চম্পকনগর বাজারের পাশ দিয়েই চলে গেছে পূর্ব দিক বরাবর একটি পাকা রাস্তা। খানিক এগোতেই বদলে যেতে যায় আশপাশের দৃশ্য। লাল মাটির আঁকাবাঁকা পথ। মাটি আঁকড়ে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি কাঁঠাল গাছ। রাস্তার পাশের খেত পাকা ধানে ভরা; সোনালী রং লেগেছে তাতে, দমকা হাওয়ার ঝাপটায় মাঝেমধ্যেই তা নুয়ে পড়ছে জমির বুকে। পাখপাখালির কণ্ঠ ভেসে আসছে চারপাশ থেকে। এমন মনোহর দৃশ্যে বিভোর হয়ে একসময় আমরা পৌঁছে যাই গন্তব্যে।

গ্রামের নাম বিষ্ণুপুর। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার এ গ্রামেই বসবাস করছেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ল্যান্স নায়েক শহিদ উদ্দিন ভুইয়া। এ বীর মুক্তিযোদ্ধার কথা শুনি ঢাকায় বসবাসরত এ গ্রামেরই সন্তান সরকার জাবেদ ইকবালের মুখে। আগ্রহী হতে তিনিই আমাদের ঠিকানাটি দিয়ে সাহায্য করেন।

‘কমান্ডারের বাড়ি’ কোথায়?

প্রশ্ন শুনেই বিষ্ণুপুরের মধ্যবয়সী এক যুবক আগ্রহ নিয়ে দেখিয়ে দেন উত্তর পাড়ায় মুক্তিযোদ্ধা শহিদ উদ্দিনের বাড়ি। অতঃপর আমরা তাঁর মুখোমুখি হই।

ফোরকান উল্লাহ ভুইয়া ও মালেকান্নেছার পঞ্চম সন্তান শহিদ উদ্দিন ভুইয়া। লেখাপড়ায় তাঁর হাতেখড়ি বিষ্ণুপুর প্রাইমারি স্কুলে। অতঃপর ষষ্ঠ শ্রেণিতে তিনি ভর্তি হন মিরাশানি পলিটেকনিক একাডেমি হাই স্কুলে। ওখান থেকেই তিনি মেট্রিক পাস করেন ১৯৬৪ সালে।

শৈশব ও কৈশোরের নানা ঘটনাপ্রবাহ আজও উদ্দিপ্ত করে শহিদ উদ্দিনকে। স্মৃতি হাতড়ে তিনি জানালেন সেসব দিনের কথা।

“তহন ফুটবল খেলতাম। মেরাশানি হাই স্কুল টিমের গোলকিপার ছিলাম। বন্ধু আলিম, মন্নাফ, বশির উদ্দিন, আবুল কাশেমের কথা খুব মনে পড়ে। কাশেমের বাড়ি ছিল মুকুন্দপুর। একবার তার খুব অসুখ হয়। তহন এইটের ক্লাস মনিটর আমি। ক্লাস ভাইঙা একদিন ওরে দেখতে গেছিলাম। ফেরার পথে মুকুন্দপুর রেলস্টেশন থাইকা ট্রেন ধরি। আজমপুর স্টেশনে নামার সময় হ্যান্ডেলে ধইরা দৌঁড়াইয়া সামনের দিকে লাফ দিয়া নামি আমরা। কিন্তু মন্নাফ ডাইরেক্ট জাম্প দিয়াই চাকার নিচে পইরা যায়। আমি ওরে টাইনা তুলি। তা না হইলে ওইদিন ও মারা যাইত।

https://www.youtube.com/watch?v=wXzWiOFxboc

(যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ল্যান্স নায়েক শহিদ উদ্দিন ভুইয়ার কথা শুনতে ওপরের লিংকে ক্লিক করুন)

“আব্দুর রহমান, শহিদ উদ্দিন, মইজুদ্দিন স্যাররে খুব ভয় করতাম। তহন শিক্ষকরা এইট-নাইন পইরাই লেহাপড়া শিখাইছে। এহন ডিগ্রি পাস শিক্ষকরাও ভালো কইরা পড়াইতে পারে না। তহন শাসন ছিল কড়া। এহন তো শাসনের সিসটেমই নাই।

“আগে মানুষের মইধ্যে আন্তরিকতা ছিল। একের প্রতি অন্যের দরদও ছিল। এহন সেইডা লোপ পাইছে। সবাই খালি ‘ইয়ানফছি’, ‘ইয়ানফছি’ করে। তবে ভালো কিছু লোকের লাইগাই সমাজ টিকা থাকে। ভালো মানুষের সংখ্যাডাও তাই বাড়াইতে হইব।”

মেট্রিকের পরেই শহিদ উদ্দিনের ইচ্ছা কলেজে পড়ার। কিন্তু তাঁর বাবা চান সে ব্যবসা করুক। এ নিয়ে মনোমালিন্য হয়। ফলে একদিন না বলেই তিনি ঘর ছাড়েন, চলে যান কুমিল্লায়। সেখানে লোকমুখে জানতে পারেন আর্মিতে লোক নেওয়ার খবর। কৌতূহলী হয়ে যান কান্দিরপাড় রিক্রুটিং অফিসে। বাকি ইতিহাস শুনি শহিদ উদ্দিনের জবানিতে:

 

vasho-67-01
পাকিস্তান সেনাদের একটি গুলি মুক্তিযোদ্ধা শহিদের বুকের বাম পাশ দিয়ে ঢুকে লাং ফুটো করে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে যায়

 

“গিয়া দেহি দুই-তিনশ লোক লুঙ্গি কাছা দিয়া খালি গায়ে দাঁড়াইয়া আছে। অফিসের বারান্দায় আমি। কী হয় দেখতাছি। এমন সময় ক্যাপ্টেন সাব আসেন। আমারে দেইখা কন, ‘তুমি ভর্তি হইবা।’

আমি বললাম, ‘ভর্তি হইতে পারমু, স্যার।’

উত্তর শুইনা উনি আমারে শার্ট-প্যান্ট খুলতে বলেন। আমি তো শরমে মরছি। বলি, ‘স্যার, প্যান্টও খুলতে হইবো!’

কথা শুইনা তিনিও মুচকি হাসলেন। এরপর হাইট, ওয়েট আর বডি চেক কইরাই স্ট্যাম্পের কালিতে পেনসিল দিয়া বুকে নাম্বার লেইখা দিলেন। বাছাইয়ের পর দেওয়া হয় চিটাগাং ইবিআরসিতে। তের-সাত-উনিশশ চৌষট্টিতে জয়েন করছি সৈনিক পোস্টে। আর্মি নম্বর ১৩১৮৪৯৬।”

আগস্টের ৩১ তারিখে শহিদ উদ্দিনকে ট্রেনিংয়ের জন্য পাঠানো হয় পশ্চিম পাকিস্তানে, রিসালপুরে। এক বছর ট্রেনিং শেষে প্রথমে লাহোর ক্যান্টনমেন্টে এবং পরে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয় খ্যামকরন সেক্টরের ইঞ্জিনিয়ার কোরে। দায়িত্ব ছিল ব্রিজ ভাঙা, রাস্তাঘাট ভাঙা, মাইন লেইং অ্যান্ড লিফটিং, ওয়াটার সাপ্লাই প্রভৃতি। যুদ্ধবিরতির পর তাঁকে প্রথমে পোস্টিং দেওয়া হয় সোয়াদ গিলগেটে, ওয়ান ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটেলিয়ানে। অতঃপর তিনি কাজ করেন রাওয়ালপিন্ডিতে, ১০১ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাটেলিয়ানে।

সত্তরের শেষের দিকে তিন মাসের ছুটিতে শহিদ আসেন দেশে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১। ছুটি শেষ হওয়ায় ওইদিনই তিনি রিপোর্ট করেন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের কুর্মিটোলা ট্রানজিট ক্যাম্পে।

দেশ তখন উত্তপ্ত, ব্যারাকের ভেতরে আপনারা কি দেখলেন?

শহিদ উদ্দিন বলেন:

“যহন পশ্চিম পাকিস্তানে ছিলাম নির্বাচনে তহন বঙ্গবন্ধু পাস করছে। পাঞ্জাবি সৈনিকেরা আমগো টিটকারি দিয়া কইত, ‘শহিদ উদ্দিন, আবিতো তেরা হাতমে পাওয়ার চালা গিয়া।’

“প্রমোশনের বেলায় পাঞ্জাবিগো আগে দিত। আমগো লোকদের কম দিত। কুর্মিটোলায় ট্রানজিট ক্যাম্পে যখন ছিলাম তহন ভেতরেই দেহি কয়েকটা জায়গায় ট্রান্স করা। এক ব্যাটালিয়ানের ক্যান্টিন থেকে অন্য ব্যাটালিয়ানের ক্যান্টিনে গেলেই ওরা চেক করত। তহনই সন্দেহ করছি কিছু একটা ঘটব।”

৭ মার্চ ১৯৭১। বঙ্গবন্ধু ভাষণ দিবেন রেসকোর্স ময়দানে। সিভিল ড্রেসে শহিদ উদ্দিন সহকর্মী বশিরকে নিয়ে শুনতে যান ঐতিহাসিক সে ভাষণ। এরপর কী ঘটল সে ইতিহাস জানালেন শহিদ উদ্দিন। তাঁর ভাষায়:

“শেখ সাহেবরে দেখার কৌতুহল ছিল। গিয়া দেহি লাখো মানুষ। বঙ্গবন্ধু কইলেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দিব…আমি যদি হুকুম দিবার না পারি…’।

“এরপরই তো সব ওলটপালট হইতে থাকে। অসহোযোগের কারণে আমগো রেশন বন্ধ হয়। তহন রেশন আসে পশ্চিম পাকিস্তান থাইকা, কার্গো বিমানে। একদিন এয়ারপোর্টে আমগো নিয়া যায় রেশনের মাল আনতে। দেহি পাকিস্তানি সেনারা ওগো পরিবারের লোকদের বিমান ভর্তি কইরা পাঠায়া দিতাছে। সন্দেহ হইল। স্টাফরোডে মধ্যরাতে তহন ট্যাংক নিয়া ওরা ঘুরাঘুরি করত। ট্রেন বন্ধ ছিল। ১৯ মার্চ তারিখে আমরা ট্রেন পাইলাম। আমি আর বশির তহন বাড়িত চইলা আসি।”

 

vasho-67-02
মুক্তিযোদ্ধা শহিদ উদ্দিন ভুইয়ার অনুকূলে সিএমএইচের ছাড়পত্র

 

ঢাকায় গণহত্যার খবর শহিদরা পান রেডিওতে। মনে তখন অজানা শঙ্কা। কী ঘটবে কেউ জানে না। আর্মির লোক পাইলে পাকিস্তানি সেনারা তো এমনিই মেরে ফেলবে। শহিদ ট্রেইন্ড সোলজার। চুপ করে বসে থাকতেও পারে না। তাই লড়াই-ই একমাত্র পথ। কিন্ত অস্ত্র ছাড়া লড়বে কীভাবে?

৩১ মার্চ ১৯৭১। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে ফোর বেঙ্গল বেরিয়ে এসে অবস্থান নিয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। ক্যাপ্টেন আইনুদ্দিন ছিলেন দায়িত্বে। খবর পেয়ে শহিদ উদ্দিনও জয়েন করেন ওখানে। এরপরই তিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য সন্মুখ যুদ্ধ করেন ২ নং সেক্টরের ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও আখাউড়ার বিভিন্ন স্থানে।

একটি অপারেশনের কথা জানালেন মুক্তিযোদ্ধা শহিদ উদ্দিন। তাঁর ভাষায়:

“আমরা তহন আখাউড়ায়, ফকিরমোড়া ইরাপুরে পজিশনে। পাকিস্তানি সেনাগো পুরা ব্যাটেলিয়ান ছিল পশ্চিমে। দুপুরের দিকে দেখলাম ওরা আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। খবরটি সঙ্গে সঙ্গে পৌঁছে দেই মেজর আব্দুস সালেক চৌধুরির কাছে। উনি সবাইরে পজিশনে যাইতে কইলেন। নির্দেশ দিলেন উনি ফায়ার ওপেন না করা পর্যন্ত কেউ যেন ফায়ার না করে। আমি পজিশন নিছি পুস্কুনির পাড়ে।

“পাকিস্তানি সেনারা সোজা রাস্তায় ক্রলিং করে চইলা আসে রেঞ্জের ভিতরে। কিন্তু তবুও স্যার ফায়ার ওপেন করে না। চিন্তায় পইরা গেলাম! হঠাৎ ফায়ারের শব্দ। আমরাও গুলি চালাই। সামনের সারিতে থাকা পাকিস্তানি সেনারা মাডিত পইড়া যায়। তবুও ওরা কাবু হয় না। পেছন থাইকা বলে, ‘আগে বারো, আগে বারো’।

“প্রচণ্ড গোলাগুলি। এরপরই ওরা শেল মারতে থাকে। আমরা তহন টিকতে পারি না। সরে গিয়ে আশ্রয় লই ভারতের মনতলি স্কুলে। ওরা তহন আখাউড়া দখল করে। বাংলাদেশের পতাকা নামায়া পাকিস্তানি পতাকা ওড়ায়। খুব কষ্ট পাইছিলাম ওইদিন। আমগো কাছে পতাকাই ছিল সব।”

এক অপারেশনে গুলিবিদ্ধ হন মুক্তিযোদ্ধা শহিদ উদ্দিন। পাকিস্তানি সেনাদের গুলি তাঁর বুকের বাম পাশে ঢুকে লাং ফুটো করে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে যায়। রক্তাক্ত ওইদিনের কথা মনে হলে আজও এ যোদ্ধার দুচোখ সিক্ত হয়।

কী ঘটেছিল ওই দিনটিতে?

খানিক নীরবতা। অতঃপর তিনি বলতে থাকেন রক্তাক্ত ওইদিনের আদ্যপান্ত:

“মনতলি স্কুল থাইকা আমাগো পাঠায় কামথানা বিওপিতে। ওখানে শালদা নদীর উত্তর পাশে পাকিস্তানিরা পজিশনে ছিল। ওগো পজিশনে অর্তকিত হামলা করতে হইব। আমি, সউদ মিয়া, হামিদ, কালামসহ ছয়জন। তিনটা দলে ভাগ হইয়া ওগো বাংকারের সামনে গিয়া মুখোমুখি ফায়ার করমু। ওরা মনে করব এনিমি সামনে আছে। তহন উত্তর দিকের রেল লাইনের নিচ দিয়া একটা কালভার্ট হইয়া আমগো আরও ৩০-৩৫ জন পেছন দিক দিয়া ওগো বাংকার চার্জ করব। সন্ধ্যায় এইডাই পরিকল্পনা হয়।

 

vasho-67-03
শহিদ উদ্দিন ভুইয়ার মুক্তিযোদ্ধা সনদ

 

“৪ জুন ১৯৭১। রাত তহন সাড়ে ৩টা। মুখোমুখি হইয়াই আমরা ফায়ার করি। পাকিস্তানি সেনারা তহন টুইঞ্চ মর্টারের ফায়ার করে। সব গোলা গিয়া পড়ে আমগো পেছনে। প্রচণ্ড গোলাগুলি চলছে। আমি ছিলাম ধানখেতের আইলে। দুই পাশে সউদ মিয়া, আবুল কালাম আর হামিদ। পাকিস্তানিরা একটু উঁচুতে। হঠাৎ বুকে একটা ধাক্কা খাইলাম। তহনও কিছু বুঝি নাই। মনে হইছে বুকের ডান পাশে একটা গুঁতা লাগছে। ভাবছি লাঠির গুঁতা। কিছুক্ষণ পরেই আমগো লোকেরা পেছন থাইকা ওগো ওপর আক্রমণ করে। গোলাগুলি তহন শেষ। কোনো আওয়াজও নাই।

“তহন আমরা আসি গৌরাংগোলা গ্রামের মসজিদের পাশে। খালি গা। বুক দিয়া রক্ত পড়তেছিল। গাও শিরশির করছে। জোকে ধরছে নি! আঙ্গুল দিয়া ধরতেই দেহি বুকের ভিতরে আঙ্গুল ঢুইকা যায়। তহনই বুঝছি গুলি খাইছি। মনে তহন মৃত্যুভয়!

“এইহানে যদি মরি তাইলে তো ডেডবডিও কেউ পাইব না! এই ভাইবা এলএমজিডা হাতে নিয়া দৌড় দেই বর্ডারের দিকে। কিছুদূর যাওয়ার পরই চোখ ঝাপসা হইয়া আসে। একটা মাঠে পইরাই কলেমা পড়ি। মনে হইছে মারা যামু। গলা শুকাইয়া কাঠ। নিঃশ্বাসও নিতে কষ্ট হইতেছে। বুকের ওপর বাম হাতটা ছিল। সেইডা পেছনে নিতেই জমে থাকা পানির স্পর্শ পাই। ওই পানি মুখে দিতেই দমডা ফিরা আসে। আমি যে বাইচা থাকমু এইডা স্বপ্নেও ভাবি নাই ভাই। একাত্তরের পরে বোনাস লাইফ নিয়ে চলতাছি।”

চিকিৎসা নিলেন কোথায়?

“এক বাড়ির দরজার একটা পাল্লা খুইলা সহযোদ্ধারা আমারে তুইলা নেয়। গ্রামের এক ডাক্তার প্রথমে আমারে দেখে। জ্ঞান তহনও ছিল। উনি শুধু বললেন,‘আশা নাই’।

তবুও কোরামিন আর একটা ইনজেকশন দিতেই শরীরটা গরম হইল। এরপরই আমারে নেওয়া হয় আগরতলা জিবি হাসপাতালে। রক্তে হাসপাতালের ফ্লোর ভাইসা গেছিল। অপারেশন থিয়েটারে ডাক্তার রতিন দত্তর হাত ধইরা হাউমাউ কইরা কাইন্দা কইছিলাম, ‘যদি মইরা যাই তাইলে আমার ডেডবডিটা বাংলাদেশে পাঠাইয়েন স্যার।’

“উনি কিছু কইলেন না। আমার মুখের দিকে শুধু এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। পাকিস্তানি সেনাগো গুলিটি আমার বুকের ডান পাশ বিদ্ধ করে লাং ফুটো কইরা দেয়। অপারেশনে লাংয়ের কিছু অংশ কাইট্টা ফেলতে হয়। তহন রক্তও লাগছিল। তৎকালীন এমপিএ লুৎফুল হাই সাচ্চু আমারে রক্ত দিছে। তাঁর রক্তেই আজ বাঁইচা আছি।”

যে দেশের জন্য রক্ত দিলেন স্বপ্নের সে দেশ পেয়েছেন কি?

মুক্তিযোদ্ধা শহিদ উদ্দিনের উত্তর:

“পেলাম কোথায়? চাইছিলাম সুন্দর একটা দেশ। যেখানে হত্যা, রাহাজানি, অন্যায় থাকব না। খাই খাই থাকব না। কিন্তু সে দেশ তো হয় নাই। মানুষ একজনরে ভোট দিয়া চেয়ারম্যান করে। কিন্তু সে ভোটের মূল্যায়নই তো হয় না। বিচারে সে অন্যায়কে দমন করবে। এটাই তো হওয়ার কথা। আপনেরে বিচারের দায়িত্ব দিলাম। আপনি কিছু নিয়াটিয়া বিচার হালকা করে দিলেন। এইসব এহন গ্রামগঞ্জেও চলতাছে।”

কী করা দরকার?

“এক নম্বর কথা হইল সৎ থাকতে হইব। শুধু নেতাই না, সবাইকেই। আপনি অর্থলোভী হইবেন কিন্তু অন্যের সততা চাইবেন এইটা কিন্তু হইব না। ঠিকাদার উন্নয়নমূলক কাজ করে। দেখেন কত পারসেন্ট কাজ হয়। কত পারসেন্ট দিতে হয়। তাইলে ভালো কাজ হইব কেমনে? ন্যায়পরায়ণ হইতে হইবো। সঠিক বিচার করতে হইব। তা না হলে শত উন্নয়নেও দেশ এগোবে না।’

স্বাধীনতা লাভের পর পাকিস্তান ফেরত বাঙালি সেনাদের নিয়ে সেনাবাহিনী গঠন প্রসঙ্গে এ যোদ্ধা অকপটে তুলে ধরেন নিজের মতামত:

“যুদ্ধবিধস্ত দেশ গড়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন শেখ মুজিব। পরিস্থিতিগত কারণে বাঙালি সেনারা পশ্চিম পাকিস্তানে আটকা পড়েছিল। তাই পাকিস্তান ফেরত বলেই কোনো বাঙালি সেনা দেশবিরোধী হবেন এই ভাবনাটা মোটেই ঠিক নয়। আমি মনে করি এইটা বঙ্গবন্ধুর বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত ছিল। বরং আগে সেনাবাহিনীতে তেমন রাজনীতি ছিল না। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সেনাবাহিনীতেও রাজনীতি ঢুকে গেছিল।”

 

vasho-67-04
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা শহিদ উদ্দিন ভুইয়া

 

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন জিয়াউর রহমান। তাঁর মন্ত্রিসভায় স্থান পায় যুদ্ধাপরাধী ও রাজাকাররা। সরকারি প্রটোকল মেনে সে সময় রাজাকারদেরই স্যালুট দিতে হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধা শহিদ উদ্দিনকে। সে সময়কার কষ্টের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন:

“কষ্টের কথা বুঝাইতে পারমু না ভাই। অর্ডারের বাইরে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। তহন ভাবতাম রক্ত দিয়া কেন পতাকা আনলাম! ওগো সালাম দিতে বুকটা তো ফাইটা যাইত।”

৪৬ বছর পরও মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা বাড়ে কেন?

মুচকি হেসে এই সূর্যসন্তান বলেন:

“দায়ী তো আমরাই। এ ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আমি। যারা জীবনে কোনোদিন যুদ্ধের কথা কয় নাই এমন লোকও এহন কয় মুক্তিযুদ্ধ করছে। আমি ওগো ফরমে স্বাক্ষর দেই নাই। দেশের সাথে এমন গাদ্দারি করতে আমি পারমু না। এজন্য আমার বিরুদ্ধেই ওরা অভিযোগ দিছে। এহন অমুক্তিযোদ্ধাগো শক্তিই বেশি। সরকার কী মনে কইরা নতুন আবেদন নিতাছে, মাথায় ঢুকে না। যত সুযোগ দিবেন মুক্তিযোদ্ধাগো তালিকা তত ভুয়া হইবো। তাই এই তালিকা বন্ধ হওয়া উচিত।”

হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে আওয়ামী লীগের চেতনা কখনও মিলবে না বলে মনে করেন মুক্তিযোদ্ধা শহিদ উদ্দিন। হেফাজতের সঙ্গে সরকারের একধরনের আপসকে তিনি রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর বলে অভিহিত করেন।

“প্রথম কইছেন, ‘তেঁতুল হুজুর’, ‘তেঁতুল হুজুর’। এহন মিল্লা যাইয়া কন, ‘মিষ্টি হুজুর’, ‘মিষ্টি হুজুর’। তাইলে তো হইব না। তেঁতুল হুজুররা সঙ্গে থাকলে কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা হইব না। প্রকাশ্য শক্রও ভালো। সর্তক হওয়া যায়। কিন্তু ওরা তো ভেতরে ঢুইকা সুযোগ পাইলেই ইঁন্দুরের মতো কাটব। তাই হুজুরগো ওপর নির্ভরশীলতা আমগো কমাইতে হইব।’

দেশ কেমন চলছে?

“শেখের মাইয়া ভালো উন্নতি করছে। আগে তো বিদুৎ পাইতাম না। এহন ঘরে ঘরে বিদুৎ। রাস্তাঘাটগুলা পাকা হইছে। যোগাযোগব্যবস্থাও উন্নত। কিন্তু ঘরে ঘরে মাদক ঢুকে গেছে। মদ, গাঁজা, ইয়াবায় আসক্ত হচ্ছে যুবকরা। মাদকের বিষয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে কঠোর সিদ্ধান্ত নিলে দেশ আরও এগোবে।”

শত সমস্যা কাটিয়ে নতুন প্রজন্মের হাত ধরেই এদেশ একদিন বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা হবে– এমনটাই বিশ্বাস যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ল্যান্স নায়েক শহিদ উদ্দিন ভুইয়ার। পাহাড়সম আশা নিয়ে তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন:

“দেশপ্রেম মানুষের শক্তি। পতাকা তোমার পরিচয়। তোমার পরিচয়টাই তুমি সবার ওপরে তুলে ধরো। মাদক থেকে দূরে থেক। মনে রেখ তোমার ভবিষ্যৎ নষ্ট করতেই মাদকের সৃষ্টি।”

 

সংক্ষিপ্ত তথ্য:

নাম : যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ল্যান্স নায়েক শহিদ উদ্দিন ভুইয়া
ছিলেন: সেনাবাহিনীর সৈনিক। আর্মি নম্বর ১৩১৮৪৯৬

যুদ্ধ করেন: ২ নং সেক্টরের ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও আখাউড়ার বিভিন্ন স্থানে
যুদ্ধাহত: ৪ জুন ১৯৭১। শালদা নদীর উত্তর পাশ থেকে আসা পাকিস্তানি সেনাদের একটি গুলি তাঁর বুকের বাম পাশ দিয়ে ঢুকে লাং ফুটো করে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে যায়।

ছবি ও ভিডিও: লেখক

সালেক খোকনলেখক, গবেষক।

১৯ Responses -- “যুদ্ধাহতের ভাষ্য: ৬৭– “তেঁতুল হুজুররা সঙ্গে থাকলে কিন্তু সোনার বাংলা হইব না””

  1. MD Jahid

    আমি সোনার বাংলা চাই না …………..আমি চাই ইসলামিক বাংলাদেশ………….

    Reply
  2. Sayed, Freedom Fighter

    Not only that the people who were doing all the nonsense against the Govt in newly liberated country on the name of the so calle Scientific Socialism can not establish the Golden Bangla.

    Reply
  3. Mannan Riipon

    মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দেখিছি। দেখিছি মুক্তিযোদ্ধাকে। শ্রদ্ধাবাজন শহীদ উদ্দীন এর মত নীল কমলেরা আমাদের জাতীর গৌরব। আজ ওনার ভাবনায় আমিও ভাবুক। যে রাজনীতি আমাদেরকে স্বাধীনতার স্বাদ পেতে সাহায্য করেছিল সে একই রাজনীতি আমাদেরকে শন্কায় ফেলছে। এ থেকে উত্তরণ প্রয়োজন। তা না হলে এ ধরনের ডাবল গেইমে অন্ধকার নেমে আসবে। খুব ভাল লাগল একজন মুক্তিযুদ্ধার আলাপচারিতায়। ওনার সত্য কথনে আমি আননন্দিত। তবে সরকারের উচিত মাদকের বিষয়ে আরও কঠোর হওয়ার। একজন মুক্তিযোদ্ধার সপ্ন আমরা ব্যথ হতে দিতে পারিনা। তাই যুব সমাজ এর প্রতিজ্ঞা হউক মাদক কে ঘৃণা করব দেশকে ভালবাসব।

    Reply
  4. borhan uddin

    জাতিসংঘের হিউমান রাইটস কাউন্সিল ১৫ই এপ্রিল ২০১০ সালে ধর্ম অবমাননার বিরুদ্ধে কীভাবে লড়া যায় সে বিষয়ে কয়েকটি সুনির্দিস্ট সিদ্ধান্ত গ্রহন করে। ২০১১ সালের ২১শে মার্চ সর্বসন্মতভাবে সেই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
    জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলের মতে ধর্ম অবমাননা একটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের অপরাধ। ধর্মীয় চরিত্রের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা একটি মানবাধিকার বিরোধী কাজ। খুব কৌতুহলউদ্দীপক যে ৭ নম্বর সিদ্ধান্তে বলা হচ্ছে ইসলাম এবং মুসলমানদের ভুলভাবে বারেবারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের এবং সন্ত্রাসবাদের সাথে যুক্ত করে প্রচারণা চালানো হচ্ছে এবং মুসলমান ও ইসলামকে কলংকিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে, হিউম্যান রাইটস কাউন্সিল এর বিরুদ্ধে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে। এই রেজুলুশনে বাংলাদেশ সাক্ষর করেছে। সো কল্ড মুক্তমনারা যে ফ্রি স্টাইলে ধর্ম অবমাননা চালিয়ে গেছে, ধর্মীয় চরিত্রদের নিয়ে পর্নোগ্রাফী রচনা করেছে, এটা যে মানবাধিকার লঙ্ঘন এটা বাংলাদেশের কোন মানবাধিকার সংস্থা একবারও কি মুখ ফুটে বলেছে? রবীন্দ্রনাথ যখন লেখেন, ওগো আমার প্রিয় তোমার রঙিন উত্তরীয়, পর পর পর তোমায় রঙ মেশাতে হবে…. তখন সেটা খুব স্যেকুলার হয়। আর “ওড়না চাই” সাম্প্রদায়িক!! আমরা বুঝি, কোথায় জ্বলে। এইবার থামেন প্লিজ। আর বেশী চিল্লাইয়েন না।
    আমি স্যেকুলারদের সমস্যা তো বুঝতে পারি, স্যেকুলার পোশাকের আড়ালে ইসলাম বিদ্বেষের অনেক পুরোনো অসুখ, এটা সারার নয়।

    Reply
  5. ashraf ahmed

    আমরা কয়েকজন দীর্ঘদিন ধরে বামপন্থীদের বলছি, সো কল্ড স্যেকুলারিজমের নামে ইসলাম বিদ্বেষের এই ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে। এটা তাদের জন্যই দরকার। এমনকি আপনাদের লিবারেল ভ্যালুজ ও এভাবে মানুষকে গরু ছাগল হিসেবে মনে করাকে এল্যাউ করেনা। কিন্তু হা হতোস্মি, কে শোনে কার কথা?
    মানুষকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দিতে না শিখলে এই কাচকলার রাজনীতি করে লাভ কী? মানুষকে উনমানুষ হিসেবে দেখানো ফ্যাসিস্ট রাজনীতি। মানুষকে ছাগল বলা আর তাকে কাঠালপাতা খেতে উপদেশ দেয়া বামপন্থী বলে দাবীদার কারো মুখে মানায় না। এই ভ্রান্ত রাজনীতির ফলে ছাপ্পানো হাজার বর্গমাইল থেকে বিতারিত হয়ে এক বর্গ মাইলের শাহবাগে বামপন্থীদের আশ্রয় হয়েছে। এখনো হুশ না হলে এই এক বর্গমাইলের মালিকানা যেতে সময় লাগবে না।

    Reply
  6. ashraf ahmed

    বাংলাভাষী বা বাঙালি হিসাবে নিজের ইতিহাস বুঝতে গিয়ে বাংলাদেশের জনগণ একবার আরব ইতিহাস আরেকবার বর্ণহিন্দুর ইতিহাসের মধ্যে খাবি খেয়েছে। নিজেদের লড়াই সংগ্রামে নিজেদের আবিষ্কার করার চেষ্টা না করে বেপথু হয়েছে বারবার। বাংলা ভাষার প্রতি বাংলাদেশের জনগণের অচ্ছেদ্য সম্পর্ক, বাংলার বিচিত্র ও বিভিন্ন লোকাচার ধর্ম সংস্কৃতি এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি হিসাবে বাংলাদেশের আবির্ভাবের তাৎপর্য বোঝার পথ ও পদ্ধতি নির্ণয়ের সাধনা নাই বললেই চলে। মনে হয়, এই পর্ব দ্রুত শেষ হতে চলেছে। এর প্রধান কারন হচ্ছে ‘বাঙালি’ জাতিবাদের প্রবল ও প্রকট উত্থানের কারনে আমাদের বোঝানো হয়েছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল ভাষা ও সংস্কৃতির অগ্রাধিকার কায়েমের যুদ্ধ, ধর্মকে প্রাইভেট কিম্বা সমাজ ও ইতিহাসের গৌণ বিষয়ে পরিণত করার লড়াই। উগ্র বাঙালি জাতিবাদীরা বিভিন্ন ভাবে দাবি করেছে একাত্তরে ইসলাম পরাজিত হয়েছে। জয় হয়েছে ‘বাঙালি’র। এই ‘বাঙালি’র সংজ্ঞায় মুসলমান নাই। ইসলাম অনুপস্থিত। বর্ণহিন্দু যেভাবে ঔপনিবেশিক কালপর্বে যবনদের বিপরীতে নিজের হিন্দু জাতিবাদী পরিচয় নির্ণয় করেছে তাকেই সার্বজনীন বাঙালির পরিচিয় হিসাবে হিন্দু জাতিবাদীরা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যার গুরুত্বপূর্ণ নজির। এই ‘বাঙালি’ মূলত বর্ণহিন্দুর প্রকল্প। বর্ণহিন্দুর প্রকল্প হিসাবে আগামি দিনে বাংলাদেশে ইসলাম নির্মূলই ‘বাঙালি’র আত্মপ্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ– বাঙালির একমাত্র রাজনীতি হিসাবে এটাই প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলেছে।

    Reply
    • সরকার জাবেদ ইকবাল

      জনাব আশরাফ, আপনার লেখাটি পড়ে ভাল লাগলো। রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির প্রয়োজনে যুগে যুগে বাঙালির পরিচয়কে বিভাজন করা হয়েছে। বাঙালির পরিচয় একটাই – বাঙালি। ‘মুসলমান বাঙালি’ ‘হিন্দু বাঙালি’ খ্রিস্টান বাঙালি’ ‘বৌদ্ধ বাঙালি’ বলে কোন কথা নেই। ধর্মীয় পরিচয় ও আচারধর্মিতা যার যার ব্যক্তিগত। রাজনীতির ঘোলাজলে টেনে এনে ধর্মকে বার বার অপবিত্র করা হয়েছে এবং সেই প্রক্রিয়া এখনও অব্যাহত আছে। আর, আমরা না বুঝে বরাবর সেই ফাঁদে পা রেখে চলেছি, কখনও কখনও মারমুখী হয়ে উঠছি। অথচ, ধর্মের এই টোপ না গিললে আমরাই হতে পারি ভারত উপমাহদেশে অন্যতম বৃহত্তম জাতিগোষ্ঠী যা আমাদের অস্তিত্ব রক্ষা ও সমৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক হতে পারে।

      Reply
  7. রোমান

    ইতিহাস বলে-দ্বি-জাতি তত্ত্বে পাকিস্তান নামক স্বাধীন মুসলিম ভূমি সৃষ্টি হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছিলো এই বাংলাদেশের মুসলমানরাই। ১৯৭১ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সরকারের প্রচার দপ্তর থেকে ‘মোনাফেকদের ক্ষমা নাই’ শিরোনামে একটি প্রচারপত্র জারি হয়, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র তৃতীয় খণ্ড, ৩২৫ পৃষ্ঠায় সন্নিবেশিত আছে —–মুক্তিযুদ্ধ ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য নয় বরং ইনসাফ কায়েমের জন্য হয়েছিলো। ইসলামপন্থিরা মুক্তিযুদ্ধকে মনে করে জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের মুক্তির লড়া্ই আর আওয়ামী ও বামপন্থিরা মনে করে পাঞ্জাবিদের বিরুদ্ধে বাঙ্গালীর সাম্প্রদায়িক লড়াই। মহান মুক্তিযুদ্ধকে উভয়ের দেখার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে অন্যদের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে ইসলামপন্থীদের মূল্যায়ন অনেক বেশি প্রসারিত। নিশ্চয়ই যাদের দেখার দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত তাদের বিজয় অবশ্যম্ভাবী।

    Reply
  8. আহসান রহমান

    আজ বিশ্বের মূলধারা ভোগবাদিতার জয়গান গাইছে, ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার মধ্যেও বাণিজ্য ও লাভের চিন্তাই প্রবল, সেবা ও দানও আজ বিনিয়োগের খাত। মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু—সবটা জুড়ে ব্যবসা ও মুনাফার চিন্তা জড়িয়ে যাচ্ছে। মানুষ কখনো ক্রেতা কখনো বিক্রেতা, কখনো নিজেই পণ্য কখনো ভোক্তা। এর কোনোটিই মানবের মূল সত্তা নয়। তার মূল্য তো নিহিত আছে মনুষ্যত্বের মধ্যে, যা অনেক নীতি ও মূল্যবোধের সমন্বয়ে গঠিত হয়। আজ সে জায়গায় আপস চলছে। একাত্তর কারও কোনো বিনিয়োগ ছিল না, এ থেকে ব্যক্তিগত মুনাফার ভাবনা কারও মধ্যে ছিল না, কেউ একা ছিল না। আমরা ছিলাম সবাই, ব্যক্তি ও তার চিন্তার জগৎ আলাদা হলেও, সামষ্টিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের মহত্ত্ব সৃষ্টি হয়েছিল সেদিন। বিশ্বজুড়ে মানুষ যেমন আদর্শ হারিয়েছে তেমনি তার হারিয়েছে মহত্ত্ব। তাই মানুষের জীবন স্থূল ভোগবিলাস ও আচার ধর্মের সহজ লক্ষ্যে বাঁধা পড়ছে। কথায় কথায় বলা হয়, একাত্তরের হাতিয়ার গর্জে উঠুক আরেকবার। মনে রাখতে হবে, একাত্তরের মূল হাতিয়ার কিন্তু অস্ত্র নয়, আগ্নেয়াস্ত্র গজরাতে থাকলে খুনোখুনি ও প্রতিহিংসার মহড়াই চলবে, সমাজ রক্তাক্ত হবে, অপরাধ ও দুর্নীতি হাত ধরাধরি করে চলবে। না, একাত্তরের মূল হাতিয়ার ছিল সেদিনের রাজনীতি। যাতে নীতি ছিল, আদর্শ ছিল, যা মানুষের মুক্তির কথা ভেবেছিল। হ্যাঁ, মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি প্রধান একটি বিষয়, কিন্তু এটি যেন খোদ মানুষটির বিনিময়ে না আসে। অথচ আজ সারা বিশ্বে মানুষের পরাজয় ঘটছে—সুউচ্চ দালান আর সুদৃশ্য স্থাপনা সে বারতাকে ঢাকতে পারবে না। যে বিশ্ব ট্রাম্প, পুতিন, মোদিকে সামনে তুলে আনে, দীর্ঘদিন সহ্য করে যায় তার যে নৈতিক শক্তির আকাল চলছে সেটা বুঝতে তো অসুবিধা হয় না।

    Reply
  9. আহাদ খান

    “তেঁতুল হুজুররা সঙ্গে থাকলে কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা হইব না। ” কারন এটি চেতনা ও মূল্যবোধ বিরোধী ।

    Reply
    • সরকার জাবেদ ইকবাল

      আহাদ সাহেব, আমি আপনার সঙ্গে একমত। বিষয়টি ethical. যারা নারীকে ভোগ্যপণ্য ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারেন না তাদের হাতে দেশের উন্নয়ন কিভাবে সম্ভব? অবশ্য নারীকে গৃহবন্দী করে রাখার মধ্যেই যদি তারা উন্নয়নের সীমানা চিহ্নিত করে থাকেন তাহলে সে’ ধরনের উন্নয়ন তাদের পক্ষে সম্ভব।

      Reply
    • shobuj

      ekjon sottoy pother alemkey mithay opobad dischay gcv zonnoy manhanir mamla kora dorkar.ajj tumi kotakhoy korctesow ami say asi kalke aer uttor dibo, allahr bicharer dineay.

      Reply
      • সরকার জাবেদ ইকবাল

        সবুজ সাহেব, আমি একজন নামাজী মানুষ। আমি যুক্তি দিয়ে (নারীকে তেঁতুল জ্ঞান করা) কথা বলেছি। আপনিও যুক্তি দিন।

  10. মিয়াদাদ হক

    আজ যারা হেফাজতে ইসলামের সাথে জড়িত তাদের কারা করা রাজাকার? মুক্তিযোদ্ধা সাহেবের কাছে প্রশ্ন? আর এসব হুজুররা দেশের কি ক্ষতি করছে যে দেশের উন্নয়ন ব্যহত হচ্ছে?

    Reply
  11. সাহিত্যিক হাসান

    দেশের বৃহৎ একটি জনসমর্থন রয়েছে তেতুল হুজুরদের,আমিও একজন তেতুল হুজুরের সমর্থক।সুতরাং তেতুল হুজুরদের বাদ দিয়ে দেশের উন্নয়ন বিঘ্রিত হবে আর গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রত্যেক নাগরিক দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখে তেতুল হুজুররাও তো এদেশের নাগরিক তারা তো দেশদ্রোহী কিংবা জঙ্গি নয়।তেতুল হুজরুরাও চায় এদেশ যেন একটি অসাম্প্রদায়িক পরিনত হোক,যেখানে ধর্ম বর্ন নিয়ে ভেদাভেদ থাকবেনা,,প্রত্যেকে তার নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে, তেতুল হুজুররাও চায় সরকারকে সহযোগিতা করে দেশকে স্বয়ংসম্পর্ন করতে।বিষয়টিকে আপনারা অবজ্ঞা করলেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অবজ্ঞা করেননি।এ জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অসংখ্য ধন্যবাদ

    Reply
    • sk Rahman

      আপনার বক্তব্য ভালো লাগলো। তবে দেশ গড়ার ক্ষেত্রে তেতুল হুজুররা কী কী অবদান রাখছে একটু বিস্তারিত বললে আমরাও তাদের মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হতাম। তারা কৃষি ক্ষেত্রে, বিজ্ঞানে অথবা দেশের গুরুত্বপূর্ন কোন বিষয়ে অবদান রাখছেন এমন কোন গবেষণা আছে কি না। দ্বিতীয়ত দওরা হাদীস যদি সরকারী স্বীকৃতি পায় তাহলে কুরআনের হাফেজদের কেমন স্বীকৃতি দেয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন তা-ও জানার কৌতুহল জাগে।

      Reply
  12. মুসা antirajakar

    বাংলাদেশের জনসাধারনের 90 ভাগই মুসলমান সুতরাং নির্বাচনে জিতার জন্য এই জনতার ভোট এবং সমর্থন সব দলেরই প্রয়োজন, শুধু সংখ্যালঘিষ্ঠদের ভোটে জয়ী হবার ইচ্ছা হাস্যকরই বটে, তাই রাজনৈতিক জ্ঞ্যান না থাকলেই শুধু এই ধরনের আবল-তাবল বকা যায়। বাংলাদেশে মুসলমান হলেই তার অর্থ রাজাকার নয়

    Reply
  13. ABSIDDIQUE

    Shahid Uddin described the whole thing very simply. I congratulate him for his word work. Really it is very difficult to accept the Hefazet islam connection with Awami League. Awami League has to rethink.

    Reply
  14. সরকার জাবেদ ইকবাল

    সুপ্রিয় সালেক সাহেব, অত্যন্ত সুনিপুণ লেখনীতে বীর মুক্তিযোদ্ধা লে: না: শহিদ উদ্দীন ভূঞার বীরত্বগাঁথা তুলে ধরার জন্য আপনাকে আন্তরিক অভিনন্দন।

    আমার ধারণা ‘৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার জন্য আপনি উপযোগী বয়সে ছিলেন না। কিন্তু বর্তমানে ধারাবাহিকভাবে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানকে জাতির সামনে তুলে ধরার যে মহতি উদ্যোগ আপনি গ্রহণ করেছেন তাকে আমি ‘দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ’ নামে অভিহিত করতে চাই। আর সেই মুক্তিযুদ্ধের আপনি হলেন অগ্রসেনানী। স্যাল্যুট আপনাকে সালেক খোকন।

    আমিও আপনার মতো এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে একবার প্রশ্ন করেছিলাম, যে দেশের জন্য যুদ্ধ করেছিলেন সেই দেশ পেয়েছেন কিনা। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, “দেশ পাইছি, কিন্তু যহন দেহি রাজাকারের গাড়ীতে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়ে তহন মনডাত (মনে) আর সইহ্য হয় না।”

    লে: নায়েক শহিদ উদ্দীন ভূঞার (আমার শুদু দাদা) স্বপ্ন পূরণ হোক, – এই কামনা। আপনাকে আবারও অভিনন্দন।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—