আসুন আমরা সবাই মিলে গত ৫২ বছর ধরে বিকশিত হওয়া আমাদের সবার ভালোবাসায় ধন্য এ দেশের টেলিভিশন শিল্পকে বাঁচিয়ে তুলি। সম্প্রতি এই শিল্প দারুণ হুমকির সম্মুখীন। আমরা নিজেরাই এ জন্য দায়ী। ফেডারেশন অব টেলিভিশন প্রফেশনালস অর্গানাইজেশন (এফটিপিও) তাই পাঁচ দফা দাবি নিয়ে এগিয়ে এসেছে। এগিয়ে এসেছে টিভি চ্যানেল মালিক থেকে শুরু করে এই শিল্পে কর্মরত সবাই। সবার দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে।

কী আছে পাঁচ দফায়?

১. দেশের বেসরকারি চ্যানেলে বাংলায় ডাবকৃত বিদেশি সিরিয়াল ও অনুষ্ঠান বন্ধ করতে হবে।

এই দাবিটি সর্বাগ্রে এসেছে। একসময় আমরা বিটিভিতে অনেক নামকরা সিরিয়াল ও অনুষ্ঠান দেখেছি। মনে করতে পারি ‘ডালাস’, ‘রুটস’, ‘পেপারচেজ’, ‘মাইন্ড ইয়োর ল্যাংগুয়েজ’, ‘ওসিন’-এর মতো অসাধারণ সব সিরিয়াল। কিন্তু সেগুলো ‘ডাব’ করা ছিল না, ইংরেজি ভাষাতেই দেখানো হত। অভিভাবকরাও ছেলেমেয়েদের সেসব অনুষ্ঠান দেখতে উৎসাহিত করতেন।

সেই সময় ভারতে টিভি তথা সম্প্রচারমাধ্যম ছিল অত্যন্ত দুর্বল। এখন প্রেক্ষাপটের বদল হয়েছে। ভারতে হাজার খানেক চ্যানেল এখন বাজার ধরতে ব্যস্ত। এ ক্ষেত্রে ভারতের প্রথম সারির বাংলা ও হিন্দি চ্যানেল আমাদের দেশে ‘পে-চ্যানেল’ হিসেবে সম্প্রচারিত হচ্ছে আর বছরে হাজার কোটি টাকা এ দেশের দর্শকদের খাজনা হিসেবে বিদেশে পাঠাতে হচ্ছে এ দেশেরই দুয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। এর মধ্যেই হঠাৎ করে একটি নতুন চ্যানেল একটি বিদেশি সিরিয়াল বাংলায় ‘ডাব’ করে আমাদের দেখাতে থাকে এবং সেটি যথেষ্ঠ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ওই চ্যানেলে বাংলাদেশের কোনো প্রথম সারির নাট্যকার বা পরিচালকের কোনো ধারাবাহিক নেই। ভারতের তৃতীয় সারির নির্মাতাদের কিছু অনুষ্ঠান আছে; সেগুলো অবশ্য জনপ্রিয়তা পায়নি।

জনপ্রিয় বিদেশি ডাবকৃত অনুষ্ঠানের জনপ্রিয়তা দেখে এখন অনেক চ্যানেলই একই পথ অনুসরণ করতে যাচ্ছে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে আমাদের দেশের টিভি অনুষ্ঠান নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত লক্ষাধিক কর্মী। প্রায় ৭০ শতাংশ প্রডাকসন হাউজ এখন বন্ধের পথে।

২. টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাণ, ক্রয় ও প্রচারের ক্ষেত্রে ক্লায়েন্ট ও এজেন্সির হস্তক্ষেপ ব্যাতিত চ্যানেলের অনুষ্ঠান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে হবে।

টিভি বা সম্প্রচারমাধ্যমে কাজ করছি তিন যুগের বেশি সময় ধরে। আর এক যুগের কাছাকাছি প্রাইভেট টিভি চ্যানেলে। এই মাধ্যমের বৈশিষ্ট্য হল নানা ক্ষেত্রে পারদর্শী ব্যক্তি ও বিশেষজ্ঞ এক ছাতার তলে কাজ করে থাকেন। কেউ কারো কাজে অহেতুক হস্তক্ষেপ করেন না। অনুষ্ঠান বিভাগ নতুন নতুন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করে, নির্মাণ করে আর বিপণন বিভাগ সেসব অনুষ্ঠান থেকে অর্থ উপার্জন করে। বিজ্ঞাপনদাতা বা এজেন্সিগুলো ওই সব অনুষ্ঠানে বিজ্ঞাপন প্রচারের মাধ্যমে নিজের পণ্যের প্রসার ঘটায়।

এখন আমরা দেখি এজেন্সিগুলোর নগ্ন হস্তক্ষেপ। তারা নিজেরাই এখন অনুষ্ঠান তৈরি করে থাকে বা বিদেশ থেকে তা এনে থাকে। এরপর সেগুলো টিভি চ্যানেলে কর্মরত বিপনন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তা চ্যানেলে বিক্রি করে থাকে। বিজ্ঞাপন প্রচার বাবদ চ্যানেলের পাওনা টাকার প্রায় অর্ধেক বা তারও বেশি তাদের সরবরাহকৃত অনুষ্ঠানের মূল্যবাবদ সমন্বয় করে থাকে। এ ধরনের ব্যবসার ফলে আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো আজ ধ্বংসের কাছাকাছি।

৩. টেলিভিশন শিল্পের সর্বক্ষেত্রে এআইটির ন্যূনতম ও যৌক্তিক হার পুনঃনির্ধারণ করতে হবে।

খুবই যৌক্তিক দাবি; মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।

৪. দেশের টেলিভিশন শিল্পে বিদেশি শিল্পী ও কলাকুশলীদের অবৈধভাবে কাজ করা বন্ধ করতে হবে।

দেশের টিভি চ্যানেলগুলোতে বিদেশি শিল্পী বা কলাকুশলীদের কাজ করার ক্ষেত্রে কিছু নিয়মকানুন এখনও আছে। কিন্তু ওই সব নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে অবৈধ পন্থায় যখন বিদেশিরা এখানে কাজ করে তখন তা দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে ওঠে বইকি।

৫. ডাউনলিংক চ্যানেলের মাধ্যমে বিদেশি চ্যানেলে দেশীয় বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধ করতে হবে।

এই বিষয়টি অতিব গুরুত্বপূর্ণ। তথ্য মন্ত্রনালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ইতোমধ্যে গ্রহণ করেছে। এখন দেখার অপেক্ষায়।

আমার মনে হয়, বাংলাদেশে এখনও ১০০টি চ্যানেল চলতে পারে, কিন্তু তার জন্য থাকতে হবে সুষ্ঠ পরিকল্পনা। আমরা যেমন দুর্বল পরিকল্পনার কারণে দর্শক হারাচ্ছি, অন্যদিকে ভারতীয় চ্যানেলগুলো তাদের কূট-পরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাদেশের দর্শকদের আকৃষ্ট করছে। বাংলাদেশ শুধু দর্শকই হারাচ্ছে না, হারাচ্ছে প্রতি বছর হাজার কোটি টাকা। এই টাকা অনেকটা তাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে টেলিভিশন অনুষ্ঠান দেখার নামে, পে-চ্যানেলের ফি বাবদ।

আমরা টাকা দিয়ে ভারতীয় চ্যানেল দেখছি, অথচ বাংলাদেশের কোনো টিভি চ্যানেল যখন ভারতে দেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখন বলা হয় ভারতীয় ক্যাবেল অপারেটরদের মোটা অংকের টাকা দিতে হবে। যে টাকা দেওয়ার সাধ্য আমাদের চ্যানেল মালিকদের নেই বললেই চলে।

একদিকে ভারতীয় চ্যানেল দেখার জন্য আমরা টাকা দিচ্ছি আমাদের ক্যাবেল অপারেটরদের মাধ্যমে ভারতীয় চ্যানেল মালিকদের, অন্যদিকে আমরা ভারতে আমাদের দর্শক সৃষ্টি করতে পারছি না সেখানকার ক্যাবেল অপারেটরদের আমরা টাকা দিতে পারছি না বলে। একেই কি বলে ‘মিডিয়া বিজনেস’?

ভারতে বাংলা ভাষাভাষী রাজ্যগুলোতে বাংলাদেশ টেলিভিশনের দর্শক কিন্তু একসময় অনেক ছিল। টেরিস্টিরিয়াল টিভি হওয়া সত্ত্বেও ওই সব অঞ্চলে ১৯৭২ হতে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ‘দূরদর্শন’-এর চেয়ে ‘বিটিভি’র জনপ্রিয়তা ছিল অনেক বেশি। আমাদের নাটক ও অনুষ্ঠান দেখার জন্য ভারতের বাঙালি দর্শকরা অপেক্ষা করে থাকত।

আমি মনে করি, বাংলাদেশে এখনও অনেক ভালো ভালো নাট্যকার, নির্মাতা এবং অভিনেতা-অভিনেত্রী আছেন। আমাদের চ্যানেলগুলো যদি ভারতে দেখানো হয় তবে পশ্চিমবাংলার বাংলা চ্যানেলগুলো দারুণভাবে দর্শক হারাবে। জনপ্রিয়তায় অনেক এগিয়ে যাবে আমাদের চ্যানেলগুলো।

ব্যবসায়ী পরিকল্পনায় ভারতীয়রা এগিয়ে আছে, কিন্তু টেলিভিশন ও নাট্যমাধ্যমে, সৃজনশীলতায় অনেক এগিয়ে বাংলাদেশ।

খ ম হারূনটেলিভিশন ব্যক্তিত্ব

Responses -- “আমাদের টেলিভিশন এবং এফটিপিওর পাঁচ দফা”

  1. জাহিদ

    ডাবিং ড্রামা গুলোর গুনগত মান আগে নিজেরা অর্জন করুন আর সামাজিক শিক্ষা মূলক ড্রামা আগে নিজেরা তৈরি করুন তার পর বন্ধ করুন। পারেন তো শুধু ভারতীয় অসভ্য সংষ্কৃতি নকল করতে। ভারতীয় নোংরা সিরিয়াল যখন সমাজ নষ্ট করে নিচ্ছে তখন এই কবিরা নিরব কেন? আর যখন কিছু সুস্থ সংষ্কৃতি সম্পন্ন ডাবিংকৃত ড্রামার কারনে দর্শকের মনের রুচির উন্নতি হচ্ছে, ভারতীয় ফালতু সিরিয়াল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে তখন তা বন্ধ করতে হবে। যোগ্যতা থাকলে সুলতান সুলেমান আর ইউসুফ জুলেখার মত ড্রামা তৈরি করে দর্শক জয় করুন। কোন সুনির্দিষ্ট ড্রামা বন্ধ করে এটা প্রমান করতে পারবেন না যে আপনারা অনেক যোগ্য। বিদেশি ড্রামা বন্ধ করতে চাইলে ভারতীয় অনুষ্ঠান আগে বন্ধ করে দেখান আপনারা পারেন, যা সমাজ সংসার ধ্বংস করছে।এই টুকু যেনে রাখুন এই ডাবিং ড্রামার কারনে দেশি চ্যানেল দর্শক পাচ্ছে।

    Reply
  2. আজিজ

    ভাল লিখেছেন। তবে আরও কয়েকটি পয়েন্ট দাবীতে রাখা দরকার ছিল। যেমন: বাংলাদেশী চ্যানেলকে পে চ্যানেল করা, বাংলাদেশী কম্পানীগুলো ভারতের অনুষ্টানের দেওয়ার উপর নিশেদাজ্ঞা দেওয়া সহ আরও অনেক পয়েন্ট আছে।

    Reply
  3. নয়ন

    আপনাদের প্রস্তাবনাসমূহ পড়ে যা বুঝলাম – বাংলাদেশী চ্যানেল দেখতে আপনারা দর্শকদের বাধ্য করতে চাচ্ছেন। এতে সমস্যার সমাধান হবে তো নাই বরং আরও বাড়বে। কারন কেন দর্শকবৃন্দ বাংলাদেশের চ্যানেল দেখছে না – সেই বিশ্লেষণ আপনারা করছেন না।
    একজন দর্শক হিসেবে বাংলাদেশী চ্যানেল না দেখার কারনগুলি সংক্ষেপে বলি:
    ১। মাত্রাতিরিক্ত বিজ্ঞাপন: খবরের কথাই বলি। একটা খবর দেখানোর সময় শিরোনাম বলার আগে একটা বিজ্ঞাপন, পরে আর একটা বিজ্ঞাপন, দুটো খবর পড়েই কমপক্ষে ৫-১০ মিনিটের বিজ্ঞাপন, তারপর একটা খবর পড়ে ৪০ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপন, আরও একটা খবরের পর আরও ৫-১০ মিনিটের বিজ্ঞাপন। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের খবরের জন্য টাইটেল যেমন কৃষি সংবাদ, শিল্প সংবাদ ইত্যাদিতেও বিজ্ঞাপন – অমুক ব্যাংক কৃষি সংবাদ। পুরো সময় জুড়ে নিচে দুইটা ক্রল চলতে থাকে। সেই স্ক্রলের মধ্যে এবং বামে ও ডানে বিজ্ঞাপন। উপরের বাম এবং ডান কোনায় একদিকে থাকে চ্যানেলের লোগো আরেকদিকে বিজ্ঞাপন।
    ২। প্রতিটা চ্যানেলে ঘন্টায় ঘন্টায় সংবাদ: দেশে এখন ৬ টা নিউজ চ্যানেল। তারপরও প্রতিটা চ্যানেলে প্রতি ঘন্টায় খবর দেখানো হয়। রাত নটায় হয়ত আপনার খবর দেখতে ইচ্ছা করছে না কিন্তু কিছু করার নেই। বাংলাদেশী চ্যানেল দেখলে আপনাকে খবর দেখতেই হবে।
    ৩। টকশো: খবরের মত আরেক উৎপাত হল টকশো। প্রতিটা চ্যানেলেই টকশো আছে।
    ৪। রাতে লাইভ গান: এটাও প্রায় সব চ্যানেলের কমন অনুষ্ঠান। রাত ১০ টার পর গান শুনতে ইচ্ছা না করলেও চ্যানেলগুলি আপনাকে শুনিয়েই ছাড়বে।
    ৫। দূর্বল অভিনয় আর বিশ্রী ভাষায় নাটক: একটা সময় মঞ্চ নাটক করে আসা অভিনেতারা টিভি নাটকে অভিনয় করতেন। আর এখন আরজে, সংগীতশিল্পী, মডেল – সবাই অভিনেতা। অভিনয় জানেনা, শুদ্ধ ভাষায় উচ্চারণ করতে পারেনা কিন্তু নামকরা টিভি অভিনেতা। যে ভাষায় এরা কথা বলে (যেমন করতেছি, খাইতেছি, যাইতেছি) সেটা বাংলাদেশের বেশীরভাগ মানুষের জন্য শ্রুতিমধুর নয়। আর আঞ্চলিক ভাষার নাটকগুলোও সার্বজনীন নয়। এখন প্রমিত বাংলায় নাটক হয়না বললেই চলে।
    ৬। দূর্বল চিত্রনাট্য, গল্প, পরিচালনা: টিভি দর্শকদের সবচেয়ে বড় অংশ হল মাঝবয়সী নারী। তাদের রুচি আর পছন্দের সাথে বর্তমানের নাটকগুলো যায়না। উঠতি বয়সী ছেলে-মেয়েদের প্রেম, উদ্ভট ভঙ্গিতে (নাকে নাকে, তোতলামি, বিশেষ কোন শব্দ করা ইত্যাদি) কথাবলা, কিছুক্ষণ পরপর মিউজিক শোনানো, কাজের মেয়ের সাথে ড্রাইভার শ্রেণীর লোকের কিছু সংলাপ, মোবাইল আর ফেসবুক – এই হল এখনকার নাটকের বিষয়বস্তু। এখানে না আছে পারিবারিক আবহ না আছে ক্লাইমেক্স। আগ্রহভরে দেখার মত কিছু কি আছে এখনকার নাটকে?

    আপনাদের প্রস্তাবনায় এসব সমস্যা সমাধানের কোন চেষ্টা বা ইচ্ছা প্রতীয়মান হয়নি। উপরন্তু একটা জোর করে গেলানোর মনোভাব ফুটে ওঠে। যেমন:
    ১। দেশের বেসরকারি চ্যানেলে বাংলায় ডাবকৃত বিদেশি সিরিয়াল ও অনুষ্ঠান বন্ধ করতে হবে: একভাষার সাহিত্য সংস্কৃতি অন্য ভাষার মানুষের কাছে পৌঁছাতে হলে ডাব তথা অনুবাদ করতেই হবে। এটা দোষের কিছু তো নয়ই বরং প্রশংসার যোগ্য। তা না হলে অনুবাদ সাহিত্য সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা হত না। ভারতে দক্ষিণভারতীয় সিরিয়াল এবং সিনেমা বাংলায় এবং হিন্দীতে ডাব করে বিভিন্ন চ্যানেলে দেখানো হয়। উদাহরনস্বরূপ তুমুল জনপ্রিয় টিভি সিরিয়াল “আদালত” এর কথা বলা যেতে পারে। বাংলাদেশেও একসময় আলিফ-লায়লা, সিন্দাবাদ, রোবোকপ,ম্যাকগাইভার, টিপুসুলতান ডাব করে দেখানো হত এবং সেগুলো প্রচন্ড জনপ্রিয় ছিল। সারা বিশ্বে প্রতিনিয়ত ডাব করা মুভি, সিরিয়াল প্রচারিত হয়।
    ২ ও ৩। এগুলো নির্মাতা এবং চ্যানেলের বিষয় তাই এই বিষয়ে দর্শক হিসেবে মন্তব্য অনাবশ্যক।
    ৪। দেশের টেলিভিশন শিল্পে বিদেশি শিল্পী ও কলাকুশলীদের অবৈধভাবে কাজ করা বন্ধ করতে হবে: এটাও হাস্যকর দাবি। দেশের শিল্পী বিদেশী সিরিয়াল বা মুভিতে কাজ করতে পারলে বিদেশীরা কেন দেশে কাজ করতে পারবে না? নির্মাতা কাকে দিয়ে তার অনুষ্ঠান নির্মাণ করবেন সেটা তার ব্যাপার। প্রচলিত আইন মেনে তিনি অবশ্যই তা করতে পারেন।
    ৫। ডাউনলিংক চ্যানেলের মাধ্যমে বিদেশি চ্যানেলে দেশীয় বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধ করতে হবে: বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্য হল মানুষকে জানানো। যেভাবে বিজ্ঞাপন দিলে কম খরচে অধিক মানুষের কাছে পৌঁছানো যাবে – বিজ্ঞাপনদাতা সেপথেই হাঁটবেন। যেই চ্যানেল মানুষ বেশী দেখে বিজ্ঞাপনদাতা সেখানেই বিজ্ঞাপন দিবেন – এটাই স্বাভাবিক। একটা চ্যানেল মানুষ দেখে না- এটা বিজ্ঞাপনদাতার দোষ নয়, চ্যানেলের দোষ। বিদেশি চ্যানেলে দেশীয় বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধ করার দাবির প্রেক্ষিতে যদি দেশী পণ্যের উৎপাদকেরা দেশী চ্যানেলে বিদেশী পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধের দাবি তোলে তাহলে? নির্মাতা আর চ্যানেল মালিকেরা কি তা মানবেন?

    মূল কথা হল – ভাল অনুষ্ঠান বানালে মানুষ দেখবে। এতগুলো চ্যানেল তাও মানুষ দেখে না এর কারন হল মানুষ যা দেখতে চায় চ্যানেলগুলি তা দেখাতে পারছে না। এর সমাধানও সোজা – মানুষ কি দেখতে চায় সেটা বুঝে সে অনুযায়ী অনুষ্ঠান নির্মান করা এবং প্রচার করা। সেটা না করে নানা বিধি নিষেধ আরোপ করে বস্তাপচা অনুষ্ঠান গিলতে দর্শককে বাধ্য করলে তা সুফল বয়ে নিয়ে আসবে না। এখন ইন্টারনেটের যুগ। ইন্টারনেট টিভি আরও জনপ্রিয় হলে প্রতিযোগীতা আরও বেড়ে যাবে। আমাদের ভাল অনুষ্ঠান বানিয়েই প্রতিযোগীতায় টিভি থাকতে হবে, প্রতিযোগীর সংখ্যা কমিয়ে নয়।

    Reply
    • ইয়াসিন খান

      নয়নের সাথে আমি পুরোপুরি একমত। তিনি যে কথাগুলো বলেছেন তা সম্পূর্ণ সত্য কথা এজন্য আমি তাকে ধন্যবাদ জানাই।

      Reply
      • মুহাম্মাদ পাভেল।।

        আমি ও এক মত।।
        পারলে স্টার জলসা আর
        জি বাংলার মত চ্যানেল গুলা বন্ধ করুন।
        এগুলা মানুষ কে কু শিক্ষা দেয়।।
        অশান্তি ছরায়।।এখানে মেয়ে গুলা পুরুষ আর পুরুষ গুলা মেয়ে।।

    • ইয়াছিন আহমদ

      আমার আপনার পরামর্শটা খুব ভাল লেগেছে। কোন কিছু করতে হলে এভাবেই করতে হবে। তবে বিদেশী চ্যানেল বাংলাদেশে চালু রাখতে হলে তাদের অনষ্ঠান মানসম্মত ও রুচিশীল করে প্রচার করতে হবে।অবশ্যই তা বাংলায় হতে হবে। ডাবিং করা অনুষ্ঠান আমার মতে ভাল।

      Reply
    • অপু

      আমি নয়নের সাথে পুরোপুরি একমত নই। আমাদের টিভি চ্যানেল গুলোর কিছু দুর্বলতা আছে। কিন্তু তা অতি মাত্রায় কমার্শিয়ালাইজেশন এর কারণে।
      আবার ভারতীয় চ্যানেলগুলো বাংলাদেশে ব্যবসায়ীক উদ্দেশ্যে আগ্রাসী ভাবে চলছে। এই অবস্থার অবসান না হলে দেশের সৃষ্টিশীল টিভি মাধ্যমে জড়িত সকলেই ক্ষতিগ্রস্থ হবেন। তাঁরা কিভাবে বাংলাদেশ ব্যবসা করছে তার কিছু নমুনা দেয়া হলো:
      ১) তারা ডাউনলিংক এর মাধ্যমে শুধু এ দেশে বিজ্ঞাপন প্রচার করে একই সময়ে একই চ্যানেলে দ্বিগুন আয় করছে। এতে আমাদের টিভি চ্যানলে এবং সরকার ব্যাপক রাজস্ব হারাচ্ছে। বাংলাদেশের মতো ছোট, জনবহুল দেশে যেখানে মানুষের আয়ের উৎস সীমিত সেখানে এটা গুরুত্বপূর্ণ।
      ২) আমাদের চ্যানেলগুলো ভারতে প্রচার করতে গেলে কাড়িকাড়ি টাকা দিতে হবে। কেন? বাংলাদেশী চ্যানলে গুলোর প্রদর্শন বন্ধ করার জন্য? আমরা উল্টো টাকা খরচ করে তাদের চ্যানেল দেখতে হয়। ব্যবসাটা আসলে কারা করছে?
      ৩) ভারতীয় চ্যানেলগুলোর নাটকের বিষয়বস্তু কি মানসম্মত? মানুষের চরিত্রের কুটিল দিকটি ফুটিয়ে তোলাই তাদের কাজ যা সমাজের জন্য ক্ষতিকর। মানের দিক থেকে আমাদের আর ভারতীয় নাটক একই বলতে পারি। তারা নির্মান ভাল করতে পারে কারণ তাদের অডিয়েন্স বড়, ব্যবসা বড়। বিনিয়োগ বেশি। বাংলাদেশী নাটক/অনুষ্ঠান তাঁদের চাইতে খারাপ নয় এজন্য তারা নিবন্ধন ফি ৫ কোটি রুপির আইন করে আমাদের চ্যানেল বন্ধ করেছে। কারণ তারা জানে আমাদের টিভি চ্যানেল গুলোর তা দেওয়ার ক্ষমতা নেই। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
      ৪) প্রত্যেকটি দেশই তার ব্যবসা/শিল্প/সাংস্কৃতি রক্ষার জন্য আইন করে থাকে। আমাদের পাশ্ববতী্ দেশ কে দেখলেই বোঝ যায়। আমি তাদের সাধুবাদ জানাই। আমাদের আইন ও তার প্রয়োগ এমন ভাবে করা উচিৎ যাতে আমরা সবাই বাঁচতে পারি। আমাদের ব্যবসা/শিল্প/সাংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখতে পারি।
      ৫) আমাদের বিজ্ঞাপন দাতারা (শিল্পপতিরা) প্রতিবছর তাঁদের ব্যবসা বাড়ানোর জন্য আমদানীর উপর শুল্ক বাড়ানো কথা বলেন। সরকার থেকে বিভিন্ন সুবিধাও যেমন: প্রনোদনা পাচ্ছেন। উদ্দেশ্য মহৎ আমাদের শিল্পের/ব্যবসার/দেশের উন্নয়নের জন্য। আর তাঁরা এসব সুবিধা নিয়ে ব্যবসা করে অন্য একটি দেশের চ্যানলে বিজ্ঞাপন দেবেন? এক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন দাতাদের দায়িত্ব রয়েছে তাঁরা যেমন সুবিধা পাচ্ছেন তেমনি টিভি মাধ্যমকে ব্যবসা দেবেন, দেশের জন্য দায়িত্ববোধ নিয়ে কাজ করবেন। দেশের মঙ্মলে তাঁরা একে অন্যের পরিপূরক।

      আসলে আমরা যাই বলিনা কেন বর্তমানের আকাশ সংস্কৃতির যুগে ব্যবসা বা লাভালাভ ছাড়া কোন প্রতিষ্ঠানই চলবে না। এই ক্ষেত্রে আমাদের চ্যানেল/শিল্প সমাজের আবেদন অনেকাংশে যথার্থ।

      আমি শুধু ব্যবসায়ীক দিকটি আলোকপাত করলাম। ধন্যবাদ। অপু, তেজকুনী পাড়া, ঢাকা।

      Reply
  4. সাজ্জাদ রাহমান

    আমার পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক খ. ম. হারুনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি- টিভি চ্যানেলগুলোর এক শ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারির নৈতিক অবক্ষয় এই দূর্দশার পেছনে অনেকাংশে দায়ি বলে আমি মনে করি। মালিকপক্ষ হয়তো জানেনই না তাঁদের আজ্ঞাবহ কর্মকর্তারা কিভাবে বিভিন্ন এজেন্সীগুলোর সাথে যোগসাজস করে লুটপাট করে থাকে। যে কোনো টিভি চ্যানেলে লিংক ছাড়া, ঘুষ ছাড়া কোনো প্রোডাক্সন চলেনা। আবার এই মধ্যস্থতা করে থাকেন ওই ফড়িয়ারাই।
    বেশীরভাগ চ্যানেলে কোনো প্রযোজক-পরিচালক যদি সরাসরি যান, তখন প্রথমতঃ রিসিপসনই পার হতে পারেন না, যদি তিনি নতুন কেউ হন। রিসিপশন থেকে বলা হয়-সিডি/ডিভিডি রেখে যান। প্রিভিউ হলে জানেতে পারবেন। ওই প্রোডাক্সন ইহ জিন্দেগীতে প্রিভিউ হয়না। নির্মাতা যদি পরিচিত হন- রিসিপসন পার হতে পারেন বটে, প্রথমেই কর্তা ব্যক্তির একটি প্রশ্নের সম্মুখিন হতে হয়- ‘কে কে আছে?’ রচয়িতা কে? গল্প কেমন, কিংবা পরিচালক কে? এর চাইতে ওই নাটকে কোন কোন স্টার আছে সেটাই মূখ্য হয়ে যায়। যদি ওখানে কোনো স্টার আর্টিস্ট থাকে তখন হয়তো দয়া করে প্রিভিউ করেন- কিন্তু সেটা প্রচারের মুখ দেখেনা বা কেনা হয়না। ওইসব কর্তা ব্যক্তিরা মুখিয়ে থাকেন এজেন্সিগুলোর দিকে। কারণ এজেন্সি আসলে সিঙ্গেল নাটক প্রতি কিংবা ধারাবাহিকের পর্ব প্রতি লেনদেনের হিসাবটা করা যাবে। এই প্র্যাকটিসটা দীর্ঘদিন চলে আসতে আসতে এখন অবস্থাটা এমন হয়েছে যে- শুধু নির্মাতাই নন, চ্যানেলগুলো নির্ভরশীল হয়ে গেছে ওইসব ফড়িয়াদের উপর।
    আমার একটি মা্ত্র অভিজ্ঞতা থেকে শুধু বলছি।
    ১৩ পর্বের একটি ধারাবাহিক নাটক দেশের স্বনামধন্য একটি চ্যানেলের কাস্টিং ধারণা (অমুককে নেন, তমুক কে নেন) মেনে জমা দেয়ার পর প্রিভিউ হলো। প্রিভিউর পর পর্ব প্রতি ৫০০০/- টাকা ওই কর্তাকে অগ্রীম ঘুষ দেয়ার প্রস্তাব আসে। বিষয়টি আমার প্রডিউসারকে জানানোর পর তিনি রাজি হলেননা। এরপর বছর খানেক প্রোডাকসনটি পড়ে থাকে। ১ বছর পর দেখি ওই কর্তা ব্যক্তি ওই চ্যানেলে নাই। বাধ্য হয়ে অন্য চ্যানেলে গেলাম। তিনি বললেন অমুক এজেন্সি হয়ে আসেন। সেই এজেন্সি বলল- পর্ব প্রতি দশ হাজার অগ্রীম দেবেন, তার আগে একটি পার্টি দেবেন, সেখানে বাইরের দামী বোতল থাকবে, মেয়েও থাকতে হবে দু’চারটা। এই কথা শুনে আমার প্রডিউসার বললেন- ‘আমার প্রোডাক্সন চালানোর দরকার নেই, মিডিয়া ব্যবসার খেতা পুড়ি।’ আমি জানি উপরোক্ত সব শর্ত মেনে প্রোডাক্সন চললেও টাকা পেতে বছর কয়েক ঘুরতে হতো।
    এই যখন টিভি স্টেশনগুলোর অবস্থা, তখন এই শিল্প ধ্বংশ হয়ে না যাওয়ার কারণ দেখিনা। সুতরাং আগে চ্যানেলগুলোকে শুদ্ধ এবং সৎ হতে হবে। তবেই দেশে ভালো অনুষ্ঠান নির্মিত হবে চ্যানেলও টিকে থাকবে। নিজেদের নৈতিক চরিত্র ঠিক না করে এবং দর্শক নন্দিত অনুস্ঠানে নির্মাণ না করে ঢালাওভাবে বাইরের চ্যানেলগুলোকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। যে অনুষ্ঠান যত জনপ্রিয় হবে, সেখানে বিজ্ঞাপনদাতারা ছুটে যাবেন এটাই স্বাভাবিক।
    একই সাথে ভালো অনুষ্ঠান হলেও অজস্র বিজ্ঞাপনে বিরক্ত হয়ে দর্শক রিমোট টিপে অন্য চ্যানেলে চলে যান। এ জন্য সব চ্যানেল মিলে অনুষ্ঠান প্রতি কত মিনিটি বিজ্ঞাপন চালাবেন তার একটা বাধা ধরা নিয়ম চালু করতে হবে। তখন বাধ্য হয়ে কোম্পানীগুলো বিজ্ঞাপন্ রেইট বাড়াবেন- কারণ নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে তিনি জায়গা পাচ্ছেননা। একই সাথে অননুমোদিত ডাউনলিংক চ্যানেল বন্ধ করতে হবে। ভারত আমাদের চ্যানেল চালায়না। সুতরাং আমরাও চালাবোনা- এই সিদ্ধান্ত কোনদিনই আসবেনা। এজন্যে আমাদের ঘরের গীন্নি এবং নতজানু পররাষ্ট্র নীতিই দায়ি।
    আরেকটি বিষয় হলো- যেসব কোম্পানীর পণ্য দেশের বাইরের মার্কেটে আছে তারাতো ব্যবসার জন্যে বিজ্ঞাপন দিবেই। সুতরাং সব দিক বিবেচনা করে নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
    আন্দোলন সংগ্রাম করে ফল লাভ হবে বলে মনে হয়না। তার চাইতে টিভি চ্যানেলগুলো মিলে একটা ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্তে আসতে হবে, প্রতিষ্ঠান থেকে অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বিদায় করতে হবে। নির্মাতা কিংবা স্টার নয়, নির্মাণ বুঝে অনুষ্ঠান সম্প্রচার করতে হবে।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—