২৪ অাগস্ট রিশা নামের চৌদ্দ বছরের এক কিশোরীকে ওবায়দুর নামের ঊনত্রিশ বছরের এক যুবক ছুরিকাঘাত করে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৮ আগস্ট মৃত্যু হয় রিশার। এরপর থেকে আমি রিশার ‘সাত ভাই চম্পা’কে খুঁজছি; যে ভাইয়েরা রিশা হত্যার প্রতিবাদ জানাতে নিজের প্রাণ দিতেও দ্বিধা করবে না! যেমন করেনি ১৯৯৫ সালে দিনাজপুরের ইয়াসমিনের সাত ভাই।

কতিপয় পুলিশ সদস্য কিশোরী ইয়াসমিনকে ধর্ষণ করে হত্যা করার পর প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিল সমগ্র বাংলাদেশ। পুলিশের গুলিতে নিহত হয় সাত দিনাজপুরবাসী। অনেকে আদর করে তখন তাদের ডেকেছে ইয়াসমিনের ‘সাত ভাই চম্পা’ বলে। বোন রিশার জন্য চম্পা ভাইদের খুঁজে পাওয়া এখন কঠিন! কিন্তু কেন?

১৯৯৫ থেকে ২০১৬ সালের দূরত্ব কতটুকু? একুশ বছর। এই সময়কালে মানুষের মানসিকতার কতটা পরিবর্তন হয়েছে? আমরা অবলোকন করছি, বিবেক-সহানুভূতি-মানবতাবোধ কীভাবে লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে!

রিশার হন্তারকের হাতে ছিল না কোনো পিস্তল বা বোমা। সেই মুহূর্তে হয়তো দু-চারজন পথচারী তাকে জাপটে ধরে সেই ভয়ঙ্কর কাজ থেকে নিবৃত্ত করতে পারত! অনেকে এই আফসোস জানিয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। আমরা যারা প্রত্যক্ষদর্শী নই, তারা জানি না আসলে সেখানে কী ঘটেছিল তখন– সেই দুর্বত্তকে ধরা আসলেই সহজ ছিল কি না।

তবে একজন ব্লগার আক্রমণের ঘটনায় দেখেছি তৃতীয় লিঙ্গের একজন কীভাবে জীবনের ঝুঁকি অগ্রাহ্য করেও ঘাতককে জাপটে ধরেন। বছর দুযেক আগে বিরোধী দলের জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনের সময় একজন অতিসাধারণ নারীকে দেখেছি জীবনের মায়া উপেক্ষা করে এক পুলিশ সদস্যকে বাঁচাতে ছুটে যেতে। কিন্তু রিশাকে বাঁচাতে কেউ এগিয়ে এল না! অকালে ঝরে গেল মায়াবতী মেয়েটি।

রিশা, তনু, মিতু, আফসানার মতো কিশোরী-তরুণী সমাজের পুরুষতান্ত্রিকতা এবং এর সঙ্গে বিশেষ ক্ষমতাবানদের অহমিকা ও ক্ষমতার দাপটের বলি। এসব নৃশংস ঘটনা এবং দলবদ্ধ হয়ে পয়লা বৈশাখের মতো সর্বজনীন উৎসবে উদ্ভটভাবে মেয়েদের লাঞ্ছিত করার ঘটনাগুলো প্রশাসনের উদাসীনতায় হারিয়ে যাওয়ার কথা ছিল না, যদি ইয়াসমিন হত্যা-ঘটনার পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার মতো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করা যেত।

 

Yasmin - 111
ঘটনাগুলো প্রশাসনের উদাসীনতায় হারিয়ে যাওয়ার কথা ছিল না, যদি ইয়াসমিন হত্যা-ঘটনার পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার মতো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করা যেত

 

কয়েকটি মানব বন্ধন, স্মারকলিপি প্রদান ও বিবৃতি-সংবলিত প্রতিবাদে আর যা-ই হোক আন্দোলন তৈরি করা যায় না। রাজনীতি এবং রাজনীতিবিদদের যতই গালমন্দ করি, একটি আন্দোলনের নেতৃত্ব প্রদানকালে তাদের প্রয়োজনীয়তা যে কতটা জরুরি তা উপলদ্ধি করা যাচ্ছে।

ইয়াসমিনের ঘটনাটি দেশব্যাপী আন্দোলনে রূপান্তরিত করার পেছনে কিছুটা হলেও কৃতিত্ব ছিল সে সময়কার বিরোধী দলের। টলে গিয়েছিল তখনকার ক্ষমতাসীনদের মসনদ। ঘটনাটির প্রভাব এমনই পড়েছিল যে, এখন ইয়াসমিন হত্যার দিনটি অর্থাৎ ২8 আগস্ট ‘জাতীয় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে। আর কী প্রহসন, এই একই দিনে হামলার শিকার হল রিশা!

এখন ইয়াসমিনের ঘটনার চেয়েও সংখ্যায় এবং ভয়াবহতায় আরও বেশি ঘটনা ঘটছে, তার প্রতিবাদ কেন যেন সব পর্যায়ে যাচ্ছে না। রাজনীতির বন্ধ্যাত্ব একটা রাষ্ট্রের জন্য কতটা ক্ষতিকর হতে পারে তার উদাহরণ হচ্ছে একটার পর একটা এ ধরনের বর্বর ঘটনা এবং অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়া ও প্রতিবাদের জোর কমে আসা।

রিশার খুনি কোনো সুরক্ষিত এলাকার বাসিন্দা নয়। সামাজিক অবস্থানের প্রেক্ষিতে অত্যন্ত সাধারণ এক ব্যক্তি, বিশেষ করে রিশার পারিবারিক মর্যদা বা স্ট্যাটাস বিবেচনা করলে।

একটা মেয়ে পোশাক বানাতে গেছে মায়ের সঙ্গে, তাকে ভালো লেগেছে। প্রেম নিবেদনে প্রত্যাখ্যাত হওয়া, এরপর মায়ের ফোনে বিরক্ত করা, মায়ের অভিযোগের প্রেক্ষিতে মালিক কর্তৃক চাকরিচ্যুত হওয়া আর এ জন্য এতটা হিংস্র হয়ে ‘ভালোলাগার’ মেয়েটিকে ছুরিকাহত করা– পুরো ঘটনায় বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই, বিশেষ করে বাংলাদেশে! প্রেমে সাড়া না দেওয়ায় প্রেমিকাকে অ্যাসিড নিক্ষেপ একসময় মহামারী আকার ধারণ করেছিল। এ অপরাধের কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা এবং দু-একটি ক্ষেত্রে শাস্তি কার্যকর করার ফলে সেই মহামারীর প্রকোপ কিছুটা কমে আসে।

সেই মহামারী আবার দেখা দিয়েছে– অন্যরূপে। অ্যাসিড নিক্ষেপ হয়তো কিছুটা হ্রাস পেয়েছে, কিন্তু মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার ঘটনা দিন দিন বাড়ছেই। মেয়েরা যত ঘর থেকে বের হচ্ছে, এর হারও তত বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ তা কমে আসার কথা ছিল।

পাশ্চাত্যেও একসময় পথেঘাটে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার বাজে সাংস্কৃতি ছিল। কিন্তু ক্রমশ যখন রাস্তাঘাটে মেয়েদের চলাচল বাড়তে থাকে– জীবনের সর্বক্ষেত্রে যখন দেখা যায় নারীদের আনাগোনা– দোকানে, অফিসে, শিক্ষালয়ে যখন ছেলেমেয়ের সংখ্যা সমান সমান হতে শুরু করে, তখন ‘ইভ টিজিং’ কমতে থাকে। এটি স্বাভাবিক। (যদিও ‘ইভ টিজিং’ শব্দবন্ধ এখন অচল; ইংরেজিতে এখন একে ‘স্টকিং’ বলা হচ্ছে।)

মানুষ মাত্রই অদেখা-অজানার প্রতি কৌতুহল থাকে। আর উত্ত্যক্ত বা বিরক্ত করার প্রবণতা থাকে অপেক্ষাকৃত দুর্বলদের প্রতি। যে সমাজে নারীরা যত পিছিয়ে থাকে সে সমাজে নারীর প্রতি নির্যাতন, নারীকে হেয় করার সংস্কৃতি তত বেশি। বিষয়টি খালি চোখে দেখা যায়; গবেষণা করার প্রয়োজন হয় না।

নারীকে ঢেকে রেখে যারা নারীর মর্যাদার কথা বলে তারাই রাস্তাঘাটে নারীদের দেখলে ‘উত্তেজিত’ হয়ে পড়ে এবং সম্ভবত তাদের দুর্বলতা ঢাকতেই নারীর ‘পর্দা’ নিয়ে তাদের এত হইচই! তাদের নিজদের কারণে নারীদের অবরোধবাসিনী করে রাখার প্রয়াস। ‘হীরের খণ্ড’ বা ‘মাংসের দঙ্গল’ যা-ই বলুক– যেভাবেই তারা নারীদের ঢেকে রাখার পক্ষে যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করুক না কেন, আসল কারণ তাদের নিজস্ব রিপুর সমস্যা।

সবচেয়ে বড় কথা, নারীরা বাইরে বের হবে কী হবে না, নিজেদের কতটা অবগুণ্ঠিত করে রাখবে, তার সিদ্ধান্ত তাদের নিজেদের। নারীরা তো পুরুষের পোশাক বা চলাচলের উপর কোনো নিষেধাজ্ঞা বা বয়ান দেয় না। এর কারণ অবশ্যই আমাদের সমাজ, ধর্ম সব কিছুই পুরুষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়া। কিন্তু এ নিয়ন্ত্রণ ভাঙার সময় হয়েছে; ভাঙাও হচ্ছে ধীরে ধীরে।

পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, একদিকে নিয়ন্ত্রণ ভাঙছে, অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণ আরও জোরালোভাবে চেপে বসছে। আরও দুঃখের বিষয় হচ্ছে, কোনো কোনো নারী, তথাকথিত শিক্ষিত নারীরাও এ নিয়ন্ত্রণ শুধু মানছে না, এর পক্ষে মনপ্রাণও সঁপে দিচ্ছে! তারা আসলে পুরুষতান্ত্রিক-রোগে আক্রান্ত।

 

Delhi Bus Rapist - 111
দিল্লিতে বাসে ধর্ষিত নির্ভয়ার হত্যা মামলার আসামীর উকিল এবং স্বয়ং আসামীর কথা শুনেছি

 

রিশার ঘটনা মনে করিয়ে দিচ্ছে ফরিদপুরের চাঁপা রানী ভৌমিক, যাঁকে বখাটেরা মোটর সাইকেল চাপা দিয়ে মেরে ফেলে। গাইবান্ধার সেই ফুটফুটে মেয়ে তৃষা যে বখাটেদের হাত থেকে রক্ষা পেতে পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে মারা যায়। বখাটেদের কারণে একের পর এক মেয়ের আত্মহত্যা করার নজির বাংলাদেশে যেমন আছে, পৃথিবীর আর কোনো দেশে তেমন আছে কি না সন্দেহ।

নারীদের উত্ত্যক্ত করার হার ও পদ্ধতি যে ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে তাতে ‘ইভ টিজিং’ শব্দ দিয়ে তা সঠিকভাবে প্রকাশিত না হওয়ায় এখন ‘যৌন হয়রানি’ বলা সমীচীন মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সম্প্রতি ‘যৌন হয়রানি বিরোধী আইন’ পাস হয়েছে। কিন্তু এ আইন সম্পর্কে যেমন মানুষের অজ্ঞতা রয়েছে, তেমনি আইন ‘থোড়াই কেয়ার’ করার চিরাচরিত প্রবণতাও কাজ করছে। পাশ্চাত্যে এ আইনের কঠোর প্রয়োগের কারণে সেখানে যৌন হয়রানির হার অনেক কম।

সমাজে মেয়েদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ওবায়দুলের মতো দর্জি দোকানের এক কর্মী রিশার মতো মেয়েকে উত্ত্যক্ত করার সাহস পায়– তাকে হত্যা করার মতো দুঃসাহস দেখাতে পারে।

নারী মানেই আমার অধীনস্থ। নারী মানেই আমার করায়ত্ত। আমার অবাধ্য হওয়া, তা প্রেম-বিষয়ক হোক আর আমার নির্ধারিত নীতি-প্রথার বিরুদ্ধে হোক, তা বরদাশত করব কেন? অসুস্থ পুরুষ মানসিকতায় আবদ্ধ এ সমাজ। পুরষতান্ত্রিকতা মানেই তো অবিচার, অনৈক্য এবং বৈষম্য!

দিল্লিতে বাসে ধর্ষিত নির্ভয়ার হত্যা মামলার আসামীর উকিল এবং স্বয়ং আসামীর কথা শুনেছি একটি ডকুমেন্টারিতে। যারা অবলীলায় অনেকটা এ রকম কথা বলেছে, ‘মেয়েরা কেন রাস্তায় বের হবে? বের হলেও সন্ধ্যায় কেন বের হবে? তারা তো ধর্ষিত হবেই।’ এ ধরনের মানসিকতা কমবেশি এই উপমহাদেশের প্রায় সব পুরুষের।

সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে যে শরণার্থীরা উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিচ্ছে সেখানেও চলছে যৌন হয়রানি। তবে সত্যটা হল, তারা আশ্রিত দেশের পুরুষদের দ্বারা উৎপীড়িত হচ্ছে না, তারা নিজে নিজে দেশের পুরুষ শরণার্থীদের দ্বারাই হয়রানি ও নির্যাতিত হচ্ছে। এসব পুরুষ যে সাংস্কৃতিতে বড় হয়েছে তার বলয় থেকে বের হতে পারছে না; এমনকি নিজেদের এই চরম দুর্দিনেও!

যে ধর্ম ও সমাজ যত নারীদের বিরুদ্ধে, সে ধর্ম ও সমাজের পুরুষরা তত বেশি নারী নির্যাতনকারী হবে– এটাই স্বাভাবিক।

পুরষতান্ত্রিকতা ছাড়াও দায় এড়ানোর মানসিকতাও আমাদের এ ধরনের ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অভিযোগ আছে, রিশার স্কুল কর্তৃপক্ষর বিরুদ্ধে। তারা নিজেদের গাড়িতে সঠিক সময়ে রিশাকে হাসপাতালে পাঠায়নি পুলিশি মামলার ভয়ে। যে বিপদে আমাদের পুলিশের শরণাপন্ন হওয়ার কথা সে বিপদেই আমরা পুলিশকে ভয় পাচ্ছি। আমাদের অভিজ্ঞতা এতই নগ্ন!

জনতাকে জাগতে হবে, জাগতে হবে পুরো বাংলাদেশকে।

আমাদের নির্লিপ্ততা গ্রাস করে নিচ্ছে সমাজের সব শুভবোধ; ন্যায়-নীতি-নৈতিকতা চলে যাচ্ছে নির্বাসনে!

পারভীন সুলতানা ঝুমাসাংবাদিক, কলামিস্ট

Responses -- “আমাদের এই নির্লিপ্ততা”

  1. নিশাপতি

    সমাজের দুইটা পরস্পর বিরোধী প্রথা; যথা পর্দা বা আভূষণ এবং অপর্দা বা ইচ্ছা-ভূষণ। আমার এই লেখা দয়া করে কোন বিকৃত-মনা-মুক্তমনা পাঠক বা বিপ্লবী পড়বেন না; বা এখানে তাদের সাথে তর্ক করার মত কোন কথাই আমি লিখব না(যদিও তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের অন্তরভুক্ত) আমার এই লেখা তাদের জন্য যারা বিশ্বাস করে আমরা সৃজিত হয়েছি এবং আবার আমরা পুনরথিত হব ভালো ও মন্দ সব কাজের হিসেবের জন্য।
    প্রথম কথাটা পর্দা বা আভুশন নিয়েই বলি। আমরা অনেকেই পর্দাকে একটা সামাজিক প্রথা হিসেবে দেখি। নিজেকে সমাজের বা অন্যের কুমতলব, কুদৃষ্টির বা কুবাক্যের কবল থেকে রক্ষা করার জন্য আমরা পর্দার প্রয়োজনীয়তা বলে জানি। এইসব সাধারণত নারীর পর্দার কারন রুপে উপস্থাপন করি আমরা। পুরুষের ক্ষেত্রে পর্দার পরিধি নারীদের তুলনায় কম।
    নারীবাদীরা মনে করেন, বিশ্বাস করেন এবং কার্যকর করতে চান যে নারীর প্রকাশ্যে দৈহিক সৌন্দর্যের বা কাম প্রকাশের নিরাপত্তাই হল নারীর সত্যিকারের সামাজিক নিরাপত্তা। আর রক্ষণশীলরা মনে করেন, বিশ্বাস করেন এবং কার্যকর করতে চান নারীকে পর্দা অনুসারেই চলতে হবে যাতে সমাজের সাম্যবস্থা অক্ষুণ্ণ থাকে। পুরুষের ক্ষেত্রে দৈহিক সৌন্দর্যের চেয়ে প্রাধান্য পায় তার যোগ্যতার পাল্লা কতটা ভারী তা। তাই সমাজে পুরুষের ক্ষেত্রে পর্দা কথা সম্পূর্ণই অর্থহীন হয়ে পড়ে। একজন পুরুষ স্বল্প ভুশনে রাস্তায় ভ্রমন করলে এবং তার চলনে চাণক্য বা কথিত আভিজাত্য প্রকাশিত হলে প্রায় বেশীরভাগ নারীই তার পানে চাইবে কৌতূহল বসে বা বাসনার মোহে; আর তাতে কামনা কতোটুকু থাকে তা যে মেয়ে বা নারী তাকাবে তারাই ভালো জানে। আর একজন নারী সল্পবসনা হয়ে পরিভ্রমন করলে প্রতিটা পুরুষ তার দিকে তাকাবে কামনার বশে যে একবারের পর ২য় বার তাকাবে না সে চায় না তার কামনা জাগ্রত হোক। সমাজে মা, বোন, সন্মানের ও স্নেহের সম্পর্কগুলো বাদ দিলে সমাজে মেয়ে বা নারী বলতে যা অবশিষ্ট থাকে তা হল কাম। সম্পর্কের পশ্চাতে নারী পুরুষের কাছে হয় কামনাময়ী না হয় কুৎসিত (যা কামনা জাগ্রত করে না)। আর এই তত্ত্বই বিনোদনের ও বিজ্ঞাপনের এবং পর্যায়ক্রমে সামাজিক বিপ্লবের বাজারের সবচেয়ে বড় পুঁজি। তেমনি সম্পর্কের মধ্যে পুরুষের ভিবিন্ন রুপ থাকলেও সম্পর্কের বাইরে কোন যুবক বা পুরুষ নারীদের কাছে হয় বন্ধনের বা আপনার সুবিদারথে ব্যবহারের লক্ষ্যবস্তু না হয় অপদার্থ। আমি তাদের কথা বলছি না যারা হাজারে ৫০ জন বা শতাংশে ৫-১০%। কারন এইসব ঘটনা তারাই ঘটিয়ে থাকে যারা খুব সাধারণ জীবন যাপন করে এবং আকাঙ্ক্ষার সাথে নিজের সমঞ্জস্য রক্ষা করতে না পেরে অসামঞ্জস্য প্রকৃতির আশ্রয় নেয়।
    আমাদের সমাজ নারী ও পুরুষ উভয়ের শুধু দৈহিক বা সংখ্যাগত মিশ্রনেই গঠিত না বরং উভয়েরই কর্মে, মতবাদে ও মতাদর্শে গঠিত। এখন কথা হল পর্দা বা আভূষণ কি সামাজিক রীতি! পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে আল্লাহ্‌ যখন আদম ও হাওয়াকে সৃষ্টি করেছেন তখন তাদের পর্দা সহিত সৃষ্টি করেছেন; কিন্তু তারা তাঁর হুকুম অমান্য করায় তাদের পর্দা খসে পড়ে এবং লজ্জা স্থান অনাবৃত হয়ে পড়ে। এবং নারী ও পুরুষ উভয়কেই নামাজে দণ্ডায়মানের সময় সবচেয়ে বেশী পর্দা অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুরুষের ক্ষেত্রে গলা নিচ থেকে হাতের কনুই এবং পায়ের গোড়ালির উপর পর্যন্ত বা হাঁটুর নিচ পর্যন্ত; এ হল পুরুষের পর্দার সরবনিন্ম সীমা। আর নারীদের মুখমণ্ডল, হাতের কব্জির পরবর্তী অংশ এবং পায়ের গোড়ালির নিচের অংশ ব্যাতিত বাকি পূর্ণ শরীর। আর একান্তে নিজের সাথে নির্জন স্থানেও নারী পুরুষ উভয়কেই নির্দেশিত পর্দা পালনের জোর আদেশ দেওয়া হয়েছে। তার মানে পর্দা সামাজিক রীতি হউয়ার আগে পর্দা ব্যাক্তিগত ভূষণ। তারপরে সমাজে পর্দা আসে একে অপরকে দেখে শিক্ষার জন্য ও অনুসরনের জন্য। পর্দার সামাজিক অর্থ এমন হতে পারে সে তার আপনার লজ্জাস্থানের এবং বাসনা সংযত করেছে তাই তাকে আমার সে সংযমের সন্মান জানানো উচিত এবং আমার নিজেকেও সংযত করা উচিৎ।
    আর কামনা শুধু নারী পুরুষের পারস্পরিক শত্রুই না তাদের নিজেদেরও শত্রু। আল্লাহ্‌ পবিত্র কোরআনে বার বার বলেছেন “তোমরা কামনা বাসনার অনুসারী হইও না”। এই নির্দেশ বিয়ে করার ক্ষেত্রেও দিয়েছেন, তিনি বলেছেন “নারীদের মধ্যে তোমাদের যাদের ভালো লাগে তোমরা তাদের বিয়ে করে নাও; কিন্তু কামনা বাসনা বা গোপন প্রেমের উদ্দেশে নয়।”
    কিন্তু কোন নারী বা পুরুষ কামনা বিনে যৌবন পার করেছে এটা রুপকথার সামিল বা সে বিশেষ উদ্দেশে আল্লাহ্‌ করতিক প্রেরিত; সে যেমনি হোক বা যেই কথাই বলুক। যে মানুষের জন্ম নারী ও পুরুষের মিলনে হয়েছে সে কখনোই কামনা বিনে জীবনে চলতে পারে না। সে যে কোন ভাবেই তার কামনা চিরতারথ করে হোক গোপন, বা সামাজিক ও বৈধ উপায়ে, বা বিকৃত উপায়ে।
    এখন কথা হল কি কারনে কিছু বুদ্ধিজীবী বা যুক্তিবাদীরা ধর্মকে নারীর ব্যাধি রুপে উপস্থাপন করে, বিশেষত ইসলাম ধর্মকে! তা সংক্ষেপে বলব আমি। আগে দেখি নারী ও পুরুষের কামনার রুপ কেমন। পুরুষের সংযমহীন কামনার রুপ উম্মাদনা বা পাশবিক প্রকৃতির; আর নারীর কামনার রুপ উদ্দেশ্যপ্রানদিত হয়। নারীর কামনা প্রকাশের মাধ্যমে একজন বা একদল পুরুষকে যত সহজে বশ বা বিশেষ কর্ম সাধনে ব্যাবহার করা যায়, পৃথিবীর এমন আর কিছুই নাই যা এত সহজে করতে পারে। আর নারী যৌনতার এই রূপকে পরিপূর্ণভাবে সামাজিক ও যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাবহারের দ্বারা তারা আর্থিক ও ক্ষমতার দিক দিয়ে লাভবান হতে চায়। নারীর অন্যতম একটা বোকামি হল সে পৃথিবীতে অতিরঞ্জিতভাবে অতিরিক্ত ইন্দ্রিয় বা বাস্তববাদী। ইসলামে নারী ও পুরুষকে সর্বদাই সমান পুরষ্কার বা সমান শাস্তির বিধান রয়েছে। আল্লাহ্‌ বলেছেন কর্মফলের ব্যাপারে তিনি নারী ও পুরুষের পার্থক্য করেন না। যারা নিজের অপকর্ম ও পাপের শাস্তিকে ভয় পায় এবং তাদের অপকর্ম ও পাপ তার ইন্দ্রিয় ও স্বভাবকে গোপনে বা প্রকাশ্যে গ্রাস করে ফেলে; তারাই তখন নিজের সুবিদারথে অন্নের দোহাই দেয়। সমাজের সকল নারী বা পুরুষ ক্ষমতার বা সফলতার ও শুদ্ধতার শীর্ষে পৌঁছতে পারে না। তাই নারী পুরুষের অবাধ-আচারে বিচরন, মুক্ত যৌনতা বা ইচ্ছা-ভুশন ক্ষমতাশালীদের ভোগের সুযোগ বাড়িয়ে দেয় কিন্তু সামাজিকভাবে দুর্বলদের জন্য চূড়ান্ত ক্ষতিকর; তারা বা তাদের ইচ্ছা, মূল্যবোধ, সন্মান, আশা ও কর্মক্ষেত্র ক্ষমতাশালীদের ইচ্ছা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও ব্যাবহিত হতে থাকে তাদের জ্ঞ্যানে ও ওজ্ঞ্যাতে।
    তাই ধর্ষণের জন্য দায়ী শুধু ধর্ষক। আর তাকে ধর্ষকে পরিনত করেছি আমি, আপনি, যারা মুক্ত যৌনাচারের কথা বলি, যারা নারীকে পুরুষের প্রেম বা কামনা জাগরনের প্রতীক রুপে সঙ্গীতে, নাটকে, ছবিতে শিল্পের নামে উপস্থাপন করি, যারা নিজেরা পাপ করলে সেই পাপকে লুকিয়ে যাই বা যেতে পারি ক্ষমতার বলে অসন্মান ও ন্যায্য শাস্তির ভয়ে, যারা নিজেদের লাভের জন্য অন্যকে নিজের মত ব্যাবহার করতে চাই। আমরা সবাই দায়ী আজকের ছেলেদের ধর্ষক হউয়ার জন্য। আর রিশার ম্রিত্তুর দায় আমাদের সবার। আমরা সবাই মিলে ধর্ষক তৈরি করেছি, সে ধর্ষক রিশাকে মেরেছ।

    Reply
  2. সুভাষ দাস

    উপরের প্রতিক্রিয়ায় বলব যে আমাদের প্রত্যেকেরেই মা, বোন ও স্ত্রী আছে। সকলেই যে সমানভাবে অনুশাসন মানে অথবা মানানো যায় তা কেউ বলতে পারবেন না। আমরা নারী-পুরুষ সকলেরই নিজ নিজ ত্রুটি খোঁজ করে নিজেদেরই সংশোধিত হওয় উচিত। তাহলে আপনার আমার মা, বোন ও স্ত্রী নিরাপদ থাকবে। সর্বোপরি আমাদের দেশের সর্বোচ্চ পদে আসীন অনেক নারী আছেন। উনারা যদি এই ব্যাপারে কঠিন হন তাহলেই সমস্যা অনেক কমে আসবে।

    Reply
  3. Amit

    স্বীকার করছি এই একুশ বছরে মানুষের বিবেক অনেক নিচে নেমে গেছে। কিন্তু মেয়েরা কি সচেতন হয়েছে? এতগুলো মেয়েকে খুন করা হল, কয়টা মেয়ে রাস্তায় বের হয়ে এর প্রতিবাদ করেছে? সবাই শুধু পত্রিকায় কলাম লিখেছে।

    আগে নিজেরা সচেতন হোন, মেয়েদেরকে সচেতন করেন, দেখবেন ‘পুরুষতান্ত্রিক’ কথাটাই থাকবে না। আপনাদের মেয়েরা পড়াশোনা না করে অবসর সময়ে স্টার জলসা দেখে, দিনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করে সাজগোজ করে।

    এ রকম মনমানসিকতা দূর করুন।

    Reply
    • alia

      শুধু চার দেয়ালের ভিতর থাকেন, তাই আপনার মনে হচ্ছে মেয়েরা শুধু সাজগোজ করে, আর কিছু করে না। সাজগোজ একটা মেয়ের নিজস্ব ব্যাপার। এতে আপনার মতো মানুষদের এত মাথাব্যথা কীসের বুঝলাম না!

      Reply
      • সাজ্জাদ আলী খান

        alia, আপনি যথার্থ বলেছেন – প্রসঙ্গ পাল্টে Amit কেন এদিকে যাচ্ছেন, বুঝলাম না। ভুল বা বাড়াবাড়ি কারোই করা উচিত নয়, কিন্তু লক্ষ্য করুনঃ নিপীড়নের ঘটনাগুলো ঘটছে বিভিন্ন পরিবেশে- সাজ গোজ করা বা না করা কোন মেয়েরাই তো রেহাই পাচ্ছে না। তবে রাস্তায় চলাচলের ক্ষেত্রে বিরাজমান অসুবিধাগুলো নিরসন করতে বর্তমান নারী নেতৃত্বের সরকার কতটা সফল হবেন তা দেখার বিষয়ঃ
        ১-ফুটপাত শতকরা ৯৫% বেদখল , কেউ কি হাটতে পারছে ?
        ২-ফুটপাথে হাটতে না পেরেই স্বল্প দূরত্বে রিক্সা,গাড়ী বা বাস প্রভৃতি যানবাহনে চড়ছে এবং যানজট বাড়িয়ে দিচ্ছে, বাসে ভিড় বাড়ছে, মেয়েদের বাসে চড়া কি নিরাপদ?
        ৩-আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কি যথেষ্ট সহায়তা দিচ্ছে মা-বোনদের স্বচ্ছন্দ চলাফেরায়?
        ৪-রাতে রাস্তায় বাতি কি যথেষ্ট ?
        ৫-পাবলিক টয়লেটে পুরুষরাই যেতে পারে (মসজিদের টয়লেটেও পুরুষরা যায়) এবং পুরুষরা যেখানে সেখানে জরুরী কাজ সেরে নেয়(যদিও অনেক ক্ষেত্রে তা অশোভন), কিন্তু মহিলারা আজ মোট কর্মজীবির অর্ধেক ( প্রায় ৪৫% থেকে ৬০% ) হয়েও চরম অসুবিধায় পড়ছে চলতে ফিরতে, এটার অবসান সহসা হবে কি?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—