২৩ জুন অনুষ্ঠিত রেফারেন্ডামে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেইনের এক্সিট বা প্রস্থান প্রস্তাব তথা ব্রেক্সিট জয়ী হওয়ার পর থেকে, দেশটির রাজনীতির দীর্ঘপ্রতিষ্ঠিত পাষাণ-ভিত্তি যেন বিগলিত হয়ে তারল্যের প্রাবল্যে সমগ্র ব্যবস্থা তরঙ্গ-বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে। রূপত, এই তরঙ্গে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল– ক্ষমতাসীন কনসারভেটিভ পার্টি ও প্রধান অপজিশন লেইবার পার্টি ভাসছে বেসামাল।

কনসারভেটিভ পার্টি ব্রেক্সিটের বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গেই কনসারভেটিভ প্রধানমন্ত্রী ডেইভিড ক্যামেরৌন তাঁর নেতৃত্বের ইতি জানিয়ে নতুন নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর জন্য স্থান করে দিতে এই অক্টোবরে দলীয় সম্মেলনে পদত্যাগ করবেন বলে অগ্রিম ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে, কে হবেন আগামী দিনের নেতা ও প্রধানমন্ত্রী, তা নিয়ে চলছে জল্পনা-কল্পনা।

লন্ডন সিটির প্রাক্তন মেয়র ইউরোস্কেপ্টিক বা ইউরো-সন্দিগ্ধ বরিস জনসন ভবিষ্যত নেতৃত্বের একজন প্রার্থী হিসেবে বহু আগে থেকেই রাজনীতি-সচেতন মহলে আলোচিত। আর, রেফারেন্ডামে তিনি ব্রেক্সিটের পক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছেন বলে, আগে থেকেই ব্রেক্সিট বিজয়ে ডিফ্যাক্টো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অনেকটা পূর্বকল্পিত। এখানে স্বাভাবিক যুক্তি হল, ব্রেক্সিটের বিজয়ের পর ব্রেক্সিটে বিশ্বাসী নেতারই প্রধানমন্ত্রী হওয়া উচিত, অন্যথায় বিশ্বাসের সঙ্গে কর্তব্যের দ্বন্দ্ব দেখা দেবে। অর্থাৎ, যিনি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে থাকায় বিশ্বাস করেন, তিনি প্রস্থানের পথে ভালো নেতৃত্ব দিতে স্বভাবতই সুচারু হবেন না।

কিন্তু বরিস জনসনের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, বৈশিষ্ট্য ও সর্বোপরি ভাবমূর্তি ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রিত্ব ও বিশ্বমণ্ডলে জার্মান নেত্রী অ্যাঞ্জেলা মার্কেল ও ভ্লাদিমির পুতিনের মত মোকাবেলা করার জন্য উপযুক্ত কি না, তা নিয়ে কনসারভেটিভ পার্টি এবং ব্রিটেইনের ডিপ স্টেইট আস্থা-অনাস্থায় তরঙ্গায়িত। যদিও প্রাক্তন কনসারভেটিভ নেতা ইয়ান ডানকান স্মিথের মতো কেউ কেউ বরিস জনসনের কথা নিশ্চিন্তির সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে শুরুতেই ঘোষণা করে দিয়েছিলেন, কিন্তু অল্প কদিনের মধ্যেই হৌম সেক্রেট্যারি থেরেসা ম্যের নাম বেশ জোরেশোরেই সামনে চলে আসে এবং দুদিন আগে তিনি স্বয়ং তাঁর ইচ্ছা ব্যক্ত করেন।

থেরেসা আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেকে কনসারভেটিভ পার্টির নেত্রী তথা প্রধানমন্ত্রিত্বের জন্যে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছেন। কিন্তু অত্যন্ত নাটকীয় ও অভাবনীয়ভাবে বরিস জনসন নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়িয়ে তাঁর শিবির থেকে লর্ড চ্যানসেলার সেক্রেট্যারি অব স্টেইট ফর জাস্টিস মাইকেল গৌভকে প্রার্থী হিসেবে মেনে নিয়েছেন।

বিষয়টি নাটকীয় এ কারণে যে, এর মাত্র দুদিন আগেই মাইকেল গৌভের স্ত্রী স্যারাহ ভাইনের একটি ইমেইল ‘ভুলবশত’ ফাঁস হয়ে যায়, যেখানে তিনি তাঁর স্বামীকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, বরিসকে নেতা হিসেবে সমর্থন করার আগে তিনি যেন আগামী ক্যাবিনেটে তাঁর অবস্থান কী হবে, সে-সম্পর্কে নিশ্চিত হোন। গৌভ বিষয়টিকে তাঁর স্ত্রীর ব্যক্তিগত মত বলে পাশ কাটিয়ে গেলেও, বাস্তবে তিনি বরিস জনসনের ওপর তাঁর সমর্থন প্রত্যাহার করে নিজেই প্রার্থী হিসেবে আবির্ভূত হন।

স্পষ্টত বরিস জনসন ব্রেক্সিট সেবা দান করে সম্ভবত ব্রিটেইনের রাজনীতিতে নিঃশেষিত হয়েছেন। তাঁর বহুদিনের লালিত স্বপ্নের প্রাসাদে মাইকেল গৌভ এভাবে গুঁড়িয়ে দেবেন, কে-ই-বা ভেবেছিল? বরিস জনসনের প্রতি মাইকেল গৌভের এহেন আচরণকে ব্রিটেইনের রাজনৈতিক মহলে শেইকসপিয়ারের ‘দ্য ট্র্যাজেডি অব জুলিয়াস সিজার’ নাটকের বিশ্বাসঘাতক ‘ব্রুটাস’ চরিত্রের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।

২৩ জুন অনুষ্ঠিত রেফারেন্ডামে ব্রেক্সিট-বিজয়ের সবচেয়ে মারাত্মক অভিঘাত পড়েছে লেইবার পার্টির ওপর। যদিও জানা গিয়েছে যে, বিষয়টি পূর্ব-পরিকল্পিত, কিন্তু দৃশ্যত ঘটনাটি এভাবে এসেছে যে, লেইবার দলের বামপন্থী নেতা জেরেমি করবিন ও তাঁর টিম আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রেক্সিটের বিপক্ষে থাকলেও, তিনি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে ব্রিটেইনের থাকার পক্ষে প্রত্যাশিত মাত্রায় সচেষ্ট ছিলেন না। একজন এমপি এমনও বলেছেন যে, জেরেমি করবিন বাস্তবে ব্রেক্সিটের পক্ষেই ভৌট দিয়েছেন।

গত রোববারে অবজারভার পত্রিকায় যখন প্রকাশিত হয় যে, জেরেমি করবিনের প্রাক্তন গুরু বামপন্থী টনিবেনের ডানপন্থী পুত্র ও তাঁর শ্যাডৌ ক্যাবিনেটের ডিফেন্স সেক্রেট্যারি হিলারি বেন তাঁর বিরুদ্ধে দলের ভেতরে একটা অভ্যুত্থান করার নকশা তৈরি করেছেন, তখন থেকে শুরু হয় লেইবার দলের মধ্যে রূপত উত্তাল তরঙ্গ।

জেরেমি করবিন সরাসরি ফৌন করেন হিলারি বেনকে এবং জিজ্ঞেস করেন প্রকাশিত ষড়যন্ত্র সম্পর্কে। বেন ষড়যন্ত্রের কথা অস্বীকার করেন কিন্তু করবিনকে জানান যে, তাঁর ওপর তিনি আস্থা হারিয়েছেন এবং তাঁর শ্যাডৌ ক্যাবিনেটে তিনি কাজ করতে চান না। এই পরিস্থিতিতে করবিন সঙ্গত কারণেই বেনকে বরখাস্ত করেন।

আর, বেনকে বরখাস্ত করার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় করবিনের শ্যাডৌ ক্যাবিনেটের ধস নামা। একের পর এক পদত্যাগ করতে থাকেন। প্রথম দশজন এবং পরে আর নজন পদত্যাগ করেন। তাদের সঙ্গে পদত্যাগ করেন মোট আঠার জন ক্যাবিনেট জুনিয়র মিনিস্টার এবং বিভিন্ন দায়িত্ব থাকা নজন ফ্রণ্টবেঞ্চার।

সম্ভবত জেরেমি করবিন এ-অভ্যুত্থানের জন্যে তৈরি ছিলেন। তাই, সঙ্গে সঙ্গে শূন্য পদগুলো তাঁর সমর্থক নেতাদের দিয়ে পূরণ করে নিয়েছেন। কিন্তু যা তিনি পূরণ করতে পারেননি, তা হচ্ছে লেইবার দলের পার্লামেণ্টারি পার্টি তথা এমপিদের মধ্যে তাঁর সমর্থনের অভাব।

গত সোমবারে জেরেমি করবিনের নেতৃত্বের ওপর লেইবার দলের দুই এমপি মার্গারেট হজ ও অ্যান কফির আনীত অনাস্থা প্রস্তাব মৌশন হিসেবে যখন গৃহীত হয় পরদিন অর্থাৎ মঙ্গলবারে গোপন ব্যালটে ভৌটের জন্যে, তখন পার্লামেণ্ট স্কোয়ারে সমবেত হন লেইবার পার্টির হাজার হাজার সদস্য ও সমর্থক। পুলিসের হিসাবে সেখানে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা ছিল দশ হাজার।

মঙ্গলবারে লেইবার দলের নেতা জেরেমি করবিনের ওপর লেইবার দলের এমপিদের আস্থা-অনাস্থা ভৌট হয় গোপন ব্যালটে। যা ভাবা হয়েছিল, মাত্র ৪০ জন এমপির আস্থা ও ১৭২ জন অনাস্থা প্রকাশ করেন জেরেমি করবিনের ওপর, যদিও গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলের নেতৃত্ব নির্বাচনে এমপিদের কোনো ভূমিকা নেই।

লেইবার দলের নেতা নির্বাচন করেন দলের সদস্যরা ভৌটের মাধ্যমে, আর এটিই জেরেমি করবিনের শক্তি। লেইবার পার্টির লক্ষ লক্ষ সদস্যের সমর্থন আছে বলেই জেরেমি করবিন তাঁর প্রাক্তন ক্যাবিনেটে ও পার্লামেণ্টারি পার্টিতে রূপত এত বিরোধিতার প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের মধ্যেও হিমালয়ের মতো শান্ত ও স্থির থেকে বলছেন:

“আমি নির্বাচিত হয়েছি লেইবার পার্টির লক্ষ লক্ষ সদস্য ও সমর্থকের সমর্থনে একটি ভিন্ন প্রকারের রাজনীতির জন্যে। আমি দুঃখিত যে, আমার শ্যাডৌ ক্যাবিনেট থেকে আজ কিছু পদত্যাগের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু যাঁরা আমাকে নির্বাচিত করেছেন– অথবা সারাদেশে যে অযুত-অযুত সমর্থক তাদেরকে প্রতিনিধিত্ব করার জন্যে লেইবার পার্টির প্রয়োজন– তাদের বিশ্বাসের সঙ্গে আমি ঘাতকতা করতে পারব না। যাঁরা লেইবার দলের নেতৃত্ব পরিবর্তন করতে চান, তাদেরকে গণতান্ত্রিক নির্বাচন মোকাবেলা করতে হবে, যেখানে আমিও একজন প্রার্থী হব।”

বহু জল্পনা-কল্পনার পর অবশেষে জেরেমি করবিনের নেতৃত্ব চ্যালেইঞ্জ করে প্রার্থী হতে চলেছেন সদ্য শ্যাডৌ ক্যাবিনেট মিনিস্টার হিসেবে পদত্যাগ করা অ্যাঞ্জেলা ঈগাল। পাশাপাশি শোনা যাচ্ছে আরেকজন প্রাক্তন শ্যাডৌ মিনিস্টার ওয়েন স্মিথও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন লেইবার দলের নেতৃত্বের পদে। ধারণা করা হচ্ছে, এদের দুজনের মধ্যে একজন অন্যজনের পক্ষে শেষ পর্যন্ত নিরস্ত হবেন। অ্যাঞ্জেলা ঈগল সাংবাদিকদের বলেছেন, ওয়েন স্মিথকে বসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

আমি মনে করি, ব্রেক্সিট যেমন জেরেমি করবিনের নেতৃত্বের জন্যে চ্যালেইঞ্জ এনেছে, তেমনি নতুন সুযোগও এনে দিয়েছে। কারণ, তিনি যদি সত্যিই ব্রিটেইনের শ্রমজীবী মানুষের সহায়ক অর্থনীতি, স্বাস্থ্যনীতি, শিক্ষানীতি, বাসস্থান-নীতি ও সর্বোপরি বিদেশ নীতির পরিপূরক রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে চান, তা মাল্টিন্যাশন্যাল কর্পোরেশনের স্বার্থরক্ষাকারী রাষ্ট্রোত্তীর্ণ রাষ্ট্র-সংঘ ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ভেতরে থেকে সম্ভব ছিল না।

যদিও সম্ভাব্য তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কায় কিংবা যুদ্ধের প্রস্তুতি পর্যবেক্ষণে বিশ্বজুড়ে যে-জাতীয়তাবাদী চেতনা নতুন শক্তি নিয়ে জাগরিত হচ্ছে, তারই অংশ হিসেবে ইউনাইটেড কিংডমের শুধু ব্রিটেইন– অর্থাৎ স্কটল্যাণ্ড ও উত্তর আয়ারল্যাণ্ডের বিপরীতে শুধু ইংল্যাণ্ড ও ওয়েলস– ‘দেশ ফিরে পাওয়া’র জন্যে ব্র্রেক্সিটের পক্ষে ভৌট দিয়েছেন, কিন্তু তা জনগণের দেশ হবে না, যদি না ব্রিটেইনের রাষ্ট্রক্ষমতায় জনগণের পক্ষের শক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।

ব্রিটেইনের রাজনৈতিক বর্ণালীতে লেইবার পার্টি ঐতিহাসিকভাবে শ্রমিক শ্রেণির দল হলেও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের আমল থেকে ‘নিউ লেইবার’ নাম ধারণ করে বস্তুত তার জন্মের প্রতিশ্রুতি থেকে বহু দূরে সরে গিয়েছে। তবে, নেতৃত্ব নির্বাচনের নীতি ও পদ্ধতিগত পরিবর্তনের কারণে অযুত অযুত সদস্যের ভৌটে বামপন্থী জেরেমি করবিন নেতৃত্ব আসার ফলে লেইবার পার্টির সুযোগ তৈরি হয়েছে তার পুরনো রাজনীতিতে ফিরে যাওয়ার। তবে, নিশ্চয় তাঁকে ব্লেয়ারপন্থীদেরকে পরাস্ত করে এগুতে হবে।

পরিশেষে, আমি মনে করি লেইবার দলের নেতৃত্ব যদি জেরেমি করবিন বিজয়ী হয়ে টিকে থাকতে পারেন এবং লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হয়ে প্রাণে বেঁচে থেকে দলের নেতৃত্ব দিতে পারেন, ব্রিটেইন নতুন কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বকে পথ দেখাবে।

বৃহস্পতিবার; ৩০ জুন, ২০১৬

লন্ডন, ইংল্যান্ড

মাসুদ রানালন্ডন-প্রবাসী শিক্ষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—