তিনি একজন রাজনীতিক, একজন নারীবাদী, একজন রাঁধুনী। তিনি টেরিজা মে, যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী। স্কুলের বন্ধুরা তাঁকে ডাকতেন ‘টেরি’ নামে। বন্ধুদের ভাষ্য অনুযায়ী, ছোটবেলায়ই তিনি দেশের ‘প্রথম’ নারী প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন, এমনকি মার্গারেট থ্যাচার প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় অল্পবয়সী টেরিজা নাকি বেশ অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিলেন। সময়ের পরিক্রমায় তিনিই এখন দেশটির দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী। এই দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে ৫৯ বছর বয়সী টেরিজা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (Home Secretary) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। যুক্তরাজ্যের ১০০ বছরের ইতিহাসে দীর্ঘসময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে রেকর্ড গড়েছেন তিনি।

বিশ্বরাজনীতিতে নারীদের অগ্রযাত্রায় টেরিজা মের সংযুক্তি নারী রাজনীতিবিদদের জন্য অবশ্যই অনুপ্রেরণাদায়ক। জার্মানির অ্যাঙ্গেলা মারকেল, যুক্তরাজ্যের টেরিজা মে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট হিলারি ক্লিনটন– বিশ্বরাজনীতিতে এ নারীদের জোরালো ভূমিকা আশাব্যঞ্জক। স্বপ্ন দেখি একদিন নারীরাই বিশ্বের নেতৃত্ব দেবে। বিশ্বাস করি, এমনটা হবেই। কারণ, মেয়েরা কোনোভাবেই ছেলেদের তুলনায় কম সপ্রতিভ, চটপটে ও বোধশক্তিসম্পন্ন নয়। তবে ছোটবেলা থেকে মেয়েদের ছেলেদের সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

অনেকে প্রশ্ন তোলেন, নারী নেতৃত্ব মানেই কি নারীবান্ধব ব্যবস্থার প্রণয়ন? এর উত্তরে সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলাটা সহজ নয়। কারণ, বিষয়টি নির্ভর করে ব্যক্তির মতাদর্শ এবং রাষ্ট্রের কাঠামো-ব্যবস্থার উপর। একজন ব্যক্তি নারীবাদী কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্র নারীবান্ধব নয়, সে ক্ষেত্রে সেই ব্যক্তির পক্ষে নারীবান্ধব ব্যবস্থা নিশ্চিত করা কঠিন। অন্যদিকে, ব্যক্তি যদি তেমন নারীবাদী না-ও হন, কিন্তু রাষ্ট্রব্যবস্থা নারীবান্ধব, সে ক্ষেত্রে জনগণ নারীবান্ধব সমাজের সুফল ভোগ করতে পারে।

নারী-পুরুষ যে কেউ নারীবাদী হতে পারেন এবং নারীবান্ধব সমাজব্যবস্থা সৃষ্টিতে অবদান রাখতে পারেন। আবার অনেক নারী বুঝে বা না-বুঝে নারীবাদের নামে সামাজিক অস্থিরতা, নারীর স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড করতে পারেন। যাহোক, এটা অন্যত্র আলোচনার বিষয়।

টেরিজা স্বঘোষিত নারীবাদী এবং তাঁর দেশে সাম্য-সমতাপূর্ণ রাষ্ট্রীয় নীতিমালা বিদ্যমান। ফলে তাঁর শাসনে জনগণ অধিক নারীবান্ধব সমাজব্যবস্থা আশা করতেই পারেন। লক্ষণীয়, তিনি অনেকের মতো নারীবাদী মূল্যবোধ শুধুমাত্র নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেন না; বরং সত্যিকার অর্থেই নারীবাদ ধারণ করেন, যা তাঁর কর্মতৎপরতায় সুস্পষ্ট। যেমন, তিনি ইতোমধ্যে রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, বিশেষ করে পার্লামেন্টে তাঁর নিজ দলের নারী সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য ২০০৬ সালে অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে ‘উইমেনটুউইন’ (Women2Win) প্রতিষ্ঠা করেছেন।

 

Theresa May - 333
টেরিজা স্বঘোষিত নারীবাদী, তাঁর শাসনে জনগণ অধিক নারীবান্ধব সমাজব্যবস্থা আশা করতেই পারেন

 

অনেকের গৎবাঁধা ধারণা, নারীবাদী মানেই বহির্মুখী, পুরুষালী, কঠোর ইত্যাদি যা শুধুই অপপ্রচার। খুব সংক্ষেপে বলা যায়, সেই ব্যক্তি (নারী-পুরুষ) নারীবাদী যে নারীবাদ, মানে ঘরে-বাইরে নারীর সম অধিকারে বিশ্বাস করেন, এর জন্য সচেষ্ট থাকেন এবং নারী-পুরুষ বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন।

প্রকৃত নারীবাদীদের প্রথম মূল্যবোধ হচ্ছে বা হওয়া উচিৎ নিজেকে ভালোবাসা। কারণ, যে নিজেকে ভালোবাসে, সে অন্যকে ভালোবাসতে পারে, পরিবারকে ভালোবাসতে পারে এবং দেশ-জনগণকে ভালোবাসতে পারে। আত্ম-ভালোবাসার এই বিশেষ গুণ টেরিজা মের জীবনযাত্রায় লক্ষণীয়। একদিকে রাজনৈতিক বলিষ্ঠতায় তাঁর পেশাজীবন, একই সঙ্গে কোমল-কমনীয়তায় তাঁর ব্যক্তিজীবন।

তাঁর বন্ধুদের মতে, দীর্ঘাঙ্গী, সুন্দরী টেরিজা সব সময় যথেষ্ট ফ্যাশন সচেতন। পার্লামেন্ট সদস্য হিসেবে পেশাজীবনের শুরুতেই তাঁর ফ্যাশন সচেতনতা সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে; বিশেষ করে জুতোর প্রতি তাঁর দুর্বলতা মিডিয়ায় বিশেষ আলোচনার বিষয়। Kitten Heels নামে বাঁকা হিলের পাদুকা এখন তাঁর নামের সঙ্ইগে উচ্চারিত হয়। কারণ, তিনি তা ব্যবহার করেন। তিনি ভোগ (Vogue) নামক ফ্যাশন ম্যাগাজিনের আজীবন সদস্য। নির্জন দ্বীপে কোনো সৌখিন বন্ধু নিতে হলে তিনি এই ম্যাগাজিন সঙ্গে নেবেন বলে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন।

সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে টেরিজার জন্ম এবং বড় হওয়া। তাঁর বাবা ছিলেন চার্চের পুরোহিত। বাবাকে দেখে ছোটবেলা থেকেই তিনি নিজেকে সমাজসেবায় নিযুক্ত করেন। নিজ গ্রামে তাঁর বাবা পরিচালিত মূকাভিনয়ে অংশগ্রহণ করতেন টেরিজা। তাছাড়া প্রতি শনিবারে বেকারিতে কাজ করে হাত খরচ জোগাড় করতেন।

টেরিজা মূলত পড়েছেন সরকারি স্কুলে। তবে কিছুদিন পড়েছেন প্রাইভেট স্কুলেও। এরপর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোলে গ্র্য়াজুয়েশন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। সে সময়েই তাঁর জীবনসঙ্গীর সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয়।

শিক্ষাজীবন শেষে টেরিজা মে ব্যাংকে পেশাজীবন শুরু করেন। কিন্তু বেশিদিন সে কাজ করেননি। কারণ, তাঁর রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষায় আবার জনসেবায় মনোযোগী হতে হয় তাঁকে। প্রায় এক যুগ তিনি নির্বাচিত কাউন্সিলর হিসেবে কাজ করেন এবং ১৯৯৭ সাল থেকে নির্বাচিত পার্লামেন্ট সদস্য হিসেবে কাজ করছিলেন। কনজারভেটিভ দলের পক্ষে তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর দল ক্ষমতায় যাবার পর ২০১০ সাল থেকে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে অশান্ত রাজনৈতিক পরিবেশে টেরিজা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। ঘটনাক্রমে, অনেকটা হঠাৎ করেই তিনি এই সুযোগ পেয়েছেন। তবে এ ক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা-প্রজ্ঞা, মধ্যবিত্ত পারিবারিক প্রেক্ষাপট, গণভোটে ভূমিকা ইত্যাদি সহায়ক হয়েছে।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে যুক্তরাজ্যের থাকা না-থাকার প্রশ্নে অনুষ্ঠিত গণভোটে বেক্সিটের পক্ষে গণরায়ের পরিপ্রেক্ষিতে ডেভিড ক্যামেরন প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান। সেই শূন্যস্থান পূরণে দলীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে টেরিজা দলের নেতা নির্বাচিত হন এবং রানি কর্তৃক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান। এ প্রক্রিয়ায় সাধারণ ভোটারদের মতামত দেওয়ার সুযোগ নেই।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে টেরিজার কাজের ভালোমন্দ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা আছে। যেমন, অভিবাসন নীতি এবং তৎপরতা নিয়ে তাঁর কঠোরতা বহুল আলোচিত একটি বিষয়। তরুণদের ধর্মীয় চরমপন্থী হওয়া প্রতিরোধে তাঁর পদক্ষেপ প্রশংসনীয়, যা প্রিভেন্ট (Prevent) কর্মসূচি নামে পরিচিত। আমাদের বর্তমান অবস্থায় সম্ভব হলে সরকার এই কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে। এছাড়া, সমলিঙ্গের মধ্যে বিয়ের পক্ষে অবস্থানের কারণে তিনি কট্টর মুসলিমদের সমালোচনার শিকার হয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি কেমন করবেন তা ভবিষ্যতই বলে দেবে। তবে প্রথম ভাষণে তিনি শ্রেণি-লিঙ্গ-সক্ষমতা ভেদে সবার জন্য সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং সুবিধাবঞ্চিতদের অধিক গুরুত্ব দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন।

কনজারভেটিভ দলকে বলা হয় অভিজাতদের পক্ষের দল এবং সেজন্য টেরিজার এসব অঙ্গীকার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সময়ই বলে দেবে কী হয়। তবে শুরুতেই তাঁকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। যেমন, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পর্কের মধ্যস্থতা করা। এছাড়া, নিজ দেশে ভোটারদের সন্তুষ্টি আদায় এবং বিরোধী দলকে মধ্যবর্তী নির্বাচন দাবির সুযোগ না-দেওয়া।

দেশে-বিদেশে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার উপরই নির্ভর করবে ২০২০ সালের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে তাঁর দলের অবস্থান এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর সাফল্য।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৃঢ় সংকল্প, জনসেবার অঙ্গীকার এবং কঠোর প্ররিশ্রমেই টেরিজা আজকের অবস্থান তৈরি করেছেন। একদিকে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং প্রজ্ঞায় তিনি রাজনৈতিক পেশাজীবন সামলান– অন্যদিকে সাজসজ্জা, রান্নাবান্নায় ব্যক্তিজীবন উপভোগ করেন। তাঁর অন্যতম শখ হচ্ছে রান্না করা। তাঁর সংগ্রহে আছে ১০০ রান্নার বই এবং প্রতি সপ্তাহান্তে তিনি একটি নতুন রান্না করেন। ‘যে রাঁধে, সে চুলও বাঁধে’– এ প্রবচন সম্ভবত কেবল নারীদের জন্যই প্রচলিত।

বহুগুণে গুণান্বিত বিশেষ একজন নারী টেরিজা। কেবল নিজ দেশেই নয়, বিশ্বের অন্য নারীদের জন্যও তিনি একজন রোল মডেল।

সীনা আক্তারসমাজবিদ, প্যারেন্টিং পেশাজীবী

Responses -- “বিলাতের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী”

  1. Dr. Muhammed Idris Bhuiyan

    তাঁর অফুরন্ত প্রাণশক্তি ও দেশবাসী প্রতি ভালোবাসাই তাঁকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছে…

    Reply
  2. গীতা দাস

    খুব ভালো লেগেছে । সমসাময়িক ঘটনার মধ্যে টেরিজা মে-কে নিয়ে লেখাটি অনেকেরই চাহিদা মেটাবে।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—