৬ অাগস্ট ১৯৪৫। যুক্তরাষ্ট্রের বি-২৯ যুদ্ধবিমান থেকে জাপানের স্থানীয় সময় সকাল ৮:১৫ মিনিটে হিরোশিমায় ফেলা হল আণবিক বোমা। লম্বায় ১০ ফুট আর চওড়ায় ২৮ ইঞ্চি ছিল সেটি, নাম ‘লিটল বয়’। মাটি স্পর্শ করার পরমুহূর্তেই শহরটির ৯০ শতাংশ জায়গা নিশ্চিহ্ন; বেঘোরে মারা গেল ৮০ হাজার মানুষ। এর ঠিক তিনদিন পর দ্বিতীয় আণবিক বোমা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র, যার পোশাকি নাম ‘ফ্যাট ম্যান’। এর লক্ষ্যস্থল ছিল ভিন্ন আরেক জাপানি শহর, নাগাসাকি। সেখানে বোমাটি কেড়ে নিল ৪০ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণ। এ দুই বোমার রেডিয়েশন (তেজস্ক্রিয়তা) বিষক্রিয়ায় ধুকে ধুকে তীব্র যন্ত্রনায় মারা গেল লক্ষাধিক নিরাপরাধ মানুষ।

এর মাত্র কয়েকদিন পর– ১৫ অাগস্ট– জাপানের সম্রাট হিরোহিতো নিঃশর্তভাবে যুদ্ধে পরাজয় মেনে নিলেন। আর এভাবেই শেষ হল ১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত চলা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।

বিজ্ঞানীরাই মূলত পারমাণবিক অস্ত্রের উদ্ভাবনে উদ্যোক্তার ভূমিকা নিয়েছিলেন। ত্রিশের দশকের গোড়ার দিকেই বৈজ্ঞানিক গবেষণার নিভৃত জগতে রাজনীতির অনুপ্রবেশ ঘটে। রাজনীতির দুয়ারে পারমাণবিক বিজ্ঞানের করাঘাতও শোনা যায় সে সময়েই।

১৯৩২ সালে জেমস চ্যাডউইক ‘নিউট্রন’ আবিস্কার করেন। পরমাণু চূর্ণ করার চাবিকাঠি হচ্ছে এই নিউট্রন। পরবর্তীতে বিখ্যাত পদার্থ বিজ্ঞানী জুলিও কুরি মন্তব্য করেছিলেন, ‘‘বিজ্ঞানীরা পরমাণুর রূপান্তর ঘটিয়ে ইচ্ছামতো উপাদান নির্মাণ ও ধ্বংস করতে পারবেন।’’

তাঁর এই চাঞ্চল্যকর ভবিষ্যদ্বাণীতে তখন তেমন আলোড়ন সৃষ্টি হয়নি। মাত্র একজন গবেষকই নিউট্রন আবিষ্কারের বৈজ্ঞানিক তথ্য থেকে বেশ কিছু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে উপনীত হন। তিনি হলেন লিও সাইলার্ড।

তখন হিটলারের আগ্রাসনে সারা বিশ্ব চিন্তিত। কী রাষ্ট্রনায়ক, কী সাধারণ মানুষ; হিটলারের তাণ্ডব থেকে বাদ যায়নি কেউই; এমনকি বিজ্ঞানীরাও তাঁর রোষানলের শিকার হন। জার্মান দখলকৃত রাষ্ট্রের বিজ্ঞানীদের ওপর হিটলার বাহিনীর নজরদারি, সন্দেহ এবং সংশয় সব মিলিয়ে অনেকেই বাধ্য হন নিরাপদ আশ্রয় ও কাজের খোঁজে স্বদেশ ছাড়তে।

জিলার্ড তখন জার্মান ছেড়ে ব্রিটেন যান। ১৯৩৩ সালে লন্ডনে থাকাকালীন তিনি নিউক্লিয়ার চেইন রি-এ্যাকশন বা শৃঙ্খল বিক্রিয়া ধারণাটি সম্পর্কে নিশ্চিত হন। আর এটির মাধ্যমেই যে ‘নিউট্রন’ উৎপাদন সম্ভব সে সম্পর্কেও নিশ্চিত হন। জার্মানির বোমা তৈরির আশঙ্কায় তখন বিষয়টি তিনি গোপন রেখেছিলেন।

Albert Einstein and Leo Szilard
লিও জিলার্ডের চিঠিতে স্বাক্ষর করেন আইনস্টাইন, পরে এ রকম একটি ‘ডাকবাক্সে’র ভূমিকা পালন করার জন্য তাঁর অনুতাপের অন্ত ছিল না

সে সময় অনেক প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানী শরণার্থী হয়ে আমেরিকায় আশ্রয় নেন। তাদের মধ্যে ছিলেন আইনস্টাইন, ফার্মি, মেটনার, নিলস বোর, অটোফ্রিজ, টেলারসহ আরও অনেকে। সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাগারগুলো তাদের মেধা বিকাশের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

নিউট্রন আবিষ্কারের পূর্ণ তাৎপর্য অনুধাবন করতে পদার্থ বিজ্ঞানীদের লেগেছিল আরও সাতটি বছর। জেমস চ্যাডউইক, এনরিকো ফার্মি, আইডা নোডাক, অটোহান, স্ট্রাসম্যান, লিজে মেটনার, অটো ফ্রিজ, জুলিও কুরি প্রমুখ বিজ্ঞানীরা পরমাণু গবেষণাকে বিভাজন পর্যায়ে এগিয়ে নিয়ে যান।

ইতোমধ্যে জিলার্ড ব্রিটেন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। সেখানে নিজেই আবার পরীক্ষা করে নিশ্চিত হন যে পরমাণু বিভাজনের মাধ্যমে অতিরিক্ত নিউট্রনের মুক্তিলাভ সম্ভব। তিনি ভাবলেন ইউরোপেও অনুরূপ নিরীক্ষার কাজ চলতে পারে। তাঁকে ভবিষ্যতের পারমাণবিক অস্ত্রনির্মাণ প্রতিযোগিতার সম্ভাবনা ভাবিয়ে তুলল। তাঁর ভাবনার শরিক হলেন প্রথিতযশা বিজ্ঞানী উইগনার, টেলর ও ওয়েইসকফ। তাঁরা ভাবতে শুরু করলেন, হিটলার কীভাবে পৃথিবীর সবগুলো বৃহৎ শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করার সাহস দেখান; নিশ্চয়ই তাঁর গোপন কোনো শক্তির উৎস আছে– হতে পারে পারমাণবিক বোমাই সেই তূণের মোক্ষম বাণ।

জার্মানি যেন আগে পারমাণবিক বোমার অধিকারী হতে না পারে, জিলার্ডের এই স্লোগান ক্রমে ব্যাপক সমর্থন লাভ করে। মার্কিন পদার্থ বিজ্ঞানীরা গোপনসূত্র থেকে আরো জানতে পারেন যে, জার্মানরা ‘ইউরেনিয়ামে শৃঙ্খল-বিক্রিয়ার সম্ভাবনা’ নিয়ে বেশ তৎপর হয়ে উঠেছে। বেলজিয়াম তখন আকরিক ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ দেশ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর তখনও ইউরেনিয়ামের সামরিক তাৎপর্য সম্পর্কে অবহিত ছিল না।

জিলার্ড ভাবলেন, হিটলারের কবল থেকে বেলজিয়ামের ইউরেনিয়াম সম্পদ রক্ষা করার আশু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। ঘটনাচক্রে আইনস্টাইন ছিলেন বেলজিয়ামের রানি ইলিসাবেথের আন্তর্জাতিক বুদ্ধিজীবী ও সাঙ্গীতিক বন্ধুচক্রের অন্যতম সদস্য। কাজেই তাঁর মাধ্যমে ব্রাসেলস সরকারকে আগাম সতর্ক করে দেওয়া যেতে পারে।

আইনস্টাইন তখন থাকতেন প্রিন্সটনে; জিলার্ডের ঘনিষ্ঠ সহযোগী উইগনারও ছিলেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাঁকে নিয়ে জিলার্ড তখন আইনস্টাইনের দারস্থ হলেন। আইনস্টাইন ওই সময়ে (১৯৩৯ সালের জুলাই) ইউরেনিয়াম শৃঙ্খল-বিক্রিয়ার সম্ভাবনার কথা ভাবেননি। কিন্তু তাঁদের মুখে ঘটনা শোনা মাত্রই তিনি এর তাৎপর্য ও পরিণাম বুঝতে পারলেন এবং এ প্রশ্নে তাদের সব ধরনের সাহায্য করবেন বলে সম্মতি দেন।

আইনস্টাইনের সম্মতি আদায় করার পর সাইলার্ড পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ ধরে পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়ে মার্কিন সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণে অনেক চেষ্টা করেন। অবশেষে কয়েকজন বন্ধুর সূত্র ধরে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের কাছের একজনের খোঁজ পান। তিনি হলেন আন্তর্জাতিক ব্যাংকার ও সুপণ্ডিত আলেকজান্ডার সাক্স। তিনি জিলার্ডের বক্তব্য শোনার পর তাঁকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসেন। তিনি জিলার্ডকে জানান, পারমাণবিক গবেষণার ব্যাপারে আইনস্টাইনের সরাসরি প্রেসিডেন্টের কাছে লেখা উচিত। যদি তিনি এরকম কোনো চিঠি লেখেন, তাহলে সাক্স ব্যক্তিগতভাবে সেটি রুজভেল্টের কাছে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

জুলাইয়ের শেষ দিনটিতে জিলার্ড আবার দেখা করেন আইনস্টাইনের সঙ্গে। এ যাত্রায় তাঁর সঙ্গী হন তরুণ হাঙ্গেরিয়ান এডওয়ার্ড টেলর। এ সময়েই মার্কিন প্রেসিডেন্টের উদ্দেশ্যে একটি চিঠি লেখা হয়। চিঠিতে মূলত দুটি বিষয়ের ওপর প্রাধান্য দেওয়া হয়। প্রথমত, জার্মান পারমাণবিক বোমার সম্ভাব্য অতর্কিত হামলার বিরুদ্ধে সতর্কতামূলক ব্যবস্থারূপে ইউরেনিয়াম সমস্যাটির প্রতি মার্কিন সরকারের গুরুত্ব দেওয়া; দ্বিতীয়ত, পারমাণবিক গবেষণা প্রকল্প গ্রহণে মার্কিন সরকারের উদ্যোগ নেওয়া এবং এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় অনুদানের ব্যবস্থা করা।

 

manhattan project - 222
ইতিহাসের নিকৃষ্টতম সেই ম্যানহাটান প্রকল্পে প্রায় এক লাখের বেশি বিজ্ঞানী যুক্ত হন, উদ্দেশ্য তাদের অভিন্ন– পারমাণবিক বোমা তৈরি

 

আইনস্টাইন চিঠিটিতে স্বাক্ষর করেন। পরে এ রকম একটি ‘ডাকবাক্সে’র ভূমিকা পালন করার জন্য আইনস্টাইনের অনুতাপের অন্ত ছিল না। আর এভাবেই ক্ষণজন্মা এই মানুষটি নিজের অজান্তেই দিয়েছিলেন ইতিহাসের ভয়াবহতম মারণাস্ত্র নির্মাণের প্রথম সবুজ সংকেত।

সাক্স অক্টোবর মাসে সেই চিঠি ও সাইলার্ডের একটি স্মারকলিপি প্রেসিডেন্টকে দেন। এরপর রুজভেল্ট তাঁর সামরিক অ্যাটাশে জেনারেল এডউইন ‘পা’ ওয়াটসনকে ডেকে কাগজগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে যে নির্দেশ দেন, তা এখন একটি ঐতিহাসিক উক্তিতে পরিণত হয়েছে: This requires action– আর এভাবেই শুরু হয় ম্যানহাটান প্রকল্পের কাজ।

ইতিহাসের নিকৃষ্টতম সেই ম্যানহাটান প্রকল্পে প্রায় এক লাখের বেশি বিজ্ঞানী যুক্ত হন। উদ্দেশ্য তাদের অভিন্ন– পারমাণবিক বোমা তৈরি করা। জেনারেল লেসলি গ্রোভসকে প্রকল্পের প্রশাসনিক দায়িত্বে নিয়োজিত করা হয়।

১৯৪৩ সালের জুলাই মাসে রবার্ট ওপেনহাইমার লস আলামোসের গবেষণাগারের পরিচালক নিযুক্ত হন। নিউ মেক্সিকোর নির্জন পাহাড়ি এলাকা, লস আলামোসে কেন্দ্রীয়ভাবে প্রকল্পের কাজ চলে।

ম্যানহাটান প্রকল্পে দুর্ভেদ্য সামরিক গোপনীয়তার প্রাচীর নির্মাণ করা হয়। এক শাখার লোক অন্য শাখায় কী হচ্ছে তা জানতে পারত না। মজার ব্যাপার হল, যাঁর চিঠিতে পারমাণবিক মহাযজ্ঞের শুরু হয়, সেই আইনস্টাইনকেই নিরাপত্তার প্রশ্নে সামরিক গোয়েন্দা বিভাগ পারমাণবিক প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করতে অস্বীকৃতি জানায়। এমনকি প্রকল্পের অন্যান্য বিজ্ঞানীদেরও তাঁর সঙ্গে কোনো বিষয় নিয়ে আলাপ করার ওপরও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়।

১৯৪৩-৪৪ সালেই মার্কিন প্রশাসন নিশ্চিত নিশ্চিত হন যে, জার্মানদের হাতে কোনো অ্যাটম বোমা নেই। খবরটির গোপনীয়তা থাকলেও তা মিত্রপক্ষীয় গবেষণাগারে কর্মরত বিজ্ঞানীরা জেনে যান। এ রকম অবস্থায় বিজ্ঞানীদের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন কেমন ছিল তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে বাস্তবতা হল যে, তাঁরা ভাবতে শুরু করলেন, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও আবিষ্কার যতই ভয়ংকর হোক না কেন, সেটি প্রত্যাহার বা অর্ধসমাপ্ত রাখা বিজ্ঞানের চিরায়ত আদর্শের পরিপন্থী।

তাছাড়া এ রকম অস্ত্র নির্মাণ অন্য কোনো ‘অবিবেকী’ শক্তিও নির্মাণ করতে পারে। তাই মানুষকে এর প্রকৃতি সম্পর্কে জানাতে হবে। তাহলে ভবিষ্যতের বিশ্বশান্তির জন্য তা কল্যাণকর হবে। প্রখ্যাত পদার্থবিদ নীলস বোর ছিলেন এই যুক্তির পক্ষের অন্যতম ব্যক্তি!

Oppenheimer - 111
ওপেনহাইমার নামক একজন নশ্বর দেহধারী মানুষের হাতেই কি না ন্যস্ত হয়েছিল বিপুল ধ্বংসশক্তির অধিকারী নতুন এই অস্ত্র

১৯৪৫ সালের গোড়ার দিকেই কয়েকটি বোমা তৈরির সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। তখন জেনারেল গ্রোভস চিফ অব স্টাফ জেনারেল জর্জ মার্শালকে লিখিত এক প্রতিবেদনে যুদ্ধে বোমার প্রয়োগের জন্য পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য অনুরোধ জানান। অতি দ্রুতই চলতে থাকে বোমার প্রথম লক্ষ্যস্থল নির্ধারণের কাজ। জুলাইয়ের শেষে জাপানের কয়েকটি শহরের তালিকা করা হয়। সেগুলো হল হিরোশিমা, ককুরা, নিগাতা ও নাগাসাকি। এর আগে যুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী (বর্তমানে মন্ত্রিসভায় এ পদটি নেই) হেনরি এল স্টিমসন সাংস্কৃতিক গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে জাপানের প্রাচীন রাজধানী ও মন্দিরের শহর কিওতোকে প্রাথমিক তালিকা থেকে বাদ দেন।

এবারের দৃশ্যপটে আবার হাজির পারমাণবিক বোমা নির্মাণ প্রচেষ্টার প্রধান উদ্যোক্তা লিও জিলার্ড। ছেড়ে দেওয়া দৈত্যকে আবার বোতলে বন্দি করার জন্য চেষ্টা শুরু করেন তিনি। ১৯৩৯ সালে জিলার্ড আইনস্টাইনের সঙ্গে দেখা করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রকে একটি নিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে পারমাণবিক বোমা নির্মাণে উদ্বুদ্ধ করতে। আর প্রায় পাঁচ বছর পরে সেই তাঁকেই আবার ছুটতে হল আইনস্টাইনের কাছে সম্পূর্ণ বিপরীত এক উদ্দেশ্যে– যুক্তরাষ্ট্রকে পারমাণবিক বোমা ব্যবহারে নিবৃত্ত করতে।

পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে আইনস্টাইন তখন সতর্কবাণী উচ্চারণ করে রুজভেল্টের কাছে চিঠি লিখলেন। সঙ্গে একটি স্মারকলিপি যোগ করলেন জিলার্ড। কিন্তু ১৯৪৫ সালের ১২ এপ্রিল রুজভেল্টের আকষ্মিক মৃত্যুর কারণে সে চিঠির কোনো ফয়সালা হয় না।

রুজভেল্টের মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসেন ট্রুম্যান। সমর সচিব স্টিমসন তাঁকে পারমাণবিক বোমার ব্যবহার ও পরবর্তী বোমা নির্মাণের প্রকল্প সম্পর্কে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের অনুরোধ করেন। অচিরেই আট সদস্যের একটি অন্তবর্তীকালীন কমিটি হল। ওই কমিটি নতুন প্রেসিডেন্টের কাছে যে সুপারিশ দেয় তা হচ্ছে:

ক. যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জাপানের উপর বোমা ব্যবহার করতে উচিত;

খ. এর লক্ষ্যস্থলটি হওয়া উচিত কোনো একটি সামরিক নির্মাণ কারখানা, যেটি হবে শ্রমিকদের ঘর-বাড়ি দ্বারা বেষ্টিত ও ব্যাপক;

গ. কোনো প্রকার সতর্কবাণী ছাড়াই বোমা নিক্ষেপ করতে হবে।

কমিটির পরামর্শক সদস্য হিসেবে ছিলেন বিখ্যাত কয়েকজন বিজ্ঞানী। তাঁরা হলেন, কমপটন, ফার্মি, ওপেনহাইমার ও লরেন্স। ধারণা করা হয়, এই চার ব্যক্তির অশেষ ক্ষমতা ও প্রভাব ছিল ম্যানহাটান প্রকল্পের সহকর্মীদের ওপর। তাঁরা ইচ্ছে করলেই তখন জাপানে ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর বিরুদ্ধে আপত্তি তুলতে পারতেন; হয়তো বা বন্ধও করতে পারতেন।

পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণের আগে বোমার কার্যকারিতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছিল না। জেনারেল গ্রোভস জুলাই মাসের মাঝামাঝি নাগাদ প্রথম বোমাটির পরীক্ষা ও অাগস্টের মধ্যেই দ্বিতীয় বোমা যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য নির্দেশ দেন।

পরীক্ষার স্থান হিসাবে নিউ মেক্সিকোর লস অ্যালামোস থেকে ২১০ মাইল দক্ষিণে অ্যালামাগোর্ডোর মরু অঞ্চল ‘জনার্দা দেল মুয়রতো’ বা ‘মৃত্য প্রান্তর’ নির্ধারণ করা হয়। ঠিক করা হয়েছিল ১৫ জুলাই স্থানীয় সময় বিকাল ৪টায় বোমাটি বিস্ফোরণ ঘটান হবে। কিন্তু হল না, আবহাওয়া ওই দিন বিরূপ হয়ে উঠল। প্রচণ্ড বজ্রপাতসহ ঝড় ও শিলা বৃষ্টি শুরু হয়। পারমাণবিক বোমার ব্যবহার পৃথিবীতে হোক– এটা বোধহয় প্রকৃতিও চাইছিল না। কিন্তু অনেকের চেষ্টার মতো প্রকৃতির সেই চেষ্টা শেষ পর্যন্ত বিফলেই গেল।

১৬ জুলাই সকাল ৫.৩০ মিনিটে সবকিছু ঘটে গেল চোখের নিমিষে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই যেন সব শেষ। বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শক্তি দেখে ভয় ও বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়েছিলেন সবাই। জিরো পয়েন্টের আগুনের শিখা রাহুর গ্রাসের মতো আকাশে উত্থিত হচ্ছিল। গোটা অঞ্চল দুপুরের সূর্যের চেয়েও বহুগুণ উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছিল। নিয়ন্ত্রণকক্ষের একটি খুঁঁটি জড়িয়ে ধরেন ওপেনহাইমার। তাঁর সমগ্র চেতনা ছুঁয়ে যায় ভগবদগীতার বিষ্ণুর একটি পংক্তি: “আমিই যমদেব, সংহারক বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের…।”

জে রবার্ট ওপেনহাইমার নামক একজন নশ্বর দেহধারী মানুষ, অথচ তাঁর হাতেই কি না ন্যস্ত হয়েছিল বিপুল ধ্বংসশক্তির অধিকারী নতুন এই অস্ত্র!

পরের কিছুদিন জিলার্ডসহ কোনো কোনো বিজ্ঞানী এ রকম বোমার ব্যবহার রোধে কিছু কিছু উদ্যোগ নিলেও তা ব্যর্থ হয়।

ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্থল ও নৌবাহিনী উভয়রই গোয়েন্দা বিভাগ জেনে গিয়েছিল জাপানের পতন আসন্ন। জাপানও তখন আত্মসমর্পণের পথ খুঁজছিল। বহির্বিশ্বের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ফলে খাদ্য ও জ্বালানি সংকট প্রকট হয়ে পড়ে। ততদিনে জার্মানিরও পতন হয় (৮ মে ১৯৪৫)।

সামান্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় হয়তো জাপান আত্মসমর্পণে রাজি হত। কিন্তু কোনো এক রহস্যময় কারণে আমেরিকা তখনও সুনির্দিষ্ট আকারে তার শর্তাবলী জানাতে ইচ্ছুক ছিল না। প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান জাপানের দুর্বলতার সব লক্ষণগুলোর কূটনৈতিক সদ্ব্যবহার করলেন না। ২৬ জুলাই পৎসডাম কনফারেন্সে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও চীন একমত হয় যে, যদি জাপান শিগগিরই আত্মসমর্পণ না করে, তাহলে তাদের ‘অতিদ্রুত ও সমূলে ধ্বংস’ করতে হবে।

 

potsdam warning - 111
২৬ জুলাই পৎসডাম কনফারেন্সে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও চীন একমত হয় যে, আত্মসমর্পণ না করলে জাপানকে ‘দ্রুত সমূলে ধ্বংস’ করা হবে

 

মার্কিন সরকার শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে উদাসীনই থাকে। সম্ভবত পারমাণবিক বোমা নামক অমোঘ বাণ তার হাতে রয়েছে বলেই এ উদাসীনতা! ধৈর্য ও সংযমের সঙ্গে সমাধানের পরিবর্তে মোক্ষম এক অস্ত্রের আঘাতে সব সমস্যার মীমাংসা করার জন্য তাদের হাত নিশপিশ করছিল।

এ ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয়ও থাকতে পারে। ম্যানহাটান প্রকল্পে প্রায় ২০০ কোটি ডলার ব্যয় করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক বোমার ব্যবহার ছাড়াই যদি যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়, তাহলে এ ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। অপরদিকে বৈজ্ঞানিক প্যানেলের চার পরমাণু বিজ্ঞানীর পক্ষে বোমা নিক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার নৈতিক ও সৎসাহস ছিল না। যদি তাঁরা এটি করতে পারতেন, তাহলে প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রিসভা ও জেনারেলদের মনে রেখাপাত করা যেত। এটুকু প্রভাব তাদের তখন ছিল।

২৯ জুলাই জাপান পৎসডাম কনফারেন্সের হুমকি প্রত্যাখ্যান করে। আর তখনই হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা ফেলার প্রস্তুতি শুরু হয়। ১৯৪৫ সালের ৬ অাগস্ট ছিল আইনস্টাইন, ফ্রাঙ্ক, জিলার্ড ও র‌্যাবিনোইচ প্রমুখ বিজ্ঞানীদের জন্য একটি কালো দিন। প্রথমে তাঁরা বোমা নির্মাণ প্রচেষ্টার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন; কিন্তু পরবর্তীতে তাঁরাই এর ব্যবহার বন্ধ করার জন্য চেষ্টা করেছিলেন।

পারমাণবিক বোমার সাফল্যে তাঁরা গর্ব করবেন, নাকি হাজারো অসহায় মানুষের অবর্ণনীয় যাতনা ও মৃত্যুর জন্য লজ্জ্বিত বোধ করবেন? একই ব্যক্তির পক্ষে একই উপলক্ষে একই সময়ে কি গর্বিত ও লজ্জ্বিত হওয়া সম্ভব?

তথ্যসূত্র:

Manhattan: The army and the atomic bomb/ United States Army in World War 2, Special Studies, Manhattan, the Army, and …

http://www.atomicheritage.org/history/decision-drop-bomb

http://www.ushistory.org/us/51f.asp

Atomic Bomb Secrets, In the Matter of J. Robert Oppenheimer,The “Chevalier incident

The Manhattan Project: An interective history, DEBATE OVER HOW TO USE THE BOMB,(Washington, D.C., Late Spring 1945),Events > Dawn of the Atomic Era, 1945, https://www.osti.gov/opennet/manhattan-project-history/Events/1945/debate.htm

Notes of Meeting of the Interim Committee, May 9, 1945. Miscellaneous Historical Documents Collection. 736.

Notes of Meeting of the Interim Committee, May 31, 1945.

Miscellaneous Historical Documents Collection. 736.

Notes of Meeting of the Interim Committee , June 1, 1945.

Miscellaneous Historical Documents Collection. 736.

http://www.trumanlibrary.org/whistlestop/study_collections/bomb/large/documents/index.php?documentid=40&pagenumber=8

Hijiya of the University of Massachusetts Dartmouth wrote a wonderful article on “The Gita of J. Robert Oppenheimer”

The Decision to Drop the Atomic Bomb Research File, Notes by Harry S. Truman on the Potsdam Conference , July 16, 1945. Truman Papers, President’s Secretary’s File. Mr. and Mrs. Charles Ross.

আসাদ মিরণলেখক, উন্নয়নকর্মী

Responses -- “ভুলে ভরা দিনগুলি”

  1. সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল

    তথ্যসমৃদ্ধ গুছানো লেখা। বেশ ভালো লাগল।
    আমি তিন বার জাপানে গিয়েও এই ধরনের লেখার সাহস পায়নি!
    লেখককে ধন্যবাদ।

    Reply
  2. Jesmin Sultana

    তারপরও আমেরিকা ভালো, অনুমতি দিলেই লেজ নাড়তে নাড়তে চলে যাব, হা. হা. হা…

    Reply
  3. neel Zaman

    অত্যন্ত তথ্যবহুল সমৃদ্ধ লেখা। পারমাণবিক বোমার ইতিহাস নিয়ে এত বিস্তারিত ভাল লেখা বাংলায় খুব কম পড়েছি। লেখক ও বিডিনিউজকে ধন্যবাদ। এমন লেখা প্রকাশিত হোক নিয়মিত।

    Reply
  4. Fazlul Haq

    আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে গিয়ে মানবতাকে হত্যা করেছে এবং আজও করছে। অথচ তারাই নির্লজ্জের মতো মানবাধিকারের কথা বলে।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—