১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন রমনা রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠের ঘোষণা “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম” শোনার পর কোনো বাঙালির মনেই আর দ্বিধা রইল না। সারাদেশের মানুষ প্রস্তুতি নিতে থাকল স্বাধীনতার জন্য। এছাড়া বঙ্গবন্ধুর ডাকে দেশবাসী অসহযোগ আন্দোলনে যেভাবে সাড়া দিয়েছিল তার দ্বিতীয় নজির নেই। ঐ সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি অফিস-আদালত ব্যাংক-বীমা সবকিছুই চলছিল তাঁর নির্দেশে।

অন্যদিকে সর্বত্র চলছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে চলছিল আমাদের ছাত্র ইউনিয়নের প্রশিক্ষণ। ছাত্রলীগও একইভাবে আয়োজন করেছিল প্রশিক্ষণের। ইউওটিসির (ছাত্র ক্যাডেট) সদস্যরা ডামি রাইফেল দিয়ে আমাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগের ব্যাপক সংখ্যক ছাত্রী কর্মীও প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছিল। আমার মনে আছে, প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর আমরা ডামি রাইফেল নিয়ে ঢাকার রাজপথে মিছিল করে মহড়া দিয়েছিলাম।

মোট কথা, চারদিকে সাজ সাজ রব চলছিল। সবাই প্রস্তুত মুক্তিযুদ্ধের জন্য।

অসহযোগ আন্দোলন চলার সময় পাকিস্তানি সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান এবং তার দোসর জুলফিকার আলী ভূট্টো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার নাম করে একদিকে কালক্ষেপণ করছিল এবং অন্যদিকে বাঙালি জাতির ওপর হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ২৫ মার্চ রাতের আঁধারে হানাদার বাহিনী অতর্কিতে শুরু করল বাঙালি নিধনযজ্ঞ। তবে মুক্তিপাগল বীর বাঙালি এই নারকীয় বীভৎস হামলায় ভীতসন্ত্রস্ত না হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে গড়ে তুলল প্রতিরোধ। তাই ২৫ মার্চ শুধু কালোরাত নয়, প্রতিরোধের রাতও বটে। আমার দেখা সেই প্রতিরোধের বর্ণনা এখানে তুলে ধরছি।

২৫ মার্চ রাতে আজিমপুর নতুন পল্টন লাইনের আমরা কজন শাহীন নামে এক বন্ধুর বাসায় আড্ডা দিচ্ছিলাম। হঠাৎ শাহীনের বড় ভাই সালেহ এসে বললেন, “পাকিস্তানি সৈন্যরা হামলা শুরু করতে যাচ্ছে, আর তোরা এখনও বসে আছিস?”

সঙ্গে সঙ্গে বেড়িয়ে পড়লাম। আমাদের নতুন পল্টন লাইন এলাকাটা হচ্ছে বিডিআরের (তৎকালীন ইপিআর বা পিলখানা) পাশে। ইপিআরএর গেট থেকে নিউ মার্কেট পর্যন্ত রাস্তার দুধারে সারি সারি বড় বড় গাছ ছিল। ইপিআর গেটে এসে দেখলাম শত শত মানুষ কুড়াল নিয়ে রাস্তার দুপাশের গাছ কেটে ব্যারিকেড দেওয়ার কাজে লেগে পড়েছে। আরও একটু এগিয়ে গিয়ে দেখলাম আর্ট কলেজের হোস্টেলের পাশে অবস্থিত সেই সময়কার সিএন্ডবির কম্পাউন্ড থেকে লোকজন একটি পরিত্যক্ত প্রকাণ্ড ভারী মেশিন টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে আসছে। রাস্তার ওপর মেশিনটি এনে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দিতে দিতে প্রকাণ্ড ওই মেশিন উল্টিয়ে কাটা গাছের তৈরি একটি ব্যরিকেডের ওপর ফেলা হল।

আরও একটু এগিয়ে নিউমার্কেটের মোড়ে পৌঁছার পর পাকিস্তানি হানাদার বাহিননীর নারকীয় হামলা শুরু হতে দেখলাম। প্রথমে মিরপুর রোড দিয়ে একটি মিলিটারি কনভয় আসতে দেখলাম। হলুদ হেডলাইট জ্বালিয়ে গাড়িগুলো এগিয়ে আসতে লাগল। এর আগে আমরা এ ধরনের হেডলাইট ঢাকা শহরে দেখিনি। এসব অত্যাধুনিক সামরিক যান পূর্ব পাকিস্তানে আনা হয়েছিল বাঙালি নিধনের জন্য।

হঠাৎ শহরজুড়ে শুরু হল প্রচণ্ড গোলাগুলি। আমরা কয়েক বন্ধু দেয়াল টপকে আজিমপুর কলোনিতে আশ্রয় নিলাম। সারারাত বাইরে কাটিয়ে ভোরবেলায় বাসায় ফিরে দেখি যে, ইপিআরএর দুই জোয়ান আমাদের ঘরে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। তারা আমাকে জানালেন পাকিস্তানিদের হামলায় তাদের অনেকেই নিহত হয়েছেন। যারা সুযোগ পেয়েছেন তারা তাদের হাতিয়ার নিয়ে ব্যারাক থেকে পালিয়েছেন।

তাদের নিয়ে আসা থ্রি নট থ্রি রাইফেলগুলো একটি বাড়িতে জড়ো করা হল। ২৬ মার্চ আমাদের পাড়ার খসরু ভাই (প্রখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা এবং পরবর্তীকালে ‘ওরা এগার জন’ ছবির নায়ক কামরুল আলম খান খসরু) এসে রাইফেলগুলো নিয়ে গেলেন।

২৭ মার্চ কারফিউ প্রত্যাহার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের মহল্লা ফাঁকা হয়ে গেল। ইপিআরএর পাশে থাকা কেউ নিরাপদ ভাবল না। আমিও আমার মা-বাবা এবং দুই বোন নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম অজানার উদ্দেশ্যে। হাজার হাজার মানুষের মিছিলে সামিল হয়ে পৌঁছুলাম জিঞ্জিরায়। কয়েক রাত কাটালাম এক বাড়িতে। সম্পূর্ণ অপরিচিত হলেও তারা যে আন্তরিকতা দেখিয়েছিল তা ভোলার নয়।

এদিকে, পাকিস্তানি বর্বর বাহিনীর নির্বিচার গণহত্যা এবং অগ্নিসংযোগে বাঙালির প্রতিরোধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। সারাদেশে শুরু হয়ে যায় প্রতিরোধ যুদ্ধ। আর্মি, ইপিআর এবং পুলিশের বাঙালি সদস্যরা জনতার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশব্যাপী এই প্রতিরোধ যুদ্ধে শামিল হন। জিঞ্জিরায়ও সংঘবদ্ধ হতে থাকলেন প্রতিরোধ যোদ্ধারা। তাঁরা ওই সময় ঢাকা শহরে কয়েকটি অপারেশনও চালিয়েছিলেন।

কয়েক দিন জিঞ্জিরায় থাকার পর আমরা নৌপথে মুন্সিগঞ্জ হয়ে নবীনগর গিয়ে পৌঁছুলাম। নবীনগর থেকে পরে গেলাম নিজ গ্রাম কসবা থানার রাইতলায়।

গ্রামও তখন বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য যুবসমাজ প্রস্তুত হয়ে আছে। আমাদের কসবা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া তখনও মুক্ত এলাকা। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে হানাদার বাহিনী যাতে আসতে না পারে সেজন্য বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈনিকরা জনগণের সহায়তায় কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়কে প্রতিরোধ সৃষ্টি করে রেখেছেন।

এদিকে ঢাকার ছাত্র ইউনিয়নের বন্ধুদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আমি ছটফট করছি। ভাবছি কীভাবে কী করা যায়। কদিন পর আখাউড়ার নিকটবর্তী গঙ্গাসাগরে মামার বাড়িতে গেলাম। খালাতো ভাই মহিউদ্দিন আহমেদকে পেয়ে গেলাম সেখানে। দেখলাম, আওয়ামী লীগের সক্রিয় নেতা মামা গোলাম রফিক ইতোমধ্যেই ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে ট্রেনিংএর জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের স্লিপ দিয়ে আগরতলায় পাঠানো শুরু করেছেন। আমি ও মহিউদ্দিন আমাদের দুজনকেও পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য মামাকে বললাম। মামা বললেন, “পাঠাতে পারি। কিন্তু তার আগে তোমাদের দুজনকেই যার যার মায়ের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে আসতে হবে।”

দুজনই যার যার মায়ের কাছে ছুটে এলাম। অনুমতি নিয়ে পরদিন মামার বাড়ি ফিরে গেলাম। তার দুয়েক দিন পরই পাকসেনাদের হাতে গঙ্গাসাগরের পতন ঘটল। আমরা সবাই আগরতলা সীমান্তের কাছাকাছি নানাবাড়ি টনকিতে চলে গেলাম। বড়মামা গোলাম সফিক রয়ে গেলেন নিজ বাড়িতে। তিনি একটু দার্শনিক টাইপের ছিলেন। পরে তাঁর বাড়িতে পাক হানাদার বাহনীর লাগানো আগুনে ভস্মীভূত হয়ে তিনি শহীদ গেলেন।

এর পরদিনই আমরা আগরতলায় চলে গেলাম। দিনটা ছিল পহেলা বৈশাখ। মামারা বড় হয়েছেন আগরতলায়। ভারত বিভক্ত হওয়ার আগে নানা আগরতলা রাজবাড়ির স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। তখন রাজ্য সরকারের মুখ্যমন্ত্রী শচীন সেনসহ রাজ্যের কর্তাব্যক্তিদের প্রায় সবাই ছিলেন নানার ছাত্র। আগরতলায় পৌঁছে আমরা সিপিএম দলীয় এমপি বীরেন দত্তের ভাই ধীরেন দত্তের বাসায় উঠলাম।

ওদিকে মহিউদ্দিন আগরতলায় তার দলবল পেয়ে আমাকে না জানিয়েই চলে গেল দেরাদুনে বিএলএফএর ট্রেনিং নেওয়ার জন্য। ছাত্রলীগের কর্মীদের জন্য দেরাদুনে এই বিশেষ ট্রেনিংএর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিছুদিন পর আমিও আমার কমরেডদের সাক্ষাৎ পেয়ে গেলাম। আগরতলার ক্র্যাফট হোস্টেলে ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি এবং ছাত্র ইউনিয়নের ক্যাম্প করা হয়েছিল। কিন্তু ট্রেনিং বা অস্ত্রপ্রাপ্তির বন্দোবস্ত তখনও হয়নি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কংগ্রেস সরকার আমাদের মতো বামপন্থীদের আশ্রয় দিলেও ট্রেনিং ও অস্ত্র দিতে অনীহা প্রকাশ করছিল। শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন আদায় করার জন্য এবং একই সঙ্গে সিপিআই (সর্বভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি) নেতাদের দেন-দরবারের ফলে ইন্দিরা গান্ধীর সরকার আমাদের ট্রেনিংএর ব্যবস্থা করলেন।

ট্রেনিংএর দীর্ঘ অপেক্ষার কথা বিবেচনা করে কিছুদিনের জন্য গ্রামের বাড়ি চলে এলাম। দেখলাম পাকিস্তানি দস্যুদের হামলার আশংকায় আমার চাচা আর দাদি ছাড়া সবাই বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। আম্মারা চলে গেছেন ফুফুর বাড়িতে। সেখানে থাকাকালীন মেহেরি গ্রামের বাজারে আমার সঙ্গে আকস্মিকভাবে দেখা হয়ে গেল নবীনগরের ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী শওকতের সঙ্গে। সে জানাল যে, ভৈরবের একটি মুক্তিযোদ্ধা দলের সঙ্গে সে আগরতলায় যাচ্ছে। দলটি যাচ্ছে গোলা-বারুদ আনতে। মুহূর্তের মধ্যে ওদের সঙ্গে আগরতলায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম।

শওকতের মাধ্যমে কমান্ডারের সঙ্গে দেখা করে আমার যাওয়ার বিষয়টি পাকাপোক্ত করে নিলাম। ভদ্রলোকের নাম, যতটুকু মনে পড়ে, হান্নান সাহেব। তিনি ভৈরব কলেজের কমার্সের অধ্যাপক ছিলেন। ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই নৌকাযোগে রওয়ানা দেবেন বলে কমান্ডার সাহেব জানালেন। আম্মা, ফুফু ও বাড়ির সকলের কাছ থেকে বিদায় নিতে গেলাম। ফুফু দুধভাত খেয়ে যেতে বললেন। দুধভাত খেয়ে গেলে নাকি বালা-মুসিবত হবে না!

ফুফুর হাতে-মাখানো দুধভাত খেয়ে খালের পাশে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের নৌকাটির জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। পড়ন্ত বেলায় মেঘলা দিনে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। সেখানে এক যুবক জাল দিয়ে মাছ ধরছিল। আমি তাকে আমার অপেক্ষার কারণ বলার পর সে জানাল, খুব সম্ভব একটা ‘মুক্তির’ নৌকা চলে গেছে, দুই মাঝি নৌকাটি চালাচ্ছিল। তখন আমার মাথায় যেন বাজ পড়ল। এবার বাড়ি ফিরে গেলে আমার আর আগরতলায় যাওয়াই হবে না। যেভাবেই হোক, আমাকে আগরতলায় যেতে হবে।

কমান্ডার আমাকে বলেছিলেন যে, তারা আমাদের গ্রামের পার্শ্ববর্তী নিমবাড়ী গ্রামের এক নামকরা ‘ব্ল্যাকার’ সুদনের মাধ্যমে আগরতলায় যাবেন। খালের পাড়ে অসহায়ের মতো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে কর্তব্য স্থির করে ফেললাম। সরাসরি সুদনের বাড়িতে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।

তখন সন্ধ্যা হয়-হয় অবস্থা। ফুফুর গ্রাম থেকে কিছুদূর হেঁটে হাঁটু-পানি কোমর-পানি ভেংগে চারগাছ বাজারের কাছে সিএ্যান্ডবি রোড নামে একটি উঁচু রাস্তায় গিয়ে উঠলাম। ঐ রাস্তা থেকে আমাদের গ্রামটি আধ মাইল দূরে আর সুদনের গ্রামটি আমাদের পাশের গ্রামের লাগোয়া। আমাদের এলাকার গ্রামগুলো নিচু এলাকায় অবস্থিত। চারদিকে পানি থৈ থৈ করে। নৌকা ছাড়া যাওয়ার উপায় নেই। বেশ দূরে একজন নৌকা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁকে ডেকে আমার চাচার পরিচয় দিয়ে অনুরোধ করলাম আমাকে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। ভদ্রলোক দয়া করে আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিলেন।

এরপর চাচা ও দাদির সঙ্গে কেবল দুয়েকটি আলাপ হল। পাশের বাড়ির এক ভাতিজাকে নিয়ে নৌকা করে সুদনের বাড়ির দিকে ছুটলাম। আমাদের নৌকাটি সুদনের বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছুতেই মুক্তিযোদ্ধাদের নৌকা থেকে টর্চ জ্বালিয়ে ‘হল্ট-হল্ট’ বলে একজন হুংকার দিয়ে উঠল। পরিচয় দেওয়ার পর কমান্ডার সাহেব অবাক। বললেন, “আমি তো মনে করেছিলাম তুমি বোধহয় আমাদের সঙ্গে যাবে না “

একটু পরে উঠানে এসে সুদন বললেন, “আইজ রাইতে ক্লিয়ারেন্স নেই, যাওন যাইব না, আপনাদেরকে অন্য কোনো জায়গায় থাকতে হইব, কাইল ক্লিয়ারেন্স পাইলে পার কইরা দিমু।”

অর্থাৎ পাকবাহিনীর যে কমান্ডার কালভার্টের পাহারার দায়িত্বে রয়েছে তার সঙ্গে সুদনের ‘লেনদেন’ হয়নি। রাতের বেলায় ২০-২২ জনের এই দলবল নিয়ে কোথায় গিয়ে উঠবেন তা নিয়ে কমান্ডার চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়লে আমি বললাম, “আমাদের বাড়িতে চলুন, কোনো সমস্যা হবে না। আমার চাচা ডাক্তার ময়না মিয়া এই এলাকার আওয়ামী লীগ নেতা এবং মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক। আপনারা গেলে বরং চাচা খুশি হবেন।”

এখানে উল্লেখ করা যায় যে, বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় পুত্র শেখ জামাল ঢাকার বন্দীদশা থেকে পালিয়ে আমাদের বাড়ি হয়েই আগরতলা গিয়েছিলেন। চাচা নিজে তাঁকে আগরতলায় পৌঁছে দিয়ে এসেছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের দলটিকে নিয়ে বাড়ি যাওয়ার পর চাচা তড়িঘড়ি খাওয়ার আয়োজন করলেন। দাদি রান্না করে মুক্তিযোদ্ধাাদের খাওয়ালেন। আমাদের বাড়িতে তিনদিন থাকার পর ক্লিয়ারেন্স পাওয়া গেল এবং রাজাকার কর্তৃক পাহারারত কালভার্টের নিচ দিয়ে পার হয়ে আমরা নিরাপদে আগরতলায় গিয়ে পৌঁছুলাম।

কিছুদিন অপেক্ষার পর ট্রেনিংএ যাওয়ার সুযোগও এসে গেল। আমাদের ট্রেনিংএর ব্যবস্থা করা হয়েছিল আসামের তেজপুরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি বেইজে। ট্রেনিং ক্যাম্পে আমাদের ব্যাচে মোট চারশ জন ছিলাম। আমাদের দলনেতা ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার মর্তুজা খান। আমাদের চেয়ে বয়স অনেক বেশি ছিল তাঁর। ট্রেনিংয়ের প্রথম দিনের একটি ঘটনা আজও আমার মনে পড়ে।

প্রথমেই আমাদেরকে দৌড় দিয়ে একটি বিশাল মাঠ চক্কর দিতে বলা হল। তারপর কমান্ড এল লিডারের সঙ্গে পিটি শুরু করার জন্য। কিন্তু ততক্ষণে মর্তুজা ভাইয়ের দম ফুরিয়ে এসেছে, কমান্ডের সঙ্গে সঙ্গেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। তাঁকে অবশ্য ঐদিনের জন্য ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

আমরা থাকতাম সারি সারি ব্যারাকের মধ্যে। রাতের বেলায় চলত গল্প-গুজব। আমার পাশের বেডেই ছিলেন গোপাল সাহা নামে কুলিয়ারচর ছাত্র ইউনিয়নের এক কর্মী। গোপাল তার প্রেমিকাকে দেশে ফেলে এসেছিলেন। প্রতিরাতেই প্রেমিকার স্মরণে একটি স্বরচিত গান গাইতেন আর অঝোরে কাঁদতেন। তার গানের একটি চরণ ছিল এ রকম, “হায়রে সাধের সাধনা, তুমি রইলা কোলকাতায় আর আমি আছি আগরতলায়।”

ট্রেনিং ক্যাম্পে আর একটি মজার ঘটনা মনে পড়ছে। জয়দেবপুর ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী মানব কুমার গোস্বামী মানিক মহাবিপাকে পড়েছিলেন থ্রি নট থ্রি রাইফেলের গুলি ছোঁড়ার প্র্যাকটিস করতে গিয়ে। এক চোখ বন্ধ করে নিশানা তাক করতে হয়। কিন্তু মানিক এক চোখ বন্ধ করতে পারতেন না। সেটা করতে গেলে তার দুচোখই বন্ধ হয়ে যেত। ভারতীয় আর্মির ইন্সট্রাক্টর ধমক দিয়ে হিন্দিতে বলতেন, “তুম ক্যায়সা মরদ হ্যায়, লাড়কি কো কাভি আঁখ নেহি মারা?”

ট্রেনিং ক্যাম্পের আর একটি ঘটনার কথা মনে পড়লে গা এখনও শিউরে উঠে। ক্যাম্পের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া একটি সরু নদীতে আমাদের গোসল করতে হত। ঐ নদীর পানিতে ছিল বড় বড় জোঁক। আমরা লাফ দিয়ে জোঁকে গিজগিজ করা পানিতে নেমে কোনো রকমে একটা ডুব দিয়ে উঠে আসতাম।

ছোট অস্ত্রের ট্রেনিং শেষ হওয়ার পর এলএমজি, মর্টার ইত্যাদির প্র্যাাকটিক্যাল ট্রেনিংএর জন্য আমাদেরকে ক্যাম্পের বাইরে নিয়ে যাওয়া হত। বাইরেই দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু পিপাসা মেটানোর মতো প্রযোজনীয় পানি জুটত না। ভাত খাবারের আগে হাত ধোয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। আমরা গাছ থেকে বড় বড় টসটসে পাকা আমলকি পেরে পানির বিকল্প হিসেবে চালিয়ে দিতাম। এই হাত না ধুয়ে খাওয়ার অভ্যেসটি আমার দীর্ঘদিন রয়ে গিয়েছিল।

ট্রেনিং পেতে আমাদের যেমন বিলম্ব হয়েছিল তেমনি ট্রেনিংএর পর অস্ত্র নিয়ে দেশে ঢুকতে গিয়েও সমস্যায় পড়েছিলাম। মুক্তিযোদ্ধারা প্রবেশ করতে গিয়ে অকাতরে প্রাণ দিচ্ছিলেন। অবশেষে আমরা দেশে ঢুকতে সক্ষম হলাম। নৌকা করে ধীরে ধীরে ঢাকামুখী এগুতে লাগলাম। তখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়েছে। স্পষ্টত বোঝা যাচ্ছিল যে, হো চি মিনের ভিয়েতনামের মডেলে দীর্ঘমেয়াদী গেরিলা যুদ্ধ করার যে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছিলাম, সেই সুযোগ আর থাকছে না।

আমরা ধীরে ধীরে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়লাম। আমাদের গ্রুপের অবস্থান ছিল মুন্সিগঞ্জে। আমাদের স্কোয়াড লিডার ছিলেন মাহবুব জামান। মাহবুব ভাই স্বাধীনতার পর অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন।

মুন্সিগঞ্জে যখন আমরা অবস্থান করছিলাম তখন রেডিওতে দখলদার পাকিস্তানি জেনারেল নিয়াজীকে আত্মসমর্পণ করার জন্য ভারতীয় জেনারেল মানিক শাহএর ফরমান বার বার প্রচারিত হতে লাগল। ১৬ ডিসেম্বর নিয়াজী দলবল নিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আত্মসমর্পণ করার পর বাংলাদেশ হানাদারমুক্ত হল। আমরা মুক্তিযোদ্ধারা মুন্সিগঞ্জবাসীকে সঙ্গে নিয়ে বিজয় উৎসব পালন করলাম।

পরদিন ভোরেই আমরা নারায়ণগঞ্জ হয়ে একটি পিকআপে করে ঢাকায় চলে এলাম। নামলাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে। মিনারের করুণ পরিণতি দেখে আমরা রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়লাম। পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের অনুপ্রেরণার উৎস এই শহীদ মিনার। তাদের আক্রোশ ছিল শহীদ মিনার এবং এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের বটতলার বটগাছটির প্রতি। আইয়ুব-ইয়াহিয়াবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র ছিল এই বটতলা। তাই পাকিস্তানি বাহিনী শহীদ মিনার গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। উপড়ে ফেলে দিয়েছিল বটগাছটি।

তবু আমরা ১৭ ডিসেম্বর মিনারবিহীন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশে রাইফেল উঁচিয়ে বিজয় উল্লাস করেছিলাম।

[১৭ ডিসেম্বর মিনারবিহীন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশে রাইফেল উঁচিয়ে বিজয়উল্লাস করার সময় ফটোসাংবাদিক রশিদ তালুকদার উপরের ছবিটি তুলেছিলেন]

আবু মুসা হাসানসাবেক কূটনীতিক ও সাংবাদিক

২০ Responses -- “আমাদের যুদ্ধযাত্রা ও বিজয়ের কাহিনি”

    • বঙ্গবন্ধুর ‘হাইব্রিড’ সৈনিক

      তাজউদ্দীন আহমেদকে ডেকে একবারও বঙ্গবন্ধু জিজ্ঞাসা করেন নাই কি করে দেশটাকে স্বাধীন করছিলেন তারা। তাজউদ্দীন আহমেদ দুঃখ করে বলেছিলেন;
      “একটা কষ্ট আমার মনে রয়েই গেল। যে মুজিব ভাইকে আমি তিল তিল করে আমার মনে ধারণ করেছিলাম, যাকে আমি কোনদিন নিজ থেকে আলাদা করে ভাবতে পারিনি, সেই মুজিব ভাই একটা দিনের জন্যও আমার কাছ থেকে জানতে চাইলেন না, তাজউদ্দীন, ১৯৭১-এ আমি যখন ছিলাম না তোমরা তখন কি করে কি করলে? একবারও বললেন না, তাজউদ্দীন তুমি বল, আমি ১৯৭১ এর কথা শুনব’।”

      Reply
  1. আহসান

    জেনারেল ওসমানীর নির্দেশনা ও পরিচালনায় বাংলাদেশে সেনাসদস্যরা যখন বিভিন্ন সেক্টরে বীরোচিত লড়াইয়ে লিপ্ত, বিভিন্ন পর্যায়ের বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধারা বিচ্ছিন্নভাবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে তুমুল লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তখন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের একাংশের ষড়যন্ত্রের কারণে মাঝপথে মুক্তিযুদ্ধ অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নিতেই ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের সমন্বয় গড়ে তোলা হয় বিশেষ গেরিলা বাহিনী। খন্দকার মোশতাক আহমেদ, তাহেরউদ্দীন ঠাকুর, মাহাবুবুল আলম চাষীসহ অনেকেই আওয়ামী লীগ নেতা মূলত পাকিস্তানপন্থী ছিলেন। তাঁরা আমেরিকার পরামর্শে ও মধ্যস্থতায় মুক্তিযুদ্ধ বন্ধ করে পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন গঠন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাজউদ্দীনের বিচক্ষণতা, রাজনৈতিক দূরদর্শীতা, নির্ভেজাল দেশপ্রেম ও কঠোর মনোবল কারণে কুচক্রীমহলের সকল ষড়যন্ত্র সেদিন ব্যর্থ হয়। এসব নানা কারণে আমরা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বিশেষ গেরিলা বাহিনী গঠন করি। মজার কাহিনী হচ্ছে- গেরিলা বাহিনী ভারতে গিয়ে বিভিন্ন স্থানে ক্যাম্প করে প্রশিক্ষণ নিতে থাকলেও প্রথমদিকে ভারত সরকার তেমন সহায়তা করেনি। একইভাবে সেক্টর কমান্ডারদের ও মুজিব বাহিনীর সদস্যদেরও সহায়তা সংকুচিত করে আনে ভারত। ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের একটি অংশের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী তৎপরতায়ও এর একটি কারণ ছিল। ভারতের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের চাচ্ছিলেন বাংলাদেশ স্বাধীন হোক। কিন্তু বৃহৎ দুই শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে থাকায় তিনি বড় ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না। এই অবস্থায় তখন মুক্তিযুদ্ধে সকল প্রকার সহযোগীতা প্রদানের ব্যাপারে ভারতের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এরপর ইন্ধিরা গান্ধী নিজেই গেরিলা বাহিনীর ক্যাম্পগুলো পরিদর্শন করে সন্তুষ্ট হন এবং আমাদের অস্ত্র সরবরাহের নির্দেশ দেন। তখন আমরা ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের গেরিলারা সশস্ত্র হয়ে বিভিন্ন সীমান্তপথে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে থাকি। দ্রুত বাড়তে থাকে গেরিলা বাহিনীর বহর। এভাবেই সামনের দিকে এগিয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু বামপন্থীদের এই অবদান ও ত্যাগের কথা অনেকেই বিশেষ করে আওয়ামী লীগ কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বীকার করতে চায় না। এটা অত্যন্ত দু:খজনক। তবে অনেক ক্ষেত্রে বামপন্থীদের দমিয়ে রাখতে চাইতেন বঙ্গবন্ধু। দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত সহযোদ্ধা তাজউদ্দীনের মতো দেশপ্রেমিক বিচক্ষণ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে শেষদিকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু।

    Reply
  2. মনজুরুল আহসান খান

    মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে জিয়া সশস্ত্র বিদ্রোহ করে ৬ পাক সেনা সদস্যকে খতম করেনঃ মনজুরুল আহসান খান॥
    প্রবীণ রাজনীতিবিদ বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টির সাবেক সভাপতি ও প্রখ্যাত শ্রমিক নেতা মনজুরুল আহসান খান বলেছেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের একেবারে সূচনালগ্নে জিয়াউর রহমান পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। এদিন তিনি নিজহাতে গুলি করে একসঙ্গে ছয়জন পাকিস্তানি সেনাসদস্যকে খতম করেন; যার মধ্যে দু’জন অফিসার ছিলেন। তাই রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর জিয়াউর রহমানের অনেক কর্মকান্ড নিয়ে যথেষ্ট রাজনৈতিক বিতর্কও থাকলেও মুক্তিযুদ্ধে তার ভুমিকা নিয়ে বিতর্ক থাকা উচিৎ নয়। একান্ত আলাপচারিতায় তিনি এসব কথা বলেন। জিয়াউর রহমান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সব চেয়ে বড় কথা জিয়া একজন মুক্তিযোদ্ধা; একজন সেক্টর কমান্ডার। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের একেবারে সূচনালগ্নে তিনি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। এদিন তিনি নিজহাতে গুলি করে একসঙ্গে ছয়জন পাকিস্তানি সেনাসদস্যকে খতম করেন; যার মধ্যে দু’জন অফিসার ছিলেন। প্রথমে ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার ও পরবর্তী সময় জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে দীর্ঘ ৯ মাস সাহসের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন তিনি। চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করে বাঙালি সেনাসদস্যসহ জাতিকে উজ্জীবিত করেছিলেন জিয়াউর রহমান। একজন সেনা কর্মকর্তার পক্ষে যুবতী স্ত্রী ও সন্তানকে মৃত্যুমুখে ফেলে রেখে এভাবে সশস্ত্র বিদ্রোহ করা সত্যিকার অর্থে কেবল একজন দেশপ্রেমিকের পক্ষেই সম্ভব। সুতরাং মহান মুক্তিযুদ্ধে জিয়ার বীরোচিত অবদান ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে বিএনপি আজ জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক দাবি করলেও সেদিন তিনি ঘোষণাটি পাঠ করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর পক্ষে। সেই সত্য ভুলে যায় বিএনপি। এছাড়া পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টপরবর্তী নানা ঘটনাপ্রবাহ ও রাজনৈতিক উচ্চাভিলাসের কারণে তখনকার টালমাটাল পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেছিলেন জিয়া। পর্যায়ক্রমে সেনাপ্রধান, উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক, সামরিক আইন প্রশাসক ও সবশেষে রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর তাঁর অনেক কর্মকান্ড নিয়ে যথেষ্ট রাজনৈতিক বিতর্কও রয়েছে। এছাড়া ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রচলন, যুদ্ধাপরাধীদের দল জামাতে ইসলামীসহ মুক্তিযুদ্ধে বিরোধীতাকারী ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ওপর থেকে রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে রাজনীতিতে তাদের পুনর্বাসনের মতো অনেক অপকর্ম করেছেন তিনি। এক প্রশ্নের জবাবে মনজুরুল আহসান খান বলেন, মোটা দাগে বলতে গেলে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ ৪৫ বছর পরও দেশে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক মূল্যবোধ পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধ করেছিলাম দেশ স্বাধীন করার জন্যে। একই সঙ্গে এই সশস্ত্র সংগ্রামের আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল; তা হচ্ছে মানুষের অথনৈতিক মুক্তি। এ দেশের শোষিত-বঞ্চিত-নিপীড় মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা। এককথায় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েই আমরা রণাঙ্গণে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু সে লক্ষ্য থেকে দেশ আজ বহুদূরে; বলা যায়, সম্পূর্ণ বিপরীতমুখে। এমনটি হওয়ার কারণ সম্পর্কে মনজুরুল আহসান খান বলেন, স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা, জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যা, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত, বৈশ্বিক পরিস্থিতি, ধর্মীয় মৌলবাদ ও উগ্র জঙ্গিবাদের উলঙ্গ উত্থান, রাজনীতিবিদদের পথভ্রষ্টতা, বামপন্থীদের মধ্যে বিভক্তি ইত্যাদি। বলা যায়, এ ক্ষেত্রে আমাদের বামপন্থীদের বিশেষ করে সিপিবি ও ন্যাপের ব্যর্থতাও রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নিতে স্বাধীনতাপরবর্তী সরকারগুলোর ওপর চাপ অব্যাহত রাখা ও তাদেরকে বাধ্য করার মতো শক্তিশালী ভূমিকা আমরা রাখতে পারিনি।

    Reply
  3. মনজুরুল আহসান খান

    মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে জিয়াউর রহমান
    পাকিস্থানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ করে,
    মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা নিয়ে কোন বিতর্ক
    উচিৎ নয়ঃ মনজুরুল আহসান খান

    Reply
  4. Areefur Rahman

    বামপন্থী লেখক বদরুদ্দীন ওমর তার ‘একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশের কমিউনিস্টদের ভূমিকা’ নামে বইয়ের ১১ পৃষ্ঠায় লিখেছে, ‘পাকিস্তান সরকার আমাদের জনগণের উপর যে আক্রমণ শুরু করেছিল সে আক্রমণ প্রতিহত করে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত করার ক্ষেত্রে ব্যাপকতম ঐক্য গঠনের পরিবর্তে তারা পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে আওয়ামী লীগকেও ঐ পরিস্থিতিতে কুকুর হিসাবে আখ্যায়িত করে তাদের পারস্পরিক যুদ্ধকে দুই কুকুরের লড়াই বলে আখ্যায়িত করে এবং তাদের উভয়েরই বিরোধিতা করার মতো এক নির্বোধ লাইন নিধার্রণ করে। এছাড়া এ কাজ করতে গিয়ে তারা আওয়ামী লীগ ও মুক্তিবাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে এক করে দেখে প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধাকেই আওয়ামী লীগ মনে করে তাদের সকলের বিরোধিতায় নিয়োজিত হয়। অন্য কোনো বিকল্প না থাকায় আওয়ামী লীগের লোক নয় এমন অসংখ্য তরুণ ও বিভিন্ন পেশার লোক সাধারণভাবে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। তাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের পার্থক্য না বুঝার পরিণাম হয়েছিল কমিউনিস্টদের জন্য ভয়াবহ। শেষ পর্যন্ত তারা নিজেরাই শুধু পাকিস্তানি বাহিনী বা আওয়ামী লীগের নয়, সাধারণ জনগণের তাড়া খেয়ে অনেক ক্ষেত্রে এলাকা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল।’
    মুক্তিযুদ্ধের সময় বামপন্থীদের উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায় মেজর জেনারেল খোন্দকার মুহম্মদ নূরুন্নবীর (অব.) একটি বইয়ে। ঢাকা স্টেডিয়াম থেকে সেক্টর আট নামে বইটির ৭৩ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন, ‘সে সময় বাংলাদেশের বামদলগুলোর কর্মীরা বেশ অসুবিধার মধ্যে ছিল। দলগুলোর নেতৃস্থানীয়রা মোটামুটি নিজেদের পরিচয়ে টিকে ছিল। কিন্তু কর্মীরা সব জায়গায় স্থান পেতো না। এছাড়া ভারত সরকার এ বামদলগুলো সম্পর্কে ছিল খুবই সতর্ক। কারণ তাদের ভয় ছিল এরা পশ্চিমবঙ্গের নকশালদের সঙ্গে মিশে গিয়ে ভারত সরকারের জন্য নতুন সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এবং নিরাপত্তা বাহিনী এই বামপন্থী কর্মীদের উপর খুব সতর্ক দৃষ্টি রাখতো। ছাত্রলীগের কর্মীরা তাদের সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করেনি। কলকাতায় দেখেছি আওয়ামী লীগের সব নেতারই মোটামুটি একটা নিজস্ব বাহিনী ছিল। প্রায় সবাই যত বড় বা ছোট নেতাই হোক না কেন, তারা নিজেদের চেলাচামুন্ডা নিয়ে থাকত এবং তাদের পুষত। তার কারণ আমার জানা নেই।’

    Reply
  5. শ্যাম রাখি না কূল রাখি

    বিশ্বে স্নায়ুুযুদ্ধের প্রভাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সমর্থন দু’টি স্রোতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। মস্কোপন্থীরা চীনের যে কোনো কার্যকলাপের বিরোধিতা করতো। একইভাবে চীনপন্থীরা মস্কোর যে কোনো ভূমিকার বিরোধিতা করতো। এ সমীকরণ থেকে বাংলাদেশে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী দলগুলো পরস্পরবিরোধী দু’টি অবস্থান গ্রহণ করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের বন্ধুত্ব মস্কোপন্থী দলগুলোকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান গ্রহণে উৎসাহিত করে। অন্যদিকে চীনপন্থীদের অবস্থা হয়েছিল শ্যাম রাখি না কূল রাখির মতো।
    মস্কোপন্থী বাম দল ছিল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (মনি সিংহ), ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (মোজাফফর), ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) ও কৃষক সমিতি। অন্যদিকে পিকিংপন্থী দলগুলোর মধ্যে ছিল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ভাসানী) ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন), মোহাম্মদ তোয়াহার নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী), আবদুল হকের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মা- লে), পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (টিপু বিশ্বাস-দেবেন শিকদার), পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (মতিন-আলাউদ্দিন), পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন, জাতীয় মুক্তিবাহিনী। ১৯৭৩ সালের ৩ জুন দলটির নামকরণ করা হয় পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি।
    মস্কোপন্থী বামদলগুলো চারটি যুক্তি দেখিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার পক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। যুক্তিগুলো ছিল-
    ১। যুদ্ধের সফল পরিণতি দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে
    ২। পরোক্ষভাবে সাম্রাজ্যবাদকে দুর্বল করবে
    ৩। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার অবসান ঘটবে এবং
    ৪। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত হবে এবং সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের উন্নতি ঘটবে।
    এই যুক্তিতে মস্কোপন্থী বাম দলের সদস্যবৃন্দ দু’ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে-
    (ক) সরাসরি মুক্তিবাহিনীতে যোগদানের মাধ্যমে এবং
    (খ) একটি স্পেশাল গেরিলা বাহিনী গঠনের মাধ্যমে।
    মুক্তিবাহিনীতে তাদের প্রায় ৬ হাজার সদস্য বিভিন্ন সেক্টরে ভূমিকা পালন করে এবং স্পেশাল গেরিলা বাহিনীর প্রায় ২ হাজার সদস্য ঢাকা ও কুমিল্লার বিভিন্ন রণাঙ্গনে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। স্পেশাল বাহিনীর একটি দলকে সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রশিক্ষণের জন্য প্রেরণ করা হয়েছিল। কিন্তু তারা ফিরে আসার আগেই দেশ স্বাধীন হয়ে যায়।
    মস্কোপন্থী বাম দলগুলো সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং মুজিবনগর সরকারকে মেনে নিলেও পিকিংপন্থী বাম দলগুলো মুক্তিযুদ্ধে বিতর্কিত ভূমিকা পালন করে। ভাসানী ন্যাপ নেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ভারতে গেলেও তার দলের নেতাকর্মীরা দেশের অভ্যন্তরেই আত্মগোপন করে থাকে। পিকিংপন্থী অন্য দলগুলো পাক বাহিনী ও আওয়ামী লীগ উভয়কেই শক্র হিসাবে চিহ্নিত করে। এমনকি মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের আওয়ামী লীগের সমর্থক বিবেচনা করে তাদেরকেও তারা শক্র হিসাবে গণ্য করে। ফলে এসব বাম দলের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায় একই সঙ্গে পাকিস্তান বাহিনী, আওয়ামী লীগের সদস্য এবং মুক্তিবাহিনী। নক্সাল আন্দোলনের প্রভাবে কোনো কোনো দল এদেশের জোতদার শ্রেণীকে খতম করাও শুরু করে। এভাবে এ দলগুলো মুক্তিযুদ্ধের সময় ভুল লাইন অনুসরণ করে।
    চীন পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু দেশ হওয়ায় পিকিংপন্থী দলগুলো মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে দ্বিধা দ্বন্দ্বে পড়ে যায়। ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে দা-কুমড়া সম্পর্ক থাকায় চীনা সরকার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সমর্থন দিতে ব্যর্থ হয়। চীনকে অনুসরণ করতে গিয়ে পিকিংপন্থী পার্টিগুলোও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল ও সমাজতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করার লক্ষ্যে তারা পাক বাহিনী, মুক্তিযোদ্ধা, আওয়ামী লীগ সদস্য ও জোতদার খতমের লড়াই চালিয়ে যায়।

    Reply
  6. মানিক মিয়া

    নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধকালে যারা গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছেন তাদের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেও বলা যায় যে স্বীকৃতির ক্ষেত্রে ঐ সীমাবদ্ধতা ও কৃপণতা ইতিহাসের অবমূল্যায়নের অন্যতম কারণ।
    হীরা কাটলে ঔজ্জ্বল্য বাড়ে এ কথা সত্যি। কিšু— শাখা-প্রশাখা কর্তন করলে প্রকারান্তরে তা ছোট হতে হতে মৃতুরূপ ধারণ করে। মনে রাখা দরকার ইতিহাস একটি মহীরূহের মত। সুতরাং এর প্রতিটি শাখা-প্রশাখাকে বাঁচিয়ে রাখার মধ্যেই এর প্রকৃত স্বরূপ নির্ভর করে। এ কথা বলা হয়তো নি®প্রয়োজন যে, ইতিহাস কোন রাজনৈতিক দলের প্রচারপত্র নয়। তাই যত প্রচেষ্টাই করা হোক না কেন, ইতিহাস তার নিজের তাগিদেই মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য যার যা প্রাপ্য তার মূল্যায়ন একদিন করবেই। কেন না বিপ্লবী মানুষদের অধ্যায় ছাড়া বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস অসম্পূর্ণ থাকতে বাধ্য।
    আমরা সবাই এদেশেরই মানুষ। সব দেশেই সব সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সবাই একমত পোষণ করে না। কেউ কেউ ভিন্নমতও পোষণ করে থাকে। ভিন্নমত পোষণ করাটা কোনো অপরাধ নয়। বরং এটা গণতান্ত্রিক অধিকার। বর্তমানে স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ বলে যা করা হচ্ছে তা জাতির জন্য মঙ্গলজনক নয়। কেউ এ দেশে গ্রিণকার্ডধারী নয়। ইচ্ছা করলেই দেশ থেকে বিতাড়িত করা যাবে না। দেশ গঠনে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
    রক্তের দামে কেনা সেই অর্জনগুলো পুনরুদ্ধার করতে আজ প্রয়োজন নতুন আরেকটি মুক্তিযুদ্ধ। এযুদ্ধের মূল এজেন্ডা থাকবে ন্যায় বিচার, দুনীর্তি প্রতিরোধ, কুলষমুক্ত রাজনীতি, ক্ষুধা মুক্ত বাংলাদেশ, শিক্ষা-ট্যাকনিকে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।

    Reply
  7. সেলিম

    এক নদী রক্তের ভিত্তির উপর এরপর শুরু-প্রগতির পথে দেশ গড়ার কর্তব্য; নব অধ্যায়। সে এক অন্য অধ্যায়, ইতিহাসের অন্য এক পর্ব। মুক্তিযুদ্ধের অর্জনগুলো প্রতিনিয়ত হাইজ্যাক হতে হতে আজ প্রায় নিঃশেষ। রক্তের দামে কেনা সেই অর্জনগুলো পুনরুদ্ধার করতে আজ প্রয়োজন নতুন আরেকটি ‘মুক্তিযুদ্ধ।’ রচনা করতে হবে মুক্তি সংগ্রামের নবতর অধ্যায়। বিজয় অর্জনের পর তা যেন আগের মতো হাতছাড়া না হয়ে যায়, সেভাবে এবার প্রস্তুত হতে হবে। তা নিশ্চিত করতে হলে, বুর্জোয়া শক্তির নেতৃত্বে নির্ভর না করে, কমিউনিস্ট, র‌্যাডিকেল, প্রগতিপন্থী শক্তিকেই নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করতে হবে।

    Reply
  8. মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

    ইতিহাস একথাই বলে যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এবং তার দল আওয়ামী লীগ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসকে এই এক কথায় বেঁধে দিলে সত্যের পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ ঘটে না। ইতিহাসের অপূর্ণাঙ্গ উপস্থাপনও এক ধরনের ইতিহাস বিকৃতি। মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগের বাইরে অপর যে রাজনৈতিক শক্তির একটি মূল ও অগ্রগণ্য ভূমিকা ছিল সে হলো কমিউনিস্ট পার্টি-ন্যাপ-ছাত্র ইউনিয়নের। ’৬৯ সালে গড়ে ওঠে গণঅভ্যূত্থান। পতন হয় আইয়ুব শাসনের। এই সময়টাতেই, ষাট দশকের মাঝামাঝি সময়ে, গণতন্ত্র, বাঙালির স্বাধিকার, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিত, রুটি-রুজির সংগ্রামের দৃঢ়চেতা বৃহৎ শক্তি কমিউনিস্ট ও ন্যাপে আসে বিভেদ ও বিভ্রান্তি। আন্তর্জাতিক কয়েকটি ইস্যু, মতাদর্শতার কতক প্রশ্ন, আইয়ুব শাসনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি কিছু বিষয় নিয়ে বিতর্ক উভয় দলের মধ্যে স্থায়ী বিভক্তির জন্ম দেয়। ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক প্রভৃতি গণসংগঠনগুলোও বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই বিভক্তি এবং আইয়ুব সরকারের প্রতি স্বাধীনতার দাবির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নানা মাত্রা ও রূপের বিভ্রান্তি বামপন্থী শিবিরের কর্মক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়। এতদিন ধরে চলে তাদের চলে আসা অগ্রবর্তী ভূমিকাকে এই বিভক্তি বহুলাংশে খর্বিত করে। ঠিক যেই সময়টাতে স্বাধীনতার দাবিতে সংগ্রাম অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠতে শুরু করেছে, সে সময়টাতেই বামপন্থী ও জাতীয়তাবাদী শক্তির মধ্যে এতদিনের প্রায় সমানে-সমানে ভারসাম্য বামপন্থীদের বিরুদ্ধে চলে যায়। জাতীয়তাবাদী আওয়ামী লীগ ও তার নেতা বঙ্গবন্ধু এক নম্বর শক্তিতে পরিণত হয়। এই পটভূমিতেই অনুষ্ঠিত হয় ’৭০-এর জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচনে বাঙালির একক প্রতিনিধি বেছে নেয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করে দেশবাসী বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগকেই বেছে নেয়। কমিউনিস্ট ও বামপন্থীদের দ্বিতীয় কাতারে থেকে সশস্ত্র সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে হয়।

    Reply
  9. “আমি ভিক্ষা করে সাহায্য-সহযোগিতা আনি আর চাঁটার দল সব চেঁটে খেয়ে ফেলে।”

    আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ। ওটা কনভেনশনাল যুদ্ধ ছিল না। আমাদের যুদ্ধ ঢাকা-পিন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। একদিকে ছিল ঢাকা-দিল্লি-মস্কো আর অন্যদিকে ছিল পিন্ডি-পিকিং-ওয়াশিংটন। একদিকে ছিল বিশ্বের শান্তি-স্বাধীনতা-প্রগতির শক্তি আমাদের পক্ষে আর অন্যদিকে বিশ্ব প্রতিক্রিয়া শক্তি পাকিস্তানের পক্ষে। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর অভূতপূর্ব-অদৃষ্টপূর্ব অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। সারা দেশে জনতার প্রতিরোধ। ২২ মার্চ ’৭১ পাকিস্তানি জাহাজ সোয়াত থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে অস্ত্র নামাতে গেলে বন্দর শ্রমিকরা বাধা দেয়। ঐ সময় বন্দর শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা ছিলেন আমাদের পার্টির নেতা আহসান উল্লাহ চৌধুরী, আবুল কালাম, নজরুল ইসলাম প্রমুখ। এই প্রতিরোধে আমরা ছাত্র-জনতা যোগ দিই। ২৩ মার্চ চৌধুরী হারুনের নির্দেশে আবু তাহের মাসুদের নেতৃত্বে আমরা চট্টগ্রাম কোর্ট বিল্ডিং-এর মালখানা থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করি। পরের দিন ২৪ মার্চ ফরেস্ট হিলের অফিস ও আইস ফ্যাক্টরি রোডের নেভাল গোডাউন থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করি। এর মধ্যে বাঙালি ইপিআর সামরিক বাহিনীর মধ্যে বিদ্রোহ শুরু হয়। ইপিআর কমান্ডার মেজর রফিক বিদ্রোহ করে সি আর বি রেলওয়ের পাহাড়ে অবস্থান নেয়। রেডিও-চট্টগ্রাম আবুল কাশেম সন্দ্বিপ, বেলাল মোহাম্মদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে ২৬ মার্চ। ষোলশহরে অবস্থানরত মেজর জিয়াও বিদ্রোহ করে।২৬ মার্চ আওয়ামী লীগের তৎকালীন জেলা সাধারণ সম্পাদক হান্নান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে চট্টগ্রাম রেডিও থেকে ঘোষণা পাঠ করেন, মেজর জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন ২৭ মার্চ। শুরু হয়ে যায় সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ। যুদ্ধ মানে জীবন দেয়া আর নেয়া। কিন্তু যে জীবন দিতে আমরা সেদিন যুদ্ধে গিয়েছিলাম সে জীবন নিয়ে পরবর্তী সময়ে বড়ই কাতর হয়ে পড়লাম। দেশ গড়ার পরিবর্তে আখের গুছানো ও লুটপাটের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়লেন শাসকদলের অধিকাংশ। বঙ্গবন্ধু বললেন, “আমি ভিক্ষা করে সাহায্য-সহযোগিতা আনি আর চাঁটার দল সব চেঁটে খেয়ে ফেলে।” সৃষ্টি হলো বিচ্ছিন্নতা, শুরু হলো ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত। ঘটলো ’৭৫ এর নির্মম হত্যাকাণ্ড। সমাজ ও রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি লুট করে লুটেরা শাসকশ্রেণী আজকে সমাজ ও রাষ্ট্রের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। এরা বড় বড় দলগুলিতে বিভক্ত হয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের হর্তা-কর্তা বনে যায়। দেশ স্বাধীন কিন্তু মানুষের সামাজিক মুক্তি আসেনি। তবে নানারূপে এই মুক্তি সংগ্রাম অব্যাহত আছে। মানুষের সামাজিক মুক্তির লড়াই হবে দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ।

    Reply
  10. কমরেড মণি সিংহ

    স্বাধীনতা-উত্তরকালে সিপিবি’র ওপর ক্ষমতাসীনরা নানাভাবে চড়াও হয়। ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি ছাত্র গণসংগঠনের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মিছিলে পুলিশ গুলি করলে ২ জন কমরেড শহীদ হন, আহন হন অনেকে। স্বাধীন দেশে এটাই প্রথম রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। ১৯৭৩ সালের ১০ মার্চ গোপালগঞ্জের জনপ্রিয় কমিউনিস্ট নেতা কমরেড ওয়ালিউর রহমান লেবু, এমপি প্রার্থী কমরেড কমলেশ বেদজ্ঞ, ছাত্র ইউনিয়ন নেতা কমরেড বিষ্ণুপদ ও কমরেড মানিককে প্রকাশ্যে নির্মমভাবে হত্যা করে শাসকদলের গুন্ডারা। ২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে সিপিবি’র মহাসমাবেশে বোমা হামলা করা হয়েছে। এ হামলায় ৫জন কমরেড শহীদ হয়েছেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তখন জেল-জুলুম-নির্যাতন অগ্রাহ্য করে সিপিবি সর্বশক্তি দিয়ে এই নির্মম হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে রাজপথে রুখে দাঁড়িয়েছে। জিয়ার শাসনামলে কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দেওয়া হয় এবং কমিউনিস্ট পার্টিকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রায় অর্ধেক সময় সিপিবি বেআইনি ছিল। এমনকি স্বাধীন দেশেও সিপিবি’কে একাধিকবার বেআইনি হতে হয়েছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকেন্দ্রিক দ্বি-দলীয় মেরুকরণের বাইরে বাম-গণতান্ত্রিক বিকল্প বলয় গড়ে তোলার কঠিন ও জটিল পথ পরিক্রমায় নানামুখী তৎপরতায় সিপিবি তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

    Reply
  11. Ashrafuzzaman

    মহান মুক্তিযুদ্ধে ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের যে গৌরব উজ্জোল ইতিহাস আজও তা ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে আছে- কিন্তু দু:খের বিষয় এ গেরিলা বাহিনীর ২৬ হাজার মুক্তিযোদ্ধারা আজও মুক্তিযুদ্ধের কোন সনদ পাই নাই ! স্বাধীনতা পর থেকে ক্ষমতার পালাবদলে অনেক সরকার ক্ষমতায় এসেছে- সবায় স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি বলে নিজেদের জাহির করেছে- কিন্তু এই গেরিলা বাহিনীকে কোন সরকারই মুক্তিযুদ্ধে সদন দেন নাই- ৪৫ বছর টেকে যাচ্ছে- মুক্তি বাহিনী ও মুজিব বাহিনী সহ অনেক অমুক্তিযোদ্ধারাও মুক্তিযুদ্ধের সনদ পেয়ে দাপটে বিভিন্ন সরকারের ভাগ – ভোগ- আখের গুছিয়েছেন- শুধু পরে আছে হারা ধনের তিন সন্তান- ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়ন ! মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী বন্ধুদের কাছে জানতে চাই- কেন এই গেরিলা বাহিনীকে অবহেলা করা হলো- ইতি মধ্যে এ বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা না খেয়ে- বিনা চিকিৎসায় মার গেছে- আজও যারা বেঁচে আছেন অসাহায় অবহেলায়- কিন্তু কেন ?

    Reply
  12. মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

    .মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন- এই সমাবেশের সামনে ডাকসুর পক্ষ থেকে আমরা ঘোষণা করছি যে, বিগত ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানকে ডাকসু’র পক্ষ থেকে আমরা যে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দিয়েছিলাম ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে আজ সেই বঙ্গবন্ধু উপাধি প্রত্যাহার করে নিলাম। আমরা দেশের আপামর জনসাধারণ, সংবাদপত্র, রেডিও ও টেলিভিশনের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি যে আজ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের নামের আগে তার বঙ্গবন্ধু বিশেষণ ব্যবহার করবেন না। একদিন ডাকসুর পক্ষ থেকে আমরা শেখ মুজিবকে জাতির পিতা আখ্যা দিয়েছিলাম। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে আবার ছাত্রের রক্তে তার হাত কলঙ্কিত করায় আমরা ছাত্র সমাজের পক্ষ থেকে ঘোষণা করছি, আজ থেকে কেউ আর জাতির পিতা বলবেন না। শেখ মুজিবুর রহমানকে একদিন ডাকসু’র আজীবন সদস্যপদ দেয়া হয়েছিল। আজকের এই সমাবেশ থেকে ডাকসু’র পক্ষ থেকে আমরা ঘোষণা করছি, আজ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকসু’র আজীবন সদস্যপদ বাতিল করে দেয়া হলো।”
    – দৈনিক সংবাদ : ৩ জানুয়ারি ১৯৭৩
    “…ডাকসুর সহ-সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, আজ যেন শোকের দিন। তিনি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ঘটনার উল্লেখ করে বলেন যে, পাকিস্তান আমলেও পাঁচ বছর পর ছাত্রদের ওপর গুলি ছোড়া হয়েছিল। আর মুজিব এক বছরও যেতে দিলেন না। শেখ মুজিব আজ নুরুল আমিনের পদাঙ্ক অনুস্মরণ করে তারই সমপর্যায়ে চলে গেছেন। ১৯৫৪ সালে যেমন ছাত্র হত্যাকারী নুরুল আমীন ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে তেমনি আগামী নির্বাচনে মুজিবও নিক্ষিপ্ত হবে। ”
    -দৈনিক সংবাদ : ৩ জানুয়ারি ১৯৭৩
    “…বিক্ষোভ সভায় বক্তৃতা করেন ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ও ডাকসুর সহ সভাপতি জনাব মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। বিক্ষোভ মিছিলে ছাত্র-ছাত্রী ছাড়াও শ্রমিক জনতা যোগদান করে। তারা সোচ্চার কণ্ঠে হত্যার বিরুদ্ধে শ্লোগান দেয়। বিক্ষোভ মিছিলে উচ্চারিত শ্লোগানগুলো হচ্ছে—‘নিক্সন-মুজিব ভাই ভাই,—এক রশিতে ফাঁসি চাই,’ ‘সাম্রাজ্যবাদের মরণ ফাঁদ—১৯৭৩ সাল,’ ‘শহীদ মতিউল-কাদেরের রক্ত বৃথা যেতে দেব না,’ ‘খুনি মান্নানের— ফাঁসি চাই,’ ‘ভিয়েতনামের বদলা নেব, বাংলাদেশের মাটিতে, ‘আগামীকাল হরতাল, গাড়ির চাকা ঘুরবে না, মুজিবশাহী ধ্বংস হোক, ‘নিক্সনের দালালি করা চলবে না,’ ‘সমাজতন্ত্রের নামে ভাওতা দেয়া চলবে না,’ ‘বাংলার মীরজাফর শেখ মুজিব।’ ”
    -দৈনিক সংবাদ : ২ জানুয়ারি ১৯৭৩

    Reply
  13. ফারজানা

    ন্যাশনাল কোয়ালিশন বা জাতীয় ঐক্য…..
    ১.স্বাধীনতার ইশতেহার কে পাঠ করেন?
    শাহজাহান সিরাজ।
    ২.বাংলাদেশের সংবিধানের প্রনেতা কে?
    ড. কামাল হোসেন।
    ৩.স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা প্রথম উত্তোলন করেন কে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বটতলায় শেখ মজিবুর রহমানের হাতে প্রথম পতাকা তুলে দেন কে ?
    অা স ম আব্দুর রব।
    ৪.মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্ব বিশেষ অবদানের জন্য বাঘা সিদ্দিকী খ্যাত একমাত্র বেসামরিক বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা কে?
    বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী।
    ৫.মুক্তিযুদ্ধে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন যৌথ গেরিলা বাহিনীর কমান্ডার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন কে?
    মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
    বিএনপির প্রতিষ্টাতা এদেশের স্বাধীনতার ঘোষক তারপরও বিএনপিকে না হয় আপনি বাদ দিলেন কিন্ত এদেশের জন্মের সাথে যাদের রক্ত ঘাম আর শ্রম জড়িত তাদেঁরকে বাদ দিয়ে জাতীয় ঐক্য হয় ক্যামনে? কোন যুক্তিতে আর কিসের ভিত্তিতে? বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির জন্মের ইতিহাসের সাথে উপরোক্ত নামগুলো যে অবিচ্ছেদ্য সেই ইতিহাস কি জানা নেই আপনার?

    Reply
  14. সোনিয়া

    মুক্তিযুদ্ধ বলতে মানুষ আওয়ামীলীগকে ভাবে। ৫২ থেকে ৬৯ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য জনমত গঠনে , ৬৯-র গন অভ্যুথানে, ৭১-র মুক্তিযুদ্ধে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন-এর যে অনন্য সাধারন ভুমিকা ছিল সে আলোচনা কোথাও শুনিনা। সোভিয়েত ব্লকের সহায়তা না পেলে ভারতের পক্ষে তার অবস্থান ধরে রাখা সম্ভব ছিলনা। এ কাজটি করেছিলেন কম্যুনিস্ট পার্টির নেতারাই। হিসেব করলে দেখা যাবে সারা দেশে ছাত্রলীগের চেয়ে ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেরা বেশি সংখ্যায় যুদ্ধে গিয়েছে। কিন্তু সব কৃতিত্বের ভাগীদার হয়েছে আওয়ামীলীগ- ছাত্রলীগ। ইতিহাস বিকৃতির এই ধারা থেকে বের হতে হবে। সত্য ইতিহাস সবার সামনে তুলে ধরতে হবে। ছাত্র ইউনিয়নের নেতা কর্মীরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে মৌলবাদের বিপক্ষে এখনও যেভাবে সক্রিয় আছে সেটা কারো চোখে পরেনা। শাহবাগ আন্দোলনের সময় আমি দেশে ছিলাম। দেখেছি ছাত্র ইউনিয়নের বর্তমান ও প্রাক্তন নেতা কর্মীরা সেখানে সপরিবারে দীর্ঘ সময় উপস্থিত থেকেছে। ছাত্র ইউনিয়নের বর্তমান বা প্রাক্তন কোন নেতা কর্মী ঘরে বসে ছিলেন এর নজির পাওয়া যাবে বলে মনে হয়না। কারণ তারাই মুক্তিযুদ্ধের সত্যিকার চেতনা ধারন করে। অন্য কোন সংগঠন এই দাবি করতে পারে না। কারণ তারা চাঁদাবাজি – টেন্ডার বাজিতে ব্যাস্ত। ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন-এর বিশেষ গেরিলা বাহিনীর পুনর্মিলনী সমাবেশে এই ইতিহাস বিকৃতির বিরেদ্ধে কথা বলার এবং একটা বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস রচনার উদ্যোগ গ্রহনের দাবি জানাচ্ছি।

    Reply
  15. চৌধুরী

    কত সাবেক! কত কথা! কত স্মৃতি! কত ভালোলাগা! আমি ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক!……
    সেই ১৯৫২ সালের ২৬ এপ্রিল থেকে আজ পর্যন্ত ছাত্র ইউনিয়নের নিজস্ব কোনো অফিস নেই। ৬৪ বছর পার হয়ে গেল অফিস ভাড়া করে, তাও সবসময় নয়, এমনকি মাঝে মধ্যে ভাড়া অফিসও ছিলো না। যেমন এখনও নেই। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ পর্বের সেরা ছাত্র সংগঠনটিকে এমন নিষ্ঠুর অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে চলতে হয়েছে অবিরাম-অবিরত।
    অথচ এই সংগঠনের সাবেকরা ইচ্ছা করলেই ৭দিনের মধ্যে একটা স্থায়ী অফিস কিনে নেওয়া/দেওয়া সম্ভব। কোথায় যে আমাদের ঘাটতি! কিসের যে অভাব! কেন হচ্ছে না?
    …… এর কোনো উত্তর আমার কাছে নেই।

    Reply
  16. জগৎজ্যোতি

    “ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতা, আমাদের প্রথম ‘প্রতারিত’ বীরশ্রেষ্ঠ! তার শহীদ হওয়ার খবর পেয়ে তৎকালীন অস্থায়ী সরকার দেশ স্বাধীন হলে যাকে তার বীরত্বের জন্য দেশের সর্বোচ্চ খেতাবে ভূষিত করার ঘোষণা দিয়েছিলো স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে।
    অথচ বেসামরিক বলে নানা ভুয়া যুক্তি দেখিয়ে এই মৃত্যুঞ্জয়ী বীরকে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ উপাধি না দিয়ে দেওয়া হয় ‘বীরবিক্রম’ উপাধি। প্রতিবাদে সেসময়েই তার অনেক সহযোদ্ধা পদবী গ্রহণ করেন নি।
    আজ তার মৃত্যু দিবস। লাল সালাম সিলেটের দাস পার্টির কমাণ্ডার, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি।”

    Reply
  17. ইন্দ্রজিত

    বাহহ… আপনারা এভাবেই মুক্তিযুদ্ধ এর কাহিনী তুলে ধরুন তাছাড়া আমরা বুঝব কেমন করে সেই দিন এর মহিমা??

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—