১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির চরম আত্মোৎসর্গের চেতনা ধারণ করে বাংলাদেশের মানুষ অবিরাম সংগ্রাম করে চলেছে বাংলা ভাষাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার এক মহান ব্রতে। এই ভাষার দাবি কেন্দ্র করে শুরু হয়েছিল স্বাধিকারের আন্দোলন। এরই প্রেক্ষাপটে পরিচালিত হল সশস্ত্র সংগ্রাম; অর্জিত হল আমাদের মহান স্বাধীনতা।

বাংলা ভাষাকে বিশ্বপরিমণ্ডলে প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রাম কখনও থেমে ছিল না। অবশেষে ১৯৯৯ সালের নভেম্বর মাসে জাতিসঘের শিক্ষা, বিজ্ঞানও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো কানাডা প্রবাসী বাঙালি তরুণদের আবেদনের প্রেক্ষিতে এবং বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে একুশের চেতনা ধারণ করে ‘আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারিকে স্বীকৃতি প্রদান করে। এরপর ২০০৭ সালে ১৬ মে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে মাতৃভাষাকে যথাযথ মর্যাদাসহকারে বিশ্বের প্রতিটি দেশ উদযাপন করবে। উল্লেখ করা হয় বিশ্বব্যাপী সব মানুষের ভাষার সুরক্ষা এবং উপস্থাপনার সুযোগ সৃষ্টি করাই হবে লক্ষ্য। এ হচ্ছে ভাষাপ্রেমিক বাঙালি জাতির বিশাল অর্জন।

ইউনেসকো ২০১৭ সালের এই আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসের প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করে ‘Towards Sustainable Futures through Multilingual Education’। এই উপলক্ষে ইউনেসকোর মহপরিচালক ইরিনা বোকোভা তাঁর বাণীতে বলেন–

“On this occasion of this Day, I launch an appeal for the potential of multilingual education to be acknowledged everywhere, in education and administrative systems, in cultural expressions and the media, cyberspace and trade.”

বহুমাত্রিক ভাষার মাধ্যমে শিক্ষা ও সংস্কৃতির চর্চা এবং প্রশাসনিক পদ্ধতির প্রচলন করার এই আবেদন কতটা প্রয়োগ হবে এই নিয়ে সর্বত্র চলছে চিন্তাভাবনা। তবে বিলুপ্তির পথে অগ্রসর হওয়া ভাষাসমূহকে রক্ষা করতেই হবে।

বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ৭ হাজার ভাষা আছে। অনেক ভাষার কোনো লিপিমালা নেই। তারা হারিয়ে যাচ্ছ কালের গহ্বরে। কারণ তাদের বংশধরেরা বৃহৎ ভাষাভাষী এবং উন্নত লিপিমালায় সমৃদ্ধ ভাষাকে তাদের আপন করে নিয়েছে। হারিয়ে যাওয়ার পথে চলমান ভাষাকে রক্ষা করতে প্রত্যেক দেশ ও জাতির প্রতি আবেদন জানিয়েছে ইউনেসকো। কিন্তু এ হচ্ছে এক গতিশীল ও প্রবাহমান ভাবধারা, যেখানে দেশ ও জাতি এবং সমাজ ও সমষ্টির প্রভাব বিশেষ ভূমিকা পালন করে। তাই দেখা যায় বাংলাদেশে প্রায় ৪৭টি ভাষা বিরাজমান থাকলেও কালের প্রভাবে আদিবাসীদের ভাষাকে বাংলা ভাষা প্রবাভিত করে চলেছে। বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের ভাষার সুরক্ষার জন্য পৃথক ‘ভাষা একাডেমি’ প্রতিষ্ঠার দাবি তুলেছে। কিন্তু বাংলা ভাষার প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা কম। কারণ বিশ্বব্যাপী বাংলার প্রভাব বাড়ছে, প্রায় ৩৫ কোটি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে।

এই ভাষার সুরক্ষা এবং আরও উন্নত করে জীবনের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রয়োগ করার একটি উদ্যোগ হচ্ছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা। এই গ্রন্থমেলার সঙ্গে মিশে আছে আমাদের প্রাণের স্পন্দন, মনের আকুতি এবং হৃদয়ের অভিব্যক্তি। এই মেলার মাঝে উদ্ভাসিত হয়ে থাকে আমাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতির ঐতিহ্য। সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের উন্মেষ হচ্ছে আমাদের প্রত্যাশা।

তাই প্রতি বছর একুশের বইমেলা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের আত্মত্যাগের ইতিহাস, কণ্ঠে ভেসে আসে: “আ মরি বাংলা ভাষা, তোমার বোলে, তোমার কোলে, কত শান্তি ভালোবাসা।”

পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-বুড়িগঙ্গা-ধলেশ্বরী-মধুমতি নদীপাড়ের মানুষের জ্ঞানচর্চার বইমেলা যেমন অবদান রেখেছে সত্য ও সুন্দরের ভাবনায় উদ্দীপ্ত হতে, তেমনি সৃষ্টি করেছে কবি সাহিত্যিক, লেখক ও পাঠকের মিলনমেলা রূপে গড়ে তুলতে। বাঙালির দোদীপ্যমান বাতিঘর মানুষের মনের অন্ধকার ঘোচাতে বই পড়া বা জ্ঞান আহরণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে প্রকাশ পেয়েছে আমাদের বইমেলা। বই কেনা আর বই পড়ার অভ্যাস অগণিত শিক্ষার্থীকে অনুপ্রাণিত করেছে তা-ই নয়, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভুবনকে বিকশিত করতে সাহায্য করেছে।

বর্ধমান হাউসের খোলা মাঠে বটবৃক্ষের নিচে ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি পাটের মাদুর পেতে পুঁথিঘরের প্রকাশিত মাত্র ৩২টি বই নিয়ে বইমেলার সূচনা করেছিলেন প্রয়াত চিত্তরঞ্জন সাহা। তিনিই হচ্ছেন বইমেলার অগ্রদূত। বই পড়ার এ আন্দোলন এবং বই কেনার পক্ষে অনেক আকর্ষণীয় বার্তা ও আবেদন সাধারণ প্রর্দশনী হিসেবে বেশ কয়েক বছর চললেও ১৯৭৬ সালে আরও কয়েকটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বইমেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে বাংলা একাডেমি চত্বরকে আকর্ষণীয় করে তোলে। ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শ্রদ্ধেয় আশরাফ সিদ্দিকী এই মেলার সঙ্গে বাংলা একাডেমিকে সংযুক্ত করে মেলায় নতুন মাত্রা যোগ করেন। ১৯৮৪ সালে এই বইমেলার নামাকরণ করা হয় ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’। শুরু হয় বইমেলার এক নতুন অভিযাত্রা।

এবার ২০১৭ সালে বইমেলায় স্থান পেয়েছে ৬৬৩টি স্টল যার মধ্যে বাংলা একাডেমির চত্বরে জায়গা পেয়েছে ১১৪টি ,অবশিষ্ট ৫৪৯টি স্থান পেয়েছে সোহরাওয়ারর্দী উদ্যানে। মোট ৪০৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এবার অংশগ্রহণ করছে মেলায়। মেলা উপলক্ষ করে গত বছর প্রকাশিত হয়েছিল প্রায় পাঁচ হাজার বই। এবার হবে প্রায় সাত হাজার এবং বেচাকেনা হতে পারে প্রায় ৩০ কোটি টাকার বই।

তবে লক্ষ্যণীয় যে, মেলা উপলক্ষে বাংলা একাডেমি প্রত্যেক বইয়ের উপর কমপক্ষে ৩০ শতাংশ ছাড় দিয়ে থাকে এবং অন্যান্য বইয়ের বিক্রেতারা কমপক্ষে ২৫ শতাংশ কম দামে বই বিক্রি করে থাকে। অনেক লেখক তাদের পরিচিতি ও স্বজনদের বই উপহার দেয় প্রচুর। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এবং বিক্রেতারা বিজ্ঞাপনী বার্তা প্রচার করছে অবিরাম। মেলার প্রবেশদ্বারে পোস্টার আর প্রচারপত্রের ছড়াছড়ি।

শুধুমাত্র বইয়ের বেচাকেনার কথা বললে মেলার সার্বিক দৃশ্য পরিস্ফুট হয়ে উঠবে না। মূলত বইমেলা হলেও এখানে আছে আরও অনেক বেচাকেনার দৃশ্যপট। যেমন আছে অসংখ্য খাবার দোকান, তেমনি আছে অগণিত ছোট-বড় পসরা। শিশুদের খেলার আকর্ষণীয় সামগ্রী, যার মধ্যে আছে বেলুন, ঝুনঝুনি, বাঁশের বাঁশি থেকে আরম্ভ করে কোনো কিছুরই অভাব নেই। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা এক হাতে একটি ছড়ার বই, অপর হাতে একটি বেলুন আর বাঁশি নিয়ে যখন খোলামেলা যানজটহীন রাস্তায় হাসতে হাসতে ছুটে চলে, তখনই মেলার আনন্দ আর উৎকর্ষ প্রকাশিত হয়। বইমেলা হয়ে উঠে আনন্দের মেলা।

মেলা ঘিরে শুধু যে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানসমূহ ব্যস্ততম সময় কাটান তাই নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক কাগজ-কালি ব্যবসায়ী, পেশাজীবী মানুষ, প্রুফ রিডার এবং ছাপাখানার অসংখ্য কর্মী। তবে অনেক প্রয়োজনীয় হচ্ছে বই বাঁধাই প্রতিষ্ঠান। বই ছাপা হলে চলবে না, বাঁধাইয়ের কাজ সম্পন্ন না হলে বই আর বাজারে আসবে না। তাই বই বাঁধাই প্রতিষ্ঠান ও তার কর্মীবাহিনী অধিক মাত্রায় ব্যস্ত ও মূল্যমান হয়ে ওঠে। তবে বাঁধাই শিল্পে অনেক নতুন প্রযুক্তি এসেছে যা অল্প সময়ে আকর্ষণীয়ভাবে এই শিল্পকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে।

এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছেন প্রচ্ছদশিল্পী। প্রতিটি বইয়ের প্রচ্ছদ নিয়ে ছবি আঁকেন একজন শিল্পী। বাংলাদেশে এমন প্রচ্ছদশিল্পী আছেন অনেকে যারা প্রচুর নাম করেছেন এবং তাদের নিয়ে চলে রীতিমতো কাড়াকড়ি। সহজ কথা হচ্ছে, প্রকাশনার এই জগতে প্রচুর কর্মী, অনেক শিল্পী ও মূল্যবান অনেক ব্যক্তির সম্পৃক্ততা থাকে। তাদের সময় ও স্বল্পতার কারণে অনেক সময় বইয়ের দাম যায় বেড়ে। প্রচ্ছদ, তেমনি ছাপা এবং আকর্ষণীয় বাঁধাই নিয়ে বাংলাদেশের সুনাম সর্বত্র। তবে বর্তমানে এমন অবস্থা হয়েছে যে সারা বছর খুব কম বই প্রকাশিত হয়; প্রকাশকগণ অপেক্ষা করে থাকেন মহান একুশের গ্রন্থমেলার প্রতি।

অমর একুশে গ্রন্থমেলা শুধু বই বেচাকেনার মেলা নয়, এ হচ্ছে বাঙালির আবেগের আর আনন্দের মিলনমেলা। নিজেদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য খুঁজে পাওয়ার মেলা। তাই সব স্তরের এবং সব বয়সের মানুষের মিলন ঘটে একুশের বইমেলায়। তবে এ কথা সত্যি যে, বর্তমানে ইন্টারনেটের প্রভাবের ফলে বইপড়ার প্রতি আকর্ষণ যেমন কমে যাচ্ছে, তেমনি মুদ্রণশিল্পেও ভাটা পড়েছে। তারপরও অনেকেই মনে করেন, মুদ্রিত বইয়ের আর্কষণ থাকবে চিরকাল এবং গ্রন্থমেলার পরিধি ও বেচাকেনাও বাড়বে বছরের পর বছর।

বই পড়ে জ্ঞানের ভুবনে বিচরণ করলে বিপথগামিতা থেকে রক্ষা পাওয়া শুধু নয়, উগ্রবাদের অনুসরণ থেকে পরিত্রাণ পেতে তরুণ প্রজন্মকে সাহায্য করে। জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদের কালো ছায়া মুক্তবুদ্ধিচর্চার কাছে হয় দূরীভূত। বই পড়ে জ্ঞান অন্বেষণ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে সত্য ও সুন্দরের, জাগ্রত হয় মমত্ববোধ, সৃষ্টি হয় সম্প্রীতির ভাবনা, আর বিকাশ ঘটে অস্মপ্রদায়িক চেতনার, যা অমর একুশে বইমেলার অমূল্য অবদান।

ধীরাজ কুমার নাথউপদেষ্টা, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার

One Response -- “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও অমর একুশে গ্রন্থমেলা”

  1. সরকার জাবেদ ইকবাল

    অমর একুশে গ্রন্হমেলা আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারকে ধরে রাখার এক অনন্য আয়োজন। বাংলা ভাষার পাশাপাশি আদিবাসীদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে যথাযথ মর্যাদায় সংরক্ষণ করার জোর দাবী জানাচ্ছি। সব ভাষাভাষি আর সংস্কৃতিকে নিয়েই আমাদের বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্যের অনন্যতা।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—