বাংলাদেশের জন্মবন্ধু সিডনি শনবার্গ আর নেই। ৯ জুন নিউইয়র্কের পোকিপসিতে অন্তিমতার অনন্ত পথে যাত্রা করেছেন তিনি। পুলিৎজার বিজয়ী নিউইয়র্ক টাইমসের এই রিপোর্টারের কাছে বাঙালি চিরঋণী।

যে সকল বিদেশি সাংবাদিক ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানিদের বর্বরতা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছিলেন তাদের মধ্যে সিডনি শনবার্গ অন্যতম। তখন তিনি ছিলেন মার্কিন পত্রিকা দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিনিধি। মুক্তিযুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তানে (বাংলাদেশ) বিদেশি সাংবাদিকদের উপস্থিতির উপর পাকিস্তান সরকারের বহিষ্কারাদেশ থাকা সত্বেও তিনি বেশ কয়েকবার এখানে এসেছিলেন। বাঙালির ওপর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দালালদের বর্বরতা ও গণহত্যায় স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন।

নিউইয়র্ক নিউজ টুডের ফেব্রুয়ারি, ১৯৯২ সংখ্যায় সিডনি নিজেই এ নিয়ে বলেছেন:

“রিপোর্টার হিসেবে আমি পৃথিবীর নানান জায়গায় অন্যায়, নিপীড়ন, নির্যাতন সংঘটিত হতে দেখেছি, তা নিয়ে লিখেছি। তবে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানে পূর্বাংশের (বাংলাদেশ) মতো এত ব্যাপক আকারে, পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে পরিচালিত সহিংসতা কখনও দেখিনি।”

২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নাম দিয়ে বাঙালির বিরুদ্ধে গণহত্যা শুরু করে। বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের নজর থেকে নিজেদের এই গর্হিত অপকর্ম আড়াল করার জন্য পাকিস্তান যে ৩৫ জন বিদেশি সাংবাদিকদের ঢাকা থেকে নিরাপত্তার অজুহাতে বহিষ্কার করে, তাদের মধ্যে সিডনিও ছিলেন। এরপর ভারতের বোম্বেতে (বর্তমান মুম্বাই) চলে যান সিডনি। সেখান থেকে তিনি নিউইয়র্ক টাইমসে বাঙালির বিরুদ্ধে পাকিস্তানিদের বর্বরতা নিয়ে রিপোর্ট করেন।

নিউইয়র্ক টাইমসের ২৮ মার্চ, ১৯৭১ সংখ্যায় In Dacca, Troops use Artillery to halt revolt শিরোনামে সিডনির একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। এই রিপোর্টে পূর্ব পাকিস্তানে নিরীহ সাধারণ বাঙালির উপর পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর বর্বরতার বর্ণনা করা হয়। সিডনি এই সামরিক অভিযানকে আখ্যায়িত করেছিলেন ‘পাইকারি হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে।

২৭ মার্চ, ১৯৭১ সকালে ঢাকা থেকে বহিষ্কৃত হলেও, তিনি বারবার পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্ত অঞ্চল, শরণার্থী শিবির, মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প ঘুরে বেরিয়েছেন। এসব নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসে রিপোর্টিংএর মাধ্যমে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছিলেন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান কর্তৃক সংঘটিত বাঙালি গণহত্যার তথ্য, মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির বীরত্ব ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের হালচাল।

Sticks & spears against tanks রিপোর্টে সিডনি লিখেছেন সসস্ত্র সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে নিরস্ত্র সাধারণ বাঙালির সংগ্রামের কথা। All part of a game: a grim & deadly one সম্পাদকীয়তে তিনি লিখেছেন ভয়ংকর বাঙালি গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জটিল রাজনীতির কথা। সে সময় মুক্তিযুদ্ধকে আন্তর্জাতিক বিশ্বের বুঝতে সিডনির একটি লেখা বেশ বড় ভূমিকা পালন করেছিল।

মার্কিন প্রভাবশালী ম্যাগাজিন ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্সের’ অক্টোবর, ১৯৭১ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় Pakistan Divided ; প্রবন্ধটি বাঙালির বিরুদ্ধে পাকিস্তানের অনাচার, দুঃশাসন ও নির্যাতনের ভয়াবহতার উপর একটি প্রমাণপত্র। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এ রকম প্রায় চল্লিশটি রিপোর্ট করেছিলেন সিডনি শনবার্গ।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আর কোনো সাংবাদিক এত বেশিসংখ্যক রিপোর্ট করেননি। তাঁর এই রিপোর্টগুলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত দলিল হিসেবে গণ্য করা হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও একাত্তরের বাঙালি গণহত্যা-নির্যাতনের সংবাদ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বাঙালি চিরদিন শ্রদ্ধাভরে সিডনি শনবার্গকে স্মরণ করবে।

সিডনি শনবার্গের জন্ম ১৯৩৪ সালের ১৭ জানুয়ারি আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের ক্লিনটনে একটি সাধারণ পরিবারে। পুরো নাম সিডনি হিল্লেল শনবার্গ। পড়াশুনা করেছেন ক্লিনটন হাই স্কুল ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। হার্ভার্ড আইন স্কুলে পড়ার সময় তিনি টেক্সাসের ফোর্ট হুডে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৫৯ সালে সাংবাদিক হিসেবে যোগ দেন দ্য নিউইর্য়ক টাইমস পত্রিকায়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পত্রিকাটির দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিনিধি (ব্যুরো চিফ, দিল্লি) হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

১৯৮৫ সালের সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্ক টাইমস ছেড়ে আসার আগে মেট্রোপলিটন সম্পাদক ও সম্পাদকীয় বিভাগের কলামিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৮৬ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত নিউইয়র্ক নিউজ টুডের সহযোগী সম্পাদক ও কলামিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি এবিবি নিউজের অনুসন্ধান বিভাগের প্রধান, দ্য ভিলেজ ভয়েজের প্রেস-ক্লিপস কলামিস্ট ছিলেন। সিডনি পেন্টহাউজ, দ্য নেশন, ভ্যানিটি ফেয়ার, আমেরিকান কনজারভেটিভের মতো খ্যাতিমান পত্রিকা-ম্যাগাজিনের নিয়মিত কলামিস্ট ছিলেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও একাত্তরের গণহত্যার উপর রিপোটিং, ভিয়েতনাম যুদ্ধের রিপোর্টিং ও কম্বোডিয়ার গণহত্যার রিপোটিংয়ের জন্য বিশ্ব তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। কম্বোডিয়ার গণহত্যা প্রসঙ্গে শনবার্গের রিপোটিং ও অভিজ্ঞতা নিয়ে ১৯৮৪ সালে নির্মিত হয় দ্য কিলিং ফিল্ডস নামে বিখ্যাত এবং বাফটা ও একাডেমি পদকজয়ী চলচ্চিত্র। সাংবাদিকতা জীবনের উপর দুটো আত্মজৈবনিক ঘরানার বই লিখেছেন সিডনি– Beyond the killing fields: War writings এবং The death & life of Dith Pran ; বই দুটো বাংলাদেশ ও কম্বোডিয়ার গণহত্যা-যুদ্ধ ও ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।

সাংবাদিকতায় বস্তুনিষ্ঠতা ও ঘটনার গভীরে প্রবেশের দক্ষতার জন্য ১৯৭৬ সালে পুলিৎজার পদক, ১৯৭১ ও ১৯৭৪ সালে জর্জ পোক পদক, ১৯৯৯ সালে ইনভেস্টিগেটিভ রিপোটার্স ও এডিটরস পদক, সিগমা ডেলটা চি পদক, ওভারসিজ প্রেসক্লাব পদক পেয়েছেন সিডনি।

মানবিকতা, ন্যায়পরায়ণতা ও সত্যনিষ্ঠতার এক অপূর্ব সমন্বয় আমরা দেখতে পাই সিডনি শনবার্গের সাংবাদিকতায়। বাংলাদেশের গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধের অস্থির সময়ের রাজনীতি তিনি বিশ্বমাধ্যমে তুলে ধরেছিলেন। তাঁর রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিপক্ষে থাকলেও, সত্য প্রকাশে কখনও কুণ্ঠিত হননি এই মহন হৃদয়ের ব্যক্তি।

অতল শ্রদ্ধা বাংলাদেশের জন্মবন্ধু সিডনি শনবার্গ। বাংলাদেশ ও বাঙালি চিরকাল শ্রদ্ধাভরে আপনাকে মনে রাখবে।

সাব্বির হোসাইনবাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার ও গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক।

Responses -- “শ্রদ্ধাঞ্জলি, সিডনি শনবার্গ”

  1. শওকত খান

    “অতল শ্রদ্ধা বাংলাদেশের জন্মবন্ধু সিডনি শনবার্গ। বাংলাদেশ ও বাঙালি চিরকাল শ্রদ্ধাভরে আপনাকে মনে রাখবে।”

    সাব্বিরকে ধন্যবাদ।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—