PM - 3

প্রধানমন্ত্রী আমেরিকাপ্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি এমনধারা কথা প্রায়ই বলে থাকেন। তবু মাঝে মাঝে মনে হয়, এটা তো আগে ভাবিনি। মিডিয়ার কল্যাণে আমরা জানি, প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগদানের সময় এবারও দ্বিধাবিভক্ত বাংলাদেশিরা দেশের মান-মর্যাদার কথা ভাবেননি। অন্য কোনো দেশের মানুষের মধ্যে এই প্রবণতা দেখা যায় না। বিশেষত দেশ বা সমাজ যখন সংকটাপন্ন কোনো পরিস্থিতিতে পড়ে, তখন সামান্য রাজনৈতিক মতবিরোধের জন্য তারা রাস্তায় নেমে বা বিদেশিদের হাসিয়ে প্রতিবাদের নামে দেশকে ছোট করে না।

ভিডিওতে দেখলাম, জাতিসংঘ অফিসের সামনে দুদল বাংলাদেশির মধ্যে মারামারি চলছে। সমানে ইট-পাটকেল ছুঁড়ছিল তারা। আর আমেরিকান পুলিশ একবার এদিকে আরেকবার ওদিকে দৌড়াদৌড়ি করছিল। তাদের এই গলদঘর্ম চেহারা আর বয়ে নিয়ে যাওয়া অভিজ্ঞতা কাদের ছোট করল আসলে? কী কারণ ছিল বিএনপির এমন করার?

তাদের নেতারা তো দেশেই যা বলার বলছেন। প্রায় প্রতিদিন রিজভি কৌতুক করছেন আর জনগণ হাসছে। এরপর আর কী বলার আছে তাদের? মীর্জা সাহেব পরিমিত ভাষায় ছিদ্র খুঁজছেন। বাকি থাকল কী? তাছাড়া এবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যাওয়াটা ছিল দেশ ও জাতির জন্য গুরুত্বপূর্ন। এবার তিনি জাতিসংঘে কী নিয়ে বলবেন সেটা আমাদের অজানা কিছু ছিল না। আমরা এ-ও জানি, সংকটে ঐক্য আর বন্ধন ছাড়া মুক্তি নেই আমাদের। তারপরও পারা গেল না। গদিলোভী রাজনীতি আর বিভেদের অতীত বর্তমান যেমন বিষিয়ে রেখেছে, ভবিষ্যতেও ছাড় দিচ্ছে না।

জাতিসংঘ অফিসের সামনের মারামারিতে আমরা বিশ্বকে বুঝিয়ে দিলাম যে, আমরা ঐক্যহীন। অথচ মিয়ানমার, যে দেশের সঙ্গে আমাদের এখন কূটনৈতিক টানাপড়েন চলছে তাদের ভেতর এই ঝামেলা নেই। তারা এক ঢিলে অনেক পাখি মারছে। একদিকে ক্রমবর্ধমান রোহিঙ্গাদের সমস্যা মনে করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে। জাতিগত সংঘাতকে সন্ত্রাস বলে চালিয়ে দিচ্ছে। ওদিকে অং সান সু চিকে এমন ফাঁদে ফেলেছে যে, তাঁর সামনে এখন আর পথ খোলা নেই। ফাঁদটা এমন– তিনি এতকাল ধরে বিশ্বের নজরে ছিলেন, গণতন্ত্রের প্রবক্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তাঁকে মনে করা হত বার্মা বা মিয়ানমারের মুক্তিদূত– সামরিক শাসনে দীর্ঘকাল আটকা-পড়া সু চি স্বামীকে দেখতেও যেতে পারেননি। এমন মহিয়সী একজন নারীকে হাড়ে হাড়ে টের পাইয়ে দেওয়া হচ্ছে গদিলাভ ও শাসনকাজ এক নয়।

তবে সু চির জন্যে মায়াকান্না কাঁদার লোক নই আমি। বরং অবাক হচ্ছি আমাদের দেশের নোবেলজয়ী আর সু চির মধ্যে মিল দেখে। এনাদের কেউ দেশের কঠিনতম পরিস্থিতিতে রুখে দাঁড়াতে পারলেন না। এটা কি সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া মেরুদণ্ডহীন মানুষের প্রমাণ? না কি এর কারণ আসলে আন্তর্জাতিক চাপ?

যাই হোক, সু চি যে এখন ঘোর বিপাকে সন্দেহ নেই। অন্যদিকে আমাদের নেত্রী শরণার্থাী সংকটের দায় নিয়ে আরও বেশি সপ্রতিভ ও উজ্জ্বল।

 

Aung San Suu Kyi - 333
এমন মহিয়সী একজন নারীকে হাড়ে হাড়ে টের পাইয়ে দেওয়া হচ্ছে গদিলাভ ও শাসনকাজ এক নয়

 

যেটা দেখছি, শেখ হাসিনার সমস্যা এখন দেশের কিছু উল্টাপাল্টা নেতা আর বিএনপি-জামাতের ফসিল। প্রান্তিক নামে পরিচিত দরিদ্র ও হ্যাভ-নটদের মগজ ধোলাই করা রাজনীতি এদের এখনও এগিয়ে রাখে বলেই এরা সুবিধাভোগী। মিডিয়ার হাল দেখুন, গত দশ বছর ঘরবন্দি বিএনপি নেতাদের কভারেজ দেওয়ার জন্য কেমন মুখিয়ে আছে। তারা কি একবারও জানতে চেয়েছে নতুন প্রজন্ম বা আমাদের সন্তানেরা আসলে রিজভি সাহেবদের চেনে কি না?

আর এক সমস্যা আওয়ামী লীগের নিজেদের ভেতর। প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে প্রবাসীদের বলেছেন আচার-আচরণ ও ভাষা সংযত করতে। কারণ এতেই ভোট বাড়ে। এটা তিনি দেশের নেতা-কর্মীদের বেলায়ও বলেছেন। তিনি ব্যস্ত মানুষ। তাঁর অনেক কাজ। আমি তো ভাবি যোগ্য পিতার যোগ্য সন্তান না হলে তিনি তৃণমূলের এত খবর রাখতেও পারতেন না। আমি বলি, দেশ চালান প্রধানমন্ত্রী আর সরকার চালায় বাকিরা। তাই তিনি জানতে পারেন না এই সিডনিতেও আওয়ামী রাজনীতির কী ভয়াল চেহারা!

প্রবাসে দেশের রাজনীতির দরকার সেদিনই আর থাকবে না যেদিন আমরা সবাই মিলে বঙ্গবন্ধু, জাতীয় সঙ্গীত, মাটি ও বাঙালি সংস্কৃতি ধারণ করে মৌলবাদের বিদায়-ঘণ্টা বাজাতে পারব। তার আগে এমনটি চাইলেও হবে না। ফলে এটুকু দরকার থাকার পরও আওয়ামী লীগের বিদেশি নেতারা মনে করেন, তারাই সর্বেসর্বা। ভাঙতে ভাঙতে এমন হাল যে, কর্মী পাওয়া যায় না। শুধু নেতা আর নেতা। যারা বছরের পর বছর নেতা ছিলেন তাদের কেউ কেউ আওয়ামী লীগের কল্যাণকামীদের সঙ্গেও এমন আচরণ করেন যা জামায়াতিরা পর্যন্ত করে না।

অষ্ট্রেলিয়ায় মুষ্টিমেয় আওয়ামী নেতার পাগলামি আর উন্মাদসুলভ আচরণে দলের ইমেজ ভবাবহভাবে আক্রান্ত। তাদের ধারণা, বাংলাদেশের মিডিয়ায় তাদের নামধাম ও কাজ প্রথম পাতায় ছাপাতে হবে। দেশ, রাজনীতি ও সমাজের জন্য বিন্দুমাত্র অবদানহীন এই মানুষগুলো মন্ত্রীরা এলে তাদের ডিনার খাইয়ে সভার আয়োজন করেন। এছাড়া তাদের আর কী কাজ জানি না। এ-ও বলব, এই নেতাদের চাইতে বিএনপি বা অন্য রাজনীতির নেতাদের আচরণে মানুষ সন্তুষ্ট। এটা কি দলের জন্য ভালো?

শেখ হাসিনা কতটা দূরদর্শী বলে এই সমস্যার কথা বলেছেন এবং ঈঙ্গিত করেছেন ভেবে অবাক হই। উত্তরণ ও সমাধানহীনভাবে একের পর এক শাখা খোলার পরিণতি জনবিচ্ছিন্নতা। আমি সাধারণ প্রবাসীদের ভেতর যতটা আওয়ামী লীগ ও দলনেত্রীর জন্য দরদ দেখি ততটাই এদের প্রতি ভয়-ভীতি দেখি। মজার ব্যাপার এই যে, সবাই দেশ থেকে অনুমোদন নিয়ে আসে। বাইরে এই পরিবেশে আমরা আর উদ্বিগ্ন নই। কারণ বিষয়টা অনেকটা হাসির খোরাক হয়ে উঠেছে বলেই ঠাট্টাচ্ছলে সবাই বলে, একটা হলে আরেকটা ফ্রি পাওয়া যায়।

বঙ্গবন্ধু, তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, কামরুজ্জমান আর শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ এমন হতে পারে না। প্রবাসে রাজনীতি মানে দুর্দিনে দেশ ও দলের পাশে দাঁড়ানো সেটা তাদের জানানো দরকার। পথভ্রষ্ট বা আদর্শচ্যুত কিংবা ভুল বুঝতে থাকা বাঙালিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ফিরিয়ে আনতে পারলেই দেশজ ও বিদেশের মাটিতে রাজনীতির দিশা ঠিক করা সম্ভব।

অজয় দাশগুপ্তকলামিস্ট।

Responses -- “রাজনীতির ভালোমন্দ”

  1. তপন কুমার বর্মণ

    আওয়ামীলীগ, বিএনপি , জামাত , জাপার নেতারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা , ইসলাম , অসাম্প্রদায়িক চেতনা এইগুলা নিয়ে ব্যবসা করে করে ক্ষমতা আর টাকার বানায়। আর আমাদের বুদ্ধিজীবীরাও এদের তেল দিয়ে সুবিধা বাগিয়ে নেন।
    লেখক একজন আওয়ামী বুদ্ধিজীবী। আর কত ভাই ? দুর্নীতি আর দুর্বৃত্তায়নের পথ থেকে সাধারণ মানুষের পক্ষে লিখুন।কত আর ইনিয়ে বিনিয়ে ত্যানা পেঁচিয়ে হাসিনা-খালেদার পক্ষে লিখবেন?

    Reply
  2. মোঃ আরিফুল ইসলাম

    যখন সংবিধান রক্ষার নির্বাচন-২০১৪ করতে গিয়ে ক্ষমতা দখল এবং চার (৪) বছরেও তা ছাড়ার নেই, তখন ৫% ভোটের সাংবিধানিক সরকার তথা নিয়মতান্ত্রীক ক্ষমতা দখলদারীরা দেশে-বিদেশে লাঞ্চিত হওয়াটাই স্বাভাবিক নয় কি?

    Reply
    • Nebedita Dey

      When we need to protest together against the Rohoinga’s killing and force them to leave their country by the Mynmer Army, at that time some people of BNP showed protest against the Govt, instead of showing protest against the Mynmer Regime of their brutal activities. Recently, we watched it in front of the UNO. Same things happens in other countries too. It is shame to us, if you need to show protest against any Govt (Hasina Or Khaleda) go to Bangladesh and show your grievances their. Please prove us as a peace loving people.

      Reply
  3. মোঃ আরিফুল ইসলাম

    রিজভি সত্যিই কৌতুক করিতেছেন, কারণ এ দেশে ‘গণতন্ত্র’ চাওয়াটাই হাস্যকর! ১৯৭৫-১৯৯০ (১৬ বছর), ১৯৯৬ (১১ দিন), ২০০৭-২০০৮ (২ বছর)- মোট প্রায় ১৮ বছর ১১ দিন ‘গণতন্ত্র’ ছিল না; যা এক বাক্যে সবাই স্বীকার করে। সাথে ২০১৪ থেকে বর্তমান-২০১৭ (৪ বছর) কেমন ‘নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার’ বিরাজ করছে তা জানার জন্য ষোড়শ সংশোধনীর রায় বিবেচনা করি ।

    বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪৬ বছর বয়সের প্রায় অর্ধেক কাল (২২ বছর- ৪৮%) গণতন্ত্রের মুখ দেখেনি, বর্তমানে প্রশ্নবিদ্ধ এবং ভবিষ্যতে থাকবে কিনা সন্দেহ !!! যদিও কিছু সময় অন্তর অন্তর আমরা নির্বাচন নামক তামাশা দেখেছি। হয়তবা নিকট ভবিষ্যতে আমরা এরকম প্রহসনের নির্বাচন (একাদশ) প্রত্যক্ষ করতে যাচ্ছি। জাফর স্যারের ‘কি ভয়ংকর!’ চয়নটা এক্ষেত্রে অধিক প্রযোজ্য ।

    যখন ‘১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের ৪৬ বছর পরও ‘সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন’ আন্দোলনের উপর নির্ভরশীল হয়, তখন এদেশের ‘গণতন্ত্র’ হাস্যকরই বলা যায় ।

    গদির জন্য বিএনপির কর্মকাণ্ড দেখে লেখক ও জনগণ হাসিতেছে, হাসতে থাকুক । এর সাথে ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্র’ একটি জোকসে পরিণত হোক!!

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—