১ জুলাই ও ২ জুলাই যথাক্রমে শুক্রবার ও শনিবার বিশ্বমিডিয়ার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বাংলাদেশ। প্যারিস, অরল্যান্ডো, ইস্তাম্বুলের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই কথিত ‘আইএস’এর হামলার শিকার হল বাংলাদেশ। লাসভেগাস টু নিউইয়র্কের ফ্লাইটে বসে সিএনএন এবং ফক্স নিউজ চ্যানেলে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের খবর দেখার মাঝখানেই পর্দায় ভেসে উঠল, ‘ব্রেকিং নিউজ’-– ঢাকাস্থ গুলশানে সন্ত্রাসী হামলা!

ডেনভারে অনুষ্ঠিত কনসারভেটিভ সামিটে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তৃতা সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ করে সেই যে শুরু–- পুরো দু দিন ধরে সিএনএনসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলো বিরতিহীনভাবে গুলশানের জঙ্গি হামলার খবর প্রকাশ করেছে। সেনাবাহিনীর কমান্ডোদের নেতৃত্বে ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ পরিচালনার মাধ্যমে প্রায় ১২ ঘণ্টার জিম্মি নাটকের অবসান ঘটলেও, রক্তাক্ত এই পৈশাচিক হামলা স্তম্ভিত করেছে পুরো জাতিকে।

গুলশানের জঙ্গি হামলা আমাদের কয়েকটি বিষয় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। প্রথমত, গুলশানের কূটনীতিক পাড়ায় নিড়াপত্তাকর্মীদের ফাঁকি দিয়ে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ছয় থেকে আটজন যুবক একটি ব্যস্ত রেস্তোরাঁয় হামলা চালাতে পারলে, দেশের যে কোনো জায়গায় জঙ্গিরা এ ধরনের হামলা চালাতে সক্ষম। অর্থাৎ বেডরুম থেকে অভিজাত এলাকার রেস্তোরাঁ– দেশে কোথাও নিরাপত্তার গ্যারান্টি নেই।

দ্বিতীয়ত, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাধারণ সন্ত্রাসীদের সঙ্গে ‘ক্রসফায়ারে’ অভ্যস্ত হলেও কয়েকজন উগ্রপন্থী, জঙ্গিদের মোকাবেলা করা জন্য তৈরি ছিল না। প্রাথমিক অভিযানে পুলিশের দুজন কর্মকর্তার মৃত্যুই প্রমাণ করে যে, সশস্ত্র জঙ্গিদের মোকাবেলা করার মতো প্রস্তুতি এবং অভিজ্ঞতা কোনোটিই তাদের নেই।

সেনাবাহিনীর কমান্ডোরা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেছে, সেজন্য তারা ধন্যবাদ পেতেই পারে। তবে ছয় থেকে আটজন সশস্ত্র জঙ্গির মোকাবেলা করার জন্য সেনাবাহিনীর কমান্ডো প্রয়োজন হলে, পুলিশসহ অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দীনতা খুবই নগ্নভাবে ফুটে উঠে। উদ্ধার অপারেশন কীভাবে পরিচালনা করা উচিত ছিল, কখন অভিযান শুরু করলে ভাল হত কিংবা এটি কোন বাহিনীর দায়িত্ব ছিল, সেটি বিচার করার ভার বিশেষজ্ঞদের ওপরই থাকুক।

বাংলাদেশে সম্প্রতি সংঘটিত জঙ্গি হামলাগুলোর ধরন নিয়ে আলোচনা, এ হামলার সম্ভাব্য কারণ নির্ণয় এবং ভবিষ্যত হামলা প্রতিরোধ সমন্ধে আমাদের কী করণীয় হতে পারে সে বিষয়ে দুচারটি কথা বলাই এ লেখার উদ্দেশ্য।

গত প্রায় দুবছরে বাংলাদেশে অসংখ্য টার্গেটেড সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে যার শিকার হয়েছেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ব্যক্তি থেকে শুরু করে প্রগতিশীল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ব্লগার, লেখক, এলজিবিটি ম্যাগাজিনের সম্পাদক অথবা বিদেশি নাগরিকগণ। এ সকল হত্যাকাণ্ডের টার্গেট নির্বাচন এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত পদ্ধতি দেখে এগুলোকে বিপথগামী, উগ্রপন্থীদের কাজ বলেই মনে হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এ হত্যাকাণ্ডগুলোর দায় স্বীকার করেছে আইএসসহ বিভিন্ন উগ্রপন্থী সংগঠন।

তবে দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, সরকারের কর্তাব্যক্তিরা প্রতিটি ক্ষেত্রেই ওই হত্যাকাণ্ডগুলোকে সরকারবিরোধী, দেশের উন্নয়নবিরোধী পক্ষের কাজ বলে দাবি করেছে এবং দেশে ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের অস্তিত্বের অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে।

ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব প্রচার করে প্রকৃত ঘটনা আড়াল করে দেওয়ার আবর্ত থেকে দেশের মানুষ মুক্তি চায়। গুলশানের নৃশংস হামলা সমন্ধে ইতোমধ্যেই ফেইসবুক ও অন্যান্য মাধ্যমে প্রচুর ষড়যন্ত্র-তত্ত্বের কথা এসেছে। কেউ বলছেন, বাংলাদেশে পশ্চিমা প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়ানোর জন্য প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোই (মূলত যুক্তরাষ্ট্র) আইএসএর মাধ্যমে এমন ঘটনা ঘটায়। কেউ বলছেন, বাংলাদেশের উন্নয়নে ঈর্ষাকাতর হয়ে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ষড়যন্ত্র করছে। আবার কেউ নিশ্চিতভাবেই দেশের বিরোধী শক্তি, বিশেষ করে জামায়াত-ভিত্তিক রাজনৈতিক দলের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করছেন।

বাস্তবতা হচ্ছে, এভাবে উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানোর মধ্য দিয়ে আসলে জঙ্গিবাদকে পরোক্ষভাবে প্রশ্রয় দেওয়া হয়। অন্যের ওপর দোষ চাপানোর মাধ্যমে বলা হচ্ছে যে, আমাদের তো কোনো দোষ নেই, ভুল নেই। অতএব আমাদের কিছুই করার নেই।

ইতোমধ্যেই সরকারের দায়িত্বশীল কেউ কেউ বলেছেন, যেহেতু হামলাকারীরা সবাই বাংলাদেশের, তাই গুলশানের হামলায় আন্তর্জাতিক বা ‘আইএস’এর সংশ্লিষ্টতা নেই। সরকার যখন অপারেশনের প্রস্তুতির অজুহাতে ঘটনাস্থলে ইন্টারনেট, মিডিয়া কাভারেজ নিয়ন্ত্রণ করছিল, তারই মধ্যে নিহতদের সংখ্যা, মৃতদেহের ছবি ও হামলাকারীদের ছবি যখন ‘আইএস’ প্রকাশ করে। তারপরও আইএসএর সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করার সুযোগ কোথায়? বিশ্বায়নের এই যুগে বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে বসে ‘আইএস’ বা অন্য কোনো সংগঠনে যে যোগদান করা যায় বা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা যায় সেটি বুঝতে কি বিশেষজ্ঞ হতে হয়?

খবরে প্রকাশ, হামলাকারীরা জিম্মিদের সুরা পড়তে বলেছিল এবং যারা সূরা পাঠ করতে সক্ষম হয়েছিল, তাদেরকে তারা হত্যা করেনি। আরও জানা যায় যে, তারা বলেছে তারা বাংলাদেশিদের হত্যা করতে চায়নি, বরং বিদেশিদের হত্যা করাই তাদের লক্ষ্য ছিল। অর্থাৎ এটি পরিস্কার যে, অমুসলিম বিদেশিরাই তাদের হামলার মূল লক্ষ্য।

কেউ কেউ হয়তো এ ভেবে তৃপ্ত হয়েছেন যে, এ হামলা তো আমাদের (বাংলাদেশি, মুসলিমদের) লক্ষ্যে করা হয়নি। কী ভয়ংকর! ভাবখানা এমন যে, যারা সূরা জানেন না তাদের বাঁচা-মরার সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার শুধুই জঙ্গিদের। এ ধরনের ভাবনা যাদের মনে এসেছে তাদের বলছি, আপনিও লালন করছেন উগ্রপন্থী, জঙ্গি-চেতনা। সাধু সাবধান।

জিম্মিকারীদের সূরা পড়তে বলে এবং বাংলাদেশিদের হত্যা না করার পরিকল্পনা ঘোষণা করে হামলাকারীরা অতি সূক্ষ্ণভাবে তাদের এই পৈশাচিকতায় বাঙালি মুসলমানদের নৈতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেছে। বাস্তবতা হচ্ছে, বিপথগামী, উগ্রপন্থী ওই হামলাকারীরা ইসলাম এবং বাংলাদেশ উভয়েরই শত্রু।

‘হোলি আর্টিজান’ রেস্তোরাঁয় নিরীহ ব্যক্তিদের ওপর হামলাকারীরা যে মুসলান সেটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যদিও আমি ধর্মবিদ নই, তবে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে যতটুকু শিখেছি, নিঃসঙ্কোচে বলতে পারি যে, আহাররত একদল নিরীহ মানুষের ওপর পবিত্র রমজান মাসে হামলা করা শান্তির ধর্ম ইসলাম কখনও সমর্থন করে না। নিজের বিশ্বাস বা ধর্ম অন্যের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া মোটেই ইসলামের আদর্শ নয়। তাই ধর্মীয় লেবাসের আড়ালে তথাকথিত জঙ্গিরা আসলে ইসলামেরই শত্রু।

‘আল্লাহু আকবর’ বলে যারা কোরবানির পশুর মতো মানুষের গলায় ছুরি চালাতে পারে তারা মুসলমান তো নয়ই, বরং বিপথগামী, মানসিক ভারসাম্যহীন ‘অমানুষ’।

বিদেশি নাগরিকদের দেশের কূটনীতিকপাড়ার অভিজাত রেস্তোরাঁয় হত্যা করে বিশ্বমিডিয়ায় বাংলাদেশকে অনিরাপদ, অকার্যকর দেশ হিসেবে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন যারা করে, তারা যে বাংলাদেশের শত্রু সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। আমরা জানি, নিহত জাপানিদের প্রত্যেকেই জাইকার বিভিন্ন উন্নয়নশীল প্রজেক্টে যুক্ত ছিলেন। আর নিহত ইতালির নাগরিকরা মূলত গার্মেন্টস শিল্পে জড়িত ছিলেন। এদেরকে হত্যা করে বিশ্বমিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার করা বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রার ওপর যে এক বিশাল আঘাত সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই হামলাকারীরা মুসলিম বাংলাদেশিদের সহানুভূতি চাইলেও তারা আসলে দেশ ও ধর্ম উভয়েরই শত্রু।

আগেই বলেছি, জঙ্গি বা উগ্রপন্থী যা-ই বলি না কেন, আমাদের মেনে নিতে হবে যে, দেশে ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের উপস্থিতি রয়েছে। গুলশানের পৈশাচিক হামলার ঘটনা বিশ্লেষণ করলে পরিস্কার হয় যে, হামলাকারীরা তীব্র ঘৃণা এবং প্রতিশোধপরায়ণ মানসিকতা থেকেই ‘হোলি আর্টিজান’ রেস্তোরাঁয় বিদেশিদের ওপর হামলা করেছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, অমুসলিম ও অবাঙালিদের ওপর এই ঘৃণা কোথা থেকে জন্ম নেয়?

অনেকে হয়তো বলবেন এ ঘৃণার মূল কারণ হচ্ছে, যুগে যুগে ফিলিস্তিন থেকে শুরু করে, আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে মুসলমানদের ওপর পশ্চিমাদের সামরিক হস্তক্ষেপ, বা সন্ত্রাস দমনের নামে ড্রোন পরিচালনা করা যার মাধ্যমে এ সকল দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করার পাশাপাশি অসংখ্য নিরীহ মানুষ প্রাণ হারায়। যদিও এ বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ, তবে শুধু এগুলোই ঘৃণা জন্মানোর মূল কারণ নয়।

গত কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন মন্দিরে পুরোহিতদের ওপর আক্রমণের কথাই ধরুন, অথবা এলজিবিটি অ্যাকটিভিটিস্ট জুলহাজ মান্নান ও তার বন্ধুর হত্যাকাণ্ড কিংবা প্রফেসর রেজাউল করিম হত্যাকাণ্ডের কথাই ভাবুন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে, আক্রান্ত ব্যক্তিরা সমাজের প্রচলিত ধারণার বাইরে এমন কিছু কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন যেটি তথাকথিত ধর্ম রক্ষাকারীদের মতাদর্শের সঙ্গে ‘বেমিল’। আর এই মতাদর্শের ভিন্নতাই যেন দিয়ে দিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে আক্রমণের নায্যতা!

নিজের বিশ্বাস বা ধর্মকেই একমাত্র স্বীকার্য ভেবে ভিন্ন মতাবলম্বীদের ঘৃণা করা এবং তাদেরকে শাস্তি(!) প্রদান গ্রহণযোগ্য মনে করার মানসিকতা প্রতিরোধ করতে না পারলে এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে।

উগ্রপন্থী বা জঙ্গি মানসিকতা তৈরির ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো নির্মূল করার ব্যবস্থা নিতে হবে। গুলশানের হামলাসহ সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনায় নামিদামি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সম্পৃক্ততা থাকার পর ঢালাওভাবে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে দায়ী করার সুযোগ নেই। অন্য ধর্ম বা মতাবলম্বীদের প্রতি ঘৃণা তৈরিতে পরিবার ও সমাজের ভূমিকাও কম নয়।

এ প্রসঙ্গে দুটি উদাহরণ দিই। ছোটবেলায় কোরআন শিক্ষার জন্য যখন মক্তবে যেতাম, পাঞ্জাবি না পরে গেলে হুজুর ইহুদি-খ্রিস্টান বলে বকা দিতেন। একটি ছোট শিশুকে যদি পোশাক পরার জন্য ইহুদি বা খিস্ট্রান বলে বকা দেওয়া হয়, তাহলে ওই শব্দ বা ধর্মের প্রতি ওই শিশুর বিরুপ মনোভাব তৈরি হওয়া কি স্বাভাবিক নয়?

এবারে আসি পরিবারের কথায়। অনেকে খাবার টেবিলে বসে বাচ্চাদের সামনে বিভিন্ন রাজনৈতিক বা ধর্মের আলোচনায় জড়ান। এ সময়ে বিভিন্ন খবরের ওপর ভিত্তি করে অনেকেই পশ্চিমাদের ‘চৌদ্দগুষ্ঠি’ উদ্ধার করে ছাড়েন। পশ্চিমা কোনো রাষ্ট্রের বিশেষ কোনো কর্মকাণ্ডের ওপর ভিত্তি করে পুরো দেশ বা ধর্মের ওপর সর্বজনীন মন্তব্য করে কোমলমতি শিশুদের মনে ঘৃণা তৈরিতে ভূমিকা রাখার জন্য কিন্তু আমাদের অনেকেই দায়ী। আপনার একটি ছোট মন্তব্য আপনার সন্তানের মধ্যে উগ্রপন্থী মনোভাব তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা না বলেই পারছি না। গত শনিবার এক বন্ধুর বাসায় ইফতারের আগে দোয়া করার সময়, এক ভদ্রলোক অনুরোধ করলেন যেন যারা গুলশান হামলায় নিহত হয়েছেন তাদের জন্য দোয়া করা হয়। এরই মধ্যে পাশ থেকে অন্য এক ভদ্রলোক বললেন, ‘‘ওরা তো বিদেশি, আল্লাহকেই মানে না। ওদের জন্য দোয়া করার কী আছে?’’

মানুষ হিসেবে নিহতদের জন্য দোয়া করার ক্ষেত্রেও যদি এহেন মানসিকতা থাকে এবং এ ধরনের মন্তব্য শিশুদের সামনে কেউ করেন, তাহলে সেই শিশুদের মধ্যে অন্যের ধর্মকে সম্মান করার মানসিকতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কতখানি সেটি বিচারের ভার পাঠকের ওপরেই থাকল।

দেশের জঙ্গি সংকট সরকারের একার পক্ষে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব আবিস্কার না করে উগ্রপন্থীদের অস্তিত্বের স্বীকৃতি দিয়ে এদের শিকড় উপড়ে ফেলতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি দেশের প্রতিটি পরিবারকেও দায়িত্ব নিতে হবে। ইতোমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে ভাষণের মাধ্যমে দেশ থেকে জঙ্গি নির্মূল করার ঘোষণা দিয়েছেন। অভিভাবকদের পরামর্শ দিয়েছেন তাদের সন্তানদের সঠিকভাবে দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য।

পরিশেষে আবার বলতে চাই, গুলশানের হামলায় জঙ্গিরা বাংলাদেশি মুসলমানদের প্রতি কৃপা দেখালেও তারা আসলে দেশ এবং ধর্ম উভয়েরই শত্রু। নিরীহ মানুষকে যারা পৈশাচিকভাবে হত্যা করে, তাদের কোনো ধর্ম নেই, দেশ নেই। দেশের প্রত্যেক পিতামাতার কাছে অনুরোধ, আপনার সন্তান যেন অন্যের বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা করতে শেখে, মানুষকে ঘৃণার পরিবর্তে ভালোবাসতে শেখে। আমার সন্তানদের অন্যের বিশ্বাস বা ধর্মকে ঘৃণার পরিবর্তে শ্রদ্ধা করার শিক্ষা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি আমি করলাম। আপনিও করছেন তো?

এইচ এম মহসীনযুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত স্ট্র্যাটেজি প্রফেশনাল

২১ Responses -- “সশস্ত্র জঙ্গি হামলা: পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে করণীয়”

  1. আবু সাঈদ খান

    “ইসলামের নামে উগ্রপন্থা ও বিভ্রান্তি” মোকাবেলার সর্বোত্তম মারনাস্ত্র কুরআনুল কারীম

    [শেষ অংশ]

    নাজওয়াঃ গোপন শলাপরামর্শ বা চক্রান্ত

    ব্যক্তি ও সমাজের কাছে ইসলামকে গ্রহণীয় ও আদরনীয় করে তোলার কাজ কোন গোপন চক্রান্তের ফসল না, অনেক নিষ্ঠা, অধ্যবসায় আর সীমাহীন ত্যাগের – যা নবী-রাসূলগণ করে দেখিয়ে গেছেন। পুরো কুরআন নবীগণের এই জাতীয় আত্মত্যাগের বিবরণে ভরপুর। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, সমগ্র আরবসহ বিশ্বব্যাপী ইসলামী লেবাসের (?) এই জল্লাদদের মধ্যে সেই শিক্ষা কোথায়? ওরা তো স্রেফ ঠান্ডা মাথার নৃশংস খুনি। এরা কুরআনে বর্ণিত মুনাফিকদের মত গোপন চক্রান্ত করে কীভাবে নিরীহ মানুষ, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিষ্পাপ শিশুদের হত্যা করে শাসকগোষ্ঠীর কাছ থেকে দরকষাকষির মাধ্যমে ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়া যায়। শয়তান তাদের নিজ বলয়ে কবজা করে নিয়েছে (শয়তান তাদেরকে বশীভূত করে নিয়েছে, অতঃপর আল্লাহর স্মরণ ভূলিয়ে দিয়েছে। তারা শয়তানের দল। সাবধান, শয়তানের দলই ক্ষতিগ্রস্ত।-৫৮:১৯)।

     “তাদের অধিকাংশ সলা-পরামর্শ ভাল নয়; কিন্তু যে সলা-পরামর্শ দান খয়রাত করতে কিংবা সৎকাজ করতে কিংবা মানুষের মধ্যে সন্ধি স্থাপন কল্পে করতো তা স্বতন্ত্র।“-৪:১১৪
     “তারা কি মনে করে যে, আমি তাদের গোপন বিষয় ও গোপন পরামর্শ শুনি না (সির্রাহুম ওয়া নাজওয়াহুম)? হ্যাঁ, শুনি। আমার ফেরেশতাগণ তাদের নিকটে থেকে লিপিবদ্ধ করে।“-৪৩:৮০
     “তুমি কি ভেবে দেখনা, যাদেরকে কানাঘুষা করতে নিষেধ করা হয়েছিল অতঃপর তারা নিষিদ্ধ কাজেরই পুনরাবৃত্তি করে এবং পাপাচার, সীমালংঘন এবং রসূলের অবাধ্যতার বিষয়েই কানাঘুষা করে।“-৫৮:৮
     “এই কানাঘুষা তো শয়তানের কাজ; মুমিনদেরকে দুঃখ দেয়ার দেয়ার জন্যে। তবে আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত সে তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। মুমিনদের উচিত আল্লাহর উপর ভরসা করা।“-৫৮:১০

    ওরা যে তরীকায় তথাকথিত ‘ইসলামী শাসন’ কায়েম করতে চায়, আল্লাহর শেষনবী সেইভাবে ইসলামের প্রচার করেছিলেন? এদের অনুসারীরা নিতান্তই জাহেল, অর্বাচীন যারা কুরআন ভালভাবে পড়ে তাদের মুনাফিক নেতৃত্বকে যাচাই করে নেয়নি। খেলায় দলবদলের মত এই হঠকারী সমর্থকেরা ভিন্ন স্বাদ নিতে জার্সি বদল করে অন্য ‘ইসলামী দলে’ পাড়ি জমায়। আল্লাহর সাথে কী নির্লজ্জ তামাশা!

    ইসলাম মুসলমানকে এই জাতীয় কোন সরল সমীকরণ শেখায় না যে, কেউ তাদের প্রতি অন্যায় আচরণ করছে বিধায় তাকেও সমান খারাপ আচরণ করতে হবে। অথবা কোন গোষ্ঠী যদি মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি প্রকাশ্যে জুলুম করে, আর মুসলমানদের যদি প্রকাশ্যে তা মোকাবেলা করার ক্ষমতা না থাকে, তবে গোপন অভিযান করে ঘটনার সাথে যোগসূত্রহীন আল্লাহর বান্দাদের উপর সেই অন্যায়ের প্রতিশোধ নেয়ার।

    বরং কুরআন মুসলমানদের অনেক অনেক বিষয়কে ক্ষমা করতে উদ্বুদ্ধ করে: “মুমিনদেরকে বল, তারা যেন তাদেরকে ক্ষমা করে, যারা আল্লাহর দিনগুলোর আশা রাখে না যাতে তিনি সেই সম্প্রদায়কে তাদের কৃতকর্মের প্রতিফল দেন।“-৪৫:১৪

    “ইসলামী আন্দোলনকারী”(?) এই সিপাহসালারদের হিপক্রিসির আলোচনা করতে গেলে বলে শেষ করা যাবে না। কুরআন আমাদেরকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় তাদের সকল দুষ্ট কলা-কৌশলের ধারা-উপধারাগুলো। জীবন বাঁচানো যখন প্রশ্ন তখন এই মুনাফিকের দল শয়তানেরও পা ধরে, উপরে ‘তৌহিদি জনতার’ ঘাড়ে হাত রাখে, তলে আল্লাহর শত্রুদের কাছেও ধর্না দেয়। অথচ আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে কুরআনে নিষেধ করেছেন তাদের সাথে সেই সম্পর্ক না করতে। এরা যখন কোন দান-দক্ষিণার ঘটনা ঘটায়, তখন তা অনেক বেশি প্রপাগান্ডায় রূপান্তরিত করে। অনেক ফুলিয়ে ফাপিয়ে তা প্রকাশ ও প্রচার করে। সেই ঘটনাকে দেশে ও দেশের বাইরে চাঁদাবাজি ও ভিক্ষাবৃত্তির নতুন হাতিয়ারে পরিণত করে। তাদের পার্থিব অর্জন রক্ষাকল্পে নিরপরাধ মানুষের জীবনের বিনিময়ে হলেও তা আদায় করে নিতে পিছপা হয় না। তাদের নিষ্ঠুরতা সব কিছুকেই হার মানায়। তারা তাদের কৃত আচরণ দ্বারা এটাও প্রমান করার ঔদ্ধত্য দেখায় যে তাদেরই মত ছিলেন নবী-রাসূলগণ।

    তাদেরই ভাষ্যমতে তারা হল ‘মিস্টার মাওলানা’, অর্থাৎ দুই গ্রুপ থেকেই তারা পার্থিব পাওনা আদায় করে নেয়- গাছেরটা খায়, তলারটাও কুড়ায়। এজন্য কুরআনে তাদের আসল অবস্থানটা এভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে, “মুযাবযাবিনা বাইনা যালিকা লা-ইলা হা-উলায়ি, অলা ইলা হা-উলায়ি [مُذَبْذَبِينَ بَيْنَ ذَلِكَ لَا إِلَى هَؤُلَاءِ وَلَا إِلَى هَؤُلَاءِ]- এরা দোদুল্যমান অবস্থায় ঝুলন্ত; এদিকেও নয় ওদিকেও নয়।-৪:১৪২-১৪৩; মা হুম মিনকুম অলা মিনহুম অইয়াহলিফুনা ‘আলাল কাযিবি অহুম ইয়া’লামুন [مَا هُمْ مِنْكُمْ وَلَا مِنْهُمْ وَيَحْلِفُونَ عَلَى الْكَذِبِ وَهُمْ يَعْلَمُونَ]- তারা মুসলমানদের দলভুক্ত নয় এবং তাদেরও দলভূক্ত নয়। তারা জেনেশুনে মিথ্যা বিষয়ে শপথ করে-৫৮:১৪। এই ‘মিস্টার মাওলানা’ মুনাফিকদের সকল আচার-আচরণ, কথা-বার্তা, বেশ-ভূষায় সুবিধাবাদী দ্বৈত নীতির প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়।
    সবচে’ পরিহাসের বিষয় হল, এরা কুরআনের কথা মুখে বলে, কিন্তু কুরআন বুঝে পড়ার সময় তাদের নেই। এমনকি যখন এদের শীর্ষনেতৃত্বকে পর্যন্ত কুরআন দিয়ে ধরা হয় তখন তারা পিছু হঠতে শুরু করে। পার্থিব স্বার্থসিদ্ধির জন্য দ্বীনকে তারা শুধুমাত্র ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। তারা ধর্মের নামে যাবতীয় বাগাড়ম্বর করে অনেক ক্ষেত্রেই পার পেয়ে যায় এজন্য যে যাদের কাছে তারা এগুলো করে তাদের অধিকাংশই কুরআনে মূর্খ।

    ধর্মের এই বড় আবর্জনার স্তুপগুলো (menace) পরিষ্কার করতে পারলে ইসলামের এক বিশাল খেদমত সম্পন্ন করা যায়। এ লক্ষ্যে বহু পরিকল্পনা, কর্মতৎপরতা, বাস্তব পদক্ষেপ সমূহ রয়েছে যা স্বল্পমেয়াদে ও দীর্ঘমেয়াদে এই উগ্রপন্থাকে কার্যকরীভাবে প্রশমনে ভূমিকা রাখবে।
    বিনিময় বা মজুরি কামনা

    বাংলায় আমরা যে মজুরি শব্দটি ব্যবহার করি তা মূলতঃ আরবী ‘আজরুন’ শব্দ থেকে জাত। এই ‘আজরুন’ ধাতু থেকে অসাধারণ সব আয়াত পরিলক্ষিত হয় কুরআনে। আল্লাহ তার শেষনবীকে বলেনঃ আম তাছআলুহুম আজরান? তুমি কি তাদের কাছে কোন মজুরি বা বিনিময় দাবী কর?

     [أَمْ تَسْأَلُهُمْ أَجْرًا فَهُمْ مِنْ مَغْرَمٍ مُثْقَلُونَ]-“তুমি কি তাদের কাছে পারিশ্রমিক দাবী কর? যা তাদের কাছে জরিমানা বলে মনে হচ্ছে?”-৫২:৪০, ৬৮:৪৬
     “বল, আমি তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাই না বরং তা তোমরাই রাখ। আমার পুরস্কার তো আল্লাহর কাছে রয়েছে।“-৩৪:৪৭
     “তুমি এর জন্যে তাদের কাছে কোন বিনিময় চাও না। এটা (কুরআন) তো সারা বিশ্বের জন্যে উপদেশ বৈ নয়।“-১২:১০৪
     “বল, আমি তোমাদের কাছে এর কোন বিনিময় চাই না [مَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ], কিন্তু যে ইচ্ছা করে, সে তার পালনকর্তার পথ অবলম্বন করুক।“-২৫:৫৭

    পূর্বের সকল নবীগণ তাদের জাতিসমূহের কাছে ঘোষণা করে গেছেন যে তারা তাদের দাওয়াতের জন্য তাদের কাছ থেকে কোন বিনিময় চান না।

     “তারপরও যদি বিমুখতা অবলম্বন কর, তবে আমি তোমাদের কাছে কোন রকম বিনিময় কামনা করিনা। আমার বিনিময় হল আল্লাহর দায়িত্বে। আর আমার প্রতি নির্দেশ রয়েছে যেন আমি আনুগত্য অবলম্বন করি।“-১০:৭২ (হযরত নূহ)
     “হে আমার জাতি! আমি এজন্য তোমাদের কাছে কোন মজুরী চাই না; আমার মজুরি তাঁরই কাছে যিনি আমাকে পয়দা করেছেন; তবু তোমরা কেন বোঝ না?”-১১:৫১ (হযরত হুদ)
     “আর হে আমার জাতি! আমি তো এজন্য তোমাদের কাছে কোন অর্থ চাই না; আমার পারিশ্রমিক তো আল্লাহর জিম্মায় রয়েছে। … বরঞ্চ তোমাদেরই আমি অজ্ঞ সম্প্রদায় দেখছি (কওমান তাজহালুন)।“-১১:২৯ (হযরত নূহ)

    সর্বশেষ আল্লাহ মানবজাতিকে এই নির্দেশ প্রদান করেন যে,-
     “অনুসরণ কর তাদের, যারা তোমাদের কাছে কোন বিনিময় কামনা করে না, অথচ তারা সুপথ প্রাপ্ত [اتَّبِعُوا مَنْ لَا يَسْأَلُكُمْ أَجْرًا وَهُمْ مُهْتَدُونَ]।“-৩৬:২১

    অথচ অর্থের বিনিময়ে ইসলামের নছিহতকারী, চুক্তিতে বক্তৃতাকারী ওয়াজশিল্পী- যে নাকি তার সারাজীবন দ্বীন কেনা-বেচা করে আল্লাহর ক্ষমার সম্পূর্ণ অযোগ্য হয়ে গেছে, তার ভেদ কুরআনের আন-পড় একজন পার্থিব পন্ডিত কীভাবে ধরবে?

    এমনতরো কেউ যখন কুরআনের আয়াতকে মতলবী অর্থে তরজমা করে আদালতে বক্তব্য রাখে, তখন ধর্মভীরু একজন প্রাজ্ঞ বিচারকের পক্ষেও হতচকিত হয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হওয়া অস্বাভাবিক নয়, যা তার সঠিক রায় প্রদানর ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে।

    অথচ মুনাফিক শ্রেণী যে তাদের দুনিয়াবী স্বার্থ রক্ষার্থে কুরআনের আয়াতের বিকৃত অর্থ করবে, ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলবে তা কুরআনে বহু জায়গায় বলা হয়েছে।

    [أَفَتَطْمَعُونَ أَنْ يُؤْمِنُوا لَكُمْ وَقَدْ كَانَ فَرِيقٌ مِنْهُمْ يَسْمَعُونَ كَلَامَ اللَّهِ ثُمَّ يُحَرِّفُونَهُ مِنْ بَعْدِ مَا عَقَلُوهُ وَهُمْ يَعْلَمُونَ]-২:৭৫
    “হে মুসলমানগণ, তোমরা কি আশা কর যে, তারা তোমাদের কথায় ঈমান আনবে? তাদের মধ্যে একদল আল্লাহর বাণী শ্রবণ করে আসছে; অতঃপর বুঝে-শুনে তা পরিবর্তন করে থাকে এবং তারা তা ভালভাবেই অবগত।“

    [فَبِمَا نَقْضِهِمْ مِيثَاقَهُمْ لَعَنَّاهُمْ وَجَعَلْنَا قُلُوبَهُمْ قَاسِيَةً يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ عَنْ مَوَاضِعِهِ وَنَسُوا حَظًّا مِمَّا ذُكِّرُوا بِهِ وَلَا تَزَالُ تَطَّلِعُ عَلَى خَائِنَةٍ مِنْهُمْ إِلَّا قَلِيلًا مِنْهُمْ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاصْفَحْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ]-৫:১৩
    “অতএব, তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের দরুন আমি তাদের উপর অভিসম্পাত করেছি এবং তাদের অন্তরকে কঠোর করে দিয়েছি। তারা আল্লাহর কালামকে তার স্থান থেকে বিচ্যুত করে দেয় এবং তাদেরকে যে উপদেশ দেয়া হয়েছিল, তারা তা থেকে উপকার লাভ করার বিষয়টি বিস্মৃত হয়েছে। তুমি সর্বদা তাদের কোন না কোন বিশ্বাসঘাতকতা সম্পর্কে অবগত হতে থাকবে, তাদের অল্প কয়েকজন ছাড়া। অতএব, তুমি তাদেরকে মার্জনা কর এবং উপেক্ষা কর। আল্লাহ অনুগ্রহ কারীদেরকে ভালবাসেন।“

    এই বিকৃত অর্থ করার ক্ষেত্রে অন্যতম হল “জিহাদ” নামক শব্দটির উদ্দেশ্য-প্রণোদিত ব্যবহার। জিহাদ একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ যার মধ্যে কখনও কখনও ‘কিতাল’ও অন্তর্ভূক্ত। মূলত জিহাদ বলতে বুঝায় কঠোর চেষ্টা-সাধনা, একনিষ্ঠ অধ্যবসায়। সস্তা মুসলিম দরদকে কাজে লাগিয়ে তারা আমজনতাকে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় নামিয়ে পেছন থেকে ফায়দা লুটতে থাকে। এই যুদ্ধের ময়দানে তারা তাদের সন্তানদের কখনই পাঠায় না, কারণ অন্যের কাছে এই মৃত্যুকে শহীদী মর্যাদার তুল্য হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও সে নিজে এটাকে অন্তঃসারশূন্য আত্মত্যাগ হিসেবেই বিশ্বাস করে। এখানে তারা তাদের প্রতিপক্ষ শাসকদের বানায় ফেরআউন, আর তারা তাদের নির্বোধ কর্মী-সমর্থকদেরে সামনে মূসার ভূমিকায় কপট অভিনয় করতে চেষ্টা করে। কুরআনের চোখ দিয়ে দেখলে সহজেই বোঝা যায় এরা মিছা মূসা, আর সাচ্চা মুনাফিক। অন্যদিকে যাদেরকে ফেরআউন হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করা হয়, তারা কুরআনী সত্যের ধারক-বাহক না হলেও অন্ততঃ ফেরআউন নয়।

    [فَأَذَّنَ مُؤَذِّنٌ بَيْنَهُمْ أَنْ لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الظَّالِمِينَ () الَّذِينَ يَصُدُّونَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ وَيَبْغُونَهَا عِوَجًا وَهُمْ بِالْآَخِرَةِ كَافِرُونَ]-৭:৪৪-৪৫
    “অতঃপর একজন ঘোষক উভয়ের মাঝখানে ঘোষণা করবেঃ আল্লাহর অভিসম্পাত জালেমদের উপর। যারা আল্লাহর পথে বাধা দিত এবং তাতে বক্রতা অন্বেষণ করত। তারা পরকালের বিষয়েও অবিশ্বাসী ছিল।“-৭:৪৪-৪৫

    [وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا أُولَئِكَ يُعْرَضُونَ عَلَى رَبِّهِمْ وَيَقُولُ الْأَشْهَادُ هَؤُلَاءِ الَّذِينَ كَذَبُوا عَلَى رَبِّهِمْ أَلَا لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الظَّالِمِينَ () الَّذِينَ يَصُدُّونَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ وَيَبْغُونَهَا عِوَجًا وَهُمْ بِالْآَخِرَةِ هُمْ كَافِرُونَ]-১১:১৮-১৯
    “আর তাদের চেয়ে বড় যালেম কে হতে পারে, যারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করে। এসব লোককে তাদের পালনকর্তার সম্মূখীন করা হবে আর সাক্ষিগণ বলতে থাকবে, এরাই ঐসব লোক, যারা তাদের পালনকর্তার প্রতি মিথ্যারোপ করেছিল। শুনে রাখ, যালেমদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত। যারা আল্লাহর পথে বাধা দেয়, আর তাতে বক্রতা খুজে বেড়ায়, এরাই আখরাতকে অস্বীকার করে।“

    পূর্ববর্তী জাতিসমূহের মতই মুসলমান সমাজের এই মুনাফিক শ্রেণীও এই কুরআনকে সম্পূর্ণ বিকৃত করে ছেড়ে দিত যদি না আল্লাহ নিজেই এর রক্ষণাবেক্ষণের ভার গ্রহণ করতেন। যেহেতু কুরআনকে বিকৃত করতে অক্ষম তাই তারা কুরআনকে প্রতিস্থাপিত করেছে আল্লাহর রাসূলের নাম চালানো হাজারো মিথ্যা-জাল ‘হাদীস’ দ্বারা।

    আল্লাহর লা’নতঃ যারা সত্যকে লুকায় আর সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করে

    লা’নত (লাম, ‘আইন, নুন) শব্দটি কুরআনে আছে মোট ৪১ বার। আল্লাহ অবাধ্যতার কারণে শয়তানকে লা’নত করেছেন। আর শয়তানের দোসর কাফির মুনাফিককে লা’নত করেছেন। কুরআনের বহু সত্য রয়েছে যা প্রকাশ করলে মতলববাজদের পার্থিব হিসাবের বড় গড়মিল হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে তাই তারা সচেতনভাবে সেগুলো আমজনতা থেকে সযত্নে এড়িয়ে যায়। যারা দ্বীনকে দুনিয়া অর্জনের হাতিয়ারে পরিণত করেছে তারা সেই সকল সত্যকে লুকিয়ে রাখে আল্লাহ যা সবার সামনে প্রকাশ করতে বলেছেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে সত্যের সাথে মিথ্যাকে মিশ্রিত করে নিজেদের সংকীর্ণ দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের ঢাল বানিয়ে নেয়। এই মিথ্যাচার তারা নিজ দলীয় কর্মী-সমর্থকদের সাথে যেমন করে, তেমনি আমজনতার সাথেও করে- আর তারা নিজেদের অনেক চালাক মনে করে। এই শ্রেণীর সৃষ্টির প্রতি স্বয়ং স্রষ্টা অভিসম্পাত করেছেন। তারা এত ঘৃণ্য যে তাদের সাথে কিয়ামতের দিন কোন কথাও বলবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন।

    [إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنْزَلْنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالْهُدَى مِنْ بَعْدِ مَا بَيَّنَّاهُ لِلنَّاسِ فِي الْكِتَابِ أُولَئِكَ يَلْعَنُهُمُ اللَّهُ وَيَلْعَنُهُمُ اللَّاعِنُونَ]-২:১৫৯
    “নিশ্চয় যারা গোপন করে, আমি যেসব বিস্তারিত তথ্য এবং হেদায়েতের কথা নাযিল করেছি মানুষের জন্য কিতাবের মধ্যে বিস্তারিত বর্ণনা করার পরও; সে সমস্ত লোকের প্রতিই আল্লাহর অভিসম্পাত এবং অন্যান্য অভিসম্পাত কারীগণেরও অভিসম্পাত।“

    [إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ مِنَ الْكِتَابِ وَيَشْتَرُونَ بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا أُولَئِكَ مَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ إِلَّا النَّارَ وَلَا يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ]-২:১৭৪
    “নিশ্চয় যারা সেসব বিষয় গোপন করে, যা আল্লাহ কিতাবে নাযিল করেছেন এবং সেজন্য নগন্য মূল্য গ্রহণ করে, তারা নিজের পেটে আগুন ছাড়া আর কিছুই ঢুকায় না। আর আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাদের সাথে না কথা বলবেন, না তাদের পবিত্র করা হবে, বস্তুতঃ তাদের জন্যে রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব।“

    [وَعَدَ اللَّهُ الْمُنَافِقِينَ وَالْمُنَافِقَاتِ وَالْكُفَّارَ نَارَ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا هِيَ حَسْبُهُمْ وَلَعَنَهُمُ اللَّهُ وَلَهُمْ عَذَابٌ مُقِيمٌ]-৯:৬৮
    “ওয়াদা করেছেন আল্লাহ, মুনাফেক পুরুষ ও মুনাফেক নারীদের এবং কাফেরদের জন্যে জাহান্নামের আগুনের- তাতে পড়ে থাকবে সর্বদা। সেটাই তাদের জন্যে যথেষ্ট। আর আল্লাহ তাদের প্রতি অভিসম্পাত করেছেন এবং তাদের জন্যে রয়েছে স্থায়ী আযাব।“

    [قُلْ هَلْ أُنَبِّئُكُمْ بِشَرٍّ مِنْ ذَلِكَ مَثُوبَةً عِنْدَ اللَّهِ مَنْ لَعَنَهُ اللَّهُ وَغَضِبَ عَلَيْهِ وَجَعَلَ مِنْهُمُ الْقِرَدَةَ وَالْخَنَازِيرَ وَعَبَدَ الطَّاغُوتَ أُولَئِكَ شَرٌّ مَكَانًا وَأَضَلُّ عَنْ سَوَاءِ السَّبِيلِ]-৫:৬০
    “বলঃ আমি তোমাদেরকে বলি, তাদের মধ্যে কার মন্দ প্রতিফল রয়েছে আল্লাহর কাছে? যাদের প্রতি আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন, যাদের প্রতি তিনি ক্রোধাম্বিত হয়েছেন, যাদের কতককে বানর ও শুকরে রূপান্তরিত করে দিয়েছেন এবং যারা শয়তানের আরাধনা করেছে, তারাই মর্যাদার দিক দিয়ে নিকৃষ্টতর এবং সত্যপথ থেকেও অনেক দূরে।“
    যে কোন মুসলমানকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে তার উপর আল্লাহর লা’নত ও গযব দুটিই এবং তার জন্য স্থায়ী জাহান্নাম। ধর্মের এই দুর্বৃত্তরা দলীয় স্বার্থ হুমকির মুখে পড়লে স্বজাতি মুসলমানদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে এতটুকু দ্বিধাবোধ করে না। অবলীলায় তারা আল্লাহর সৃষ্টি মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। এদের সম্পর্কে বলা হয়েছে তারা চিরকাল জাহান্নামে থাকবে। লোক দেখানো ধর্মাচরণ তার কোন কাজে আসবে না। কুরআনে এতদূর পর্যন্ত বলা হয়েছে, “যে কেউ প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা ব্যতীত কাউকে হত্যা করে সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করে। এবং যে কারও জীবন রক্ষা করে, সে যেন সবার জীবন রক্ষা করে”। [مَنْ قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا]-৫:৩২।

    [وَمَنْ يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا]-৪:৯৩
    “যে ব্যক্তি স্বেচ্ছাক্রমে মুসলমানকে হত্যা করে, তার শাস্তি জাহান্নাম, তাতেই সে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেন (গযব), তাকে অভিসম্পাত (লা’নত) করেছেন এবং তার জন্যে ভীষণ শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন।“

    [وَيُعَذِّبَ الْمُنَافِقِينَ وَالْمُنَافِقَاتِ وَالْمُشْرِكِينَ وَالْمُشْرِكَاتِ الظَّانِّينَ بِاللَّهِ ظَنَّ السَّوْءِ عَلَيْهِمْ دَائِرَةُ السَّوْءِ وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَلَعَنَهُمْ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا]-৪৮:৬
    “এবং যাতে তিনি কপট বিশ্বাসী পুরুষ ও কপট বিশ্বাসিনী নারী এবং অংশীবাদী পুরুষ ও অংশীবাদিনী নারীদেরকে শাস্তি দেন, যারা আল্লাহ সম্পর্কে মন্দ ধারণা পোষণ করে। তাদের জন্য মন্দ পরিনাম। আল্লাহ তাদের প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেন, তাদেরকে অভিশপ্ত করেছেন। এবং তাহাদের জন্যে জাহান্নাম প্রস্তুত রেখেছেন। তাদের প্রত্যাবর্তন স্থল অত্যন্ত মন্দ।“

    কুরআনের যথাযথ পাঠ ও সময়োচিত প্রত্যাবর্তন

    আমরা যারা মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত তারাই যথাযথ কুরআন চর্চার অত্যন্ত মৌলিক ও জরুরী কাজটি করি না। আমাদেরকে সেই দায়ের জবাবদিহিতাও আল্লাহর দরবারে করতে হবে। অন্যদেরকে জাহান্নামে আর নিজেদেরকে জান্নাতে কল্পনা করে আমরা তৃপ্তি অনুভব করি, কিন্তু সেই ‘অন্যদের’ চেয়ে আমার অবস্থান যে জাহান্নামের আরো গভীরে স্থায়ীভাবে হতে পারে সেই সম্ভাবনাকে আঁচ করতে চাই না।

    ওজনওয়াালা কথা ওজন সহকারে পড়তে হয়, তাহলে তার ভিতরে প্রবেশ করা যায়, এবং তাও তখন নিজের ভিতরে প্রবেশ করে। দেড়সহস্র বছর ধরে সম্পূর্ণ অবিকৃত অবস্থায় মানবজাতির কাছে যে মহাগ্রন্থটি রয়েছে তার যথাযথ পাঠ (হাক্কা তিলাওয়াহ-২:১২১) মানবসমাজ সামগ্রকিভাবে করেনি। মানবজাতির (শুধু মুসলিম জাতি নয়) একজন সদস্যের কাছে কুরআন যে মনযোগ ও নিষ্ঠা দাবী করে তা সেই মহিমান্বিত কুরআন আমাদের কাছ থেকে আদায় করতে পারেনি।

    এত দীর্ঘ দিনের ধারাবাহিক চর্চার বদৌলতে অন্ততঃ মুসলমানের অস্থি-মজ্জার মধ্যে কুরআনের প্রতিটি শব্দ, শব্দগুচ্ছ, আয়াতাংশ, আয়াত মিশে যাবার কথা ছিল। এর সমার্থক শব্দ, বিপরীতার্থক শব্দ, সমোচ্চারিত শব্দ, লিঙ্গ-বচন, এর অলংকার-বাগধারা আমাদের মন-মননে একাকার হয়ে যেতে পারত।

    যে মানুষ এত এত গ্রন্থ এত মনোনিবেশ সহকারে অধ্যয়ন করে তারা তাদের স্রষ্টার গুরুভার বাণীগুলোকে কেন পরিত্যক্ত করে রেখেছে? অনিশ্চিত ও ক্ষণস্থায়ী জীবনের সাফল্যের সাধনায় মানুষ এত এত ত্যাগ স্বীকার করে, তবু মানুষ মহাপরাক্রান্ত এবং প্রজ্ঞাময় রব্বের সর্বশেষ ও চূড়ান্ত দলীল কুরআনের নেয়ামত-সূধা পানের মাধ্যমে চিরস্থায়ী কল্যাণের পথে কেন হাটে না? আহা! আমরা বহু বহু বিষয়ের মহাপন্ডিত, আর কুরআনে এসে মূর্খ।

    মানবজাতি কী সমষ্টিগতভাবে নিজেদেরকে এমন একটি অবস্থার দিকে ঠেলে দেবে যখন এই মতলবী উগ্রপন্থীরাই পৃথিবীর দখল নিয়ে নিবে, আর তখন মানবকূল বাধ্য হয়েই কুরআন চর্চা শুরু করবে (সেভাবে যেভাবে তা অধিত হওয়া উচিত), সেই উগ্রবাদীদের প্রতিরোধ করার জন্য?

    বনী ইসরাইলের সকল নবজাতক ছেলে-শিশুকে হত্যার হুকুম দিয়ে ফেরআউন বাঁচার পথ খুঁজতে চেয়েছিল। পরিহাস এই যে আল্লাহ সেই মূসাকে ফেরআউনের গৃহেই লালন-পালনের ব্যবস্থা করেছিলেন যার হাতে তার ধ্বংস লেখা ছিল। এজন্য আল্লাহ বলেনঃ
    [يَأْخُذْهُ عَدُوٌّ لِي وَعَدُوٌّ لَهُ]-(২০:৩৯) “তাকে এমন একজন উঠিয়ে নেবে যে আমার শক্র, তারও শক্র।“

    বিচিত্র নয় যে, কুরআন বর্জনের জন্য মানবজাতিকেও মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ অনুরূপ বাধ্য করতে পারেন সেই কুরআনের কাছেই ফিরে আসতে। তার বাস্তব লক্ষণ ইসলামী লেবাসে উগ্রপন্থার উত্থানের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হচ্ছে যার থেকে পরিত্রাণের জন্য মানবকূলকে কুরআনের কাছে ফিরে আসা ছাড়া দ্বিতীয় কোন বিকল্প নেই।

    অন্ততঃ মুসলমানদের ব্যাপারে আল্লাহ আফসোস করেন:-
    [أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آَمَنُوا أَنْ تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ وَمَا نَزَلَ مِنَ الْحَقِّ وَلَا يَكُونُوا كَالَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلُ فَطَالَ عَلَيْهِمُ الْأَمَدُ فَقَسَتْ قُلُوبُهُمْ وَكَثِيرٌ مِنْهُمْ فَاسِقُونَ]-৫৭:১৬
    “যারা মুমিন, তাদের জন্যে কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য কিতাব অবর্তীর্ণ হয়েছে, তার কারণে হৃদয় বিগলিত হওয়ার সময় আসেনি? তারা তাদের মত যেন না হয়, যাদেরকে পূর্বে কিতাব দেয়া হয়েছিল। তাদের উপর সুদীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হয়েছে, অতঃপর তাদের অন্তঃকরণ কঠিন হয়ে গেছে। তাদের অধিকাংশই পাপাচারী।“

    প্রত্যাবর্তন সময়োচিত হওয়াই ভাল। তাতে আক্ষেপ করতে হয় না। কেননা একসময় স্বীয় রব্বের সমীপে আমাদের প্রত্যাবর্তন করতেই হবে। মানবজাতির ব্যাপারে আল্লাহ পুনঃ আফসোস করেন- “কাইফা তাকফুরুনা বিল্লাহি…– কেমন করে তোমরা আল্লাহর ব্যাপারে কুফরী অবলম্বন করছ? অথচ তোমরা ছিলে নিষ্প্রাণ। অতঃপর তিনিই তোমাদেরকে প্রাণ দান করেছেন, আবার মৃত্যু দান করবেন। পুনরায় তোমাদেরকে জীবন দান করবেন। অতঃপর তারই প্রতি প্রত্যাবর্তন করবে।“-২:২৮

    মুসলিম, অমুসলিম, কাফির, মুনাফিক- সবাই এক আদমের সন্তান, আল্লাহর বান্দা। নিজের সৃষ্টি সকল অন্ধ গলি ঘুরেও শেষে তাঁর সন্নিধানে ফিরে আসবে সেই আশা ও সম্ভাবনার দ্বার আল্লাহ খোলা রাখেন। পুরো কুরআন জুড়েই সেই আহবান, আকাঙ্খা ব্যক্ত করা হয়েছে, আর আক্ষেপ ঘোষিত হয়েছে- ফাআইনা তাজহাবুন [فَأَيْنَ تَذْهَبُونَ]- অতএব তোমরা (কুরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে) কোন দিকে যাচ্ছ (৮১:২৬)?

    “এই হচ্ছে তোমাদের আল্লাহ, অতএব তোমরা কোথায় ঠোকর খাচ্ছ?” [ذَلِكُمُ اللَّهُ فَأَنَّى تُؤْفَكُونَ]-৬:৯৫; ১০:৩৪, ৩৫:৩। “তিনি আল্লাহ, তোমাদের পালনকর্তা, সব কিছুর স্রষ্টা। তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। অতএব তোমরা কোথায় বিভ্রান্ত হচ্ছ?” [ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ فَأَنَّى تُؤْفَكُونَ]-৪০:৬২।

    “অতএব, এ আল্লাহই তোমাদের প্রকৃত পালনকর্তা। আর সত্য প্রকাশের পরে (উদভ্রান্ত ঘুরার মাঝে) কি রয়েছে গোমরাহী ছাড়া? সুতরাং কোথায় ঘুরছ?”-[فَذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمُ الْحَقُّ فَمَاذَا بَعْدَ الْحَقِّ إِلَّا الضَّلَالُ فَأَنَّى تُصْرَفُونَ]-১০:৩২। “তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। অতএব, তোমরা কোথায় বিভ্রান্ত হচ্ছ?”-[ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ لَهُ الْمُلْكُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ فَأَنَّى تُصْرَفُونَ]-৩৯:৬।

    অতএব নানা ঘাটে ঠোকর খেতে খেতে একসময় যদি কারও সত্যের উপলব্ধি জাগ্রত হয়, আল্লাহ তার জন্য ক্ষমা আর অনুগ্রহের দরজা তখনও উন্মুক্ত রাখেন।

    [إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا وَأَصْلَحُوا وَبَيَّنُوا فَأُولَئِكَ أَتُوبُ عَلَيْهِمْ وَأَنَا التَّوَّابُ الرَّحِيمُ]-২:১৬০
    “তবে যারা তওবা করে এবং বর্ণিত তথ্যাদির সংশোধন করে মানুষের কাছে তা বর্ণনা করে দেয়, সে সমস্ত লোকের তওবা আমি কবুল করি এবং আমি তওবা কবুলকারী পরম দয়ালু।“

    [إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ وَأَصْلَحُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ]-৩:৮৯, ২৪:৫
    “কিন্তু যারা এরপর তওবা করে এবং সংশোধিত হয়, আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম মেহেরবান।“

    [إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا وَأَصْلَحُوا وَاعْتَصَمُوا بِاللَّهِ وَأَخْلَصُوا دِينَهُمْ لِلَّهِ فَأُولَئِكَ مَعَ الْمُؤْمِنِينَ وَسَوْفَ يُؤْتِ اللَّهُ الْمُؤْمِنِينَ أَجْرًا عَظِيمًا]-৪:১৪৬
    “অবশ্য যারা তওবা করে নিয়েছে, নিজেদের অবস্থার সংস্কার করেছে এবং আল্লাহর পথকে সুদৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে আল্লাহর ফরমাবরদার হয়েছে, তারা থাকবে মুসলমানদেরই সাথে। বস্তুতঃ আল্লাহ শীঘ্রই ঈমানদারগণকে মহাপূণ্য দান করবেন।“

    [ثُمَّ إِنَّ رَبَّكَ لِلَّذِينَ عَمِلُوا السُّوءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ تَابُوا مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ وَأَصْلَحُوا إِنَّ رَبَّكَ مِنْ بَعْدِهَا لَغَفُورٌ رَحِيمٌ]-১৬:১১৯
    “অনন্তর যারা অজ্ঞতাবশতঃ মন্দ কাজ করে, অতঃপর তওবা করে এবং নিজেকে সংশোধন করে নেয়, তোমার পালনকর্তা এসবের পরে তাদের জন্যে অবশ্যই ক্ষমাশীল, দয়ালু।“

    কিয়ামত নিকটবর্তীঃ সিদ্ধান্ত এখনই

    পুরো মানবজাতি তাদের শেষ হিসাব-কিতাবের খুবই সন্নিকটে এসে পড়েছে। আমরা প্রত্যেকে নিজ স্রষ্টার সামনে কিয়ামতের দিন একাকী হাজির হব- অকুল্লুহুম আতিহি ইয়াওমাল কিয়ামাতি ফারদা-[وَكُلُّهُمْ آَتِيهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَرْدًا]। যে কোন মুহূর্তে আমাদের ব্যক্তি-ডাক এসে যেতে পারে। তাই সিদ্ধান্ত এখনই।

    [اقْتَرَبَ لِلنَّاسِ حِسَابُهُمْ وَهُمْ فِي غَفْلَةٍ مُعْرِضُونَ () مَا يَأْتِيهِمْ مِنْ ذِكْرٍ مِنْ رَبِّهِمْ مُحْدَثٍ إِلَّا اسْتَمَعُوهُ وَهُمْ يَلْعَبُونَ]-২১:১-২
    “মানুষের হিসাব-কিতাবের সময় নিকটবর্তী; অথচ তারা বেখবর হয়ে মুখ ফিরিয়ে আছে। তাদের কাছে তাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে যখনই কোন নতুন উপদেশ আসে, তারা তা খেলার ছলে শ্রবণ করে। তাদের অন্তর থাকে খেলায় মত্ত।”

    যখন সত্যিই সেই সময় এসেই যাবে, তখন কী পরিস্থিতি হবে তাও মেহেরবানী করে আগেভাগে বলে দেয়া হয়েছে।

    [وَاقْتَرَبَ الْوَعْدُ الْحَقُّ فَإِذَا هِيَ شَاخِصَةٌ أَبْصَارُ الَّذِينَ كَفَرُوا يَا وَيْلَنَا قَدْ كُنَّا فِي غَفْلَةٍ مِنْ هَذَا بَلْ كُنَّا ظَالِمِينَ]-২১:৯৭
    “আর যথার্থ ওয়াদা ঘনিয়ে আসছে, তখন দেখবে, যারা অবিশ্বাস পোষণ করেছিল তাদের চক্ষু স্থির হয়ে যাবে। ”ধিক্ আমাদের, আমরা তো এ বিষয়ে উদাসীনতায় পড়ে রয়েছিলাম! বরং আমরা অন্যায়কারী ছিলাম।’’

    অতঃপর আমরা এই আদম সন্তানের প্রতিটি সদস্য একদিন মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর সামনে নতজানু অবস্থায় অধোবদনে হাজির হব (৪৫:২৮)। চূড়ান্ত ও শেষ বিজয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণ এবং মু’মিন বান্দাদের। কাফির-মুনাফিক নিরাশা, কঠিন শাস্তি-লাঞ্ছনার অথৈ সাগরে হাবুডুবু খেতে থাকবে।

    [وَاللَّهُ غَالِبٌ عَلَى أَمْرِهِ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ]-১২:২১
    “আল্লাহ নিজ কাজে বিজয়ী থাকেন, কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না।“
    [كَتَبَ اللَّهُ لَأَغْلِبَنَّ أَنَا وَرُسُلِي إِنَّ اللَّهَ قَوِيٌّ عَزِيزٌ]-৫৮:২১
    “আল্লাহ লিখে দিয়েছেনঃ আমি এবং আমার রাসূলগণ অবশ্যই বিজয়ী হব। নিশ্চয় আল্লাহ শক্তিধর, পরাক্রমশালী।“
    [وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُونَ]-৬৩:৮
    “কিন্ত ইজ্জত (ক্ষমতা) তো আল্লাহ্‌রই আর তাঁর রাসূলের আর মুমিনদের, কিন্ত মুনাফিকরা জানে না।“

    তাই সিদ্ধান্ত এখনই। আল্লাহর বন্ধু (৪:১২৫), মানবজাতির ইমাম বা নেতা (২:১২৪), মুসলিম জাতির পিতা (২২:৭৮), উত্তমাদর্শ (৬০:৪, ৬০:৬) হযরত ইব্রাহীম এবং শেষনবীসহ সকল নবী-রাসূলগণকে (সালামুন ‘আলাল মুরসালিন- তাঁদের সবার প্রতি শান্তি) অনুসরণের মাধ্যমে পুরো মানবজাতি এই গুরু দায়ভারকে খুবই সহজ করে নিতে পারে। মহান আল্লাহই সর্বোত্তম জ্ঞাতা।

    [يَا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءَكُمْ بُرْهَانٌ مِنْ رَبِّكُمْ وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكُمْ نُورًا مُبِينًا]-৪:১৭৪
    হে মানবকুল! তোমাদের পরওয়ারদেগারের পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট এসেছে স্পষ্ট প্রমাণ। আর আমি তোমাদের প্রতি উজ্জ্বল জ্যোতি অবতীর্ণ করেছি।

    [قَدْ جَاءَكُمْ بَصَائِرُ مِنْ رَبِّكُمْ فَمَنْ أَبْصَرَ فَلِنَفْسِهِ وَمَنْ عَمِيَ فَعَلَيْهَا وَمَا أَنَا عَلَيْكُمْ بِحَفِيظٍ] -৬:১০৪
    “তোমাদের কাছে তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে সূক্ষ্ণদৃষ্টি সম্পন্ন জ্ঞান এসেছে। অতএব, যে প্রত্যক্ষ করবে, সে নিজেরই উপকার করবে এবং যে (তা থেকে) অন্ধ হয়ে থাকে, তাহলে তার দায়িত্ব তার উপরই (বর্তাবে। তুমি বল); আমি তোমাদের উপর তত্ত্বাবধায়ক নই।“

    — সমাপ্ত।

    Reply
  2. আবু সাঈদ খান

    “ইসলামের নামে উগ্রপন্থা ও বিভ্রান্তি” মোকাবেলার সর্বোত্তম মারনাস্ত্র কুরআনুল কারীম

    [দ্বিতীয় অংশ]

    দ্বীনকে বিভক্ত করো না

    যখন কেউ বলে, আমি সুন্নি, আমি শিয়া, আমি আহমদী, আমি বাহাই বা আমি অমুক তরীকার, তমুক সিলসিলার– তখন সে ঠিক তাই যা সে ঘোষণা করে; সে মুসলিম নয়। কোন মুসলমান বিশ্বের যে প্রান্তেই থাকুক তার পরিচয় সে শুধুই মুসলমান। কেননা ইসলাম ভিন্ন অন্য কোন দ্বীন আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। “নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য দ্বীন একমাত্র ইসলাম [إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ]। এবং যাদের প্রতি কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের নিকট প্রকৃত জ্ঞান আসার পরও ওরা মতবিরোধে লিপ্ত হয়েছে, শুধুমাত্র পরস্পর বিদ্বেষবশতঃ, যারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহের প্রতি কুফরী করে তাদের জানা উচিত যে, নিশ্চিতরূপে আল্লাহ হিসাব গ্রহণে অত্যন্ত তৎপর”-৩:১৯।

    আবার আল্লাহ বলেছেন, তোমরা দ্বীনকে বিভক্ত কোর না। যারা তা করে তাদের সাথে রাসূলকে সম্পর্ক না রাখার জন্য হুশিয়ার করেছেন (ইন্নাল্লাজিনা ফাররাকু দিনাহুম অকানু শিয়া’আল্লাছতা মিনহুম ফি শাইয়্যিন-৬:১৫৯)। আবার বলেছেন- তোমরা ইসলামে পুরোপুরি দাখেল হও (২:২০৮)। আবার বলেছেন- তোমরা আল্লাহর কুরআনকে (হাবলুন-৩:১০৩) দৃঢ়রূপে ধারণ কর আর পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।

    আমরা যদি ইসলামে পুরোপুরি দাখেল হতে না পারি, তবে তা আমাদের ব্যর্থতা, অন্যায়। কিন্তু তাকে খন্ডিত করে ইসলামের মধ্যে গ্রুপিং, নতুন নামকরণ এবং তার বাজারজাত করণের কোন অধিকার কারো নেই। যখন কেউ বা কোন গোষ্ঠী তা করে তখন তা খোদার উপর খোদকারীর শামিল। চূড়ান্ত গর্হিত অপরাধ।

    আল্লাহ প্রশ্ন ছোড়েনঃ আ তু’আল্লিমুনাল্লাহা বিদিনিকুম (৪৯:১৬)- তোমরা কি আল্লাহকে তোমাদের ধর্মের জ্ঞান দিচ্ছ? দ্বীন পালন, প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি নামে আমরা আসলে কী করি তা তিনি ভাল করেই জানেন। এগুলো ইসলামের বিরুদ্ধে সুগভীর ষড়যন্ত্র। যারা জ্ঞানতঃ এর সাথে জড়িত, তারা শয়তানেরই দোসর, ধুরন্ধর ধান্ধাবাজ- আখিরাতের বিনিময়ে যারা দুনিয়াকে গ্রহণ করেছে (উলাইকাল্লাজিনাশ তারাউল হাইয়াতাত দুনিয়া বিল আখিরাহ-২:৮৬, ৪:৭৪)।

    আর যারা আবেগের বশবর্তী হয়ে সম্পৃক্ত হয়েছে, তারা ধর্মের ঠুনকো দরদী। ‘কল্যাণকর’ ভেবে তারা যা কিছু করে তা মূলতঃ হিতে বিপরীত হয়- আল্লাহর ক্রোধ উদ্রেককারী হয় যেহেতু তা কুরআন নির্দেশিত পথ ও পন্থার উল্টো। পুরো মানবজাতির ‘মুক্তির দলিলের’ একটি আয়াত বুঝে পড়বার সময় নেই, কিন্ত দিনের পর দিন দ্বীনের দায়ী সেজে অভিনয় আর পিকনিক; রাজপথে হৈচৈ।

    দ্বীন খন্ডনকারীদের পরিচয় ও মোকাবেলা

    মতলবী এই দ্বীন খন্ডনকারীদের এতই দুর্দশা যে তাদের খন্ডিত পরিচয় অন্য মুসলমানের কাছে প্রকাশ করতেও তারা শংকিত ও দ্বিধাগ্রস্ত থাকে। অথচ একজন মুসলমান এই ধরণের সকল দীনতা থেকে মুক্ত থাকবে। সে যেমন দাম্ভিক হবে না, তেমনি তার মুসলমানিত্বের পরিচয় প্রকাশেও তার কোন সংকীর্ণতা থাকবে না। দ্বীন খন্ডনকারীরা সমাজে চোরের মত গোপন এজেন্ডা নিয়ে ঘোরাফেরা করে, মিথ্যাচার করে, গুপ্তহত্যার মত কাপুরুষোচিত, জঘন্য কাজ করে যার সমর্থন ইসলামে নেই। এজন্য বলা হয়েছে “ইন্নাল মুনাফিকীনা হুমুল ফাসিকুন- নিশ্চয়ই মুনাফিকরা সত্যত্যাগী [إِنَّ الْمُنَافِقِينَ هُمُ الْفَاسِقُونَ]-৯:৬৭। ইন্নাল মুনাফিকীনা লাকাযিবুন- নিশ্চয়ই মুনাফিকরা ভীষণ মিথ্যাবাদী [إِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَكَاذِبُونَ]-৬৩:১।

    আল্লাহ তায়ালা যে বিষয়গুলোকে সুনির্দিষ্ট ভাবে নিষেধ করেছেন তা এই মুনাফিকশ্রেণী পদে পদে লংঘন করে। আল্লাহ ও ইসলামের শত্রুদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেছেন। তারা পার্থিব স্বার্থ রক্ষা করতে গোপনে ও প্রকাশ্যে সেই কাজটিই বেশি করে।

    [يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ أَتُرِيدُونَ أَنْ تَجْعَلُوا لِلَّهِ عَلَيْكُمْ سُلْطَانًا مُبِينًا]-৪:১৪৪
    “হে ঈমানদারগণ! তোমরা কাফেরদেরকে বন্ধু বানিও না মুসলমানদের বাদ দিয়ে। তোমরা কি এমনটি করে নিজের উপর আল্লাহর প্রকাশ্য দলীল কায়েম করে দেবে?”

    [أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ تَوَلَّوْا قَوْمًا غَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مَا هُمْ مِنْكُمْ وَلَا مِنْهُمْ وَيَحْلِفُونَ عَلَى الْكَذِبِ وَهُمْ يَعْلَمُونَ]-৫৮:১৪
    “তুমি কি তাদের প্রতি লক্ষ্য করনি, যারা আল্লাহর গযবে নিপতিত সম্প্রদায়ের সাথে বন্ধুত্ব করে? তারা মুসলমানদের দলভুক্ত নয় এবং তাদেরও দলভূক্ত নয়। তারা জেনেশুনে মিথ্যা বিষয়ে শপথ করে।“

    [يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا لَا تَتَوَلَّوْا قَوْمًا غَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ قَدْ يَئِسُوا مِنَ الْآَخِرَةِ كَمَا يَئِسَ الْكُفَّارُ مِنْ أَصْحَابِ الْقُبُورِ]-৬০:১৩
    “মুমিনগণ, আল্লাহ যে জাতির প্রতি রুষ্ট, তোমরা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করো না। তারা পরকাল সম্পর্কে নিরাশ হয়ে গেছে যেমন কবরস্থ কাফেররা নিরাশ হয়ে গেছে।“

    তারা প্রচুর মিথ্যা কথা বলে। কর্মী-সমর্থকরা প্রশ্ন উত্থাপন করলে তাকে পরিস্থিতি মোকাবেলায় ‘হেকমত’ হিসেবে চালিয়ে দেয়। তারা দেদারসে দ্বীন কেনা-বেচা করে দুনিয়া কামানোর জন্য। বিপদে জান বাঁচানোর জন্য হেন হীন পন্থা নেই যা তারা অবলম্বন করে না, যখন শেষ রক্ষা হয় না, তখন সেই মৃত্যুকেও নতুন বাণিজ্যের পুঁজি বানায়। তাকে শহীদী মৃত্যু হিসেবে বিপণন করে। নতুন আদম রিক্রুট করা হয জনগণের মধ্যে ‘শহীদী’ মর্তবা বিলি-বন্টন করতে, ‘শহীদের’ নামে স্মৃতিসংসদ বানিয়ে একাউন্ট খোলা হয় নতুন উদ্যমে চাঁদাবাজির জন্য।

    রাষ্ট্রযন্ত্রের যে এজেন্সি বা সংস্থাসমূহ বিভিন্ন পর্যায়ে এই উন্মত্ত গোষ্ঠীর সংস্পর্শে আসে তারা কীভাবে তাদের সাথ বোঝাপড়া করে থাকে? আর পাঁচজন সাধারণ সন্ত্রাসীর মতই নয় কি? বিশ্বাসের যে জায়গা থেকে তারা তাদের মত করে সমাজ পরিবর্তন করতে চায় তার পটভূমিতে এই সংস্থার সদস্যদের কোন বিচরণ কি আছে? তাদের নষ্ট বিশ্বাসের জায়গাটিতে কুরআন দ্বারা নাড়া দিয়ে তাদের ভ্রান্তি ধরিয়ে দেবার কোন প্রশিক্ষণ কি তাদের আছে?

    আইন-প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে আটক এই ভ্রান্তগোষ্ঠীকে শেষপর্যন্ত বিচার-ফয়সালার জন্য যেখানে চালান দেয়া হয়, সেই আদালত সংশ্লিষ্ট জেরাকারী আইনজীবী, তদন্তকারী কর্মকর্তা, রায় প্রদানকারী বিচারক- তাদেরও কি কুরআনের জ্ঞান রয়েছে? কুরআনকে যথাযথভাবে জেনে ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের জেরা করা, বিচার-ফয়সালা করা কি তাদের রুটিন কাজের মধ্যে পড়ে? মুনাফিকী তত্ত্বের ধারা-উপধারাগুলো কী তাদের রপ্ত করা আছে? আরও আছে পার্লামেন্ট এবং তার বিজ্ঞ সদস্যবৃন্দ। তাদেরকেও ‘ধর্মীয় জঙ্গীবাদের’ মত বিষয়গুলো মোকাবেলা করতে হয় আর পাঁচটি পার্থিব সংকট যেভাবে সমাধা করা হয় সেভাবে। কিন্তু মুনাফিক ঘায়েল করার অতি প্রয়োজনীয় “আল্লাহর ভয়েস” কি সংশ্লিষ্ট সকলের আছে?

    সংস্থাসমূহের বিদ্যমান ব্যবস্থাদি দ্বারা এই বিপুল বিভ্রান্ত গ্রুপগুলোকে সাময়িকভাবে দমিয়ে রাখা যেতে পারে, কিন্ত এই বিষবৃক্ষের মুলোৎপাটন একেবারেই অসম্ভব। এদেরকে ‘জঙ্গী এবং নিষিদ্ধ ঘোষণা’ করার মধ্যে কল্যাণ সামান্যই নিহিত। কুরআনের আয়াত দিয়ে এদের চরিত্র বিশ্লেষণ করে আমজনতার সামনে তাদের মুনাফিকী বৈশিষ্ট্যগুলো ধরিয়ে দিতে পারলে বরং স্থায়ী লাভ।

    এরা দ্বীনকে নগন্য মূল্যে (ছামানান কলিলা-২:৪১, ২:৭৯, ২:১৭৪, ৩:৭৭, ৩:১৮৭, ৩:১৯৯, ৫:৪৪, ৯:৯, ১৬:৯৫) কেনা-বেচার সামগ্রীতে রূপান্তরিত করেছে। আখিরাতকে বিসর্জন দিয়ে নগদ অর্জনের (৭৫:২০-২১) এক মহা হাতিয়ারে পরিণত করেছে আল্লাহর এই দ্বীনকে যা ঘোরতরভাবে নিষেধ করা হয়েছে কুরআনে। পরিহাস এই যে, ‘ইসলামী লেবাসের’ এই বিভিন্ন দলগুলো শেষপর্যন্ত দেশে দেশে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়- আর আগাগোড়া সেটাই তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকে।

    প্রথমত. এদের কাছে এদের মুখেই তাদের পরিচয়টা আমাদের জেনে নেয়া উচিত। একজন মানুষ আল-কায়েদা, কেউ হিযবুত, একজন জামাতী, খেলাফতী, একজন ইখওয়ানী; তো কেউ সালাফী, ওয়াহাবী, কেউ আহমদী; তারও পূর্বের বিভাজন রেখা রয়েছে, শিয়া-সুন্নী। কী অদ্ভূত!! এগুলো কোন পরিচয় হতে পারে? যেখানে স্বয়ং আল্লাহ আমাদের পরিচয় ও নাম দিয়ে দিয়েছেন মুসলমান হিসেবে। সকল নবীগণ ও তাঁদের সত্যানুসারীগণ একই ভাবে স্বীকারোক্তি করে গেছেন নিজেদের মুসলমান হিসেবে (নাহনু লাহু মুসলিমুন)। আল্লাহ তাঁর শেষনবীকে হুকুম করেছেন, তুমি বল আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেন আমি মুসলমানদের মধ্যে একজন হই [وَأُمِرْتُ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْمُسْلِمِينَ]-২৭:৯১।

    হযরত ইব্রাহীম (তাঁর উপর শান্তি) আমাদের সর্বশ্রদ্ধেয়, আদর্শ আত্মিক পিতা। আমাদের পিতা- যারা নিজেদেরকে মুসলমান বলে দাবী করি। তাদের নয় যারা দ্বীনকে খন্ডিত করে বিভিন্ন দলে বা গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে, নতুন নতুন ‘নাম’ পরিগ্রহ করেছে ইসলামেরই বহিরাবরণে- দ্বীন ‘প্রচার’, দ্বীন ‘প্রতিষ্ঠা’ দ্বীনের ‘খেদমত’ ইত্যাদি বাহানায়। ইব্রাহীম তাদের সবার পিতা যারা বলে- আনা মিনাল মুসলিমিন, ইন্নি মিনাল মুসলিমিন, উমিরতু আন আকুনা মিনাল মুসলিমিন, ও নাহনু লাহু মুসলিমুন (২:১৩৩, ২:১৩৬, ৩:৫২, ৩:৬৪, ৩:৮৪, ১২:৭২, ১২:৯০, ২৭:৯১, ২৯:৪৬, ৪১:৩৩, ৪৬:১৫)।

     খাতামুন্নাবিয়্যিন হযরত মুহম্মদকে (তাঁর উপর শান্তি) আল্লাহ নির্দেশ দিচ্ছেন- (তুমি বল) তাঁর কোন অংশীদার নেই। একথা বলার জন্য আমি আদিষ্ট হয়েছি, মুসলমানদের মধ্যে আমিই সর্বপ্রথম। [لَا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ]-৬:১৬৩; আরও ৬:১৪, ৩৯:১২, ৪০:৬৬।
     হযরত নূহ নবীর (তাঁর উপর শান্তি) কাছ থেকেও একই স্বীকারোক্তি আল্লাহ নিয়ে নিয়েছেন- [وَأُمِرْتُ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْمُسْلِمِينَ]-১০:৭২।
     হযরত মূসা (তাঁর উপর শান্তি) তাঁর জাতিকে মুসলমানিত্বের দোহাই দিয়ে ধৈর্য্য ধারণের আহবান জানাচ্ছেন- [وَقَالَ مُوسَى يَا قَوْمِ إِنْ كُنْتُمْ آَمَنْتُمْ بِاللَّهِ فَعَلَيْهِ تَوَكَّلُوا إِنْ كُنْتُمْ مُسْلِمِينَ]-১০:৮৪।
     হযরত সুলাইমান (তাঁর উপর শান্তি) সাবার রানীর কাছে যে চিঠি পাঠিয়েছিলেন তাতে তিনি তাদের প্রতি মুসলমান হবার আহবানই জানিয়েছিলেন। [إِنَّهُ مِنْ سُلَيْمَانَ وَإِنَّهُ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ () أَلَّا تَعْلُوا عَلَيَّ وَأْتُونِي مُسْلِمِينَ]-২৭:৩০-৩১, ২৭:৩৮। সাবার রানীও সে মর্মে মুসলমানিত্বের ঘোষণা জাহির করেছিলেন [وَكُنَّا مُسْلِمِينَ]-২৭:৪২।
     হযরত লূত নবীর (তাঁর উপর শান্তি) কওমকে আল্লাহ ধ্বংস করেন, শুধু বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর সাথের কতিপয় বান্দাকে যাদের পরিচয় আল্লাহ দিচ্ছেন মুসলমান হিসেবে। [فَأَخْرَجْنَا مَنْ كَانَ فِيهَا مِنَ الْمُؤْمِنِينَ () فَمَا وَجَدْنَا فِيهَا غَيْرَ بَيْتٍ مِنَ الْمُسْلِمِينَ]- ৫১:৩৫-৩৬।
     সত্যানুসন্ধিৎসু সকল আল্লাহর বান্দাদের সামনে যখন কুরআন তেলাওয়াত করা হয় তখন অবলীলায় তারা তাদের সমর্পণের স্বীকারোক্তি করে বলে, আমরা আসলে পূর্ব থেকেই মুসলমান (এই সত্যের প্রতি বিশ্বাসী) ছিলাম [وَإِذَا يُتْلَى عَلَيْهِمْ قَالُوا آَمَنَّا بِهِ إِنَّهُ الْحَقُّ مِنْ رَبِّنَا إِنَّا كُنَّا مِنْ قَبْلِهِ مُسْلِمِينَ]-২৮:৫৩।
     আল্লাহ আসমান থেকে সনদ জারী করেন, তাঁর কথার চেয়ে আর কার কথা উত্তম যে মানুষকে আল্লাহর (কুরআনের) দিকে ডাকে, এবং ভাল কাজ করে আর বলে যে সে মুসলমানদের মধ্যকার একজন [وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِمَّنْ دَعَا إِلَى اللَّهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ]-৪১:৩৩।
     চল্লিশোর্ধ একজন আদর্শ বান্দা তাঁর সত্য উপলব্ধি থেকেও সেই একই ঘোষণা দেয় যে, ইন্নি মিনাল মুসলিমিন-৪৬:১৫।
     যারা নিজেদেরকে মুসলমান পরিচয়ের বাইরে ব্রান্ডিং করে তাদেরকে আল্লাহ মুজরিম হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। [إِنَّ لِلْمُتَّقِينَ عِنْدَ رَبِّهِمْ جَنَّاتِ النَّعِيمِ () أَفَنَجْعَلُ الْمُسْلِمِينَ كَالْمُجْرِمِينَ]-৬৮:৩৪-৩৫। “মুত্তাকীদের জন্যে তাদের পালনকর্তার কাছে রয়েছে নেয়ামতের জান্নাত। আমি কি মুসলমানদেরকে অপরাধীদের (মুজরিম) ন্যায় গণ্য করব?”-৬৮:৩৪-৩৫
     কিয়ামতের কঠিন ময়দানে যাদেরকে নির্ভয় দেয়া হবে তাদের পরিচয় আল্লাহ নিজেই জানিয়ে দিচ্ছেন এই বলে যে, তারা ছিল মুসলমান। [يَا عِبَادِ لَا خَوْفٌ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ وَلَا أَنْتُمْ تَحْزَنُونَ () الَّذِينَ آَمَنُوا بِآَيَاتِنَا وَكَانُوا مُسْلِمِينَ]-৪৩:৬৮-৬৯। তারা আল-কায়েদা, বোকো হারাম ছিল; হিযবুত, জামাতী, ওয়াহাবী ছিল- নিশ্চয়ই এমন নয়।
     অতএব সেই চূড়ান্ত আহবানই করা হয়েছে কুরআনে আমাদের কাছেঃ আমরা মুসলমান হব কিনা? ফাহাল আনতুম মুসলিমুন [فَهَلْ أَنْتُمْ مُسْلِمُونَ]-২১:১০৮, ১১:১৪।
     ফেরআউনকে যখন তার দলবলসহ ডুবিয়ে দেয়া হয়, তখন তারও শেষ উপলব্ধি হয় নিজেকে মুসলমান ঘোষণা করার- আনা মিনাল মুসলিমিন [وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ]-১০:৯০। “এমনকি যখন তারা ডুবতে আরম্ভ করল তখন বলল, আমি ঈমান আনলাম যে, কোন মা’বুদ নেই তাঁকে ছাড়া যাঁর উপর ঈমান এনেছে বনী-ইসরাঈলরা। এবং আমিও মুসলমানদের একজন।“
     কুরআন সকল কিছুর ব্যাখ্যা, হেদায়েত ও রহমত এবং সুসংবাদদাতা তাদের জন্য যারা মুসলমান। [وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ تِبْيَانًا لِكُلِّ شَيْءٍ وَهُدًى وَرَحْمَةً وَبُشْرَى لِلْمُسْلِمِينَ]-১৬:৮৯; ১৬:১০২।
     যারা মুসলমান হয়নি, সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এই মহান পরিচয়কে গলার মালা করেনি তারা একদিন আফসোস করতে থাকবে যদি তারা মুসলমান হত। [الر تِلْكَ آَيَاتُ الْكِتَابِ وَقُرْآَنٍ مُبِينٍ () رُبَمَا يَوَدُّ الَّذِينَ كَفَرُوا لَوْ كَانُوا مُسْلِمِينَ]-১৫:১-২। “আলিফ-লাম-রা; এগুলো পরিপূর্ণ গ্রন্থ ও সুস্পষ্ট কুরআনের আয়াত। (এমন একটি সময় আসবে যখন) অস্বীকারকারীরা আকাঙ্ক্ষা করবে যে, কি চমৎকার হত, যদি তারা মুসলমান হত।“

    ফেরআউনও শেষক্ষণে মুসলমানিত্বের মালা গলায় জড়াতে চায়। আমরা হতভাগা মুসলমান যারা এই মহান পরিচয়ে নিজেদেরকে উপস্থাপিত করতে দ্বিধা ও সংকোচ বোধ করি, আর আমাদের মধ্যের মুনাফিক সম্প্রদায় ইসলামের সীমা লংঘন করে নতুন নতুন নাম গ্রহণ করে- শুধু মুসলমান নামে যাদের বাণিজ্য জমে না।

    শুধু কপাল পুড়েছে আমাদের। পৈত্রিকসূত্রে মুসলমানিত্ব আর কুরআন পেয়ে না পারলাম মাহাত্ম বুঝতে আর না প্রয়োজনীয় কদর করতে। আমাদের অবস্থা ‘হীরা ফেলে কাঁচ তুলে, যে ভুলে তোমারে ভুলে’র মত। কুরআনের মত মহাকল্যাণ (খইরান-১৬:৩০) হাতের কাছে রেখে তাকিয়ে থাকি পরকিয়ার মত অন্যের ক্ষণস্থায়ী চাকচিক্যের দিকে। তাদের রঙে রঞ্জিত হয়ে জাতে উঠার বৃথা চেষ্টা করি।

    জীবনে মুসলমান, মৃত্যুতেও মুসলমান; বাঁচা-মরা মুসলমান হিসেবেই। এর বাইরে মুসলমানের অন্য কোন রঙ নেই।

     যাদুকরদের যে দল ফেরআউন জড়ো করেছিল, তারা যখন হযরত মূসার আসল পরিচয় বুঝতে পারল তখন তারা প্রার্থনা করল যেন তাদের মৃত্যু মুসলমান হিসেবেই হয়। [وَمَا تَنْقِمُ مِنَّا إِلَّا أَنْ آَمَنَّا بِآَيَاتِ رَبِّنَا لَمَّا جَاءَتْنَا رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَتَوَفَّنَا مُسْلِمِينَ]-৭:১২৬
     হযরত ইউসুফ (তাঁর উপর শান্তি) প্রার্থনা করেছেন যেন তাঁর মৃত্যু মুসলমান অবস্থায় হয়। [رَبِّ قَدْ آَتَيْتَنِي مِنَ الْمُلْكِ وَعَلَّمْتَنِي مِنْ تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ فَاطِرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ أَنْتَ وَلِيِّي فِي الدُّنْيَا وَالْآَخِرَةِ تَوَفَّنِي مُسْلِمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ]-১২:১০১
     ‘ছবরুন জামিলের (পরম ধৈর্যশীল)’ অধিকারী নবী হযরত ইয়াকুব (তাঁর উপর শান্তি) তাঁর সন্তানদের শিক্ষা দিয়ে গেছেনঃ তোমরা মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। ফালা তামুতুন্না ইল্লা ওয়া আনতুম মুসলিমুন [فَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ]- ২:১৩২। সেই একই নির্দেশ আল্লাহ পুরো মানবজাতিকে দিচ্ছেন সুরা আল-ইমরানে [يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ]-৩:১০২। সেই মহান নবী ইয়াকুবের মৃত্যুর সময় তাঁর সন্তানগণ তাঁকে আত্ম-পরিচয়ের সেই ওয়াদাও করে গেছেন (২:১৩৩)।
    কুরআনের কোথাও তো ফেরকাবাজদের দ্বীন খন্ডনের সপক্ষে কোন দলীল নাযিল করা হয়নি। একমাত্র ইবলিস শয়তান ছাড়া আর কে তাদেরকে উদ্বুদ্ধু করেছে ইসলামের মধ্যে এইসব রকমারী নাম আমদানীর? ‘ধর্মের নামে দোকানদারী’ করা ছাড়া আর কীইবা উদ্দেশ্য এর পেছনে থাকতে পারে? তারা বস্তুতঃ নতুন নামে এক একটা নতুন ধর্ম আবিষ্কার করেছে যা আল্লাহর কাছে কখনও গৃহীত হবে না (তারা কি আল্লাহর দ্বীনের পরিবর্তে অন্য দ্বীন তালাশ করে?-৩:৮৩। যে লোক ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম তালাশ করে, কস্মিণকালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখেরাতে সে ক্ষতিগ্রস্ত-৩:৮৫)। এভাবেই যুগে যুগে বাহাই, আহমদীয়া, ইবাদী, মাহদাভীয়া ইত্যাদি ধর্ম চালু হয়েছে যারা গোড়াতে একই ছিল।

    দ্বিতীয়ত. তাদের কাছে যদি জানতে চাওয়া হয়, যে ‘খেলাফত’ তোমরা কায়েম করতে চাও সে সম্পর্কে কুরআনে কী বলা হয়েছে। তবে তা তারা বলতে পারবে না। হ্যাঁ, কুরআনের আন-পড় লোকদের সামনে তারা এমন কিছু বলে পার পেয়ে যায় যা দিয়েই তাকে আসলে প্রত্যাঘাত করা যায় কুরআনের জ্ঞান থাকলে। যদি জানতে চাওয়া হয় ‘খলিফা’ শব্দটি কুরআনে কত বার, কী অর্থে এসেছে তবে তারা হতবাক, লা-জওয়াব হয়ে যাবে। যদি জানতে চাওয়া হয় খলিফা মানে ‘শাসক’ বুঝায় কিনা- এর কোন উত্তর তার জানা নেই। যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, যে কুরআনী শাসন তোমরা কায়েম করতে চাও, সেই কুরআন আদৌ কি তোমরা পড়ার মত পড়? না, তারা দলবেধে তাদের দলীয় বাইবেল পড়ে।

    ধর্মের এই রটেন এলিমেন্টগুলো মুসলিম ইতিহাসের নষ্ট পাতা থেকে মনগড়া গল্প দিয়ে তাদের অভিপ্রায় সিদ্ধির ইশতেহার সাজিয়েছে। সেই গল্প শুনিয়েই তারা কোমলমতী তরুন-যুবাদের মগজ ধোলাই করে চিরস্থায়ী ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। তারা সেই খেলাফত কায়েম করতে চায় যা ইতিমধ্যে অভিশপ্ত হয়ে ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। যে খেলাফতের নোংরা কাহিনীতে মুসলিম ইতিহাসের পাতাগুলো সয়লাব। আঁস্তাকুড়ের পাতা কখনও স্বর্গে যায় না।

    অবিভাজ্য দ্বীনঃ সবাই অখন্ড দ্বীন ইসলামে শামিল হই

    কুরআনে কঠোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে “অলা তাফাররাকু (৩.১০৩)” অর্থাৎ “পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না” এবং “অলা তাতাফাররাকু ফিহি (৪২.১৩)” অর্থাৎ “দ্বীনে অনৈক্য সৃষ্টি করো না”। কিন্তু আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন এই নাটের গুরুরা সেটাই বেশি বেশি করে।

    আরবী ‘ফারাক’ শব্দটি আমরা বাংলা ভাষাভাষী যারা আছি তারা সবাই বুঝি- অর্থ ‘পার্থক্য করা, আলাদা করা’। “ফা, র, ক্বাফ”- এই ত্রিবর্ণীয় রুট থেকে ১৪টি ফর্মে জাত মোট শব্দসংখ্যা কুরআনে ৭২টি। ‘ফেরকা’, ‘ফেরকাবাজ’ ইত্যাদি নেতিবাচক শব্দ এখান থেকেই উদ্ভুত। দুনিয়াবী স্বার্থসিদ্ধির জন্য যারা দ্বীনকে ব্যাবহার করে, সেসব মুনাফিককে সূরা ত্বওবায় (৯.৫৬) বলা হয়েছে, ‘ক্বওমুই ইয়াফরক্বুন’ বা ‘ফেরকাবাজ সম্প্রদায়’ বা ’বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী’– তারা আল্লাহর নামে হলফ করে ঘোষণা করে যে তারা মুসলমান সম্প্রদায়েরই অন্তর্ভুক্ত, আল্লাহ তা’য়ালা জানিয়ে দেন যে তারা তোমাদের দলভুক্ত নয়।

    দ্বীনের প্রতি যদি দরদ থাকে, আমাদের নিজ গরজে দেখে নিতে হবে কতভাবে, কত ব্যঞ্জনায় ‘ফারাক’ শব্দটি কুরআনে ব্যবহৃত হয়েছে।

    [إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ إِنَّمَا أَمْرُهُمْ إِلَى اللَّهِ ثُمَّ يُنَبِّئُهُمْ بِمَا كَانُوا يَفْعَلُونَ]-৬:১৫৯
    “নিশ্চয় যারা স্বীয় ধর্মকে খন্ড-বিখন্ড করেছে এবং অনেক দল হয়ে গেছে, তাদের সাথে তোমার (শেষনবী) কোন সম্পর্ক নেই। তাদের ব্যাপার আল্লাহ তা’য়ালার নিকট সমর্পিত। অতঃপর তিনি বলে দেবেন যা কিছু তারা করত।”

    [مِنَ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ]-৩০:৩২
    “যারা তাদের ধর্মে বিভেদ সৃষ্টি করেছে এবং অনেক দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে উল্লসিত (কুল্লু হিযবিম্ বিমা লাদাইহিম ফারিহুন)।”

    [وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ وَأُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ]-৩:১০৫
    “আর তোমরা তাদের মত হয়োনা, যারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং নিদর্শনসমূহ আসার পরও বিরোধিতা করতে শুরু করেছে- তাদের জন্যে রয়েছে ভয়ঙ্কর আযাব।”

    [فَتَقَطَّعُوا أَمْرَهُمْ بَيْنَهُمْ زُبُرًا كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ] -২৩:৫৩
    “অতঃপর মানুষ তাদের অনুশাসনকে বহুধা বিভক্ত করে ফেলল। প্রত্যেক সম্প্রদায় নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে সন্তষ্ট।”

    [شَرَعَ لَكُمْ مِنَ الدِّينِ مَا وَصَّى بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ كَبُرَ عَلَى الْمُشْرِكِينَ مَا تَدْعُوهُمْ إِلَيْهِ اللَّهُ يَجْتَبِي إِلَيْهِ مَنْ يَشَاءُ وَيَهْدِي إِلَيْهِ مَنْ يُنِيبُ]-৪২:১৩
    “তিনি তোমাদের জন্যে দ্বীনের ক্ষেত্রে সে পথই নির্ধারিত করেছেন, যার আদেশ দিয়েছিলেন নূহকে, যা আমি প্রত্যাদেশ করেছি তোমার প্রতি এবং যার আদেশ দিয়েছিলাম ইব্রাহীম, মূসা ও ঈসাকে এই মর্মে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত কর এবং তাতে অনৈক্য সৃষ্টি করো না।”
    মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা মুনাফিকদের মুনাফিকী আচরণের কারণে পৃথিবীব্যাপী দ্বীন বিদ্বেষীদের দ্বীন-বিরোধী কার্যকলাপ যেমন প্রকট হচ্ছে, তেমনি সাধারণ মুসলমানদের দ্বীন পালন কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে।

    ‘হুয়া সাম্মাকুমুল মুসলিমিনা মিন ক্ববলু ওয়াফি হাজা’ [هُوَ سَمَّاكُمُ الْمُسْلِمِينَ مِنْ قَبْلُ وَفِي هَذَا]- “তিনিই (আল্লাহ) তোমাদের নাম রেখেছেন মুসলমান; পূর্বেও এবং এই কুরআনেও” (২২:৭৮),-এর বাইরে মুসলমানের কোন পরিচয় নেই, তার প্রয়োজন নেই; যে তেমন কোন পরিচয় বা ব্রান্ডে নিজেকে উপস্থাপিত করে বা কোন দলীয় এজেন্ডা ফেরি করে, তবে সে ঠিক তাই যে নাম সে গ্রহণ করেছে– অবশ্যই মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত নয়। ‘ইসলামে’র গন্ডির মধ্যে থেকেই নিজের, উম্মাহর এবং মানবজাতির জন্য যা কিছু কল্যাণ করতে চাই, তা করতে হবে (৩:৮৫)।

    দ্বীন অবিভাজ্য। অতএব যারা নতুন নতুন নামে দ্বীনের মধ্যে ফারাক সৃষ্টি করতে প্রয়াসী হয় তারাই ইসলামের বিচ্ছিন্নাতাবাদী গোষ্ঠী। ইসলামী মোড়কে পৃথিবীর সর্বত্র শত শত দল আছে যাদের সবারই ঘোষিত লক্ষ্য ‘ইসলাম কায়েম’; তাদেরকে যদি বলা হয় তোমরা এক হয়ে যাও; একক নেতৃত্বের অধীনে জমায়েত হও যেহেতু তোমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য একই- তবে সেটা তাদের পক্ষে ততদিনে সম্ভব নয় যতদিনে সূঁচের ছিদ্র দিয়ে উট প্রবেশ না করবে। যদি বলা হয়, শুধু বাংলাদেশ কেন সারা বিশ্বেই তোমরা সবাই ইসলাম কায়েম কর; কিন্তু ইসলামের গন্ডির মধ্যে থেকে, আর শুধুই মুসলিম হিসেবে- নতুন ব্রান্ডের কোন দল বা উপদলের এজেন্ট হয়ে নয়; খন্ডিত দ্বীনের ধ্বজাধারী হিসেবে নয়। তখন তাদের আগ্রহের ফুলানো বেলুন মুহূর্তের মধ্যেই ফুটো বেলুনের মত চুপসে যাবে। কেননা সেখানে তার কোন ব্যবসা নেই।

    হ্যাঁ, তারা মাঝে মাঝে এক জায়গায় হয়, সেটা ষড়যন্ত্র আর চক্রান্ত (নাজওয়া) করার জন্য। দুষ্কর্মে তারা ঐক্যমতে আসতে পারে। ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে দুনিয়া কামানো ছাড়া ইসলামের নাম ব্যবহারের আর কোন উদ্দেশ্য তাদের পেছনের ইবলিসী শক্তির নেই। তারা যেটা কায়েম করতে চায় তা অবশ্যই ইসলাম নয়, “মোঘলাই ইসলাম” টাইপের একটা কিছু যেখানে রংমহল, শীষমহল, আল-হামরা ইত্যাকার বিষয়াদি থাকবে।

    বিশ্বাসের দুর্নীতি

    অন্ধ অনুকরণ মানুষের বিশ্বাসের জগতে দুর্নীতির প্রকোপ ঘটিয়েছে। সেই প্রশ্নাতীত আস্থার অন্যতম সুবিধাভোগী ‘আলেম-ওলামা-মাশায়েখ’, ‘আমীর-মুরুব্বী’ আর ‘পীর-মোজাদ্দেদ’ দাবীদারেরা। তারা আমজনতার এই বিশ্বাসকে জিইয়ে রাখতে কুরআনের সত্যকে লুকিয়ে ফেলে ও তাদের প্রচলিত বিশ্বাসের সমর্থনে মনগড়া গল্প বানিয়ে বলে। নিজ দায়িত্ব ভুলে যাওয়া সাধারণ মুসলমান তাতে আশ্বস্ত বোধ করে। শুধু তাই নয়, তারা এই লেবাসী গোষ্ঠীকে তাদের প্রভুর আসনে বসিয়ে দেয় (৯.৩১)।

    হিন্দু সমাজের সদস্যরা প্রাণহীন মূর্তির পূঁজা করে। পক্ষা্ন্তরে ক্ষয়িষ্ণু বিশ্বাসের জাহেল মুসলিম দাবীদারেরা জীবিত-মৃত শুধু নয়, মৃত ব্যক্তির পাথর বাঁধানো কবরের পর্যন্ত পূজা করে। যে হক্ব আল্লাহর প্রাপ্য তা অবলীলায় ঢেলে দেয় পীর-মোজাদ্দেদ-আমীর পদবীর ভন্ড-প্রতারক-শঠদের পদতলে। যারা এমনটি করে তা তাদের দুর্নীতিগ্রস্ত বিশ্বাসের নতিজা।

    একজন সত্যিকার মুসলমান কখনোই কারো জন্য- চাই সে যে কোন ধর্ম-বর্ণ বা গোষ্ঠী-সম্প্রদায়েরই হোক না কেন- হুমকি হয় না, হতে পারে না। তার জন্য অনেকেই হুমকি হতে পারে; কিন্তু সে কারো জন্য পেরেশানী বা উদ্বেগের কারণ হবে না। অথচ দ্বীন কায়েমের স্বঘোষিত ঠিকাদার এই ধর্ম-বেপারীদের কাছে স্বজাতিকেই উৎখাত হতে হয় প্রতিনিয়ত, প্রাণ দিতে হয় নির্মমভাবে, এদের হাতে দিনের পর দিন মসজিদসমূহ রক্তাক্ত হচ্ছে মুসলমানেরই রক্তে।

    এরাই কুরআন নির্দেশিত খাঁটি মুনাফিক শ্রেণী। সকল জঘন্য কাজই তারা ‘ইসলাম কায়েমের’ দোহাই দিয়ে কর্মী-সমর্থকদের কাছে জায়েজ করিয়ে নিয়েছে। কোন অমুসলিম কর্তৃক ইসলামের কোন বিষয়ের ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ হলে সীমার বাইরে গিয়ে এই শ্রেণীর সদস্যরা প্রতিবাদ-বিক্ষোভে পৃথিবী উত্তাল করে তোলে। অথচ এই মুনাফিকদের হাতেই মুসলমান, মসজিদ, আল্লাহর কুরআনের চূড়ান্ত অপমান, অবমাননা প্রতিনিয়ত হচ্ছে।

    শেষনবীর (তাঁর প্রতি শান্তি) প্রতি তাদের কপট দরদ প্রকাশের কোন সুযোগই তারা হাতছাড়া করেনা। অথচ সেই নবীর নামে হাজার হাজার মিথ্যা কথা তারা চালু করে রেখেছে যা কুরআনের শাশ্বত বানীর সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক; যা রাসূল বলতেই পারেন না। আল্লাহ এদেরকে বলেছেন সবচে’ বড় জালেম যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের নামে মিথ্যা কথা চালু করে যার সপক্ষে আল্লাহ কোন দলীল নাযিল করেন নাই।

    যারা এক প্রকার সস্তা দরদ থেকে দ্বীন কায়েমের জন্য এ জাতীয় দ্বীন খন্ডনকারীদের বিভিন্ন প্লাটফর্মে জড়ো হয়, তাদের মধ্যে যদি সত্যানুসন্ধিৎসা থাকে তবে তাদের নষ্ট নেতৃত্বের আসল চেহারাটা বুঝতে পারা শুধুই সময়ের ব্যাপার। এমন অনেকেই আছে যারা তাদের ভুল বুঝতে পেরে এই মতলবী গোষ্ঠীর সংশ্রব পরিত্যাগ করে। আরা যারা ইতিমধ্যে বিশ্বের বাকী মানবতার জন্য হুমকি হয়ে দাড়িয়েছে, যারা নানা ছল-ছুতায় জিহাদের উন্মাদনা ও জিকির তুলে সমাজ-রাষ্ট্র ও পৃথিবীকে অস্থির করে তুলতে চাইছে, তাদের বিরুদ্ধেই রাষ্টসমূহকে এখন কুরআন দিয়ে “জিহাদান কাবিরা” বা বৃহত্তর জিহাদ [فَلَا تُطِعِ الْكَافِرِينَ وَجَاهِدْهُمْ بِهِ جِهَادًا كَبِيرًا -২৫:৩২] পরিচালনা করতে হবে।

    — পরের অংশে সমাপ্য।

    Reply
  3. আবু সাঈদ খান

    @Akash Malik

    “ইসলামের নামে উগ্রপন্থা ও বিভ্রান্তি” মোকাবেলার সর্বোত্তম মারনাস্ত্র কুরআনুল কারীম

    জিহাদান কাবিরা বা বৃহত্তর জিহাদ

    না, কখনোই না। অন্ততঃ ইসলামের নামে কৃত ‘টেররিজমের’ মোকাবেলা শুধুমাত্র ‘কাউন্টার টেররিজমের’ প্রচলিত অনুসঙ্গ দিয়ে করা যাবে না। তাতে সফলতা আসবে না, কথিত ‘জিহাদী’ উন্মাদনা ও উগ্রপন্থা নির্মূল হবে না।

    [লোকে ইসলামের নিন্দা করার জন্য বলে ‘ইসলামী উগ্রবাদ’ (Islamic extremism); না, উগ্রবাদ ইসলামী হয় না। ইসলাম কোন অবস্থাতেই সন্ত্রাসবাদ বা ফ্যানাটিসিজম শেখায় না। মুসলিম নামের কেউ ইসলামী মোড়কে দুর্বৃত্তপনা করলেই তাকে ইসলামী বলে চালানো অতি নিন্দনীয়, হঠকারী ও দূরভিসন্ধিমূলক।]

    বিশ্বের রাষ্ট্রসমূহ যত কলা-কৌশল ও শক্তি প্রয়োগ করুক না কেন, ধর্মীয় চরমপন্থা দমনে যত মিলিয়ন-বিলিয়ন ডলার ঢেলে দিক না কেন- তা শেষ বিচারে কার্যকর প্রমানিত হবে না। প্রচুর সময়-শ্রম-অর্থ ব্যয় করেও শেষ রক্ষা হবে না।

    সহজতম এবং অন্যতম সমাধান চিরন্তন সত্য, মহিমান্বিত কুরআন। যা এমন একজনের বাণী যিনি সকল মানুষের স্রষ্টা, তাদের মনের সকল গোপন কথা জানেন [إِنَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ]-৮:৪৩, ১১:৫, ৩৫:৩৮, ৩৯:৭, ৪২:২৪, ৬৭:১৩। “যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি জানবেন না? তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্ণদর্শী, সর্ববিষয়ে সম্যক জ্ঞাত”-৬৭:১৪। আর তিনি এমন যিনি তাদের মনের রোগ সম্পর্কে সম্যক অবগত [فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ]-২:১০, ৫:৫২, ৮:৪৯, ৯:১২৫, ২২:৫৩, ২৪:৫০, ৩৩:১২, ৩৩:৬০, ৪৭:২০, ৪৭:২৯, ৭৪:৩১।

    ভ্রান্ত ও কপট বিশ্বাসের গোড়ায় আঘাত করার জন্য কেবলমাত্র সেই কুরআনই হচ্ছে মোক্ষম মারনাস্ত্র। আল্লাহর কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে তাদের পরখ করে নেয়া, অন্তরের ব্যাধিগুলোকে কুরআন দিয়েই চিহ্নিত করে তাদের ধরিয়ে দেয়া। ‘কাউন্টার টেররিজম’ দ্বারা দমন-পীড়নের মাধ্যমে সাময়িক কণ্ঠরোধ করা যায়, নির্মূল করা যায় না বা যারা সংশোধনের যোগ্য তাদের প্রত্যাবর্তনের পথকে সুগম করা যায় না।

    উত্তম হল, সেই মহিমান্বিত কুরআন দিয়ে সকল মিথ্যা বিশেষ করে ইসলামের নামে চালু সকল মতলবী মিথ্যাকে প্রতিহত করা, কলুষিত অন্ধ বিশ্বাসের বেদীমূলে মহাসত্য (বিল হাক্ক) দিয়ে সজোরে আঘাত করা এবং তার আলো দিয়ে আল্লাহর সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বান্দাদের কলংকিত মৃত্যুর মিছিল থেকে জীবনের অভিযাত্রায় ফিরিয়ে আনা।

    কেননা এই মতলবী গোষ্ঠী- পার্থিব ভোগবিলাসের এক সাম্রাজ্য কায়েমই যাদের চূড়ান্ত গন্তব্য – আল্লাহ ও তাঁর শেষনবীর নামে প্রচুর মিথ্যা কথা চালু করেছে যা দিয়ে তারা আমজনতাকে ধর্মের নামে সহজেই বিভ্রান্ত করে দলে ভিড়িয়ে নিতে চেষ্টা করে।

    খন্ডিত দ্বীনের পতাকাবাহীরা মুসলমান তথা মানবতার বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ দূরভিসন্ধিমূলক ‘নকল জিহাদ’ চালু করেছে। রাষ্ট্রযন্ত্রসমূহকে তার প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থা, শক্তি ও বিচার ব্যবস্থাকে সাথে নিয়ে কুরআন দ্বারা এইসব কপট ও বাতিল শক্তির বিরুদ্ধে শুরু করতে হবে “জিহাদান কাবিরা” বা বৃহত্তর জিহাদ বা প্রচন্ড সংগ্রাম [جِهَادًا كَبِيرًا]; যেমনটি আল্লাহ তাঁর শেষনবীকে বলেছেন। এখানে লক্ষ্যনীয় যে, জিহাদান কাবিরার সাথে বস্তুগত মোকাবেলাকে সম্পৃক্ত না করে অস্ত্র হিসেবে কুরআনের উল্লেখ করা হয়েছে।

    এই যাবতীয় মিথ্যা শক্তিসমূহ নির্মূলে কুরআনের বাণী কতটা কার্যকরী তা আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন এভাবে-

    [بَلْ نَقْذِفُ بِالْحَقِّ عَلَى الْبَاطِلِ فَيَدْمَغُهُ فَإِذَا هُوَ زَاهِقٌ وَلَكُمُ الْوَيْلُ مِمَّا تَصِفُونَ]-২১:১৮
    “বরং আমি সত্যকে মিথ্যার উপর নিক্ষেপ করি, অতঃপর সত্য মিথ্যার মস্তক (দেমাগ) চুর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়, অতঃপর মিথ্যা তৎক্ষণাৎ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। তোমরা যা কিছু (মনগড়া) উদ্ভাবন করেছো, তার জন্যে তোমাদের দুর্ভোগ।“

    [وَيَمْحُ اللَّهُ الْبَاطِلَ وَيُحِقُّ الْحَقَّ بِكَلِمَاتِهِ إِنَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ]-৪২:২৪
    “বস্তুতঃ তিনি মিথ্যাকে মিটিয়ে দেন এবং নিজ বাক্য দ্বারা সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেন। নিশ্চয় তিনি অন্তর্নিহিত বিষয় সম্পর্কে সবিশেষ জ্ঞাত।“

    [لِيُحِقَّ الْحَقَّ وَيُبْطِلَ الْبَاطِلَ وَلَوْ كَرِهَ الْمُجْرِمُونَ]-৮:৮
    “যাতে করে সত্যকে সত্য এবং মিথ্যাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে দেন, যদিও অপরাধিরা অসন্তুষ্ট হয়।“

    আর যারা সত্যিকার আলো পেতে চায় তাদের জন্য বলা হয়েছে-

    [الر كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ لِتُخْرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ بِإِذْنِ رَبِّهِمْ إِلَى صِرَاطِ الْعَزِيزِ الْحَمِيدِ]-১৪:১
    “আলিফ-লাম-রা; এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি-যাতে তুমি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আন- পরাক্রান্ত, প্রশংসার যোগ্য পালনকর্তার নির্দেশে তাঁরই পথের দিকে।“
    একমাত্র কুরআনই পারে এজাতীয় ধর্মীয় বিভ্রান্তি মোকাবেলার মাধ্যমে যুতসই সমাধানে পৌছে দিতে। কেননা সম্মানিত কুরআন হচ্ছে-
    ক. কওলান ছাকীলা [قَوْلًا ثَقِيلًا]- ভারী বা ওজনওয়ালা কথা (৭৩:৫)
    খ. কওলাম বালিগা [قَوْلًا بَلِيغًا]- অন্তরস্পর্শী কথা (৪:৬৩)
    গ. বাছায়িরু লিন্নাস [هَذَا بَصَائِرُ لِلنَّاسِ]- মানবজাতির জন্য চক্ষু উন্মোচনকারী বা আলোকবর্তিকা (৪৫:২০)
    ঘ. বাছায়িরু মির রব্বিকুম [بَصَائِرُ مِنْ رَبِّكُمْ]- তোমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে চক্ষু উন্মোচনকারী বা আলোকবর্তিকা (৬:১০৪, ৭:২০৩)
    ঙ. আহসানাল হাদীস [أَحْسَنَ الْحَدِيثِ]- সর্বোত্তম বাণী (৩৯:২৩)
    চ. তাফসিলা কুল্লি শাইয়িন [تَفْصِيلَ كُلِّ شَيْءٍ]- সকল বিষয়ের তফশিল (১২:১১১, ১০:৩৭)
    ছ. মা কানা হাদীসাই ইউফতারা [مَا كَانَ حَدِيثًا يُفْتَرَى]- এটা কোন মনগড়া কথা নয় (১২:১১১)
    জ. অমা কানা হাজাল কুরআনু আই-ইউফতারা মিন দুনিল্লাহ [وَمَا كَانَ هَذَا الْقُرْآَنُ أَنْ يُفْتَرَى مِنْ دُونِ اللَّهِ]- আর কুরআন এমন জিনিস নয় যে, আল্লাহ ব্যতীত কেউ তা বানিয়ে নেবে (১০:৩৭)

    জাতি-রাষ্ট্র যদি ইসলামী মোড়কের এই বিষফোড়া নির্মূলে আন্তরিক হয় তবে কুরআনী সমাধানে তাকে ফিরতেই হবে। আর যদি কোন অজ্ঞাত কারণে তাকে জিইয়ে রাখত চায় তবে তার দায়ভার তাদের উপরই বর্তাবে (অমান আসায়া ফায়ালাইহা-৪৫:১৫)।“আর যে অসৎ কর্ম করে, তা তার উপরই বর্তাবে। তোমার পালনকর্তা বান্দাদের প্রতি মোটেই যুলুম করেন না [ وَمَنْ أَسَاءَ فَعَلَيْهَا وَمَا رَبُّكَ بِظَلَّامٍ لِلْعَبِيدِ]”-৪১:৪৬।

    আসমান-যমীনের সবচে’ শক্তিশালী বানী (Most Powerful Words) এই কুরআন। কিন্তু সবাই কি তার ওজন স্বীয় উপলব্ধিতে আনতে পারে? কেন পারেনা তার কারণ বিশ্লেষণ, খেদ-আফসোস অনেক কিছুই ব্যক্ত করা হয়েছে খোদ কুরআনেই।

    বাংলায় ব্যবহৃত ‘আয়ত্ত’ শব্দটি যার অর্থ ‘অধীন’ বা ‘অধিগত’, তা আরবী ভাষার ‘ইহাত্বতুন’ ধাতুমূল থেকে উদ্ভূত। সূরা ইউনুস এবং সূরা নামলের নিম্নোক্ত আয়াত দুটিতে একই রুট থেকে ব্যবহার করা হয়েছে, ‘লাম ইউহিতু বিইলমিহি’ [لَمْ يُحِيطُوا بِعِلْمِهِ]- “যাকে এখনও জ্ঞান দ্বারা আয়ত্ত করেনি” এবং ‘লাম তুহিতু বিহা ইলমান’ [لَمْ تُحِيطُوا بِهَا عِلْمًا]- “তোমারা জ্ঞান দ্বারা তা আয়ত্ত করনি”।

    [بَلْ كَذَّبُوا بِمَا لَمْ يُحِيطُوا بِعِلْمِهِ وَلَمَّا يَأْتِهِمْ تَأْوِيلُهُ كَذَلِكَ كَذَّبَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الظَّالِمِينَ]
    “বরং সেই বিষয়কে তারা প্রত্যাখ্যান করে যাকে এখনও তাদের জ্ঞান দ্বারা আয়ত্ত করেনি। অথচ এখনও এর মর্ম তাদের কাছে আসেনি (Nay, they reject that of which they have no comprehensive knowledge, and the final sequel of it has not yet come to them)। এমনিভাবে তাদের পূর্ববর্তীরাও মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে। সুতরাং, লক্ষ্য করে দেখ, যালিমদের পরিণতি কেমন হয়েছে।“-১০:৩৯

    [حَتَّى إِذَا جَاءُوا قَالَ أَكَذَّبْتُمْ بِآَيَاتِي وَلَمْ تُحِيطُوا بِهَا عِلْمًا أَمْ مَاذَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ]-২৭:৮৪
    “যখন তারা উপস্থিত হবে, তখন আল্লাহ বলবেন, তোমরা কি আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিলে? অথচ এগুলো তোমারা জ্ঞানায়ত্ত করতে পারনি। বরং (বল) তোমরা আর কি করেছিলে?”

    [أَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ أَفَأَنْتَ تَكُونُ عَلَيْهِ وَكِيلًا () أَمْ تَحْسَبُ أَنَّ أَكْثَرَهُمْ يَسْمَعُونَ أَوْ يَعْقِلُونَ إِنْ هُمْ إِلَّا كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ سَبِيلًا]-২৫:৪৩-৪৪
    “তুমি কি তাকে দেখ না, যে তার প্রবৃত্তিকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে? তবুও কি তুমি তার যিম্মাদার হবে? তুমি কি মনে কর যে, তাদের অধিকাংশ শোনে অথবা বোঝে? তারা তো চতুস্পদ জন্তুর মত; বরং তার চেয়েও বিভ্রান্ত।“

    [وَلَقَدْ ذَرَأْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيرًا مِنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ لَهُمْ قُلُوبٌ لَا يَفْقَهُونَ بِهَا وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لَا يُبْصِرُونَ بِهَا وَلَهُمْ آَذَانٌ لَا يَسْمَعُونَ بِهَا أُولَئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ أُولَئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ]-৭:১৭৯
    “আর নিশ্চয়ই আমি বহু জ্বিন ও মানুষ সৃষ্টি করেছি জাহান্নামের জন্য। তাদের অন্তর রয়েছে, তার দ্বারা বিবেচনা করে না, তাদের চোখ রয়েছে, তার দ্বারা দেখে না, আর তাদের কান রয়েছে, তার দ্বারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত; বরং তার চেয়েও নিকৃষ্টতর। তারাই উদাসীন।“

    কুরআনের শিক্ষাকে আয়ত্ত করার পথে মানুষ তখনই এগিয়ে যাবে যখন তারা তাকে নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করতে থাকবে। তাই খুবই সঙ্গত প্রশ্ন রাখা হয়েছে একাধিকবার- “তারা কি তবে কুরআন নিয়ে চিন্তাভাবনা করে না?”

    [أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآَنَ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِنْدِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا]-৪:৮২
    “তবে কি এরা কুরআন নিয়ে চিন্তাভাবনা (অনুধাবন) করে না? পক্ষান্তরে এটা যদি আল্লাহ ব্যতীত অপর কারও পক্ষ থেকে হত, তবে এতো অবশ্যই বহু বৈপরিত্য দেখতে পেত।“

    [أَفَلَمْ يَدَّبَّرُوا الْقَوْلَ أَمْ جَاءَهُمْ مَا لَمْ يَأْتِ آَبَاءَهُمُ الْأَوَّلِينَ]-২৩:৬৮
    “অতএব তারা কি এই কালাম সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করে না? না তাদের কাছে এমন কিছু এসেছে, যা তাদের পূর্বপুরুষদের কাছে আসেনি?”

    সুরা মুহম্মদে আরও শাণিত বাক্যবাণে বলা হয়েছে-
    [أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآَنَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا]-৪৭:২৪
    “তারা কি কুরআন সম্পর্কে গভীর চিন্তা করে না? না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ?”

    কমন দুষমনঃ ইবলিস শয়তান

    ব্যক্তি-বিদ্বেষের জেরে আমরা পরস্পর পরস্পরের শত্রুতে রূপান্তরিত হয়েছি (বাগইয়াম বাইনাহুম- ২:২১৩, ৩:১৯, ৪২:১৪, ৪৫:১৭)। অথচ আমরা সবাই একই সত্তা আদম থেকে এসেছি (নাফসিউ অহিদাহ- ৪:১, ৬:৯৮, ৭:১৮৯, ৩১:২৮, ৩৯:৬)। আমরা সবাই একটি মাত্র জাতি (কানান্নাসু উম্মাতাও অহিদা-২:২১৩; মা কানান্নাসু ইল্লা উম্মাতাও অহিদা-১০:১৯)। [وَمَا كَانَ النَّاسُ إِلَّا أُمَّةً وَاحِدَةً فَاخْتَلَفُوا]- “আর সমস্ত মানুষ একই উম্মতভুক্ত ছিল, পরে পৃথক হয়ে গেছে।”-১০:১৯।

    আমাদের চেতনাতেই নেই যে আমরা আমাদের শত্রু হতে পারি না। হওয়া উচিত না- কেননা আমরা পৃথিবীর সবাই একজন আদর্শ পিতার সন্তান। তাদের মধ্যে কোন বৈরিতা কি কাম্য? আমরা আলবৎ ভুলে বসে আছি যে ইবলিস শয়তান শুধু মুসলমানদের নয়, বরং সম্মিলিতভাবে পুরো মানব-পরিবারের কমন দূষমন। সে কোন গোপন দস্যু নয়- বরং প্রকাশ্য দুষমন বা ‘আদুয়্যুম মুবীন [عَدُوٌّ مُبِينٌ]। কতবার বলা হয়েছে তা কুরআনে? সাত সাত বার (২:১৬৮, ২:২০৮, ৬:১৪২, ৭:২২, ১২:৫, ৩৬:৬০, ৪৩:৬২)। কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারণ করা হয়েছে তার পদাঙ্ক অনুসরণ না করতে (লা তাত্তাবিয়ু খুতুওয়াতিশ শাইতন- ২:১৬৮, ২:২০৮, ৬:১৪২, ২৪:২১)।

    বিতাড়িত শয়তান আল্লাহর দরবারে তাঁর ইজ্জতের উপর কসম খেয়ে আদম ও তাঁর সন্তানদের জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত করার জন্য হুমকি প্রদান করে এসেছে। “কলা ফাবি ইজ্জাতিকা লা উগবিয়ান্নাহুম আজমাইন [قَالَ فَبِعِزَّتِكَ لَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ]- সে বলল, আপনার ইজ্জতের কসম, আমি অবশ্যই তাদের সবাইকে বিপথগামী করে দেব”-৩৮:৮২। “যার প্রতি আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন। শয়তান বললঃ আমি অবশ্যই আপনার বান্দাদের মধ্য থেকে নির্দিষ্ট অংশ গ্রহণ করব“ [وَقَالَ لَأَتَّخِذَنَّ مِنْ عِبَادِكَ نَصِيبًا مَفْرُوضًا]-৪:১১৮।

    তাই আল্লাহ মানবজাতিকে পুনঃপুনঃ সতর্ক করেছেন-

    “হে বনী-আদম! শয়তান যেন তোমাদেরকে বিভ্রান্ত না করে; যেমন সে তোমাদের পিতামাতাকে জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছে এমতাবস্থায় যে, তাদের পোশাক তাদের থেকে খুলিয়ে দিয়েছি-যাতে তাদেরকে লজ্জাস্থান দেখিয়ে দেয়। সে এবং তার দলবল তোমাদেরকে দেখে, যেখান থেকে তোমরা তাদেরকে দেখ না। আমি শয়তানদেরকে তাদের বন্ধু করে দিয়েছি, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে না।“-৭:২৭

    “যে ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহর কুরআন (জিকর) থেকে অন্ধ সাজে, আমি তার জন্যে এক শয়তান নিয়োজিত করে দেই, অতঃপর সে-ই হয় তার সঙ্গী। শয়তানরাই মানুষকে সৎপথে বাধা দান করে, আর মানুষ মনে করে যে, তারা সৎপথে রয়েছে।“-৪৩:৩৬-৩৭

    কিন্তু বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। আমরা কুরআনে প্রদর্শিত আল্লাহর পথে না চলে সেই শয়তানেরই পদাঙ্ক অনুসরন করছি অধিকাংশ মানুষ (আকছারান্নাস) যা করতে আমাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে বারবার।

     আল্লাহর রঙ্গে রঞ্জিত (২:১৩৮) না হয়ে আমরা তাঁর দ্বীনকে শতধা বিচ্ছিন্ন করে নিজেদেরকে খন্ডিত ও বিকৃত রঙ্গে রাঙ্গিয়েছি।
     আল্লাহ ও তাঁর কুরআনকে যথার্থ কদর না করে (মা কদারুল্লাহা হাক্কা কদরিহি-৬:৯১, ২২:৭৪, ৩৯:৬৭) কদর করছি সকল মিথ্যা ও ক্ষণস্থায়ী শক্তিকে।
     যে ভালবাসা আল্লাহর প্রতি প্রদর্শন করা উচিত তা অবারিতভাবে দিয়ে দিচ্ছি শয়তানী শক্তির ধারক-বাহকদের।

    “আর কোন লোক এমনও রয়েছে যারা অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে এবং তাদের প্রতি তেমনি ভালবাসা পোষণ করে, যেমন আল্লাহর প্রতি ভালবাসা হয়ে থাকে (ইউহিব্বুনাহুম কাহুব্বিল্লাহ)। কিন্তু যারা আল্লাহর প্রতি ঈমানদার তাদের ভালবাসা ওদের তুলনায় বহুগুণ বেশী। আর কতইনা উত্তম হ’ত যদি এ জালেমরা পার্থিব কোন কোন আযাব প্রত্যক্ষ করেই উপলব্ধি করে নিত যে, যাবতীয় ক্ষমতা শুধুমাত্র আল্লাহরই জন্য এবং আল্লাহর আযাবই সবচেয়ে কঠিনতর।“-২:১৬৫

    মহাসত্য থেকে এই পৃষ্ঠ প্রদর্শন শেষবিচারে আমাদের জন্য কেবলমাত্র লাঞ্ছনাকর শাস্তিই বয়ে নিয়ে আসবে। কেউ যদি স্বেচ্ছায় সেই পরিণতি গ্রহণ করতে চায় তবে তা তার পূর্ণ এখতিয়ার। আমাদেরকে কুরআনে ফিরতে হবে নিজ কল্যাণ চিন্তা করেই।

     “এটা উপদেশ। অতএব যার ইচ্ছা, সে তার পালনকর্তার পথ অবলম্বন করুক [إِنَّ هَذِهِ تَذْكِرَةٌ فَمَنْ شَاءَ اتَّخَذَ إِلَى رَبِّهِ سَبِيلًا]।“-৭৩:১৯, ৭৬:২৯
     “কখনও না, এটা তো উপদেশ মাত্র। অতএব, যার ইচ্ছা, সে একে স্মরণ করুক [كَلَّا إِنَّهُ تَذْكِرَةٌ () فَمَنْ شَاءَ ذَكَرَهُ]।“-৭৪:৫৪-৫৫
     “এই দিবস সত্য। অতঃপর যার ইচ্ছা, সে তার পালনকর্তার কাছে ঠিকানা তৈরী করুক [ذَلِكَ الْيَوْمُ الْحَقُّ فَمَنْ شَاءَ اتَّخَذَ إِلَى رَبِّهِ مَآَبًا]।“-৭৮:৩৯
     “বলঃ সত্য তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে আগত। অতএব, যার ইচ্ছা বিশ্বাস স্থাপন করুক এবং যার ইচ্ছা অমান্য করুক [وَقُلِ الْحَقُّ مِنْ رَبِّكُمْ فَمَنْ شَاءَ فَلْيُؤْمِنْ وَمَنْ شَاءَ فَلْيَكْفُرْ]। আমি জালেমদের জন্যে অগ্নি প্রস্তুত করে রেখেছি, যার বেষ্টনী তাদেরকে পরিবেষ্টন করে থাকবে। যদি তারা পানীয় প্রার্থনা করে, তবে পুঁজের ন্যায় পানীয় দেয়া হবে যা তাদের মুখমন্ডল দগ্ধ করবে। কত নিকৃষ্ট পানীয় এবং খুবই মন্দ আশ্রয়।“-১৮:২৯
     “অতপর তোমার দায়িত্ব তো পৌছে দেয়া এবং আমার দায়িত্ব হিসাব নেয়া [فَإِنَّمَا عَلَيْكَ الْبَلَاغُ وَعَلَيْنَا الْحِسَابُ]-ফাইন্নামা ‘আলাইকাল বালাগু অ’আলাইনাল হিসাব-১৩:৪০।“

    পৃথিবীর শাসকবর্গ নিজেরা কুরআনে ফিরুক আর নাই ফিরুক; কিন্তু ধর্মের দুর্বৃত্তদের মোকাবেলা কুরআনকে বাদ দিয়ে? কখনোই না, কোন কালে বা স্থানেই সম্ভব নয়। বিশ্বনেতৃত্বকে তাদের ‘কাউন্টার টেররিজমের’ সিলেবাসে অপরিহার্য পাঠ্য হিসেবে কুরআনকে অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কাটা দিয়ে কাটা তোলার ধারণা কে না বোঝে?

    ইসলামের নামে যে ব্যক্তি বা দলসমূহ জেনে-বুঝে ইসলামি শিক্ষা-সৌন্দর্যের বিরুদ্ধ কাজ করে সে মুনাফিক, পাক্কা মুনাফিক। সে মুখে বলে আল্লাহতে বিশ্বাস করি, আখিরাতে বিশ্বাস করি কিন্তু আল্লাহ বলেন সে মুমিন নয়। মানবমুক্তির চূড়ান্ত দলীল কুরআনের শুরুতেই এই গোষ্ঠীর মুখোশ উন্মোচন করে দেয়া হয়েছে অসাধারণভাবে।

    “আর মানুষের মধ্যে কিছু লোক এমন রয়েছে যারা বলে, আমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান এনেছি অথচ আদৌ তারা ঈমানদার নয়। তারা আল্লাহ এবং ঈমানদারগণকে ধোঁকা দেয়। অথচ তারা নিজেদেরকে ছাড়া অন্য কাউকে ধোঁকা দেয় না কিন্তু তারা তা অনুভব করতে পারে না। তাদের অন্তঃকরণ ব্যাধিগ্রস্ত আর আল্লাহ তাদের ব্যাধি আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন। বস্তুতঃ তাদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে ভয়াবহ আযাব, তাদের মিথ্যাচারের দরুন। আর যখন তাদেরকে বলা হয় যে, দুনিয়ার বুকে দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করো না, তখন তারা বলে, আমরা তো মীমাংসার পথ অবলম্বন করেছি। মনে রেখো, তারাই হাঙ্গামা সৃষ্টিকারী, কিন্তু তারা তা উপলব্ধি করে না। আর যখন তাদেরকে বলা হয়, অন্যান্যরা যেভাবে ঈমান এনেছে তোমরাও সেভাবে ঈমান আন, তখন তারা বলে, আমরাও কি ঈমান আনব বোকাদেরই মত! মনে রেখো, প্রকৃতপক্ষে তারাই বোকা, কিন্তু তারা তা বোঝে না। আর তারা যখন ঈমানদারদের সাথে মিশে, তখন বলে, আমরা ঈমান এনেছি। আবার যখন তাদের শয়তানদের সাথে একান্তে সাক্ষাৎ করে, তখন বলে, আমরা তোমাদের সাথে রয়েছি। আমরা তো (মুসলমানদের সাথে) উপহাস করি মাত্র। বরং আল্লাহই তাদের সাথে উপহাস করেন। আর তাদেরকে তিনি ছেড়ে দিয়েছেন যেন তারা নিজেদের অহংকার ও কুমতলবে হয়রান ও পেরেশান থাকে। তারা সে সমস্ত লোক, যারা হেদায়েতের বিনিময়ে গোমরাহী খরিদ করে। বস্তুতঃ তারা তাদের এ ব্যবসায় লাভবান হতে পারেনি এবং তারা হেদায়েতও লাভ করতে পারেনি। তাদের অবস্থা সে ব্যক্তির মত, যে লোক কোথাও আগুন জ্বালালো এবং তার চারদিককার সবকিছুকে যখন আগুন স্পষ্ট করে তুললো, ঠিক এমনি সময় আল্লাহ তার চারদিকের আলোকে উঠিয়ে নিলেন এবং তাদেরকে অন্ধকারে ছেড়ে দিলেন। ফলে, তারা কিছুই দেখতে পায় না। তারা বধির, মূক ও অন্ধ। সুতরাং তারা ফিরে আসবে না।“-(২:৮-১৮)।

    মুনাফিকীঃ মূর্খ মুনাফিক আর পাক্কা মুনাফিক

    মুমিনের ভয়ংকর শত্রু মুনাফিক। আল-কুরআনের ৬২৩৬টি আয়াতের অনেকাংশ জুড়েই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মুনাফিকের চরিত্র বিশ্লেষণ করা হয়েছে মুমিনকে সতর্ক করার জন্য। কাফির মুমিনের যতটানা শত্রু, তারচে’ বহুগুণে ভয়ংকর শত্রু হচ্ছে মুনাফিক। পুরো কুরআনে মোট ১১বার আল্লাহ তাঁর সর্বশেষ রাসূলকে খাছভাবে ‘আলাম তারা ইলাল্লাজিনা- তুমি কি তাদেরকে দেখনা’ বলে মুনাফিককে চিহ্নিত করে দেখিয়েছেন। সূরা তাওবায় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, রাসূলের আশেপাশে বিদ্যমান আরব এবং মদীনাবাসীদের মধ্যে অনেকে আছে কঠিন স্তরের মুনাফিক (৯:১০১)। সুরা মুজাদালায় (৫৮.১৯) তাদেরকে বলা হয়েছে ‘হিযবুশ্ শাইতন’- মুনাফিকরা হচ্ছে শয়তানের দল। এরা কপট ও দ্বিমুখী আচরণে সিদ্ধহস্ত। তাদের ধূর্ততার চরিত্র চিত্রন করা হয়েছে কুরআনে ব্যাপকভাবে।

    [وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يُعْجِبُكَ قَوْلُهُ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيُشْهِدُ اللَّهَ عَلَى مَا فِي قَلْبِهِ وَهُوَ أَلَدُّ الْخِصَامِ]-২:২০৪
    “আর এমন কিছু লোক রযেছে যাদের পার্থিব জীবনের কথাবার্তা তোমাকে চমৎকৃত করবে। আর তারা সাক্ষ্য স্থাপন করে আল্লাহকে নিজের মনের কথার ব্যাপারে। প্রকৃতপক্ষে তারা ভীষণ কলহপ্রিয়।”

    [إِذَا جَاءَكَ الْمُنَافِقُونَ قَالُوا نَشْهَدُ إِنَّكَ لَرَسُولُ اللَّهِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ إِنَّكَ لَرَسُولُهُ وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَكَاذِبُونَ]-৬৩:১
    “মুনাফিকরা তোমার কাছে এসে বলেঃ আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আপনি নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূল। আল্লাহ জানেন যে, তুমি অবশ্যই আল্লাহর রাসূল এবং আল্লাহ (এটাও) সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, মুনাফিকরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী।“

    [وَإِذَا رَأَيْتَهُمْ تُعْجِبُكَ أَجْسَامُهُمْ]-৬৩:৪
    “তুমি যখন তাদেরকে দেখ, তখন তাদের দেহাবয়ব তোমার কাছে প্রীতিকর মনে হয়।“

    [وَمِمَّنْ حَوْلَكُمْ مِنَ الْأَعْرَابِ مُنَافِقُونَ وَمِنْ أَهْلِ الْمَدِينَةِ مَرَدُوا عَلَى النِّفَاقِ لَا تَعْلَمُهُمْ نَحْنُ نَعْلَمُهُمْ سَنُعَذِّبُهُمْ مَرَّتَيْنِ ثُمَّ يُرَدُّونَ إِلَى عَذَابٍ عَظِيمٍ]
    “আর তোমার আশ-পাশের আরবদের মধ্যে কিছু কিছু মুনাফেক আছে এবং কিছু লোক মদীনাবাসী থেকেও; এরা সবাই মুনাফেকীতে সিদ্ধহস্ত। তুমি তাদের জান না; আমি তাদের জানি। আমি তাদেরকে আযাব দান করব দু’বার, তারপর তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হবে কঠোরতম আযাবের দিকে”।-৯:১০১

    আর তাদের সর্বশেষ পরিণতি ব্যক্ত করা হয়েছে এভাবে-
    [إِنَّ الْمُنَافِقِينَ فِي الدَّرْكِ الْأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ وَلَنْ تَجِدَ لَهُمْ نَصِيرًا]-৪:১৪৫
    “নিঃসন্দেহে মুনাফেকরা থাকবে জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে। আর তোমরা তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী কখনও পাবে না।“

    আর ধর্মীয় উগ্রপন্থীরা যারা জ্ঞানতঃ মুনাফিকী করে থাকে, তারা যে হাজার হাজার কর্মী-সমর্থক তাদের আশেপাশে জড়ো করেছে তাদের বিশ্বাস কলুষিত, পঙ্কিল ও দূর্ণীতিগ্রস্ত। এরা অনেক ক্ষেত্রে না বুঝে, কোন রকম বাছ-বিচার ব্যতিরেকেই এক একটা ‘ইসলামী’ দোকানে ভিড় জমায় এবং শঠ নেতৃত্বের আরোপিত শিরক ও মুনাফিকীতে লিপ্ত হয় মূর্খোচিত পন্থায়। এই যে লক্ষ জনতা যারা একটা সস্তা দরদ থেকে বিভিন্ন প্লাটফর্মে ভিড়েছে, যাদেরকে ঢাল বা বলি হিসেবে ব্যবহার করছে পেছনের সুবিধাভোগী শ্রেণী, তাদের প্রতি সমাজের, রাষ্ট্রযন্ত্রের বড় দায়দায়িত্ব রয়েছে- তাদেরকে আত্মঘাতী খেলা থেকে নিবৃত্ত করতে, জীবনের সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনতে।

    এই শ্রেণীর আদম-সন্তানগণ মুসলমানদের মধ্যকার সেই অংশটি যারা মুখে ঈমানের দাবীদার, কিছু ইবাদত-বন্দেগীও করে; কিন্তু পার্থিব প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির দোলাচলে প্রতি মুহূর্তে যারা তাদের মহামূল্যবান ঈমানকে জলাঞ্জলি দিতে থাকে। নীচের আয়াতে তাদের দোদুল্যমানতার অসাধারণ চিত্র এবং তাদের প্রতি আল্লাহর বিদ্রুপাত্মক অভিব্যক্তিও ফুটে উঠেছে।

    সূরা নিসাঃ ৪:১৩৭-১৩৯ –”যারা একবার মুসলমান হয়ে পরে পুনরায় কাফের হয়ে গেছে, আবার মুসলমান হয়েছে এবং আবারো কাফের হয়েছে এবং কুফরীতেই উন্নতি লাভ করেছে, আল্লাহ তাদেরকে না কখনও ক্ষমা করবেন, না পথ দেখাবেন। সেসব মুনাফেককে সুসংবাদ শুনিয়ে দাও যে, তাদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব। যারা মুসলমানদের বর্জন করে কাফেরদেরকে নিজেদের বন্ধু বানিয়ে নেয় এবং তাদেরই কাছে সম্মান প্রত্যাশা করে, অথচ যাবতীয় সম্মান শুধুমাত্র আল্লাহরই জন্য।”

    সূরা নিসাঃ ৪:১৪২-১৪৩ -“অবশ্যই মুনাফেকরা প্রতারণা করছে আল্লাহর সাথে, অথচ তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতারিত করে। বস্তুতঃ তারা যখন সালাতে দাঁড়ায় তখন দাঁড়ায়, একান্ত শিথিল ভাবে লোক দেখানোর জন্য। আর তারা আল্লাহকে অল্পই স্মরণ করে। এরা দোদুল্যমান অবস্থায় ঝুলন্ত; এদিকেও নয় ওদিকেও নয়। বস্তুতঃ যাকে আল্লাহ গোমরাহ করে দেন, তুমি তাদের জন্য কোন পথই পাবে না কোথাও।”

    সূরা মুজাদালাঃ ৫৮:১৪-১৭ -“তুমি কি তাদের প্রতি লক্ষ্য করনি, যারা আল্লাহর গযবে নিপতিত সম্প্রদায়ের সাথে বন্ধুত্ব করে? তারা মুসলমানদের দলভুক্ত নয় এবং তাদেরও দলভূক্ত নয়। তারা জেনেশুনে মিথ্যা বিষয়ে শপথ করে। আল্লাহ তাদের জন্যে কঠোর শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন। নিশ্চয় তারা যা করে, খুবই মন্দ। তারা তাদের শপথকে ঢাল করে রেখেছে, অতঃপর তারা আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বাধা প্রদান করে। অতএব, তাদের জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি। আল্লাহর কবল থেকে তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তাদেরকে মোটেই বাঁচাতে পারবেনা। তারাই জাহান্নামের অধিবাসী তথায় চিরকাল থাকবে।”

    শুধুই “মুসলমান” হিসেবে (দ্বীনকে খন্ডিত করে, ইসলামী লেবাসে মোড়ানো অন্য কোন তৈরি করা ব্রান্ডে নয়) আমরা সবাই যখন কুরআনকে বুঝতে চেষ্টা করব, সম্মিলিতভাবে মজবুত করে আকড়ে ধরব- তখন দ্বীনের মতলবী দরদীদের আসল চেহারাটা (true colors) আমাদের সবার সামনে পরিস্ফুট হয়ে উঠবে।
    — চলমান।

    Reply
  4. পিনাকী দাশ

    জঙ্গী বা উগ্রবাদী হামলা ঠেকাবার কৌশল বা পারঙ্গমতায় আমাদের আইন শৃঙ্কলা বাহিনী যে দুরবল তা গুলশান এবং শোলাকিয়ার ঘটনা প্রমান করে। হামলার মাত্রা বোঝার আগেই নিজেদের চারজন সদস্যর প্রাণ গেল, আহত হল অনেকে। বিষয়টি গুরত্ত সহকারে ভাবতে হবে।

    Reply
  5. আবু সাঈদ খান

    “ইসলামের নামে উগ্রপন্থা ও বিভ্রান্তি” মোকাবেলার সর্বোত্তম মারনাস্ত্র কুরআনুল কারীম

    ভূমিকা
    জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ইস্যুতে বিশ্বে নতুন মেরুকরণ তৈরি হয়েছে- ইসলামের নামে উগ্রপন্থা সেখানে যোগ করেছে ভিন্ন এক মাত্রা। মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যকার কোন দল বা গোষ্ঠী কর্তৃক যখন কোন নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি, বিশেষ করে ধর্মের নামে উগ্র আচরণ বা অমুসলিম হত্যাযজ্ঞের মত ঘটনা ঘটে তখন তা অনেক মুসলমানকে দ্বিধায় ফেলে দেয়। সে প্রকাশ্যে এটাকে সমর্থন না করলেও মনে মনে অখুশি হয় না। কেননা, পৃথিবীর বহু প্রান্তে বহু দিন ধরে সম্প্রদায়গতভাব মুসলমান নির্যাতিত, নিগৃহীত- যারপরনেই বঞ্ছনার শিকার।

    কিন্তু সেই দ্বিধান্বিত মুসলিম সমাজের ঘোর তখনও পুরোপুরি কাটেনা যখন কোন মুসলিম নামধারী নির্বিচারে মসজিদে এবং মসজিদের বাইরে নিরপরাধ মুসলমানকে হত্যা করে ইসলামেরই দোহাই দিয়ে।

    মুসলমানের দীনতা
    বিশ্বে এই মুসলমান সম্প্রদায়ের সবচে’ বড় সংকট তারা মুসলমানিত্বের দাবীদার, অথচ যার ভিত্তিতে সেই দাবী তারা করে থাকে সেই মহিমান্বিত কুরআনের ব্যাপারে তারা গাফেল- ভীষণ উদাসীন। তারা কুরআনকে পরিত্যাক্ত করে রেখে দিয়েছে (কলার রসুলু ইয়া রাব্বি ইন্না কওমিত্তাখজু হাজাল কুরআনা মাহজুরা-২৫:৩০)। এটা তার সবচে’ বড় দীনতা। মূলতঃ তারা শুধুই বংশ পরম্পরায় মুসলমান নামের উত্তরাধিকারিত্ব বহন করছে, কিন্তু কুরআন পড়ে সেই পরিচয়কে যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে ঝালিয়ে নেয়নি। মুসলিম নামের লেবেলটি ছাড়া তার ভেতরে মুসলিম সত্তার কিছুই অবশিষ্ট নেই। আবার তার বর্তমান বলতেও কিছু নেই, শুধুই একটা ফিকে হয়ে যাওয়া অতীত রয়েছে যাকে সে খুব গৌরবান্বিত বলে মনে করে। যুগে যুগে এই হতাশাগ্রস্থ মুসলিম সম্প্রদায় সমাজের ধূর্ত ও কায়েমী শ্রেণীর হাতের ক্রীড়নকে রূপান্তরিত হয়েছে তার জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে।

    কুরআন-বিমুখ এই দরিদ্র ও হতাশ্রগ্রস্থ মুসলমানেরা তাই ব্যক্তি ও দলগতভাবে যুগে যুগে দ্বৈতনীতি অবলম্বন করে দুনিয়া অর্জনের জন্য শয়তান এবং শয়তানী শক্তির তাবেদারী করেছে; অন্যদিকে পরকাল ঠিক রাখার মানসে ইসলামী লেবাসও কিছুটা গায়ে চড়িয়েছে- এটাকেই কুরআনে বলা হয়েছে মুনাফিকী- যারা এই দলের না আবার ঐ দলেরও না। বিশ্বের মুসলমান আজ ব্যাপকহারে মুসলমানিত্বকে জলাঞ্জলী দিয়ে দলে দলে মুনাফিকের খাতায় নাম লিখিয়ে নিচ্ছে পার্থিব স্বার্থকে ঠিকঠাক রাখার জন্য- তারা যে কোন ত্যাগের বিনিময়ে ‘অর্থ’কেই তাদের প্রভু বানিয়ে নিয়েছে। কুরআন প্রত্যাখ্যানকারী কাফের জাহান্নামে যাবে, আর দ্বৈতনীতির মুসলিম নামধারী মুনাফিক জাহান্নামে কাফেরের চেয়েও অধিক নীচে অবস্থান করবে [إِنَّ الْمُنَافِقِينَ فِي الدَّرْكِ الْأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ وَلَنْ تَجِدَ لَهُمْ نَصِيرًا]-৪:১৪৫।

    মোকাবেলা
    আজ কুরআনে প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে মুসলমানের আত্ম-পরিচয় সংকট ঘোঁচানোর সময় যেমন এসেছে, তেমনি ভাবে কুরআনের আলো দিয়ে নিজ ঘরের ভেতর থেকেই জন্ম নেয়া ভয়ানক বিষাক্ত সাপের ছোবল থেকে নিজেদের এবং ভবিষ্যত প্রজন্মকে বাঁচানোর প্রয়োজনীয়তাও প্রকটভাবে অনুভূত হচ্ছে।
    মোকাবেলার এই আপাত কঠিন মহতী কাজটি সমাজে বসবাসকারী একজন মুসলমান যেমন কুরআনের ব্যক্তিগত চর্চা ও অভ্যাসের মাধ্যমে করবে, তেমনি রাষ্ট্রযন্ত্রও তার শক্তি ও সংস্থাসমূহকে কুরআনী অস্ত্রে সজ্জিত করে কপট বিশ্বাসী মুনাফিকশ্রেণীকে মোকাবেলায় জোরেশোরে এগিয়ে আসবে।
    কুরআন দ্বারা এই যাবতীয় বিভ্রান্তি মোকাবেলা মানবজাতির সার্বিক নিরাপত্তার প্রশ্নে ভীষণভাবে জরুরী।

    আমরা যদি সমষ্টিগত ভাবে কুরআনে চোখ বুলাই, তবে তার অপার সম্ভাবনাময় শক্তি সকলে উপলব্ধি করব। আমাদের জন্য যদি কুরআনের দরজা-জানালা উন্মুক্ত হয়, তবে ইহকাল আর পরকালে আর কে হতে পারে আমাদের চেয়ে অধিক সফলকাম?

    Reply
    • সাজ্জাদ রাহমান

      খুব ভালো বলেছেন। ধর্মের সঠিক জ্ঞান অর্জন ও পালনের মাধ্যমে অর্ধমকে ঠেকাতে হবে।

      Reply
    • Akash Malik

      “আমাদের জন্য যদি কুরআনের দরজা-জানালা উন্মুক্ত হয়, তবে ইহকাল আর পরকালে আর কে হতে পারে আমাদের চেয়ে অধিক সফলকাম”?

      কোরানের দরজা-জানালা বন্ধ আছে, নাকি কোনদিন বন্ধ ছিল? কুরআনের আলো দিয়ে সমস্যার সমাধান করবেন কিন্তু কিছু নমুনা পদ্ধতি না বাতলালে তো বুঝা যাচ্ছে না কীভাবে তা করা যায়।

      Reply
      • আবু সাঈদ খান

        ধন্যবাদ। তিনটি পৃথক পোস্টের মাধ্যমে কিছু ধারণা দিতে চেষ্টা করলাম।

  6. MD. Habibullah

    I am really very afraid now, Just even a month ago I was told that there are no IS terrorist link in our country at all. And I believed.But now ? I am asking for to protect the nation as well as country by ourselves. It is now not only responsibility of Govt. and law Enforcement agencies to handle. Plz plz come forward to tackle to help ourselves . Find them out. Terrorist are living with us, Just need to trace and track them out.They are few. Only we need to care to find their activity. When we will see somebody/bodies something not doing normal behave , doubtful character beside you ,be noted and take action. Because terrorists became brain washed by their Saitan. Even they take medicine to perform such kind of devil activities. Only you and me if keep our eyes open can be destroyed their Satanic game, So be witted , be care, look around you. Bangladesh is very small country. Everybody knows each other.

    Reply
  7. হাছান

    মৃত ব্যক্তিদের জন্য গভীর সমবেদনা , আমার প্রিয় দেশটিতে আগুনের লেলিহান শিখা ; আসুন সবাই শৃংখলা ও গনতান্ত্রিক পরিবেশে থাকি , আইনের শাসনে থাকি , ক্রশফায়ার বন্ধকরি , অপরাধীকে আইনের মাধ্যমে সুবিচার করি , স্বাভাবিক পথরুদ্ধ হলে অস্বাভাবিক অবস্হা ফিরে যা সকলের জন্যই ক্ষতিকর।

    Reply
  8. Bagha Bangalee

    “মিষটার মহসীন,
    বাংলাদেশের এই দুঃসময়ে আপনার সঠিক এবং সমৃদধ লেখাটি আমি সমসত বাংগালীকে মনযোগ দিয়ে পড়তে এবং টুইট করতে অনুরোধ করছি। জাতিধরম নিরবিশেসে আমরা অনাদিকাল হতে এদেশে বসবাস করে আসছি একসাথে। এখানে কেউ কারও ধরম নিয়ে একে অপরকে পৈচাসিকভাবে চাপাতি দিয়ে নৃসংস হত্যা করেনি। আমাদের সেই শানতির বাংগালী সমাজে কি ভাবে ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের উপস্থিত হল? এ ব্যাপারে আপনার বকতবব “গুলশানের পৈশাচিক হামলার ঘটনা বিশ্লেষণ করলে পরিস্কার হয় যে, হামলাকারীরা তীব্র ঘৃণা এবং প্রতিশোধপরায়ণ মানসিকতা থেকেই ‘হোলি আর্টিজান’ রেস্তোরাঁয় বিদেশিদের ওপর হামলা করেছে” খুবই সঠিক। আর যে যে উৎস থেকে অমুসলিম ও অবাঙালিদের ওপর এই ঘৃণা জন্ম নেয়ার কথা আপনি উললেখ করেছেন তাও সত্যি। প্রায় পচিশ বছর আগের ঘটনা, ঢাকা থেকে বেড়াতে আসে আমার এক পারিবারিক বনধু পরিবার। হঠাৎ আমার ন বছরের ছেলে দৌরে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করে, “ড্যাডি হিনদুরা নাকি বেহেসতে যেতে পারেনা”? আমরা তখন খাবার টেবিলে। আমার ঐ বনধুর ন বছরের ছেলেই নাকি বলেছে এ কথা। অপ্রসতুত বনধু এবং তার ইসত্রী তাদের ছেলেকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারল এ কথা নাকি ওর হুজুর যিনি ওকে হাদিস এবং পবিত্র কোরান পড়ান উনি বলেছেন। এভাবেই কোমলমতি শিশুদের মধ্যে ঘূনা ছড়াতে ছড়াতে আমাদের সমাজ আজ মানুষ হত্যার কারখানা হয়ে দাড়িয়েছে।“

    Reply
    • Sojib Ahsan

      Ata to sotti kotha…but ekhane hinsha r grina koi pelen bujhte parchi na. Onno dhormalombider porokaler obostha ki hobe seta jodi Dhorme ullekh thake, seta to apnar amar sobar jante hobe, ekhane oi hujur to apnar baccha k ba amar baccha k shekhai ni j tader hingsha korte hobe ba grina korte hobe. apnar dhormer proti gayan tai deya hoyesilo.

      Reply
  9. রাহিন খান

    আর যদি একটা ও হামলা হয় [ আল্লাহ তালা না করুন ] তবে কম পক্ষে একটা হলেও জঙ্গি ধরতে হবে …।।

    Reply
  10. L Gani

    জঙ্গিদের ছবি ফেইসবুকে শেয়ার করা ICT আইনে অপরাধ বলে জানলাম | তবে কথা হলো, ছবিগুলো শেয়ার না করলে সাধারণ মানুষ বা, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন এদের চিনবেন কি করে? যেমন ধরুন, সাম্প্রতিক সময়ে যে সব জঙ্গির পরিচয় উন্মোচিত হয়েছে, ফেইসবুকে ছবি শেয়ার না করলে তা কি এতো সহজে সম্ভব হতো?
    তার চেয়ে বরং যা করা যেতে পারে তা হলো, এ ধরণের ছবি বা পোস্টে কেউ জঙ্গি কর্মকান্ড সমর্থনমূলক কমেন্ট দিলে তাকে ICT আইনে দোষী সাব্যস্ত করে বিচারের আওতায় আনা হবে .. (বা, তেমন কিছু)..
    আইনপ্রণেতারা বিষয়টি ভেবে দেখুন |

    Reply
  11. আবু সাঈদ খান

    বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় উগ্রপন্থার যে মহাসংকট, তার সমাধান অতি সহজ। সেই সহজ সমাধানটা কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা। আর সেই কাঁটা হল ‘মহিমান্বিত কুরআন”। যেহেতু ইসলামী মোড়ক গায়ে জড়িয়ে তারা শয়তানী করে তাদের ঘায়েল করার সর্বোত্তম মারনাস্ত্র সেই কুরআনই। এদেরকে যতটা শক্তিশালী মনে করা হয়, কুরআনের মোকাবেলায় তারা ততটাই শক্তিহীন। প্রয়োজনের সময় যথার্থ আয়াতটি দিয়ে আঘাত করতে পারিনা বলেই আমরা কুরআনের অপরিসীম শক্তিকে অনুভবই করিনা।

    কুরআনের ভাষ্যমতে মানবজাতি একই সত্ত্বা (নাফসিন ওয়াহিদাহ), অর্থাৎ একই পিতা আদম থেকে আগত। তাই সুবিশাল এই মানব পরিবারকে একই উম্মত বা একজাতিও (উম্মাতান ওয়াহিদাহ) বলা হয়েছে। শেকড়ের এই সূত্র উল্লেখ করে আবার এটা বলা হয়েছে ‘পারস্পরিক বিদ্বেষের’ (বাগইয়ান বাইনাহুম) কারণে একজন মানুষ আর একজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

    কিন্তু তাই বলে বিচিত্র ভাষা বা বর্ণের মত বিশ্বাসের মতপার্থক্যের জন্য মানব সমাজের স্বাভাবিক সহাবস্থানকে মহিমান্বিত কুরআন অস্বীকার করে না। মানবজাতির নানা বৈচিত্রকে কুরআনে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে, তাকে বৈষম্যে রূপান্তরিত করা হয় নাই। ইসলামের সত্যকে কেউ মেনে না নিলে তার ব্যাপারে শেষনবীকে (তাঁর উপর শান্তি) জবরদস্তি করার কোন এখতিয়ার দেয়া হয় নাই।

    অন্যদিকে, ইসলামী বিশ্বাসের দাবীদার এমন বহু মানুষ রয়েছে যারা মূলতঃ সেই দাবী করে শুধুমাত্র সামাজিক ও গোষ্ঠীগত কিছু ফায়দা হাসিলের জন্য – তাও অনুপূঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে পবিত্র কুরআনে। এদেরকে বলা হয়েছে মুনাফিক এবং হিযবুশ্ শাইতন বা শয়তানের দল। তারা একজন বিশ্বাসী বান্দার জন্য একজন অবিশ্বাসীর চেয়েও বেশি ভয়ংকর। দ্বৈতনীতি চর্চার কারণে তারা শুধুমাত্র মুমিন মুসলমানের জন্যই নয় বরং পুরো মানবজাতির জন্যই এক গুরুতর হুমকি।

    সুতরাং মানবজাতির সাধারণ শত্রু , শয়তানের দোসর এই শ্রেণীটাকে চেনা-জানা এবং নিবৃত্ত করার পন্থা নির্ধারন আমাদের সবার জন্য অতি জরুরী হয়ে পড়েছে। মানব সভ্যতাকে বাঁচাতে, পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখতে তা আমাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিক কাজের তালিকায় এসে পড়েছে।

    এ লক্ষ্যে জাতিসংঘসহ প্রত্যেক জাতি-রাষ্ট্রেরই নিজস্ব বিভাগ বা সেল থাকা দরকার কুরআন-কেন্দ্রিক প্রয়োজনীয় গবেষণা এবং তার ফলাফল চরমপন্থীদের মোকাবেলার সাথে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে সরবরাহ করার জন্য। জাতিসংঘ এ ক্ষেত্রে তার অবস্থান থেকে মূল নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করতে পারে।

    পৃথিবী এবং পৃথিবীবাসী ধর্মীয় চরমপন্থার সকল অবিচার ও নৃশংসতা থেকে অতিসত্বর মুক্তি পাক।

    Reply
  12. Nusrat Jahan Prity

    দেশের সার্বিক পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে এবং ভবিষ্যতে এর পুনর্বার না ঘটতে দক্ষ , চৌকস গোয়েন্দা সংস্থার সুষ্ঠ নজরদারি বাড়ানো দরকার ।
    জঙ্গি গোষ্ঠীর নির্রমূলে সকলকে এক হয়ে কাজ করতে হবে, দলাদলি করেই আজ এই পরিস্থিতি ।

    Reply
  13. সুমন

    এরকম বাস্তব ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষন খুবই দরকারী। বেশীরভাগ মতামতই একপেশে। পড়লে মনে হয় বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বের জঙ্গি তৎপরতার কারন বিরোধী দল ও জামাত। এসব মতামত তাদেরকে জাতিসংঘে উপস্থাপন করতে দিলে কেমন হয়?

    Reply
  14. Nusrat Jahan

    আমরা একটুও সজাগ নই ।
    বার বার হুমকির সম্মুখীন হয়েও শেষ রক্ষা হল না ।
    একের পর এক ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর ও
    আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর অক্ষমতার প্রমাণ ।
    দেশে সাময়িক কোন বিপর্যয় ঘটলেও পুলিশ বাহিনী কতটা দুর্বল , যে সামরিক কমান্ডো ছাড়া উত্তরণের পথ নেই ।
    সত্যিই হতাশা ছাড়া কিছুই দেখতে পারছি না ।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—