রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যতটা কবি তারচেয়ে তিনি অনেক বড় পণ্ডিত ও দার্শনিক। শিক্ষিত বাঙালির ভাবমানসই কেবল তিনি নির্মাণ করেননি, তাদের সত্যিকার অর্থে বাঙালি করেছেন, শুদ্ধ ও পরিশীলিত বাংলায় কথা বলতে শিখিয়েছেন, বাংলা গদ্যরীতিতে তিনি অসামান্য পরিবর্তন এনেছেন।

তিনি যেমন বহু বাংলা শব্দ নির্মাণ করেছেন, তেমনি তার প্রয়োগরীতি উদ্ভাবন করেছেন। তিনিই ‘বাঙ্গলা’ ও ‘বাঙ্গাল’– চারমাত্রার বানান দুটো বর্জন করতে বলেছেন। তবে ভাষা ব্যবহার এবং জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে তিনি পান্ডিত্যের চেয়ে রচনার প্রসাদগুণ, তার গ্রহণযোগ্যতা– সামগ্রিক সত্যনিষ্ঠা ও সততা বেশি মূল্য দিয়েছেন।

অহংবোধ যে তিনি সবসময় অতিক্রম করতে পেরেছেন, এমন নয়। তাই প্রকাশক তাঁর শব্দের বানান সম্পর্কে প্রশ্ন তুললে তিনি বলেছেন:

“ওটাই থাকবে।”

আবার প্রদোষ শব্দ নিয়ে বিতন্ডা হলে তিনি অতিবিনয়ের সঙ্গে বলেন:

“অজ্ঞতা ও অনবধানতায় স্বকৃত ও অন্যকৃত দোষে অনেক ভুল আমার লেখায় থেকে গেছে। মেনে নিতে কখনো কুণ্ঠিত হইনে। পান্ডিত্যের অভাব এবং অন্য অনেক ক্রটি সত্ত্বেও সমাদরের যোগ্য যদি কোন গুণ আমার রচনায় উদবৃত্ত থাকে তবে সেইটের পরেই আমার একমাত্র ভরসা, নির্ভুলতার পরে নয়।”

রবীন্দ্রনাথ সেই ব্যক্তি যিনি বাংলার বাঙালিকে আত্মপরিচয়ের সন্ধান দিয়েও জাতীয় সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে বহুজাতিক স্রোতধারায় নিজেকে বিলীন করতে সচেষ্ট হয়েছেন। সে অর্থে তিনি পরিপূর্ণভাবে আন্তর্জাতিক।

তিনি যেমন টলস্টয়ের সঙ্গে সেতুবন্ধন স্থাপন করেছেন, তেমনি আর্জেন্টিনার ওকাম্পোকে আপন করে নিয়েছেন, কিংবা ওকাম্পো কবিগুণে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে হৃদয়ে স্থান করে দিয়েছিলেন। তিনি যেমন এজরা পাউন্ড, ইয়েটস ও রদেনস্টেইন এবং টি. এস. ইলিয়টের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ স্থাপন করেছেন, তেমনি মুলার এবং আইনস্টাইনের সঙ্গে বিজ্ঞান, দর্শন, সমাজতত্ত্ব, রাষ্ট্রভাবনা এবং সভ্যতার সংকট নিয়ে কথকতায় ডুবে গেছেন।

বাংলার কবি শ্রী অক্ষয়চন্দ্র যখন কবি বিদ্যাপতিকে সমকালীন সাহিত্যের সমান্তরালে আনতে চেয়েছেন বা তার শ্লোকের গূঢ় ব্যাখ্যা উপস্থাপন করতে চেয়েছেন, সেসময়, রবীন্দ্রনাথ চর্যাপদ এবং মধ্যযুগের সাহিত্য আত্মস্থ করে নিয়েছেন। বিদ্যাপতি, শ্রীজয়দেব, চন্ডীদাস, গোবিন্দদাস রচিত বৈষ্ণব পদাবলীর ভাব, ভাবনা, শব্দ, সুর অনেক বাক্য উচ্চারিত হয়েছে কবি রবীন্দ্রনাথের কবিতায়। ‘পাসরি’ (ভুলে যাওয়া) শব্দটি রবীন্দ্রনাথের গান ছাড়া কেবল বৈষ্ণব পদাবলীতে পেয়েছি। যেমন পেয়েছি ‘পেখলুঁ’ (দেখলুম) শব্দটি।

পদাবলী ও প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্য, বিশেষ করে কালিদাস রচনা এবং তামিল সাহিত্যে প্রকাশিত প্রেম, বিরহ, অভিসার, আকুলতা, মান, আক্ষেপ, প্রতীক্ষা এবং সার্বিক নিবেদন রবিন্দ্রনাথের নানা কবিতায় নানা আঙ্গিকে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর কবিতা ও দর্শনে বৈষ্ণববাদ, চৈতন্যচিন্তা, সুফিবাদ এবং লালনসহ আঞ্চলিক গীত কবিতার ভাব ও দর্শনের প্রভাব প্রবল।

সর্বোপরি তাঁর রচনায় রয়েছে ভগবদ্গীতা এবং নানা বেদের নানা মুনির দর্শন ও চিন্তার প্রকাশ। তিনি নানা ধর্মচিন্তা, আধুনিক দর্শন এবং প্রাচ্যের মুনি-ঋষিদের ভাবনা অপূর্বভাবে সমন্বিত করেছেন। একইসঙ্গে তিনি পাঠ করেছেন রক্ষণশীল বৈদিক পন্ডিত শান্ডিল্য ও আত্মনবাদী উদ্দালককে। সংস্কৃত বৈয়াকরণিক পাণিনির ‘অষ্টাধ্যায়ী’ সম্ভবত তিনি আত্মস্থ করেছিলেন।

তিনি যেমন বাঙালিকে বাংলা শিখিয়েছেন তেমনি, নতুন শব্দ এবং ভাবনাচিন্তার সন্ধান দিয়েছেন। কবিতা, নাটক ও গানে তিনি প্রচলিত ধারা এবং পাশ্চাত্য রীতির সমন্বয় করেছেন।

মাটির গান, ঘাটের গান, আখড়ার গান, নৈবদ্যের গান, প্রার্থনা, মন্ত্র, স্তোত্র, দেশের গান, বিদেশের গান, বিশেষ করে আইরিশ গান ও নৃত্য, মনিপুরি নৃত্য, ওডিসা নৃত্য, পাহাড়ের নৃত্য, সমতলের নৃত্য, ধ্রুপদ সংগীত এবং সনাতন মন্দিরনৃত্য– সবকিছুর মধ্যে অপূর্ব সমন্বয় করেছেন রবীন্দ্রনাথ।

তিনি যেমন ‘Inverted’-কে ‘অন্তঃপাতিত’ বলেছেন, ‘Permission’-কে ‘অনুজ্ঞা’, ‘Association’-কে ‘অনুষদ’ বলেছেন, তেমনি ‘Caste’-কে ‘জাত’, ‘Race’-কে ‘জাতি’, ‘Nation’-কে ‘রাষ্ট্রজাতি’, ‘People’-কে ‘জনসমূহ’, ‘Population’-কে ‘প্রজন’ বলেছেন।

কাজ ও জ্ঞান চর্চার মাধ্যমে তিনি জ্ঞান ও মহিমাতে (Sublimity) ডুবে যান। তারপরও তিনি যখন ‘Apathy’-এর বাংলা করেন ‘অনীহা’ তখন কিছুটা আপত্তি জেগে উঠে। ‘Caste’-কে ‘বর্ণ’, ‘শ্রেণিবর্ণ’ বা ‘সম্প্রদায়’ বললে হয়তো ভালো হত।

এরপরও রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথই। তাঁর সমাজ ভাবনা এত বিশাল ও আন্তরিক ছিল যে, তাঁর সঙ্গে বিশ্বের কোনো কবি বা সাহিত্যিকের তুলনা হয় না। তিনি দেশ ও জাতির ভাবমানস পরিবর্তন করে গেছেন। তিনি কেবল ভাবিত হয়ে এবং ভাব প্রকাশ করে ক্ষান্ত হননি। তাঁর মানবকল্যাণ ধারণার সার্থক প্রকাশ হল ‘কালিগ্রাম সমবায় ব্যাংক’ এবং পতিসরে ‘আধুনিক চাষে’র প্রচলন। তিনি নারী ও মানবতার মুক্তির সঙ্গে সঙ্গেতাদের শিক্ষার জন্য কাজ করেছেন। তিনি বাংলার যে রূপ দেখেছেন, যে দৈন্যদশা দেখেছেন, রোগে-শোকে কাতর কৃষক, রুগ্ন শিশু ও ব্যথাক্লিষ্ট প্রাণীদের দেখেছেন, তেমন করে কজন এই দেশ, দেশের ব্রাত্যজন ও গণমানুষকে দেখেছেন, সে বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ নিজে তাঁর নানা ধরনের রচনায় রসের অনির্বচনীয়তা নিয়ে কাজ করার কথা বলেছেন। সেই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেছেন:

“যুগে যুগে রসের স্বাদ সমান থাকে না।”

এ কথাটি তাঁর অনেক গল্পের ক্ষেত্রে প্রয়োজ্য হলেও গীতনাট্যের ক্ষেত্রে নয়; গানের বেলায় তো একেবারেই নয়। রবীন্দ্রনাথের গান নিঃসন্দেহে তাঁর শ্রেষ্ঠ অবিনাশী কীর্তি।

বাংলা ভাষায় তাঁর অবদান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বুদ্ধদেব বসুর ভাষায় বলতে হয়:

“আমাদের ভাষায় যিনি কবিগুরু এবং যার সমকক্ষ কবি আবহমান ভারতে নেই, তিনিই আমাদের গদ্যরীতির স্রষ্টা।”

বিদ্যাসাগর ও বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতি অসীম শ্রদ্ধা রেখেই এ কথাটা বলতে হবে। তবে রবীন্দ্রনাথের কবিতার ক্ষেত্রে হয়তো কিছুটা শূন্যতা রয়েছে। কবিতার ভাব ও কথা থেকে বেরিয়ে ভিন্ন মায়াজাল সৃষ্টি করে সর্বজনগ্রাহ্য কালজয়ী কাব্যভূমি নির্মাণে তিনি যেন দ্বিধান্বিত ছিলেন।

T. S. Eliot রচিত ‘The Waste Land’ অথবা ‘Little Gidding’-এ উল্লেখিত:

“Ash on an old man’s sleeve
Is all the ash the burnt roses leave
Dust in the air suspended
Marks the place where a story ended.
Dust inbreathed was a house…
The death of hope and despair
This is the death of air.”

চরণগুলোতে জীবন অথবা মৃত্যুর যে ঘ্রাণ তা বিশ্বকবিদের ভাবনার ব্যাপ্তি ও গভীরতা প্রকাশ করে। যখন W.B. Yeats তাঁর ‘Easter 1916’-এ বলেন:

“Too long a sacrifice
Can make a stone of the heart.

To murmur name upon name,
As a mother names her child
When sleep at last has come
On limbs that had run wild.
What is it but nightfall?
No, no, not night but death;
Was it needless death after all?”

তখন বিশ্ব কবিতার আন্তর্জাতিক মান সম্পর্কে ধারণা পাই। এই অর্থে কবি তাঁর বোধ ও ভাবনা কাব্য রচনায় প্রয়োগ করেছিলেন কি না তা গবেষণার বিষয়।

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, নাটক ও চিত্রকলাসহ সংস্কৃতির সব ভুবনে সমভাবে পদচারণা করেছেন। তাঁর চিত্রকলা নানা বিচারে মনে হয়েছে অস্থির কবির সমুদ্রসম হৃদয়ের অন্তর্নীহিত চিত্র। তাঁর আত্মপ্রতিকৃতি বা চারকল এচিং কবির মনোজগতের গভীরে প্রোথিত আরেক অধ্যায় উম্মোচন করেছে। তাঁর ‘বাংলার ব্যাঘ্র চিত্র’ যাতে কিনা ক্ষীণকায়, রুগ্ন, ভগ্ন একটি ব্যাঘ্র উপস্থাপিত হয়েছে তা তাঁর জীবপ্রেম ও অনুকম্পা, না তাঁর নিজস্ব রীতি বা দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছে তা দেখার বিষয়।

এসব কিছুর পরও রবীন্দ্রনাথ আমাদের প্রাণের ঠাকুর। তাঁর চিত্রে রয়েছে এক ধরনের দ্বৈতসত্ত্বা ও পরাবাস্তববাদ। পিকাসোর জীবনে যুদ্ধ ও নারী যেমন বিপ্লব এনেছিল তেমন অভিজ্ঞতার মাঝে রবীন্দ্রনাথ প্রবেশ করেননি। তিনি রীতি অনুসারী বা রীতিভাঙা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আঁকিয়ে ছিলেন না। এ আলোকে রবীন্দ্রনাথের শিল্পকর্ম ও চিত্রকলা বিচার করা প্রয়োজন।

রবীন্দ্রনাথের বিশ্বদর্শন, সহমর্মিতা, সহনশীলতা, বোধ ও মানবতা সাত্যিকার অর্থে অন্তরে ধারণ করতে পারলেই তাঁকে পাঠ করা সম্ভব।

প্রাচ্যের ভাববাদী দর্শন তথা ধর্মভিত্তিক দর্শন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আপন করে নিয়েছিলেন। বৈদান্তিক দর্শনের সঙ্গে জৈনবাদ এবং সর্ববাদী ধর্ম ও দর্শন তথা সুফিবাদ ও বৈষ্ণববাদের মিশেল তৈরি করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এই দর্শনের সঙ্গে একত্ববাদের সমন্বিত ধারাকে মূল্য দিয়ে তিনি হাফিজ ও খৈয়াম পাঠ করেছেন। তাঁর পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন ব্রহ্মধর্মের অন্যতম প্রচারক ও সংঘটক ছিলেন, তেমনি হাফিজ ও অন্যান্য সুফি সাধকদের ভক্ত ছিলেন। এর একটা প্রভাব ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ওপর। পূর্ববঙ্গের বাউল গীতসহ মন্দিরে মন্দিরে চর্চিত আরাধনা সংগীতগুলো একটি বড় ছাপ রেখেছিল রবীন্দ্রনাথের ওপর। ভাববাদের বাইরে ‘চার্চ ক্যারল’ কান্ট্রি গান ও আইরিশ গানেরও প্রভাব রয়েছে তাঁর গানের মাঝে।

সুফি সংগীত ও বাউল সংগীতের mysticism-এর সঙ্গে মন্দিরে মন্দিরে চর্চিত ভজন এবং আইরিশ গানের মন্দাক্রান্তা ছন্দগুলো নানাভাবে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর গানে। ভক্তিবাদী এসব গান ও কবিতা নানাভাবে প্রকাশিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিতে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গানের কথা যেমন মূল্য দিয়েছেন তেমনি সুর, স্বর, গানের মাত্রা, অনুষঙ্গী বাজনা ও বাদন নিয়ে রীতিমতো গবেষণা করেছেন। গানের মাঝে প্রতিভাসিত রবীন্দ্রনাথই বিশ্বমঞ্চে চিরন্তন হয়ে থাকবে।

কবি তাঁর কাব্য রচনায় কালিদাস ও দান্তেকে কতটুকু অনুসরণ করেছেন বা করতে চেয়েছেন, খৈয়াম, হাফিজ বা রুমিকে কতটুকু আত্মস্থ করেছেন, আধুনিক কবিতা রচনায় কতটুকু সার্থক হয়েছেন– সেটা গবেষণার বিষয়। আধুনিক কবিতায় তিনি কতুটুকু কোলরিজ, ইয়েটস, ইলিয়ট বা রিলকেকে অতিক্রম করেছেন বা করতে পেরেছেন– সেটা আলোচনার বিষয়। ছোটগল্প বা উপন্যাসে আদৌ তিনি টলস্টয়, শেখভ, দস্তয়ভস্কি, হার্ডি প্রমুখকে অতিক্রম করতে চেয়েছেন কি না তা দেখা প্রয়োজন। এসব করা প্রয়োজন ভাবাবেগের ঊর্ধ্বে উঠে।

ভক্তিবাদে আচ্ছন্ন না হয়ে নন্দিতজনের জীবন ও কর্মকে সত্যিকার অর্থে মূল্যায়ন করে, ইতিবাচক বিষয়গুলো অন্তরে ধারণ করে, শ্রদ্ধা নিবেদন সার্থক করা প্রয়োজন। নিজের অজ্ঞতা, দীনতা ও শূন্যতা আড়াল করতেই ভক্তিবাদে সমর্পণ করে অবুঝ মন।

অবোধ তার দীনতা, জ্ঞানশূন্যতা, অক্ষমতা ও দুর্বলতার কারণে ভক্তিবাদে আশ্রয় নেয়, ভক্তিরসে ডুবে নিজের কষ্ট ও ব্যর্থতা আড়াল করে, এতে পূজক ও পূজিতের জীবন ও কর্মের মূল্য বৃদ্ধি পায় না। রবীন্দ্রনাথের সার্থক মূল্যায়ন এবং তাঁর কর্মের অনুসরণ জাতিকেই সমৃদ্ধ করবে। এতে কবি নিজগুণে, নিজ স্থানে অধ্যারুড় হবেন; তিনি কখনও হারাবেন না আমাদের হৃদয় থেকে।

ডা. এম এ হাসানবাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত গবেষক

Responses -- “বহুমাত্রিক রবীন্দ্রনাথ ও বিশ্বভুবন”

  1. মুস্তাফিজ

    আমাদের আলো ঝলমল শহরগুলোতে গত কয়েক বছরে বেশ ভালোভাবে দুই শ্রেণির উগ্রবাদী গোষ্ঠীর বিকাশ হয়েছে। একটা ধর্মীয় উগ্রবাদী আরেকটা ধর্মবিরোধী উগ্রবাদী। আমার ধারণা, এই দুই শ্রেণির লোকেরাই তীব্র এবং বিষাক্ত কিছু কথাবার্তা লালনপালন করেন নিজেদের মধ্যে, সুযোগ পেলেই তা উগরে দিয়ে ভাসিয়ে দিতে চান প্রতিপক্ষকে। কাশেম বিন আবু বাকারকে উপলক্ষ করে তাঁরা তা-ই করে চলেছেন। তাঁরা কিছু বলতে চান, সেটা কাশেমকে নিয়ে নয়, তাঁকে উপলক্ষ করে একে অন্যকে। আমাদের এই সমাজের অস্থিরতা আর অশান্তির বহু প্রতিফলন রয়েছে তাঁদের এসব বক্তব্য এবং আক্রমণভঙ্গিতে।পক্ষ-বিপক্ষের এই তীব্র মানুষেরাই আসলে উগ্রবাদী। তাঁরা হয়তো বোঝেননি কাশেম বিন আবু বাকার ধর্মান্ধ উগ্র মানুষের কথা লেখেননি, শহরের উন্নাসিক ‘প্রগতিশীল’দের কথাও লেখেননি। তিনি লিখেছেন আবহমান বাংলাদেশের মানুষের বৃহত্তর শ্রেণির কথা। তাঁরা ধর্ম মেনে চলেন, ধর্মীয় পোশাকও পরেন অনেকে। কিন্তু সমাজের কঠোর রক্ষণশীলতার মধ্যেও স্বাভাবিক মানবসত্তা থেকে ভালোবাসা খোঁজেন, ভালোবাসেন। তাঁদের কাছে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা মানে কোনো ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বা উগ্রবাদের খপ্পরে পড়া নয়। তথাকথিত মডারেট না, এটাই বাংলাদেশের আবহমান ইসলাম। সামান্য কিছু ব্যতিক্রম বাদে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ আসলে এমনই। যাঁরা এটা বুঝবেন, তাঁরা শুধু কাশেম বিন আবু বাকারকে নয়, দেশকে আর সমাজকে চিনতে পারবেন। কেন ধর্মবিরোধী উগ্রবাদীরা এবং ধর্মীয় উগ্রবাদীরা এ দেশের রাজনীতির মূলধারা নয়, তা-ও বুঝতে পারবেন।

    Reply
  2. মুস্তাফিজ

    কাশেম বিন আবু বাকারকে দেখা হচ্ছে ভিন্ন চোখে। তাঁর প্রতি রাগের মাত্রাজ্ঞান হারিয়ে একটি টিভি আলোচনায় তাঁর কারণে বাংলাদেশে উগ্রবাদ ও ইসলামি লেবাসের প্রসার ঘটেছে বলা হয়েছে। এটিই আমার কাছে সবচেয়ে কৌতুকপ্রদ মনে হয়েছে। আমি কলম্বো সেমিনারে যাওয়ার আগে ধর্মীয় উগ্রবাদের ওপর বাংলাদেশ ও ভারতের কিছু লেখকের লেখা মন দিয়ে পড়েছি। সেখানে বিএনপি, জামায়াত, হেফাজত, মাদ্রাসা শিক্ষা, পাকিস্তানি ভাবধারাসহ নানা কারণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বিবেচনায় এগুলো ধর্মীয় উগ্রবাদের কারণ নয়; বরং উপসর্গ। আসলে আমরা কেউ কারণ খুঁজতে যাইনি। উগ্রবাদের সঙ্গে বৈষম্য, বিচ্ছিন্নকরণ, দুর্নীতি, গণতন্ত্রহীনতা, কুশাসন ছাড়াও বৈশ্বিক কারণ (যেমন: বিভিন্ন মুসলিম দেশে আমেরিকা ও ইউরোপীয়দের আক্রমণ এবং আইএসের উত্থান) এবং বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতে (যেমন: ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কাসহ প্রতিবেশী রাষ্ট্রে ধর্মীয় উগ্রবাদের উত্থান) কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তার কোনো বিশ্লেষণ নেই। তাজ হাশমীর মতো দু-একজনের লেখা ছাড়া আর কোথাও এসব প্রসঙ্গ নিয়ে তেমন আলোচনা দেখিনি আমি। সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝার মতো সহানুভূতি আর উদারতা আমাদের নেই। বরং উদারবাদের কথা বলে আমরা সংকীর্ণতায় আক্রান্ত। কাশেম বিন আবু বাকারের সাহিত্যকে মৌলবাদ/উগ্রবাদ বলা হচ্ছে সে কারণেই। আর তাঁকে অশ্লীল বলাও এ কারণেই। না হলে চুমু খাওয়া আর স্ত্রীকে পাঁজাকোলা করে বিছানায় নিয়ে যাওয়া—শুধু এটুকু লেখা অশ্লীলতা হবে কেন? তাঁরা শুধু কাশেম বিন আবু বাকারকে নয়, দেশকে আর সমাজকে চিনতে পারবেন। কেন ধর্মবিরোধী উগ্রবাদীরা এবং ধর্মীয় উগ্রবাদীরা এ দেশের রাজনীতির মূলধারা নয়, তা-ও বুঝতে পারবেন..

    Reply
  3. মুস্তাফিজ

    কাশেম বিন আবু বাকারের প্রতি আক্রমণের একটা কারণ তাঁর জনপ্রিয়তা। এ দেশে জনপ্রিয় ধারার প্রতি একধরনের মানুষের অনীহা বরাবরই। মুজিব পরদেশী, মমতাজ, অনন্ত জলিল প্রমুখ এই অনীহার শিকার হয়েছেন নানাভাবে। এমনকি হুমায়ূন আহমেদের মতো শক্তিশালী লেখকের প্রতি বহু আক্রমণের কারণই ছিল তাঁর জনপ্রিয়তা। জনপ্রিয়তা মানেই সস্তা আর চটুল কিছু—এটা আসলে বলে জনবিচ্ছিন্ন এক উন্নাসিক শ্রেণি। এই শ্রেণির মানুষ বাংলাদেশের বৃহত্তর সমাজ আর সাধারণ মানুষের আবেগ-অনুভূতি বুঝতে তো চানই না, তা মেনে নিতেও প্রস্তুত না। তাঁরা জনগণ বলতে কেবল নিজেকে বোঝেন, মানুষ মানেও তাঁরাই।

    ধর্মীয় ইস্যুতে তাঁদের এই অন্য সবাইকে বাদ দেওয়ার (এক্সক্লুশনিস্ট) মনোভাব আরও উগ্র। কাশেম বিন আবু বাকারের প্রতি মনোভাবে এটিই তীব্র হয়ে উঠেছে। সাহিত্যের উপজীব্য যদি হয় সাধারণ মানুষের জীবন, তাহলে এতে নামাজ পড়া, ইসলামি সম্বোধন ব্যবহার করা, কথাবার্তায় ইসলামি অনুশাসনের বিষয় আনা অস্বাভাবিক কি? কাশেম বিন আবু বাকার এই স্বাভাবিক বিষয়গুলো তাঁর উপন্যাসে টেনে এনে আক্রমণের শিকার হয়েছেন। তিনি জনপ্রিয়তা না পেলে, তিনি যে জনপ্রিয় এটি বিদেশি গণমাধ্যমে ফলাও করে না এলে, এই আক্রমণ হতো না।

    ইসলামি জীবনাচরণ সাহিত্যে কেন জনপ্রিয় হবে—এই রাগ অবশ্য সরলভাবে দেখানো সম্ভব নয়। তাই কাশেম বিন আবু বাকারের প্রতি এসেছে মৌলবাদের অভিযোগ, অশ্লীলতার অভিযোগ। কিন্তু বিসমিল্লাহ বলা, ইসলামি পোশাক পরা আর ধর্মবিশ্বাস কি মৌলবাদ? আমরা প্রচলিত অর্থে মৌলবাদ বলতে চরমপন্থী বা উগ্রবাদী মনোভাব বুঝি, আরও বুঝি অন্য ধর্মের প্রতি আক্রমণ ও অসহিষ্ণুতার কথা। কাশেম বিন আবু বাকারের উপন্যাসে এগুলো আছে, তা কোথাও বলা হয়নি। তাহলে তা মৌলবাদকে (সঠিক অর্থে উগ্রবাদকে) প্রসার করছে কীভাবে? তাঁর উপন্যাসে ধর্মীয় যে শিকড়ের কথা আছে, তা আরও তীব্রভাবে আছে ভারতীয় বিভিন্ন সিরিয়ালে এবং বাহুবলী ধরনের সিনেমায়। আমরা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কারণে এগুলো বর্জনের কথা বলি। কিন্তু হিন্দু মৌলবাদের কারণে এগুলো বর্জনের কথা বলি কি?

    Reply
    • Keshab K. Adhikary

      মুস্তাফিজ সাহেব অ-জায়গায় কু-জায়গায় ঘুটছেন কেনো? জায়গামতো ঘুটেন। এখানে এসব অবান্তর কথা বলে লাভ কি? আপনার উদ্দ্যেশ্য কি? কাশেম বিন আবুবাকার কি আপনার চোখে রবীন্দ্রনাথ? তো সেই সিদ্ধিতে টান দিতে থাকুন ……ভালোই ধক আছে বলে শুনেছি……..!

      Reply
  4. Sujan Sen

    লেখাটি থেকে অনেক কিছু জানতে পারলাম ও শিখতে পারলাম। ধন্যবাদ ডা: এম এ হাসান।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—