Feature Img

farseem-f111211111211১৯২৯ সালে এডুইন হাব্‌ল দূরবর্তী গ্যালাক্সির আলো বিশ্লেষণ করে প্রমাণ করলেন যে মহাবিশ্ব ক্রমাগত প্রসারণশীল। এর পরে ১৯৩১ সালের দিকে হাব্‌ল তাঁর সহযোগী হিউমাসনকে নিয়ে তাঁর অনুসন্ধানকে আরো পরিশীলিত করে দেখাতে সক্ষম হন যে, যে গ্যালাক্সি যত দূরে অবস্থিত তার অপসরণ গতি তত বেশি। এই নিয়মটিকে এখন আমরা হাব্‌ল বিধি বলে জানি। মহাবিশ্বের প্রসারণ আবিস্কৃত হবার পর তা মানুষের সেই সময়ের চিন্তাজগতে বিপুল আলোড়ন তোলে। বিশ্বজগৎ সম্পর্কে তখনকার দিনে ধারণা ছিল যে এই বিপুল ব্রহ্মাণ্ডখানি যেমন ছিল তেমনই আছে, আর ভবিষ্যতেও সেরকমই থাকবে। স্থিরবিশ্বের এই ধারণাটি আইনস্টাইনকেও প্রভাবিত করে। ১৯১৬/১৭ সালে আইনস্টাইন যখন আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব প্রদান করেন, তখন মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যাকারী আইনস্টাইন ক্ষেত্রসমীকরণটি একটি পরিবর্তনশীল বিশ্বের কথা বলে। অর্থাৎ সমীকরণটির গণিত এমন এক সমাধানের কথা বলে যা কেবল একটি গতিশীল বিশ্বের জন্যই প্রযোজ্য।

এরকম অবস্থায় আইনস্টাইন তৎকালীন জ্যোতির্বিদদের কাছে যখন স্থানু বিশ্বের কথা শুনলেন, তখন তিনি তাঁর সমীকরণে একটি ধ্রুবরাশি যোগ করে সমীকরণকে স্থানুবিশ্বের উপযোগী করে তোলেন। এই ধ্রুবরাশিকে বলে ‘মহাজাগতিক ধ্রুবক’। কিন্তু ১৯২৯ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা যখন জানতে পারলেন যে মহাবিশ্ব প্রকৃতই প্রসারণশীল, তখন আইনস্টাইনের আর দুঃখের অবধি রইল না। কেন যে তিনি সমীকরণের নিজস্ব গাণিতিক চরিত্রের উপর খোদকারী করতে গেলেন! নয়ত তিনিই তো মহাবিশ্বের প্রসারণের কথা ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারতেন। শোনা যায়, একে তিনি তাঁর ‘জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল’ বলে অভিহিত করেছিলেন। মহাজাগতিক ধ্রুবকের চরিত্রটি অ্যান্টি-গ্র্যাভিটির মতো, মহাকর্ষ যেমন সকল বস্তুকে আকর্ষণ করে, মহাজাগতিক ধ্রুবক-জাতীয় বল মহাবিশ্বকে প্রসারিত করে। ‘সায়েন্টিফিক প্রেজুডিস’ বা বৈজ্ঞানিক গোঁড়ামির যে কতদূর দুরবস্থা হতে পারে, সেটা স্টিফেন হকিংয়ের কথায় স্পষ্ট হয়: ‘নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ সূত্রজনিত তত্ত্ব থেকেই মহাবিশ্বের আচরণ ব্যাখ্যা করা সম্ভব ছিল উনবিংশ, অষ্টাদশ কিংবা সপ্তদশ শতাব্দীর শেষদিকেও। কিন্তু স্থানুবিশ্বের প্রতি অন্ধভক্তি এতো জোরালো ছিল যে তা বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকেও ঠিকই টিকে ছিল। এমনকি স্থানুবিশ্বের প্রতি আইনস্টাইনও এমনই আকৃষ্ট ছিলেন যে, ১৯১৫ সালে আপেক্ষিকতার সাধারণতত্ত্ব তিনি যখন প্রণয়ন করেন, তখন ঐ তত্ত্বের পরিবর্তন করে সমীকরণে স্থানুবিশ্বের উপযোগী মহাজাগতিক ধ্রুবক যোগ করেন। … কিন্তু আইনস্টাইনকে যা সত্যিকার আশাহত করেছিল তা হল যে স্থানুবিশ্বের প্রতি তার অন্ধবিশ্বাস থেকে তিনি তাঁর সমীকরণকে বদলাতে বাধ্য করেছিলেন, যে সমীকরণ মহাবিশ্বের প্রসারণকে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারত।’ [-এ ব্রিফার হিস্ট্রি অব টাইম, হকিং ও ম্লোদিনো, ২০০৫।]

প্রসারণশীল বিশ্বের ব্যাখ্যায় স্বাভাবিকভাবেই চলে আসে বিগ-ব্যাং তত্ত্ব: যেহেতু সব গ্যালাক্সি একে-অপর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তাহলে বলা যায় দূর-অতীতে এইসব গ্যালাক্সি সব একত্রে ছিল। এটাই বিগ-ব্যাং তত্ত্বের মূল কথা। এভাবেই স্ট্যান্ডার্ড কসমোলজির শুরু এবং বিকাশ। এই কসমোলজি অনুযায়ী মহাবিশ্বে বস্তুর মোট মহাকর্ষীয় আকর্ষণ বিশ্বের সব গ্যালাক্সিকে টেনে ধরবে, এভাবে এক সময়ে প্রসারণ বন্ধ হবে বা কমে আসবে। অবশ্য যদি বস্তুর মোট পরিমাণ নির্দিষ্ট সংকট-ঘনত্বের কম হয়। বস্তুর গড়-ঘনত্বের বর্তমান মান ১০^-৩১ গ্রাম/সিসি কিংবা প্রতি ঘনমিটারে o.২টি পরমাণু। মহাবিশ্বের প্রত্যাশিত এই মন্দনের পরিমাপের লক্ষ্যে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা কাজ শুরু করেন অনেকদিন হলো। এই কাজেরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৮ সালে সল পার্লমাটারের নেতৃত্বে শুরু হয় ‘সুপারনোভা কসমোলজি প্রজেক্ট’। এরপর এদের সাথে যুক্ত হয় হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রবার্ট কার্শনারের নেতৃত্বে তাঁরই ছাত্র এডাম রিস, ব্রায়ান শ্মিড এবং অন্যান্য সহযোগীবৃন্দ। ওঁদের গ্রুপের নাম ‘হাই-জেড সুপারনোভা সার্চ টিম’।

এখন কথা হলো, মন্দন মাপা যায় কীভাবে? দূরাকাশের জ্যোতিষ্কদের দূরত্ব ঠিকঠিক মতো মাপতে পারলে এটা করা সম্ভব। কিন্তু সমস্যা হলো, দূরবর্তী জ্যোতিষ্কদের দূরত্ব মাপা খুবই কঠিন কাজ। এর মূল কারণ হলো দূরত্ব মাপার ব্যাপারে প্রমিত পরিমাপক বা স্ট্যান্ডার্ড ক্যান্ডেলের অভাব। এভাবে বলা যায়, যদি আপনাকে একটা ১০০ ওয়াট বাতি দেওয়া হয় তবে একে যত দূরেই নেই না কেন, এর আপাত উজ্জ্বলতা মেপে আপনি এর দূরত্ব গণনা করতে পারেন। কারণ উজ্জ্বলতা দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতে কমে যায়। কিন্তু এক্ষেত্রে ১০০ ওয়াট বাতিটি যে ১০০ ওয়াট ক্ষমতার তা আপনার জানা আছে। কিন্তু দূরের জ্যোতিষ্কের প্রকৃত উজ্জ্বলতা কত সেটা কিন্তু সহজে জানা যায় না। তবে সৌভাগ্যক্রমে কিছু কিছু জ্যোতিষ্ক আছে যাদের অভ্যন্তরীন গঠন সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ভালো ধারণা আছে। সুনির্দিষ্ট তত্ত্বের ভিত্তিতে ঐসব জ্যোতিষ্কের আপাত উজ্জ্বলতার রদবদল দেখে তাদের প্রকৃত উজ্জ্বলতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তারপর একাধিক পদ্ধতিতে এদের দূরত্ব নির্ণয় করে উক্ত পদ্ধতিকে যাচাই করা হয়। একে বলে ‘ক্যালিব্রেট’ করা। এরকম একটি জ্যোতিষ্ক হলো শেফালী বিষমতারা। এ ধরনের নক্ষত্রের আপাত উজ্জ্বলতার বিষমতা নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন বিজ্ঞানী হেনরিয়েটা লিভিটের নাম উল্লেখ করতে হয়। এই মহিলার অক্লান্ত গবেষণায় আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগেই শেফালী বিষমতারাদেরকে দূরত্বের মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয়। এডুইন হাব্‌ল তাঁর ১০০ ইঞ্চি দুরবিন দিয়ে দুরবর্তী গ্যালাস্কিতে শেফালী বিষমতারাদের চিহ্নিত করে দূরত্ব পরিমাপ করতেন।

এরকমই আরেকটি স্ট্যান্ডার্ড ক্যান্ডেল হলো টাইপ ওয়ান সুপারনোভা। আকাশের সব নক্ষত্রই এক সময়ে তার সব জ্বালানী ফুরিয়ে ফেলে। বহুকোটি বছর জ্বলার পর নক্ষত্রের জ্বালানী শেষ হয়ে যায়, তখন তার অন্তিম নিয়তি ঘনিয়ে আসে। নক্ষত্রের অন্তিম দশা নির্ভর করে তার ভরের উপর। খুব কম ভরের নক্ষত্রের ক্ষেত্রে তারা তাদের গ্যাসীয় বহিরংশ হারিয়ে ফেলে ধুসর বামন তারায় পরিণত হয়। সূর্যের সমান বা তার থেকেও কিছু ভারী নক্ষত্রের ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত একটি শ্বেতবামন বা হোয়াইট ডোয়ার্ফের সৃষ্টি হয়। এবং নক্ষত্রের বহিরংশ বাইরে ছড়িয়ে গ্রহগত নীহারিকার সৃষ্টি করে। সূর্যের ১০ গুণ বা তার থেকেও বেশী ভারী তারার ক্ষেত্রে কেন্দ্রে নিউট্রন স্টার বা ব্ল্যাকহোলের সৃষ্টি হয়। এই পর্যায়ে যাবার ঠিক আগে এক সুবিপুল বিস্ফোরণে তারার বহিরংশ বাইরের দিকে বেরিয়ে যায়। এ অবস্থায় একে সুপারনোভা বা অতিনবতারা বলে। একটি সুপারনোভার উজ্জ্বলতা একটি পুরো গ্যালাক্সির উজ্জ্বলতার কাছাকাছি পৌঁছে। একটি গ্যালাক্সির দশ হাজার কোটি তারার থেকেও সুপারনোভার উজ্জ্বলতা বেশী বা তুলনীয় হওয়া সম্ভব। তবেই বুঝুন, একটি সুপারনোভা বিস্ফোরনে কী পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়!
এখন মহাবিশ্বে এমন অনেক নক্ষত্র সিস্টেম আছে যাদের একটি সঙ্গী শ্বেতবামন তারা এবং অপর সঙ্গীটি একটি দানব তারা। এদের ক্ষেত্রে প্রায়শই দেখা যায় যে, দানবতারাটি তার জীবদ্দশায় স্বাভাবিক নিয়মে যখন স্ফীত হয়ে ওঠে তখন তার বহিরাংশের পদার্থ গিয়ে শ্বেত-বামন সঙ্গী তারাটিতে ঘুরে ঘুরে পড়ে। এভাবে সৃষ্টি হয় অ্যাক্রেশন ডিস্কের। গুগলে ‘অ্যাক্রেশন ডিস্ক’ লিখে সার্চ দিলে এই সিস্টেমের চমৎকার ছবি দেখা যায়। ঐ উত্তপ্ত গ্যাসের প্রভাবে শ্বেতবামনটির ভর ও তাপ বাড়তে থাকে। এমতাবস্থায় শ্বেতবামনটি এক পর্যায়ে জ্বলে ওঠে এবং বিস্ফোরণ ঘটায়। একে বলে ‘টাইপ-ওয়ান সুপারনোভা’। এদের বৈশিষ্ট্যসূচক বর্ণালিতে হাইড্রোজেন গ্যাসের অপ্রতুলতা লক্ষণীয়। এর কারণ অবশ্য স্বাভাবিক – শ্বেতবামন এবং দানবতারা দুটোই নক্ষত্রের জীবনের অন্তিম দশা নির্দেশ করে। এরা হাইড্রোজেন পুড়িয়ে শেষ করে ফেলে বলেই তাদের বর্ণালিতে হাইড্রোজেনের আধিক্য দেখা যায় না, দেখা যায় ভারী মেটালের আধিক্য। টাইপ-ওয়ান সুপারনোভার উজ্জ্বল্য দ্রুত হারে হঠাৎ করে বেড়ে যায়, তারপর বেশ কিছুদিন (মাসখানেক) পর কমে যেতে থাকে। ঔজ্জ্বল্যের বাড়াকমার এই ছন্দটা বিজ্ঞানীরা মোটামুটি ভালো বোঝেন আর এ সম্পর্কিত তাঁদের ভালো কিছু কার্যকর গানিতিক মডেল আছে। এসব মডেল টাইপ-ওয়ান সুপারনোভার ঔজ্জ্বল্যের বাড়াকমা থেকে তাদের স্বকীয় বা পরম উজ্জ্বলতা সম্পর্কে প্রায়-সঠিক ধারণা দেয়। এসব মডেল আরো বলে যে, মহাবিশ্বের সকল টাইপ-ওয়ান-এ সুপারনোভা প্রায় একই। এর কারণ হলো, প্রতিটি টাইপ-ওয়ান সুপারনোভার মূলে থাকে একটি শ্বেতবামন তারা যার ভর কখনোই চন্দ্রশেখর সীমার (১.৪১ সৌরভর) বেশী হতে পারে না। এই গাণিতিক সীমাটি ভারতীয়-আমেরিকান নোবেল-বিজয়ী সুব্রহ্মন্যম্ চন্দ্রশেখর আবিষ্কার করেছিলেন। এ সমস্ত কারণে বিজ্ঞানীরা মনে করেন তাঁদের মডেল থেকে টাইপ-ওয়ান সুপারনোভার প্রাপ্ত স্বকীয় উজ্জ্বলতার মান মোটামুটি সঠিক (মাত্র ১০-শতাংশ এদিক-ওদিক হতে পারে)। এভাবে এদেরকে দূরত্ব পরিমাপের মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। টাইপ-ওয়ান সুপারনোভাদের বর্ণালি নিয়ে একটা সমস্যা হলো – দূরের সুপারনোভা থেকে প্রাপ্ত আলোর বর্ণালি পৃথিবী ও সুপারনোভার মধ্যবর্তী আন্তঃনাক্ষত্রিক ধূলিকণার দ্বারা শোষিত হচ্ছে কি-না, হলে কতটা। সেটা পরীক্ষার জন্য বর্ণালির একাধিক তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ফিল্টার দিয়ে সুপারনোভার আলো বিশ্লেষণ করতে হয়। সকল তরঙ্গদৈর্ঘ্যে ঔজ্জ্বল্যের যদি একইরূপ ওঠানামা লক্ষ করা যায়, তবে বোঝা যায় আন্তঃনাক্ষত্রিক গ্যাসের শোষণ নগণ্য। এভাবে পার্লমাটারের গ্রুপ ও শ্মিডের গ্রুপ আলাদাভাবে অনেকগুলো টাইপ-ওয়ান সুপারনোভার বর্ণালি জোগাড় করলেন। পার্লমাটারের গ্রুপ প্রায় ৪২টি সুপারনোভা এবং শ্মিডের গ্রুপ ১৬টি সুপারনোভা পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হয়। শ্মিডের গ্রুপের ফলাফল অবশ্য অধিকতর বিশুদ্ধ ছিল – তাদের পর্যবেক্ষিত সুপারনোভার সংখ্যা কম হলেও তাদের ডেটাসেট পর্যবেক্ষণজনিত সম্ভাব্য সকল ক্রটিমুক্ত ছিল। এভাবে প্রাপ্ত তথ্য থেকে তাঁরা দেখতে পেলেন যে মহাবিশ্বে কোনো মন্দন তো চোখেই পড়ছে না, বরঞ্চ দূরবর্তী গ্যালাক্সিদের দূরত্ব আরো বেড়ে চলেছে। প্রচলিত প্রসারণের হিসাব অনুযায়ী দূরবর্তী সুপারনোভাদের ঔজ্জ্বল্য যা হবার কথা, তার তুলনায় তারা ২৫% অনুজ্জ্বল। অর্থ্যাৎ মহাবিশ্বের প্রসারণ ত্বরণগতি সম্পন্ন, এবং এই ত্বরণ শুরু হয়েছে মহাবিশ্ব সৃষ্টির ৭ বিলিয়ন বছর পর।
এই ত্বরণের অর্থ কী? এই ত্বরণের একমাত্র তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা আইনস্টাইনের সেই মহাজাগতিক ধ্রুবকে নিহিত। স্মরণ করুন, ক্ষেত্র সমীকরণের স্বাভাবিক গতিশীল সমাধানকে স্থানু বিশ্বের ধারণার সাথে জোর করে মেলাতে গিয়ে আইনস্টাইন ঐ মহাজাগতিক ধ্রুবকের আমদানী করেছিলেন যার বিকর্ষণী ক্ষমতা মহাকর্ষের আকর্ষনী শক্তিকে নাকচ করে দেয়। এই ধরনের ধ্রুবকের আচরণ ঋণাত্মক চাপ-বিশিষ্ট ফ্লুইডের মতো। কিন্তু মৌলিক চারটি বলের কোনটির কারনে এইরকম ঋণাত্মক চাপবিশিষ্ট বলক্ষেত্রের সৃষ্টি হয়? এর উত্তর জানা নেই। অনেকেই মনে করেন শূন্যস্থানের শক্তিই এই অদৃশ্য বা ডার্ক এনার্জির উৎস। শূন্যস্থান শূন্য দেখালেও কোয়ান্টাম তত্ত্ব বলে যে প্রকৃতপক্ষে শূন্যস্থানে অসংখ্য অপ্রকৃত কণা বা ভার্চুয়াল পার্টিকেলের নিত্য সৃজন ও সংহার চলে। এ ধরনের অপ্রকৃত কণার স্থায়িত্ব অত্যল্প সময়ের পরিসরে হলেও এদের সাথে অতি সামান্য পরিমাণ শক্তি সংশ্লিষ্ট থাকে। যেহেতু শূন্যস্থান অত্যন্ত ব্যাপক, অতি সামান্য এই সকল শক্তির যোগফলও কিন্তু কম নয়। এই ভ্যাকুয়াম ফ্লাকচুয়েশনই ডার্ক এনার্জির উৎস হতে পারে। মনে হয় যেন এই শক্তি উৎস অন্তরালে অপেক্ষা করছিল, বিগ-ব্যাংয়ের পর প্রসারনের ফলে বিশ্বের শক্তি-ঘনত্ব একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ের নিচে নেমে যাওয়ায় প্রায় ৭ বিলিয়ন বছর পর এটি কার্যকর হতে শুরু করে।

প্রশ্ন হলো, সুপারনোভা থেকে প্রাপ্ত ডেটা কতখানি বিশ্বাসযোগ্য? বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, আরো বেশ কয়েকটি মহাজাগতিক প্রপঞ্চের পরিমাপ (যেমন WMAP দ্বারা পটভূমি বিকিরণের অসুষমতার পরিমাপ, মিলেনিয়াম সিমুলেশন দ্বারা পর্যবেক্ষিত গ্যালাক্সি সৃষ্টির ধারা, নক্ষত্রস্তবকের সংশ্লিষ্ট ডেটা ইত্যাদি) সবই যেন একই উপসংহার ইঙ্গিত করে। আর তা হলো – বিশ্বে দৃশ্যমান বস্তুর অংশ ৫%, ডার্ক ম্যাটার বা অদৃশ্য বস্তুর অংশ ২৩% এবং ডার্ক এনার্জি ৭২%। এই সিদ্ধান্ত একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। এর মানে হলো, আমি-আপনি যে বস্তু দিয়ে তৈরি, দূরান্তের নক্ষত্র-গ্যালাক্সি এবং এদের মধ্যবর্তী অঞ্চলে ব্যাপ্ত আন্তঃনাক্ষত্রিক গ্যাসে যে পদার্থ আছে যার বর্ণালি সম্পর্কে আমাদের সম্যক ধারণা আছে, সেটা মহাবিশ্বের মোট শক্তি-ঘনত্বের পাঁচ শতাংশেরও কম। আরো একটা তথ্য আমরা জেনেছি, তা হলো এটি ব্রহ্মাণ্ডের জ্যামিতি সমতল। অর্থাৎ স্কুল-কলেজে আমরা যে ইউক্লিডিয় জ্যামিতি পড়েছি সেটাই ব্যাপক পরিসরে মহাবিশ্বে কার্যকর। বইয়ের পাতায় যে পিথাগোরাসের উপাদ্য আমরা পড়ি, দূরান্তের গ্যালাক্সিও সেটা মেনে চলে। এই অসাধারণ আবিষ্কারটি সম্পর্কে ব্রিটেনের রাজকীয় জ্যোতির্বিদ স্যার মার্টিন রিস বলেছেন,

‘১৯৯৮ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে, আলাদা আলাদা পর্যবেক্ষণ থেকে প্রাপ্ত আমাদের মহাবিশ্বের বেশ কয়েকটি মৌলিক রাশির মানের মধ্যে একটা আশ্চর্য সমাপতন লক্ষ করা গেছে। দেখা গেছে, যেমনটি আমাদের তাত্ত্বিকেরা পছন্দ করেন – আমাদের এই মহাবিশ্বের জ্যামিতি সমতল। কিন্তু এর গঠন অদ্ভুত কিছু উপাদানের যদৃচ্ছ মিশ্রণ বলে প্রতীয়মান হয়। নক্ষত্র, নীহারিকা আর আন্তঃগ্যালাকটিক স্থানের ব্যাপ্ত গ্যাসের উপাদান যে সাধারণ বস্তু (বা ব্যারিয়ন), তা বিশ্বের মোট বস্তু-শক্তির মাত্র ৫ শতাংশ, অদৃশ্য বস্তুর অবদান ২৩ শতাংশ এবং অবশিষ্টাংশ (প্রায় ৭২ শতাংশ) আসে অদৃশ্য শক্তি থেকে। বিশ্বের প্রসারণ ত্বরিত হারে বেড়ে যাচ্ছে, কারণ (ঋণাত্বক চাপযুক্ত) অদৃশ্য শক্তির প্রভাবই বেশি হয়ে দেখা দিয়েছে। মহাবিশ্বের সকল পরমাণুর অর্ধেক থাকে দৃশ্যমান গ্যালাক্সিগুলোতে আর বাকি অর্ধাংশ ব্যাপ্ত থাকে আন্তঃগ্যালাকটিক স্থানের সূক্ষ্ম গ্যাসে। মহাবিশ্বের সবচেয়ে মনোহারী বস্তু – নক্ষত্র আর গ্যালাক্সিতে – বিশ্বের মোট ভর-শক্তির ২ শতাংশেরও কম ভর-শক্তি বিন্যস্ত থাকে। এই সত্যটি বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের সাধারণ অনুমান থেকে কতই-না বিপরীত, সেটা ভেবে দেখা যেতে পারে। … এই রহস্যময় (অ্যান্টিগ্রাভিটি) বস্তুই, যা শূন্যস্থানের শক্তি অথবা মূল-সার (কুইন্টেসেন্স), মহাবিশ্বের মোট ভর-শক্তির প্রধান অংশীদার, যদিও নক্ষত্র ও গ্যালাক্সির গঠনে এর কোনো প্রভাবই নেই। … এর প্রকৃতি অনুসন্ধান করাই বিজ্ঞানীদের বড় চ্যালেঞ্জ: কেননা, আদিম বিশ্বের সূচনা এবং মহাবিশ্বের প্রকৃতি যথাযথভাবে বোঝার ব্যাপারের মধ্যেই হয়ত রয়েছে সমাধানের মূল চাবিকাঠি।” [-‘আওয়ার কসমিক হ্যাবিটাট’]

এই আবিষ্কারের জন্যই সল পার্লমাটার, ব্রায়ান শ্মিড ও এডাম রিসকে ২০১১ সালের জন্য নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। এ বছর এই পুরস্কার ঘোষণাটি আমাদের জন্যও এক বিশেষ তাৎপর্য নিয়ে এসেছে। পুরস্কারটি ঘোষিত হয় ১০ অক্টোবর ২০১১তে যখন আমরা সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে ‘বিশ্ব মহাকাশ সপ্তাহ’ উদযাপন করছিলাম। এবারের মহাকাশ সপ্তাহ উদযাপন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য এ কারণে যে, এইবার ইউনেস্কোর সহযোগিতায় বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিকাল সোসাইটির উদ্যোগে আয়ার্ল্যান্ডের দুইজন বিজ্ঞানী, এসেছিলেন যাঁরা শ্রেণীকক্ষে কীভাবে জ্যোতির্বিদ্যাকে জনপ্রিয় করে শেখানো যায় তা নিয়ে মাধ্যমিক শিক্ষকদের নিয়ে একটি কর্মশালা করছিলেন। আর সেদিন সন্ধ্যায় আমরা খবর পেলাম এবারের নোবেলটি গেছে জ্যোতির্বিদদের পকেটে। এটাও একটা মজার ব্যাপার যে, ১৯৯৮ সালের আবিস্কার ২০১১ সালেই নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছে। এর আগে ২০/৩০ বছর আগের আবিস্কারের জন্য নোবেল পুরস্কার ঘোষণা দেওয়া হতো। এখন আবিস্কারের গুরুত্ব বিবেচনা করে স্বল্প সময়েই নোবেল দেওয়া হচ্ছে। যেমন চিকিৎসাবিজ্ঞান ৩০ বছর আগের আবিষ্কারের জন্য নোবেল পুরস্কার দেওয়া হলো যে বেচারা শুনে যাবার আগেই মারা গেলেন। আহারে!

আজকাল আমরা জানি, বিশ্বের বয়স ১৩.৭ বিলিয়ন বছর। এই একটি কথার পেছনে আছে প্রায় ৪০০ বছরের ইতিহাস। ১৬০৯ সালে গ্যালিলেও যখন দুরবিন হাতে নিয়ে আকাশের দিকে চাইলেন, সেই থেকে শুরু হলো আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যার। আজ আমরা জানি মহাবিশ্বের একটা শুরু আছে, একটা পরিণতি আছে। এর পরিণতি নির্ভর করে অদৃশ্য শক্তির প্রকৃতির ওপর। অদৃশ্য শক্তি যদি ধ্রুব প্রকৃতির হয় তবে পরিণতি একরকম, যদি তা চলরাশি হয় তবে পরিণতি আরেক রকম। এখন পর্যন্ত যা মনে হয় তাতে ভবিষ্যতে বিশ্বের সকল গ্যালাক্সি পরস্পর থেকে দূরে সরে যাবে, ১০০ বিলিয়ন বছর পর আমাদের গ্যালাক্সি ও অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি মিলিত হয়ে একটি সুপারগ্যালাক্সি তৈরি করবে। ১০০ ট্রিলিয়ন বছর পর সব নক্ষত্র নিভে যাবে। সেই অন্ধকারে মুখোমুখি বসবার জন্য আমিও থাকব না, আপনিও থাকবেন না, বনলতা সেনও নয়। সেই একাকী নিঃসীম অন্ধকারে কোনো বুদ্ধিমান সত্তা যদি বেঁচেও থাকে তবে সে হয়ত টি.এস. এলিয়টের কথাই ভাববে: ‘দিস ইজ দ্য ওয়ে দ্য ওয়ার্ল্ড এন্ডস, নট উইথ এ ব্যাং বাট উইথ এ হুইম্পার।’

তথ্যসূত্র:
১. ‘দ্য এক্সট্রাভ্যাগান্ট ইউনিভার্স; রবার্ট কাশনার, ২০০২।
২. ‘অপূর্ব এই মহাবিশ্ব’, হারুন-অর-রশীদ ও ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী, প্রথম প্রকাশন, ২০১১।

ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী:বিজ্ঞান গবেষক ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।

১৩ Responses -- “সুপারনোভা, ডার্ক এনার্জি এবং নোবেল পুরস্কার”

  1. প্রসন্ন প্রহর

    ১৯২৯ থেকে ১৯৯৮ । হাবল থেকে পলমুটার…
    অসাধারণ। আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

    Reply
  2. প্রসন্ন প্রহর

    – ১৯২৯ থেকো ১৯৯৮ । এডুইন হাবল থেকে পার্টমুটার। কত সাধনা,ত্যাগ,… তারপর একটা নতুন তথ্য
    দারুন। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ এমন সুপাঠ্য প্রবন্ধ উপহার দেয়ার জন্য।

    Reply
  3. Adv. A N Kabir

    অত্যন্ত সুন্দর একটি লেখা। আমাদের সমাজে যখন ধর্মান্ধতা এবং বিজ্ঞান বিমুখতা জেঁকে বসেছে তখন এইরকম লেখা আমাদের আশার আলো জ্বালিয়ে রাখে।

    Reply
  4. Gias Uddin Bhuiyan

    লেখকের লেখাটি যুগোপযোগী, এরকম লেখা দরকার যা থেকে মানুষ কিছু জানতে পারবে এবং শিখতে পারবে। লেখার জন্য সম্মানিত লেখককে ধন্যবাদ এবং অভিনন্দন। আরো লেখা চাই।

    Reply
  5. sumon-SMC

    পৃথিবীতে এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ অপশন। আপনার লেখাটি পড়ে খুব খুশী হয়েছি।

    Reply
  6. Sharfaraj Hussain

    মহাবিশ্বের জ্যামিতি সমতল” দয়া করে এই বিষয়টা একটু ব্যাখ্যা করলে খুশী হবো। ধন্যবাদ।

    Reply
  7. কাজী মাহবুব হাসান

    আজকাল আমরা জানি, বিশ্বের বয়স ১৩.৭ বিলিয়ন বছর। এই একটি কথার পেছনে আছে প্রায় ৪০০ বছরের ইতিহাস।

    যে মানুষগুলো সেই অন্ধকার থেকে আমাদের চিন্তার উত্তরণে জীবন উৎসর্গ করে গেছেন তাদের জন্য শ্রদ্ধা। কার্ল সেগানের কসমস এ পড়েছিলাম ইয়োহানেস কেপলার সম্বন্ধে, পৃথিবীর শেষ জ্যোতিষী এবং প্রথম জ্যোতির্বিজ্ঞানী। কিন্তু ১৬০৯ এ গ্যালিলিওর সুচনাটাই হয়তো আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যার সুচনালগ্ন।

    ধন্যবাদ লেখককে।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—