাখাইনের অধিবাসী হিসেবে তালিকাভুক্ত হয় বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। কফি আনান কমিশনের রিপোর্টেও তার উল্লেখ আছে। ওই রিপোর্টের ভাষ্যানুযায়ী:

Based on the 1982 Citizenship Law, a citizenship verification process has been advanced by both the former and current governments. According to government figures, approximately 4,000 Muslims (as well as 9,000 Kamans) have been recognized as citizens or naturalized citizens– out of a population of around one million stateless Muslims in the state. Around 10,000 Muslims have also received National Verification Cards (NVC), considered a preparatory step for applying for citizenship.

[কফি আনান কমিশন রিপোর্ট, ২০১৭; পৃষ্ঠা-২৬]

সুতরাং মিয়ানমার যখন ভেরিফিকেশন বা যাচাই-বাছাই করে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলে, তারা আসলে এই ১৪ হাজারকেই ফিরিয়ে নিতে চায়। তন্মধ্যে অনেকেই কোনো রকমে জান নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার পথে অস্থায়ী অধিবাসী কার্ড হারিয়ে ফেলেছে। অনেকের কার্ড ঘরবাড়ির জ্বালানোর সময় পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। আবার অনেকে সঙ্গে করে আনতে পারেনি।

ফলে, এখানেও যাচাই-বাছাইয়ের আরেকটা ঘাপলা মিয়ানমার তৈরি করবে। তথাপি বাংলাদেশ যদি কোনো তালিকা প্রদান করে, তার সঙ্গে মিয়ানমারের তালিকার ১৪ হাজার মিলে যেতে পারে বলেই আমরা অনুমান করতে পারি। ওরা মূলত ১১ লক্ষ রোহিঙ্গার মধ্যে কেবল ১৪ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত নিয়ে একে আন্তর্জাতিক বাজারে চড়া দামে বিক্রি করবে এই বলে যে, ‘দেখ, আমরা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিচ্ছি। তোমরা মেহেরবানি করে একটু চুপ কর।’

দ্বিপাক্ষিক নয়, বহুপাক্ষিক সমঝোতা জরুরি

মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলনের দপ্তর থেকে প্রকাশিত বিবৃতি অনুযায়ী ওরা দ্বিপাক্ষিক আলোচনা এবং সবঝোতার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করতে চায়। বিবৃতিতে পরিষ্কার লেখা আছে:

The Union Minister expressed his firm conviction that issues arising between two neighbours can be resolved bilaterally.

 

Rohingya - 18111

 

অর্থাৎ, ওরা দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করছে যে, প্রতিবেশি দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা এবং সমঝোতার মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিকভাবে উদ্ভূত সমস্যার সমাধান করতে পারে। অর্থাৎ রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কোনো ধরনের হস্তক্ষেপের সুযোগ ওরা রাখতে চায় না।

কিন্তু বাংলাদেশ কীসের উপর ভিত্তি করে মিয়ানমারকে বিশ্বাস করবে? কোন ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ আস্থা রাখবে? সু চির দপ্তরের একজন মন্ত্রীকে পাঠিয়ে যে আলোচনার সূত্রপাত, তার উপর আমরা কীভাবে ভরসা করব?

সু চি নিজে মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি নিজে এসে যদি একটা যুক্তিগ্রাহ্য ও গ্রহণযোগ্য প্রস্তাব রাখতেন এবং সে প্রস্তাবে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের কোনো সুষ্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রূপরেখা থাকত তাহলে বিষয়টি বিবেচনা করা যেত। কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দপ্তরের একজন ব্যক্তির বাংলাদেশে আসার বিষয়টি কোনোভাবেই রোহিঙ্গা সমস্যার মতো জটিল ও বৃহৎ সমস্যার সমাধানের জন্য মিয়ানমারের শুভেচ্ছার প্রমাণ দেয় না।

তাই, আমরা চাই বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে জাতিসংঘকে সঙ্গে রাখবে। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় গুরুত্ব দিতে হবে যাতে মিয়ানমার কথা আর কাজের মধ্যে ফাঁকিবাজি করতে না পারে। শুধু তাই নয়, তারা যেন কেবল ১৪ হাজার নয়, ক্রমান্বয়ে ১১ লক্ষ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

এখানে বলে রাখা জরুরি যে, ২৫ আগস্টের পর থেকে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের উপর যে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ এবং নির্মম অত্যাচার চালানো হয়েছে, তাতে বিশ্বব্যাপী মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে উঠেছে। যার একটা বড় প্রেসার হচ্ছে, রোহিঙ্গাদেরকে মিয়ারমারের নাগরিকত্ব দিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। আনান কমিশনের রিপোর্টে একই সুপারিশ করা হয়েছে। জাতিসংঘে প্রদত্ত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভাষণেও রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে একই ফ্রেইমওয়ার্কে পাঁচ দফা সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়েছে।

এ রকম একটি পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক (bilateral) সমঝোতার মাধ্যমে সমাধানে যাওয়া মূলত ওদের পাতা ফাঁদে পা দেওয়ার সামিল। বরঞ্চ বাংলাদেশের এখন দায়িত্ব হচ্ছে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া আন্তর্জাতিক চাপটি যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে ১১ লক্ষ রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে দেশটিকে বাধ্য করা।

আর মিয়ানমার সেটা ঠিকই বুঝতে পারছে বলেই, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার প্রতি জোর দিচ্ছে এবং শক্ত ভাষায় প্রত্যয় ব্যক্ত করছে। ১৯৭৮ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ওদের সঙ্গে আমাদের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা এবং সমঝোতা কম হয়নি, কিন্তু কাজের কাজ কী হয়েছে? সেটা হয়নি বলেই আজ ১১ লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে বাস করছে। বিরাট সংখ্যক শরণার্থীর বোঝা বাংলাদেশকে বহন করতে হচ্ছে।

সুতরাং আর কোনো নরম কূটনীতি (soft diplomacy) নয়। একটা শক্ত অবস্থানে দাঁড়িয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে এবং দ্বিপাক্ষিক নয়, বহুপাক্ষিক আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের একটি পথ বের করতে হবে। গাড্ডায় পড়ে যাওয়ায় সেখান থেকে বেরুতে মিয়ানমার নানা ভনিতা করবে, ফাঁদ পাতবে।

বাংলাদেশের কাজ হচ্ছে সাবধান থেকে চৌকসভাবে পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা।

রাহমান নাসির উদ্দিননৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

১৬ Responses -- “মিয়ানমারের পাতা ফাঁদে বাংলাদেশ যেন পা না দেয়”

  1. E A Bari

    আমাদের দেশের মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী একজন দক্ষ কূটনীতিক। বিলম্বে হলেও তিনি মিয়ানমার ও সূচির কূটকৌশল ধরে নিয়েছেন। আজকের (10/10/17) একটি খবরে এটা জানা গেছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্ববিবেক যেখানে মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ওপর নিধনযজ্ঞের কারণে আজ সোচ্চার সেখানে বাংলাদেশ কোন্ কারণে দ্বিপাক্ষিক (bilateral) সমাধান করতে মেনে নেয়? তথাকথিত মিয়ানমারের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে তো এ কথাটিই মাননীয় মন্ত্রী আমাদেরকে বলেছিলেন। আমি লেখরের সঙ্গে ১০০ পার্সেন্ট একমত। আগের দু’টি চুক্তি আংশিক বা এমনকি পূর্ণাঙ্গভাবে পূর্ণ করেও মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন, নীপিড়ত, জাতিগত নিধন এবং গণধর্ষণের মতো পাষণ্ড কার্যকলাপ থামায় নি- বরং বাড়িয়েছে। সুতরাং ৭৮ আর ৯২ এর চুক্তি তো বাস্তবে কোনো কাজে আসে সি। এখন এরূপ আরেকটি চুক্তি করে যদি সবাইকেই তারা ফেরৎ নেয়- তথাপি ওখানে রোহিঙ্গারা কখনো নিরাপত্তাসহ বসবাস করতে পারবে না। কিছু দিন পরিই আবার নির্যাতন শুরু হবে এবং রোহিঙ্গারা পালিয়ে আসবে বাংলাদেশে জীবন রক্ষার্থে। সুতরাং জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রসমূহের পূর্ণাঙ্গ involvement ছাড়া এ সমস্যার সমাধান দ্বিপাক্ষিকভাবে করা কখনও কাম্য হতে পারে না।

    Reply
  2. hamayet uddin

    রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য বাংলাদেশকে জাতিসংঘ, ইউরোপিও ইউনিয়ন এবং ও আই সি এর সহায়তা নিতে হবে। যেহেতু সাগর তীরবর্তী জলদস্যুরা রোহিঙ্গাদের জাতিসত্তা, অস্তিত্ব ও নাগরিকত্বের সকল প্রমাণক বিনষ্ট করে ফেলেছে তাই তাদেরকে কোনো ক্রমেই বিশ্বাস করা যাবে না। ভারত এখন টের পাবে না, টের পাবে যখন ব্যাপক ধ্বংসলীলা ও হত্যাযজ্ঞের কারণে মা-বাবা হারা ১০-১২ বছরের রোহিঙ্গা কিশোরেরা ৫/৭ বছর পর বড় হয়ে প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধ পরায়ণ হবে আর চীন ও রাশিয় এই সুযোগে ভারতের সেভেন সিস্টারকে অশান্ত করের জন্য ১০ ট্রাক ভারী অস্র চালান এর মত অস্র পাঠিয়ে বঙ্গপসাগর তীরবর্তী দেশগুলিকে অশান্ত করে তুলবে।

    Reply
  3. No Name

    NO ONE WILL OBEY YOU UNLESS THEY FEAR YOU !

    Sad to say, no other country fears a bit about Bangladesh, they disrespect us, offend us and pretend care about us.

    I can see where its going with ” Tulu Tulu ” attitude, nothing will be resolved this way, these people will stay, I think we should welcome people deported from Western Countries and all Middle East, African refugees to our country !! Why ? Because we are good people, aren’t we ??

    Being too Humane can sometimes make the GUESTS KILL THE HOST.

    Reply
  4. ABDUL WASEQ

    লেখককে ধন্যবাদ,এ বিষয়ে শ্রেষ্ঠতম বিশ্লেষণের জন্য। বিষয়টায় রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও মানবাধিকারের মহা বিপর্যয় এত জটিলভাবে জড়িয়ে গেছে যে এর সমাধান কঠিন। তবে সরকারের সকল রাজনৈতিক দল নিয়ে জাতীয় ঐক্য গঠন প্রয়োজন। যেহেতু দেশটি সকলের।

    Reply
    • E A Bari

      ‘জাতীয় ঐক্য গঠন’ মানে কী? এরূপ জাতীয় ইস্যুতে তো এমনিতেই জাতীয় ঐক্য আছে বা থাকা উচিত! নিছক রাজনীতিক স্বার্থেই ‘জাতীয় ঐক্য’ জাতীয় ঐক্য বলে চিল্লচিল্লি হচ্ছে! দেশের এই সঙ্কটমুহূর্তে এবস কথা না বলে আসুন সবাই মিলে সমস্যার মুকাবিলা করি। বৃহত্তর স্বার্থে আমরা যে এক হতে পারি তা বিশ্বের মানুষ দেখুক।

      Reply
  5. Abdur Rouf Chowdhury

    Suu Kyi has much been criticised by world’s renowned persons on Rohingya issue.She ‘…is a Burmese military prisoner’.Military leaders won’t let her go anywhere outside Myanmar, nor will she feel easy to show her face where her awards are being withdrawn.Therefore, to expect any Rohingya solution from her will be a cry in the wilderness.Thank you Mr Nasir for your well-written article.

    Reply
  6. zulhash uddin

    বিষয়টি কলামে আনাতে অনেকেই জানতে পারলাম সেজন্যে আপনাকে ধন্যবাদ ! এর পক্ষে গবেষনার কাগজপত্রসহ আপনার আর্টিকেলটি সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের সরবরাহ করলে দেশের কাজে লাগতে পারে ।

    Reply
  7. Asad

    Brother whatever we discuss there is no result at all. If until the government not understand the real fact of Myanmar conspiracy. Simultaneously Myanmar clearly understand about of our government policy that the Bangladesh present government so polite mother of sympathy, Father of humanity so now that they have got 1 million rohynga child complete the family. Now Bangladesh government happy to being compete family.

    Reply
  8. Md. Sheikh Sadi

    “মিয়ানমারের পাতা ফাঁদে বাংলাদেশ যেন পা না দেয়”

    যতক্ষন ভারত মিয়ানমারের সাথে ব্যবসায় করার সুযোগ বজায় রাখবে এবং মিয়ানমারের গ্যাস পেতে চীনকে পেছনে ফেলে না দেবে, ততক্ষন বাংলাদেশের কিচ্ছু করার ক্ষমতা নেই। ভারতের মিয়ানমারকে সমর্থনের আগে এবং সমর্থনের পরের বাংলাদেশের বক্তৃতার ভাষ্যই বদলে গেছে।

    Reply
  9. Musa Palash

    Nice diplomatic,pragmatic and unsighted writing from the columnist.There is no reason to believe such a heinous, brutal,barbarous nation like Burma.Bangladesh government should be very careful to handle this miserable crisis.There must be involvements of the UN,China,India,Thailand,Malaysia,Indonesia and human rights organisations for theppermanent solution of this utmost prolonged stalemate.

    Reply
  10. Hasan Mahmud

    ধন্যবাদ লেখককে এ বিষয়ে অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিশ্লেষণের জন্য। বিষয়টায় রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও মানবাধিকারের মহা বিপর্যয় এত জটিলভাবে জড়িয়ে গেছে যে এর সমাধান কঠিন। তবে দেশটায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সামরিক শাসনের উচ্ছেদ হওয়া দরকার।

    Reply
  11. সৈয়দ আলী

    যতক্ষন ভারত মিয়ানমারের সাথে ব্যবসায় করার সুযোগ বজায় রাখবে এবং মিয়ানমারের গ্যাস পেতে চীনকে পেছনে ফেলে না দেবে, ততক্ষন বাংলাদেশের কিচ্ছু করার ক্ষমতা নেই। ভারতের মিয়ানমারকে সমর্থনের আগে এবং সমর্থনের পরের বাংলাদেশের বক্তৃতার ভাষ্যই বদলে গেছে। এখন প্রতারণামূলক অর্থহীন কথাবার্তা বলা শুরু হয়ে গেছে (ষোলকোটি মানুষককে খাওয়াতে পারলে আট লাখ রোহিঙ্গাকেও খাওয়াতে পারবো ইত্যাদি)।

    Reply
  12. Atowar Rahman

    লেখক কে ধন্যবাদ সুন্দর লেখার জন্য। এ বিষয়ে আমার মত হলো:
    ক। সরকারের সকল রাজনৈতিক দল নিয়ে জাতীয় ঐক্য গঠন প্রয়োজন। যেহেতু দেশটি সকলের। আজ তারা ক্ষমতায় আছে কাল অন্য দল ক্ষমতায় আসতে পারে।
    খ। কুটনীতি তৎপরতায় সরকারী দলের সদস্য ছাড়াও বড় দলের সদস্যদের নিয়ে টীম গঠন করে চীন ও রাশিয়ায় যেতে হবে তাদের বোঝানোর জন্য। যাতে, এ সরকারের পতন হলে নতুন সরকার যাতে বিষয়টি মোকাবেলা করতে পারে।
    গ। সরকার ভাল কাজ করেছি এবং তাদের আরো ভাল করতে হবে। হিংসা, বিভেদ ভ’লে যেতে হবে। রহিঙ্গা বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর ৬ দফার মধ্যে ১নম্বরে তাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করতে হবে। ২। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ৩। তাদের মৌলিক বিষয়গুলো যেমন- অন্ন, বস্ত্র, জমি ও বাসস্থান ফিরিয়ে দিতে হবে। ৪। নাগরিক হিসেবে সকল সুবিধা দিতে হবে।

    মো: আতোয়ার রহমান খান

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—