বাংলাদেশে মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত পড়েছেন এমন শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে শহুরে আটপৌরে জীবন-কাটানো নারী-পুরুষের অনেকেই জানেন রোকেয়ার নাম। শাসকের ইতিহাস যখন কেবল রাজ-রাজড়াদের, শাসকের পরিবারের বা বিত্তবান অভিজাতের উত্তরাধিকারীকে স্থান দেয়– ক্ষমতাই যখন কাউকে জনমানসে পরিচিতির প্রধান উপায়– তখন রোকেয়া ব্যতিক্রম বটে।

পৈতৃক বা স্বামীর কাজ বা সম্পদের উত্তরাধিকার তিনি নন; ছিলেন না কখনও। বরং আজ রোকেয়ার কর্মই তাঁর জীবনসঙ্গী সাখাওয়াতকে তুলে ধরেছে সকলের সামনে। এমনকি তাঁর জন্মস্থান রংপুরের পায়রাবন্দ বা একাধিক বিয়ে করা পিতার নামটিও আমরা জেনেছি রোকেয়ার কল্যাণেই। যদিও রোকেয়া তাঁর নিজের বা তাঁর জীবনসঙ্গী সাখাওয়াতের নামের কাঙ্গাল ছিলেন না কখনও। এমনকি–

“গভর্নমেন্ট স্কুলের নতুন নামকরণ government H.E School for Muslim Girls অর্থাৎ মুসলিম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় করতে চেয়েছেন, তাতে আমি সেই মুহূর্তেই রাজি হয়েছি।”

[পত্র: ১৮; তারিখ:২৫-৪-৩২]

তবে প্রশ্ন জাগে রোকেয়া কেন করলেন স্কুল, লিখলেন প্রবন্ধ, উপন্যাস বা গড়ে তুললেন নারী সংগঠন, আনজুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম?

এর উত্তরো রোকয়া সেই একই চিঠিতেই দিয়েছেন:

“চিরকাল আমি স্ত্রীস্বাধীনতার জন্য কিছু করার চেষ্টা করেছি।”

এমন কঠোর ব্রতেই রোকেয়ার জীবন কেন্দ্রীভূত। তিনি আজ সমাজে যতটুকু পরিচিত, সম্মানিত, সবই তাঁর অর্জন। বাংলাদেশের মতো সমাজেও আজ একজন নারী, তা-ও আবার ক্ষমতাধর কারও কন্যা, জায়া, জননী না হয়েও মৃত্যুর ৮৪ বছর পরও আলোচিত হন, বইয়ের পাতায় স্থান পান, সম্মানিত হন। কিন্তু এই যে ৯ ডিসেম্বরও রোকয়া স্মরণে দিবস যেটি নানাভাবে উদযাপিত হয়, সেখানে রোকেয়া কতখানি থাকেন? স্মরণের, উদযাপনের উদ্দেশ্য যদি হয় কোনো ব্যক্তির চেতনা, আদর্শ সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া– তাহলে স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, তা কতখানি হচ্ছে রোকেয়াকে ঘিরে? আজ আমরা রোকেয়ার নামটুকু জেনেছি বটে; কিন্তু কতখানি ধারণ করছি তার আদর্শ? তাঁর চেতনা? তাঁর কাছে কী হবে আমাদের শিক্ষা?

এসব প্রশ্নের যথার্থ জবাব আমরা খুঁজি না। আজ তাই আমাদের আত্মজিঞ্জাসা: আমরা কি তবে রোকেয়া পাঠ যর্থাথভাবে, পূর্ণাঙ্গভাবে করছি?

এদিকে রোকেয়ার পরিচয়টাও ঘটছে নির্দিষ্ট একটি ছকে। রোকয়ার যে ফটোগ্রাফটা আমরা দেখি আর যে জীবনী পড়ি, যেসব লেখা আমাদের পাঠ্যে থাকে, সেসব থেকে তাঁর সম্ভ্রান্ত মুসলিম ‘হেডমিস্ট্রেস-হেডমিস্ট্রেস’ ইমেজে ধরা পড়ে; যিনি মেয়েদের লেখাপড়া শেখাতে জীবন উৎসর্গ করেছেন। রোকেয়া তাঁর প্রতিষ্ঠিত স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন, মেয়েদের লেখাপড়ার জন্য জীবনব্যাপী কাজও করেছেন। কিন্তু এটুকুই কি রোকেয়া?

না, তিনি তা নন। তিনি একাধারে লেখক, সংগঠক, প্রগতিবাদী এবং বিপ্লবীও। তিনি তাঁর সময়ে নারীর প্রতি পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি চ্যলেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন। ধর্মীয় গোঁড়ামিকে নারীর প্রতি বৈষম্যের বড় কারণ বলে চিহ্নিত করেছেন। রোকেয়ার মতো আর কোনো নারী এত দুঃসাহস নিয়ে বলতে পারেন কি:

“ধর্মশাস্ত্রগুলি পুরুষ-রচিত বিধি-ব্যবস্থা ভিন্ন আর কিছুই নহে।”

তাঁর বক্তব্যের পক্ষে যুক্তিও দেন:

“যদি ঈশ্বর কোনো দূত রমণী শাসনের জন্য প্রেরণ করিতেন, তবে সে দূত কেবল এশিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকিতেন না।”

দৃঢ়কণ্ঠে রোকেয়া ঘোষণা করেন:

“আমরা আর ধর্মের নামে নত মস্তকে নরের প্রভুত্ব সহিব না।”

এমন সব প্রথাবিরোধী, বিপ্লবী অবস্থান নেওয়ার পরও রোকেয়া কেন কেবলই ‘নারীশিক্ষার অগ্রদূত’ বা ‘মুসলিম নারীজাগরণের পথিকৃত’ হিসেবে ফ্রেমবন্দি হলেন? আবার রোকেয়ার স্কুল প্রতিষ্ঠার ইমেজ এমনভাবে রূপায়িত করা হয় যেন তিনিই প্রথম মুসলমান মেয়েদের শিক্ষার জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন।

বাস্তবে রোকেয়ার জন্মেরও সাত বছর আগে, ১৯৭৩ সালে কুমিল্লার নওয়াব ফয়জুন্নেসা সেখানে মেয়েদের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া ১৯১১ সালে ভাগলপুর থেকে বিতাড়িত হয়ে রোকেয়া যখন দ্বিতীয়বারের মতো কলকাতায় সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন, তখন মুসলমান মেয়েদের জন্য সেখানে আরও দুটি স্কুল ছিল। এর একটি করেছিলেন মুর্শিদাবাদের নবাব ফেরদৌস মহল। অপরটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মা, খুজিন্তা আখতার।

রোকেয়ার কালের অন্যতম প্রধান সমস্যা মেয়েদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভের অধিকার। রোকেয়া লিখেছেন, বলেছেন, এমনকি স্কুলও প্রতিষ্ঠা করেছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি ‘পাশ করা বিদ্যা’ অথবা ‘কোনো সম্প্রদায় বা জাতিবিশেষের অন্ধ অণুকরণ’কে শিক্ষা বলতে নারাজ। এমনকি তিনি জানতেন, যে শিক্ষা মেয়েদের ‘মুর্ত্তিমতী কবিতা’ হিসেবে নিজেকে তৈরি করে থাকে সে শিক্ষা নিয়ে নারীরা ‘ষোলআনা স্বত্ব’ ভোগের উপযুক্ত হয় না।

এ কারণে, তাঁর মতে, খ্রিস্টিয় সমাজে মেয়েরা শিক্ষার সুবিধা পেলেও তাদের মন দাসত্ব থেকে মুক্তি পায় না। তাই তিনি তারিনী ভবনের স্কুলে–

“ছাত্রীদের দুই পাতা পড়িতে শিখাইয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাঁচে ঢালিয়া বিলাসিতার পুত্তলিকা গঠিত করা হয় না।… মিথ্যা ইতিহাস কণ্ঠস্থ করাইয়া তাহাদিগের নিজের দেশ এবং দেশবাসীকে ঘৃণা করিতে শিক্ষা দেওয়া হয় না।”

অর্থাৎ রোকেয়া দাসত্বমুক্তির অন্যতম মাধ্যম হিসেবে শিক্ষাকে দেখেছেন। এ দাসত্ব গৃহ-দাসত্ব, ঔপনিবেশিকতার দাসত্ব, ধর্মের দাসত্ব, পুরুষের দাসত্ব। এসব দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে নারীর ‘মানুষ’ হয়ে ওঠার প্রচেষ্টার কথাই বার বার বলেছেন। পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে বিকশিত হয়ে সমাজে ভুমিকা রাখার মধ্যেই নারীজীবনের স্বার্থকতা বলে মনে করেছেন তিনি।

গৃহ-দাসত্বমুক্ত পদ্মরাগের সকিনার জোর গলায় শোনা যায়:

“আমিও দেখাইতে চাই যে দেখ, তোমাদের ‘ঘর করা’ ছাড়া আমাদের আরও পথ আছে। স্বামীর ঘর করাই নারীজীবনের সার নহে। মানবজীবন খোদাতালার অপূর্ব দান– তাহা শুধু রাঁধা, উনুনে ফুঁপ পাড়া আর কাঁদার জন্য অপব্যয় করিবার জিনিস নহে।”

ঘর না করতে চাওয়াটাও যে নারীর অধিকার সে কথা কি আজকের দিনের সমাজ সহজ স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়? অথবা আমরা মেয়েরা যারা বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ নিচ্ছি নিজেদের কি পূর্ণাঙ্গ মানুষ ভাবতে পারছি? অণুকরণপ্রিয়তা, পণ্যপূজা বা মানসিক দাসত্ব– কোনটা থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারছি? উঁচু বেতনের, উঁচু ক্ষমতার চাকুরীও করছি, কিন্তু দাসত্বমুক্তি মিলছে কি?

মিলছে না। মিলবে না। ততক্ষণ পর্যন্ত মিলবে না যতক্ষণ না আমরা ‘মৃত্যুর মতো নিস্ক্রিয় ক্লীব শান্তি’ প্রত্যাখ্যান করতে পারি।

রোকেয়ো সব রকম উৎপাদন-বিমুখতার বিরোধিতা করেছেন। তিনি উৎপাদক কৃষকদের উন্নয়ন প্রত্যাশা করেছেন। তাদের প্রতি সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য সুস্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে, কেবল কলিকাতাটুকু গোটা ভারতবর্ষ নয়, মুষ্টিমেয় ধনাঢ্য ব্যক্তি সমস্ত ভারতের অধিবাসী নয়। বরং এখানের পাছায় ত্যানা জোটাতে না পারা চরম দরিদ্র কৃষকও আছেন। তাই তিনি উদ্যোগ নিয়েছিলেন রংপুরের এন্ড্রি শিল্প বিকাশের। দেশি ও নারীবান্ধব এ শিল্প পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা করার সময় সমাজের একটি শ্রেণি-বিশ্লেষণও করেন। রোকেয়া যে কতখানি বাস্তবমুখী ছিলেন তা তাঁর এ বিভাজনে আবারও সুস্পষ্ট হয়।

রোকেয়াকে অনেকে ‘নারীবাদী’ বলে আখ্যায়িত করেন। কিন্তু তিনি পশ্চিমা নারীবাদের পথে হাঁটেননি। বরং উপনিবেশিকতা-বিরোধী সংগ্রামে নারীর শক্তিকে সমাবেশিত করার আহবান রেখেছেন। তিনি নারীর অধস্তনতাকে প্রথাগত চিরন্তন অধস্তন অবস্থা বলে স্বীকার করেননি। উল্টো এ সম্পর্কিত তাঁর ব্যাখ্যায় ঐতিহাসিক বস্তুবাদের কিছু প্রকাশ দেখা যায়।

“আদিমকালে যখন সভ্যতা ছিল না, সমাজবন্ধন ছিল না, তখন আমরা এ রূপ দাসী ছিলাম না।

রোকেয়া সুস্পষ্টভাবে বুঝেছিলেন যে, সমাজের বিধি-ব্যবস্থা নারী-পুরুষের স্বার্থকে বিপরীতমুখী করে রাখে। তাই এ সমাজের নারীমুক্তির প্রশ্নকেও স্বদেশের উপযোগী করেই আলোচনা করেছেন। সমাধান খুঁজেছেন নিজ মাটিতে।

রোকেয়ার জন্ম ১৮৮০ সালে। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৫টি। মাত্র ২৪ বছর বযসে (১৯০৪) তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘মতিচুর’ প্রকাশিত হয়। ১৯৩১ সালে প্রকাশিত হয় সর্বশেষ গ্রন্থ ‘অবরোধবাসিনী’ । সরল বোধগম্য অসাধারণ স্যাটায়ারও লিখেছেন তিনি। রোকেয়ার বক্তব্যে ধারালো এবং লক্ষ্যমুখী। তাঁর সব লেখা যেন পরস্পরের সঙ্গে গাঁথা। এক অভিন্ন চিন্তার প্রকাশ। রোকেয়ার ‘সুলতানার স্বপ্ন’ এর নারীস্থানের খানিক বাস্তবায়ন যেন ‘পদ্মরাগ’ এর তারিণী ভবনে দেখা যায়।

রোকেয়ার পুরো জীবনই এক অভিন্নতার সমষ্টি। সেই যে পায়রাবন্দেও বাড়িতে ভাইয়ের কাছে প্রথম পড়তে শেখা থেকে শুরু, এরপর বিয়ে, বিয়ের পর আরও সুস্পষ্ট করে চিন্তা করা এবং এক সময় কর্তব্য ঠিক করা। একান্তু ব্যক্তিগত জীবন রোকেয়া খুব একটা কাটাননি। যখন গৃহী ছিলেন তখন নিজেকে প্রস্তুত করেছেন। পড়েছেন, লিখেছেন। কাজ করে গেছেন। রোকেয়ার একনিষ্ঠতা, দুর্দমনীয় সাহস, অধ্যবসায় তাঁকে মানুষ হিসেবে বিকশিত করেছে। ‘পদ্মরাগ’ এর সিদ্দিকার মতো নিজেকে সমাজের জন্য আদর্শ করে রাখতে চেষ্টা করেছেন যেন।

আজও সমাজে নারীর দাসত্ব ঘুচে যায়নি। দূর হয়নি মানসিক শৃঙ্খল। তাই রোকেয়ার পরিপূর্ণ চর্চা সমাজের জন্য বড় প্রয়োজন। মুসলিম নারীজাগরণের বা নারীশিক্ষার অগ্রদূত হিসেবে রোকেয়ার যে খণ্ডিত, খর্বিত ইমেজ তা ভেঙ্গে বিপ্লবী রোকেয়ার প্রতিষ্ঠাই হবে সেই সংগ্রামের অন্যতম হাতিয়ার।

জাহান-ই-গুলশানলেখক, অ্যকটিভিস্ট

১১ Responses -- “রোকেয়া পাঠ: আমাদের ‘রোকেয়া’ ও রোকেয়ার ‘আমরা’”

  1. রাশেদুজ্জামান

    সব সময়েই দেখা যায় শাসকশ্রেণি তার স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ মানুষের অবদানকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে। বেগম রোকেয়ার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। রোকেয়াকে যেভাবে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা হয় তাতে করে তাকে অবমূল্যায়ন করা হয়। আপনার লেখায় রোকেয়া হারিয়ে যাওয়া স্বত্ত্বাকে তুলে ধরা হয়েছে। যা এ সময়ে দেখা যায় না। আশাকরি আপনি নিয়মিত বিষয়টিতে আলোকপাত করবেন।

    Reply
  2. sham kar

    বেগম রোকেয়াকে খণ্ডিতভাবে তুলে ধরার মধ্যেও একটা রাজনীতি আছে। আপনার আলোচনা তা চমৎকারভাবে তুলে ধরেছে। রোকেয়া ছিলেন উপনিবেশবাদরিরোধী গণতান্ত্রিক মানসের অধিকারী। যদিও সংস্কারবাদের সীমা তিনি অতিক্রম করতে পারেন নি। কিন্তু একটা পশ্চাদপদ সমাজে, ততোধিক অবরুদ্ধ নারী সমাজের কথা যখন আমরা বিবেচনা করি, তখন তাঁকে বিশাল বিদ্রোহের পথিকৃৎ মানতেই হয়।

    Reply
  3. শাম কর

    বেগম রোকেয়াকে খণ্ডিতভাবে তুলে ধরার মাঝেও একটা রাজনীতি আছে। সমগ্র রোকেয়াকে চেনার যে চেষ্টা, তাকে স্বাগত জানানো দরকার। রোকেয়া উপনিবেশবাদবিরোধী, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল চেতনার অধিকারী ছিলেন। তাঁর নারী জাগরণের সংগ্রামকে সে আলোকেই বোঝা দরকার। যদিও সংস্কারবাদের সীমা তিনি অতিক্রম করতে পারেন নি। কিন্তু পশ্চাদপদ সমাজের, ততোধিক অবরুদ্ধ নারী সমাজের কথা বিবেচনা করলে, রোকেয়ার তৎপরতাকে বিরাট বিদ্রোহ হিসাবে চেনা যায়।

    Reply
  4. নারীদের সম্মান

    ঢাবিতে “জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে বিভিন্ন হল থেকে রাতে নামাযরত ছাত্রীদের আটক করেছে ছাত্রলীগ।” খবরটি দেখে একটু আঁতকে উঠলাম এই জন্য আরো জঙ্গি সম্পৃক্ততার সেই পুরনো নাটক মঞ্চস্থ করছে ঢাবি প্রশাসন? অবশ্য এ জাতীয় মিথ্যাচার এখন একেবারেই সেকেলে। এঅভিনয়ে অংশ নিয়েছে-ছাত্রলীগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত প্রক্টর এবং ভিসি মহোদয় নিজেই। ঢাকা বিশ¡বিদ্যালয়ের হলে তল্লাশি করে বিভিন্ন বিভাগের অসংখ্য ছাত্রীকে আটক করেছে ছাত্রলীগ ও প্রশাসন। ঘটনার বিবরণে বলা হয় ২ নবেম্বর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা নামাযের রুমে ঘাপটি মেরে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকে। উদ্দেশ্য কারা নামায পড়তে আসে তা জানা। নামাযের রুমের পাশের এক ছাত্রী রোজা রাখতে উঠলে সন্দেহের ভিত্তিতে তার রুম সার্চ করে। দুই ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে আটক করে ছাত্রলীগের নেত্রীর রুমে নিয়ে যায়। এদিকে নামাযের রুমে নামায পড়তে আসা একজনকে আটক করে। এরপর শুরু হয় পুরো হল তল্লাশি। হলগেটে দারোয়ানদের কাউকে বের হতে না দেয়ার জন্য নির্দেশ দেয় ছাত্রলীগ। সারাদিন সবাই মিলে মারধর করে কোন তথ্য বের করতে না পেরে প্রক্টর অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেও কোন তথ্য না পেয়ে বিকেলে শাহবাগ থানায় হস্তান্তর করেন প্রক্টর ড. আমজাদ হোসেন। রাতভর জিজ্ঞাসাবাদের পর রাত দুইটায় ছেড়ে দেয়। অপর দুইজনকে গার্ডিয়ান ডেকে হল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এভাবে গত কয়েকদিনে ২১ ছাত্রী গ্রেফতার ও লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনা ঘটে। ছাত্রলীগ আইনের কোন ধারা মতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে এ অভিযানে অংশগ্রহণের অধিকার লাভ করলো? তা আমাদের বোধগম্য নয়। তাহলে আমরা কি ধরে নেব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরিচালনা করছে ছাত্রলীগ? অথবা ছাত্রলীগের কাছে ঢাবি প্রশাসন অসহায় কিংবা স্বেচ্ছায় নির্বিকার। অনেক সাধারণ নামাযী, হিজাব পরা ছাত্রীদের লাগানো হচ্ছে জঙ্গি তকমা। কারণ তত্ত্ব দিয়ে সহজেই রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করা যায়। জঙ্গি, ইসলাম বললেই তার সাথে সকল অমানবিক আচরণকেই সরকার আর একশ্রেণী মিডিয়া জায়েজ মনে করে। আচ্ছা তারপরও ধরে নিলাম আটককৃত অনেকেই ছাত্রীসংস্থার সাথে যদি জড়িতও হয় তাহলে আমার প্রশ্ন হচ্ছে ছাত্রীসংস্থা তো কোন নিষিদ্ধ সংগঠন নয়? জানা গেছে ঐ মেয়েগুলোর প্রত্যেকেই তাদের ডিপার্টমেন্টে ভালো রেজাল্টের অধিকারী। তাহলে ৯০% মুসলমানের দেশেও এই মেয়েদের বোরকা পরাই কি একমাত্র অপরাধ। ধর্ম-কর্ম পালনে এটাই কি শেখ হাসিনার ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের উত্তম নমুনা? ভিসি মহোদয় আপনি সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হননি? যে মেয়েগুলোকে আপনি ছাত্রলীগের কথামত রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে গ্রেফতার করে সিট বাতিল করে অপমান করে বের করে দিলেন। এদের একজন যদি আপনার মেয়ে হতো? গভীর রাতে আপনার মেয়েকে এভাবে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে হয়রানি করলে আপনার কেমন লাগতো ? তাহলে বুঝতে পারবেন এই মেয়েগুলোর বাবা-মা কত উদ্বিগ্ন সময় কাটাচ্ছে! এ জাতির জন্য দুঃখজনক বিষয় আপনারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হয়েও নিজেদেরকে দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে চিন্তা করতে পারলেন না!!
    আমাদের ভিসি এবং প্রক্টর সাহেব মনে হয় ঢাবিতে ছাত্রলীগের একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে-ই কাজ করছেন। অবশ্য না করেও বা উপায় কি? চেয়ার ঠিক রাখতে হলে ছাত্রলীগের আনুগত্য শিরোধার্য। কারণ যারা পেপার-পত্রিকা আর নিউজ দেখেন রাবি, চবি, ইবিসহ সারা দেশে ছাত্রলীগের হাতে শিক্ষক লাঞ্ছিতের খবর। তারা প্রত্যেকেরই আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের আজ্ঞাবহ হওয়ার বিকল্প আছে কি?
    গত ০৭ নবেম্বর ”এখন তোর আল্লাহ কোথায়?’ শিরোনামে একটি জাতীয় দৈনিকের সংবাদ সবাইকে আঁতকে দিয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ভুক্তভোগী ছাত্রী বলেছেন, আমার কাছে ‘নারী-পুরুষের পর্দা’ নামক একটি বই ছিল। আমার এ বইটি দেখে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা আমাকে সভাপতির রুমে ডেকে নিয়ে বলে, তোর কাছে ইসলামী বই আছে, তুই জঙ্গি। ছাত্রীটি আরো বলেন, ওই সময় ছাত্রলীগের হলের নেতারা আমাকে বলে, তুই তো জঙ্গি, এখন তোর আল্লাহ কোথায়? তোকে বাঁচালে আমরা বাঁচাবো, তা ছাড়া কেউ বাঁচাতে পারবে না। ছাত্রীটি অভিযোগ করে বলেন, এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ বা হলের প্রক্টর কেউই আমার কোনো কথাই শোনেন নি, তারা ছাত্রলীগ নেতাদের কথা মতোই কাজ করেছেন। মানুষের প্রত্যাশা ছিল এই সরকারের প্রায় ক্ষমতাধর ব্যক্তিরাই নারী। আমাদের প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও স্পীকার, সংসদ উপনেতা, কৃষিমন্ত্রী, মহিলা হওয়ায় নারীদের অধিকার অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় বেশি নিশ্চিত হবে। কিন্তু তা না হয়ে নারীর অধিকার আওয়ামী শাসনামলে সবচেয়ে বেশি ভূলুন্ঠিত হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মুখে নারী নীতির কথা বলেন, আর গভীর রাতে নামাযী, পর্দানশীন নিরপরাধ ছাত্রীদের গ্রেফতার করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে আপনার সোনার চাঁদ ছাত্রলীগ এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এ নাটক বন্ধ হবে কবে?। আজ রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনর ১৩৬তম জন্মদিনে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা জানাচ্ছি। । আওয়ামী শাসনামলে নামাযী ও পর্দানশীন নারীর যত অপমান!!! তথাকথিত নারী অধিকারের আন্দোলনকারীরা আজ কোথায়??? আমার মায়ের জাতির মর্যাদা একমাত্র দিয়েছে ইসলাম। আসুন ইসলাম নারীকে যে সম্মান দিয়েছে তা জানার চেষ্টা করি এবং বাস্তবায়নে সোচ্চার হই।

    Reply
  5. Ahmed Hasan

    নারী যখন এয়ার-হোস্টেজ হয়ে বিমানের যাত্রীদের সামনে খাবার পরিবেশন করে, মিষ্টি মিষ্টি সুরেলা কণ্ঠে কথা বলে, যাত্রীদের কামনার স্বাদ পুরা করে তখন সেটা হয় নারীর “স্বাধীনতা”? তাইনা?
    আর সে যখন নিজের ঘরে নিজের জন্য, স্বামী ও সন্তানের জন্য, পিতামাতার জন্য খাবার রান্না করে তখন সেটা হয় “পরাধীনতা”।
    এই অদ্ভূত দর্শনের কারণে নারী আজ পণ্যে পরিণত হয়েছে। ব্যবসায়ীদের ব্যবসা বাড়ানোর এক অসাধারণ মাধ্যম এক শ্রেণীর দেহ প্রদর্শনকারী নারী সমাজ।
    এই নারীবাদি সমাজে নারীরা যেন পণ্যের মোড়কে পরিণত হয়ে গেছে। পণ্যের বিক্রি বাড়াতে যেমন আকর্ষণীয় মোড়ক ব্যবহার করা হয় তেমনি পাশাপাশি ব্যবহার করা হচ্ছে নারীর আকর্ষণীয় শরীরকে।
    তাই এই জগতের শিল্পচর্চার সবচেয়ে বড় অংশটা একটা কেন্দ্রে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে আর তা হল “নারীর শরীর”।
    নারীর শরীরের উপর গবেষণা চলছে প্রতিনিয়ত, তাকে আরো কত আবেদনময়ী করে তোলা যায়।
    পরিশেষে এই নারীকে ব্যবহার করে বণিক শ্রেণী হাতিয়ে নিচ্ছে কাড়ি কাড়ি অর্থ। কেউ বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে, কেউ নাটকে, কেউ বা সিনেমায়, একেকজন একেক কৌশলে।
    ফলে নারী হারাচ্ছে তার সম্ভ্রম আর সমাজ হারাচ্ছে ভারসাম্যপূর্ণ যুবসমাজ।
    পাশাপাশি উপহার হিসেবে সমাজকে দিচ্ছে মাদক, ধর্ষন, হতাশা, আত্মহত্যা ইত্যাদি।
    আর ধূর্ত বণিক সমাজ এই দেহ প্রদর্শনীর নাম দিয়েছে “নারী স্বাধীনতা”।

    Reply
  6. অর্নব

    এখনও পুরুষতন্ত্র
    নারীর পোষাক থেকে শুরু করে
    তার আচরণকে নিয়ন্ত্রন করে! তাহলে নারী স্বাধীনতা কোথায়?.
    এইতো সেদিন, কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া
    কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু নামের মেয়েটি! প্রাইভেট পড়িয়ে আর বাসায় ফিরতে পারেননি! যে পথ দিয়ে টিউশনির বাসায় যেতেন, সেই পথেই সেনানিবাসের ভিতরে একটি কালভার্টের নীচে রাত সাড়ে দশটা নাগাত তার মৃতদেহ পাওয়া যায়। এটাই কি নারী স্বাধীনতা? যেখানে সেনাবাহিনীদের এলাকার
    নিরাপত্তার বেষ্টনীর মধ্যে মেয়েটিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে,সেখানে নারী স্বাধীনতা কোথায়?
    যেখানে একজন মানুষ হিসেবে মর্যাদা মিলে নি, মর্যাদা মিলেছে ভোগের বস্তু হিসাবে, সেখানে কোথায় নারীর স্বাধীনতা?.
    নারীকে উলংগ করে স্বাধীনতার গন্ধ খুঁজে চলাই কি তাহলে নারী স্বাধীনতা?.
    দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর, ত্রিশ লক্ষ তাজা প্রান এবং আড়াই লক্ষাধিক মা-বোনের উজ্জতের বিনীময়ে অর্জিত এই স্বাধীন বাংলা! যে বাংলার নাম কিছুদিন আগেও মুখে উচ্চারন করলে গর্বে বুক ভরে উঠেছে! বুক উচিয়ে বলেছি,আমি বাঙালি,আমি গর্বিত!.
    আজ সে দেশের নাম উচ্চারন করতে লজ্জা লাগে! কিছু একটা বলতে গেলে মাথা নিচু করে বলতে হচ্ছে! কারন এ দেশে মা-বোনের ইজ্জত নিয়ে সবসময় আতঙ্কে থাকতে হয়! দেয়া হয় না তাদের ন্যায্য স্বাধীনতা! পারছে না তারা স্বাধীন ভাবে চলাচল করতে! .
    সত্যিই কি তাহলে নারীদের স্বাধীনতা বলে কিছু আছে?
    উত্তর: হ্যা আছে.
    আধুনিক মনষ্কতা নারীদের জন্যে সমাজে কিছু জায়গা ছেড়ে দিয়েছে এ কথা সত্যি৷ কিন্তু তা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের দয়া নাকি নারীর নিজের স্বাধীনতা তা এখনও বোঝা দায়…………….
    .

    Reply
  7. Manik

    _কন্যা সন্তান _____________________

    ১. কন্যা সন্তান সৌভাগ্যের চাবিকাঠি ।
    ২.কন্যা সন্তানের কারনে আল্লাহর রহমতের ধারা আব্যাহত থাকে ।
    ৩. জান্নাতে যাওয়া এবং নবী করীম সা় এর সাহচর্য লাভ করা কন্যা সন্তান প্রতিপালনের কারনে সহজ হয় ।
    ৪. কন্যা সন্তানকে অবজ্ঞা ও তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখা গুনাহের কাজ ।
    ৫. কন্যা সন্তান জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার ঢাল স্বরুপ।
    ৬. কন্যাদের উপর পুত্রদের প্রাধান্য দেয়া অত্যন্ত গর্হিত কাজ । এমনকি তা কুফুরীর দিকেও নিয়ে যেতে পারে ।
    ৭. স্বামী পরিত্যক্ত অথবা বিধবা কন্যাদের প্রতিপালন অত্যন্ত সওয়াবের কাজ ।
    ৮. কন্যাদের সৌভাগ্যের কারনে অনেক অভিভাবকের আর্থিক অবস্থারও উন্নতি হতে পারে ।
    ৯. কন্যা সন্তান শান্তির দূত ।
    ১০. কোন ঘরে কন্যা সন্তানের জন্মের সাথে সাথে আল্লাহ একদল ফেরেশতা পাঠান । তারা ঐ ঘরের অধিবাসীদের বলে ” তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক” । তারা কন্যা সন্তানটিকে ডানার ছায়ায় ঢেকে নেয় । এবং দোয়া করতে থাকে ” এ শিশুটির তত্ত্বাবধানকারী কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহর সাহায্যপ্রাপ্ত হবে ।( তাবরানী)

    আমাদের প্রচলিত সমাজে অর্থাৎ আধুনিক সমাজে কন্যা সন্তান বা অধিক সন্তান নেয়া কে বুজা মনে করেন,কিন্তু দেখুন আল্লাহ কি বলেন?

    →আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ

    [“ দারিদ্রের ভয়ে তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না। তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমিই জীবনোপকরণ দিয়ে থাকি। নিশ্চয় তাদেরকে হত্যা করা মারাত্নক অপরাধ। ]আল- ক্বোরআন!!

    রাসুল (সা:) বলেনঃ যার একটি মেয়ে আছে সে জান্নাতে যাবে,যার দুটি মেয়ে আছে সে জান্নাতে যাবে,আর যার তিনটি মেয়ে আছে সে আমার সাথে জান্নাতে যাবে।আল- হাদিস।

    মা, , স্ত্রী, ও কন্যা সবাই আল্লাহর রহমত । নবী করীম সা় বলেছেনঃ আমি মেয়ের পিতা । তোমরা মেয়েদের কষ্ট দিওনা ।
    আল্লাহ সকলকে পরিবারের সব সম্পর্কের (দাদী,মা,বোন,স্ত্রী,কন্যা সন্তান, )মেয়েদের সাথে সদ্ব্যবহার করার তওফিক দিন । আমীন ।

    Reply
  8. মহসিনা

    নারী-স্বাধীনতা বিষয়ক একটি বিজ্ঞাপন চোখে পড়লো। বলিউড খ্যাত নায়িকা দীপিকা পাদুকোনের এই বিজ্ঞাপন অনুসারে নারীর নিজের অধিকার আছে তার শরীরের । একান্তই তার ইচ্ছার উপর নির্ভর করবে যে, সে তার শরীর নিয়ে কি করবে — বিয়ের আগে সেক্স করবে, নাকি বিবাহ-বহির্ভূত যৌন সম্পর্ক তৈরি করবে। “শরীর আমার, চয়েশ আমার” নামক এই ধরনের একটি অত্যন্ত ক্যাচি এবং বোল্ড মেসেজ ছড়িয়ে আছে এই বিজ্ঞাপনী বক্তব্যে ।ব্যক্তিগতভাবে আমি এই ধরনের বক্তব্যের বিরোধী। মনে হতে পারে, একজন শিক্ষিত নারী হয়ে কেন আমি এর বিরোধিতা করছি ? নারীর শরীরের অধিকার কি নারীর নেই ? গালাগালি দিন , অপমান করুন ক্ষতি নাই। কিন্তু একটু ভেবে দেখুন অন্তত সবদিকটা। ভেবে দেখুন আমরা বিজ্ঞাপনের অর্ধসত্য এবং চাকচিক্যে নিজের বিচারের ক্ষমতাকে হারিয়ে ফেলতে শিখে যাইনি তো ? এমন নয় তো, যে, এই আপাত নারীবাদী বিজ্ঞাপন সত্যি্কারের নারীবাদী নয় ? এমন নয় তো যে, এটি নারীবাদের আড়ালে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষের চাহিদার প্রকাশ ? এর পিছনে সত্যিই পুরুষের নারী-শরীরের খিদে লুকিয়ে নেই তো ?যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, তাহলে বলি , দীপিকার এই আপাত-স্বাধীনতার বানীও আসলে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের হর্ত্তা কর্তা বিধাতা পুরুষের উদগ্র কামনারই প্রকাশ। কেন ? কারণ, দেখতে পাচ্ছি নারী স্বাধীনতার নামে এই বিজ্ঞাপনে অদ্ভুত ভাবে শরীরের দিকে জোর দেওয়া হয়েছে। কেননা নারী স্বাধীনতার এই বিজ্ঞাপনেও নারীর সত্তাকে নারী শরীরের সমতুল্য করে দেখা হয়েছে। নারী মানেই যেন নারীর শরীর। তাই শরীরের স্বাধীনতাতেই নারীর স্বাধীনতা । আর একথা যুক্তি–বহির্ভূত ভাবে কেবল স্কুল কলেজের মেয়েদের আবেগে সুড়সুড়ি দেওয়ার জন্য বারবার সমস্ত চ্যানেলে বলা হচ্ছে। আচ্ছা, নারীর স্বাধীনতার কথা কেন শরীরে এসেই থেমে যাবে? কেন শিক্ষার স্বাধীনতা, কর্মের স্বাধীনতা পর্যন্ত পৌঁছাবে না ? প্রসঙ্গক্রমে একটু মনে পড়িয়ে দিতে চাই, সতীদাহ সংক্রান্ত যে সব তথ্য বর্তমান গবেষনায় বেরিয়ে আসছে, তাতে প্রমানিত হয়েছে যে, সতীদাহের জন্য খুব একটা জোর করে করা হত না। মেয়েরাই স্বেচ্ছায় সহমৃতা হত। এনিব্যাসান্তদের লেখা থেকে একথা প্রমানিত হয় যে, সেইসময় নারী সমাজের সামনে সহমরণকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের হর্তাকর্তা পুরুষেরা এতো উচ্চ মর্যাদার স্থানে স্থাপিত করতে সক্ষম হয়েছিল যে, মেয়েরা সতী হওয়াকেই পরম পুণ্যের কাজ বলে মনে করতো । এইভাবেই সেদিন নারী চিতায় উঠেছিল স্রেফ পুরুষের প্রচারণার ফাঁদে পা দিয়ে । আজো দীপিকাদের দিয়ে পুরুষ সমাজ এমন কিছুই করাতে চাইছে না তো, যাতে করে নারী নিজেই সহজলভ্যা হয়ে ওঠে পুরুষ সমাজের কাছে ?
    বিষয়ের জটিলে না গিয়ে একটা কথা বলে রাখা ভাল যে, নারীবাদের সৃষ্টি কিন্তু নারীকে পুরুষের মর্যাদায় তুলে আনার জন্য বা নারী পুরুষের সমান অধিকারের দাবীতে এবং নারীর প্রতি শারীরিক ( বিশেষত যৌন) ও মানসিক অপরাধ কমানোর লক্ষ্যে । কিন্তু নারীবাদী চেতনার মধ্যে দিনের পর দিন ধীর গতিতে স্থান করে নিয়েছে একটি শরীর কেন্দ্রিক চেতনা, যা নারীকে আবার শরীরমাত্র করে তুলছে। কৌশলে অসম্ভব করে তুলছে নারীর সত্যিকারের স্বাধীনতার সম্ভবনাকে।
    একটা কথা আমাদের মনে রাখতে হবে যে, শরীরকেন্দ্রিক চেতনা, তা সে যৌনশিক্ষাই হোক, অবাধ যৌনতা বা নারী শরীরের অকারন প্রদর্শন – কোনটাই কখনোই যৌন অপরাধকে কমাতে সক্ষম হয়নি। বরং বৈষম্য-জনিত অপরাধকে বাড়িয়ে তুলেছে অনেক। নারীকে পুরুষেরসমান মর্যাদায় স্থাপন করতেও এই চেতনা সম্পুর্ন ব্যর্থ হয়েছে। পাশ্চাত্য দেশগুলি এই বিষয়ে আমাদের কাছে শিক্ষা হতে পারে। তাই ‘শরীর প্রদর্শনে আমার অধিকার আছে’ , ‘বিবাহ বহির্ভুত শারীরিক সম্পর্ক রাখার আমার অধিকার আছে’ জাতীয় সস্তা কথাগুলি কখনোই ‘নারী স্বাধীনতার প্রকাশ’ হিসাবে মেনে নেওয়া যায় না । চোখ ধাঁধানো চাকচিক্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলা নারীর আজ বোঝা অত্যন্ত দরকার যে স্বাধীনতা আসলে কি । দর্শনের তথা নীতিবিদ্যার আধুনিক পাঠগুলি থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, স্বাধীনতা মানে হল নির্বাচনের ক্ষমতা। একাধিক কর্তব্য বা বিষয়ের মধ্যে ইচ্ছামতো নির্বাচন করার সামর্থ্যই হল স্বাধীনতা। আর স্বাধীনতাই আমাদের অস্তিত্ত্বের প্রকৃত প্রকাশ। রাস্ট্রবিজ্ঞান যারা পড়েছে তারা জানে যে, স্বাধীনতা কখনো অবাধ হতে পারে না। প্রাচীন ভারতের মুনি-ঋষিরা মনে করতেন যে, স্বাধীনতা মানে স্ব-নিয়ন্ত্রন বা আত্মনিয়ন্ত্রন। নারীর আজ সেইটে শেখা উচিত। ‘আত্ম’নিয়ন্ত্রনের অধিকার – কেবল ‘ আপন শরীর নিয়নন্ত্রনের অধিকারমাত্র’ নয়। মনে রাখতে হবে শরীরটা যন্ত্রমাত্র। তার খিদে আছে, বোধ নেই, নেই নিজেকে নিয়ন্ত্রনের ক্ষমতা। আজ তাই সমস্ত প্রভাবমুক্ত হয়ে নারীকে ধ্যানমগ্ন হতে হবে। নিজেকে খুঁজতে হবে। নিজের মধ্যের ‘নারী সত্তা’কে আবিষ্কার করতে হবে। তবেই সে নিজেকে বুঝতে পারবে, নিজেকে নিয়ন্ত্রন করতে পারবে। ঠিক-ভুলকে নির্ধারন করে নির্বাচন করতে পারবে। তবেই তো সে প্রকৃত স্বাধীন হবে । ‘দীপিকার স্বাধীনতা’ আসলে স্বাধীনতা নয়, স্বাধীনতার মুখোশের আড়ালে পরাধীনতা — তবে সে তো কেবল আমার মত, সামগ্রিকভাবে নারী সমাজকে নির্বাচন করতে হবে, দীপিকার স্বাধীনতা কি আসলেই স্বাধীনতা ? নারী সমাজের উপরেই এটা ছেড়ে দেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। এই বিষয়ে নির্বাচনের অধিকার কেবল নারীর, আর কারো নয় ।

    Reply
  9. সুমি

    এটা মনে করেই কষ্ট পাই যে, আমারা রোকেয়ার সময় থেকে না এগিয়ে পিছিয়ে গেলাম! ভেবে দেখুন উন্নত চিন্তা চেতনা ,সুযোগ সুবিধা ভোগ করায় আসে না, আসে মানসিকতায় । অনেক ভালো লিখেছেন । ধন্যবাদ ।

    Reply
  10. পুঁথি কথক

    ‘রোকেয়া দিবসে’ বেগম রোকেয়ার উপর আপনার মতামত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। আমাদের দেশে নারীমুক্তি আন্দোলনকারীদের নিকট রোকেয়া নারী শিক্ষার “আলোক বর্তিকা “-শুধু এইটুকুই । তাঁর নারী মুক্তির চিন্তার সুত্র গুলি বিস্তারিতভাবে পাঠ্যবই এআসা উচিত। আমাদের চিন্তার খন্ডিত রোকেয়া নিয়ে বেশি দুর যেতে পারবনা। বেগম রোকেয়ার
    পদ্মরাগ উপন্যাসের তারিণীভবন ‘-এ “মসুলমান, হিন্দু,ব্রাহ্ম,খৃষটান সকলে এক মাতৃ-গর্ভজাত সহোদরার ন্যায় মিলিয়া মিশিয়া কার্য করিতেছেন”। রোকেয়া সেই সমাজের কল্পনা করেছিলেন, যেখানে জাতের সহাবস্তান আছে। শিক্ষিত নারী পুরুষ সম মর্যাদায় সম্মিলিত চেষ্টায় সমাজ এগিয়ে নিবে -এ ছিল তার স্বপ্ন।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—