কিশোর বয়সের কথা মনে পড়ছে, পাকিস্তানি আমলের কথা মনে পড়ছে, সেই সময়ে প্রভাতফেরির কথা মনে পড়ছে, মনে পড়ছে আরও সেই গানের কথা– ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’। এই গান শুনে ঘুম থেকে উঠে প্রভাতফেরিতে যোগ দিতাম, প্রভাতফেরি যে দিক দিয়ে যেত, তার দুপাশে বাংলার বদলে ইংরেজি সাইনবোর্ড বা অন্যকিছু থাকলে, তা ভেঙে ফেলা হত। এই ভাঙার প্রয়োজন ছিল; সেই সময়ে এভাবে বিক্ষুব্ধ না হলে হয়তো শাসকগোষ্ঠীর টনক নড়ত না, মানুষের মনেও প্রতিক্রিয়া হত না।

আজ প্রভাতফেরি নিছক আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হয়ে পড়েছে, প্রভাতফেরি শুধু শহীদ মিনারে গিয়ে একরৈখিকভাবে শেষ হয়ে যাচ্ছে! শহীদ দিবসের যে মূল তাৎপর্য– সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহার ও তার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা– তা অনেকাংশে শিথিল হয়ে পড়ছে। এই শিথিলতা আর সহ্য করা যায় না।

যা ইচ্ছে তাই ভেবে যুক্তিহীনভাবে একধরনের হীনমন্যতার বশে; যেখানে প্রয়োজন নেই সেখানেও ইংরেজি ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। টিভি ও পত্রপত্রিকায় ইংরেজি বিজ্ঞাপনের জয়জয়কার! ঢাকা নগরের অনেক দোকানপাট, প্রতিষ্ঠানের নাম শুধুই ইংরেজিতে লেখা হচ্ছে। বাংলাদেশের সংবিধানে বাংলা ভাষার উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার দিক-নির্দেশনা থাকলেও চার দশক পার হওয়ার পরও বাংলা দাপ্তরিকসহ রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে আবশ্যিক ভাষা হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে না।

এই সময়ে এসেও দেখা যায় সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার, নামফলক, দেওয়াল লিখন হচ্ছে ইংরেজিতে। সরকারি পর্যায়ের বিভিন্ন বিলের ভাষা বাংলা নয়, ইংরেজিতে। গণমাধ্যমের বিভিন্ন পর্যায়েও বাংলা ভাষার করুণ পরিস্থিতি। ঘরে ও বাইরে অন্ধকার ঘনীভূত হচ্ছে বাংলা ভাষার আলোটুকু গ্রাস করার জন্য। এগুলো আমরা সাদা চোখে প্রকাশ্যে লক্ষ করছি। এসব প্রবণতা রোধ করতে হলে আবারও পাকিস্তানি আমলের বিরূপ পরিবেশে গড়ে ওঠা বিক্ষুব্ধ মিছিলকে আমন্ত্রণ জানাতে হবে? অবস্থা দেখে তাই তো মনে হয়।

ভাষা আন্দোলনের অন্যতম দাবি ছিল সরকারের প্রশাসনিক কাজকর্মে বাংলা ভাষা মর্যাদার সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে। এই দাবি দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় কখনও কখনও জোরালো হয়েছিল, তা আজ যেন অমাবশ্যার অন্ধকারে অন্তর্ঘাতমূলক অবস্থায় পতিত হয়েছে, যার ফলে সরকারি পর্যায়ে বাংলা ভাষা ব্যবহারের শিথিলতা এখন আগের চেয়ে আরও বেড়েছে।

একটি উদাহরণ দিই, ১৩৯০ সনের ২৮ মাঘ এক সরকারি নির্দেশে বলা হয়েছিল, ‘সরকারি নথিপত্রে বাংলা ভাষা ব্যবহার না করা শৃঙ্খলাবিধি অনুযায়ী অসদাচারণ বলে গণ্য হবে এবং প্রতিটি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর)-এ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বাংলা ভাষা ব্যবহারে আগ্রহ ও দক্ষতার বিষয়টি উল্লেখ থাকতে হবে।’

এ নির্দেশ জারির পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনে আলাদা একটি ছক সংযোজন করা হয়েছিল। এর ফলে বাংলা ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা ছিল এবং বাংলা ব্যবহারের উৎসাহ সৃষ্টি হয়েছিল। সরকারি প্রশাসনে ভাষা বিষয়ে জটিলতা ও স্থবিরতা অনেকটা কেটে গিয়েছিল।

আমরা জানি, একটি ফাইলে যে নোট দেওয়া হয় তার সঙ্গে একটি কার্যালয়ের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী যুক্ত থাকেন এবং সেই নোট অনুযায়ী বিভিন্ন জনের ভূমিকা গ্রহণ করতে হয়। সেখানে যদি অভিন্ন ভাষায় নোট লেখা হয়, তবে অনাবশ্যক জটিলতা কমে যায়, কাজের গতি বাড়ে। কিন্তু মুষ্টিমেয় কর্মকর্তার হীনমন্যতার কারণে অভিন্ন ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে জটিলতা বাড়ছে। শুধু তাই নয়, কোনো কোনো সরকারি কর্তাব্যক্তির ইংরেজি ভাষা তোষণের কারণে এবং সরকারের উদাসীনতার জন্য উল্লিখিত বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনের ছকটি ১৩৯৯ সনে বাতিল করা হয়, যা ১৩৯৮ সন পর্যন্ত নিয়মিত পূরণ করা হত। ১৩৯৯ সনে বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন ছাপা হয়, তাতে এই ছকটি আর ছাপা হয়নি!

এ বিষয়টি অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সেই সময়ে বিস্মিত করেছিল। কিন্তু এর পরবর্তীতে প্রশাসনে বাংলা ভাষা ব্যবহারের মূলে কুঠারাঘাত করার এই বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনা হয়নি। কোনো রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন থেকেও প্রতিবাদ ওঠেনি। এভাবে চোরাগোপ্তা হামলার শিকার হচ্ছে বাংলা ভাষা।

পূর্ববর্তী (১৩৯০) সরকারি নির্দেশে বলা হয়েছিল, ‘এখন থেকে মন্ত্রী ও সচিবের কাছে পাঠানো নথিতে বাংলা নোট লিখতে হবে। নইলে তা বিবেচনার জন্য গৃহীত হবে না।’

আমাদের আশ্চর্য হতে হয় স্বৈরশাসক এরশাদের আমলে বাংলা ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে, বিশেষত সরকারি প্রশাসনে-প্রতিষ্ঠানে যতটুকু অগ্রগতি সাধিত হয়েছিল, সেই অগ্রগতির ধারাটুকু ধীরে ধীরে রুদ্ধ করা হয়েছে! এমনকি বাংলা ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সেই সময়ে কিছু বাস্তবধর্মী আইন ও কৌশল গ্রহণ করা হয়েছিল, তা বাংলা প্রচলনে বিশেষ সহায়ক হয়েছিল।

বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী বলে গর্ব করা এবং বাংলা ভাষার দরদী বলে জিগির তোলা সরকারকে দেখছি, তারা সরকারি পর্যায়ে বাংলা ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বৈরশাসকের শাসনামলের চেয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারছে না। বরং এ সরকারের আমলে বাংলা ভাষা প্রচলনের পূর্ববর্তী নিয়ম-নির্দেশ অবজ্ঞা করা শুধু হচ্ছে না, বাংলা ভাষা প্রচলনের সম্ভাবনা ও শক্তিকে সংকুচিত করা হচ্ছে কিছু কিছু ক্ষেত্রে। তাহলে আমরা কি ভাববো না, এই সরকার বাংলা ভাষার কাঙ্ক্ষিত মিত্র হয়ে উঠতে পারেনি!

অথচ ১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমির এক সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান দৃপ্ত উচ্চারণে ঘোষণা দিয়েছিলেন:

“ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে আমি ঘোষণা করছি, আমার দল ক্ষমতা গ্রহণের দিন থেকেই সকল সরকারি অফিস-আদালত ও জাতীয় জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে বাংলা চালু করবে। এ ব্যাপারে আমরা পরিভাষা সৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করব না। কারণ, তাহলে কোনোদিনই বাংলা চালু করা সম্ভবপর হবে না। এই অবস্থায় হয়তো কিছু কিছু ভুল হবে, তাতে কিছু যায় আসে না। এভাবেই অগ্রসর হতে হবে।”

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবং সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আকবর আলী খানের ভাষ্যানুযায়ী বঙ্গবন্ধু যেদিন দপ্তরে বসেছিলেন, সেদিনই ইংরেজিতে লেখা একটি নথি নিয়ে তাঁকে যেতে হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর কাছে। ইংরেজিতে লেখা নথি দেখে বঙ্গবন্ধু উষ্মা প্রকাশ করে প্রশ্ন করেছিলেন যে, “এই স্বাধীন দেশেও কি তাঁকে ইংরেজিতে লিখিত নথি দেখতে হবে?”

অতঃপর তিনি তাঁকে এই মর্মে একটি প্রজ্ঞাপন জারির নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, এখন থেকে সব নথি বাংলায় লিখিত হতে হবে।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে গিয়ে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে বাংলাকে গ্রহণ করার জন্য বলেছেন, অথচ তাঁর সরকারের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে বাংলা এখন কতটুকু গুরুত্ব পাচ্ছে, তা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। শুধু দাপ্তরিক কাজে নয়, আইন-আদালতসহ প্রায় সর্বস্তরে আজ বাংলা ভাষার ব্যবহার কমছে, ইংরেজির ব্যবহার বাড়ছে। আমরা ভাষা আন্দোলন ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গৌরবে নিজেদের অহং প্রকাশে আনুষ্ঠানিকভাবে তৎপর হলেও বাংলা ভাষার বিকাশে তৎপর কতটুকু, তা বিবেচনায় টেনে আনা উচিত। ভাষা ব্যবহারের জন্য হঠাৎ হঠাৎ করা কিছু পদক্ষেপ ও ঘোষণা এসেছে, কিন্তু একটি ‘জাতীয় ভাষানীতি’ আমরা ভাষা আন্দোলনের ৬২ বছর পার হওয়ার পরও প্রণয়ন করতে পারিনি।

শহীদ দিবসে কি শুধু গতানুগতিক এক আনুষ্ঠানিকতায় আমরা ফুল দিতে যাব? নাকি পাকিস্তানি আমলের মতো বাংলা প্রচলনের শিথিলতা, সরকারি পর্যায়ে বাংলা ভাষা প্রচলনে গাফিলতির বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়ে শ্লোগানমুখর মিছিলের সৃষ্টি করব? যে মিছিল শুধু শহীদ মিনারে যাবে না, অন্যখানেও যাবে। সেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

আসুন, শহীদ দিবসের প্রাক্কালে তাই বিবেক জাগানো প্রশ্ন নিয়ে জেগে উঠি।

গোলাম কিবরিয়া পিনুকবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক

Responses -- “বাংলা প্রচলনে শিথিলতার উদাহরণ ও গতানুগতিক আনুষ্ঠানিকতা”

  1. সরকার জাবেদ ইকবাল

    সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহার নিশ্চিত করার আগে জরুরি হলো আমরা শুদ্ধভাবে বাংলা বলতে এবং লিখতে পারি কিনা তা যাচাই করা। যারা বাংলায় লেখালেখি করেন তারা অবগত আছেন ব্যাকরণসম্মতভাবে বাংলা বাক্য তৈরি করা এবং শুদ্ধ বানানে বাংলা শব্দ লিখা কতটা কঠিন।

    Reply
  2. সফিকুল ইসলাম

    সরকারি অফিসে পুরোপুরি বাংলা ব্যবহৃত হয়। লেখক মনে হয় বিষয়টি অবগত নন। অথচ এ নিয়ে পুরো কলামটি লেখা। তবে আদালতে বিশেষ করে উচ্চ আদালতে বাংলা ব্যবহৃত হয় না। তা ঠিক । এ নিয়ে মাত্র অর্ধ বাক্য কলাম জুড়ে। অনেক প্রাইভেট/ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বাংলা ব্যবহৃত হয় না।

    Reply
  3. সৈয়দ আলি

    “অথচ ১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমির এক সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান দৃপ্ত উচ্চারণে ঘোষণা দিয়েছিলেন” – মানলাম এটি দৃপ্ত একটি ঘোষনা। তাহলে এক বছরের মধ্যে সর্বস্তরে বাংলাভাষা চালু হয়নি কেন? কেউ কি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল? কে?

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—