Feature Img

habibur111বিজয় দিবস আমাদের কাছে নববর্ষের মতো। এদিন আমাদের নবান্নের মতো উৎসবও। আমরা আনন্দ করি এবং প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসেবনিকেশ করি। বিজয়ের চল্লিশ বৎসর পূর্তিতে সেই দিনের তাৎপর্য আজ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের অতীতের অর্জন-ব্যর্থতা বা লাভক্ষতির একটা খসড়া খতিয়ান তুলে ধরা যাক । যদি আমরা আমাদের অতীতকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারি এবং তার থেকে যথার্থ শিক্ষালাভ করতে পারি তবে ভবিষ্যতের জন্য আমরা কিছু দিগনির্দেশনা পেতে পারি।

যে ভূখন্ড আজ বাংলাদেশ হিসেবে পরিচিত তা ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারতের এক প্রদেশের অংশ ছিল। পরে তা পাকিস্তানের এক প্রদেশ হয়। আমাদের রাজনৈতিক ভাবনা প্রদেশের স্বায়ত্তশাসন ঘিরে। ছয় দফার আন্দোলনও সেই উপলক্ষে। পাকিস্তানের জুলফিকার আলি ভুট্ট অবশ্য ঠিকই ধরেছিলেন যে ব্যাপারটি প্রায় সার্বভৌম স্বাধীনতার কাছাকাছি। যাই হোক যখন ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে আমরা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিজয় ও অন্যান্য দেশের কাছ থেকে স্বীকৃতি লাভ করলাম তখন সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রশাসন, দায়িত্ব ও গুরুত্ব সম্পর্কে আমরা তেমন অভিজ্ঞ ছিলাম না। আমাদের লোকবল তেমন দক্ষ ছিল না। এখনো বিশ্ব ব্যাংক বলে আমাদের প্রশাসনের শতকরা মাত্র ২০ ভাগ লোক কাজের। এরপরে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশ এবং অবাঙালি শিল্পপতিদের পরিত্যক্ত প্রতিষ্ঠান ও বিষয়াদির দেখভাল ভারী শিল্প, ব্যাংক বীমা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের জাতীয়করণের ফলে সদ্যস্বাধীন দেশের সরকারের সম্মুখে একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেয়। সেই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করে আমরা টিকে আছি।

গত দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষের দিকে ব্রিটিশ ভারত সাম্রাজ্যের প্রশাসনে বিকার দেখা দেয়। মুসলমান কর্মকর্তা দিয়ে মুসলমান এলাকায় এবং হিন্দু কর্মকর্তা দিয়ে হিন্দু এলাকায় যখন শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল তখন শাসক সম্প্রদায় নিজেদের বিলাতে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবতে শুরু করল। প্রশাসনে যে পতন শুরু হয়েছিলো পাকিস্তান আমলে তা রোধ করা যায় নি। স্বাধীন বাংলাদেশে তার অধোগতি নির্মমভাবে বৃদ্ধি পায়। মুক্তিযোদ্ধাদের দুই বছরের সিনিয়রিটি দলীয় স্বার্থে প্রশাসনে নিয়োগ, পদ-উন্নতি বা পদাবসান বিশেষ কর্তব্যে নিয়োজিত কর্মহীন কর্মকর্তার সংখ্যা এবং চুক্তিভিত্তিতে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ প্রশাসনকে একেবারে তছনছ করে দেয়। ইতিমধ্যে তত্ত্বাবধান ও তদারকির অনুশীলনের অভাবে প্রশাসনিক কাঠামো মরচেপড়ে একেবারে অকেজো হয়ে ওঠে। বেসামরিক প্রশাসনে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের অন্তর্ভূক্তি এক দুরুহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। আত্মরক্ষার্থে জী-হুজুর আমলারা তাদের প্রশাসনিক দায়িত্ব ভুলে নিজেদেরকে চাটুকার্য্যে নিয়োজিত রাখেন। গত চল্লিশ বছরে দেশের প্রশাসনে আমাদের টিকে থাকাই এক বড় অর্জন।

১৯৭১ সালে দেশে ১ কোটি টন ধান উৎপাদন হতো। বর্তমানে খাদ্য উৎপাদন ৩ কোটি টন ছাড়িয়ে গেছে, মোট দেশজ উৎপাদনে কৃষির অবদান ২০ শতাংশ। চল্লিশ বছর আগে যেখানে দেশের ৬০ শতাংশের খাদ্যাভাব পূরণ হতো, আজ দেশ সেখানে প্রায় স্বনির্ভর। চল্লিশ বছরে মাথাপিছু আয় ৯ গুন বেড়ে ৮১৮ ডলারে পৌঁছেছে। প্রবাসী নাগরিকদের প্রেরিত আয়ের দিক দিয়ে বাংলাদেশের স্থান পঞ্চম। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যে ১১ বিলিয়ন পর্য়ন্ত উঠেছিল তা সেই প্রবাসীপ্রেরিত অর্থেরই কারণে।

চল্লিশ বছর আগে এদেশের ৭০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র সীমার নিচে বাস করত। বর্তমানে সেই দারিদ্র্য সীমা ৪০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। গত বিশ বছরে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ দারিদ্র্য সীমার ওপরে উঠেছে।

নব্বই-এর দশকে মাথাপিছু আয়ের প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশ হারে ছিল। বর্তমানে মাথাপিছু আয়ের প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশ। বিশ্বমন্দার পরেও মোট দেশজ উৎপাদন ৬ শতাংশ বা তার ওপরে উঠানামা করছে। রপ্তানি খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪০ শতাংশ। বিপুল সংখ্যক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা সৃষ্টি হয়েছে। প্রতি বছর প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকা ঋণ পাচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পখাত। প্রযুক্তি ক্ষেত্রে দেশের আয় বেড়েছে। আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে আয়ের সেরা দশটি দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয়ে চীনের পরে আমরা, দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক।

গত চল্লিশ বছরে সবচেয়ে বেশি অর্জন হয়েছে শিক্ষাক্ষেত্রে, যদিও স্বাধীনতার অন্যতম অঙ্গীকার সবার জন্য শিক্ষা আজও নিশ্চিত করা যায় নি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় সারা দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছিল চারটি। তখন কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। এখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ৩৪টি এবং বেসকারি বিশ্ববিদ্যালয় ৫৪টি। যেখানে স্বাধীনতার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৪ থেকে ৫ হাজার সেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আজ প্রায় ৪০ হাজার। যেখানে স্বাধীনতার সময় কলেজ শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১ থেকে দেড় লাখ সেখানে বর্তমানে ২০ লাখ শিক্ষার্থী রয়েছে। যেখানে একাত্তরে প্রাথমিক শিক্ষার হার ছিল মাত্র ৫/৬ ভাগ এখন তা ৭০ শতাংশে পৌঁছেছে। প্রাথমিক শিক্ষায় এখন ৯০ ভাগ ছেলেমেয়ে স্কুলে যায় এবং ছেলে ও মেয়ে শিক্ষার্থীর অনুপাত প্রায় সমান-সমান। বিনামূল্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, অবৈতনিক শিক্ষা, ব্যাপক প্রচার – প্রচারণার ফলে এ উন্নতি ঘটেছে।

একাত্তরে সাক্ষরতার হার ছিল ১৬.৮ ভাগ। ৭৪ সালে ছিল ২৫ ভাগ। এখন ২০১১ সালে তা দাঁড়িয়েছে ২০বছর বয়সের কম বয়সী পুরুষদের ক্ষেত্রে ৬২.৬৬ শতাংশে। নারী ছাত্রীদের ক্ষেত্রে এ হার এখন ৫৭ শতাংশ। সাধারণ শিক্ষার পাশপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, কারিগরি চিকিৎসা ও আইন পেশায় শিক্ষার হার বেড়েছে। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ইদানিং কমে আসছে। গত চল্লিশ বছরে শিক্ষার মান কমেছে। নৈতিক শিক্ষায় আমরা এগুতে পারিনি।

বিগত চল্লিশ বছরে স্বাস্থ্য খাতে আমরা কিছু বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করেছি। শিশু মৃত্যুহার কমেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ২.৬৭% থেকে হ্রাস পেয়ে বর্তমানে ১.৪২ তে দাঁড়িয়েছে। ৯০ শতাংশ শিশু টিকার আওতায় এসেছে। গড় আয়ু যেখানে ছিল ৫০-এর নিচে তা আজ ৬৫ বছরের উপরে।

বাংলাদেশকে আর কেউ তলাবিহীন ঝুড়ি বলবে না। আগামী ৪০ বছরে বাংলাদেশ উন্নত ৩০টি দেশের মধ্যে তার স্থান করে নেবে। আশা করা যায় আন্তসংযোগ বাড়বে এবং আয় বৈষম্য কমবে। ২০১৪ সালে স্বাক্ষরতার হার ১০০ শতাংশে উন্নীত করার জন্য সরকারের সর্বশক্তি নিয়োগ করা প্রয়োজন। সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতির অভাবে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সুদৃঢ় ভিত্তি না পাওয়ায় মানবিক রাষ্ট্র গঠনের যে স্বপ্ন আমরা মুক্তিযুদ্ধের সময় দেখেছিলাম তা আজও আমাদের করায়ত্ত নয়। দেশে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে প্রবৃদ্ধির সাথে সাথে, কিন্তু সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি এখনও সুদূর পরাহত। দেশে আইনের সংখ্যা, আদালতের সংখ্যা বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এখনো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় নি। বিলম্বে হলেও বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার সম্পন্ন হয়েছে। এটা আমাদের জন্য এক বড় কলঙ্ক মোচন। বিলম্বে হলেও যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হয়েছে। এটা আমাদের জন্য সঠিক পথে যথার্থ পদক্ষেপ। অরাজনৈতিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে সংঘটিত বহু খুন, নিমখুন বা গুমখুনের বিচার হয় নি।

আইনমন্ত্রী–সব আমলেরই আইনমন্ত্রী–যখন বলেন, আইন নিজস্ব গতিতে চলবে, তখন আমরা বিস্মিত হই। দন্ডীয় ব্যক্তির জন্য রাষ্ট্রপতির ক্ষমা দ্রুতগতিতে নিস্পন্ন হয়, তখন আমরা স্তম্ভিত হই। ক্ষমতা হস্তান্তরের পর প্রতিটি নতুন সরকার নতুন নতুন মামলা দায়ের করেন বিরোধী দলের নেতা কর্মীদের বিরুদ্ধে এবং সরকারি দলের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আগের সরকার যেসব মামলা দায়ের করেছিলেন তা প্রত্যাহার করেন।

প্রতিরক্ষা বিভাগের যেসব কোটি কোটি টাকার অস্ত্রশস্ত্রাদি ক্রয়ের ব্যাপারে দুর্নীতির গুঞ্জন ওঠে তা প্রত্যাহার ভাটায় বিলীন হয়ে যায়। ঘটনাচক্রে এপর্যন্ত কেবল হোসাইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধেই দুর্নীতির মামলায় বিধিবদ্ধ বিচার হয়েছে।

গত চল্লিশবছর ধরে আমরা দুর্নীতি বিরোধী সমাজ দেখতে চেয়েছি। কিন্তু দুর্নীতি দমন কমিশনকে দূর্বল করে রেখেছি। পূর্বানুমোদনের বিধান ও নানাবিধ আমলাসন্তোষক বিধানবলীর জন্য দুর্নীতিরোধী সংস্থা আজ ঠুঁটো জগন্নাথ। আমরা নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য হুকুম দিই। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের হুকুম মানতে চায় না। শুধু নির্বাচনের ব্যাপারে গত তত্ত্বাবধায়ক সরকার যেসব ব্যবস্থা নিয়েছিলেন তার বেশ কিছু পরে অনুমোদিত হয় নি।

তেষট্টি জেলায় বোমা বিস্ফোরণের মদদদাতাদের সম্পর্কে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যে মন্তব্য করতেন একই সুরে পরের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী র্নিদ্বিধায় মন্তব্য করেন এই বলে যে দেশে শান্তি শৃঙ্খলা আগের চেয়ে ভালো। বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটলে আগের আমলের নজির উত্থাপন করা হয়। আগের সরকারের অদক্ষতা বা অক্ষমতা কি বর্তমান সরকারের দক্ষতা বা ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে? চাঞ্চল্যকর সাংঘাতিক মামলায় যেভাবে একের পর এক তদন্ত অফিসার বদল হয় তাতে মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ-আলামত সমস্ত বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা।

গত চল্লিশ বছরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান স্থাপনার নাম বদলাতে এবং কমিটি কমিশন নিয়োগ করতে আমরা বহু কোটি টাকা ব্যয় করেছি। তার একটা হিসেবনিকেশ হওয়া দরকার।

আমাদের দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র ভুঁইয়া গণতন্ত্রে রূপান্তরিত হয়েছে। সংসদ সদস্যে নির্বাচনী এলাকায় তাঁকে ছাড়া কোনো কাজ হয় না। এমন সর্বব্যাপী ক্ষমতাধর ব্যক্তির সম্মুখে আর সবাই মূল্যহীন। আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্রের বিরোধীদল দলনির্বিশেষে তাদের ভূমিকা পালন করেন না। বিরোধীদল পাঁচতারা হোটেলে তার বাজেটের সমালোচনা ব্যক্ত করেন। সংসদ সদস্যগণ যে বিলখেলাপির ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছেন তা বিস্ময়কর। সরকার ও সংসদ সদস্যদের বিলাসবহুল জীবন লোকে তাকিয়ে দেখে। সরকারের আয় ব্যয়ের হিসাব সময়মতো সংসদে পেশ হয় না। বিদেশভ্রমণে প্রধানমন্ত্রী ও অন্য মন্ত্রীদের সফরসঙ্গীদের পেছনে যে ব্যয় হয় তা দেখে বিদেশিরা চমৎকৃত হয়। গত চল্লিশ বছরে বিদেশভ্রমণে কত ব্যয় হয়েছে এবং আমাদের কী প্রাপ্তি ঘটেছে তার একটা নিরীক্ষা হওয়া দরকার।

দাবি-দাওয়া উত্থাপনে বা প্রতিবাদে আমরা বেশ উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় দিয়েছি। পরিচিত হরতালের সঙ্গে যোগ হয়েছে অবরোধ, লাগাতার হরতাল এবং সর্বশেষে মানববন্ধন। এইসব ক্ষেত্রে সমাজ বা সরকার যদি দাবি বা প্রতিবাদকে গুরুত্বের সঙ্গে আমলে না নেয় তবে তা হবে নিরর্থক অনুশীলন। এই নিরর্থক একজন মানববন্ধনকারী সখেদে বলেছেন, এমন মানববন্ধনে একশ বছর ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলেও কোনো লাভ হবে না। এ হতাশার কথা। হরতালে অভ্যস্ত বাঙালি হরতালের মাধ্যমে অনেক কিছু অর্জন করেছে। তাই তারা অনিয়মিতভাবে সেই অনুশীলন করতে সর্বদাই যেন এক পায়ে দাঁড়িয়ে। শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পথে সমাজ বদলাতে না পারলে সোনার বাংলা গড়ার অঙ্গীকার সব মিথ্যা মনে হবে। যে সীমিত উন্নতি আমরা অর্জন করেছি তা রাজনৈতিক অস্থিরতায় নিমেষেই বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে। সহিষ্ণুতার সঙ্গে জাতিধর্ম নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলে মিলে দেশ গঠনে ও সমাজের সার্বিক কল্যাণে আমরা আগামী দিনের জন্য আমাদেরকে নিয়োজিত করব।

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা।

Responses -- “চল্লিশ বছর: স্বাধীনতার খসড়া খতিয়ান”

  1. মুহম্মদ জাহাঙ্গীর

    সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের লেখা বিশেষ গুরুত্ত বহন করে। আশা করবো তিনি সরকার ও দেশের অর্জন, সার্থকতা, ব্যর্থতা ও তার থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে মাঝেমধ্যে লিখবেন। এ দেশে প্রতিটা সাধারণ নাগরিক প্রতিটা সরকারী কাজে হয়রানীর সম্মুখীন হয়। সরকার পরিচালনার কোন সহজ পদ্ধতি(system & policy) নাই, সবখানেই জটিলটা। আমাদের সরকার পরিচালনার জন্য একটি ভাল পদ্ধতি (system & policy) দাড় করানো দরকার। আমার সামান্য ব্যবসায়ীক অভিজ্ঞতা থেকে বলছি – চীন, কোরিয়া, আমেরিকায় যে সব কাজ ৫ মিনিটে করা যায় – তা করতে এখানে ৫ দিন লাগে, ওখানে যে কাজ করতে এক পৃষ্ঠা লাগে তা করতে এখানে একশ পৃষ্ঠা লাগে সুতরাং ঐ সব দেশের পদ্ধতি(system & policy) আমরা কেন গ্রহণ করছি না? এতে উন্নয়ন বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। আমাদের পদ্ধতি(system & policy) – আবার বলছি, আমাদের পদ্ধতি(system & policy) উন্নয়নের বিরাট অন্তরায়। ভাল পদ্ধতি(system & policy) গ্রহণ করলে কাজ দ্রুত হবে এবং দুর্নীতি কমে আসবে।

    Reply
  2. আবাবিল

    -খুব ভাল লেগেছে। স্যারকে ধন্যবাদ। আপনি বলেছেন, “গত চল্লিশ বছরে শিক্ষার মান কমেছে। নৈতিক শিক্ষায় আমরা এগুতে পারিনি।” আমারতো মনে হয় নৈতিক বোধ গুলোকে আমরা সন্ত্রাসী কায়দায় বিতাড়িত করতেই বেশী উদ্‌গ্রীব। কারণ তাদের লুটপাটের কাজে সাধারণ মানুষের এই নৈতিক বোধটাই বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই নৈতিক বোধটাকে দেশ ছাড়া করতে পারলে, প্রথমতঃ তারা মানুষের ঘৃণা থেকে বাঁচবে, দ্বিতীয়তঃ এটাকে একটা জাতীয় রুপ দিতে পারবে। অথচ একটি জাতি নৈতিকতার দিক থেকে একটা আদর্শ মান বজায় রাখতে না পারলে তার বৈষ্যয়িক উন্নতি অর্জন করা ও ধরে রাখা আদৌ সম্ভব নয়। ইহুদিরা এতো বেশী শৃংখলিত থেকেও দুনিয়াজোড়া তাদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড চালু রাখতে পেরেছে শুধুই মানের জোরে। আর আমরা ডানা মেলার আগেই পাততাড়ি গুটাচ্ছি।

    আপনি বলেছেন, “অরাজনৈতিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে সংঘটিত বহু খুন, নিমখুন বা গুমখুনের বিচার হয় নি।”-এর ফলে শাসক আর তার সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে জনগণের দুরত্ব বেড়েছে বহুগুণ; যেমনটা ছিল জমিদার ও ব্রিটিশ আমলে। আজকাল আর কেউ প্রতিকার চাইতে আদালতের দারস্থ হওয়াকে বুদ্ধিমানের কাজ মনে করেনা। যারা আদালতে যান তারা প্রতিপক্ষকে বিপদে ফেলার জন্য। এদেশের প্রশাসন ব্যবস্থা আর বিচার ব্যবস্থা সাধারণ জনগণকে সেবা দেবার জন্য নয়; এগুলি সবই সরকারী দলের তোষণ নয়তো তাদের অবৈধ কর্মকান্ডকে বৈধতা দেয়ার জন্য এবং সরকারী দলের অবৈধ আয় রোজগারের যোগানদাতা হিসেবে কাজ করছে। সরকারী দলের তদবির ছাড়া উচ্চাদালতে কেউ বিচার পায়না। মাঠ পর্যায়ের অবস্থা আরও খারাপ। পুলিশ এখন শিষ্টের দমন আর দুষ্টের লালন করে চলেছে। এদের একাংশ ক্রস ফায়ার, গুম, চাঁদাবাজি ইত্যাদিতে জড়িয়ে পড়েছে। এটা সরকারের নির্দেশেই। সরকারী দলের অনুমোদন কিংবা আদালতের নির্দেশ ছাড়া থানা কোন ভুক্তভোগির মামলা রেকর্ড করতে পারছেনা। মামলার চার্জশীট হয় দুর্নীতির মধ্য দিয়েই। কাজেই বিচার বলতে যা বোঝাই তা নেই। যা আছে তাকে অবিচার ছড়া কিছুই বলা যায় না।

    আপনার প্রশ্ন, “আগের সরকারের অদক্ষতা বা অক্ষমতা কি বর্তমান সরকারের দক্ষতা বা ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে?” রাজনীতিতে এটাই একটা বড় ট্রাজেডি । আর এটা রাজনৈতিক দলগুলোর দৈন্যতার স্বীকৃতি। এর মাধ্যমে তারা বুঝাতে চান যে, তাদের কুকর্ম দেখে শুধু ছি ছি করে লাভ নেই। তাদের বিকল্প অবস্থানে যারা আছে তাদের অবস্থাও ভাল নয়। এরা এতোটাই নীচে নামে যে, নিজেদের খারাপ হওয়ার বিষয়ে এদের নিজেদেরও বিন্দু মাত্র সন্দেহ নেই। এদের নীচতা এতোটাই হীন প্রকৃতির যে, নিজেদের ভাল কাজ দিয়ে তারা কখনই জনগণের মন জয়ের আশা করেনা। তাই তারা জনগণকে বুঝাতে চায় যে শুধু শুধু তাকে খারাপ বলছে কেন, তার চেয়েও অন্যেরা খারাপ। তাই তারা নীজেরা কাজের মাধ্যমে বড় হওয়ার আশা ত্যাগ করে, অন্যের হাত-পা কেটে খাট করে তার উপরে উঠতে চায়। আর এজন্যই রাজনীতিতে সংঘাত।

    আর তাই “শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পথে সমাজ বদলানোর” সম্ভাবনা খুবই কম। “যে সীমিত উন্নতি আমরা অর্জন করেছি তা রাজনৈতিক অস্থিরতায় নিমেষেই বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে।” শুধু একটা প্রবল ঝড়ের অপেক্ষা মাত্র। এদেশে মানবাধিকার নেই। পরিশেষে স্বাধীন দেশের পরাধীন নাগরিক হিসেবে আর তেমন কিছুই চাই না, শুধুই স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা চাই।

    Reply
  3. Gias Uddin Bhuiyan

    চল্লিশ বছর: স্বাধীনতার খসড়া খতিয়ান। এ প্রসঙ্গে বলতে গেল অনেক কিছু বলতে হয়, কিন্তু আমি বেশি কিছু না বলে স্যারের কথার সাথে একটু সুর মিলায়ে বলতে চাই যে, স্বধীনতার ৪০ বছর পেরিয়ে এসেও আমরা আজও বলতে পারিনি আমরা স্বাধীন, কারণ আমরা স্বাধীনতার সুফল আজও পাইনি। মুক্তিযুদ্ধে দেশ মুক্ত হয়েছে পাক হানাদার বাহিনীর হাত থেকে, কিন্তু ক্রমে ক্রমে দেশীয় হানাদারদের থেকে দেশ মুক্ত হতে পারেনি যার জন্য আমরা আজও স্বাধীন দেশে পরাধীনভাবে বসবাস করতে হচ্ছে। দেশে বাড়ছে ক্রমাম্বয়ে গুপ্ত হত্যা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ভুমিকা নিলীর্প্ত। বিচার বিভাগ যেখানে পরাধীন এবং সাধারণ জনগণের নিরপেক্ষ বিচার পাওয়ার কোন সুযোগ নেই। আগে আমরা বিচারপতি মহোদয়গণদেরকে নিষ্পাপ মনে করতাম, তাঁদের চালচলন, আচার আচরন সবার নিকট অনুসরনযোগ্য। কিন্তু বতর্মানে কি দেখছি দলীয়ভাবে বিচারপতি নিয়োগের কারণে তাঁরা হয়ে উঠেছেন দলীয় ভাবমুতির্ রক্ষার হাতিয়ার। সাধারণ জনগণের জন্য দেশের জন্য তাঁদের কোন কিছু করার নাই এটাই আমাদের দেশের সবচেয়ে বেশী লজ্জার। রাজনীতি থাকতে পারে কিন্তু একজন বিচারপতি তিনি সবার উদ্ধের্ থাকবেন, যখন তিনি আসনে বসবেন তখন তিনি সবার জন্য কোন দল বা গোষ্ঠীর জন্য নন। বতর্মানে দেখা যায় তার উল্টোটা। স্বাধীনতার ৪০ বছর পার হলেও আমরা দলীয় গন্ডি থেকে বেড়িয়ে আসতে পারিনি। দেশের আইনকে বছরের পর পরিবতর্ন করলেও সব করা হয় নিজেদের জন্য দেশ তখা জনগণের জন্য বিবেচনায় কিছু করা হয়নি। সব আমলেরই আইনমন্ত্রীমহোদয়গণ–যখন বলেন, আইন নিজস্ব গতিতে চলবে, তখন আমরা বিস্মিত হই। দন্ডীয় ব্যক্তির জন্য রাষ্ট্রপতির ক্ষমা দ্রুতগতিতে নিস্পন্ন হয়, তখন আমরা স্তম্ভিত হই। ক্ষমতা হস্তান্তরের পর প্রতিটি নতুন সরকার নতুন নতুন মামলা দায়ের করেন বিরোধী দলের নেতা কর্মীদের বিরুদ্ধে এবং সরকারি দলের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আগের সরকার যেসব মামলা দায়ের করেছিলেন তা প্রত্যাহার করেন। সবচেয়ে আশ্চযের্র বিষয় হল: সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিগত বছরগুলোতে যারা খুনের আসামী, জাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামী এবং অন্যান্য মামলায় আসামী ছিল তাদেরকে সরকার ক্ষমতায় এসেই রাজনৈতিক বিবেচনায় মুক্তি দিলেন এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা দিলেন যে, তাদেরকে আমরা নতুন করে বাঁচার সুযোগ দিয়েছি। তার সাথে সাথে দিনের সময় একঘন্টা এগিয়ে নিয়ে আসলেন। এপ্রসঙ্গে একজন ড্রাইভারের নিকট থেকে আমি একটি মন্ত্য শুনেছিলাম : সরকার সময় একঘন্টা এগিয়ে আনার কারণ হল সরকার যে সন্ত্রাসী, খুনিদের ছেড়ে দিয়েছেন তারাতো তাদের পুরনো পেশায় ফিরে যাবে, আপনারা যাতে সন্ধ্যার আগেই বাসায় ফিরতে পারেন সেই জন্য সময় একঘন্টা এগিয়ে নিয়ে এসেছেন। তার দিক থেকে তার যুক্তিকে আপনি অস্বীকার করবেন কী করে। কোন দেশে আছে রাজনৈতিক বিবেচনায় সকল বন্দীদের ছেড়ে দেয়া হয়? যদি নতুন করে বাঁচার সুযোগ করে দিতে চান তাহলে সব দলের লোকদের ছেড়ে দেন। আবার আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহোদয়ের একটি বক্তব্য পরলাম, শহীদ জিয়া সম্পকে, তিনি নাকি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না, তিনি মুক্তি যুদ্ধ করেন নাই এবং ২৫ মাচর্ রাতে কী করেছেন প্রধানমন্ত্রীর এরকম কথাবাতার্ই প্রমাণ করে যে আমরা কতটুকু স্বাধীন হয়েছি। কারণ তিনিইতো দেশকে দুই ভাগ করে দিচ্ছেন, স্বাধীনতার ৪০ বছর পর এসে তিনি মুক্তিযোদ্ধা খুঁজছেন।
    দলীয় স্বাথ ভুলে দেশের স্বাথের্র দিকে মনোনিবেশ করুন। তাহলে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে তুলতে সহজ হবে। সেই মূল্যবান কাজটা জনগণের উপর ছেড়ে দেন, দলীয় ক্যাডারদের উপর না দিয়ে। প্রতিহিংসা এবং আক্রোসের রাজনীতি ছাড়ুন, তাহলে দেশবেন সবাইকে আপন মনে হবে এবং সোনার বাংলা গড়ার কাজ অনেক এগিয়ে যাবে। ধন্যবাদ! ছাপা হবেতো?

    Reply
  4. sagor

    স্বাধীনতার ৪০ বছর:খসড়া ও খতিয়ান নিয়ে এ বছর যত লেখা পড়েছি, তার মধ্যে বিচারপতি হাবিবুর রহমানের লেখাটি সবচেয়ে নিরাপেক্ষ মনে হয়েছে। সবগুলো বিষয় এখানে নিরপেক্ষ ও তথ্যবহুলভাবে উঠে এসেছে।আমি স্যার কে অনেক অনেক শ্রদ্ধা ও ধন্যবাদ জানাই। আপনি জাতির প্রয়োজনে আবার এগিয়ে আসুন।

    Reply
  5. তাসকিনা ইয়াসমিন

    মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান তো দেশের বরেণ্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর মতো শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের লেখা নিয়ে মন্তব্য করার দু:সাহস দেখানো অনেক কঠিন। এরপরেও একটু সাহস নিয়ে বলতে চাই – যে রাজনীতির কারণে বাংলাদেশের আজ এই হাল সেই রাজনীতিকে নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাববার সময় এসেছে।

    খুব ভালো হতো যদি বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে দলীয় রাজনীতিমুক্ত একটি রাষ্ট্রে পরিণত করা যেতো। এতে আপাত দৃষ্টিতে রাজনীতিবিদদের ক্ষতি হচ্ছে মনে হলেও আসলে তারাও সাধারণ জনগণের মতোই উপকৃত হবেন।
    নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করা খুব জরুরী। তারাই পারে ভোটে রাজনৈতিক দলের সব ধরনের অসৎ আচরণ দূর করতে। কিন্তু আমাদের সেই এক জায়গাতেই ঝামেলা বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে?

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—