“History of civilization is written in blood and tears”

২৫ মার্চকে ‘গণহত্যা দিবস’ বা ‘গণহত্যা প্রতিরোধ দিবস’ হিসাবে ঘোষণা দেওয়ার দাবি সামনে এসেছে। যে যৌক্তিক দাবিটি ক্ষীণকণ্ঠে এতকাল উচ্চারিত হয়েছিল তা সবল, প্রবল ও স্পষ্ট হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্পষ্ট উচ্চারণে। বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত এই দিনটি যেমন বিশ্ব মানবতার প্রতি চূড়ান্ত এক আঘাতের দিন, স্বাধীন আকাঙ্ক্ষা ধ্বংসের দিন, শুভ সুন্দর স্বপ্নের উপর অসুর ও অসুন্দরের প্রভুত্ব স্থাপনের দিন, পরিকল্পিতভাবে একটি জাতি ও গোষ্ঠী বিনাশের দিন, তেমনি তা মৃত্যুঞ্জয়ী অলক্ষ্য স্বপ্নের বীজ বপনের দিনও।

দৃশ্যমানভাবে এবং অনুভবে ঐ দিন ছিল লক্ষ মানুষের মৃত্যু, ধ্বংস এবং সর্বোপরি স্বপ্নভঙ্গের দিন। এর প্রভাব রয়ে যায় প্রায় এক কোটি পরিবারের জীবন প্রবাহে। চুড়ান্ত বিচারে ঐ ২৫ মার্চের আঘাতটি ছিল মানুষের জীবনের ন্যায্য অধিকারের প্রতি, মানব মর্যাদার প্রতি, স্বাধীন সত্তা-সংশ্লিষ্ট চিরন্তন আকাঙক্ষার প্রতি নিষ্ঠুরতম আঘাত।

দেশে দেশে ঘটে যাওয়া সভ্যতাবিনাশী, মর্যাদাবিধ্বংসী এমন নিষ্ঠুর ও ভয়াবহ কর্মকাণ্ড প্রতিরোধের জন্যই ২৫ মার্চের মতো দিনগুলো স্মরণীয় করে রাখা প্রয়োজন। এটি স্মরণ করতে হবে এই কারণে যাতে এমন দিন আর কখনও ফিরে না আসে। এ কারণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উচ্চারণকে সাহসী, সময়োপযোগী ও প্রাসঙ্গিক মনে করতে হবে।

২০০৪ সনে একাত্তরের যুদ্ধ, নিষ্ঠুরতা, নির্যাতন তথা যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার সঙ্গে ২৫ মার্চকে সংশ্লিষ্ট করে ঐ সব অপরাধ প্রতিরোধের লক্ষ্যে ঐ দিনটিকে স্মরণীয় করতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি শক্তিশালী উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি। এর আগে বিচারের প্রস্তুতি হিসেবে ২০০১ সনে ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি প্রকাশ করে ‘যুদ্ধাপরাধ গণহত্যা ও বিচারের অন্বেষণ’ নামক ৮৩৮ পাতার বিশাল একটি গবেষণা দলিল এবং ২০০২ সালে প্রকাশ করে ‘যুদ্ধ ও নারী’ শীর্ষক নির্যাতিত নারীদের বয়ানসমৃদ্ধ একটি গ্রন্থ।

নানা পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্লেষণ সমৃদ্ধ এই গ্রন্থ দুটিতে উপস্থাপিত তথ্যকে সত্যনিষ্ঠ তথা বিজ্ঞানসম্মত জেনে বিশেষজ্ঞজন এটাকে যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধের Evidence হিসেবে গ্রহণ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এসব দলিল ইউএস কংগ্রেস লাইব্রেরিতে প্রেরণ করে নিবন্ধন করে (US Congress library, LC Control Number – 2001416755)। অপরদিকে যুক্তরাজ্য এবং কমনওয়েলথ ওয়ার ক্রাইমস সেকশন বিচারের লক্ষ্যে হাত বাড়িয়ে দেয়। তারা WCFFC বরাবর লেখে:

“As you may know, the ICC will work on the basis that the best place for crimes of this sort to be investigated is the domestic jurisdiction, and that the court will only step in where a state is unwilling or unable genuinely to prosecute.

“In the case of the War Crimes Fact Finding Committee in Bangladesh, therefore, I suggest that you approach the domestic prosecuting authorities to consider an investigation or a Court of Inquiry of the sort you are proposing.”

(সূত্র: Foreign & Commonwealth Office, London SWIA 2AH/ Samantha Purdy, War Crimes Section, United Nations Department/ 01 September 2000)

ঐ সব গ্রন্থে বর্ণিত তথ্যসংশ্লিষ্ট প্রমাণগুলো ইমপিরিয়াল ওয়ার মিউজিয়াম সংরক্ষণের ইচ্ছা প্রকাশ করে ২০০৪ সনে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘যুদ্ধ ও নারী’ গ্রন্থে উপস্থাপিত বিষয়গুলোকে যুদ্ধ সংঘাতে নারীর উপর ভয়াবহ আঘাত হিসেবে গুরুত্ব দিলেও অজানা কারণে বৃটিশ মেডিকেল জার্নাল গণহত্যার বিষয়টি খাটো করে দেখার চেষ্টা করে। পাকিস্তান এবং তাদের আন্তর্জাতিক বন্ধু ও সমর্থকগণ পুরো বিষয়টিকে গৌন করে দেখার বা Civil conflict হিসেবে উপস্থাপনের কৌশল গ্রহণ করে।

এ প্রেক্ষিতে ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি গণহত্যা-সংক্রান্ত সংজ্ঞার আলোকে জাতি, ধর্ম, গোষ্ঠী ও লিঙ্গভিত্তিক পরিকল্পিত নিধন, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিসংখ্যান, জেনোসাইড ম্যাপ, Mass grave স্টাডি রির্পোট ইত্যাদি সামনে এনে তা খণ্ডন করার চেষ্টা করে। ২৫ মার্চকে ‘গণহত্যা প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার তাগিদ অনুভব করে WCFFC।

এমন ধারণা করা হয় যে, এভাবে বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যার বিষয়টি আলোচিত, বিশ্লেষিত হওয়ার পথ উন্মোচিত হবে। জাতির শোকের দিন, ব্যথার দিনটি নিবেদিতভাবে পালনের বিষয়টিকে যেমন জাতির আত্মপরিচয় এবং স্বপ্ন নির্মাণ প্রয়াসের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন, তেমনি ঐ ব্যথার দিনটিকে পৃথিবীর নানা জাতি ও গোষ্ঠীর আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্নভঙ্গ ও স্বপ্ন নির্মাণের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। এই দিনটিকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন ন্যায় ও সত্য নির্মাণের চিরন্তন প্রয়াসের সঙ্গে। একে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন সভ্যতার মিনার নির্মাণের কর্মযজ্ঞের সঙ্গে, সহনশীলতার সুবিশাল বলয় ও ক্ষেত্র নির্মাণের সঙ্গে।

২৫ মার্চকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন শান্তি ও মর্যাদার সুবিস্তৃত ভূমি নির্মাণের সঙ্গে। কালে কালে, দেশে দেশে মানবতা ও মানব মর্যাদার মৃত্যু এবং মৃত্যুর মধ্যে টিকে থাকা অবিনাশী আত্মার চিরায়ত আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে গেঁথে দেওয়া প্রয়োজন এই দিনটিকে। আন্তর্জাতিকভাবে এই কাজটি করা এমন সহজ নয়। পাকিস্তান এবং তাদের প্রধান চালিকাশক্তিসহ পশ্চিমা বিশ্বের যে শক্তিশালী গোষ্ঠী ১৯৭১ সনে পাকিস্তানের পক্ষ হয়ে ভয়াবহ নিষ্ঠুর ও নষ্ট খেলায় মেতেছিল এবং ’৭১ সনের পূর্বে ও পরে এমন নষ্ট কাজে সম্পৃক্ত আছে তারা যে এই কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

তবে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার যেমন domestic arena থেকে করা হয়েছে তেমনি করে শুরু করতে হবে এই কাজটি। কালক্রমে যথাযথভাবে উপস্থাপিত হলে ইউনেসকো এই কাজটি মেনে নেবে এটা আমাদের বিশ্বাস। ২০০৪ সনে ইউনেসকোর পরিচালক Pierre Sane তাঁর লিখিত চিঠিতে এমনটা বলেছিলেন বলেই এ বিশ্বাসটি আমাদের হৃদয়ে প্রোথিত হয়ে আছে। তিনি লেখেন:

“I acknowledge with thanks receipt of your email to UNESCO by which you request support to mark 25 March as the International Day of Resistance against War and cruelty.

“In line with Resolution 53/199 adopted by the United Nations General Assembly on 15 December 1998, the procedure for the proclamation of International Years with the UN system implies that “proposals (….) should be submitted [by Governments of Member States or by NGOs] directly to the Assembly, for consideration and action.”

(সূত্র: UNESCO/Assistant Director-General for Social and Human Sciences/Reference: SHS/FPH/PHS/04/026/date 16 March 2004)

অতএব প্রস্তাবটি দেবে রাষ্ট্র। তবেই তা বিচার-বিবেচনায় আসবে। এ কাজটি বিশেষ করে বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যার বিষয়টি প্রমাণ করার দায়িত্বও রাষ্ট্রের। এ ক্ষেত্রে নানা ফরেনসিক Evidence সহ বধ্যভূমির বিস্তারিত তালিকা ও জেনোসাইড ম্যাপ রয়েছে ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির হাতে। রয়েছে নানা ফরেনসিক Evidence সহ গণহত্যা সংক্রান্ত অসংখ্য কেস স্ট্যাডি এবং অকাঠ্য প্রমাণ।

 

genocide-01

 

মনে রাখতে হবে পারসেপশনাল অর্থে যাকে আমরা ‘গণহত্যা’ বলে থাকি অনেক ক্ষেত্রে তা গণহত্যা নয়। কম্বোডিয়ায় ১.৮ মিলিয়ন মানুষের হত্যাকে গণহত্যার সংজ্ঞায় বাঁধা যায়নি। তা বিবেচিত হয়েছে Crimes against humanity of murder হিসেবে।

জেনেভা কনভেনশন ও জেনোসাইড কনভেনশন অনুযায়ী, ‘গণহত্যা’ বলতে সমষ্টির বিনাশ এবং অভিপ্রায়কে বোঝায়। এই ‘গণহত্যা’ বলতে বোঝায় এমন কর্মকাণ্ড যার মাধ্যমে একটি জাতি, ধর্মীয় সম্প্রদায় বা নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে নিশ্চিহ্ন করা হয় এবং এ-সংক্রান্ত অভিপ্রায় ব্যক্ত করা হয়।

১৯৪৮ সালের ৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত রেজ্যুলেশন ২৬০(৩)-এর অধীনে গণহত্যাকে এমন একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় যা বিশ্বময় প্রতিরোধে সব রাষ্ট্র অঙ্গীকারাবদ্ধ। সংজ্ঞা অনুযায়ী গণহত্যা কেবল হত্যাকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

এ ক্ষেত্রে জাতিগত, গোষ্ঠীগত বা ধর্মগত নিধনের উদ্দেশ্যে যদি একটি লোককেও হত্যা করা হয়, সেটাও গণহত্যা। যদি কোনো জাতি, গোষ্ঠী বা বিশেষ ধর্মের মানুষের জন্ম রুদ্ধ করার প্রয়াস নেওয়া হয় বা পরিকল্পিতভাবে বিশেষ জাতি ও গোষ্ঠীভুক্ত নারীর গর্ভে একটি ভিন্ন জাতির জন্ম দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, সেটাও গণহত্যা। তবে শেষের বিষয়টিকে ‘জেনোসাইডাল রেপ’ বলা হয়।

মানুষ উচ্চপর্যায়ের বুদ্ধি প্রয়োগ করেই সমষ্টির হিতজ্ঞানকে পরিকল্পিতভাবে বিলুপ্ত করে এবং নষ্ট কর্মে ঠেলে দেয়। যারা এ কাজটি করে বা করেছে তারা ব্যক্তিগত জীবনে স্বাভাবিক কর্মক্রিয়া সাধন করলেও এবং উচ্চজ্ঞান ও বুদ্ধিসম্পন্ন হলেও নষ্ট ইচ্ছার কারণেই এমন কর্ম সম্পাদন করে। পেছনের এই নষ্ট শক্তিকে গণহত্যার মুখ্য সংঘটক বা Prime Perpetrator বলে। এরা সমষ্টির উপর নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করে এবং ক্ষমতা প্রয়োগ করে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে মানুষকে মানুষ মনে না করার শিক্ষাটি দান করে।

ঘাতক যখন Dehumanization কাজটি রপ্ত করে তখন নির্বিচারে জাতিগত অহংকার অথবা ধর্মোন্মাদনা বুকে ধারণ করে অথবা বিশেষ আত্মপরিচয় নিয়ে ভিন্ন ধর্ম, গোত্র, বর্ণ, লিঙ্গ এবং অপরিচিতজনকে সমূলে বিনাশ করে অথবা ভিন্ন জাতি, গোষ্ঠী বা গোত্রকে নির্মূল করার চেষ্টা করে। সামগ্রিকভাবে এই অপরাধের কোনো ব্যাখ্যাই একে বৈধতা দিতে পারে না। সভ্যতাবিনাশী এই প্রবণতাকে রোধ করবার জন্যই রচিত হয়েছে ‘জেনোসাইড কনভেনশন’।

১৯৭১ সালের ২৫ থেকে ২৯ মার্চের মধ্যে কুমিল্লা ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারে প্রায় ৩০০ বাঙালি সৈন্য ও ১৬০০ বেসামরিক লোককে আটক করে পাকিস্তানি সেনারা।
লে. কর্নেল মনসুরুল হক হামুদুর রহমান কমিশনের নিকট এক সাক্ষ্যে জানায়, ইয়াকুব মালিকের অঙ্গুলি হেলনে ১৭ জন বাঙালি অফিসারসহ ৯১৫ জন মানুষকে জবাই করে হত্যা করা হয়। সালদা নদী অঞ্চলে আরও ৫০০ লোককে হত্যা করেছিল পাকিস্তানি সেনারা। একাধারে এটা ছিল Crimes against humanity of murder এবং War crimes। সেনা নিধনের বিষয়টিকে গণহত্যা বলা না গেলেও সাধারণের এই পরিকল্পিত বিনাশ ছিল গণহতার অংশ।

জগন্নাথ হলে হিন্দু শিক্ষক ও ছাত্রকে হিন্দু বলেই আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বলে বিবেচনা করা হয়েছে। ১৯৭১-এ হিন্দুকে যেমন সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিহ্ন করার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে, তেমনি হিন্দু সম্প্রদায় ও বাঙালির গর্ভে পাকিস্তানি এবং তথাকথিত সাচ্চা মুসলমান তৈরি করবার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। প্রয়াত পাকিস্তানি মেজর জেনারেল কে. এইচ. রাজা তার ‘A Stranger in my Country- East Pakistan 1969-1971’ গ্রন্থে উলে­খ করেন:

“Gen. Niazi told his officers to let loose their soldiers on the women of East Pakistan till the ethnicity of the Bengalies was changed.”

সিলেট অঞ্চলের পাকিস্তানি অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার ইফতেখার এবং ময়মনসিংহের মেজর ইফতেখার রানা উভয়ই জেনারেল নিয়াজির ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে হিন্দু সম্প্রদায় বিশেষ করে উচ্চ বর্ণের হিন্দু নারীর গর্ভে পাকিস্তানি জন্ম দেওয়ার প্রয়াস চালিয়েছিল। এই জেনোসাইডাল রেপের শুরু হয় ’৭১ সনের ২৫ মার্চ রাতে। এটা কালক্রমে তুঙ্গে উঠে এপ্রিলের শেষ ও মে মাসে।

১৬ জুন ২০০৩ তারিখে, WCFFC-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ব্রিগেডিয়ার মজুমদার বলেন: “’৭০-এর ডিসেম্বরের শেষে বা ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে তিনি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে একটি চিঠি পেয়েছিলেন। ঐ চিঠিতে কর্তৃপক্ষ জানান যে, শেখ মুজিবের ছয় দফা বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তান আর্মিতে পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্য ক্ষুণ্ন হবে এবং তাদের সামরিক স্বার্থ ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হবে।”

চিঠির শেষ অংশে লেখা ছিল:

‘Therefore the Army cannot allow Sheikh Mujib to become the Prime Minister of Pakistan.’

ঐ চিঠিতে সম্ভবত DMO অথবা DMI-এর স্বাক্ষর ছিল।

সেই চিঠিটার প্রসঙ্গ সিদ্দিক সালিকের বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। সিদ্দিক সালিক সেখানে বলেছেন যে, ঐ সময় একজন জেনারেল এখানে এসেছিল এবং সে গভর্নর হাউসে বলেছিল:

“Don’t worry, we will not allow these black bustards to rule over us.”

নানা বিচারে ২৬ মে বালাগঞ্জে ৭৬ জন, বুরুঙ্গাতে ১৩৬ জন ও সৈয়দপুরের গোলারহাটে ৪১৩ জন, নারী, শিশু ও পুরুষ হত্যাকে গণহত্যা বলা যায়। বুরুঙ্গাতে এক হাজার গ্রামবাসী থেকে বেছে বেছে ৪১ জন হিন্দুকে হত্যা করা হয়। চুকনগর হত্যাকাণ্ডটি মিশ্রিতভাবে পরিচালিত গণহত্যা এবং Crimes against humanity of murder-এর একটি উদাহরণ। Enforced disappearance I Enforced migration-এর অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল।

বাঙালি বিশেষ করে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের প্রতি বিদ্বেষ, ঘৃণা ও প্রতিহিংসার শীর্ষ প্রকাশ ঘটেছে বুদ্ধিজীবীর হত্যার মধ্য দিয়ে। ২৫ মার্চ রাতে অধ্যাপক গোবিন্দচন্দ্র দেব, অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, অধ্যাপক অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য ও অধ্যাপক মুনিরুজ্জামানসহ অন্যান্য শিক্ষক এবং সৈয়দপুরের ডাঃ জিকরুলসহ অন্যান্য বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবী হত্যার মধ্য দিয়ে যে পরিকল্পিত বুদ্ধিজীবী হত্যা বা গণহত্যা শুরু হয়েছিল তা ক্রমে ক্রমে ধীরেন দত্ত ও রণদাপ্রসাদসহ অন্যান্যদের গ্রাস করে। এটা শেষ হয় প্রগতিশীল চিকিৎসক ডাঃ রাব্বি, অধ্যাপক মুনির চৌধীর, অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিনসহ সাত শিক্ষক হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। এটা কেবল বুদ্ধিজীবী হত্যা ছিল না। এটা ছিল পরিকল্পিত গণহত্যা।

কেবল অর্থনৈতকি স্বার্থ বা রাজনৈতিক অভিসন্ধি নয়, বাঙালির প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ ২৫ মার্চ হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্যতম প্রণোদনা হিসাবে কাজ করে। বাঙালির প্রতি বিদ্বেষ, ঘৃণা এবং ক্রোধের বিষয়টি Prime perpetrator বিশ্বাসের সঙ্গে মিলেমিশে ছিল। তাদের শীর্ষ ক্রোধ ছিল বাঙালি জাতিসত্তায় বিশ্বাসী রাজনৈতিক কর্মী এবং প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের উপর।

হত্যা ও গুমের জন্য গেস্টাপো বাহিনীর আদলে ‘আলবদর বাহিনী’ নামক killing squad গঠন করে পাকিস্তান। মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর তত্ত্বাবধানে জেনারেল জামশেদ ও জেনারেল রহিম এর নেতৃত্ব দেয়। আলী আহসান মুজাহিদ, কামরুজ্জামান, মাঈনুদ্দীন, আশরাফুজ্জামান খান গং এই বাহিনীর মাঠ পর্যায়ের নেতা ও Execution Head হিসেবে কাজ করত।

কুখ্যাত সামরিক শাসক আইয়ুব খান মনে করতেন:

“Bengalees are lower class race, unfit to enjoy any kind of freedom, Pakistanis had every right to rule over the defeated nation- Bengalees, that was his point of view.”

(Massacre, Robert Payne, page 30)

এই আইয়ুব খান মনে করতেন যে, সাহসী ও গুণসম্পন্ন মানুষগুলো কেবল পশ্চিম পাকিস্তানেই আছে। তিনি তার ডায়েরিতে লেখেন:

“We can only face and hold him (India) in cheek with quality manpower, which lies in West Pakistan…the trouble here is that such quality manpower is not easily available in East Pakistan.”

নিয়াজি বাঙালি ও বাংলাদেশ সম্পর্কে বলেছিলেন:

“It was a low lying land of low lying people”. The Hindus among the Bengalees were as Jews to the Nazis, scum and vermin that should best be exterminated.”

গণহত্যা নির্ধারণের মূল বিষয়টি হল অভিপ্রায় ও পরিকল্পনা। এতে চিহ্নিত হওয়া প্রয়োজন পরিকল্পকদের পরিচয় এবং স্পষ্ট হওয়ার প্রয়োজন জাতিগত, গোষ্ঠীগত তথা সম্প্রদায়ভিত্তিক বিনাশের পরিকল্পনাটি। এটি কার্যকর করার পদ্ধতি এবং বাস্তবায়নের প্রমাণ অতীব গুরুত্বপূর্ণ।

উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানের ৩২ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট তাদের অধিনায়ক লে. কর্নেল তাজের নির্দেশে প্রায় এক হাজার পুলিশ সদস্যকে রাজারবাগে হত্যা করলেও ওই ঘটনাকে গণহত্যা হিসেবে প্রমাণ করা যাবে না। পাকিস্তান সেটিকে সশস্ত্র বিদ্রোহ দমন হিসেবে উপস্থাপন করবে এবং তা চূড়ান্ত বিচারে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ বা Crimes against humanity of murder হিসেবে বিবেচিত হবে যদি রায় বাংলাদেশের পক্ষে যায়। একই কথা প্রযোজ্য পিলখানায় ইপিআর নিধন, চট্টগ্রামের ইবিআরসিতে প্রায় হাজার সেনা হত্যাকাণ্ড এবং কুমিল্লা ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার ময়নামতিতে ৯০০ সেনা ও ১৭ অফিসারের হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে।

অপরদিকে জগন্নাথ হলে যে গণহত্যা সাধিত হয় তাতে দেখা যায় যে নিহত ৪১ জনের মধ্যে ৪০ জনই হিন্দু। ঐ স্থানে ৩২ পাঞ্জাবের অধিনায়ক কর্নেল তাজের আগমন, তার এবং তার সঙ্গীদের কার্যকলাপ প্রমাণ করে তাদের জাতিগত ও ধর্মগত বিদ্বেষ ও হিন্দু নির্মূল অভিপ্রায়। এমন অভিপ্রায় ব্যক্ত হয়েছে prime perpetrator পাকিস্তানি ও তাদের দোসরদের নানা বয়ানে। এ ক্ষেত্রে তাদের নানা Hate message প্রণিধানযোগ্য। তাদের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডই প্রমাণ করে সেই অভিপ্রায় ও পরিকল্পনা যা গণহত্যার সমার্থক।

১৯৭১ সনের আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি আলোকিত অংশ এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলো বাংলাদেশে সংঘটিত হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনসহ অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মুখ্য অপরাধী ও তাদের দোসরগণের বর্বরতা সামনে আনলেও পশ্চিমা দেশগুলোর শঠতা, নীতিহীনতা এবং নষ্ট রাজনীতির কারণে বাংলাদেশের গণহত্যার বিষয়টি ইতিহাসের কৃষ্ণ বিবরে স্থান পেয়েছিল। এর পেছনে ছিল অপরাধীর সঙ্গে অপশক্তির সখ্য এবং অতীতে নানা দেশে এমন ভয়াবহ অপরাধের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা। এর পেছনে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব সংক্রান্ত চিত্রটি অবিচল ও অমোচনীয় রেখে ফায়দা লাভের রাজনীতি সবল থেকেছে সব সময়। তাই পদদলিত হয়েছে দুর্বলের মর্যাদা তথা ন্যায় ও সত্যের অধিকার।

পাকিস্তান থেকে কারামুক্ত হয়ে দেশের মাটিতে নামার আগেই ৮ জানুয়ারি লন্ডনের মাটিতে বঙ্গবন্ধু বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলেন: “পাকিস্তান জঘন্য খেলায় মাতিয়াছিল।”

তিনি আরও বলেন: “বাংলাদেশে যে গণহত্যা হইয়াছে তাহার বিচার হইবে।”

এই সময়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ’৭১-এ গণহত্যা ও নারী নির্যাতন-সংক্রান্ত তদন্ত শুরু হয় তৎকালীন পুলিশের ডিআইজি জনাব মঞ্জুরুল ইসলামের নেতৃত্বে। ১০ মে সংবাদ সংস্থা এনা জানায়: ‘দেড় হাজার পাকিস্তানি সামরিক কর্মচারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ গঠিত হয়েছে।’

বঙ্গবন্ধুর অকাল প্রয়ানে দৃশ্যপট বদলে যায়। থেমে যায় জাতীয় স্বার্থ, পরিচয় ও মর্যাদার সঙ্গে সম্পৃক্ত নানা উদ্যোগ। ১৯৭৫ সনের পরবর্তী ঘটনাবলী তথা বিচারহীনতা বা ন্যায় বিচার প্রতিরোধে ’৭৫-এর পরবর্তী সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপ ভয়াবহ বর্বরতার নির্দশন হয়ে আছে। সেই সঙ্গে ’৭১-এর স্মৃতি ভুলিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টাগুলো কেবল একটি মসিলিপ্ত অধ্যায় হিসেবে থাকেনি তা কয়েক জেনারেশন বাংলাদেশিকে বিভ্রান্তির পথে ঠেলে দিয়েছে।

২৫ মার্চের কৃষ্ণরাতে জমাট হয় যে আকাঙক্ষা তা স্বাধীনতা সংগ্রামে অসামান্য শক্তিশালী অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। এটাকে সামনে এনে আলোকজ্জ্বল করতে হবে জাতির আত্মপরিচয় ও মূল্যবোধ নির্মাণের জন্য। এ কাজটি করতে পারেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনিই জ্বালাতে পারেন মানবতা ও মানব মর্যাদার আলোকে দীপ। এ আলোকই আলোকিত করবে জাতির আত্মপরিচয়।

“Some of us are like ink and some like paper.
And if it were not for the blackness of some of us, some of us would be dumb;
And if it were not for the whiteness of some of us, some of us would be blind.”

— Kahlil Gibran

ডা. এম এ হাসানবাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত গবেষক

Responses -- “গণহত্যা দিবস: প্রাসঙ্গিক ভাবনা”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—