Rohingya - 12111

মার্টিন লুথার কিংসহ আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গদের পূর্বপুরুষদের আমেরিকায় ধরে নিয়ে এসেছিল ইওরোপীয়/আমেরিকান দাসব্যবসায়ীরা। ভাষিক/নৃতাত্ত্বিক দিক থেকে যে ইন্দো-ইওরোপীয় জনগোষ্ঠীকে আরাকান থেকে আজ উৎখাত করা হচ্ছে, তাদের বৃহদাংশকে বাংলার উপকূল অঞ্চল থেকে ধরে নিয়ে আরাকান বা রোসাঙ্গ দেশে বিক্রি করেছিল মঘ ও পর্তুগিজ দাসব্যবসায়ীরা। এর অন্যতম প্রমাণ ‘আলাওল’ । ফরিদপুর থেকে পাকড়াও করা এই ক্রীতদাস পরিণত বয়সে আরাকান রাজসভার অন্যতম সভাকবি হয়ে উঠেছিলেন। চট্টগ্রামও যে মঘদের অন্যতম আবাসস্থল ছিল, তার প্রমাণ শায়েস্তাখানের ‘মঘধাউনি’ (অর্থাৎ ‘মঘতাড়ানো’)– এখনও চট্টগ্রামের লোকের মুখে মুখে ফেরে। চট্টগ্রামের একাধিক স্থাননামে ‘মঘ’ শব্দটি রয়েছে। উদাহরণ: সীতাকুণ্ড থানার ‘মঘপুকুরিয়া গ্রাম’। ঢাকার ‘মঘবাজার’ নামটিও কি মঘদের স্মৃতিবিজড়িত নয়?

ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে আরাকান বা রোসাঙ্গ কখনও স্বাধীন রাজ্য ছিল। মধ্যযুগে সেখানে বাংলা সাহিত্যের চর্চা হয়েছে। কখনও বার্মার কোনো রাজা আরাকান রাজ্য জয় করেছেন, কখনও এটা মোঘল সাম্রাজ্যেরও অংশ ছিল, কখনও-বা ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অংশ। যে কোনো রাষ্ট্রে একাধিক নৃগোষ্ঠী থাকে, সীমান্তে বসবাসরত নৃগোষ্ঠী দুই রাষ্ট্রের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। যেহেতু ইন্দো-ইওরোপীয় জনগোষ্ঠী-অধ্যুষিত বাংলাদেশ এবং ভোটবর্মী জনগোষ্ঠী-অধ্যুষিত বার্মার সীমান্ত ভাগ হয়েছে আরাকানে, সেহেতু সেখানে যে কিছু ইন্দো-ইওরোপীয় জনগোষ্ঠী থাকবে সেটা খুবই স্বাভাবিক।

১৯৬২ সাল থেকে বার্মায় চলছে সামরিক শাসন বা সেনানিয়ন্ত্রিত তথাকথিত গণতন্ত্র। দেশের সম্পদ লুট করে সেনাবাহিনীর জেনারেলরা একেক জন নাকি বহু সহস্র কোটিপতি। এই প্রশিক্ষিত গুণ্ডারা কাউকে পরোয়া করে না, অং সান সু চিকে তো নয়ই। কিন্তু এ ধরনের গুণ্ডামির ফল যে ভালো হয় না, তার প্রমাণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিক থেকে বার্মা আশেপাশের দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে। সমস্যা হচ্ছে, আন্তর্জালের বদৌলতে মানুষ ইদানিং হয়ে উঠেছে Homo media বা ‘আশরাফুল মিডিয়ালুকাৎ’। বার্মার একটা বাচ্চাও জানে, গত ছয় দশকে বার্মার অর্জন সম্ভবত একটাই, দেশের নাম পরিবর্তন। যখন থেকে ‘মায়ানমার’, কমবেশি তখন থেকেই চট্টগ্রামের ভাষায় ‘মায় ন, মার!’ প্রমিত বাংলায় বললে, ‘মায়া দেখানোর দরকার নেই, লাগা কঠিন মার!’ দেশে কোথাও একটা গণ্ডগোল লাগিয়ে জনগণের মনোযোগ অন্যদিকে চালিত করার সহজ সুযোগ অনেক শাসকই নিয়ে থাকেন– বার্মার General রাও specifically নিয়েছেন।

প্রশ্ন হতে পারে, মারটা শুধু রোহিঙ্গাদের উপরই কেন? না, অন্য জাতিগোষ্ঠীর উপরও কমবেশি আক্রমণ হয়েছে বৈকি। স্বাধীন হবার আগেই স্বাধীনতার স্থপতি অং সানকে হত্যা করেছে বর্মীরা (বাঙালিরা নিজেদের রাষ্ট্রপিতাকে হত্যা করেছে স্বাধীনতার সাড়ে তিন বছর পরে– সুতরাং বাঙালিদের চেয়ে সাড়ে তিন ডিগ্রি বেশি নৃশংস বর্মীরা!) ১৯৪৮ সালে স্বাধীন হওয়ার পর থেকে বার্মায় জাতিগত সম্প্রীতি কখনও ছিল না। বার্মা যখন ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল অথবা যখন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা আন্দোলন চলছিল বার্মায়, তখন বর্মি ছাড়া অন্য সব ক্ষুদ্রতর জাতিগোষ্ঠী ব্রিটিশদের পক্ষে কাজ করেছিল। বার্মার অন্য সব জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে রোহিঙ্গাদের তফাৎ এই যে, তারা যুগপৎ জাতিগত, ভাষাগত এবং ধর্মগত সংখ্যালঘু। সুতরাং তারাই তো প্রথমে বলির পাঁঠা হবে! অন্য সব জাতিগোষ্ঠীর উপর অত্যাচার করে শক্তিশালী প্রতিবেশি চীন, ভারত বা থাইল্যান্ডকে ঘাঁটাতে চায় না বার্মা। দুর্বল প্রতিবেশির মধ্যে রয়েছে লাওস এবং বাংলাদেশ। লাওস যেহেতু বৌদ্ধ-অধ্যুষিত, সেহেতু মুসলমান-অধ্যুষিত বাংলাদেশকে ঘাঁটানোই সুবিধাজনক নয় কি?

 

General Aung San - 111
স্বাধীন হবার আগেই স্বাধীনতার স্থপতি অং সানকে হত্যা করেছে বর্মীরা

 

বার্মার ইতিহাসে এটা নতুন কিছু নয়। বর্মী রাজা বোধপায়া ১৭৪৫ সালে আরাকান, ১৮১৪ ও ১৮১৭ সালে যথাক্রমে ভারতের মণিপুর এবং আসাম দখল করেছিলেন। কারণ চীন সীমান্তে প্রবল প্রতিবেশি চীনের সঙ্গে তিনি সুবিধা করে উঠতে পারছিলেন না।

জেনারেলরা বড়লোক, কিন্তু তার মানে কিন্তু এই নয় যে, বার্মার সেনাবাহিনীর সবাই বড়লোক। আরাকানে লুটের মাল আর গণিমতের মেয়েমানুষ পেয়ে সাধারণ বর্মী সৈন্যরা নিশ্চয়ই অখুশি নয়। বউকে ঠেসে মার দিলে বউ যদি মোহরানার টাকা ভুলে গিয়ে পড়ি কী মরি ঘর ছেড়ে পালিয়ে বাঁচে, তাহলে খসমের নতুন নিকে করতে সুবিধা হয় না কি? সব রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে চলে গেলে আরাকানের খালি জমি নিয়ে বার্মার জেনারেলরা যাচ্ছেতাই করতে পারবে। উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন কর, গ্যাস তোল, বিদেশিদের জমি লিজ দাও, গাছ কেটে চালান কর বিদেশে– কে বাধা দিচ্ছে! তার উপর রোহিঙ্গাদের যদি ফেরৎ নিতেও হয়, সেক্ষেত্রে তাদের পুনর্বাসনের জন্যে জাতিসঙঘের কাছ থেকে মোটা অনুদান পাবার সম্ভাবনাও রয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসেবে জাতিসংঘকেও নিজের কার্যকারিতার প্রমাণ দিতে হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কয়েক দিন আগেও জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বাংলাদেশে শরণার্থীদের ভরনপোষণ করা অথবা বার্মায় তাদের পুনর্বাসন এবং শান্তিরক্ষীবাহিনী মোতায়েনের সুযোগ সৃষ্টি হলে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছে জাতিসংঘ নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পারবে এবং বকেয়া চাঁদা পরিশোধ করার জন্যে তাদের চাপও দিতে পারবে। রোহিঙ্গারা না আবার দলে দলে ইওরোপে এসে উপস্থিত হয় এই আতঙ্কে ইওরোপীয় দেশগুলোও চাঁদা দিতে গররাজি হবে না।

বহু আগে থেকেই বার্মা চীনের ধামাধরা। বাংলাদেশের নাড়িকাটা বন্ধু ভারতও বার্মার সঙ্গে আছে, যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ফোনালাপে বাংলাদেশকে মৌখিক সহানুভূতি জানিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে এক ঢিলে একাধিক পাখি মারছে ভারত। বাংলাদেশ ট্রানজিট দিতে গড়িমসি করছে। বার্মার কাছ থেকে আকিয়াব বন্দরটা পাওয়া গেলে ক্ষতি কী? বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে সাবমেরিন কেনাতে রাশিয়ার মনে একটু গোস্বাও কি হয়নি? আমার কাছ থেকে মিগ বিমান কিনেছ, সাবমেরিন চাইলে কি আমি বেচতাম না? রাশিয়ার কাছ থেকে মিগ কেনাতে চীনও কি খুব খুশি? আরে বাপু, যতই ‘মেইড ইন চাই না’ হোক, আমি তো জলের দামে ছেড়ে দিতাম। (সাবমেরিন তো আগে-পরে জলেই যাবে!)

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অত দহরম-মহরম চীনও কি সহজভাবে নিতে পারছে? এদিকে ভারত ভাবছে, মিগ আর সাবমেরিনের দরকারটাই-বা কী বাংলাদেশের? প্রয়োজনে আমি ‘দাদা’ রয়েছি না পাশে! ভারতবর্ষের পূর্বপ্রান্তে চীন সীমান্তে বার্মাকে বন্ধু হিসেবে পেতে চাইছে ভারত, আর পশ্চিম সীমান্তে ভারত হাতে রাখতে চাইছে আফগানিস্তানকে। এতে চাপে রাখা যাবে পূর্বদিকে বাংলাদেশকে, পশ্চিমদিকে পাকিস্তানকে। তাছাড়া ভারতকে যা দেবার সব দিয়েই তো দিয়েছে বাংলাদেশ। ‘চুষে হুয়ে গেন্না’ বা চিবানো আখের ছিবড়ে আর রস খুঁজে কী ফায়দা?

১৯৭১ সালে তিন মাসেও যা করা সম্ভব হয়নি, সপ্তাহ খানেকের মধ্যে তা করে দেখিয়েছে শেখ হাসিনার সরকার। এশিয়ার দুই মোড়ল, ভারত ও চীনের অনাগ্রহ সত্ত্বেও বিশ্বের জনগণের কাছে বাংলাদেশ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে যে, আরাকানে জাতিবিদ্বেষী গণহত্যা চলছে। নিপীড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ও বাংলাদেশের প্রতি সহানুভূতির পাল্লা ইতোমধ্যেই ভারি হয়েছে। জননেত্রী শেখ হাসিনার ভাবমূর্তিও উজ্জ্বলতর হয়েছে বৈকি। নির্বাচনের অব্যবহিত পূর্বে এই ঔজ্জ্বল্যের প্রয়োজনও রয়েছে।

সম, দান, ভেদ, দণ্ড– প্রাচীন ভারতের চতুরঙ্গ রাজনীতির প্রথম উপায়টি, অর্থাৎ ‘সম’ অনুসরণ করছেন শেখ হাসিনা, আপাতত। ধৈর্য এবং মানবিকতা দুইই প্রদর্শন করেছেন তিনি তাঁর সংসদ-বক্তৃতায়। অকারণ সময়ক্ষেপণ না করে সশরীরে তদবির করতে চলে গেছেন জাতিসংঘে। জাতির পিতার হত্যাকারী এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পর রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান শেখ হাসিনার সাফল্যের উষ্ণিষে একটি উজ্জ্বল পালক হিসেবে বিবেচিত হবে। শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার এসে গেলে সেটা হবে উপরি পাওয়া।

ফরাসি গোয়েন্দা জগতে একটা প্রবাদ আছে: Cherchez la femme (উচ্চারণ: শার্শে লা ফাম) অর্থাৎ ‘মেয়েটিকে খুঁজে বের কর’। এর নিগলিতার্থ হচ্ছে, প্রতিটি অপরাধের সঙ্গে কোনো না কোনো মহিলা জড়িত আছে এবং সেই মহিলাটিকে খুঁজে না বের করতে পারলে অপরাধের কিনারা করা যাবে না। রোহিঙ্গা সঙ্কটের পেছনে কলকাঠি নাড়ছে কে?

 

Aung San Suu Kyi - 444
সুললিত অক্সফোর্ডিয়ান ইংরেজিতে তিনি হয়তো ঠিক তাই বলেছেন, যা তাঁকে তোতাপাখির মতো শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে

 

চট্টগ্রামের প্রবাদ আছে: ‘লাভে লোয়া বয়’। অর্থাৎ ‘লাভের সম্ভাবনা থাকলে মানুষ লোহা বইতেও রাজি’। লাভটা আসলে কার? কার স্বার্থ সবচেয়ে বেশি রক্ষিত হবে রোহিঙ্গা সঙ্কটে? এই সঙ্কট এমন কোনো মোড় যদি নেয় যে, জেনারেলদের কর্তৃত্ব চিরদিনের জন্যে খর্ব হয়ে গেল বার্মায়, তাতে কি সু চি বা তাঁর দলের সুবিধা হয় না? সুবিধা হয় না কি বাংলাদেশেরও, একটি গণতান্ত্রিক দেশকে প্রতিবেশি হিসেবে পেলে?

বার্মা ক্ষুদ্র ও বৃহৎ অস্ত্রের এক গুরুত্বপূর্ণ খরিদ্দার। আমেরিকা, ইওরোপ ও এশিয়ার একাধিক দেশের সঙ্গে সুগভীর বাণিজ্য-সম্পর্ক রয়েছে বার্মার। সুতরাং এই সব দেশ উপরে উপরে নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের প্রতি শুকনো সহানুভূতি দেখিয়ে ভিতরে ভিতরে যদি বার্মার নিপীড়ক জেনারেলদের পক্ষে দাঁড়ায় তাতেও কি অবাক হবার কিছু আছে? লেলিন বলেছিলেন: ‘পুঁজিবাদীরা সুযোগ পেলে নিজেদের ফাঁসির দড়িটুকুও বিক্রি করে ছাড়বে!’

সত্যিকারের গণতন্ত্র থাকলে বার্মাকে লুটেপুটে খাওয়া অতটা সহজ হবে না। সুতরাং নিজের স্বার্থেই স্বদেশে গণতন্ত্রের ধ্বজাধারীরা বিদেশে গণতন্ত্র হত্যা করে। বিশ্বের জনগণকে ধোঁকা দিতেই হয়তো সু চিকে শিখণ্ডী বানানো হয়েছে। কারাবাস এবং কিছুটা বয়সের ভারেও ক্লান্ত সু চি হয়তো এই ব্যবস্থা মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র এবং সীমান্ত-বিষয়ক এই তিন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় রয়েছে বার্মার জেনারেলদের হাতে। তাদের কথাই আইন। সু চি প্রকৃতপক্ষে ঢাল-তলোয়ারহীন এক নিধিরাম সর্দার। ঠুঁটো জগন্নাথ। একজন অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল প্রতিদিন সু চিকে পরামর্শ দিতে আসেন। এই পরামর্শ যে মূলত নির্দেশ তা না বোঝার মতো খুকি সু চি নন। সাম্প্রতিক বক্তৃতায় সুললিত অক্সফোর্ডিয়ান ইংরেজিতে তিনি হয়তো ঠিক তাই বলেছেন, যা তাঁকে তোতাপাখির মতো শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে।

কার স্বার্থ জড়িত নেই রোহিঙ্গা সঙ্কটে? বার্মার সেনাবাহিনী, চীন, ভারত, রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এমনকি স্বার্থ রয়েছে খোদ বাংলাদেশেরও, নিদেনপক্ষে বর্তমান সরকারের। সুতরাং এই সঙ্কটে femme একজন নয়, একাধিক। কিন্তু কার না প্রাণ কাঁদে সেইসব উলুখাগড়াদের কথা ভেবে, রাজায় রাজায় যুদ্ধে যাদের প্রাণ যায়, যাচ্ছে, আরও যাবে? পাটাপুতায় ঘসাঘসিতে মরিচের মতো সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বেচারা রোহিঙ্গারাই। মাতৃভূমি-সম্পদ-সম্ভ্রম-সময়-জীবন সব হারাবে তারা। এই রোহিঙ্গারা হবে আলোচ্য সঙ্কটের ‘বহুপাক্ষিক অপচয়’ (Multilateral damage), চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায়: ‘লাথির কাট্টল’ অর্থাৎ ‘লাথির কাঁঠাল’ (যে কাঁচা/আধপাকা কাঁঠালকে বাচ্চারা ফুটবলের মতো লাথি মেরে মেরে পাকায়)।

বাংলাদেশের মতো জনবহুল একটি দেশের পক্ষে এত লক্ষ শরণার্থী সামাল দেওয়াও কি সহজ হবে? এই বিপুল সংখ্যক শরণার্থী যে একদিন বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলার জন্যে হুমকি হয়ে উঠবে না তাই-বা কে বলতে পারে। শরণার্থী পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতির উপর চাপ সৃষ্টি করবেই করবে। যে কয়েকটি উপজেলায় শরণার্থীদের রাখা হচ্ছে, চাপ পড়বে সেখানকার অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও সামগ্রিক পরিবেশের উপর। স্বাগতিকরাও যে চিরকাল রোহিঙ্গাদের স্বাগত জানাতে থাকবে এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না।

জনস্রোত আর জলস্রোত আটকে রাখা অসম্ভব। মনুষ্য-তরঙ্গ কে রোধিতে পারে? গত তিন দশক ধরেই রোহিঙ্গারা পাড়ি জমাচ্ছে বিদেশে। ভূগোলের কোথায় নেই তারা? কোনো সন্দেহ নেই যে, বাংলাদেশ থেকে বহু রোহিঙ্গা কালক্রমে চলে যাবে বহির্বিশ্বে। যারা বিদেশে গিয়ে পৌঁছাতে পারবে, তারা কমবেশি উন্নত জীবনের অধিকারী হবে। বেঁচে যাবে তাদের পরবর্তী প্রজন্ম। রোহিঙ্গাদের অভিবাসনের কারণে আমার মাতৃভাষা চট্টগ্রামী ছড়িয়ে যাবে সারা পৃথিবীতে।

ঘর পুড়ে গেলে কিছু পোড়া কয়লা তো পাওয়া যায়। আপাতত এই পোড়া কয়লাটুকু ছাড়া রোহিঙ্গাদের ভাগ্যের দিকচক্রবালে আশাব্যঞ্জক ‘আর ত কিছু ন দেখির!’

শিশির ভট্টাচার্য্যঅধ্যাপক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Responses -- “রোহিঙ্গা সমস্যা: ‘মেয়েটিকে খুঁজে বের কর’”

  1. PRANAB KUMAR JANA

    রোহিঙ্গা সমস্যা একটি জাতীয় সমস্যা। তা নিয়ে বিশ্বের সকল জাতির দৃঢ় ও সুচিন্তিত মতামত প্রয়োজন । কে জানে,কবে এই সঙকট স্বজাতির উপর আঘাত হানে।

    Reply
  2. rodela

    বিষদভাবে সব কিছুই তুলে ধরছেন। বাংলাদেশ একটি অশনিসংকেতের মুখে দাঁড়িয়ে আছে, এই ব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই।

    Reply
  3. ত্রম ত্রইচ বি.

    স্যার , প্রথমে অাপনাকে ধন্যবাদ ত্রতসুন্দর ও সহজ করে লেখার জন্য . জীবন থেকে কিছুটা সময় রেখে দিলাম অাবারও অাপনার লেখা পড়ার জন্য. “ধন্যবাদ”

    Reply
  4. Palash

    সুন্দর, বস্তুনিষ্ঠ ও গভীর দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে এই প্রতিবেদনের জন্য আপনাকে অাভূমি প্রণতি।

    Reply
  5. mohammad setab uddin

    Amra karo biruddhe loray korte chaina. kutnoitik aloconar maddhyome protibeshi barma tar lokjonke firiye nibe ebong tader nagorik odhikar soho sokol manobik odhikar vog korar babostha korbe eta amra asha kori. Amra protibeshir sathe shantipurno soho obosthane bissashi. Asha kori China ebong Bharot shantipurno somadhane egiye asbe.

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—