সমালোচনার ঝড় বইছে। মশকারা করে বলা হচ্ছে, দারিও ফো যেন পরপার থেকে এই কৌতুকটা ছুঁড়ে মারলেন পৃথিবীতে। সারা বিশ্বের মিডিয়ায় যেদিন নোবেলবিজয়ী ইতালিয়ান সাহিত্যিক দারিও ফোর মৃত্যুর খবর বেরুল সেদিনই বব ডিলান নোবেল পেলেন সাহিত্যে। দারিও ফো-ই একমাত্র নোবেলজয়ী সাহিত্যিক যাঁর লেখালেখিতে কোনো আগ্রহ ছিল না। নেই উল্লেখযোগ্য কোনো বই। বব ডিলানে যেন ফিরে এলেন দারিও ফো।

বলা হচ্ছে, লিখিত ভাষাকে সুরক্ষার যে মহান ব্রত ও ঐতিহ্য সুইডিশ একাডেমির ছিল, বব ডিলানকে নোবেল দিয়ে তার বারোটা বাজানো হল! ডিলান উঁচু মানের শিল্পী, কিন্তু তাঁর লিরিক কি নোবেল পাওয়ার উপযুক্ত? কিংবা একটা আত্মজীবনীই কি যথেষ্ট?

না, যথেষ্ট নয়। খোলা চোখে তা-ই মনে হবে। সাহিত্যে নোবেল বলতে আমরা যা বুঝি, গল্প-কবিতা-উপন্যাস; ডিলান এসবে নেই। একাডেমির ট্র্যাডিশনাল ছকের অনেক বাইরে ডিলানের অবস্থান। ডিলান আরেক ঘরানার কথক; মৌখিক, গণমুখী।

সঙ্গীতকে সাহিত্য বিবেচনায় এনে প্রথম নোবেল দেওয়া হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। ফ্রেম ভাঙার সাহস তখন দেখিয়েছিল নোবেল কমিটি। সেটা ছিল শুরুর দিকের বিপ্লব। এরপর আবার সেই ছকে আটকে যায় কমিটি। বব ডিলানকে দিয়ে আবার প্রথা ভাঙল সুইডিশ একাডেমি।

ডিলানের গান যদি পাঠ করা হয় তবে হয়তো বলা যাবে– এ নোবেলের সঙ্গে যায় না, ওই মানটা পায়নি। কিন্তু গান তো পাঠের জন্য না, গাওয়ার জন্য। পুরস্কারটি এবার দেওয়া হয়েছে এক গীতিকবিকে, কবিতা-লেখককে নয়। শব্দ ও সঙ্গীতকে উপলব্ধি করতে হবে সামগ্রিকতার মানদণ্ডে।

সুইডিশ একাডেমি ১৭ শতকের গীতিকবি কার্ল বেলমানকে সম্মান জানাতে গিয়ে সেসময়েই বলেছিল, কবিতায় তো গায়ন থাকতে হবে। কবিতাকে বেজে উঠতে হবে, রিনরিন করে ধ্বনিত হতে হবে, শূন্য ভরিয়ে দিতে হবে কবিতার সুরে।

BoB_Dylan
তিনি শ্রবণইন্দ্রিয়ের কবি– কর্ণকবি

একাডেমির সেই প্রত্যাশা এ বছর ডিলানে এসে আকৃতি পেল। সামগ্রিকতার স্কেলে কবিতা ও গান তো একই শরীরের দুই পরিপূরক অস্তিত্ব। কবিতার অক্ষর আর শব্দ যদি মাংস হয়, কণ্ঠের সুর তো আত্মা। সাহিত্যের লিখিত ফর্মের বাইরে ভোকাল ফর্মের দিকে তাই চোখ তুলে তাকাল এবার একাডেমি। বিস্তৃত হল সাহিত্যের পরিধি।

আড়াই হাজার বছর আগে হোমার কিংবা স্যাফো যখন কবিতা লিখেছিলেন, কিংবা কালিদাস, লিখেছিলেন তাঁরা শোনানোর জন্যই। মুখে মুখে ফিরত কবিতা। কবিতা লেখা হত আবৃতির জন্য, মঞ্চে গাওয়ার জন্য, নৃত্যের গায়ে তাল জুড়ে দেওয়ার জন্য। এবং কবিতা গাওয়া হত বাজনা বাজিয়ে। অর্থাৎ কথন বা গায়কী সাহিত্যের ইতিহাস লেখ্য সাহিত্যের ইতিহাসের চেয়ে পুরনো ও সমৃদ্ধ।

বব ডিলান গায়কী সাহিত্যেরই প্রতিভূ। আমরা এখনও হোমার পড়ি, স্যাফো পড়ি এবং আনন্দ পাই, অনুপ্রাণিত হই। একইভাবে বব ডিলানকেও পড়তে হবে, বার বার পড়তে হবে।

‘গীতাঞ্জলী’র স্বাদ হয়তো পাবো না, অত উঁচু মাপের হয়তো নয়। কিন্তু আমেরিকার সঙ্গীতে কাব্যিক অভিব্যক্তি আনা ডিলান তো এখন বিশ্বসাহিত্যেরও অংশ হয়ে গেলেন। একজন গীতিকবি এবং কথাকে কণ্ঠে ধারণ করা শিল্পী এভাবেই ফাটল ধরিয়ে দিলেন সাহিত্যে বিশ্ব-মোড়লদের গড়ে তোলা দেওয়ালে।

রবার্ট জিমারম্যান নামে জন্ম ১৯৪১ সালে। ১৯৬৫ সাল থেকেই জিনিয়াস। ৫৫ বছরের ক্যারিয়ারের পুরোটা সময়েই তিনি চেষ্টা করেছেন বৈপরীত্যে হাঁটতে। ঠিক সেভাবে ফল হাতে পাননি। নিজের অজান্তে কবিই থেকে গেছেন। ওয়েলসের বিখ্যাত কবি ডিলান টমাসের নাম ‘আত্মসাৎ’ করে নিজে হন ‘বব ডিলান’। তারপর বিশ্বসাহিত্য ঘাঁটাঘাঁটি করে অকুণ্ঠে ছিনিয়ে আনেন শিল্পরস। সমৃদ্ধ করেন নিজের গীত। বাইবেল থেকে র‍্যাবো হয়ে বোদলেয়ার, ওয়াল্ট হুইটম্যান থেকে অ্যালেন গিন্সবার্গ; ডিলানের পদ্যে আছে এঁদের স্পর্শ।

যে কথা বলা হল, নিজের অজান্তেই তিনি কবি। তাঁর শ্রেষ্ঠ কাজগুলো তিনি কবিতা হিসেবে লেখেননি। পাঠবান্ধব করেননি বই ছাপিয়ে। লিখে গেছেন লিরিক; শ্রবণবান্ধব।

প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, একজন গীতিকার কি নোবেল পাওয়ার যোগ্য?

বলা হয়, গীত তো তখনই সম্পূর্ণতা পায় যখন সেটা সুর পেয়ে কণ্ঠে বাজে। লিরিক তো তাহলে শিল্প-সাহিত্যের একটি অসম্পূর্ণ শাখা যা কিনা একা একা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে না। যার দাঁড়াতে হয় সঙ্গীতের উপর ভর করে। এই অসম্পূর্ণ শিল্প বা সাহিত্য বলেই এত কথা।

দারিও ফোর প্রসঙ্গ এ কারণেই উঠে আসে। যিনি নাটক লিখেছেন মঞ্চে প্রদর্শনের জন্য, নিজে অভিনয় করেছেন, পাতার পর পাতা না লিখে আউরে গেছেন স্ক্রিপ্ট। একজন নাট্যকার তাহলে কিভাবে নোবেল পান যখন তাঁর সৃষ্টি পূর্ণতা পায় অভিনয়ের মধ্য দিয়ে? এ পর্যন্ত ১১ জন নাট্যকার সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন। এঁদের মধ্যে অন্যতম হ্যারল্ড পিন্টার, ওল সোয়েঙ্কা, স্যামুয়েল বেকেট, ইউজিন ও নীল এবং জর্জ বার্নার্ড শ।

কাগজে এঁদের চিত্রনাট্য পড়লে কার কতটা ভাল লাগে? কিন্তু মঞ্চে যখন গড়ায়, হাজার দর্শকের চোখের সামনে পুরো ইম্প্যাক্ট নিয়ে হাজির হয়। পিন্টারকে যদি ডায়ালগ লেখার জন্য নোবেল দেওয়া হয়, যে ডায়ালগ মঞ্চে অভিনেতাদের মাধ্যমে বিশাল ইম্প্যাক্ট হয়ে ওঠে তাহলে ডিলানও নোবেলের ভাগীদার নিঃসন্দেহে। তাঁর গীতিকবিতা তো কণ্ঠে বাঙময় হয়ে ওঠে, লাইভ কনসার্টে ওরাল পারফরম্যান্সে রূপ নেয় স্বর্গীয় কবিতায়। এই চিরন্তনতাই তো খুঁজে ফেরে সুইডিশ একাডেমি।

সুইডিশ একাডেমি কি সাহিত্যের সংজ্ঞার পরিধিকে বিস্তৃত করতে চাইছে?

আপাতদৃষ্টিতে তাই মনে হচ্ছে। গেল বছর সাহিত্যে নোবেল পেলেন সেভেতলানা আলেক্সিএভিচ, একজন সাংবাদিক। এবার পেলেন সঙ্গীতশিল্পী। ভবিষ্যতে হয়তো কোনো দার্শনিক, ঐতিহাসিক কিংবা চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্ট রাইটারকে পাব নোবেল ক্লাবে। ঐতিহাসিক পিটার ব্রাউন, দার্শনিক চার্লস টেইলর কিংবা চলচ্চিত্র কিংবদন্তি উডি অ্যালেন হতে পারেন পরবর্তী আকর্ষণ। উদাহরণ অবশ্য আছে। রাসেল, চার্চিল। সার্তরে ছিলেন কিছুটা সাহিত্যিক, কিছুটা দার্শনিক।

কিন্তু ডিলানকে নোবেল দেওয়ার মধ্য দিয়ে সাহিত্যকে নিয়ে যাওয়া হল অন্য মহিমায়। কবিতা লিখে নয়, কবিতা শুনিয়ে পুরস্কার ছিনিয়ে নিলেন তিনি। তিনি শ্রবণইন্দ্রিয়ের কবি– কর্ণকবি। একদা গেয়েছিলেন It ain’t me, babe…, এখন ভেগাসের ক্যাসিনোতে বসে নিশ্চয়ই গুনগুন করছেন–

It’s me, babe… It’s me…

শাকিল রিয়াজকবি, সাংবাদিক, কলামিস্ট

One Response -- “বব ডিলানের নোবেলপ্রাপ্তি ও কিছু কথা”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—