জহির রায়হান একদিন আমজাদ হোসেনকে ডেকে একটা সিনেমার চিত্রনাট্য লিখতে বললেন। গল্পটা হবে এমন যেখানে এক বোন আরেক বোনকে বিষ খাওয়াবে। আমজাদ হোসেন লেখাও শুরু করে দিলেন। তবে প্রথম দৃশ্যটা ছিল এ রকম– এক বোন আরেক বোনকে দুধভাত খাওয়াচ্ছে। জহির রায়হান জিজ্ঞেস বললেন, “খাওয়াতে বললাম বিষ, আর খাওয়াচ্ছেন দুধ।”

আমজাদ হোসেন বলেন, “আরে, দুধ না খাওয়ালে বিষ খাওয়াব কীভাবে?”

সময়টা তখন ১৯৬৯-৭০ সাল।

সিনেমার কাহিনি একটা পরিবার নিয়ে। ভাইবোন, ভাইয়ের বউ, বোন-জামাই আর একটা চাবির গোছা-– এই নিয়েই সে পরিবার। কিছুক্ষণ পর সেই পরিবারই হয়ে ওঠে ‘একটি দেশ, একটি সংসার, একটি চাবির গোছা, একটি আন্দোলন, একটি চলচ্চিত্র।’ সিনেমার নাম প্রথমে ‘তিনজন মেয়ে ও এক পেয়ালা বিষ’ রাখার কথা ছিল। মাঝপথেই জহির রায়হান নাম পাল্টে দিলেন ‘জীবন থেকে নেয়া’

জহির রায়হান তখন ‘কখনো আসেনি’ এবং ‘কাঁচের দেয়াল’ এর মত ব্যতিক্রমধর্মী সিনেমার পরিচালক। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘কাঁচের দেয়াল’ শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র এবং তিনি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকার হিসেবে পুরস্কার পান। সে উৎসবে সর্বোচ্চ সংখ্যক পুরস্কারও তিনি পেয়েছিলেন। বিভিন্ন কারণেই একসময় তিনি বাণিজ্যিক ধারার সিনেমা তৈরি শুরু করেছিলেন। কিন্তু সত্তরের জানুয়ারিতে তিনি নিজেই বলেন:

“এ বছরের মধ্যে নতুন ধরনের চলচ্চিত্র তৈরি করতে না পারলে আপন বিবেকের কাছে প্রতারক সাব্যস্ত হব। এই সময় আমার আর্থিক সংকট ছিল বলে সৃজনশীল ছবির বদলে বাণিজ্যিক ছবির ভিড়ে হারিয়ে গিয়েছিলাম। এখন সে সামর্থ্য এসেছে। তাই আমার স্বপ্ন–সাধ নিয়ে ছবি তুলবার সময় উপস্থিত।”

‘জীবন থেকে নেয়া’ তাঁর এই স্বপ্ন-সাধের একটি।

Jahir-Raihan-1
‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবির পোস্টার

 

ছবি নির্মাণকালে পাকিস্তানিদের নজরে পড়েন কলাকুশলীরা। জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল জহির রায়হানকে। ছবি মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল ১৯৭০ সালের ১০ এপ্রিল। সেন্সর জটিলতার দরুণ ওই দিন মুক্তি না পেয়ে পায় পরদিন– ১১ এপ্রিল। নির্দিষ্ট সময়ে মুক্তি না দেওয়াতে জনগণ আন্দোলনে নেমে পড়েছিল। ‘জীবন থেকে নেয়া’ খুব সম্ভবত একমাত্র চলচ্চিত্র যার মুক্তির জন্য হাজার হাজার মানুষ মিছিল করেছে, স্লোগান দিয়েছে।

নিজে ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলেই তাঁর সাহিত্যকর্মে ভাষা আন্দোলন এক উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে। হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন:

“জহির রায়হান সম্ভবত বাংলাদেশের একমাত্র কথাসাহিত্যিক যাঁর উদ্ভবের পেছনে আছে ভাষা আন্দোলন…। যদি বায়ান্নর একুশ না ঘটত তবে জহির রায়হান হয়ত কথাশিল্পী হতেন না।”

‘আরেক ফাল্গুন’, ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’, ‘মহামৃত্যু’ এবং ‘একুশের গল্প’ সেই সত্যতার প্রমাণ দেয়। এ জন্যেই বোধহয় ছবির শুরুতেই প্রভাত ফেরীর বাস্তব দৃশ্যেটা এতটা অতুলনীয়। খান আতাউর রহমানের সঙ্গিতায়োজনে করা “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি…” এখনও আমাদের প্রভাত ফেরীর অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে, থাকবেও।

ছবিটি শেষ হয়েছিল এক নবজাতককে দিয়ে, নাম ‘মুক্তি’; এ যেন আমাদের মুক্তির আগাম বার্তা!

 

২.

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ১৮ এপ্রিলের দিকে জহির রায়হান দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। ফেরেন ১৮ ডিসেম্বর। আসার পথে বাঙালির বিজয়োল্লাস রুপালি ফিতার মধ্যে বন্দি করছিলেন। ঢাকাতে নেমেই চলে যান ক্যান্টনমেন্টে; পাকিস্তানিদের আত্নসমর্পনের দৃশ্য ক্যামেরায় তুলে রাখতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছিলেন। হঠাৎ তখন কে একজন তাঁকে জানাল– “বাড়ির খবর কিছু জানেন, আপনার বড়দা ১৪ তারিখ থেকে নিখোঁজ। রাজাকার আলবদররা ওঁকে ধরে নিয়ে গেছে।”

ক্যামেরাটা সহকারীর হাতে দিয়ে তখনই রওয়ানা দেন বাড়ির দিকে।

পরাজয় আসন্ন দেখে পাকিস্তানিরা বাঙালিকে মেধাশূন্য করার নীলনকশা তৈরি করে। সেই নকশা অনুযায়ীই শহীদুল্লাহ কায়সার, ডা. আলীম চৌধুরীর মতো আরও বহু বুদ্ধিজীবীকে আলবদরেরা ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে পরবর্তীতে অনেকেরই লাশ পাওয়া গেলেও শহীদুল্লাহ কায়সারের লাশ খুঁজে পাওয়া যায়নি। যে বড়দা তাঁর ‘প্রেরণার মূল শক্তি’ সেই বড়দার জন্য পাগলপ্রায় হয়ে গেলেন।

এসেই তিনি বুদ্ধিজীবী হত্যা ও গণহত্যার তথ্য অনুসন্ধান ও ঘাতকদের ধরার জন্যে ‘বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিটি’ নামে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করেন। এশতেহাম হায়দার চৌধুরী, ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম, ব্যারিস্টার মওদুদ, ড. সিরাজুল ইসলামসহ আরও অনেক বুদ্ধিজীবী এর সদস্য ছিলেন। এই কমিটিতে কাজ করতে গিয়ে জহির রায়হান আলবদর ও রাজাকারদের অনেক গোপন তথ্যও উদ্ধার করেছিলেন। বুদ্ধিজীবীদের হত্যার পেছনে কারা জড়িত ছিলেন এবং হত্যাকারীদের অনেকেরই গোপন আড্ডাখানা সম্পর্কেও তথ্য উদ্‌ঘাটন করেছিলেন জহির রায়হান। শহীদুল্লাহ কায়সারকে যে ধরে নিয়ে গিয়েছিল, সেই খালেক মজুমদারকে ধরিয়েও দিয়েছিলেন।

বড়দাকে খুঁজতে একজন জাপানি রেডক্রস কর্মীর সাহায্যে মিরপুরের কয়জন বিহারি ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করেন। রেডক্রস কর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, এই ডাক্তাররা ছিলেন নিরপেক্ষ এবং ভালো। তারা আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, ব্যাপারটা দেখবেন এবং ১৬ ডিসেম্বরের পরে এ রকম আরও অনেক অনুরোধ তাদের কাছে আসছে।

এখানে উল্লেখ্য, জহির রায়হান পীর-ফকির-মাজার এ ধরনের কুসংস্কারে কখনও বিশ্বাস করতেন না। কিন্তু শুধুমাত্র তাঁর প্রিয় বড়দার জন্য পীর–ফকিরদের কাছে যাতায়াতও শুরু করেছিলেন। এমনকি আজমীর শরীফেও গিয়েছিলেন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে। রফিকউদ্দীন নামক এক লোকের দ্বারা তখন বেশ প্রভাবিত হয়েছিলেন। সে হয়ে উঠেছিল তাঁর নিত্যদিনের সহচর।

১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি সকালে টেলিফোনে তিনি খবর পান যে মিরপুরের ১২ নম্বরে শহীদুল্লাহ কায়সারসহ আরও অনেক বুদ্ধিজীবীকে বন্দি করে রাখা হয়েছে।

এই পর্যায়ে মিরপুরের তখনকার অবস্থা সম্পর্কে কিছু বলা প্রয়োজন। মিরপুর এবং মোহাম্মদপুর ছিল মূলত বিহারি অধ্যুষিত এলাকা। এদের মধ্যে শিক্ষিত ও বড় ব্যবসায়ীয়রা থাকত মোহাম্মদপুরের দিকে এবং মূলত শ্রমিক শ্রেণিরাই থাকত মিরপুরে। ১৯৬৯ সালের দিকে এখানে বিহারি-বাঙালি দাঙ্গাও হয়। ২৫শে মার্চে রাতের পর বিহারিরা নির্মম ও নৃশংসভাবে সে এলাকার অনেক বাঙালিকে হত্যা করে। পরবর্তীতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী প্রায় ২০ হাজার বিহারিকে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে ‘সিভিল আর্মড ফোর্সেস’ (সিএএফ) নামে নতুন আরেকটা বাহিনী গড়ে তোলে। কেউ কেউ রাজাকার আলবদর বাহিনীতে যোগদান করে। ১৬ই ডিসেম্বরে পাকিস্তানিরা আত্নসমর্পন করলেও এই সিএএফের সদস্যরা আত্নসমর্পণ করেনি। বরং এসব বিহারি, আলবদর অস্ত্রশস্ত্রসহ আশ্রয় নিয়েছিল মিরপুরে। অর্থাৎ বাংলাদেশ ১৬ই ডিসেম্বর হানাদার মুক্ত হলেও মিরপুর তখনও অবাঙালি, আলবদর ও রাজাকারদের দখলে ছিল।

Jahir-Raihan-2
কৃতজ্ঞতা: নিঝুম মজুমদার

এখানে একটা প্রশ্ন আসে, কে তাঁকে সেদিন ফোন দিয়েছিল। বিহারিদের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে সিনেমার সঙ্গে জড়িত ছিল, যার ফলে জহির রায়হানের সঙ্গে টুকটাক পরিচিতি থাকার কথা। এরাই যুদ্ধকালীন নির্বিচারে বাঙালি হত্যা করেছে। এই পূর্বপরিচিত বিহারিদের কেউ কি তাঁকে সেদিন ফোন দিয়েছিলেন?

অনেকেরই ধারণা, ষাটের দশকের ঢাকার ছবির এক বিহারি নৃত্যপরিচালক মাস্তানাই তাঁকে সেদিন ফোন দিয়েছিল। মিরপুরে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রধান সহযোগীদের একজন ছিল এই মাস্তানা; মিরপুর মুক্ত হওয়ার সময় মারা যায় সে। আবার, অনল রায়হানের ‘পিতার অস্থির সন্ধানে’ প্রতিবেদনে উপরোল্লিখিত আধ্যাত্মিক রফিক সম্পর্কেও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এই প্রশ্নের উত্তর বোধহয় কখনও পাওয়া যাবে না!

টেলিফোনে খবর পাওয়ার পরই জহির রায়হান পরিচিত কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে সঙ্গে করে মিরপুরের দিকে রওয়ানা দেন। পরনে ছিল ছাই রঙয়ের প্যান্ট আর গাঢ় ঘিয়ে রঙের কার্ডিগান। সাদা রঙের শার্টের সঙ্গে পায়ে ছিল স্যান্ডেল। শাহরিয়ার কবিরও সেদিন সঙ্গে ছিলেন। তাঁর ভাষায়:

“সেদিন আমরা যখন টেকনিক্যালের মোড় ঘুরে বাংলা কলেজের কাছে গিয়েছি তখনই উত্তর দিক থেকে আমাদের গাড়ি লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলি বর্ষিত হয়েছিল। জহির রায়হান প্রচণ্ড বেগে গাড়ি চালিয়ে ছয় নম্বর সেকশনে এসেছিলেন। মিরপুরে তখন কারফিউ। টেকনিক্যালের মোড়ে গাড়ি আটকানো হয়েছিল। গাড়িভর্তি মুক্তিযোদ্ধা দেখেই হোক কিংবা জহির রায়হানের কথা শুনেই হোক পুলিশ আমাদের গাড়ি আটকায়নি। আটকেছিলেন ছয় নম্বর সেকশনের পুলিশ ক্যাম্পে অবস্থানরত সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা।”

উল্লেখ্য, সেনাবাহিনি তখন ১২ নম্বর সেকশনের রেইড করার জন্যে যাচ্ছিল, তারা কোনো সিভিলিয়ান সঙ্গে রাখতে চায়নি। অনেক অনুরোধের পর জহির রায়হানকে নিতে রাজি হয়েছিল।

আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে বিহারিরা আশেপাশের বাড়িঘর থেকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রশস্ত্রসহ হ্যান্ড গ্রেনেড নিয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। কেউ এই হামলার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না, তাই পাল্টা আক্রমণের কোনো সুযোগ পাননি তাঁরা। ওই দিন বিকালে ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সেনাবাহিনী মিরপুরে ১২ নং সেকশনের ওপর আবারও আক্রমণ চালায়। পরদিন সকালে পুরো একটা ব্যাটালিয়ন ১২ নং সেকশনে প্রবেশ করে, কিন্তু কোনো পুরুষ মানুষকে খুঁজে পায়নি। রাতেই সবাই পালিয়ে গিয়েছিল।

অন্যদিকে, সেদিন সকালের বিহারিদের অতর্কিত হামলায় ৪২ জন সেনাসদস্য নিহত হন। ক্যাপ্টেন মোর্শেদ ও নায়েক আমিরসহ কয়েকজন আহত হন। নিহতদের মাত্র ৩-৪ জন ব্যতীত আর কারও লাশ খুঁজে পাওয়া যায়নি। এমনকি মিরপুর পুরো জনশূন্য করার পরও। খুব সম্ভব ৩০ জানুয়ারি রাতেই সেগুলো সরিয়ে ফেলা হয়। রাতের অন্ধকারে বিহারিদের সরিয়ে ফেলা সেই লাশগুলোর সঙ্গে বড়দাকে খুঁজতে গিয়ে হারিয়ে যান আমাদের জহির রায়হান।

তাঁর আর সন্ধান পাওয়া যায়নি। তাঁর বাসায় পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট আবু সাইদ চৌধুরী বলেছিলেন, “স্বাধীন দেশে এমন একজন ব্যক্তিকে হারালাম, যাঁকে এখন আমাদের বেশি করে প্রয়োজন। যা ঘটল– এ আমাদের সকলের ব্যর্থতা।”

পত্রপত্রিকায় জহির রায়হানের হারিয়ে যাওয়ার খবর বেরোতে লাগল। অনেকগুলো নতুন সিনেমা বানানোর কথা ছিল তাঁর। ভাষা আন্দোলন নিয়েও একটা সিনেমা বানানোর কথা ছিল। নামও দিয়েছিলেন, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ ।

কিছুই করা হল না। হারিয়ে গেলেন তিনি।

 

৩.

১৯৯৯ সালের জুলাই মাস। জহির রায়হান হারিয়ে যাওয়ার প্রায় ৩০ বছর হয়ে গিয়েছে। বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ করার কথা ছিল জহির রায়হানের। এই ৩০ বছরের মধ্যে অনেকেই রটালেন যে, নেতাদের গোপন ডকুমেন্ট প্রকাশ হওয়ার ভয়ে খুন হয়েছিলেন জহির রায়হান। আলবদর নেতা নিজামী জহির রায়হান প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে পুরো বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের দায়ভারই তখনকার আওয়ামী লীগের ওপর চাপিয়ে দেন। শাহরিয়ার কবীরের এক ডকুমেন্টারিতে নিজামী বলেন:

“একটি তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছিল জহির রায়হানের নেতৃত্বে; সেই তদন্ত কমিটির চেয়ারম্যান জহির রায়হানকে কারা উধাও করল? কেন উধাও করল? সেই তদন্তটাও কেন হল না? এই প্রশ্নের উত্তর যদি আপনারা বের করতে পারেন, তাহলে আসল রহস্য আমাদের সামনে বের হবে!”

তাহলে কারা খুন করেছিল জহির রায়হানকে?

 

Jahir-Raihan-3
আমির হোসেনের বর্ণনানুসারে মিরপুরের যে স্থানটিতে শহীদ হয়েছিলেন জহির রায়হান [ ভোরের কাগজ, ১ সেপ্টেম্বর ১৯৯৯]

১৯৯৯ সালের জুলাই মাসে মিরপুর ১২ নং সেকশনের মুসলিম বাজারের নূরী মসজিদের নির্মাণকাজের জন্য খননকালে বের হয়ে আসে মানুষের দেহাবশেষ, গুলিবিদ্ধ হাড়, করোটি; আবিষ্কৃত হয় বাংলার আনাচেকানাচে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য বধ্যভূমির একটি। ১২ নং সেকশনের এই বধ্যভূমি আবারও ৩০ জানুয়ারির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, আবারও সামনে চলে আসেন হারিয়ে যাওয়া জহির রায়হান।

যুদ্ধের ২৮ বছর পর সেদিনের আহত নায়েক আমির হোসেনের সন্ধান পাওয়া যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, যিনি বেঁচে এসেছিলেন বিহারিদের আক্রমণের হাত থেকে। তাঁর মুখ থেকেই বেরিয়ে পড়ে ঘটনা। তিনি জহির রায়হানকে গুলিবিদ্ধ দেখেছিলেন। আমির হোসেন জহির রায়হানকে চিনতেন না। উর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন ‘সাংবাদিক’ হিসেবে। তার প্রতি নির্দেশ ছিল ওই সাংবাদিকসহ অন্যদের পাহারায় থাকা। যেহেতু সবাই সামরিক বাহিনীর লোক ছিলেন, তাই একমাত্র সেই সাংবাদিকই ছিলেন সিভিল পোশাকে। তিনি বলেন,

‘‘বেলা ১১টার দিকে ঢং ঢং পাগলা ঘণ্টা শুনতে পাই। গুলি ছুটে আসতে থাকে দক্ষিণ দিক থেকে। সঙ্গে সঙ্গে বাঁ দিকে তাকিয়ে দেখতে পাই অনেক পুলিশ সদস্য মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে এবং সেখানেই একটি ইটের স্তূপের পিছনে আমি অবস্থান নিই। তখন তাকিয়ে দেখি, পুলিশের পাশাপাশি সাংবাদিক সাহেবও যেখানে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন, তাঁর পাশেই পানির ট্যাংকের দেয়ালের পাশে তাঁর দেহ পড়ে আছে।’’

আমির হোসেনের কথা থেকেই আরও জানা যায়, পুলিশের সদস্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়ার পর দক্ষিণ দিক থেকে গোলাগুলি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু তখনই ‘সিভিল পোশাকে’ একশ জনের মতো বিহারি দা-ছুরিসহ নানা ধরনের অস্ত্রপাতি নিয়ে দক্ষিণ দিক থেকে ছুটে আসতে থাকে। তারা উর্দুতে গালিগালাজ করাসহ ‘কাউকেই ছাড়া হবে না’ বলে চিৎকার করছিল। অবাঙালিরা দক্ষিণ দিক থেকে এদিয়ে এসে মাটিতে লুটিয়ে পড়া পুলিশ সদস্যদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা তাদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো শুরু করে এবং টেনেহিঁচড়ে পানির ট্যাংকের পশ্চিম দিকে নিয়ে যেতে থাকে। এ সময় পড়ে থাকা সাংবাদিককেও (জহির রায়হান) ৬-৭ জন অবাঙালি হাত-ঘাড়-কোমর ধরে টেনে নিয়ে যায় পানির ট্যাংকের পশ্চিম দিকে।

আমির হোসেনের জবানবন্দি নিয়ে দৈনিক ভোরের কাগজ ১৯৯৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর ‘নিখোঁজ নন, গুলিতে নিহত হয়েছিলেন জহির রায়হান’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

এই প্রতিবেদনের মাধ্যমেই জহির রায়হানকে নিয়ে নিজামীদের তৈরি করা দীর্ঘদিনের ধোঁয়াশার চাদর পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। তাই এটা স্বীকার করতেই হয় যে, জহির রায়হানের এই মৃত্যু পাকিস্তানি ও তাদের সহযোগীদের দ্বারা পরিচালিত বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডেরই একটা অংশ।

৪.

বাহাত্তরে জহির রায়হান যখন ঘাতকের হাতে নিহত হন তখন তাঁর বয়স সবে ৩৭ বছর। এই মৃত্যুর ফলে শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বও অকালে হারাল তার এক প্রতিভাবান সৃষ্টিশীল সন্তান।

‘Stop Genocide’ এর কথাই ধরেন, এটা কি শুধুই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য দলিল কিংবা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র! শুরুতেই লেনিনের স্কেচ ও বক্তব্য, ভিয়েতনামে মার্কিন বোমাবাজির দৃশ্য, ভিয়েতনামি শিশুর লাশ ও নাৎসি বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞের দৃশ্য প্রমাণ করে এটা শুধুই আমাদেরই না, পৃথিবীব্যাপী সব মুক্তিকামী মানুষের চেতনার প্রতীক। আমাদের এই মুক্তিসংগ্রামকে তিনি দেখেছিলেন দুনিয়াজুড়ে সব মুক্তিসংগ্রামের অংশ হিসেবে।

‘আর কতদিন’ – এক অদ্ভুত সৃষ্টি জহির রায়হানের। এখানেও দুনিয়াজুড়ে চলতে থাকা ধর্ম, জাত, বর্ণ নিয়ে হানাহানি সংঘাতের চিত্র পাওয়া যায়। ধর্ম-বর্ণের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া বিপন্ন মানবতার ছবি পাওয়া যায়। জহির রায়হানের চলে যাওয়ার প্রায় অর্ধশতাব্দী পরও ‘আর কতদিন’ এর শেষ বক্তব্যটুকুর অস্তিত্ব এখনও পৃথিবীব্যাপী বিরাজমান:

আমরা কোথায়?
ভিয়েতনামে না ইন্দোনেশিয়ায়।
জেরুজালেমে না সাইপ্রাসে।
ভারতে না পাকিস্তানে।
কোথায় আমরা?
জানো ওরা আমার ছেলেটাকে হত্যা করেছে হিরোশিমায়।
ওরা আমার মাকে খুন করেছে জেরুজালেমের রাস্তায়।
আমার বাবাকে মেরেছে বুখেনওয়াল্ডে গুলি করে।
আর আমার ভাই। তাঁকে ওরা ফাঁসে ঝুলিয়ে হত্যা করেছে। কারণ সে মানুষকে ভীষণ ভালোবাসতো।

একজন জহির রায়হানের শূন্যতা কোনোভাবেই পূরণীয় নয়। এখনও অপেক্ষা করি তাঁর জন্য। রাত বাড়ছে, হাজার বছরের সে রাত!

 

তথ্যসূত্র:

 

১.    ‘জহির রায়হানের চলচ্চিত্র পটভূমি বিষয় ও বৈশিষ্ট্য’, অনুপম হায়াৎ

২.    ‘স্টপ জেনোসাইডএর চিত্রনাট্য; ভূমিকা ও সম্পাদনা’, মানজারে হাসীন

৩.    ‘নিখোঁজ নন, গুলিতে নিহত হয়েছিলেন জহির রায়হান’, ভোরের কাগজ

৪.    ‘পিতার অস্থির সন্ধানে’, অনল রায়হান

৫.    ‘মিরপুরের সদ্য আবিষ্কৃত বধ্যভূমি ও জহির রায়হানের অন্তর্ধান প্রসঙ্গ’, শাহরিয়ার কবির

৬.    ‘রক্ত ও কাঁদা ১৯৭১’, তাদামাসা হুকিউরা

৭.     ‘মুক্তিযুদ্ধ – আগে ও পরে’, পান্না কায়সার

৮.    ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য’, জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী

৯.    ‘যুদ্ধাপরাধ ৭১ শাহরিয়ার কবির’ (ডকুমেন্টারি)

১০.   ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’, শাহরিয়ার কবিরের ভূমিকায়

১১.   বিভিন্ন ব্লগ ও ওয়েবসাইট।

সহুল আহমদঅনলাইন অ্যাকটিভিস্ট

২৬ Responses -- “জহির রায়হান: নিখোঁজ ও অপেক্ষার হাজার বছর”

  1. M. Rana

    জনাব জনাবা সিম্পল গার্ল দেখেছো কি পড়েছো কি নিছের টা –????
    “”মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে অপপ্রচারে যাবজ্জীবন”

    আমার মনে হ্য় অনেক ভন্ডদের বকর বকর বন্দ হচ্ছে ——

    Reply
  2. সিম্পল গার্ল

    মি. রানা, আসলে আপনাদের সমস্যা হলো ইতিহাস বা ব্যক্তি সম্পর্কে না জেনে বিতর্ক করতে আসেন। চীনপন্থী বাম দলগুলো মুক্তিযুদ্ধকে যে “দুই কুকুরের লড়াই” বলতো এত সবাই জানে। অথচ এই বিষয় নিয়েই আপনি আমার কাছে তথ্য চাচ্ছেন। সে জন্যেই বলেছি আপনি নিজে একটু চেষ্টা করে জেনে নিন। খুব বেশি দুরে যেতে হবে না, বিডিনিউজ২৪.কম-এ “মুক্তিযুদ্ধে বাম দলগুলোর ভূমিকা” শিরোনামে প্রকাশিত একটি লেখাতেও বিষয়টি একেবারে সূত্র উল্লেখ করে বলা আছে, ‘১৯৭১ চীনাপন্থী বামদের বড় অংশ মুক্তিযুদ্ধকে “দুই কুকুরের লড়াই” বলতে কুন্ঠাবোধ করেনি।’ লিংক দেখুন– http://opinion.bdnews24.com/bangla/archives/2515

    শুধু তাই নয় আবদুল হকের নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও নিজেদের নামের সাথে পূর্ব পাকিস্তান রেখে দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল। একসময় বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার জন্য ভুট্টোর কাছে অস্ত্র সহযোগীতা চেয়ে চিঠি লিখেছিল। ইতিহাসের শিশুও যা জানে সে বিষয়টি আপনি জানেন না দেখেই বলেছি নিজে একটু চেষ্টা করে ইতিহাস পড়ুন।

    এরপর মুনির চৌধুরী-শহীদুল্লাহ কায়সার বা ডা. মুর্তজা অর্থাৎ ১৪ ডিসেম্বর যাদের নিজের বা সরকারী বা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসা থেকে নিজে হত্যা করা হয়েছে তারা যে চীনপন্থী বাম ছিলেন তা সকলেই জানে। সে কারণে তারা কেউই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি বরং যুদ্ধের সেই উত্তাল দিনগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষা সবকিছু নিয়ে সুষ্ঠুভাবে পাকিস্তান সরকারের চাকুরি করেছেন। তাদের সাথে রাজাকার-আলবদরদের সাথে পাকিস্তানের পক্ষে থাকা নিয়ে কোনো বিরোধ ছিল না, বরং ছিল মুক্তিযোদ্ধা বা মুজিব বাহিনী বা ভারতীয় বাহিনীর সাথে।

    ইতিহাসের সামান্য অ আ ক খ জ্ঞান ছাড়া কি ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক করতে আসা উচিত?

    Reply
    • M. Rana

      একজন মানুষ তার ভন্ডামীর সীমা ছাড়ায় যখন সে অসুস্থ হয়ে পড়ে —
      অন্য আরেক ধরনের ভন্ডামী হয়, যারা ক্রিমিনাল তারা জেনেশুনেই করে এবং একটা অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে। এখন পর্যন্ত সিম্পল গার্ল এর জবাব দেখে উনাকে পরেরটাই মনে হয়।
      প্রথমেই বলে নেই, আমি ইতিহাস নিয়ে জানি কোথাও বলিনি, বরঞ্চ জানিনা বলেই
      জানতে চেয়েছিলাম “” মুনির চৌধুরী-শহীদুল্লাহ কায়সার বা ডা. মুর্তজা “” রা কোথায় বলেছেন যে “১৯৭১ সালের যুদ্ধ হলো “দুই কুকুরের কামড়া-কামড়ি।”??
      তা না বলে বার বার একই জবাব দিয়ে যাচ্চেন যে “চীনপন্থী বামরা মুক্তিযুদ্ধকে …”
      এটাই যদি আপনার ফিলসফি হয় তাহলেতো সারা জাহানের মুসলমানকে ”আইএস আইএস বা আলকায়েদার” করা অপরাধের জন্য অপবাদ দেওয়া যায় কারন ”আইএস আইএস বা আলকায়েদা” রা নিজেদের মুসলমান বলে দাবী করে।
      কিন্তু নিকৃষ্ট জীবের চাইতেও নোংরা অমানবিক কাজ গুলো করে যাচ্ছে।
      তাই আমার মনে হয় কেউ এই রকম ভন্ডের (জনাব/জনাবা সিম্পল গার্ল) কমেন্ট গুলো পড়াটাই ভুল আবার আপরাধও!!!!

      সব শেষে সিম্পল গার্ল এর জন্য একটা মোক্ষম উপদেশ ( যদিও জান তা ছাই এর উপর পী করার মত ) ।
      বেশী বকর বকর করলেই যে জ্ঞ্যানী হ্য এমন নয়, সত্যি কথা সহজ ভাবে দু লাইন লিখলেই সিম্পল গার্ল এর হাজার পেইজ (হাজার হাজার কমেন্ট) এর চাইতেও বেশী মুল্যবান-
      সিম্পল গার্ল এর জন্যই বোধ হয় George Clooney বলেছিলেন
      ”You never really learn much from hearing yourself speak.”

      Reply
      • M. Rana

        জনাব/জনাবা সিম্পল গার্ল
        আহাম্মকির একটা সীমা থাকা উচিৎ–
        “”যুদ্ধের সেই উত্তাল দিনগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষা সবকিছু নিয়ে সুষ্ঠুভাবে পাকিস্তান সরকারের চাকুরি করেছেন। “” হ্যাঁ???
        সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালীর মাঝে ১.০ কোটি বাঙ্গালী ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল, তাহলে সাড়ে ছয় কোটি লোক দেশের ভীতরই ছিল হিসাবে দাঁড়ায় –।
        আপনার হিসাবে এরা সবাই তাহলে পাকিস্তানের সমর্থক ছিল? হ্যাঁ????
        জীবন ধারনের জন্য সবাই কেই কিছু না কিছু করতেই হয়েছিল – এই সুস্থ ভাবনা টা আপানার মনে এলোনা? হ্যাঁ???
        মুক্তি যোদ্দারা গেরিলা যুদ্ধ করেই দেশ স্বাধীনের পথ টাকে তরান্বিত করেছিল –
        এই মুক্তি যোদ্দারা দেশের ভীতর আশ্রয় দেবার জন্যই “”মুনির চৌধুরী-শহীদুল্লাহ কায়সার বা ডা. মুর্তজা ” র মত মহান লোকজন দেশে থেকে যান — এই ভাবাটাই সুস্থ মস্থিকের লক্ষন — তারও উপর এরা মুক্তি যুদ্ধ তথা মুক্তি যোদ্ধাদের সহায়তা করেছিল বলেই তো আপনাদের মত রাজাকার আলবদর, আলশামস রা উনাদের ধরে নিয়ে গিয়ে নিস্টুর ভাবে মেরেছিল – এই মারাটাই কি প্রমান করেনা উনারা মুক্তি যুদ্ধের পক্ষের ছিলেন এবং আমারা যারা সাধারন মুক্তি যুদ্ধের পক্ষের তার চাইতেও অনেক অনেক বেশী মুক্ত যুদ্ধকে সহায়তা করেছিলেন – তাই তাদের মারা হয়েছিল–
        ক্রিমিনাল মাথায় এসব না আসার বা না জানার কথা নয় !!!

  3. বিলকিছ আখতার

    মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অনেকটাই অালো-আঁধরির মধ্যে। একেক জনের লেখায় একেক রকম! আমরা যারা নতুন প্রজম্ম তারা আসলেই বুঝতে পারি না কোনটা সঠিক? তবে বুদ্ধিজীবী হত্যা যারাই করুক না কেন দেশ আসলে প্রকৃত মেধাবীদের হারিয়েছে।

    Reply
  4. সিম্পল গার্ল

    পান্না কায়সার জহির রায়হানের বড় ভাই পরলোকগত শহীদুল্লাহ কায়সারের স্ত্রী। বাংলা ১৩৯৯, ১০ জ্যৈষ্ঠ, ইং ১৯৯২ দৈনিক বাংলার বাণীতে তিনি একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। প্রবন্ধের শিরোনাম ছিল ‘কবিতা মিলনকে মিথ্যা সান্ত্বনা।’ এই নিবন্ধে তিনি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবু সাঈদ চৌধুরীর স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট সেলিম সম্পর্কে কিছু তথ্য দিয়েছেন। আলোচ্য নিবন্ধের এক স্থানে পান্না কায়সার বলেছেন, ‘৩০ জানুয়ারি জহির রায়হান একটি ফোন পেয়ে মিরপুর ছুটে গিয়েছিলেন। একথা বহুবার লেখা হয়েছে, বলা হয়েছে। কিন্তু বলা হয়নি সেলিমের কথা। সেলিমও নাকি সে রকমই একটি ফোন পেয়ে প্রেসিডেন্ট আবু সাঈদকে না বলেই জহির রায়হানের সঙ্গে মিরপুরে ছুটে গিয়েছিলেন। তারপর দু’জনের ভাগ্যে একই নিষ্ঠুর পরিণতি। দু’জনই নিখোঁজ। সেলিমের মা এ সংবাদ পেয়ে প্রেসিডেন্ট আবু সাঈদ চৌধুরীর কাছে ছুটে গিয়েছিলেন। সেলিম বঙ্গভবনের যে ঘরটিতে থাকতেন ইত্যবসরে সে ঘর থেকে সমস্ত কাগজপত্র, কাপড়-চোপড় উধাও। শহীদ সেলিমের মা অনেক কষ্ট করেও কোন রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি। রহস্য রহস্যই থেকে গেল। জহির রায়হান নিখোঁজ হবার পর বুদ্ধিজীবী হত্যার কোন রকম কাগজপত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি। কাগজগুলোর কোন হদিসই পাওয়া গেল না। পাওয়া গেলে হয়তো পরবর্তীতে তদন্ত কমিটির অন্য কেউ কাজে লাগাতে পারতেন। শহীদ সেলিমের মায়ের মতে, বঙ্গভবনের ওর ঘর থেকে যে প্রয়োজনীয় কাগজগুলো উধাও হয়েছিল সেগুলো সম্ভবত তদন্ত কমিটির গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রই হবে। খোদ বঙ্গভবন থেকে জিনিসপত্র উধাও হয়ে যাবে তা ভাবতেও বিশ্বাস হয় না। শহীদ সেলিম বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্তের কাজে সরাসরি জড়িত ছিলেন একথা আমি আগ থেকে জানতাম না। আমি ছাড়া আর কেউ জানে কিনা তাও জানি না। জহির রায়হান ও সেলিমের নিখোঁজ রহস্য এখন আমার কাছে আরো রহস্যজনক মনে হচ্ছে। বুদ্ধিজীবী হত্যার যেমন ১৯৭২ সালের গুরুত্বের সঙ্গে উদঘাটিত হয়নি, তেমনি জহির রায়হান নিখোঁজ রহস্যও গুরুত্বের সঙ্গে উদঘাটিত করার প্রয়োজনীয়তা কেউ অনুভব করেনি। অথচ এটা একটা গভীর ষড়যন্ত্র। যে ষড়যন্ত্রের বিষবৃক্ষের বীজ রোপণ হয়েছিল সেদিন।’
    পান্না কায়সার নিজেই বলেছেন যে, খোদ বঙ্গভবন থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র উধাও হয়ে যাবে সেটা ভাবনারও অতীত। জহির রায়হানের সাথে লেফটেন্যান্ট সেলিমও বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্তে সরাসরি জড়িত ছিলেন। এ সম্পর্কিত কাগজপত্র জহির রায়হান ও সেলিম উভয়ের কাছ থেকেই উধাও হয়ে গেছে। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রেসিডেন্টের ভবন থেকে কাগজপত্র উধাও করতে পারে কারা? রাজাকার বা পাকিস্তানপন্থীরা অবশ্যই নয়। এটা করা সম্ভব একমাত্র তাদের পক্ষে, যারা ক্ষমতার আশেপাশে ছিলেন।

    Reply
  5. সিম্পল গার্ল

    জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়া সম্পর্কে প্রখ্যাত সাংবাদিক নির্মল সেন উল্লেখ করেন- “স্বাধীনতার ৪০ বছর পরেও একটি প্রশ্নের জবাব আমি পাইনি। প্রশ্নটি হচ্ছে, জহির রায়হানের ব্যাপারে বিভিন্ন মহলের নিস্পৃহ আচরণ। একটি মানুষ যে এভাবে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল। কেউ যেন তার খোঁজ রাখল না। আমরা ঘাতক দালাল নির্মূলের কথা বলি, গণআদালত করে গোলাম আযমের ফাঁসি দাবি করি। অথচ জহির রায়হানের নামটি চলচ্চিত্র জগৎ ছাড়া আর কোথাও উচ্চারিত হয় না। কেন হয় না, সে প্রশ্নের জবাব দেয়ার মতো কেউ এদেশে নেই।
    সাম্প্রতিককালে জহির রায়হান নিরুদ্দেশ হওয়া নিয়ে নতুন তথ্য শোনা গেছে। বলা হয়েছে- পাকিস্তানি হানাদার বা অবাঙালিরা নয়, মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অংশই জহির রায়হানকে খুন করেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের এ অংশটির লক্ষ্য ছিল- বাংলাদেশকে স্বাধীন করা এবং সঙ্গে সঙ্গে বামপন্থী বুদ্ধিজীবীসহ সামগ্রিকভাবে বামপন্থী শক্তিকে নিঃশেষ করে দেয়া। এরা নাকি বামপন্থী বুদ্ধিজীবিদের হত্যার একটা তালিকা প্রণয়ন করেছিল। এদের ধারণা এ তালিকাটি জহির রায়হানের হাতে পড়েছিল। জহির রায়হানও জানত তার জীবন নিরাপদ নয়। তবুও সে ছিল ভাইয়ের শোকে মূহ্যমান। তাই শহীদুল্লাহ কায়সারের নাম শুনেই সে ছুটে গিয়েছিল মিরপুরে তারপর আর ফিরে আসেনি। এ মহলই তাকে ডেকে নিয়ে খুন করেছে।
    তাহলে কোনটি সত্য? জহির রায়হানকে কারা গুম করেছে? পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরা, আল বদর, আল শামস্, না রাজাকার? নাকি মুক্তিবাহিনীর একটি অংশ? স্পষ্ট করে বললে বলা যায়- মুক্তিবাহিনীর এ অংশটি মুজিব বাহিনী!
    ১৯৭১ সালে প্রবাসী স্বাধীন বাংলা সরকারের অজান্তে গড়ে ওঠা মুজিব বাহিনী সম্পর্কে অনেক পরস্পরবিরোধী তথ্য আছে। বিভিন্ন মহল থেকে বারবার বলা হয়েছে, এ বাহিনী গড়ে উঠেছিল ভারতের সামরিক বাহিনীর জেনারেল ওবান-এর নেতৃত্বে। এ বাহিনী নাকি মিজোরামে ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে মিজোদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। এদের নাকি দায়িত্ব ছিল- রাজাকার, শান্তি কমিটিসহ বাংলাদেশের সকল বামপন্থীদের নিঃশেষ করে ফেলা। মুজিব বাহিনী সম্পর্কে এ কথাগুলো বারবার লেখা হচ্ছে। কোনো মহল থেকেই এ বক্তব্যের প্রতিবাদ আসেনি। অথচ দেশে মুজিব বাহিনীর অনেক নেতা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে আছেন। তারা কোন ব্যাপারেই উচ্চবাচ্চ্য করছেন না। তাদের নীরবতা তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত বক্তব্যই প্রতিষ্ঠিত করছে এবং সর্বশেষ জহির রায়হানের নিখোঁজ হবার ব্যাপারেও মুজিব বাহিনীকেই দায়ী করা হচ্ছে।”
    — নির্মল সেন/আমার জবানবন্দি ॥ [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ – ফেব্রুয়ারি, ২০১২ । পৃ: ৪০৫-৪০৬ ]

    Reply
  6. সিম্পল গার্ল

    ১৯৯২ সালের ১ মে তারিখে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের একটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন শাহরিয়ার কবির। সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে সত্যজিত রায় শাহরিয়ার কবিরকে হঠাৎ করে জিজ্ঞেস করলেন,
    “-জহিরের ব্যাপারটা কিছু জেনেছো?
    -তাকে সরিয়ে ফেলার পেছনে ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। আমরা ব্যক্তিগতভাবে তদন্ত করে যা বুঝতে পেরেছি তাতে বলা যায়, ৩০ জানুয়ারি দুর্ঘটনায় তিনি হয়তো মারা যাননি। তারপরও দীর্ঘদিন তাঁকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন।
    -স্ট্রেঞ্জ! জহিরকে বাঁচিয়ে রাখার পেছনে কারণ কি?
    -সেটাই ষড়যন্ত্রের মূল সূত্র বলে ধরছি। মিরপুরে দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হলে গভীর ষড়যন্ত্র মনে করার কোনো কারণ ছিল না। আমি যতদূর জানি, বুদ্ধিজীবীদের হত্যার তদন্ত করতে গিয়ে তিনি এমন কিছু তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন যা অনেক রথী-মহারথীদের জন্যই বিপজ্জনক ছিল, সে জন্য তাঁকে সরিয়ে ফেলার প্রয়োজন ছিল।”
    শুধু তা-ই নয় শাহরিয়ার কবির আরেকটি গ্রন্থে জহির রায়হানের অন্তর্ধান সম্পর্কে বলেছিলেন– “৭১-এর ১৬ই ডিসেম্বর শহিদুল্লাহ কায়সারের মৃত্যুর সংবাদ শুনে জহির রায়হান একেবারেই ভেঙ্গে পড়েন।… বিভিন্ন জায়গায় ছোটাছুটি করে হানাদার বাহিনীর সহযোগী বহু চাঁই ব্যক্তির নাম সংগ্রহ করলেন। সাংবাদিক সম্মেলনে বললেন, তিনি শ্বেতপত্র প্রকাশ করবেন। বুদ্ধিজীবিদের হত্যার জন্য তিনি আওয়ামী নেতৃত্বকেও দায়ী করেন। মুজিবনগর সরকারের সকল গোপন তথ্য ফাঁস করে দেবেন বলেও ঘোষণা করেন। … তাঁর উপস্থিতি যাদের জন্য অস্বস্তিকর তারা এই পরিস্থিতির সুযোগ নেবে এটা খুব স্বাভাবিক। ৭২ এর ৩০শে জানুয়ারী মিরপুরে তাঁর অগ্রজকে (শহিদুল্লাহ কায়সার) খুঁজতে গিয়েছিলেন। তদন্ত করলে হয়ত জানা যেতো সেই অজ্ঞাত টেলিফোন কোত্থেকে এসেছিল, যেখানে তাঁকে বলা হয়েছিল শহিদুল্লাহ কায়সার মিরপুরে আছেন।
    … এটাও বিস্ময় যে তাঁর (জহির রায়হানের) অন্তর্ধান নিয়ে কোন তদন্ত হয়নি। কেন হয়নি অনুমান করতে অসুবিধে হয় না।” – শাহরিয়ার কবির
    তথ্যসূত্র : একুশে ফেব্রুয়ারী/জহির রায়হান (ভূমিকা : শাহরিয়ার কবির) ॥ [ পল্লব পাবলিশার্স – আগস্ট, ১৯৯২ । পৃ: ১৩-১৬ ]

    Reply
  7. সিম্পল গার্ল

    বাংলাদেশ স্বাধীন হলে ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর জহির রায়হান ঢাকায় ফিরে আসেন। ফিরে এসেই শুনলেন তাঁর অগ্রজ শহীদুল্লাহ কায়সার ১৪ ডিসেম্বর থেকে নিখোঁজ। আদর্শস্থানীয় বড় ভাইকে হারিয়ে তিনি পাগলের মত তাকে খুঁজতে থাকেন। তাঁর উদ্যোগে বেসরকারি বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডসহ অন্যান্য ঘটনার প্রচুর প্রমাণাদি তিনি সংগ্রহ করেন এবং সাংবাদিক সম্মেলনে ঘোষণা করেন যে, তার সংগৃহীত প্রমাণাদি প্রকাশ করলেই অনেকের কুকীর্তি ফাঁস হয়ে যাবে। স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে ভারতের মাটিতে আওয়ামী লীগের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কর্মকান্ড, বিভিন্ন হোটেলে বিলাসবহুল ও আমোদ-ফুর্তিময় জীবনযাপন, রাজনৈতিকভাবে প্রতিপক্ষ আওয়ামী আদর্শে বিশ্বাসহীন বাঙালিদের নির্মূল করার ষড়যন্ত্র প্রভৃতির প্রামাণ্য দলিল জহির রায়হান কলকাতা থাকাকালে সংগ্রহ করেছিলেন। বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারের নিখোঁজ ও বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের ঘটনাবলী তাকে বিচলিত করে।

    শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের সর্বময় ক্ষমতায় আসীন হওয়ার ১৫ দিন পর ১৯৭২ সালের ২৫ জানুয়ারি ঢাকা প্রেসক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলনে কৃতী চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান ঘোষণা দেন, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের পেছনে নীলনকশা উদ্‌ঘাটনসহ মুক্তিযুদ্ধের সময়ের অনেক গোপন ঘটনার নথিপত্র, প্রামাণ্য দলিল তার কাছে আছে, যা প্রকাশ করলে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের মন্ত্রিসভায় ঠাঁই নেয়া অনেক নেতার কুকীর্তি ফাঁস হয়ে পড়বে। আগামী ৩০ জানুয়ারি সন্ধ্যায় এই প্রেসক্লাবে ফিল্ম শো প্রমাণ করে দেবে কার কী চরিত্র ছিল।

    ১৯৭২ সালের ২৫ জানুয়ারি সাংবাদিক সম্মেলনের কয়েকদিন পর ৩০ জানুয়ারি রোববার সকালে রফিক নামের এক ব্যক্তির অজ্ঞাত টেলিফোন আসে জহির রায়হানের কায়েতটুলির বাসায়। রফিক ছিলেন জহিরের পূর্ব পরিচিত যিনি ইউসিসে চাকরি করতেন। প্রথমে ফোন ধরেছিলেন জহির রায়হানের ছোট বোন ডাক্তার সুরাইয়া যার কাছে জহিরকে খোঁজা হচ্ছিল। সুরাইয়া জহির রায়হানকে ডেকে ফোন ধরিয়ে দেয়। টেলিফোনে জহিরকে বলা হয়েছিল, আপনার বড়দা মিরপুর ১২ নম্বরে বন্দী আছেন। যদি বড়দাকে বাঁচাতে চান তাহলে এক্ষুণি মিরপুর চলে যান। একমাত্র আপনি গেলেই তাকে বাঁচাতে পারবেন। টেলিফোন পেয়ে জহির রায়হান দুটো গাড়ী নিয়ে মিরপুরে রওনা দেন। তাঁর সাথে ছিলেন ছোট ভাই মরহুম জাকারিয়া হাবিব, চাচাত ভাই শাহরিয়ার কবির, বাবুল (সুচন্দার ভাই), আব্দুল হক (পান্না কায়সারের ভাই), নিজাম ও পারভেজ। মিরপুর ২ নং সেকশনে পৌঁছার পর সেখানে অবস্থানরত ভারতীয় সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী (ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট) এবং পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে জহির রায়হানের টয়োটা গাড়িসহ (ঢাকা-ক-৯৭৭১) থাকতে বলে অন্যদের ফেরত পাঠিয়ে দেন। শাহরিয়ার কবির অন্যদের সাথে করে বাড়ী ফিরে আসেন। এভাবেই জহির চিরতরে হারিয়ে যায়। অথচ সেদিন বিকেলেই প্রেসক্লাবে তাঁর কাছে থাকা অনেক দুর্লভ তথ্যপ্রমাণ ফাঁস করার কথাছিল, যা ফাঁস হলে অনেকের মুখোশ উম্মোচিত হয়ে যেত যা আর কোনোদিন করা হলো না।

    ঠিক একই কথা জহির রায়হানের স্ত্রী সুচন্দাও বলেছিলেন নিউ ইয়র্কে দেয়া সাপ্তাহিক ঠিকানাতে। তিনি বলেছিলেন, কিছু না কিছু মনে তো হয়ই। আজ পর্যন্ত আমি এ বিষয়টি বলিনি এবং এখনো বলতে চাই না। যে বিষয়টি আড়ালে রয়ে গেছে, আমি তাকে মনের অন্তরালেই রাখতে চাই। কারণ সব কথা সব সময় বলা যায় না, বললে অনেক সময় বিপদ এসে যায়। যে বিপদটা জহিরের জীবনে এসেছিল। জহির বেঁচে থাকা অবস্থায় সর্বশেষ প্রেস ক্লাবে দাঁড়িয়ে এক বক্তব্যে বলেছিল ‘যারা এখন বড় বড় কথা বলেন, নিজেদের বড় বড় নেতা মনে করেন, তাদের কীর্তি কাহিনী, কলকাতায় কে কী করেছিল, তার ডকুমেন্ট আমার কাছে আছে। তাদের মুখোশ আমি খুলে দেবো।’ এ কথা জহির মুখ দিয়ে প্রকাশ্যে বলার পরই তার ওপর বিপদ নেমে আসে। এ বলাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল।
    ববিতা: (সুচন্দার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে) জহির ভাইকে বলা হলো যে, তোমার ভাই শহীদুল্লাহ কায়সার জীবিত আছে, মিরপুর ১১ নম্বর সেক্টরে চিলেকোঠার একটি বাড়িতে রাখা হয়েছে, তার দুটো চোখ উপড়ে ফেলা হয়েছে, তবে সে জীবিত আছে। তুমি যে তোমার ভাইকে উদ্ধার করতে যাচ্ছ, এটি তোমার মা, স্ত্রী ও আত্মীয়দের বলবে না।”

    জহির রায়হান নিখোঁজ হওয়ার মাস দেড়েক পর শহিদুল্লাহ কায়সার ও জহির রায়হানের বোন নাফিসা কবির, শহিদুল্লাহ কায়সারের স্ত্রী পান্না কায়সার, জহিরের ২য় স্ত্রী সুচন্দা সহ ১৯৭১ সালে নিহত বুদ্ধিজীবীদের পরিবারের অনেকে শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করতে গেলে শেখ মুজিবুর রহমান সবাইকে বাড়ির গেইটে অপেক্ষামান রাখেন। এক সময় শেখ মুজিবুর রহমান গেইটের সামনে এসে বিক্ষোভ ও দেখা করার কারণ জানতে চাইলে এক পর্যায়ে শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে নাফিসা কবিরের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়-
    মুজিব : অনেকে তো দালালী করে মরেছে।
    নাফিসা কবির : বুদ্ধিজীবীরা কেউ দালালী করে মরেনি। দালালী যারা করেছে তারা এখনও বেঁচে আছে। সে দালালদের বিচারের দাবী জানাতে এসেছি॥
    [ শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবার কল্যাণ পরিষদের পক্ষ থেকে শহীদুল্লাহ কায়সারের বোন এবং পরিবারের সদস্যদের সাথে শেখ মুজিবের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়কালে]
    [ সুত্র – মুক্তিযুদ্ধ: আগে ও পরে/পান্না কায়সার [আগামী প্রকাশনী – ফেব্রুয়ারী, ১৯৯১ । পৃ: ১৬৮]

    জহির রায়হানের প্রথম স্ত্রী প্রয়াত অভিনেত্রী সুমিতা দেবী এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, “জহির রায়হান নিখোঁজ এই নিয়ে পত্রপত্রিকায় বেশ লেখালেখিও হলো। একদিন বড়দি অর্থাৎ জহিরের বড় বোন নাসিমা কবিরকে ডেকে নিয়ে শেখ মুজিব বললেন, জহিরের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে এ রকম চিৎকার করলে তুমিও নিখোঁজ হয়ে যাবে। পরে নাসিমা আর কিছু বলেনি। টেলিফোন করেছিল যে রফিক, তাকে নিয়ে যখন পত্রপত্রিকায় লেখালেখি শুরু হলো। তখন তাকে নাগরিকত্ব দিয়ে পুরো পরিবারসহ আমেরিকায় পাঠিয়ে দেয়া হলো। এই ঘটনা জহিরের নিখোঁজ হওয়ার সম্পর্কে রফিকের ভূমিকাকে আরো সন্দেহযুক্ত করে তোলে আমার কাছে।” (সুত্র: দৈনিক আজকের কাগজ, ৮ ডিসেম্বর ১৯৯৩)

    দৈনিক আজকের কাগজ (৮ ডিসেম্বর ১৯৯৩) সংখ্যায় ‘জহির রায়হানের হত্যাকারী রফিক এখন কোথায়’ শীর্ষক প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে ‘রাহুর কবলে বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ গ্রন্থে সরকার সাহাবুদ্দিন আহমদ লিখেছেন, ‘আজকের কাগজের ৮ ডিসেম্বর ১৯৯৩ সংখ্যায় জহির রায়হানের হত্যাকারী রফিক এখন কোথায়’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, জহির রায়হান নিখোঁজ এই নিয়ে লেখালেখি হলে একদিন বড়দি অর্থাৎ জহির রায়হানের বড় বোন নাফিসা কবিরকে ডেকে নিয়ে শেখ মুজিব বললেন, জহিরের নিখোঁজ নিয়ে এ রকম চিৎকার করলে তুমিও নিখোঁজ হয়ে যাবে। কিন্তু এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে, জহির রায়হানের মতো একজন বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা স্বাধীনতার পর নিখোঁজ হয়েছে এটা নিয়ে চিৎকার হওয়াটাই স্বাভাবিক। জহির রায়হান তার বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে মিরপুরে খুঁজতে গিয়ে নিখোঁজ হন। সম্ভব তাকে হত্যা করা হয়েছিল। সুতরাং তার হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে তার আত্মীয়-স্বজন সোচ্চার হতেই পারেন। কিন্তু শেখ মুজিব কেন জহির রায়হানের বড় বোনকে ডেকে নিয়ে নিখোঁজ করে ফেলার হুমকি দিলেন। কি রহস্য ছিল এর পেছনে? তাহলে কি বুদ্ধিজীবী হত্যার ব্যাপারে শেখ মুজিব এমন কিছু জানতেন, যা প্রকাশ পেলে তার নিজের কিংবা আওয়ামী লীগের জন্য ক্ষতির কারণ হতো? আর কেনইবা তড়িঘড়ি করে জহির রায়হানের তথাকথিত হত্যাকারী রফিককে সপরিবারে আমেরিকা পাঠিয়ে দেয়া হলো? রফিক কে ছিলেন/ কি তার রাজনৈতিক পরিচয়? (সূত্র : সরকার সাহাবুদ্দিন আহমদ, রাহুর কবলে বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ঢাকা, পৃষ্ঠা-১০৮)
    ৯ আগস্ট ১৯৯৯ দৈনিক বাংলার বাণী পত্রিকায় প্রকাশিত হয় জহির রায়হানের মেজো সন্তান অনল রায়হানের অভিযোগ। তিনি অভিযোগ করেন, ‘জহির রায়হান নিখোঁজ হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকার এক ভুয়া তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলেন। এই কমিটি কোনো কাজ করেনি। মুক্তিযুদ্ধের প্যানপ্যানানি করে আওয়ামী লীগ সরকার আবার ক্ষমতায় এলো… মুজিব হত্যার বিচার হচ্ছে। এই হত্যাকান্ড ঘটেছে ১৯৭৫ সালে। এর আগে জহির রায়হানসহ অনেক বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়েছে। কই তাদের তো বিচার হলো না।’

    Reply
  8. সিম্পল গার্ল

    মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জহির রায়হান আগরতলা হয়ে কলকাতায় পৌঁছান। নিজেকে যুক্ত করেন মুক্তিযুদ্ধের প্রচার কাজ সংগঠিত করার কাজে নিজেকে যুক্ত করেন এবং পাকিস্থানের গণহত্যা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরার জন্য ‘স্টপ জেনোসাইড’ নামের একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করার উদ্যোগ নেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো যুদ্ধে শরণার্থী শিবিরে মানুষের দুর্দশার চিত্র, কলকাতায় পালিয়ে যাওয়া বড় বড় নেতাদের আরাম আয়েশের চিত্র তুলতে গিয়ে জহির রায়হান মুজিব নগর সরকারের রোষানলে পড়েছিলেন। সাধারণ মানুষদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার অমানুষিক পরিশ্রমের অনেক চিত্র তিনি জীবন বাজি রেখে ধারণ করেছিলেন। ‘স্টপ জেনোসাইড’ প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করার সময় ও মুক্তির দেয়ার সময় কলকাতায় আওয়ামী লীগ নেতারা বারবার জহির রায়হানকে বাধাগ্রস্থ করেছিলেন যে সম্পর্কে জহিরের চাচাতো ভাই শাহরিয়ার কবির বলেন – “তিনি (জহির রায়হান) যুদ্ধে যোগ দেয়ার জন্যই ঢাকা ছেড়ে আগরতলা এবং পরে কলকাতা চলে যান।কলকাতায় তিনি প্রচার কাজ সংগঠিত করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেন। এই কাজ করতে গিয়ে তিনি প্রবাসী আওয়ামী লীগ সরকারের রোষানলে পতিত হন এবং তাঁকে বিভিন্নভাবে নিগৃহীত হতে হয়।
    ‘স্টপ জেনোসাইড’ ছবিটি নির্মাণের সময় আওয়ামী লীগের নেতারা তাঁকে নানাভাবে বাধা দিয়েছে। বিভিন্ন সেক্টরে শুটিং করতে দেয়নি, এমনকি কোন কোন সেক্টরে তাঁর গমন পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছিল।… আওয়ামী লীগের নেতারা ছবি দেখে ছাড়পত্র না দেয়ার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সেন্সর বোর্ডকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন।” তথ্যসূত্র : একুশে ফেব্রুয়ারী/জহির রায়হান (ভূমিকা : শাহরিয়ার কবির) ॥ [ পল্লব পাবলিশার্স – আগস্ট, ১৯৯২ । পৃ: ১৩-১৬ ]

    ‘স্টপ জেনোসাইড’ মুক্তি দেয়ার প্রতিবাদে ১০ই সেপ্টেম্বর ১৯৭১ সালে কলকাতায় বসবাসরত আওয়ামী সমর্থিত বুদ্ধিজীবী ও ‘সন অব পাকিস্থান’ চলচ্চিত্রের পরিচালক ফজলুল হক [চ্যানেল আইয়ের ফরিদুর রেজা সাগর ও কেকা ফেরদৌসীর বাবা] অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের কাছে একটি চিঠি লেখেন যেখানে প্রামাণ্য চিত্রটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে/বন্ধের ব্যাপারে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। [সম্পূর্ণ চিঠিটা ছাপা আছে – বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস ও দলিলপত্র (৩য় খণ্ড, পাতা ১২৭-১২৮), তথ্য মন্ত্রণালয়, গনপ্রজাতন্তী বাংলাদেশ সরকার। প্রথম প্রকাশ – নভেম্বর ১৯৮২।]

    Reply
  9. M. Rana

    সিম্পল গার্লকে বলছি–
    নিছের অংশে যা লিখা আছে আপানার কমেন্টে তার রেফারেন্স দিন
    “মুনির চৌধুরী-শহীদুল্লাহ কায়সাররা চীনপন্থী কমিউনিস্ট ছিলেন।
    তাঁরা ১৯৭১ সালের যুদ্ধকে বলতেন, “দুই কুকুরের কামড়া-কামড়ি।”

    আর না দিতে পারলে এটা একটা অপরাধ বোঝার জ্ঞ্যান আবশ্যই আছে…

    Reply
    • সিম্পল গার্ল

      আপনি নিজ চেষ্টায় খবর নিন এবং জেনে বলুন ওই সময় চীনপন্থী বামরা মুক্তিযুদ্ধকে কি বলত এবং মুনির চৌধুরী-শহিদুল্লাহ কায়সারসহ যারা ১৪ ডিসেম্বর নিহত হয়েছিলেন তারা কোন পন্থী ছিলেন? সেই সাথে জানার চেষ্টা করুন তাদের কোথা থেকে তুলে নেয়া হয়েছিল, লুকিয়ে থাকা কোন স্থান থেকে না সরকারী বা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়া বাসা থেকে। আরো জানার চেষ্ঠা করুন, তারা ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসের বেতন ইয়াহিয়া থেকে নিয়েছিল কি না। আরো জানুন, তারা নিয়মিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস-পরীক্ষা নিতো কি না। আরো জানুন তাদের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে হুমকি দেয়া হতো কি না। এরপর বেশকিছু সুত্র উপরে উল্লেখ করেছি জহির রায়হানের ব্যাপারে।

      Reply
      • M. Rana

        সিম্পল গার্ল
        ভন্ডামী বন্দ করুন, আপনার ভন্ডামী শুদু মাত্র একটা ভন্ডামী বলেই শেষ হবার ভন্ডামী নয়। জাতি কে দোষীত পথে টেনে নামানোর বিষ।
        কেউ যদি বলে আপনি একজন জারজ সন্তান তাহলে তা প্রমান করার দায়িত্ব আপনার নয় যে বলেছে তার, এটা তো মানবেন?
        তাই বলছি যখন বলেছেন
        “মুনির চৌধুরী-শহীদুল্লাহ কায়সাররা চীনপন্থী কমিউনিস্ট ছিলেন।
        তাঁরা ১৯৭১ সালের যুদ্ধকে বলতেন, “দুই কুকুরের কামড়া-কামড়ি।”
        তার প্রমানের দায়িত্ব আপনার।
        না পারলে বোল্ড লেটারে ক্ষমা চান পাঠকদের কাছে – তারসাথে ভন্ডামীও বন্দ করুন।

  10. Fazlul Haq

    তথ্য উপাত্তহীন রাজাকারি-প্রতিক্রিয়া প্রকাশ না করাই ভালো।

    Reply
  11. অতনু

    অনেক অজানা কথা জানতে পারলাম। ধন্যবাদ সহুল আহমেদ। এরকম আরও লেখা চাই।

    Reply
  12. abul ala

    Couple of months back Maj. Gen Ibrahim BP wrote an column in Naya Diganta regarding Zahir Raihan. He mentioned that Zahir accompanied him in an operation to flush mirpur. Zahir was killed by Biharis, and his dead body was taken by biharis..

    Reply
  13. সিম্পল গার্ল

    মুক্তিযুদ্ধকালীন ভারতে রাজার হালে থাকা, বিশাল আকারে ছেলের জন্মদিন পালন করা, বারের সব মদ একসাথে কিনে নেয়া ইত্যাদি কাজের মাধ্যমে “মুক্তিযুদ্ধরত” আওয়ামী নেতাদের ডকুমেন্টারি তৈরি ও জহির রায়হানের নেতৃত্বে ১৪ ডিসেম্বর চীনপন্থী বুদ্ধিজীবিদের (যারা কেউই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পাকিস্তান সরকারের চাকরি করেছেন, যাদের সাথে পাকিস্তানপন্থীদের কোনো বিরোধ ছিল না) হত্যাকাণ্ডের তদন্তে তৎকালীন মুজিব বাহিনীর সরাসরি সংশ্লিষ্টতা পাওয়া এবং তা প্রকাশের হুমকি দেয়ার কারণেই বাস্তবে জহির রায়হানকে হত্যা করা হয়েছিল বলে মনে হয়। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি সে জন্যেই পরিকল্পিতভাবে তাঁকে বিহারি অধ্যুষিত এলাকায় বিনা কারণে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরিস্থিতির শিকার করে খুন করা হয়। সাথে সাথে জহির রায়হানের করা বুদ্ধিজীবী তদন্ত রিপোর্ট গুম করে ফেলা হয় এবং তাঁর পরিবারকে জহির রায়হান হত্যাকাণ্ড নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার হুমকিও দেয়া হয়। তাই রাজাকার-আলবদরা জহির রায়হানকে হত্যা করেছে মর্মে যা বলা হয় তা আসলে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত অপরাধীদের এখনও লুকিয়ে রাখার জন্যেই বলা হয়।

    Reply
    • Shakil

      “মুক্তিযুদ্ধকালীন ভারতে রাজার হালে থাকা, বিশাল আকারে ছেলের জন্মদিন পালন করা, বারের সব মদ একসাথে কিনে নেয়া ইত্যাদি কাজের মাধ্যমে “মুক্তিযুদ্ধরত” আওয়ামী নেতাদের ডকুমেন্টারি তৈরি …”
      — সিম্পল গার্ল, আপনার এইসব আজগুবি টাইপ কথাবার্তার বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ হাজির করেন। এইসব পুরানা প্যাঁচাল…

      “… চীনপন্থী বুদ্ধিজীবিদের (যারা কেউই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পাকিস্তান সরকারের চাকরি করেছেন, যাদের সাথে পাকিস্তানপন্থীদের কোনো বিরোধ ছিল না) হত্যাকাণ্ডের তদন্তে তৎকালীন মুজিব বাহিনীর সরাসরি সংশ্লিষ্টতা পাওয়া..”
      — এই চীনাপন্থী শহীদ বুদ্ধিজীবি কারা, তাদের তালিকাটা একটু দিন তো!

      ” ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি সে জন্যেই পরিকল্পিতভাবে তাঁকে বিহারি অধ্যুষিত এলাকায় বিনা কারণে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরিস্থিতির শিকার করে খুন করা হয়।”
      — মাশাল্লাহ, আপনার উচিত খুব শীগগীরই ফিকশান গল্প, নাটক, চলচ্চিত্র লেখাতে হাত দেয়া। বাংলাদেশের জন্য সেইটা খুব বড় কাজ হবে, এন্শাল্লাহ্।

      আর একখানা কথা, ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ ট্রাইবুনালরে আপনার অভিযোগ পেশ করেন, কাজে দিবে।

      “সাথে সাথে জহির রায়হানের করা বুদ্ধিজীবী তদন্ত রিপোর্ট গুম করে ফেলা হয় এবং তাঁর পরিবারকে জহির রায়হান হত্যাকাণ্ড নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার হুমকিও দেয়া হয়।”
      জহির রায়হানের কোন পরিবারকে তাঁর হত্যাকান্ড নিয়া বাড়াবাড়ি না করার জন্য কওয়া হইছিল। কইনচেন দেহি! পারলে কইলাম ১০ শে ১২ পাবেন।

      আরেকখান কথা, বুদ্ধিজীবী তদন্ত রিপোর্ট গুম করা হলো, আপনার চোখের সামনে?

      Reply
      • সিম্পল গার্ল

        মুনির চৌধুরী, জহির রায়হানের ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারসহ যাঁদের ১৪ ডিসেম্বর হত্যা করা হয়েছে তাঁদের কোথা থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল? নিজের বা সরকারী বাসা থেকে তো না কি? উনারাসহ ঢাবির যেসব অধ্যাপককে হত্যা করা হয়েছিল তাঁরা সবাই নিয়মিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস নিতেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া বাসায় থাকতেন, নভেম্বর ১৯৭১ সালের বেতন পর্যন্ত নিয়েছেন তা কি জানেন? বাংলাদেশের স্বাধীনতাপন্থী যারা ছিল তারা সবাই পালিয়ে গিয়ে হয়তো গ্রামে লুকিয়ে ছিলেন বা ভারতে চলে গিয়েছেন আর উনারা সবাই নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষা নিয়েছেন বা সরকারী চাকুরী করেছেন। উনাদের যারা জানেন তারা সবাই জানেন, মুনির চৌধুরী-শহীদুল্লাহ কায়সাররা চীনপন্থী কমিউনিস্ট ছিলেন।
        তাঁরা ১৯৭১ সালের যুদ্ধকে বলতেন, “দুই কুকুরের কামড়া-কামড়ি”। সে কারণে তাঁরা কেউই যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করে বরং সরকারী চাকুরি করে গিয়েছেন, নিজের বাসায় থেকেছেন, বেতনভাতা নিয়েছেন। মুনির চৌধুরীর ভাই কবির চৌধুরী ১৯৭১ সালে ইয়াহিয়া খানের চাকুরি করেছেন। তাদের আরেক ভাই পাকিস্তান আর্মির তৎকালীন কর্ণেল কাইয়ুম চৌধুরী ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে এখানে যুদ্ধ করেছেন এবং এমনভাবে বাংলাদেশকে ঘৃণা করতেন যে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশে ফিরে না এসে পাকিস্তানেই থেকে গিয়েছিলেন! এসব তথ্য কি আপনাদের জানা আছে?
        যেসব চীনপন্থী কমিউনিস্ট ১৯৭১ সালে ঢাবিতে ক্লাস-পরীক্ষা নিয়েছিলেন তাঁদের নাম উল্লেখ করে কোলকাতা থেকে পরিচালিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে নিয়মিত নাম উল্লেখ করে হত্যার হুমকি দেওয়া হতো তা কি জানেন?
        এসব কিছু মিলিয়ে দেখুন কারা কাকে হত্যা করতে পারে এবং করেছে। আরো তথ্য লাগলে দেওয়া যাবে।

    • sultan89

      ১৯৭১ ও পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য বিহারী যুদ্ধাপরাধীদের চিহ্নিত করে তাদের বিচারের আওতায় আনা হয়েছে কি? কিংবা বিহারীদের কি আদৌ যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচারের আওয়ায় আনা হবে? আদৌ এর কোন সদুত্তর পাইনি। রাজাকার, আলবদর, আল শামসসহ দোষী বিহারীদের যুদ্ধাপরাধের বিচার চাওয়া কি খুব অনৈতিক চাওয়া?

      আরো লেখা এ বিষয়ে
      জানুয়ারি ১৯৭২: জহির রায়হানকে খুঁজতে গিয়ে শহীদ হন আলীম
      http://www.banglatribune.com/national/news/70803

      জহির রায়হান সেখানে গিয়েছিলেন তাঁর ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারের সন্ধানে, সেনা সদস্যদের সহগামী হয়ে। মিরপুরে লুকিয়ে থাকা পাকিস্তানি সেনা ও বিহারিদের আক্রমণে এইদিন শুধু জহির রায়হান নয়, লে. সেলিম, নায়েব সুবেদার আবদুল মুমিনসহ দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৪০ জন সেনা নিহত হন এবং তাদের দেহাবশেষ কোনওদিনই খুঁজে পাওয়া যায় নাই।
      http://www.banglatribune.com/national/news/73697

      Reply
    • M. Rana

      আমার কাছে অতীব বিস্ময়কর যে কমেন্টগুলো যাচাই না করেই ছাড়া হচ্ছে!
      উপরের কমেন্টাতে যে পয়েন্টগুলো তোলা হয়েছে তার সবগুলোরই রেফারেন্স দরকার। তা ব্যাতিত এই সব কমেন্ট প্রকাশ হতে দেওয়াটা মনে করিয়ে দেয় ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সন পর্যন্ত যেই সব প্রপাগান্ডা চালিয়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পথ তৈরি করেছিল তার পদশব্দ পুনরায় শোনার মত!

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—