Feature Img

showkat-f1আগরতলা মামলা থেকে মুক্তি পাওয়ার পরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী থেকে আমাকে অকাল অবসর দেয়া হয় ক্যাপ্টেন পদে। মামলা প্রত্যাহার এবং চাকরি থেকে অব্যাহতির পর আমি তখন যশোর খুলনার মাঝামাঝি নোয়াপাড়ার রাজঘাটে একটা জুট মিলে কাজ করতাম। জুট মিলের নাম কার্পেটিং জুটমিল। এই কার্পেটিং জুটমিলে আমি প্রশাসনিক কর্মকর্তার চাকরি নিয়ে গিয়েছিলাম ১৯৭০ সালের আগস্ট মাসে। ওখানে চাকরি করতাম। মিলের ভেতরেই থাকতাম। তো আমার সাথে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ, এমপি–এমপি তো তখন না, তখন ছিল এমপিএ। এমপিএ মানে মেম্বার অব দি প্রভিন্সিয়াল অ্যাসেমব্লি। এমপিএ শাহ হাদিউজ্জামান ছিলেন নোয়াপাড়া পীর সাহেবের ছেলে। উনি আওয়ামী লীগের এমপি ছিলেন, উনার সাথে আমার যোগাযোগ ছিল। অনেক আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী আমার সাথে যোগাযোগ রাখত। যশোর থেকে খুলনায় যাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী মুভ করতে না পারে সেজন্য আমরা রেললাইন উঠিয়ে দিয়েছিলাম। গাড়ি চলার রাস্তায় বেরিকেড–মানে রাস্তা ভেঙে ফেলছিলাম। রাস্তা ভেঙে ফেলছিলাম বিভিন্ন জায়গায়–যশোর টু খুলনা। পাকিস্তানিদের ক্যান্টনমেন্ট শুধু যশোরে। ওখান থেকে যশোর, যশোর থেকে খুলনা যাতায়াতের জন্য রেললাইন ছিল আর সড়কপথ ছিল। সড়কপথটা কার্পেটিং জুটমিলের সামনে দিয়েই যায়, এখনো সেভাবে আছে। আর রেলপথ একটু দূরে, আরেকটু পশ্চিমে ছিল রেলপথ । আরেকটা যোগাযোগ মাধ্যম ছিল টেলিফোন লাইন। সেটা অবশ্য আমাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। টেলিফোন লাইনে তারা যোগাযোগ করতে পারে নাই, কারণ তারা নিজস্ব অয়ারলেস ব্যবহার করত। ওই যশোর থেকে খুলনা, এই পুরা রাস্তা-রেললাইন, টেলিফোন লাইন আমাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ওরা পাকিস্তানিরা চেষ্টা করছিল যশোর থেকে খুলনায় মুভ করতে। ওরা ২৬ তারিখে তা করতে পারে নাই। মাঝখানে আমি একবার ঢাকা আসলাম, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করলাম।

এইটা ৭ই মার্চ এবং ২৬শে মার্চের মাঝামাঝি কোনো এক সময়ে, সম্ভবত ১৩ বা ১৪ ই মার্চ। বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করলাম, বঙ্গবন্ধু আমাকে বললেন জেনারেল ওসমানীর সঙ্গে দেখা করতে। জেনারেল ওসমানীর সঙ্গে দেখা করলাম, প্রয়োজনীয় নির্দেশ নিলাম। আমার আরো বন্ধুবান্ধব ছিল, আগরতলা মামলায় যারা আমার সাথে সহ-অভিযুক্ত ছিলেন। ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামান, কর্নেল হুদা– ওদের সাথে দেখা হলো। আমরা নিজেরা কীভাবে যুদ্ধ করব এসব আলোচনা করলাম। আমি আবার যশোরে ফিরে এলাম। শাহ হাদিউজ্জামান আমাকে বলছিলো ফিরে আসতে।

আমরা জুটমিলে টাকা আনতাম খুলনা থেকে। খুলনা মানে খুলনা শহরে, আমাদের টাকা পয়সা ওখানে একটা ব্যাংকে থাকত। তো ২৬ তারিখে বেতন দেয়ার কথা। ওইদিন বেতন নিতে পারলাম না। কারণ ওখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ।

এদিকে শ্রমিকরা বিক্ষোভ করল। আমরা বুঝিয়ে সুঝিয়ে শ্রমিকদের একটু শান্ত করলাম। এর পরে ২৬ তারিখ এভাবেই গেল। ৭ই মার্চের ভাষণটা আমি সরাসরি শুনতে পারি নাই। সরাসরি তা প্রচার হয়্ওনি। পরের দিন প্রচার হয়েছিলো এবং আমি নোয়াপাড়া কার্পেটিং জুটমিলে বসে শুনেছি। তখনই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে যুদ্ধ করতে হবে।

তো একটা বিষয় আমি চিন্তুা করলাম যে আমি যুদ্ধ কোত্থেকে করব? যেখানে আছি সেখান থেকে করব, না বর্ডার পার হয়ে চলে যাব, না আমার নিজের এলাকায় চলে যাব? তো এই চিন্তার মধ্যে আমি ছিলাম। যে কোনো সময় আমাকে ওখান থেকে সরে পরতে হবে। কারণ পাকিস্তানিরা যেকোনো সময় চলে আসতে পারে এবং তা-ই হলো, ২৭ তারিখে তারা চলে আসল, রাস্তাঘাট মেরামত করে তারা চলে আসল। আমি ঘটনাক্রমে তখন বাইরেই ছিলাম। তো ওই সময় ঠিক ১২টা ১টার দিকে আমি একটু বাসায় গেলাম। আমার ছোট ছেলের বয়স তখন আড়াই বছর। ওদের নিয়ে আমি তখন মিল থেকে বেরিয়ে যাব–এরকম একটা চিন্তা করে আমি ভেতরে ঢুকছিলাম। কিন্তু ওখানে ভেতরে ঢুকেই খবর পেলাম পাকিস্তানিরা চারদিক ঘেরাও করছে।

তখন মিলের জেটিতে আমার একটা নৌকা বাঁধা ছিল। আগে থেকেই নৌকাটাকে বেঁধে রেখেছিলাম প্রয়োজনমতো যাতে ওই নৌকায় আমরা বেরিয়ে যেতে পারি। এটা ছিল ভৈরব নদী। ওই নদীর মধ্যে নৌকাটা বাঁধা ছিল। আমি খবর পেয়ে দৌড়ে চলে গেলাম। ছেলেপুলে নিয়ে বেরোবার আর সময় পেলাম না। আমার স্ত্রী, দুই ছেলে, আরো কিছু লোকজন বাসায় রয়ে গেল। আমি দৌড়ে গিয়ে নৌকায় উঠলাম। তো আমি নৌকায় উঠতেই নৌকার মাঝিদের বললাম, নৌকা ছাড়ো। তো বলার সাথে সাথে ওরা নৌকা ছাড়ল।

কিন্তু ততক্ষণে পাকিস্তানি আর্মি জেটিতে চলে আসছে চারিদিক থেকে মিলটাকে ঘেরাও করার জন্য। ওরা যখন জেটিতে আমি তখন ঘাটে, নৌকার ভেতরে। মাঝিদের বললাম, নৌকা ছাড়ো। ওরা চট করে নৌকা ছেড়ে দিল।

পাকিস্তানিরা বুঝতে পারেনি আমি পালাচ্ছি, ওরাতো আসছে আমাকে ধরার জন্য।

ওরা বুঝতে পারেনি আমি পালাচ্ছি, তখন আমি মাঝিদের বললাম তোমরা নৌকার ভিতরে চলে আস, ওরাও নৌকার ভিতরে চলে আসল। বাতাস নৌকাটাকে ওপাড়ে নিয়ে গেল।

আমরা অপর পারে চলে গেলাম। ঐখানে গিয়ে পরিস্থিতি অবলোকন করলাম। মাঝে মাঝে দেখলাম নদীর মধ্যে লোকজন ঝাপিয়ে পড়ছে, আমাদের কলনীতে গোলাগুলি হচ্ছে, পাকিস্তানিরা যাকে পাচ্ছে তাকেই মেরে ফেলছে। আমার স্ত্রী আর দুই পুত্রকে ওরা বন্দি করল।

বললো যে তোমাদেরকে বন্দী করা হল এবং তোমরা এখান থেকে নড়বে না, কোথাও যেতে পারবে না। আমার স্ত্রীর বুকে পিস্তল, ছেলেদের বুকের উপরে পিস্তল–এ ঘটনা আমি পরে শুনেছি। আমিতো আর ছিলাম না, আমার স্ত্রীর কাছে শুনেছি।

এক সময় গোলাগুলি বন্ধ হয়ে গেল। আমি লোকমুখে শুনলাম যে পাকিস্তানিরা চলে গেছে। তখন আমি বড় নৌকাটা ওখানে রেখে ছোট নৌকা নিয়ে আবার মিলের ঘাটে গেলাম।

মিলের মূল ঘাটে না গিয়ে আমি সেখান থেকে আর একটা ঘাটে গেলাম।

আমার স্ত্রীকে ওরা বলে গেছে তোমরা এখান থেকে যাবা না অন্য জায়গায়, তোমরা এইখানেই থাকবা। আমিতো আর এটা জানতাম না, পরে শুনেছি।

নদীর ঘাটে যাওয়ার পরে দারোয়ান দৌড়ে গিয়ে আমার স্ত্রী-পুত্রকে নিয়ে এলো। আমার সবাই তারাতারি এসে একটা ছোট নৌকায় উঠল। রাত্রে ওখানে কোন এক বাড়ীতে গিয়ে থেকেছি, খেয়েছি।

এরপর আমাদের পরিকল্পনা হচ্ছে আমি আমার এলাকায় যাব, আমার দেশের বাড়ীতে যাব। আমার গ্রামের বাড়ি শরিয়তপুর জেলায়।

তখন বাড়িতে গিয়ে আমার স্ত্রী-পুত্রকে রেখে এলাম। এদিকে ঐ জুট মিলে পাকিস্তানিরা ফিরে এসে যখন দেখে যে আমার স্ত্রী-পুত্র নেই; পালিয়েছে, তখন একজন দাড়োয়ানকে ওরা মেরে ফেলে। আমার প্রতিবেশী একজন ভদ্রলোক তার নাম আঃ লতিফ, জুট মিলের এক অফিসার ছিলেন। ওখানে বিহারী ছিল অনেক। বিহারীরা বললে যে আমাদের সাথে খুব ভাল সম্পর্ক লতিফ নামে একজন অফিসারের। এই কারণে তাকে ওরা পরে মেরে ফেলেছে।

এদিকে মাদারীপুরে আমরা হেড কোয়ার্টার করলাম| মাদারীপুরের আ্ওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ এবং নৌমন্ত্রী সাজাহান খানের পিতা তৎকালীন মাদারীপুর জেলা আ্ওয়ামী লীগের সভাপতি আসমত আলী খান মাদারীপুরে। তারা আমাকে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব দিলেন| তখন আমি চারিদিকের খোঁজখবর নিয়ে ছেলেপেলেদের খবর দিয়ে মাদারীপুর কলেজ মাঠে ট্রেনিং ক্যাম্প করলাম। এদিকে আমি খবর পেলাম যে আমার বন্ধু খালেদ মোশারফ জি ফোর ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক। অধিনায়ক মানে উনি সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন।

সিদ্ধান্ত নিলাম আমি তার সাথে দেখা করব, অস্ত্র-শস্ত্র যোগাড় করব, ছেলেদের আরও উন্নত ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য।

সেই লক্ষ্যে আমি একটা লঞ্চে উঠে চাঁনপুর হয়ে এবং পরে ঐখান থেকে ফেনি হয়ে ভারতে গেলাম। সেটা এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের ঘটনা। ভারতে গিয়ে জেঃ ওসমানীর সাথে দেখা হল, তার সাথে কথাবার্তা বললাম। আমাদের মাদারীপুর মহকুমা তখন তার অধীনে ছিলো। কিছু অস্ত্র নিয়ে, গোলাবারুদ নিয়ে আমি আবার মাদারীপুর ফিরে আসলাম।

কর্নেল (অবঃ) শওকত আলী: জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার।

Responses -- “যেভাবে পালিয়ে যুদ্ধে গেলাম”

  1. Ratan Roy

    আপনি আমাদের দেশের একজন মহান যোদ্ধা। আপনাকে শ্রদ্ধা করি। আপনার লেখা সবার পড়া উচিত।

    Reply
  2. Anwar

    এখানে কি শুধু লিখার পক্ষে জিন্দাবাদ দিলেই গৃহীত হয়? মেইল এড্রেস আপনাদের খেদমতে রইলো, দয়া করে জ্ঞান দিবেন যে সমালোচনা কাকে বলে? দামী লোকেরা মিথ্যা বললেও গ্রহণ করবেন আর কোনটা মিথ্যা তা ধরিয়ে দিলে গ্রহণ করবেন না, তা কী করে হয়?

    Reply
  3. Tabin

    লিডার,
    গল্পটা পড়ে ভাল লাগল। তবে ভাষার গঠন “কারাগারের ডায়েরীর” মত মনে হইনি। হয়ত ব্যস্ত থাকায় খুব তাড়াহুড়ার মধ্যে লিখেছেন।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—