Feature Img

saimum-f১৪ জানুয়ারি ২০১১ মাত্র আটাশ দিনের ক্রমাগত প্রতিবাদ, মিছিল, সমাবেশের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান ২৩ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট বেন আলি। এর মাসখানেক পরে, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১১, তিরিশ বছরের শাসনের অবসান ঘটে মিশরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের। এবার সময় লাগে আরো কম, মাত্র আঠারো দিন। এভাবে আরব বিশ্ব এক নতুন ইতিহাস গড়তে চলেছে। যে মাত্রা ও গতিতে আরব বিশ্বে পরিবর্তন এসেছে এবং হয়তো সামনের দিনগুলোতে আরো আসবে তা আগে থেকে কেউই অনুমান করতে পারেনি। নতুন এ ইতিহাসকে তাই বুঝতে ও ব্যাখ্যা করতে সময় প্রয়োজন। বিশেষ করে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বিশ্লেষণের জন্য যে স্থিতি দরকার, সে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে বলে অনেকেই মনে করছেন।

ডিসেম্বর ২০১০ এ শুরু হওয়া প্রতিবাদ, সমাবেশ, ধর্মঘট আর মিছিলের ঢেউ বৃহত্তর আরবের প্রায় সব দেশকেই ছুঁয়ে গিয়েছিল। এই বিপ্লবের ফলে তিউনিসিয়া, মিশর, লিবিয়া, ইয়েমেনের শাসকগোষ্ঠীকে ক্ষমতা থেকে সরে আসতে হয়েছে, আলজেরিয়া, ইরাক, জর্দান, কুয়েত, মরক্কো ও ওমানকে বড় ধরণের প্রতিবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে লেবানন, মৌরিতানিয়া, সৌদি আরব, সুদান এবং পশ্চিম সাহারায় এর মাত্রা খুব একটা বেশি ছিলনা। এসব প্রতিবাদের মূল ধরণটা ছিলো নাগরিক প্রতিরোধমূলক। ফেসবুক, টুইটারের মত সামাজিক মিডিয়া, বিভিন্ন ওয়েবসাইট, গ্রুপ ই-মেইল, ইউটিউব, মোবাইলের টেক্সট ম্যাসেজ ইত্যাদিকে ব্যবহার করে মূলত তরুণ ও যুবকরা জমায়েত, ধর্মঘট, সমাবেশ, মিছিল, মার্চ, র‌্যালির মাধ্যমেই এই আন্দোলন পরিচালিত করে। অনেকেই মনে করছেন, আরব বসন্তের আন্দোলন পরিচালনা, সংগঠন, যোগাযোগরক্ষা এবং সচেতনতা তৈরিতে ইন্টারনেট সেন্সরশিপ ও নিয়ন্ত্রন সত্ত্বেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো একটা বড় ধরণের ভূমিকা রেখেছে। এ কারণে এ বিপ্লবকে ‘টুইটার বিপ্লব’ বা ‘ফেসবুক অভ্যুত্থান’ ও বলার চেষ্টা করেছেন কেউ কেউ। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ভূমিকা আসলেই এ বিপ্লবের জন্য কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ তা তর্কের বিষয়। এ বিষয়ে আলোচনার আগে আমরা আরব বসন্তের উল্লেখযোগ্য ঘটনাপ্রবাহের দিকে একটু নজর দেই।

উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ঘটে যাওয়া এই আন্দোলনকে আরব বসন্ত, আরব জাগরণ, আরব বিপ্লব, আরব উত্থান ইত্যাদি নানা নামে ডাকা হচ্ছে যদিও এই বিপ্লবে অংশগ্রহণকারীরা সবাই যে আরব তা কিন্তু নয়। বার্বার, কুর্দী ইত্যাদি নানা সংখ্যালঘু গোত্রের সদস্যরাও এ আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহন করে। ঘটনার সূত্রপাত হয় ১৮ ডিসেম্বর ২০১০ এ, যেদিন তিউনিসিয়ার ফলবিক্রেতা মুহাম্মদ বুয়াজিজি দুর্নীতি আর বেকারত্ত্বের জীবনে ক্ষুব্ধ হয়ে নিজের গায়ে গ্যাসোলিন ঢেলে আগুন দেন। যদিও এ ধরণের আত্মাহুতি নতুন কোন ঘটনা নয়, (তিব্বতী ভিক্ষুরা চীনের শাসনের প্রতিবাদে অনেকেই এভাবে প্রাণ দিয়েছেন) কিন্তু তিউনিসিয়ার জনগণের পুষে রাখা অসন্তোষের বারুদ তাকে একটি ভিন্ন মাত্রা দেয়। এই আগুনের আঁচ তিউনিসিয়া ছাড়িয়ে আলজেরিয়া, জর্দান, মিশর এবং ইয়েমেন, পরবর্তীতে অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক দশক ধরে গড়ে উঠf শাসনযন্ত্র তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়ে। তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট বেন আলি পালিয়ে যান সৌদি আরবে। অবসান হয় মিশরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক যুগের। ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১২তে ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট আলি আব্দুল্লাহ সালেহ তার উত্তরসূরীর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। সুদান, ইরাক বা জর্দানের রাষ্ট্রপ্রধানরাও শিগগিরই ক্ষমতা হস্তান্তর বা আবার নির্বাচন না করার অঙ্গিকার করে আন্দোলন প্রশমিত করার চেষ্টা চালান। তবে লিবিয়ার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল কিছুটা ভিন্ন। তিউনিসিয়া বা মিশরের মত এখানেও মুয়াম্মার গাদ্দাফি দীর্ঘকাল ধরে শাসন চালিয়ে আসছিলেন, সে হিসেবে লিবিয়ার অনেকেই হয়তো পরিবর্তন চেয়েছিলেন, কিন্তু যেভাবে পরিবর্তন এসেছে তাকে কোনভাবেই গণতন্ত্রের পথে সঠিক যাত্রা বলা ঠিক হবে না। পশ্চিমারা সরাসরি বোমাবর্ষণ ও মদদপুষ্ট বিদ্রোহীদের সশস্ত্র করে তুলে গাদ্দাফি যুগের অবসান ঘটায়। শুধু লিবিয়ায় মারা যান ২৫ থেকে ৩০ হাজারের মত মানুষ।(১) বিচিত্র চরিত্রের অথচ আরব বিশ্বে জনপ্রিয় এই নেতাকে ২০ অক্টোবর ২০১১ নিজ শহর সির্তে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।

আরব বসন্তের পেছনে নানা কারণই দায়ী। দীর্ঘকালীন স্বৈরতন্ত্র, রাজতন্ত্র, মানবাধিকার লঙ্ঘন, সরকারী দুর্নীতি, অর্থনৈতিক মন্দা, বেকারত্ব, চরম দারিদ্র ইত্যাদি বিপ্লবের পটভূমি তৈরিতে সাহায্য করেছে। বিশেষ করে শিক্ষিত বেকার যুবকদের অসন্তোষ এই বিপ্লবের পেছনে একটি চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আরব বিশ্বের এসব দেশের দুর্নীতি সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিক নথি ফাঁসকে এই বিপ্লবের পেছনে একটি অন্যতম প্রভাবক হিসেবে বিবেচনা করে। তবে উইকিলিকসের পাশাপাশি ফেসবুক বা টুইটারের মত সামাজিক মাধ্যমগুলো এসব আন্দোলনকে কতটুকু বেগবান করেছে, আন্দোলনের নতুন কোন ধারার সূচনা করেছে কিনা তা ভেবে দেখার মত বিষয়।

আরব দেশগুলোতে টেলিযোগাযোগ খাত বেসরকারী করার ফলে বেশির ভাগ সময়ই শাসনক্ষমতায় থাকা স্বৈরতন্ত্র বা রাজতন্ত্রের কাছের পরিবারগুলোই লাভবান হয়েছে। কিন্তু টেলিযোগাযোগের সহজলভ্যতা এসব সমাজে মানুষকে কাছাকাছি এনে দিয়েছে। এমনকি উন্নত দেশগুলোর জোট ওইসিডি অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোতে যখন ২০০৫ এ গড়ে প্রতি ১০০০ জনে ৭৮৫ জন মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী ছিল সেখানে কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে ছিলো গড়ে ৮০০ জনেরও উপরে। তিউনিসিয়া, মিশর বা সিরিয়ার মত দেশগুলোতে এ হার এত বেশি না হলেও তা ছিল উন্নত দেশগুলোর কাছাকাছি। বিশেষ করে তরুন প্রজন্মের ইন্টারনেটের প্রতি যে আকর্ষণ তা তাদের অনুভূতি ও মতামত প্রকাশের একটা পছন্দের জায়গা হয়ে দাঁড়ায়। ২০০৯ এ তিউনিসিয়ার পুরো জনসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগই ছিলেন ইন্টারনেটের সাথে সংযুক্ত।(২) এর মধ্যে প্রতি ৬ জন তিউনিসিয়ানের মধ্যে একজনই ছিলেন ফেসবুকের সাথে যুক্ত। মিশরেও ৮০ মিলিয়ন জনসংখ্যার মধ্যে ২৫ মিলিয়নই ইন্টারনেট ব্যবহার করে থাকে।(৩) আরব বিশ্বে সাইবার ক্যাফে শুধু ইন্টারনেট ব্যবহার করার জায়গা নয়, অথবা বাংলাদেশের মত ছোট ছোট খুপরি নয়, সমমনাদের মধ্যে আলোচনা ও প্রতিবাদের জন্য একত্রিত হবার সুযোগ তৈরি হয় এখানে। আরব বিশ্বের আড্ডার সংস্কৃতি অবশ্য বহু পুরনো। এখানকার শত বছরের পুরনো ক্যাফে ও রেস্তোরাগুলোতে একত্রে বসে স্যাটেলাইট চ্যানেলে অনুষ্ঠান দেখার রীতিও রয়েছে।

তবে সামাজিক মিডিয়া বা স্যাটেলাইট চ্যানেলের মাধ্যমে সরকারবিরোধী মতামত যেন তৈরি না হয় সেটা নিশ্চিত করতে শাসকরা্ও চুপচাপ বসে ছিলনা। তিউনিসিয়ার সরকার সাইবার ক্যাফে নিয়ন্ত্রন, সামাজিক যোগাযোগ ও ওয়েবসাইট নজরদারি ও প্রয়োজনে বন্ধ করে দেয়ার নীতি গ্রহন করে। একই ধরণের পদক্ষেপ নেয় মিশরের সরকারও। মিশরের আলেক্সান্দ্রিয়ার ২৮ বছর বয়স্ক ব্লগার খালিদ সাইদ ইন্টারনেটে দুই পুলিশের ঘুষের টাকা বন্টনের ভিডিও ফুটেজ আপলোড করেন। ২০১০ এর জুনে একটি সাইবার ক্যাফে থেকে সাইদকে ধরে নিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলে পুলিশ। এ ঘটনায় গোটা মিশর জুড়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠে। ফেসবুকে নতুন গ্রুপ খোলা হয় ‘আমরা সবাই খালিদ সাইদ’ নামে। হাজার হাজার মিশরীয় এই গ্রুপে যোগ দেয়। এর আগে ২০০৬ সালে ওয়াইল আব্বাস ও মালেক মোস্তফা নামের দুই ব্লগার পুলিশ কর্তৃক ধর্ষণের ঘটনার মোবাইলে তোলা ফুটেজ ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিলে তা বেসরকারী টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত হয় এবং পরবর্তীতে অভিযুক্তদের বিচারের সম্মুখিন হতে হয়। এভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করে একত্রিত হবার হাজারো নজির আছে আরব বিশ্বে, বিশেষ করে মিশর ও তিউনিসিয়ায়। ২০০৮ এ ৬ এপ্রিল কায়রোতে টেক্সটাইল শ্রমিকদের ধর্মঘটের সমর্থনে খোলা হয় একটি ফেসবুক গ্রুপ। কিছুদিনের মধ্যেই যার সদস্যসংখ্যা হয়ে দাঁড়ায় ৭০ হাজার।(৪) গঠন করা হয় ‘৬ এপ্রিল কমিটি’, যা পরবর্তীতে মুবারক বিরোধীদের তাহরির স্কয়ারে একত্রিত হবার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করেছিল। তিউনিসিয়াতে আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন, ৬ জানুয়ারি ২০১১, গ্রেফতার ও নির্যাতন করা হয় ব্লগার স্লিম আমানু, আজিজ আমামি, হামাদি কালোশা ও সালেদিন কশেয়ককে। তীব্র প্রতিবাদ ও গণজমায়েতের মুখে পরবর্তীতে তাদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় সরকার। ১৮ জানুয়ারি বেন আলি সরকার পতনের পর মাত্র ৩০ বছর বয়সী তিউনিসিয়ান ব্লগার স্লিম আমানু যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রী হিসেবে অভিষিক্ত হন।

এসব ঘটনাপ্রবাহ ও পরিসংখ্যানের মাধ্যমে এ কথা স্পষ্ট করেই বলা যায় যে আরব বসন্তে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু এ গুরুত্বের পরিমান ও মাত্রা কতটুকু তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। অনেকেই ফেসবুক বা টুইটারকে শুধু বিপ্লবের পথে ব্যবহৃত হওয়া পোস্টার বা ফেস্টুনের মত উপাদান হিসেবে দেখছেন, প্রভাবক বা আন্দোলনের সাংগাঠনিক কাঠামো হিসেবে নয়। এসব সামাজিক মাধ্যম শুধু প্রতিবাদের প্রতিধ্বনী করেছে, প্রতিবাদটুকু আগেই জনগণের মনে তৈরি ছিল। মিথ্যা ও দুর্নীতিকে উন্মোচিত করে ভীতির দেয়ালকে ভেঙে ফেলতে সহায়তা করেছে ইন্টারনেট। ফেসবুক বা টুইটার আন্দোলনকে সম্মেলনের শক্তি দিয়েছে, কিন্তু এই আন্দোলন হঠাত করে গজিয়ে উঠেনি। বেশ কয়েক বছর ধরে বিরোধী দল এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এসব দেশে, বিশেষ করে তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া ও মিশরে সক্রিয় ছিল। গত তিন বছর ধরে তিউনিসিয়ায় ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন চলে। শুধু ২০১০ সালেই আলজেরিয়া জুড়ে ৯৭০০ দাঙ্গা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে।(৫) দুর্নীতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত এসব আন্দোলনের বিষয় ছিল। একইভাবে মিশরেও গত কয়েক বছর ধরেই বিপ্লবের প্রস্তুতি চলছিল। ২০০৪ থেকে ছোট বড় ৩ হাজারটি শ্রমিক আন্দোলন হয়েছিল মিশরে। তবে এ আন্দোলনে ফেসবুক বা টুইটারের গুরুত্বকে অন্যসব কিছুর চাইতে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখার লোকেরও অভাব নেই। আরব বসন্তকে বলা হচ্ছে ‘টুইটার রেভ্যুলেশন’। ফেসবুক যদি একটি দেশ হতো, তবে ব্যবহারকারীর সংখ্যা অনুযায়ী এর নাগরিকের সংখ্যা হতো আশি কো্টি। পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম দেশ হতো এটি। ফেসবুক ছাড়াও টুইটারের মত প্রভাবশালী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোরও রয়েছে কয়েক কোটি ব্যবহারকারী। সংখ্যার এই বিশালত্ব এর প্রভাবকে স্পষ্ট করে তোলে। তাছাড়া উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে প্রতিবেশি দক্ষিন ককেসাস অঞ্চলের আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, জর্জিয়া, ইউরোপের আলবেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, স্পেন, সাব সাহারান অঞ্চলের বারকিনা ফাসো, জিবুতি, উগান্ডা এবং মালদ্বীপ ও চীনেও আরব বসন্তের প্রভাবে সামাজিক মিডিয়া ব্যবহার করে আন্দোলন সংগঠিত করা হয়। ২০১১ এর অক্টোবরে বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও ‘ওয়াল স্ট্রিট দখল করো’ আন্দোলনেও আরব বসন্তের প্রত্যক্ষ প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ব্যানারে, ফেস্টুনে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের প্রশ্ন করে আয়োজকরা,‘আপনি কি আরেকটি তাহরির মুহুর্তের জন্য প্রস্তুত?’ বিশ্বজুড়ে কর্পোরেট শক্তি ও তাদের নিয়ন্ত্রনের বিরুদ্ধে আরব বসন্তের কৌশল অবলম্বন ছিলো এই আন্দোলনের অন্যতম মূলমন্ত্র। ২০১২ সালের প্রথম দিনে তেল সমৃদ্ধ নাইজেরিয়াতে তেলের দাম নিয়ে অসংগতি নির্মূলে ‘নাইজেরিয়া দখল কর’ আন্দোলনের পেছনেও কাজ করেছে আরব বসন্তের অনুপ্রেরণা।

তবে খোদ আরব দেশগুলোতে আরব বসন্ত শেষে যে ফুল ফুটেছে তা জনগণের জন্য কতটুকু সৌরভ বয়ে নিয়ে আসবে তা দেখার বিষয়। এসব দেশের তরুণ আন্দোলনকারীরা তাদের চিন্তা, ধারণা, কৌশল পরষ্পরের সাথে লেনদেন করছে, একে অপরকে নীতিগত সমর্থন দিয়েছে, এই অর্থে তাদের মধ্যে একধরণের মিল খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু তারা ভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী ও ভিন্ন পরিস্থিতির মোকাবেলা করছে। তাই আরব বসন্তের ছাতার তলে সব দেশের জন্য একই ধরণের ফলাফল আশা করা ভুল হবে। আন্দোলনের কৌশলে মিল থাকলেও ফলাফল নির্ভর করবে দেশগুলোর অতীত ইতিহাস, বর্তমান সমস্যার প্রকৃতি ও সমস্যা সমাধানে তারা কি ধরণের পদক্ষেপ নিচ্ছে তার উপর।

তথ্যসূত্র:

১Laub, Karin, “Libyan estimate: At least 30,000 died in the war”. San Francisco Chronicle, Associated Press

২http://www.internetworldstats.com/af/tn.htm

৩ http://www.carnegieendowment.org/arb/?fa=downloadArticlePDF&article=20495

৪Filiu, Jean Pierre, ‘The Arab Revolution: Ten Lessons from the Democratic Uprising’, Hurst & Company, London

৫ প্রাগুক্ত

সাইমুম পারভেজ: প্রভাষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

One Response -- “আরব বসন্ত ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম”

  1. শাওন

    আরব বসন্ত তাদের জন্য তখনি কার্যকর হবে যখন তারা বৈদেশিক নিয়ন্ত্রন ও দুর্নীতি মুক্ত সরকার গঠন করতে সমর্থ হবে। ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো এখানে সাংগঠনিক ভুমিকা পালন করেছে বলে মনে হয়। আন্দোলনকে ছড়িয়ে দেয়ায়, ছোট একটা ইস্যু হটাত বিশাল আন্দোলনের কারন হিসেবে উপস্থাপন করা অন্যথায় সম্ভব ছিল না। জনগণের নীরব বিরক্তি, আর কোণঠাসা অবস্থান থেকে সরব আন্দোলনে তুলে আনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মুখ্য ভুমিকাই পালন করেছে, তবে এটা মানতে হবে যে তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা এক্ষেত্রে বড় একটা ব্যাপার। আবার লিবিয়ার ক্ষেত্রে অসন্তোষকে পুরোপুরি দায়ি করা বোধয় ঠিক হবে না। পশ্চিমা দেশগুলোর সশস্ত্র সহযোগিতা, বোমা বর্ষণ বিদ্রোহীদের অস্ত্র সবরাহ আন্দোলনকে ফাপিয়ে তুলেছে। অনেক নিরপেক্ষ মানুষ অথবা গাদ্দাফি সমর্থক দেশের তৎকালীন যুদ্ধ বিধ্বস্ত অবস্থার অবসানে গাদ্দাফির পতনকেই হয়ত ত্বরিত সমাধান হিসেবে দেখেছিলেন।

    এখন দেখার ব্যাপার আরব বসন্ত তাদের কাঙ্ক্ষিত অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে কি না।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—