Virtual learning (Pexel) - 111

বাঙালি আপাতত একটি অভিবাসন-প্রবণ জাতি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগর পাড়ি দিয়ে যারা ইওরোপে যাচ্ছে আজকাল, তাদের অধিকাংশই নাকি বাঙালি। স্বাধীনতার পর থেকেই একের পর এক সরকারের অবিমৃষ্যতার কারণে আরও কয়েক দশক পরের দেশে গিয়ে গতর ও মস্তিষ্ক খাটিয়ে গোলামি করতে হবে বাঙালিদের। শিক্ষিত এবং প্রশিক্ষিত না হওয়ার কারণে বাঙালি শ্রমিকেরা প্রতিবেশি দেশের শ্রমিকদের তুলনায় কম পারিশ্রমিকে কাজ করতে বাধ্য হয়। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যাকে সুশিক্ষিত জনসম্পদে রূপান্তরিত করে বিদেশে রপ্তানি করার বিকল্প নেই।

এই রূপান্তরের অন্যতম উপায়, জনগণের সর্বস্তরে শিক্ষাবিস্তার। এই সামর্থ্য কি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আছে? ১৯৬৮ সালে আমি যখন প্রথম শ্রেণির ছাত্র ছিলাম, তখন আমাদের ক্লাসে ছাত্রসংখ্যা ছিল ৮০ জন। সবাই প্রতিদিন আসত না, কিন্তু কমপক্ষে ৫০ জন তো আসত। এক একটা বেঞ্চিতে চার জনের জায়গায় সাতজন বসতাম। অনেক সময় মাটিতে চাটাই পেতেও বসতে হত। ছোট একটি শ্রেণিকক্ষ গিজগিজ করত ছাত্রছাত্রীতে। সুগন্ধী তেল, ঘাম এবং অনুরূপ একটি দুর্গন্ধে নরক গুলজার! দেয়ালে প্লাস্টার ছিল না, প্রায়ই সিলিং থেকে সিমেন্টের চাকলা খসে পড়ত, ভূমিকম্প ছাড়াই।

তিনটি মাত্র শ্রেণিকক্ষ ছিল আমাদের স্কুলে এবং বেড়ার পার্টিশন দিয়ে একটি কক্ষ থেকে অন্য একটি কক্ষ আলাদা করা হত। সুতরাং কোন শ্রেণিতে কী পড়ানো হচ্ছে, কোথায় কার পিঠে বেতের কোন কারুকাজ চলছে সব কিছুই কানে এসে একটা ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি হত। লিখতে বা পড়তে শেখার বা শেখানোর আদর্শ পরিবেশ এটা নয়, বলাই বাহুল্য।

দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা আর না বাড়িয়ে বিদ্যমান প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর মানোন্নয়নে মনোযোগ দিলে ভালো হয়। দেশের সব ধরনের শিক্ষায়তনে বৈকালিক/সান্ধ্য শিফট চালু করার কথা ভাবা যেতে পারে। এতে করে সিট-সঙ্কুলানের অভাবে যারা ভর্তির সুযোগ পায় না, পছন্দের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের ভর্তির সুযোগ বাড়বে। যারা দিনে কাজ করে, তারাও এই সান্ধ্য শিফটে লেখাপড়া করে ডিগ্রি নেবার সুযোগ পাবে।

এর জন্যে যোগ্য নতুন শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। আদমশুমারী, ভোটার-তালিকা তৈরি, এলাকার পাকা ও কাঁচা পায়খানা সম্পর্কে তথ্যসংগ্রহ ইত্যাদি কত বিচিত্র রকমের অ-শিক্ষকসুলভ কাজে যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ব্যবহার করা হয় তার ইয়ত্তা নেই। এই অপসংস্কৃতির অবসান হওয়া প্রয়োজন।

ফরাসি দার্শনিক মোঁতেঈন (১৫৩৩-১৫৯২) মনে করতেন, প্রত্যেক শিক্ষার্থীর প্রকৃতি আলাদা, তাদের ক্ষমতাও এক নয়। সুতরাং কোনো শ্রেণির, ধরা যাক, ত্রিশ জন শিক্ষার্থীকে যেহেতু একই শিক্ষক একইভাবে পড়িয়ে থাকেন, সেহেতু প্রতি শ্রেণিতে মাত্র দুই কী তিন জনের বেশি শিক্ষার্থী লেখাপড়ায় ভালো করতে পারে না। এটা একটা সমস্যা, কিন্তু একাধিক শিক্ষার্থীর জন্যে একই শিক্ষক– এর বিকল্প আমাদের জানা নেই। তবে আমরা আপাতত শ্রেণিকক্ষে ছাত্রসংখ্যা কমিয়ে আনতে পারি, ত্রিশের বেশি শিক্ষার্থী কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এছাড়া শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ উন্নত করা যেতে পারে। লুটপাট সহ্যমাত্রায় নামিয়ে এনে (একেবারে বন্ধ যে করা যাবে না তা পাগলেও বোঝে!) যে বিপুল পরিমাণ অর্থ শিক্ষাখাতে বরাদ্দ হচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে, তা যদি ঠিকঠাক ব্যয় করা যায় তবে বর্তমান অবস্থার দর্শনীয় উন্নতি সম্ভব।

শিক্ষায় খুবই উন্নতি করেছে বলে শোনা যায় এমন তিনটি দেশ, ডেনমার্ক, সুইডেন ও নরওয়ে যথাক্রমে তাদের মোট জাতীয় উৎপাদন বা জিডিপির যথাক্রমে ৮.৭, ৭ এবং ৬.৯ শতাংশ ব্যয় করছে শিক্ষায়। আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশ, যেমন ঘানা, কঙ্গো ও রুয়ান্ডা ব্যয় করছে যথাক্রমে ৮, ৬.২ এবং ৪.৮ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নেপাল, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা বয় করছে যথাক্রমে ৪.৭, ৩.৩, ২.৪, ২.২ এবং ২ শতাংশ।

 

Primary Education in Bangladesh - 77777
দেশের সব ধরনের শিক্ষায়তনে বৈকালিক/সান্ধ্য শিফট চালু করার কথা ভাবা যেতে পারে

 

২০১২ সালের এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে দাবি করা যেতে পারে যে, বাজেটের সর্বোচ্চ অংশ শিক্ষায় ব্যয় করার সরকারি প্রচারণা প্রকৃতপক্ষে শুভঙ্করের ফাঁকি। শিক্ষায় কাম্য উন্নতি পেতে অন্যান্য দেশ যে পরিমাণ ব্যয় করছে, বাংলাদেশ প্রকৃতপক্ষে তা করছে না। শিক্ষায় উন্নতি করতে হলে মোট জাতীয় উৎপাদনের কমপক্ষে ৫-৬ শতাংশ শিক্ষাখাতে ব্যয় করার বিকল্প নেই। সাম্প্রতিক এক বক্তৃতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেছেন, বাংলাদেশের শিক্ষার প্রধান সমস্যা দুটি: ১. স্বল্প বাজেট এবং ২. ত্রুটিপূর্ণ ও অনুপযুক্ত শিক্ষাকাঠামো। তিনি মনে করেন, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। বৈধ ও বিভিন্ন অবৈধ উপায়ে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের কমবেশি শিক্ষাদানের উপযুক্ত করে তুলতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মাহবুব আহসান খান ব্যক্তিগত আলাপে বলেছেন, বাজেট বা প্রশিক্ষণ নয়, মনিটরিং বা তদারকির অভাবই বাংলাদেশের শিক্ষার প্রধান সমস্যা। আজকাল বেশিরভাগ প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক উচ্চশিক্ষিত, অনেকেই গ্র্যাজুয়েট বা মাস্টার্স ডিগ্রি পাস। যেহেতু বেশিরভাগ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিজ গ্রামেই শিক্ষকতা করেন, সেহেতু বেতন নিয়ে তাদের অভিযোগ হয়তো ততটা নেই। কিন্তু শিক্ষকেরা যদি স্কুলে আদৌ না আসেন বা দেরি করে আসেন অথবা এলেও কোনো না কোনো অজুহাতে ক্লাস না নেন তবে তাদের জবাবদিহির ব্যবস্থা দেশের অনেক স্থানে অনুপস্থিত।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে জানি, স্কুল কমিটির সদস্য এবং শিক্ষকরা সবাই যেহেতু এলাকার লোক, সেহেতু তাঁরা একে অপরকে চেনেন এবং অনেক সদস্য শিক্ষকদের উপর খবরদরি বা নজরদারি করে তাদের বিরাগভাজন হতে চান না।

বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালী উপন্যাসে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইন্সপেক্টর এসে বিভিন্ন ক্লাসের ছাত্রদের প্রশ্ন করার কথা উল্লেখ রয়েছে। আমাদের ছাত্রজীবনে (প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারি হবার আগে) স্কুল ইন্সপেক্টরকে হঠাৎ করে বা খবর দিয়ে স্কুল পরিদর্শনে আসতে দেখেছি। এখন কি এই রেওয়াজ একেবারেই উঠে গেছে?

অভিভাবকেরাও সম্ভবত নিয়মানুবর্তিতা ও সময়ানুবর্তিতার অভাব নিয়ে শিক্ষকদের কিছু বলতে পারেন না। কারণ যেসব শিক্ষার্থী (একান্তই ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ে পড়ার সঙ্গতি নেই বলে) বাংলা মাধ্যম বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে বাধ্য হয়, শিক্ষকের কোনো আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো যোগ্যতা বা সামাজিক অবস্থান তাদের অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত বাবা-মায়ের থাকে না। মোহাম্মদ আযম মনে করেন, যাঁরা কিছুটা হলেও শিক্ষককে জবাবদিহি করতে বাধ্য করতে পারতেন, সেই শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সন্তানেরা বাংলা মিডিয়াম বিদ্যালয়ে প্রায় পড়েই না। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ধীরে ধীরে ধ্বংস হওয়ার পেছনে বাঙালি মধ্যবিত্তের দায়ও খুব একটা কম নয়।

সময় দ্রুত বদলে যাচ্ছে এবং তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শিক্ষাদান ও গ্রহণের ব্যাপারটাও দ্রুত পাল্টাতে শুরু করেছে, অন্ততপক্ষে পাশ্চাত্যে। আগামি কয়েক দশকে শিক্ষায় এমন সব পরিবর্তন আসবে যা আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছে অচিন্ত্যনীয় ছিল। সেদিন আর দূরে নেই যেদিন শিক্ষার একটি বড় অংশ ভার্চুয়াল হয়ে যাবে।

জীবন ও জগৎ এখনই দুই রকম– বাস্তব এবং ভার্চুয়াল (প্রতিরূপায়িত, প্রতিবিম্বিত)। ভার্চুয়াল জগতটা, আমি বলছি (লালনের ভাষায়), ‘আরশিনগর’। মোবাইল বা কম্পিউটারের আন্তঃস্বয়ংক্রিয় (ইন্টারঅ্যাকটিভ) আরশিতে অঙ্গুলি-ঘর্ষণের মাধ্যমে এই জগতে আমাদের অনেকের নিত্য আসাযাওয়া। এমন অনেকে আছেন যারা যতক্ষণ না বাস্তবে থাকেন তার চেয়ে বেশি সময় থাকেন আরশিনগরে। ‘বাড়ির কাছে আরশিনগর, যেথা সব পড়শি বসত করে।’ যারা এই পড়শিদের ‘আমি এক দিনও না দেখিলাম তারে’ ভেবে গর্ব করছে, তারা বোকার স্বর্গে বাস করছে।

বাস্তব এবং ‘ভার্চুয়াল’ (যার বাংলা প্রতিশব্দ হতে পারে ‘আরশিক’) শিক্ষা আগে-পরে এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে এবং ভার্চুয়াল/আরশিক শিক্ষা প্রাধান্য পাবে। কাগজের বই, পরিচিত শ্রেণিকক্ষ, রক্তমাংসের শিক্ষক আরও অনেক দিন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অংশ হয়ে থাকবে এটা যেমন সত্য, তেমনি ডিজিটাল বই, ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষ, ডিজিটাল শিক্ষকও যে ধীরে ধীরে আমাদের জীবনের দখল নেবে। আন্তঃস্বয়ংক্রিয় একেকটি শিক্ষা-উপকরণ– ডিজিটাল কোর্স, ডিজিটাল শিক্ষক, ডিজিটাল পাঠাগার, ডিজিটাল যাদুঘর নির্মাণের কথা আমাদের এখনই ভাবতে হবে।

 

Primary students in Japan - 111
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা হয়তো আরও অনেকদিন শ্রেণিকক্ষেই সম্পন্ন হবে

 

ভবিষ্যতে পুরো শ্রেণিকক্ষই ভার্চুয়াল হয়ে যেতে পারে, যেখানে আধুনিক ভিডিও গেমের মতো এক এক জন ভার্চুয়াল শিক্ষার্থী বা শিক্ষার্থীর হলোগ্রাম একটি বিষয়ে যত রকম প্রশ্ন করা সম্ভব একে একে করতে থাকবে এবং ভার্চুয়াল শিক্ষক সেসব প্রশ্নের উত্তর দিতে থাকবেন। শিক্ষার্থী সেই প্রশ্নোত্তর শুনবে, এমনকি আলোচনায়ও অংশ নিতে পারবে, অর্থাৎ কম্পিউটার বা অন্য কোনো ডিভাইসে ভার্চুয়াল শিক্ষাপ্রোগ্রাম চালু করার সঙ্গে সঙ্গে প্রোগ্রামের দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের শিক্ষার্থীও হয়ে যাবে একজন ভার্চুয়াল শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থীর একান্ত নিজস্ব প্রশ্নেরও উত্তর দেবে ভার্চুয়াল শিক্ষক। শিক্ষাদান, শিক্ষার্থীর অগ্রগতি নির্ধারণ, বিশেষ শিক্ষার্থীর বিশেষ সমস্যা খুঁজে বের করা ইত্যাদি অনেক কিছুর দায়িত্ব নেবে সেই ভিডিও-শিক্ষা প্রোগ্রাম।

ভার্চুয়াল শিক্ষার অন্যতম সুবিধা হচ্ছে, শিক্ষার্থী একই ক্লাস যতবার খুশি করতে পারবে। এই শিক্ষাপদ্ধতির আরও একটি সুবিধা হচ্ছে, এতে বাস্তব কোনো শ্রেণিকক্ষ বা বিদ্যালয়গৃহের প্রয়োজন নেই। শিক্ষার্থীর ক্লাসে যাবার বাধ্যবাধকতাও থাকবে না। একজন শিক্ষার্থী যখন খুশি লেখাপড়া করতে পারবে, তার সময়মতো, নিজের দায়িত্বে। ‘সুশিক্ষিত ব্যক্তি মাত্রেই স্বশিক্ষিত’– এই প্রবাদ অবশেষে সর্বজনীন রূপ নেবে। চূড়ান্ত পরীক্ষা নিয়ে ডিগ্রি দেবার দায়িত্বে থাকবে শিক্ষাবোর্ড বা বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষার বাকি সব দায়িত্ব শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের।

ভিডিও গেম শেষ করার পর খেলোয়াড় যেমন তার স্কোর জানতে পারে, তেমনি ভিডিও-শিক্ষা প্রোগ্রাম শেষ করার পর শিক্ষার্থী জানতে পারবে বিষয়টিতে সে পাশ করেছে কী করেনি। হ্যাঁ, সব শিক্ষা-প্রোগ্রামই যে এ কাজগুলো ঠিকঠাক করে উঠতে পারবে এমন কথা নেই। যে প্রোগ্রাম সবচেয়ে ভালো, শিক্ষার্থীরা সেটি কিনবে (বা ডাউনলোড করবে)– ঠিক যেমন আমরা সবচেয়ে ভালো ভিডিও গেমটি কিনে থাকি।

ভার্চুয়াল শিক্ষা চালু হলে শিক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও খরচ লক্ষ্যণীয়ভাবে কমে যাবে। উচ্চশিক্ষার্থে তখন বিদেশ-গমনের প্রয়োজন হবে না। ফলে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের শিক্ষার্থী-অভিভাবকের কষ্টার্জিত অর্থ উন্নত দেশের কোষাগারে পাচার হবে না। আধুনিকতম উচ্চশিক্ষা দিনরাত হাতের কাছেই থাকবে– শিক্ষার্থীর মুঠোফোনে বা অন্য কোনো ডিভাইসে। যখন প্রয়োজন, ঘরের দেয়ালে বা অন্য কোথাও প্রক্ষেপণ করে শিক্ষার্থী তার লেখাপড়া সেরে নেবে, একা বা আরও কয়েক সহপাঠী মিলে। লিভারপুলের শিক্ষার্থী যা শিখবে হাতিরপুলের শিক্ষার্থীও অনেকটা তাই শিখবে। সিঙ্গাপুরের মিউজিয়মে গিয়ে যা দেখা যাবে ঠিক তাই দেখা যাবে মীরপুরে– নিজের বিছানায় শুয়ে নিজের ট্যাবলেটের ত্রিমাত্রিক যাদুঘরে।

ডিজিটাল বই আর কাগজের বই এক পদ্ধতিতে লিখলে চলবে না। শ্রেণিকক্ষে পড়ানোর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দিয়ে চৌকশ ডিজিটাল শিক্ষক হওয়া যাবে না– ঠিক যেমন করে ভালো সাইকেল চালাতে জানলেই ভালো গাড়ি চালানো যাবে এমন কথা নেই (এবং বিমান চালানোর জন্যে সাইকেল চালাতে জানার প্রয়োজনই নেই)।

ভবিষ্যতে এমন দিন হয়তো আসবে যেদিন এক বা একাধিক পর্যায়ে শিক্ষা পুরোপুরি ডিজিটাল হয়ে যাবে। প্রথমেই হয়তো ডিজিটাল হবে উচ্চশিক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অধিকাংশই তখন অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাবেন, শুধু গবেষণা-পরিচালনার ক্ষেত্রেই তাদের যা কিছু উপযোগিতা থাকবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা হয়তো আরও অনেকদিন শ্রেণিকক্ষেই সম্পন্ন হবে।

এ লেখায় ‘হয়তো’ শব্দের বাহুল্য আছে। কারণ পাশ্চাত্যেও শিক্ষার ডিজিটাইজেশন বা ‘আরশিকায়ন’ নিয়ে চিন্তাভাবনা এখনও ভ্রুণ পর্যায়ে। আমরা সবসময় পাশ্চাত্যের অনুসরণ করি, কিন্তু শিক্ষার ডিজিটাইজেশনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কি অগ্রবর্তী সৈনিকের ভুমিকা গ্রহণ করতে পারে না? আমাদের রাষ্ট্র, শিক্ষাচিন্তক, অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীরা কি শিক্ষার এই আধুনিকায়নের কথা আদৌ ভাবছেন?

শিক্ষা-উপকরণের ব্যবসায়ে যারা বিনিয়োগ করতে চান, যারা প্রোগ্রামিং করেন এবং শিক্ষা নিয়ে ভাবেন তাদের জন্যে এটা চমৎকার একটা সুযোগ। এতে একদিকে নিজের ও অন্য অনেকের কর্মসংস্থান হবে, অন্যদিকে জাতীয় শিক্ষা তথা দেশের উন্নয়নে অবদানও রাখা যাবে।

যে কথা ভুলে গেলে চলবে না সেটা হচ্ছে, বাংলাদেশে সর্বজনীন শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে ভার্চুয়াল শিক্ষার ভাষা হতে হবে বাধ্যতামূলকভাবে রাষ্ট্রভাষা বাংলা। শিক্ষা-সম্পর্কিত যে কয়েকটি স্বতঃসিদ্ধ শিক্ষার নীতিনির্ধারকদের মেনে না নিলেই নয় সেগুলো হচ্ছে: ১) কোনো একটা বিষয় জানার জন্যে বিশেষ একটা ভাষা জানা অপরিহার্য নয়; ২) নিছক একটা ভাষা জানার অর্থ জ্ঞান-অর্জন নয়; ৩) যে কোনো ভাষা হচ্ছে জ্ঞান অর্জনের একটি মাধ্যম মাত্র এবং ৪) পৃথিবীর যে কোনো ভাষায় জ্ঞান অর্জন সম্ভব।

সাধারণ শিক্ষার ক্ষেত্রে একাধিক ভাষা-মাধ্যম প্রশ্রয় দেবার বা বিজাতীয় ইংরেজি মাধ্যম চাপিয়ে দেবার যে অপসংস্কৃতিতে সায় দিয়েছিলেন আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্ম ভার্চুয়াল বা আরশিক শিক্ষার ক্ষেত্রে সেই একই ভুল যেন আমরা না করি।

শিশির ভট্টাচার্য্যঅধ্যাপক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Responses -- “উচিৎ শিক্ষা-৭: গণশিক্ষার ‘আরশিনগর’”

  1. SHAH ALAM MASTER

    আমি জাপানের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যাবস্থা সম্পর্কে জানতে চাই ৷ আমি ব্যক্তিগত উদ্যোগে
    জাপানের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যাবস্থা আমার স্কুলে চালু করতে আগ্রহী ৷ হ্যাঁ, ১২ বসর যাবৎ
    আমি আমার স্কুলটি পরিচালনা করছি ৷ স্কুলটির নাম, “গ্রামীণ কেজি এন্ড ডে-কেয়র সিস্টেম” ৷ যে কেউ এ ব্যাপারে তথ্য দিয়ে সাহায্য করুন ৷ আমি কৃতজ্ঞ থাকবো ৷
    ধন্যবাদ ৷

    Reply
  2. বাসার

    প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সবার কথা জানিনা, কিন্তু দুটি সন্তান থাকা সত্ত্বেও সকাল ৯ টার মধ্যে স্কুলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন, আর সারে ৪ টায় বা ৫ টায় ফিরে আসেন আমার স্ত্রী। ৮ বছরে নির্ধারিত ছুটি ছাড়া আটদিন ব্যাতিক্রম দেখেছি বলে মনে করতে পারছি না। জিজ্ঞেস করে জানতে পেরেছি ৫/৬ টি ক্লাস নিতে হয়। শুক্রবারেও বিভিন্ন কার্যক্রম। বছরের পর বছর চলছে আর সে ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। অমানবিক নির্যাতনের শিকার রাষ্ট্র যন্ত্রের দ্বারা। টাকা না দিলে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধিও হয়না।

    Reply
  3. Qudrate Khoda

    Very interesting, thought-provoking, and informative article as usual by Dr. Shishir.

    However, as far as I know DU has a separate institute called Institute of Education and Research (IER), which is dedicated for the development of education and research as the title tells us.

    What are the teachers/researchers of IER of DU and other institutions in the field of Education Studies doing, I wonder?
    Ideally, are not they the ones who should be writing more on education than the teachers of the linguistics? We rarely see any articles from them!

    Reply
  4. সৈয়দ আলি

    মাঝে মাঝে মাস্টারেরা বাঁচার মতো বেতন ভাতা চাইলে পুলিশ পেটাই করতে হবে।

    Reply
  5. সিকদার তাহের আহমদ

    সহমত।
    প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন-কাঠামোর উন্নয়ন করা দরকার। পাশাপাশি অবশ্যই তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। থানা কিংবা জেলা পর্যায়ে ষাণ্মাসিক কিংবা বাৎসরিক পর্যালোচনা সভার ব্যবস্থা এবং আন্তরিকভাবে এসবের দেখাশোনা করা হলে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়া শুরু হবে। তবে, রাতারাতি উন্নতি আশা করাটা ঠিক হবে না, ভোটের জন্য দুই-থেকে পাঁচ বছরের মধ্যেও চোখ-ধাঁধানো উন্নতির আশা করাটাও ঠিক হবে না। কিন্তু, একটু লম্বা সময় পরে এসবের সুফল আসতে থাকবে। তুলনামূলকভাবে যোগ্য ও মেধাবী ব্যক্তিরা এসব পেশায় আসবেন এবং ছাত্রদের উপরও দীর্ঘমেয়াদে সুপ্রভাব পড়বে।

    Reply

Leave a Reply to সৈয়দ আলি Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—