১. ভূমিকা:

বাংলাদেশের যে কোনো রাজনৈতিক দলের মতো অনেক আলোচিত-সমালোচিত রাজনৈতিক দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ গত এক মাসের বেশি সময় ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও মূলধারার গণমাধ্যমে জোরালো আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এসব অলোচনার বিশেষ দিকটি হল রাজনৈতিক বিশ্লেষক বা অন্য দলের কেউ এগুলো করছেন না– এগুলো করছেন:

ক. গত ১২ মার্চ জাসদের সম্মেলন ও কাউন্সিল অধিবেশন থেকে বের হয়ে যাওয়া ম্ঈউদ্দিন-শরীফ-মুশতাক-নাজমুল জোটের কয়েকজন নেতা– যারা দলের রাজনৈতিক-সাংগঠনিক চর্চার সঙ্গে একমত নন;

খ. ম্ঈউদ্দিন-শরীফ-মুশতাক-নাজমুল জোটের অপপ্রচারের সহজ শিকার দলের হাতেগোণা অল্প কয়েকজন সদস্য; এবং

গ. জোটের অপপ্রচারের সহজ শিকার দলের শুভানুধ্যায়ীদের অনেকে যারা জাসদের সম্মেলন ও কাউন্সিলে সংঘটিত ঘটনাবলী সম্পর্কে অবগত নন।

জোট-সদস্যদের বক্তব্য-বিবৃতি ও ফেইসবুক পোস্টের মাধ্যমে এবং মূলধারার গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে সেগুলো জেনে দলের কর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের অনেকে বলছেন কোনো রাজনৈতিক কারণে নয়– নিছক নেতৃত্বের ভাগাভাগির কারণে জাসদে তথাকথিত বিভক্তির সূত্রপাত হয়েছে।

বর্তমান রচনায় জাসদ রাজনীতির একজন নগণ্য প্রাথমিক সদস্য হিসেবে এবং জাতীয় কৃষক জোটের কোটা থেকে জাসদের ১২ মার্চের কাউন্সিল অধিবেশনের একজন কাউন্সিলর হিসেবে বর্তমান লেখক–

ক. জাতীয় কাউন্সিল বিষয়ে জোটের সদস্যদের প্রতিটি বক্তব্যের ব্যবচ্ছেদ করছেন ও ‘টু দি পয়েন্ট’ জবাব দিচ্ছেন;

খ. ঐক্যের মুখোশ পড়ে এই জোট পরিচালিত ঐক্যবিরোধী কার্যক্রমের সপ্রমাণ বিবরণ তুলে ধরছেন; এবং

গ. সারা দেশে জাসদের সদস্য-শুভানুধ্যায়ীদের যুক্তির সঙ্গে জানাচ্ছেন যে, জাসদ বিভক্ত হয়নি– কতিপয় নেতা রাজনৈতিক-সাংগঠনিক বিষয়ে রহস্যজনক আচরণ করে দল থেকে চলে গিয়েছেন মাত্র।

এখানে সরলভাবে মনে রাখা দরকার জোটের সদস্যরা কেবলমাত্র পদ-পদবির লোভেই বিশৃঙ্খলা তৈরি করেননি– নিজেরা পরষ্পরবিরোধী রাজনৈতিক চিন্তার অনুসারী হলেও একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্যে তারা সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন এবং জাসদের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক গতিশীলতার বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালনা করেছেন। দলের ভেতরের অতীতের বিশৃঙ্খলকারীরা যেভাবে সমকালের রাজনীতি ও সংগঠন থেকে বিলীন হয়ে গিয়েছেন– ম্ঈউদ্দিন-শরীফ-মুশতাক-নাজমুল জোটের রাজনৈতিক-সাংগঠনিক পরিণতিও হবে ঠিক সে রকম। এটা ইতিহাস ও রাজনীতির অমোঘ নিয়ম।

২. জাতীয় সম্মেলন:

১১ মার্চ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাসদের জাতীয় সম্মেলন ২০১৬ অনুষ্ঠিত হয়। সারা দেশ থেকে হাজার হাজার নেতাকর্মী এতে সমবেত হন; তাদের উপস্থিতিতে এক আনন্দমুখর পরিবেশে সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দলীয় নেতাদের পাশাপাশি মহাজোটের অপরাপর দলের নেতা এবং বাংলাদেশে চীনের অ্যাম্বাসেডর বক্তব্য রাখেন। জাসদের সীমিত অর্থনৈতিক সামর্থের মধ্যে আয়োজিত এ বিশাল সমাবেশ দল, ১৪ দল ও মহাজোটের রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক অনুপ্রেরণা জাগায়। সারা দেশ থেকে আসা দলের নেতা-কর্মীগণ সমাবেশ শেষে সে রাতে নিজ নিজ জেলায় ফেরত যান; ঢাকায় রয়ে যান কেবলমাত্র দলের ১২০৫ জন কাউন্সিলর।

এখানে বিশেষভাবে বলে রাখা দরকার যে, জাসদের ১২০৫ জন কাউন্সিলর নির্ধারণের ক্ষেত্রে যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় তা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন নির্বাচনী প্রক্রিয়ার চেয়েও নজিরবিহীন রকমের নিয়মতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ। ১২০৫ জন কাউন্সিলর নির্ধারিত হন জেলা কমিটি ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক শক্তি অনুযায়ী; এমনকি দলের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্যরাও দলের ভোটাধিকারপ্রাপ্ত কাউন্সিলর নন।

জেলা কমিটি ও সহযোগী সংগঠনগুলো আগেই নিজ নিজ শাখায় আলোচনা করে সাংগঠনিক পদবিসহ কাউন্সিলর তালিকা, তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি ঢাকায় দলের কার্যালয়ে প্রেরণ করে। কেন্দ্রীয় দফতর সে তালিকা অনুযায়ী কাউন্সিলরদের ছবিসহ কাউন্সিলর কার্ড প্রদান করে। জাসদের কাউন্সিল অধিবেশন কক্ষে কেবলমাত্র কাউন্সিলরগণই উপস্থিত থাকেন এবং রাজনৈতিক, সাংগঠনিক ও নির্বাচনী অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেন।

৩. জাতীয় কাউন্সিল ২০১৬: রাজনৈতিক অধিবেশন:

১২ মার্চ সকালে জাসদের কাউন্সিল অধিবেশন ২০১৬ শুরু হয় মহানগর নাট্যমঞ্চে দলের সভাপতি হাসানুল হক ইনুর সভাপতিত্বে। কাউন্সিলের প্রথম অধিবেশনটি রাজনৈতিক অধিবেশন হিসেবে অভিহিত হয়। এতে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক তাঁর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। এবার জাতীয় কাউন্সিলের রাজনৈতিক অধিবেশনে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সাধারণ সম্পাদক শরীফ নূরুল আম্বিয়া এবং একটি বিশেষ রাজনৈতিক প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. মুশতাক হোসেন। দলের বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দ এগুলোর উপর আলোচনা-পর্যালোচনা করেন ও কাউন্সিলের রাজনৈতিক প্রস্তাব গ্রহণ করেন।

সামরিক শাসনের কঠিন দিনগুলোতেও জাসদের কাউন্সিলে সাধারণ সম্পাদকের খসড়া প্রতিবেদন ছাপিয়ে উপস্থাপন করা হত; জাসদের ইতিহাসে এবারই প্রথম সাধারণ সম্পাদক তা করতে পারেননি। কাউন্সিল অধিবেশন শুরু হলে তড়িঘড়ি করে ফটোকপি করা আট পৃষ্ঠার একটি নামকাওয়াস্তে প্রতিবেদন সাধারণ সম্পাদক অধিবেশন কক্ষে বিতরণ করেন।

প্রতিবেদনে তিনি জাতীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি ভাসাভাসা বিবরণ প্রদান করলেও দুই কাউন্সিলের মধ্যবর্তী সময়ে একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে জাসদ সংসদের বাইরে কী কী করেছে সে সম্পর্কে সামান্য একটি বাক্যও রচনা করেননি। আর সংসদের ভেতরের কার্যক্রমের মধ্যে শুধুমাত্র সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ও বিসমিল্লাহ সম্পর্কে জাসদের দেওয়া নোট অব ডিসেন্ট প্রদানের ঘটনাটিকেই তিনি উল্লেখ করেছেন– জাতীয় অর্থনীতি ও কৃষক-শ্রমিকের স্বার্থে জাসদের গৃহীত নীতিগত অবস্থানের কোনো উল্লেখ করেননি।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাসদের রাজনৈতিক ঐক্যের ভিত্তি ২৩ দফা চুক্তির প্রসঙ্গটি তিনি এড়িয়ে গিয়েছেন। জাসদ কী করতে পরেনি বা আর কী কী করলে ভালো হত সে বিষয়েও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি ন্যূনতম দিকনির্দেশনা দলের নেতা-কর্মীদের দিতে পারেননি।

১৪ দলের ঐক্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার কথা বলে তিনি “লক্ষ্য অর্জনে পরিচ্ছন্ন ধারণা ও সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির প্রতি বিশ্বস্ত না থাকলে রাজনৈতিক ঐক্যজোট নেহায়েত ক্ষমতা ভাগাভাগির জোটে পরিণত হয়” উল্লেখ করে নিজ প্রতিবেদনে সাধারণ সম্পাদক কোনো রাজনৈতিক প্রস্তাব বা আশু কর্মসূচি উপস্থাপন না করে তিনি “সকল শ্রেণির মানুষের নিকট গ্রহণযোগ্য একটি সাধারণ রাজনৈতিক কর্মসূচি এখনও দৃশ্যপটে আসার অপেক্ষায়” বলেই নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পাদন করেন। জাসদের ৪৪ বছরের ইতিহাসে এমন সাধারণ সম্পাদক কখনও দায়িত্ব পালন করেননি যিনি দলের কাউন্সিলে একটি রাজনৈতিক প্রস্তাব ও কর্মসূচি উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

উপরন্তু, গভীর বেদনার সঙ্গে লক্ষ্য করা গেল, তিনি জাসদের প্রতিষ্ঠাকালীন ঘোষণা ও দলের সর্বশেষ সংশোধিত ঘোষণাপত্রে সমাজতন্ত্রের প্রতি জাসদের যে আদর্শিক অঙ্গীকার– সে বিষয়টি পুরোপুরি এড়িয়ে গিয়েছেন এবং ইনিয়ে বিনিয়ে তার বিরোধিতা করেছেন। দলের ঘোষণা এড়িয়ে গিয়ে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার কথা রেফারেন্স হিসেবে এনেছেন, কিন্তু সংবিধানে ঘোষিত চার মূলনীতি ও সেগুলোর একটি সমাজতন্ত্রও এড়িয়ে গিয়েছেন।

তার পুরো প্রতিবেদনেটিতেই আকারে ইঙ্গিতে ইনিয়ে বিনিয়ে বারবার তিনি সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা একপেশে, সংকীর্ণ, সেকেলে, পুরোনো ও পশ্চাদপদ হিসেবে অভিহিত করে নতুন রাজনীতির কথা বলেছেন। গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের লড়াই ‘প্রায় সমার্থক’ আখ্যায়িত করে তিনি বলেছেন যে, ‘গণতন্ত্রের কোনো বিশেষণ নেই, গণতন্ত্রই গণতন্ত্রের বিশেষণ’ এবং এই গণতন্ত্রের সঙ্গে পুঁজিবাদের সম্পর্ক ও বিরোধের জায়গাটি সম্পর্কে একটি শব্দও না বলে প্রকারান্তরে তিনি ‘গণতন্ত্র’এর ছদ্মবেশে পুঁজিবাদের পক্ষে উকালতি করেন।

এখানে বিশেষভাবে বলা দরকার, দলের স্থায়ী কমিটির সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা না করে ২০১৫ সালের ১৯ নভেম্বর দলের জাতীয় কমিটির সভায় শরীফ নূরুল আম্বিয়া আকস্মকিভাবে ‘জাসদের রাজনীতি: আদর্শগত বিষয় একটি পর্যালোচনা ও কতিপয় প্রস্তাব’ শিরোনামে নিজের লেখা একটি তিন পাতার দলিল বিতরণ করেন। এ দলিলের প্রথম প্রস্তাবনাটি ছিল, “ছাত্রলীগকে ‘আমাদের লক্ষ্য বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ এই ঘোষণা থেকে সরে এসে অসাম্প্রদায়িক সমাজ নির্মাণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে” এবং ষষ্ঠ প্রস্তাবনাটি ছিল, “জাসদের নাম পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।”

তার পর্যালোচনা ও প্রস্তাবনার ধারায় তিনি জাতীয় সম্মেলন ২০১৬এর উদ্বোধনী অধিবেশনের বক্তব্যে প্রচ্ছন্নভাবে এবং জাতীয় কাউন্সিল ২০১৬এর সাধারণ সম্পাদকের প্রতিবেদনে সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ অবস্থান নেন। শোনা যায় দলের স্থায়ী কমিটির সভায় নাজমুল হক প্রধান দলের নাম ‘জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল’ পাল্টে ‘জাতীয় সমতা দল’ হিসেবে রাখার প্রস্তাব দেন।

সাধারণ সম্পাদকের প্রতিবেদনে সাংগঠনিক বিষয়ের আলোচনায় গত ছয় বছর সংগঠনের যে পরিমাণগত বিকাশ হয়েছে তার স্বীকৃতি না দিয়ে কেবলমাত্র তত্ত্ব ও প্রয়োগের অসঙ্গতির সংকটের কথা বলা হয় এবং বড় দল ও ছোট দলের সম্পর্কের অসঙ্গতির দিক তুলে ধরা হয়।

নেতা-কর্মীদের বিস্তারিত আলোচনার পর কাউন্সিলে এ প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যানের দাবি ওঠে এবং সারা দেশের নেতাকর্মীদের কাছে তা বিলি করার প্রশ্নে নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব আসে। শরীফ নূরুল আম্বিয়া তাঁর প্রতিবেদন ডিফেন্ড করতে ব্যর্থ হন। এ ক্ষেত্রে অবশেষে দলের সভাপতি হাসানুল হক ইনু একটি বিশেষ কমিটির গঠন করে সে কমিটির কাছে কাউন্সিলের আলোচনা অনুযায়ী সাধারণ সম্পাদকের প্রতিবেদন পরিমার্জনার দায়িত্ব অর্পণ করেন। সাধারণ সম্পাদকের প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়া যে কোনো সাধারণ সম্পাদকের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্য অত্যন্ত অসম্মানজনক বিবেচিত হওয়ায় দলের সভাপতি উক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

কাউন্সিলের রাজনৈতিক অধিবেশনে ডা. মুশতাক হোসেনের চার পৃষ্ঠার একটি ছাপানো রাজনৈতিক প্রস্তাব আলোচনার জন্য বিলি করা হয়। তাঁর এ প্রস্তাবের শুরুতে সাধারণ সম্পাদক আম্বিয়ার বক্তব্যও সংযুক্ত হয় যাতে তিনি বলেন যে, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা ওই প্রস্তাবের সঙ্গে একমত নন, তারপরও দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রচর্চার স্বার্থে মুশতাক হোসেনের প্রস্তাব কাউন্সিলরদের কাছে প্রেরণ করা হল।

মুশতাক মূলত ২০১৪ সাল থেকে তাঁর সে প্রস্তাবের পক্ষে দলে মতামত গঠনের চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। তাঁর প্রস্তাবের মূল বক্তব্য হল, “জাসদকে মন্ত্রিসভা ও ১৪ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে এসে জাতীয় সংসদের ভেতরে ও বাইরে কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা” পালন করতে হবে এবং “এখন দেশ মোটামুটি স্থিতিশীল। এখনই এ প্রস্তাব গ্রহণ করার উপযুক্ত সময়। কারণ যখন দেশ ও সরকার অস্তিত্বের হুমকির মুখে পড়বে তখন যদি আমরা সরকার ও ১৪ দল ত্যাগ করি সেটা হবে সুবিধাবাদিতা।”

এর বিপরীতে জাসদের কাউন্সিলরগণ মনে করেন বিএনপি-জামাত-জঙ্গীবাদের আক্রমণ থেকে দেশ এখনও নিরাপদ নয়; এদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম মাঝপথে ছেড়ে দিয়ে এখনই সরকার ও ১৪ দল থেকে বেরিয়ে বিরোধী দলের ভূমিকা গ্রহণ হবে আত্মঘাতী।

কাউন্সিল মুশতাকের রাজনৈতিক প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে বাতিল করে দেয়। এমনকি তিনি নিজেও তাঁর প্রস্তাব বিষয়ে কাউন্সিলের সিদ্ধান্তে কোনো নোট অব ডিসেন্ট দেননি।

সাধারণ সম্পাদক আম্বিয়ার রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রতিবেদন, মুশতাকের রাজনৈতিক প্রস্তাব, কাউন্সিলরদের বক্তব্যের উপর ম্ঈনউদ্দিন খান বাদলের প্রতিক্রিয়া এবং বিগত দিনে দলের অভ্যন্তরে শরীফ নূরুল আম্বিয়া কর্তৃক দলের নাম পরিবর্তন বিষয়েক অননুমোদিত দলিল বিলির ঘটনা থেকে কাউন্সিলরগণ কাউন্সিলের রাজনৈতিক অধিবেশনে স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, যে ‘রাজনৈতিক গণসংগঠন’ জাসদের অভ্যন্তরে চার ধরনের রাজনৈতিক চিন্তাধারা দৃশ্যমান–

ক. মধ্য বাম চিন্তাধারা:

এ ধারায় বলা হয় যে জঙ্গীবাদ ও ধর্মীয় উগ্রবাদ পরাজিত করতে ঐক্যবদ্ধ লড়াই অব্যাহত রাখ, দুর্নীতি-বৈষম্যের অবসান কর এবং সুশাসন, অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম এগিয়ে নাও। দলের সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও স্থায়ী কমিটির সদস্য শিরীন আখতারসহ দলের প্রায় সকল নেতাকর্মী এ রাজনৈতিক চিন্তার অনুসারী।

খ. অতি বাম চিন্তাধারা:

এ ধারায় বলা হয় যে, সরকার ও ১৪ দল থেকে বেরিয়ে এসে দলকে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে হবে। কমিউনিস্ট পার্টি ও বাসদসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বামপন্থী দল-উপদলগুলোর সঙ্গে জোট বাঁধতে হবে। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ডামু হোসেন এ চিন্তার একমাত্র প্রবর্তক ও অনুসারী। তার এ রাজনৈতিক চিন্তার সাংগঠনিক বহিঃপ্রকাশ হল– তার নিজের ভাষায়– বাঘের লেজ হওয়ার চেয়ে বিড়ালের মাথা হওয়া ভালো।

গ. পুঁজিবাদী চিন্তাধারা:

আদর্শ হিসেবে সমাজতন্ত্র বাদ দিতে হবে, দলের নাম পরিবর্তন করতে হবে। দলের সাধারণ সম্পাদক শরীফ নূরুল আম্বিয়া ও স্থায়ী কমিটির সদস্য নাজমুল হক প্রধান এ ধারার অনুসারী। স্বতঃস্ফূর্ত তীব্র প্রতিক্রিয়া ও বিরোধিতার মুখে দলের জাতীয় কমিটির সভার সময় বিলিকৃত এ দলিল দলের সদস্যরা বাতিল করে দেন।

ঘ. সুবিধাবাদী চিন্তাধারা:

পরিপূর্ণভাবে একটি আদর্শহীন ও গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেওয়ার প্রবণতা; বিচ্ছিন্ন ও একঘরে ধারা। দলের কার্যকরী সভাপতি মঈনউদ্দিন খান বাদল এ ধারার একমাত্র অনুসারী।

এখানে বিশেষভাবে বলা প্রয়োজন যে, প্রতিষ্ঠাকালীন ঘোষণা থেকেই জাসদ নিজেকে একটা ‘রাজনৈতিক গণসংগঠন’ হিসেবে পরিচিত করে আসছে; এটা কোনো শ্রেণি-সংগঠন নয়। বিভিন্ন সময় জাসদে ‘শ্রেণি সংগঠন’ গঠনের প্রস্তাবনা আসলেও সেটা কখনও সিদ্ধান্ত হিসেবে চূড়ান্ত হয়নি। সুতরাং একটি রাজনৈতিক গণসংগঠন হিসেবে জাসদের অভ্যন্তরে বিভিন্ন ধারার চিন্তা থাকতেই পারে, তাতে দোষের কিছু নেই– কিন্তু সকল ভিন্ন-চিন্তার নন-নেগোশিয়েবল সাধারণ বিষয় হতে হবে সমাজতন্ত্র– এ বিষয়ে দল ঐক্যবদ্ধ।

জাসদের ২০১৬ সালের কাউন্সিল দলের রাজনৈতিক প্রস্তাব হিসেবে ঘোষণা করে: জঙ্গীবাদ ও ধর্মীয় উগ্রবাদ পরাজিত করার জন্য ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম অব্যাহত রাখা, দুর্নীতি-বৈষম্যের অবসান করা, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম এগিয়ে নেওয়া।

৪. জাতীয় কাউন্সিল ২০১৬: সাংগঠনিক অধিবেশন

কাউন্সিলের রাজনৈতিক অধিবেশন শেষে মধ্যাহ্ন বিরতির পর বিকেল চারটায় শুরু হয় সাংগঠনিক অধিবেশন। এ অধিবেশনে ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্রের সংশোধনীর আলোচনা-পর্যালোচনা ও অনুমোদন হয়ে থাকে। সাত পৃষ্ঠার দীর্ঘ সংশোধনী প্রস্তাব উপস্থাপন করেন মুশতাক। তাঁর প্রস্তাবনার কিছু কাউন্সিল অনুমোদন করে এবং কিছু সংশ্লিষ্ট উপ-কমিটির কাছে প্রেরণ করে পরিমার্জনার জন্য।

বর্তমান রচনার স্বার্থে প্রথম যে সংশোধনীটি এখানে আলোচনা করা দরকার তা হল– মুশতাক উপস্থাপিত সংশোধনী প্রস্তাবের সপ্তম পৃষ্ঠায় বর্ণিত ২.৪ নম্বর সংশোধনী– গঠনতন্ত্রের ১১ ধারার খ উপধারার বিয়োজন; ব্যাখ্যা হিসেবে তিনি বলেন যে, সাংগঠনিক বাস্তবতায় উল্লিখিত ধারাটি সঙ্গতিপূর্ণ নয়। দলের গঠনতন্ত্রের অষ্টম পৃষ্ঠায় ১১ ধারার খ উপধারায় বলা হয়েছে:

“দলের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও কার্যকরী সভাপতি পর পর একাধিক মেয়াদে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। জেলা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকও একসঙ্গে একাধিক মেয়াদে নির্বাচিত হবেন না।”

কাউন্সিলরগণ সর্বসম্মতিক্রমে ১১ ধারার খ উপধারা বাতিল করেন। উল্লেখ্য, এ ধারাটি বাতিল করার জন্য গত ছয় বছর ধরে দেশের সকল জেলা কমিটি থেকে জোর দাবি উত্থাপিত হচ্ছিল– কেননা এ ধারা বহাল থাকলে দলের জেলা পর্যায়ে সাংগঠনিক নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা যাচ্ছিল না; অবশেষে বিকল্প হিসেবে ধারাটি স্থগিত রেখে এবং জাতীয় কাউন্সিলের অনুমোদন সাপেক্ষে বিয়োজনের প্রস্তাবনা রেখে জেলা পর্যায়ে সম্মেলন ও কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়।

সুতরাং দেশের সকল জেলা কমিটির বৈধতার স্বার্থে ও তাদের মনোনীত কাউন্সিলরদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের অস্তিত্বের স্বার্থে কাউন্সিলরগণ সর্বসম্মতিক্রমে তা বিয়োজন করেন।

দ্বিতীয় যে সংশোধনীটি এখানে আলোচনা করা দরকার তা হল– ডা. মুশতাক হোসেন উপস্থাপিত সংশোধনী প্রস্তাবের সপ্তম পৃষ্ঠায় বর্ণিত ২.৩ নম্বর সংশোধনী– গঠনতন্ত্রের ১০ ধারায় সংযোজন– “সভাপতি/সাধারণ সম্পাদক এবং সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য পদে একই ব্যক্তি দায়িত্ব পালন করবেন না।”

এ প্রস্তাব কাউন্সিল অনুমোদন না করার বিষয়ে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত প্রদান করে।

৫. জাতীয় কাউন্সিল ২০১৬: নির্বাচনী অধিবেশন

নির্বাচনী অধিবেশন জাসদের জাতীয় কাউন্সিলের তৃতীয় ও সর্বশেষ অধিবেশন। জাতীয় কাউন্সিল ২০১৬এর নির্বাচনী অধিবেশন শুরু হয় রাত সাড়ে নটায়। দলের স্থায়ী কমিটির সভায় নাজমুল হক প্রধানের প্রস্তাবনার ভিত্তিতে এডভোকেট হাবিবুর রহমান শওকত, এডভোকেট শাহ জিকরুল আহমেদ ও জনাব মীর হোসাইন আখতারের সমন্বয়ে গঠিত তিন সদস্য বিশিষ্ট নির্বাচন কমিশনকে অধিবেশনের শুরুতে সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন দেওয়া হয়।

এ রচনার দ্বিতীয় অধ্যায়ে জাসদের কাউন্সিলর সংখ্যা ও তা নির্ধারণ পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। দলের গঠনতন্ত্রের ৬ ধারার ‘ক’ উপধারা এবং ৭ ধারার ‘ক’ উপধারা অনুযায়ী কাউন্সিল অধিবেশনের নির্বাচনী অধিবেশনে উপস্থিত কাউন্সিলরগণই দলের নির্বাচকমণ্ডলী বা ভোটার। গঠনতন্ত্রের ১০ ধারার ‘খ’ উপধারা অনুযায়ী কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটে দলের কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হবেন এবং ‘গ’ উপধারা অনুযায়ী নবনির্বাচিত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটি ও স্থায়ী কমিটির প্যানেল তৈরি করে অনুমোদনের জন্য কাউন্সিলে পেশ করবেন।

উল্লেখ্য, জাসদের নির্বাচনী অধিবেশন শুরুর সঙ্গে সঙ্গে প্রথানুযায়ী আগের কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটি ও স্থায়ী কমিটি বিলুপ্ত হয়ে যায়; রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সেশনে দলের সভাপতি কর্তৃক সভাপতিত্ব করার যে ভূমিকা তা-ও বহাল থাকে না; সভাপতিসহ সকল নেতৃবৃন্দ মঞ্চ ছেড়ে দিয়ে পেছনে চলে যান, নির্বাচন কমিশন অধিবেশন কক্ষের নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণ করেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পর্কে কাউন্সিলরদের অবহিত করেন; তিনি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন যে, কোনো পদে একাধিক প্রার্থী থাকলে সে ক্ষেত্রে গোপন ব্যালটে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

এরপর প্রধান নির্বাচন কমিশনার সভাপতি পদে প্রার্থিতার প্রস্তাব আহ্বান করেন। কাউন্সিলর ওবায়দুর রহমান চুন্নু সভাপতি পদে হাসানুল হক ইনুর নাম প্রস্তাব করেন ও কাউন্সিলর রোকনুজ্জামান রোকন তা সমর্থন করেন। কাউন্সিলরগণ শ্লোগান ও করতালি দিয়ে হাসানুল হক ইনুর নাম প্রস্তাবনায় স্বাগত জানান। নির্বাচন কমিশন সভাপতি পদে আরও প্রস্তাব আহ্বান করেন ও অপেক্ষা করেন। সভাপতি পদে আর কোনো প্রস্তাব না থাকায় হাসানুল হক ইনু বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।

এরপর প্রধান নির্বাচন কমিশনার একইভাবে সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থিতা আহ্বান করেন। কাউন্সিলর নাদের চৌধুরী সাধারণ সম্পাদক পদে শিরীন আখতারের নাম প্রস্তাব করেন ও কাউন্সিলর লোকমান আহমেদ সে প্রস্তাব সমর্থন করেন। পুরো কাউন্সিল অধিবেশন এ প্রস্তাবনার সঙ্গে সঙ্গে বিপুল উল্লাসে ফেটে পড়ে, কাউন্সিলরগণ শিরীন আখতারের নামে শ্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় ৩০ সেকেন্ডেরও কম সময়ের ব্যবধানে কাউন্সিলর মোহাম্মদ খালেদ সাধারণ সম্পাদক পদে নাজমুল হক প্রধানের নাম প্রস্তাব করেন; মুখলেছুর রহমান মুক্তাদির তা সমর্থন করেন।

নির্বাচনী অধিবেশন কক্ষে এ সময় কাউন্সিলরগণ হাসানুল হক ইনু ও শিরীন আখতারের নামে শ্লোগান দিচ্ছিলেন; নির্বাচনী অধিবেশনে শ্লোগান দেওয়া এ দেশের রাজনৈতিক ঐতিহ্যের সাধারণ ও জনপ্রিয় চর্চা।

কিন্তু এ সময় আকস্মিকভাবে নাজমুল হক প্রধান নির্বাচনী অধিবেশনের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে যুব জোট থেকে যোগ দেওয়া কাউন্সিলর পরিবেষ্টিত হয়ে নির্বাচনী অধিবেশনে বক্তব্য দিতে উদ্যত হন। নির্বাচন কমিশন নিজেদের নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য তাঁকে বক্তব্য দিতে নিষেধ করেন; প্রধান ক্ষিপ্ত হয়ে মাইক ছুঁড়ে ফেলে দেন। তাঁর এ আচরণে উদ্বুদ্ধ হয়ে পঞ্চগড় জেলার একজন কাউন্সিলর শেখ সাজ্জাদ মঞ্চে এসে নির্বাচন কমিশনের সামনে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করলে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত স্বেচ্ছাসেবীরা তাকে কোলে করে তার আসনে বসিয়ে দিয়ে আসেন।

ব্যালট পেপার তৈরির জন্য সময় চেয়ে নির্বাচন কমিশনার ভোটের ঘোষণা দেওয়া মাত্র হঠাৎ করে মঈনউদ্দিন খান বাদল, শরীফ নূরুল আম্বিয়া ও নাজমুল হক প্রধান মঞ্চ থেকে নেমে অধিবেশন কক্ষের বাইরে চলে যান। উল্লেখ্য, প্রধান তাঁর প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করেই অধিবেশন কক্ষ থেকে বের হয়ে যান। বক্তব্য দেওয়ার জন্য যতক্ষণ তিনি মাইক হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন– প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে চাইলে কিংবা ভোটের বিরুদ্ধে অনাস্থা আনতে চাইলে তিনি অবশ্যই তা করতে পারতেন। তাঁরা বের হবার মিনিট খানেক পরে ডা. মুশতাকও মঞ্চ থেকে নেমে যান।। সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থিতা ঘোষণার এ পুরো পর্বটি মাত্র চার-পাঁচ মিনিটে সমাপ্ত হয়।

নির্বাচন কমিশন ব্যালট পেপার ছেপে কাউন্সিলরদের সামনে শূন্য ব্যালট বাক্স প্রদর্শন করে প্রকাশ্য মঞ্চে কাউন্সিলর তালিকার সঙ্গে ছবিসমেত কাউন্সিলর কার্ড মিলিয়ে গোপন ব্যালটে কাউন্সিলরদের ভোট গ্রহণ শুরু করে। ভোট গ্রহণের এক পর্যায়ে পত্রপত্রিকার অফিসগুলো থেকে আসা টেলিফোনে জানা যায় নির্বাচনী অধিবেশন থেকে বের হবার কয়েক মিনিটের মধ্যে ম্ঈনউদ্দিন-শরীফ-মুশতাক-নাজমুল জোট রাতের আঁধারে প্রেস ক্লাবের সামনের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে জাসদের আরেকটি কমিটি গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। নির্বাচনী অধিবেশনের ভেতরে ও বাইরে অপেক্ষারত কাউন্সিলরগণ ব্যথিত হন কিন্তু গণতান্ত্রিক রীতিনীতির স্বার্থে ভোটদান প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখেন।

রাত পৌনে দুটোর দিকে নির্বাচনী ফলাফল ঘোষিত হয়– মোট ৭৪৭ ভোটের মধ্যে ৬০৩ ভোট পেয়ে শিরীন আখতার দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। নাজমুল হক প্রধান পান ১৩৭ ভোট; ৭টি ভোট বাতিল বলে গণ্য হয়।

কাউন্সিলের নির্বাচনী অধিবেশনের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে বক্তব্য দিতে উদ্যত নাজমুল হক প্রধান; এ সময় নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বক্তব্য প্রদান বিষয়ে তাঁর কথা হলেও তিনি তাঁর প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি।

নির্বাচনী অধিবেশনে গোপন ব্যালটে ভোট দিচ্ছেন লুৎফা তাহের এমপি। অধিবেশন কক্ষের ভেতরে ও বাইরে নিজ নিজ পরিচয়পত্র নিয়ে ভোট দেবার জন্য অপেক্ষা করছেন কাউন্সিলরগণ। নির্বাচন কমিশনার জেলার নাম ধরে কাউন্সিলরদের ভোটদানে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন।

নির্বাচন কমিশনের আমন্ত্রণে নবনির্বাচিত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটি ও স্থায়ী কমিটির প্যানেল কাউন্সিলের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করেন। কাউন্সিল তাদের প্রস্তাবিত প্যানেল সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন দেয় এবং জাতীয় কমিটির পরবর্তী সভার আগে কেন্দ্রীয় কমিটির বাকি পদগুলো পূরণ করার অনুমোদন দেয়।

কাউন্সিল শেষ হলে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীরা মঈনউদ্দিন-শরীফ-মুশতাক-নাজমুল জোটের অধিবেশন কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন যে, জঙ্গীবাদ-বিরোধী চলমান সংগ্রামের সময় নিজেদের অনৈক্য জঙ্গীবাদকে সুবিধা দেবে। তিনি আরও বলেন যে, যাঁরা অধিবেশন কক্ষ থেকে বের হয়ে গেছেন তাদেরকে দলের কমিটিতে রাখা হয়েছে– এবং তিনি আশা প্রকাশ করেন জোটের সকলে নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে দলে ফেরত এসে নিয়মিত কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করবেন।

৬. জোটের ধারাবাহিক অসংলগ্ন মিথ্যাচার:

ডিজিটাল যুগের মহিমা অপরিসীম। রিয়েলটাইম কম্যুনিকেশনস এবং ডকুমেন্টেশেনের ফলে সকলের কৃতকর্মই সকলের জানা হয়ে যায় যথাসময়ে। ১২ মার্চের কাউন্সিল অধিবেশনের দিন থেকে গত প্রায় দেড় মাস ধরে মঈনউদ্দিন-শরীফ-মুশতাক-নাজমুল জোট যা যা বলেছে ও করেছে তা সবই বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে– এ প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘমেয়াদে ইতিহাসের জন্য, মধ্যমেয়াদে যদি আইন-আদালতের দ্বারস্থ হতে হয় সে জন্য (জোট এর মধ্যে বহুবার আদালতে যাবার হুমকি দিয়েছেন), আর স্বল্পমেয়াদে যদি তাঁরা দলে ফিরে আসেন তাহলে ভবিষ্যতে তাদের চিনে রাখার জন্য।

ক. নির্বাচনী অধিবেশন থেকে বের হয়ে যাওয়া বিষয়ে:

জোটের সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ নেতা বাদল সদলবলে ১২ মার্চ রাতে কাউন্সিল অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করে রাতের আঁধারে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে যে জ্বালাময়ী ভাষণটি দিয়েছেন– তার ভিডিওতে দেখা যায় তিনি বলছেন:

“এই কাউন্সিলে আপনাদের নেতা, এমপি, নাজমুল হক প্রধানের নাম যখন প্রস্তাব হয়েছে, তখনও শত শত কাউন্সিলর দাাঁড়িয়ে গেছে এবং ইনু সাহেব দেখেও দেখেন না– উনার মাস্তানরা মাইক দখল করে ইনসিস্ট করছে যে, এই তো সবাই হাত তুলে ফেলেছে, শিরীন পাশ, সুতরাং ইনু-শিরীন প্যানেল হয়ে গেছে। এতটুকু পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করেছি।”

অর্থাৎ, এরপর তাঁরা অপেক্ষা না করে চলে গেছেন। এখানে বাদলের প্রতি সবিনয় জিজ্ঞাসা– কাউন্সিলররা তো নিজ প্রার্থীর পক্ষে ইনসিস্ট করবেই, এটাই সারা পৃথিবীর নিয়ম; কাউন্সিলরদের কথায় আপনারা বের হয়ে যাবেন কেন? নির্বাচন কমিশন কি আপনাদের বের করে দিয়েছে?

অবশ্য ১৩ মার্চ বিকেল ৫টা ৪১ মিনিটে বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমএ ‘ইনু ব্যক্তিগত সম্পর্কে গুরুত্ব দেওয়ায় দলে ভাঙন: বাদল’ শিরোনামে সংবাদ থেকে জানা যায়, সেদিন দুপুরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মঈনউদ্দিন খান বাদল নিজেকে সংশোধন করে বলেন, ‘‘সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নাজমুল হক প্রধানের নাম প্রস্তাবিত হলে অনেক কাউন্সিলর তা সমর্থন করেন এবং নির্বাচন কমিশন বলেন যে, আপনারা এক ঘণ্টা সময় দিন, খাওয়া-দাওয়া করেন, আমরা গোপন ব্যালটের ব্যবস্থা করছি।’’

এবার দেখা যাক শরীফ নূরুল আম্বিয়া কী বলেন।

১২ মার্চ রাত ১১টা ৪০ মিনিটে বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমএ ‘ইনুর জাসদে ভাঙন’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে আম্বিয়া বলেন যে, তাদেরকে “অধিবেশন থেকে বের করে দরজাও বন্ধ করে দেওয়া হয়।”

নাজমুল হক প্রধান ১৯ মার্চ দৈনিক প্রথম আলোয় দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, “শিরিন আখতারকে কণ্ঠভোটে পাশ করানোর চেষ্টা হয়েছিল।… কণ্ঠভোটে পাশ করতে চাইলে আমিসহ শ পাঁচেক কাউন্সিলর বেরিয়ে আসি।”

আর ডা. মুশতাক হোসেন ১৮ মার্চ রাত ৯টা ৭ মিনিটে ফেইসবুকে লিখেছেন:

“পক্ষপাতদুষ্ট ও অথর্ব নির্বাচনী কাউন্সিলের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে প্রধান ভাই হল থেকে বেরিয়ে আসেন।”

জোটের নীতিনির্ধারকদের বলি– প্রয়োজনে আপনারা আদালতে যাবেন বলছেন– সেখানে একেক জন একেক কথা বললে মাননীয় বিচারক আপনাদের ব্যাপারে কী ভাববেন বলুন তো? কীভাবেই-বা আপনাদের পক্ষে রায় দেবেন? আর সারাদেশের নেতা-কর্মীদের সামনে তথ্যপ্রমাণসহ এগুলো তুলে ধরলে তারাই-বা কী ভাববেন? এসব মোকাবেলার জন্য এক্ষুণি বসে ঠিক করে নিন কোন মিথ্যাটি আপনারা সবাই সত্যের মতো করে একসঙ্গে একভাবে বলবেন।

কাউন্সিল উপেক্ষা করে প্রেস ক্লাবের সামনের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে রাতের আঁধারে নিজেদের তিন জনের নামে জাসদের কমিটি ঘোষণা করছেন বাদল; পাশে প্রধান ও আম্বিয়া। বক্তব্যের ভিডিও ক্লিপ থেকে ধারণকৃত ছবি।

খ. আম্বিয়া-প্রধান কমিটি বিষয়ে:

১২ মার্চ রাত ১১টা ৪০ মিনিটে বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমএ ‘ইনুর জাসদে ভাঙন’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে প্রেস ক্লাবের সামনের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে রাতের আঁধারে নিজেদের তিন জনের নামে কমিটি গঠন প্রসঙ্গে আম্বিয়া বলেন:

“নির্বাচনী অধিবেশন সুষ্ঠুভাবে হয়নি বলে আমরা এ কমিটি গঠন করেছি।”

আচ্ছা, ধরে নিচ্ছি যে, নির্বাচনী অধিবেশন সুষ্ঠুভাবে হয়নি– কিন্তু আপনারা কমিটি গঠন করলেন কোথায়? কীভাবে? এর আগে জোটের কেউ বললেন আপনাদের কাউন্সিল কক্ষ থেকে বের করে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে আর কেউ বললেন নাজমুল হক প্রধান বের হয়ে এসেছেন সদলবলে। বের হয়ে কোথায় গেলেন? ডা. মুশতাক হোসেন তাঁর ফেইসবুক পোস্টে ‘জাসদ কাউন্সিল বিষয়ে আলোচনা # ৩’-এ ‘কাউন্সিল হলে কী ঘটেছিল’ শিরোনামে জানাচ্ছেন যে, নাজমুল হক প্রধানকে “অনুসরণ করে জাসদ নেতৃবৃন্দসহ অধিকাংশ কাউন্সিলর হলের বাইরের অপেক্ষাগারে অবস্থান নেন।”

১২০৫ জন কাউন্সিলরের ‘অধিকাংশ’ শব্দটির মানে কী তা সম্ভবত মুশতাক হোসেন জানেন না; তা না জানুন, সমস্যা নেই– কিন্তু নাজমুল হক প্রধান বলেছেন তাঁর সঙ্গে পাঁচ শতাধিক কাউন্সিলর বেরিয়ে আসেন। ঢাকা মহানগর নাট্যমঞ্চের ‘অপেক্ষাগার’ কতজন লোক ধারণ করতে পারে কোনো ধারণা আছে মুশতাক হোসেন? খুব বেশি হলে ৫০/৭৫ জন; সেখানে ৫০০ বা অধিকাংশ কাউন্সিলরের স্থান সংকুলান করা তো শেখ হাসিনাকে ব্রিফকেসে কোটি টাকা চাঁদা দেবার অলীক কাহিনির মতোই শোনাবে।

শুধু তাই নয়, এর আগেই নিজের বক্তব্যের বিপরীতে ‘জাসদ কাউন্সিল বিষয়ক আলোচনা # ১’এ ডা. মুশতাক হোসেন এ-ও দাবি করেছিলেন যে, আম্বিয়া-প্রধান কমিটি গঠন হয়েছে ‘বারান্দা’য়। ২২ মার্চ বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমএ দুপুর ১২টা ৩৪ মিনিটে প্রকাশিত বিবৃতিতে– যেটি ড্রাফট করেছেন ও নিজের ফেইসবুক পেইজ থেকে প্রকাশ করেছেন মুশতাক হোসেনই– শরীফ নূরুল আম্বিয়া ও নাজমুল হক প্রধান দাবি করেন:

“১২ মার্চ রাতে জাসদের নির্বাচনী কাউন্সিল শুরু হলে মাননীয় তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর উচ্ছৃঙ্খল সমর্থকগণ মঞ্চ দখল করে নেয়। তারা নির্বাচনী কার্যক্রম চালাতে বাধার সৃষ্টি করলে উপস্থিত কাউন্সিলরগণ মিলনায়তনের অপর প্রাঙ্গণে অবস্থান নিয়ে নির্বাচনী কাউন্সিল অব্যাহত রাখেন। জাসদের বিদায়ী কার্যকরী সভাপতি মঈনউদ্দিন খান বাদল এমপির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত নির্বাচনী কাউন্সিলে আমরা নির্বাচিত হই।”

ওরে বাবা– ‘মিলনায়তনের অপর প্রাঙ্গণে’ আবার ঢুকলেন কখন? একটু আগেই না দাবি করলেন অধিকাংশ কাউন্সিলর নিয়ে আপনারা বের হয়ে গেছেন অথবা আপনাদের বের করে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে! অন্যদিকে ৫ এপ্রিল গল্পটি আরও বিশাল ও জমজমাট করে বাংলা সিনেমার ফাইটিং দৃশ্যের মতো সাজিয়ে নির্বাচন কমিশনে জমা দিলেন। খুব সংক্ষেপে এর শেষ দিক থেকে সামান্য উদ্ধৃতি দিই:

“সভা পরিচালনায় ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাউন্সিল সভাপতি ইনু ও দলীয় নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশ্যমূলক ব্যর্থতার কারণে কাউন্সিলরবৃন্দ বিক্ষোভে ফেটে পড়েন ও হাউজ ত্যাগ করে মহানগর নাট্য মঞ্চ চত্বরে সমবেত হন। সে চত্বরে জাসদের কার্যকরী সভাপতি মঈনউদ্দিন খান বাদল এমপি সভার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন ও ভেঙ্গে যাওয়া কাউন্সিল সভা আবার শুরু করেন। উপস্থিত কাউন্সিলরদের অভিমত অনুযায়ী তিনি সভাপতি পদে শরীফ নূরুল আম্বিয়া, সাধারণ সম্পাদক পদে নাজমুল হক প্রধান এমপি ও কার্যকরী সভাপতি পদে মঈনউদ্দিন খান বাদল এমপির নাম প্রস্তাব করেন। উপস্থিত কাউন্সিলরগণ আর কোনো নাম প্রস্তাব না করে সমবেতভাবে প্রস্তাবসমূহ সমর্থন করেন।”

অথচ গল্পটির শুরু ছিল সহজ-সরল– কাউন্সিল অধিবেশন বা কমিটি গঠন তো দূরের কথা, মঈনউদ্দিন খান বাদল ১২ মার্চ রাতে প্রেস ক্লাবের ফুটপাতে বলছিলেন প্রস্তাবের কথা–

“আমি আমার কথায় বলেছি, এটা কারও বাপের প্রতিষ্ঠান নয়। এটা যদি কেউ মনে করেন তাহলে ভুল করছেন। এই কারণে আপনাদের সবাইকে বলছি যে, আমি ওখানেও বলেছিলাম, এখানেও বলছি, আমাদের এই প্রেস ক্লাব চত্বরে আমরা বলছি যে, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতি হিসেবে আমরা শরীফ নূরুল আম্বিয়ার নাম প্রস্তাব করছি। সাধারণ সম্পাদক হিসেবে, অন্যায় কাউন্সিলে যাকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে, সেই নাজমুল হক প্রধান এমপির নাম প্রস্তাব করছি। আমি, আমি আগেও কার্যকরী সভাপতি ছিলাম, আমি উনাদের সঙ্গে কার্যকরী সভাপতি থাকব।”

থাক– এ প্যাচাল আর না বাড়াই; যদিও এ কাহিনির আরও একাধিক ভার্সন তাঁরা বাজারজাত করেছেন।

গ. সভাপতি পদে নির্বাচন বিষয়ে:

১২ মার্চ দলীয় সভাপতির নামে কুৎসা রটনার জন্য মঈনউদ্দিন খান বাদল প্রেস ক্লাবের সামনের ফুটপাতে রাতের আঁধারে বললেন:

“সংগঠনের বিপ্লবী সাধারণ সম্পাদক, আমি, পরিষ্কারভাবে বলেছিলাম– যে প্রস্তাব ২০১০ ইংরেজি সালে পাশ হয়েছিল, সেই প্রস্তাব মোতাবেক আমাদের দাঁড়ানোর অধিকার নাই। কিন্তু উনার সভাপতি হতেই হবে। সুতরাং সেই প্রস্তাব কীভাবে উইথড্র হয়েছে সেটা আপনারা লক্ষ্য করেছেন।”

আর পরদিন দুপুরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন:

“আমাদের কাউন্সিলে সিদ্ধান্ত ছিল সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, কার্যকরী সভাপতি একবারের বেশি স্বপদে থাকতে পারবেন না। সে একবারের বদলে আমরা তিনবার পার করে দিয়েছি।”

এ প্রসঙ্গে গঠনতন্ত্রের ১১ ধারার খ উপধারা বাতিল বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে আগেই। আর শনূ আম্বিয়ার সাধারণ সম্পাদকের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রতিবেদনের শুরুতেও লেখা রয়েছে:

“গঠনতন্ত্রের বিধান অনুযায়ী চার বছর পূর্বেই আমাদের কাউন্সিল কবার কথা ছিল। প্রথমত, নির্ধারিত সময়ে জেলা সম্মেলন অনুষ্ঠান করতে আমরা সক্ষম হইনি। দ্বিতীয়ত, ২০১৩ ও ২০১৪ সালে আন্দোলনের নামে বিএনপি-জামাত-হেফাজত সৃষ্ট অগ্নিসন্ত্রাস ও তাণ্ডবলীলার কারণে সম্মেলনের পরিবেশ ছিল না। তৃতীয়ত, আমাদের গাফিলতিও অস্বীকার করা যাবে না। এ কাউন্সিলের অনুমোদন সাপেক্ষেই জাতীয় কমিটি কয়েকবার কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির মেয়াদ বাড়িয়েছে।”

স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে জনাব মঈনউদ্দিন খান বাদল কি এ সিদ্ধান্তগুলো জানতেন না? তাহলে তিনি দলের কর্মী-সমর্থক-শুভানুধ্যায়ীদের কাছে মিথ্যা বলে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করলেন কেন?

ঘ. সভাপতির মন্ত্রী থাকা বিষয়ে:

আগেই বলা হয়েছে গঠনতন্ত্রের ১০ ধারায় সংযোজন প্রস্তাব– “সভাপতি/সাধারণ সম্পাদক এবং সরকারের মন্ত্রীসভার সদস্য পদে একই ব্যক্তি দায়িত্ব পালন করবেন না”– কাউন্সিল অনুমোদন না করার বিষয়ে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত প্রদান করে। তারপরও ১২ মার্চ দলীয় সভাপতির নামে কুৎসা রটনার জন্য মঈনউদ্দিন খান বাদল প্রেস ক্লাবের সামনের ফুটপাতে রাতের আঁধারে বললেন:

“ডা. মুশতাকের প্রস্তাব ছিল– হয় মন্ত্রী হবেন, না হয় সভাপতি হবেন। কেউ কিন্তু উনি সভাপতি হবেন না, এটা মানা করেন নাই। বলা হইছে ইদার অব দি টু। উনি গাছেরটাও খাবেন, উনি গোড়ারটাও খাবেন। সেই কারণে, সেই কারণে সমস্ত নিয়ম নীতি বিসর্জন দিয়ে, আমরা লক্ষ্য করেছি যে, কাউন্সিল অধিবেশনটি কীভাবে এগিয়ে গেছে।”

অবশ্য পরদিন দুপুরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাদল বলেন:

“আমাদের দলে কথা উঠেছিল, দলের কেউ যদি নির্বাহী দায়িত্ব গ্রহণ করেন তবে দিনি স্বপদে বহাল থাকতে পারবেন না। যে কোন একটি দায়িত্ব রাখতে পারবেন। আমাদের ক্ষেত্রে এই … বিষয় আলোচনা করে হাসানুল হক ইনুকে কাউন্সিলররা সুযোগ দিয়েছে। উনি সভাপতি ও মন্ত্রী দুটোই থাকতে পারবেন।”

মনে হচ্ছে আগের রাতে বাদল স্বাভাবিক ছিলেন না– কী বলতে কী বলে ফেলেছেন, অথবা কাউন্সিল অধিবেশনের বাইরে অপেক্ষারত নন-কাউন্সিলরদের উত্তেজিত করার জন্য তিনি উদ্দেশ্যমূলকভাবেই কাউন্সিলের গঠনতন্ত্র বিষয়ক সিদ্ধান্ত ও সভাপতির নির্বাচনের বিরুদ্ধে মিথ্যা বক্তব্য রেখেছেন। এ বিষয়ে মঈনউদ্দিন-শরীফ-মুশতাক-নাজমুল জোট ৫ এপ্রিল নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া পত্রের ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্র সংশোধন বিষয়ক অংশে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা প্রণিধানযোগ্য।

ঙ. সভাপতির ব্যক্তিগত অনুগ্রহ বিষয়ে:

১৩ মার্চ দুপুরে জোট সংবাদ সম্মেলন করে দলত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করেন। বিকেল ৫টা ৪১ মিনিটে বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমএ ‘ইনু ব্যক্তিগত সম্পর্কে গুরুত্ব দেওয়ায় দলে ভাঙন: বাদল’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী বাদল ওই সংবাদ সম্মেলনে বলেন যে, মন্ত্রী হবার পর হাসানুল হক ইনু ব্যক্তিগত সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেন এবং কাউন্সিলেও তিনি তার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি বলেছেন যে, নির্বাচন কমিশন সভাপতি হাসানুল হক ইনুর অনুগ্রহপ্রাপ্ত। তিনি আরও বলেন:

“নাজমুল হক প্রধান কথা বলার সুযোগ চেয়েছেন, তখন কমিশন বলল– আপনি এখন কথা বলতে পারবেন না। নাজমুল হক প্রধান সভাপতি ইনুর কাছে কথা বলার সুযোগ চেয়ে বলেছেন, আপনি আমাকে কথা বলতে না দিলে আমি চলে যাব। তারপরও তিনি তাকিয়ে দেখেছেন, কিছুই বলেননি।”

একই সংবাদে বাদল আরও বলেন:

“আমাদের সবচেয়ে বড় অভিযোগ, তিনি ছয় বছর আমাদের সাধারণ সম্পাদক শরীফ নূরুল আম্বিয়াকে কোনো কাজ করতে দেন নাই; বাধা সৃষ্টি করেছেন।”

এখানে খুব স্পষ্ট করে বলতে চাই নির্বাচন কমিশন হাসানুল হক ইনুর অনুগ্রহপ্রাপ্ত নয়– সকল দিক থেকে সভাপতির অনুগ্রহ যদি কেউ পেয়ে থাকেন তো তাঁরা হচ্ছেন মঈনউদ্দিন খান বাদল, শরীফ নূরুল আম্বিয়া, ডা. মুশতাক হোসেন ও নাজমুল হক প্রধান– এখানে সেসব বিষয়ের বিস্তারিত বিবরণ না দেওয়াই উত্তম। তবে এটা বলা যায় দলের সভাপতি হিসেবে হাসানুল হক ইনু বরাবরই নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনে অভ্যস্ত।

এর আগের কাউন্সিলে সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচনে হাসানুল হক ইনু যদি কোনো পক্ষ নিতেন তাহলে শরীফ নূরুল আম্বিয়া কি নির্বাচনে শিরীন আখতারের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মাত্র ৪৩ ভোটের ব্যবধানে জিতে সাধারণ সম্পাদক হতে পারতেন? সভাপতি যদি পক্ষ নিতেন তাহলে তো শরীফ নূরুল আম্বিয়া গত কাউন্সিলে জিততে পারতেনই না আর এবারের কাউন্সিলে নাজমুল হক প্রধানও ১৩৭ ভোট পেতেন না– শূন্য ভোট পেতেন। সভাপতি নিরপেক্ষ ছিলেন বলেই তিনি নির্বাচনী অধিবেশনের সর্বময় ক্ষমতা বরাবরই নির্বাচন কমিশনের হাতে ন্যস্ত করেন– তিনি কমিশনের কাজে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করেন না; এবং সে জন্যই নির্বাচনী অধিবেশনে তিনি কারও পক্ষে অবস্থান নেননি।

জোট চেয়েছিলেন সভাপতিকে তাদের পক্ষে ব্যবহার করতে– কেন তাঁরা নাজমুল হক প্রধানের পক্ষে সভাপতির হস্তক্ষেপ চাচ্ছিলেন? বাদল এক ধাপ এগিয়ে বললেন সভাপতি ছয় বছর শরীফ নূরুল আম্বিয়াকে কাজ করতে দেননি।

বেশ তো! আম্বিয়া নিজেও তো সাধারণ সম্পাদকের প্রতিবেদনে এমন কিছু ইঙ্গিত করলেন না? সাধারণ সম্পাদক বা বাদল গত ছয় বছরে কটা জেলা সফর করেছেন? সংগঠনে কে না জানে যে, আম্বিয়া নিজে সাংগঠনিক সম্পাদকদের সারাদেশে সংগঠন গোছানোর সম্মিলিত উদ্যোগ বারবার বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছেন এবং বলেছেন– কী হবে এসব করে। এটা কে না জানে যে, সভাপতি হচ্ছেন গঠনতান্ত্রিক প্রধান আর সাধারণ সম্পাদক হচ্ছেন নির্বাহী প্রধান; সাধারণ সম্পাদককে কে আটকাতে পারে কাজ করতে?

তবে কি বিষয়টা এমন ছিল যে, সাধারণ সম্পাদক সকল বিষয়েই সভাপতির উপর নির্ভরশীল ছিলেন? আসলেই তাই– বাদল, আম্বিয়া বা প্রধান– সকলেই সভাপতির কাঁধে ভর করে পদ-পদবি চান আর সভাপতি নিরপেক্ষ থাকলেই খেপে যান।

চ. সভাপতির আর্থিক স্বচ্ছতা বিষয়ে:

সভাপতি জাসদের কোষাধ্যক্ষ নন– দলের আয়-ব্যয়ের দেখভাল করেন দলের কোষাধ্যক্ষ। দলের কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য অর্থসংগ্রহের প্রয়োজন হলে নেতৃবৃন্দ সিদ্ধান্ত নিয়ে শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করেন ও দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য ব্যয় করেন। দলের কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থসংগ্রহে সভাপতি তাঁর উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেন মাত্র।

জাসদের সকল নেতাকর্মীর অত্যন্ত স্পষ্ট ধারণা আছে সভাপতি হাসানুল হক ইনুর আর্থিক স্বচ্ছতা বিষয়ে; এ বিষয়ে কোনো ধরনের অপপ্রচারই তাঁর ভাবমূর্তি নষ্ট করতে পারবে না।

১২ মার্চ রাতে অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করে প্রেস ক্লাবের সামনের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে রাতের আঁধারে মঈনউদ্দিন খান বাদল বললেন, “পকেটভর্তি টাকা নিয়ে ওপেনলি জাসদ অফিসে কাউন্সিলর কেনার চেষ্টা করেছে।”

কে কাউন্সিলর কেনার চেষ্টা করেছে? বাদল, আপনার অবগতি ও ভবিষ্যৎ সতর্কতার জন্য বলি– জাসদের কাউন্সিলরদের এত ছোট করবেন না। ১৯৯৭ সালে জাসদে যোগ দিয়েছেন– এ দল সম্পর্কে আপনার এখনও শেখা হল না– জাসদের কাউন্সিলর কেনা যায় না। আপনিও তো কাউন্সিলর, সর্বসম্মতিক্রমে নির্বাচিত সভাপতির বিরুদ্ধে আপনি তো আপত্তি জানাননি– কত টাকায় আপনি আপনার ভোটটি তাকে দিয়েছিলেন? আর ১২ তারিখে তো জাসদ অফিসে কেউ ছিল না– কে কোন কাউন্সিলর কিনবে?

১১ তারিখ রাতে কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে জেলা নেতৃবৃন্দ ফেরত যাবার সময় বাস রিকুইজিশনের জন্য কেন্দ্রীয় ভর্তুকির অর্থ গ্রহণ করেছেন– যার মধ্যে আপনার জেলাও রয়েছে। এর মানে কি কাউন্সিলর কেনা?

অবশ্য ১৩ মার্চ সংবাদ সম্মেলনে সভাপতির আর্থিক অস্বচ্ছতার বিষয় উপস্থাপন করার একদিন পর ১৪ মার্চ এশিয়ান টিভির টক শোতে উপস্থাপকের উপর্যুপরি প্রশ্নের জবাবে বাদল এ বিষয়ে আর কিছুই বলতে পারেননি– তিনি বলেছেন যে, তিনি তো সম্মেলনের জন্য কোনো তহবিল দলকে দেননি, সভাপতি সম্মেলন করার এত টাকা কোথায় পেলেন।

বাদলের উদ্দেশে বলতে চাই: পাশ কাটাবেন না; আপনাকে এ বিষয়ে জবাবদিহি করতেই হবে– আপনি যেখানেই থাকুন না কেন।

ছ. অধিবেশন কক্ষে পেশিশক্তির ব্যবহার বিষয়ে:

নির্বাচনী অধিবেশন কক্ষে উপস্থিত সকলেই ছিলেন জাসদের কাউন্সিলর– তাদের প্রতি অশালীন বিশেষণ প্রয়োগ করা কোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচয় তা জোটই বলতে পারে। তবে সর্বসম্মতিক্রমে নির্বাচিত দলের সভাপতি সম্পর্কে যাঁরা অশালীন উক্তি করতে পারেন তাঁরা কাউন্সিলরদের ‘মাস্তান ও সভাপতির উচ্ছৃঙ্খল সমর্থক’ বলবেন তাতে আর সন্দেহ কী!

১২ মার্চ রাতে শরীফ নূরুল আম্বিয়া দাবি করলেন যে, তাদেরকে মেরে অধিবেশন কক্ষ থেকে বের করে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে; জোটের আর কেউ তা দাবি করলেন না। অবশেষে জোট ৫ এপ্রিল নির্বাচন কমিশনে দেওয়া চিঠিতে আবারও দাবি করলেন যে, হাসানুল হক ইনুর উচ্ছৃঙ্খল সমর্থকবৃন্দ কাউন্সিলরদের উপর হামলা শুরু করেন আর ডা. মুশতাক হোসেন নিজ ফেইসবুক পোস্টে দাবি করলেন শিরীন আখতারের সমর্থকরা কাউন্সিলরদের উপর হামলা শুরু করেন।

অথচ সত্য ঘটনা হল, জাসদের ইতিহাসে কোনো কাউন্সিলে কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি; বরং এবারের কাউন্সিলে একমাত্র ব্যতিক্রম হল পঞ্চগড়ের কাউন্সিলর শেখ সাজ্জাদ নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করে এবং এ জন্য স্বেচ্ছাসেবকগণ তাকে কোলে করে তার সিটে বসিয়ে দিয়ে আসে। জাসদের সকল কাউন্সিলরগণ সাক্ষী আছেন অধিবেশন কক্ষে পেশিশক্তির ব্যবহার হয়েছে কী হয়নি। জাসদের কাউন্সিলরগণ যদি পেশিশক্তি ব্যবহার করতেন, তাহলে জোটের কেউ অধিবেশন কক্ষ থেকে বের হয়ে যেতে পারতেন না; তাদেরকে নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত অধিবেশন কক্ষে বসে থাকতে হত– প্রেস ক্লাবের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে কমিটি ঘোষণা করা সম্ভব হত না।

জ. দলে গণতন্ত্র বিষয়ে:

১৩ মার্চ দুপুরে জোটের সংবাদ সম্মেলনে বাদল বলেন, “এই ভাঙন কমিটির সঙ্গে আচরণ এবং দীর্ঘ দিন জমে থাকা ক্রোধের বিষ্ফোরণ।” তাঁরা দাবি করেন জাসদে গণতন্ত্রের চর্চা নেই। ১ এপ্রিল এক সভায় আম্বিয়া দাবি করেন জাসদে গণতান্ত্রিক রীতি-নীতির চর্চা নেই। বাদল বলেন, সংগঠনে বহুমতের চর্চা নেই। প্রধান বলেন, জাসদে বিশেষ নেতৃত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। ২২ মার্চ ২০১৬ আম্বিয়া ও প্রধান এক যুক্ত বিবৃতিতে দাবি করেন:

“আমাদের সংগঠনে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার নীতি অনুসরণ করে রাজনৈতিক-সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, আর ইনু-শিরীন অংশের দলে মন্ত্রিত্বের দাপট খাটিয়ে একক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয় এবং ভিন্নমত দাবিয়ে রেখে মত প্রকাশ করতে বাধার সৃষ্টি করা হয়।”

তা বটে! তা বটে! মনে রাখা দরকার বাংলাদেশে জাসদই একমাত্র দল যেখানে পরিপূর্ণভাবে গণতন্ত্রের চর্চা হয়। কাউন্সিলরগণ এখানে সরাসরি ভোটে নেতৃত্ব নির্বাচন করেন– আওয়ামী লীগ বা বিএনপি বা জাতীয় পার্টির মতো একজন ব্যক্তি এখানে দলের কমিটি গঠন করেন না; জামাতের মতো এখানে প্রার্থিতা নিরুৎসাহিত করা হয় না; অন্যান্য দলের মতো নেতৃত্ব নির্বাচনে রাখঢাক করা হয় না।

জাসদই একমাত্র দল যেখানে ভিন্নমতের চর্চা আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করা হয়– যে কারণে মন্ত্রিসভা ও ১৪ দল থেকে বেরিয়ে আসার জন্য মুশতাক হোসেনের প্রস্তাব আম্বিয়ার স্বাক্ষরে অনুমোদনসহ দলের কাউন্সিলরদের কাছে প্রেরণ করা হয়; যে কারণে দলের আদর্শ ও নাম পরিবর্তনের মতো ঔদ্ধত্যপূর্ণ প্রস্তাব দেবার পরও সাধারণ সম্পাদক স্বপদে বহাল থাকেন; যে কারণে দলের গঠনতন্ত্র পদদলিত করে কাউন্সিল উপেক্ষা করে ফুটপাতে দাাঁড়িয়ে দলের সভাপতি ও দল সম্পর্কে ধারাবাহিক বিষোদগারের পরও তাদেরকে দলের কমিটিতে রাখা হয়।

ডা. মুশতাক হোসেন দাবি করেন তাদের জোটে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয়। বাহ! বাহ! দলের কাউন্সিল অধিবেশন থেকে পালিয়ে গিয়ে প্রেস ক্লাবের সামনের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে রাতের আঁধারে নিজের নাম নিজে প্রস্তাব করে কমিটি গঠনের নাম গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা! তাই না? আর বলুন তো মুশতাক হোসেন, আপনাদের কোন ভিন্নমতটি দলে কবে দাবিয়ে রাখা হয়েছে? একটিও না, কখনও নয়; আপনাদের ভিন্নমত সকল সময় প্রচারের সুযোগ দেওয়া হয় এবং আপনারা বারবার কাউন্সিলরদের দ্বারা সর্বসম্মতিক্রমে প্রত্যাখ্যাত হন।

ঝ. দলের কার্যালয়, নির্বাচনী প্রতীক ও নিবন্ধন বিষয়ে:

১৩ মার্চ থেকেই জোট ধারাবাহিকভাবে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় সম্পর্কে কল্পিত মালিকানার প্রশ্ন তোলে, নিজেদেরকে জাসদ সাজিয়ে নির্বাচনী প্রতীকের মালিকানা দাবি করে ও গঠনতান্ত্রিক পদ্ধতির বিরুদ্ধে গিয়ে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে কমিটি ঘোষণা করে জাসদের নিবন্ধন নাম্বার ব্যবহার শুরু করে। কার্যালয় বিষয়ক আইনী দলিলটিতে কী লেখা আছে সেটা না জেনেই অযাচিতভাবে মালিকানা প্রসঙ্গে গণমাধ্যমে ভুল তথ্য সরবরাহ করে দলের নেতা-কর্মীদের মনোবল ভেঙে দেবার চেষ্ট করেছেন। ওই ভবনের মালিক পক্ষের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন– মালিক পক্ষ তাদের সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন এ বিষয়ে কিছু জানতে বা বলতে চাইলে তারা যেন হাসানুল হক ইনুর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এতে তাদের মতো জোঁকের মুখে নুন পড়েছে।

১৩ মার্চ থেকে তাঁরা দাবি করেছিলেন জাসদ কেন্দ্রীয় কার্যালয় চারজনের মালিকানায় আর ৫ এপ্রিল নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া পত্রে অবশেষে তাঁরা দাবি করলেন যে, জাসদ অফিস কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এ চিঠির অজস্ত্র ভুল বানানে ও ভুল বাক্যে বাক্যে তাঁরা মিথ্যা দাবি করলেন: “আইন ও নৈতিকতায় এবং কর্মীদের নিরাপত্তা বিবেচনায় আমরা এই অফিস নিয়ে আইনগত লড়াইয়ে অবতীর্ণ হইয়াছি যা এই মুহূর্তে বাঞ্ছনীয় মনে করছি।”

প্রতীক নিয়ে তাদের ধারাবাহিক মিথ্যাচার বিষয়ে আলোচনার আর অবকাশ নেই; কেননা এরই মধ্যে শুনানি ও দাখিলকৃত দলিলাদির বিশ্লেষণ শেষে নির্বাচন কমিশন রায় দিয়েছে যে, হাসানুল হক ইনু ও শিরীন আখতারের নেতৃত্বাধীন জাসদই সংগঠনের মূলধারা– তাই প্রতীক ও নিবন্ধনও তাদের নেতৃত্বাধীন জাসদের। মঈনউদ্দিন-শরীফ-মুশতাক-নাজমুল জোট সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানালেও নির্বাচন কমিশন তা প্রত্যাখ্যান করে।

১৩ মার্চ রাত ১১টা ৩ মিনিটে বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমে ‘জাসদের মশাল থাকেবে কার হাতে’ শিরোনামের প্রতিবেদনে মঈনউদ্দিন খান বাদল বলেছিলেন:

“জাসদের মশাল নিয়ে কেউ দাবিদার এলে আমরা প্রমাণ দিয়েই তা নিজেদের করে নেব। সব কিছুর প্রমাণ আমাদের হাতে। আমরা মূল দল। আমরা সবাই জাসদের হয়ে সংসদে এসেছি। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বহিষ্কার করে সদস্যপদ বাতিলের মতো কোনো ডিসপিউট তৈরি হবে না। যদি এমন কিছু হয় তা হবে স্রেফ পাগলামি। রাজনৈতিক ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ এভাবে হবে না আশা করি। যে যেখানে আছে আমরা সেভাবেই জাসদের সংসদ সদস্য হয়ে থাকব।”

অথচ মঈনউদ্দিন-শরীফ-মুশতাক-নাজমুল জোটই রাজনৈতিক বিষয়ের সমাধানের জন্য ঘুরেফিরে বারবার আদালতে যাবার ঘোষণা দিয়েছে– কিন্তু আদালতেও তাঁরা পরাজিত হবেন তাদের অসংলগ্ন মিথ্যাচারের কারণে।

ঞ. দলের তথাকথিত বিভক্তি বিষয়ে:

জোট দাবি করেছে যে, দলের অধিকাংশ সংসদ সদস্য ও দেশের ৪০টি জেলা কমিটি তাদের সঙ্গে রয়েছে; বাকি ৩৯টি জেলা কমিটিও আংশিকভাবে তাদের সঙ্গে রয়েছে বলে তাদের দাবি। যদিও এখন পর্যন্ত জোট অতীতের দলত্যাগী কজনসহ মোট ১৯ জনের বেশি নাম বলতে পারেনি। যে ১৯ জনের নাম তাঁরা বলেছেন তাদের অনেকেরই সম্মতি নেবার তোয়াক্কা তাঁরা করেননি এবং এখনও পর্যন্ত সারাদেশে একটিও জেলা কমিটি গঠন করতে পারেনি। তাদের এ জাতীয় দাবির আসল উদ্দেশ্য হল মিথ্যাচার ও নেতাকর্মীদের নৈতিক মনোবলে ফাটল ধরানো।

ট. আওয়ামী লীগের কাছে নালিশ বিষয়ে:

নিজ দলের কাউন্সিলরদের উপর ভরসা না করে বাদল ও আম্বিয়া ১৪ মার্চ সোমবার রাতে ১৪ দলের সমন্বয়ক মোহাম্মদ নাসিমের কাছে নালিশ করতে যান। ১৭ মার্চ ২০১৬ দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত ‘জাসদের বিদ্রোহীরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাচ্ছেন’ শীর্ষক খবর অনুযায়ী আম্বিয়া নিজেই পত্রিকাটিকে জানান:

“আমরা নাসিম সাহেবের সঙ্গে আলাপ করেছি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও সাক্ষাতের সময় চেয়েছি। দু-একদিনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হবে আশা করছি।”

এ খবর থেকে জানা যায়, মোহাম্মদ নাসিম মঈনউদ্দিন-শরীফ-মুশতাক-নাজমুল জোটকে ১৬ তারিখ সংবাদ সম্মেলন না করে দলে ঐক্য ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানান। মুশতাক হোসেন ১৮ মার্চ রাত ৯টা ৭ মিনিটে পোস্টকৃত সিরিজের দ্বিতীয় অংশ ‘জাসদ কাউন্সিল বিষয়ে আলোচনা # ২’এ বলেন:

“জাসদ (আম্বিয়া-প্রধান) ১৪ দলে আছে এটা প্রকাশ করার জন্যই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।”

অবশ্য প্রধানমন্ত্রী তাদেরকে সাক্ষাৎ না দিলে এবং নিজ দলের বিষয়ে অন্য দলের কাছে নালিশ জানানোর হীন চর্চায় সমালোচনার ঝড় উঠলে মুশতাক হোসেন তাঁর ফেইসবুক পোস্ট থেকে এ নতুন গল্প ফেঁদে বসেন– যদিও বাদল বা আম্বিয়া দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত খবর অস্বীকার করেননি বরং তাতে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। মুশতাক তাঁর ফেইসবুক পোস্টের মাধ্যমে বীরত্ব দেখিয়েছেন– পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে প্রকাশিত খবরটি অস্বীকার করতে পারেননি।

ঠ. কমিটি বাতিল বিষয়ে:

১২ মার্চ রাত থেকেই ‘আমরা মূল দল’, ‘আমরা মূল দল’ বলে স্বতঃপ্রণোদিত চেঁচামেচির পরও মশমন-জোট জাসদের সঙ্গে ঐক্য চাচ্ছেন– তাঁরা মূল দল হলে এভাবে ঐক্য চাইবেন কেন? বড়জোর তাদের বলা উচিত– হাসানুল হক ইনু ও শিরীন আখতারের নেতৃত্বে ভোট ডাকাতরা দলে ফিরে আসুন! তাই না? একদিকে নিজেদের মূল দল দাবি করে অন্য দিকে জাসদ নেতৃত্বের কাছে নিজেদের গ্রহণ করার প্রচারণা তো কৌশলগতভাবে পিছিয়ে যাওয়া!

আবার, ১৫ মার্চ দৈনিক কালের কণ্ঠে ‘জাসদের দুই পক্ষের সমঝোতার সম্ভাবনা’ শিরোনামে খবর করিয়ে শরীফ নূরুল আম্বিয়া তাতে মন্তব্য দিয়ে বলেন: “জাসদের কাউন্সিলে ঐকমত্যের ভিত্তিতে রাজনৈতিক সেশনে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া সভাপতি নির্বাচনও ঐকমত্যের ভিত্তিতে হয়েছে।”

তাহলে মঈনউদ্দিন খান বাদল সদলবলে কাউন্সিল থেকে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে রাতের আঁধারে প্রেস ক্লাবের সামনের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে শরীফ নূরুল আম্বিয়াকে সভাপতি হিসেবে প্রস্তাব করলেন কেন আর পরবর্তীতে বিভিন্ন কাগজপত্রে ভূয়া কাউন্সিলের (মিলনায়তনের অপর প্রঙ্গণে, বারান্দায়, অপেক্ষাগারে, নাট্যমঞ্চ চত্বরে… বাদলের সভাপতিত্বে…!) রেফারেন্সে আম্বিয়া নিজেকে সভাপতি বলছেন কেন?

একদিকে ১৫ মার্চ দৈনিক কালের কণ্ঠে ‘জাসদের দুই পক্ষের সমঝোতার সম্ভাবনা’ শিরোনামে খবর করিয়ে আম্বিয়া তাতে মন্তব্য দিয়ে বলেন: “সভাপতি নির্বাচনও ঐকমত্যের ভিত্তিতে হয়েছে। কিন্তু সাধারণ সম্পাদক বিধিসম্মতভাবে হয়নি। সাধারণ সম্পাদক পদে পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত নিলে সংকট সমাধানের পথ উন্মুক্ত হতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে কোনো চালাকি করা চলবে না।”

অন্যদিকে, নিজেদের ফুটপাত কমিটি বাতিলের প্রস্তাব নাকচ করে মুশতাক তাঁর ফেইসবুক পোস্টে বলেন:

“আমাদের নেতৃবৃন্দ বলেছেন, নির্বাচনী কাউন্সিলের সভাপতি হিসেবে ইনু যদি গোটা নির্বাচনী কাউন্সিলটিই বাতিল করেন তাহলে হলের ভেতরের কমিটি ও হলের বারান্দার কমিটি দুটোই বাতিল হয়ে যায় আপনা আপনিই। এখন ইনুর সিদ্ধান্তের বিষয়, তিনি কী সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে অপর পক্ষের সময় ক্ষেপণের কৌশল আমরা মেনে নেব না।”

এ বিষয়ে আম্বিয়া অবশ্য ১৫ মার্চের বক্তব্য থেকে সরে এসে ২৪ মার্চ নতুন অবস্থান নেন– বিডিনিউজ টুযৈন্টিফোর ডটকমএ প্রকাশিত ‘আদালতে যাওয়ার ঘোষণা জাসদের বিদ্রোহীদের’ শিরোনামের সংবাদ অনুযায়ী “তবে ঐক্যের পূর্বশর্ত হিসেবে যে কাউন্সিলে হাসানুল হক ইনু ও শিরীন আখতারের নেতৃত্বাধীন কমিটি হয়েছে তা বাতিলের কথা বলেছেন তিনি।”

কী মজা, তাই না? রাজনীতি ছেলেখেলা? নিজেরা শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে ফুটপাতে গিয়ে কমিটি গঠন করে কাউন্সিলরদের অপমান করবেন, আর তার মাশুল দিতে বৈধ কাউন্সিল বাতিল করা হবে– তাই না? মামাবাড়ির আবদার!

উল্লিখিত ১২টি বিষয়ের প্রত্যেকটিতে জোটের স্ববিরোধী অবস্থান ও ঐক্য-বিরোধী ধারাবাহিক উস্কানিমূলক অপপ্রচার বহাল রাখা আর মুখে ঐক্যের কথা বলা যেন ‘মুখে শেখ ফরিদ– বগলে ইট’ নীতির বহিঃপ্রকাশ।

৭. জোটের রাজনৈতিক অবস্থান:

১২ মার্চ রাতে জাসদের কাউন্সিল অধিবেশন থেকে বের হয়ে যাওয়া মঈনউদ্দিন-শরীফ-মুশতাক-নাজমুল জোটের রাজনৈতিক পরিচয় কী তা গত কয়েক মাসের ধারাবাহিকতায় এবারের কাউন্সিলের রাজনৈতিক অধিবেশনে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। জোটের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা রাজনৈতিক চিন্তা থাকলেও দেখা যায় অতি বাম, ডান ও সুবিধাবাদী ধারাগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়েছে জাসদের মধ্য বাম রাজনৈতিক চিন্তার বিরুদ্ধে। কিন্তু জাতীয় রাজনীতিতে ও ক্ষমতার পালাবদলে এর গুরুত্ব কতটুকু? চলুন দেখা যাক।

জোটের সদস্যগণ বর্ণিত রাজনৈতিক পার্থক্য প্রায়শ কোনো ব্যাখ্যা ছাড়া ‘কল্পিত’ বলে উল্লেখ করেন। তবে কি তাঁরা সমাজতন্ত্র বাদ দেবার কথা বলেননি? তবে কি তাঁরা দলের নাম পরিবর্তনের কথা বলেননি? কাউন্সিলে উপস্থাপিত সাধারণ সম্পাদকের প্রতিবেদনটি কি শরীফ নূরুল আম্বিয়া লেখেননি? ওহ– ওগুলো সব ভুতের কায়কারবার– উনারা ওসব কিছু করেননি! তাহলে কাউন্সিলের পরের কায়কারবারগুলো দেখা যাক!

কাউন্সিলে ডা. মুশতাক হোসেন জাসদকে সরকার ও ১৪ দল থেকে বের হয়ে আসার জন্য লিখিত প্রস্তাব দিলেন। তাঁর প্রস্তাব কাউন্সিলরগণ সর্বসম্মতিক্রমে নাকচ করে দিলেন। ১২ মার্চ রাতে জোটের নেতারা ভাবলেন তাঁরা দলকে বিভক্ত করে ফেলতে পারবেন– কিন্তু পরদিন সকালেই দেখলেন তাদের সঙ্গে জাসদের কেউ নেই– তাঁরা নতুন লেবাস ধরলেন। ডিগবাজি দিয়ে হঠাৎ করে ১৪ দলের সমর্থক হয়ে গেলেন; ২৪ মার্চ বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমএ নাজমুল হক প্রধান বললেন: “১৪ দলের ভেতরে আত্মসমালোচনার মাধ্যমে ভুল সংশোধন করে মহাজোট সরকারের সাফল্য নিশ্চিত করতে চাই।”।

কিন্তু মুশতাক একদিকে বললেন, “জাসদ জাতীয় কাউন্সিলের রাজনৈতিক অধিবেশনে ১৪ দল ও সরকারে থাকার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ১৪ দল ও সরকারে জাসদের না থাকা নিয়ে আমার প্রস্তাব গৃহীত হয়নি”– অন্যদিকে তিনি আবার ১৪ দল ও সরকারে জাসদের অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে প্রচার অব্যাহত রাখলেন– কাউন্সিলে নাকচকৃত তাঁর সে লিখিত বক্তব্য ১৭ মার্চ ও ১ এপ্রিল আবারও তিনি প্রকাশ করলেন যথাক্রমে বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম এবং আলোর মিছিল ডটকমএ।

শুধু তাই নয়, নিজের ফেইসবুক আইডি থেকে দুটোই আবার প্রচারও করলেন। অর্থাৎ, কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত তিনি মেনে নেননি; ১৪ দল ও সরকার থেকে বেরিয়ে আসার প্রচারণা তিনি চালিয়েই যাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে মুশতাক হোসেন তাঁর জোটের অপরাপর নেতাদের সঙ্গেও চালাকি ও বিশ্বাসভঙ্গ করেছেন।

এও যথেষ্ট না হলে আরও একটি নজির উপস্থাপন করা যাক। দলের কাউন্সিল অধিবেশন থেকে বেরিয়ে যাবার এক মাস পর মঈনউদ্দিন-শরীফ-মুশতাক-নাজমুল জোট জাতীয় প্রেস ক্লাবে জাসদের নাম ব্যবহার করে একটি সেমিনার আয়োজন করলেন; বিষয় ‘সাম্প্রদায়িকতা-জঙ্গীবাদের প্রকৃতি : বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতি’। শরীফ নূরুল আম্বিয়া ও নাজমুল হক প্রধানের নামে উপস্থাপিত (আসলে ডা. মুশতাক হোসেন লিখিত) এ সেমিনার পেপারে বিএনপিকে রাজনৈতিক সুবিধা দেওয়ার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রস্তাবনা পেশ করা হয়– আপাতভাবে তা খুবই বৈপ্লবিক শোনায় যদিও।

এটা কে না জানে যে, ১৯৯০ সালে সামরিক স্বৈরশাসনের অবসানের পর থেকে, বিশেষত ২০০১ সালে বিএনপির দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর থেকে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু মুক্তিযোদ্ধা মহাসমাবেশ ও মুক্তিযুদ্ধ দিবসসহ বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে একটি বৃহত্তর ঐক্যের উদ্যোগ নেন। ২০০৩ সালের জুন মাস থেকে আওয়ামী লীগ, কম্যুনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও গণতন্ত্রী পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকের উদ্যোগ গ্রহণ করে জাসদ।

জুন মাসে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিন জাসদের অনুষ্ঠান থেকে একটি ঐক্য ফ্রন্ট গঠনের জন্য আওয়ামী লীগের প্রতি আনুষ্ঠানিক উদাত্ত আহ্বান জানান জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাসদের একটি ২৩ দফা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। আরও পরে সেপ্টেম্বর মাসে জাসদ-সিপিবি-গণতন্ত্রী পর্টি একসঙ্গে বিএনপির অপশাসন, বিরাষ্ট্রীয়করণ ও ধর্মান্ধ জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

এভাবে ১৪ দল গড়ে উঠলেও সিপিবি পরে ১৪ দলে যোগদান থেকে বিরত থাকে। এ সময় জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর সঙ্গে দলের অন্যান্য নেতৃবৃন্দও ওই রাজনৈতিক প্রত্রিয়ায় অংশ নেন। আজ ২০১৬ সালের মার্চ-এপ্রিলে এসে মশমন-জোটের মিথ্যাবাদীরা তাদের কাগজপত্রে জাসদ ও হাসানুল হক ইনুর সে ঐতিহাসিক ভূমিকা অস্বীকার করে আজেবাজে কথা বলছেন।

সে যাক। ১৪ দলের ঐক্যের বাইরে ঐক্যের আরও একটি বৃহত্তর পরিমণ্ডল গড়ে তোলা হয়– সেটা হল মহাজোট। ১৪ দলের দলগুলো অনেক বিষয়ে অনেক বেশি কাছাকাছি অবস্থান করে; এরশাদের জাতীয় পর্টি ও ১৪ দলের সমন্বয়ে গঠিত মহাজোটের সঙ্গে ১৪ দলের রয়েছে বিস্তর ফারাক– কিন্তু একটি বিষয়ে মহাজোট একমত– তা হল বিএনপির বিরুদ্ধে নির্বাচনী ঐক্য– যে বিএনপি বাংলাদেশে জামাত-শিবির ও জেএমবিসহ সকল জঙ্গীবাদকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছে।

এরই মধ্যে বাংলাদেশে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল হয়েছে, সামরিক শাসন অবৈধ ঘোষিত হয়েছে, দেশ আংশিক গণতন্ত্র থেকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে গণতন্ত্রের পথে। রাজনৈতিক দল হিসেবে জাতীয় পার্টি কার্যকর কোনো দল নয়– এটা পতিত স্বৈরাচারের দোসরদের একটি ক্লাবের মতো চলছে। কিন্তু গণতন্ত্র যেহেতু এখনও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি এবং সামরিক শাসনের জঞ্জাল সরানোর কাজটি দীর্ঘমেয়াদী এবং যেহেতু প্রচলিত নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও ক্ষমতবলয়ে জাতীয় পার্টি এখনও সংসদে বেশ কিছু আসনে নির্বাচিত হয়– সেহেতু নির্বিষ জাতীয় পার্টির সঙ্গে নির্বাচনী জোট হতেই পারে। জাতীয় পার্টি এই মুহূর্তে বিএনপি-জামাত-জঙ্গীবাদের ঐক্যের মতো প্রধান শত্রু নয়। বিএনপি-জামাত-জঙ্গীবাদ-জাতীয় পার্টি যদি ১৪ দলের বিরুদ্ধে নির্বাচনী ঐক্য গড়ে তোলে তা হবে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার জন্য মহা হুমকি।

সুতরাং অপ্রধান শত্রু নির্বিষ জাতীয় পার্টিকে সঙ্গে রেখে প্রধান শত্রু বিএনপি-জামাত-জঙ্গীবাদকে মোকাবেলার কৌশল অন্যায় কিছু নয়। মঈনউদ্দিন-শরীফ-মুশতাক-নাজমুল জোটের জ্ঞাতার্থে বলি, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের প্রধান দ্বন্দ্ব ও অপ্রধান দ্বন্দ সম্পর্কে নিশ্চয়ই আপনারা অনেক পড়াশোনা করেছেন।

জাসদের সম্মেলন ও কাউন্সিলের পরপরই বিএনপিরও কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। মীর্জা ফকরুল ইসলাম আলমগীরকে মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মহাসচিবের দায়িত্ব গ্রহণের পর মীর্জা ফকরুল দৈনিক সমকালে সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেছেন তিনি বিএনপির নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার উদ্যোগ নিচ্ছেন। অন্যদিকে আসম রব, কাদের সিদ্দিকী, বি চৌধুরী ও কামাল হোসেনরাও ঐক্যের ডাক দিচ্ছেন।

এ অবস্থায় ১৪ দল ও জাতীয় পার্টির মহাজোট দুর্বল করলে বিএনপির লাভ নাকি ক্ষতি? রাজনীতির একজন সাধারণ পর্যবেক্ষকও তা খুব ভালো করে জানেন।

এবারে দেখা যাক শরীফ নূরুল আম্বিয়া ও নাজমুল হক প্রধান ‘সাম্প্রদায়িকতা-জঙ্গীবাদের প্রকৃতি: বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতি’ শীর্ষক সেমিনার পেপারে কী বললেন। সরাসরি উদ্ধৃতিতেই যাওয়া যাক:

“বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিকাশে প্রধান বাধা হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি। নানাভাবে রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গণতন্ত্রবিরোধী অপশক্তি সক্রিয়। বিএনপি ও জাতীয় পার্টি রাজনৈতিক দল হিসেবে গণতন্ত্রবিরোধী শক্তি। সামরিক শাসকদের উদ্যোগে সামরিক শাসনের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত এ দল দুটি ধর্মভিত্তিক ‘দ্বিজাতি-তত্ত্ব’ ও ‘সামরিক শাসনের’ অপছায়া মাত্র। পরিপূর্ণভাবে গণতন্ত্রবিরোধী ‘সূক্ষ্ম সাম্প্রদায়িক ও পশ্চাদপদ চিন্তার’ একটা আধুনিক চক্র দুটি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গীবাদকে আলাদা করে ভাবার সুযোগ নেই। সাংবিধানিক, আইনি, রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে জনগণের দৃঢ় ঐক্য গড়ে তোলে এদের মোকাবেলা করার বিকল্প নেই।”

মঈনউদ্দিন-শরীফ-মুশতাক-নাজমুল জোটের এই রাজনৈতিক অবস্থান কি বিএনপির রাজনৈতিক কৌশল নয়?

আরও আছে। ১৪ মার্চ এশিয়ান টিভির টক শোতে অংশগ্রহণ করে মঈনউদ্দিন খান বাদল জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে এক হাত দেখে নিলেন বিএনপি-জামাত-জঙ্গীবাদের নেত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে হাসানুল হক ইনুর ধারাবাহিক আপোষহীন বক্তব্যের জন্য। এ বক্তব্যের মাধ্যমে বাদল কি জোটের রাজনৈতিক অবস্থান আরও স্পষ্ট করেননি?

সুতরাং দলের নির্বাচনী কাউন্সিল থেকে জোটের বের হয়ে যাওয়া আকস্মিক বিষয় নয়। জাসদের কাউন্সিলরগণ হঠাৎ করে তাদের বের হয়ে যাওয়া বুঝে উঠতে পারেননি বটে, তবে ধীরে ধীরে চিনে উঠছেন। কী এমন হয়েছিল যে, নাজমুল হক প্রধানের প্রার্থিতা ঘোষণার কয়েক মিনিটের মাথায় কাউন্সিল কক্ষ থেকে বের হয়ে যেতে হবে এবং কমিটি ঘোষণা করে ফেলতে হবে– কাউন্সিলরদের কাছে আপিল না করে, দলের অভ্যন্তরে প্রয়োজনে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে না তোলে কেন কয়েক মিনিটের মধ্যে বের হয়ে যেতে হবে?

আসলে জোট আগে থেকে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কোনো ছুতো না পেয়ে শিরীন আখতারের পক্ষে বিপুল উচ্ছাস দেখে দলে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন এই ভয়ে নির্বাচন শেষ হবার আগেই কাউন্সিল থেকে বের হয়ে গিয়েছেন। পৃথক দল গঠনও তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়; পৃথক দল গঠন করার সামর্থ্য তাদের নেই; তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে বিভিন্ন দিক থেকে আঘাত করা, জাসদের ঐক্যের রাজনীতিতে আঘাত করা, ১৪ দলকে আঘাত করা, মহাজোটকে বিপর্যস্ত করা এবং সর্বোপরি ২০১৯ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামাত-জঙ্গীবাদকে সহযোগিতা করা।

জাসদের কাউন্সিল থেকে ২০১৬ সালে বের হয়ে কোনো সুবিধা করতে না পেরে দলের ঐক্যের ধূয়া তুলে নিজেরা আরও সুসংহত হয়ে দলে ফিরে এসে ২০১৯ সালের নির্বাচনের আগে তাঁরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে মহাজোটকে বিপন্ন করতে চান। এই তাদের রাজনীতি।

৮. জোটের অনুসৃত নীতি ও কৌশল:

এবার দেখে দেয়া যাক জোট কাউন্সিল উত্তরকালে কোন কোন নীতি ও কৌশল চর্চা করছেন।

জোটের নীতি:

হাসানুল হক ইনু সর্বসম্মতিক্রমে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। শিরীন আখতারের প্রার্থিতা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে কাউন্সিলরদের বিপুল উচ্ছ্বাস দেখে এবং নাজমুল হক প্রধানের প্রার্থিতা ঘোষণার পর সমর্থন কম দেখে দলের অতিবাম, ডান ও সুবিধাবাদী ধারার ঐক্য মঈনউদ্দিন-শরীফ-মুশতাক-নাজমুল জোট অধিবেশন কক্ষ থেকে বের হয়ে যায় জাসদের সভাপতি, জাসদ, ১৪ দল ও মহাজোটকে বিপর্যস্ত করার সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্যে।

একই লক্ষ্যে তাঁরা মুখে জাসদের ঐক্যের শ্লোগান দিয়ে কার্যত ঐক্যবিরোধী কার্যক্রম বহাল রেখে নিজেদেরকে একটি সুসংহত গ্রুপ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে দুই গ্রুপের ঐক্যের নামে নতুন কমিটির পদ-পদবীতে সমান ভাগ ও নেতৃস্থানীয় পদ দখল করা যাতে ২০১৯ সালের নির্বাচনের আগে দলে ভাঙন তৈরি করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জাসদ, ১৪ দল ও মহাজোটের গ্রহণযোগ্যতায় ভরাডুবি ঘটানো যায় এবং বিএনপি-জামাত-জঙ্গীবাদের জোটকে সহযোগিতা করা যায়।

জোটের রণকৌশল:

১২ মার্চ রাত থেকে আজ পর্যন্ত গত এক মাসের বেশি সময় ধরে মঈনউদ্দিন-শরীফ-মুশতাক-নাজমুল জোট যে রাজনৈতিক-সাংগঠনিক চর্চা করেছে তা হল:

ক. সকল আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হাসানুল হক ইনু। স্বজনপ্রীতি, আর্থিক অস্বচ্ছতা, স্বৈরাচারি, অগণতান্ত্রিক ইত্যাদি বিবিধ বিশেষণ ব্যবহার করে যতটুকু সম্ভব তাঁর চরিত্র হনন করে যাচ্ছেন নিয়মিতভাবে।

খ. ক্রমবর্ধমান ও ধারাবাহিক যথেচ্ছ মিথ্যাচার। এটা করতে গিয়ে জোটের সদস্যরা একেক জন একেক ধরনের মিথ্যা বলেছেন। পরবর্তীতে ডা. মুশতাক হোসেন এগুলোকে একসূত্রে গাঁথার চেষ্টা করেছেন ও তীব্রতর করেছেন। জোটের সদস্যরা জানেন তাদের বক্তব্যের সংবাদ, সাক্ষাৎকার, ভিডিও ও নির্বাচন কমিশনে লিখিত সাবমিশন নির্বাচন কমিশন বা আদালত কোথাও গ্রহণযোগ্য হবে না– কিন্তু তাঁরা জানেন এসব করে তাঁরা জাসদ সভাপতি ও জাসদের ইমেজের ক্ষতি করতে পারবেন।

গ. মূলধারার ও সামাজিক গণমাধ্যম ব্যবহার। ১২ মার্চ রাত থেকে আগ বাড়িয়ে গণমাধ্যমে দল ভাঙার সংবাদ প্রচার করা। নিয়মিতভাবে দল ও দলের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা। গণমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য সরবরাহ করা।

ঘ. নিয়মিত বিরতিতে হুমকি প্রদান। ১২ মার্চ রাত থেকে এ পর্যন্ত তাঁরা পত্রিকার সংবাদে ও ফেইসবুক পোস্টে নিয়মিতভাবে হুমকি প্রদান করেছেন যে, কাউন্সিল বাতিল না করলে একদিন/দুদিন পরই তাঁরা পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করবেন। বারবারই তাদের এ হুমকি প্রদান ব্যর্থ হয়েছে। কমিটি গঠন তো দূরের কথা– তাঁরা কিছুই করতে পারেননি। তাঁরা দলের প্রতীক-কার্যালয়-নিবন্ধন নিয়ে কর্মী ও গণমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন। বারবার আদালতে যাবার হুমকি দিয়েছেন।

ঙ. শুভানুধ্যায়ীদের ভুল বোঝানো। পেশাজীবী ও বিদেশে দলের শুভানুধ্যায়ী– যারা কাউন্সিল অধিবেশনের বিস্তারিত জানেন না তাদেরকে কাউন্সিল সম্পর্কে ভুল তথ্য সরবরাহ করে কথিত ঐক্যের পক্ষে সংগঠিত করার চেষ্টা করেছেন; ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলিংএর চেষ্টা করেছেন; রাজনীতি ও ভবিষ্যত বিবেচনা নয়, কাউন্সিলে কী হয়েছে সেটাও বিবেচনা নয়– যেনতেন প্রকারে যে কোনো ছাড়ের মাধ্যমে ঐক্যের জন্য প্রচার করেছেন।

চ. নিষ্ক্রিয় ও অসন্তুষ্টদের সংগঠিত করার চেষ্টা করেছেন। একটি গণসংগঠনে অনেক নিষ্ক্রিয় ও অসন্তুষ্ট ব্যক্তি থাকেন– তাদেরকে পদ-পদবির লোভ দেখিয়ে ঐক্যের জন্য জিকির তুলিয়েছেন– দু/একটি ক্ষেত্রে ঐক্যের জন্য সভাও করিয়েছেন– কিন্তু নিজেদের পক্ষে একজনকেও টানতে পারেননি।

ছ. ‘বগলে ইট, মুখে শেখ ফরিদ’। লোকদেখানো ঐক্য-প্রক্রিয়া শুরু করেছেন; নিজেদের ব্যবসায়িক অংশীদার এবং কয়েকজন সম্মানিত পেশাজীবীর নেতৃত্বে ঐক্য আলোচনা শুরু করিয়েছেন কেবলমাত্র আইওয়াশের জন্য। ঐক্যের বিরুদ্ধে সচেতনভাবে সক্রিয়।

জ. সচেতনভাবেই নিজেরা বিভক্ত থাকা। মঈনউদ্দিন-শরীফ-মুশতাক-নাজমুল জোটের ভেতরে ঐক্য নিয়ে কোনো আলোচনা নেই; ঐক্য আলোচনায় তাদের চারজনের অন্তত একজন অনুপস্থিত থাকেন। একেক জন একক ধরনের ঐক্য ফর্মুলার কথা বলেন। ঐক্য প্রক্রিয়ার সভার সিদ্ধান্ত অমান্য করে ডা. মুশতাক হোসেন ও শরীফ নূরুল আম্বিয়া সভাগুলো সম্পর্কে মিডিয়ায় নামে বেনামে ভুল তথ্য সরবরাহ করেন ও নিজের ফেইসবুক আইডি থেকে সেগুলো প্রচার করেন।

ঞ. ব্যক্তিগত আক্রমণ পরিচালনা করা। সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতারের সঙ্গে যারা সাংগঠনিক কাজ করেন তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক তথ্য সংগ্রহ করে সেগুলো বিকৃত করে ফেইসবুকের মাধ্যমে প্রচার করা।

জোটের উল্লিখিত ১০টি কৌশলের বিপরীতে দলের সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতারের নেতৃত্বে দলের নেতা-কর্মীগণ গত এক মাসের বেশি সময় ধরে তিনটি সাধারণ কৌশল গ্রহণ করেছেন; এগুলো হল:

ক. সকল অপপ্রচারের বিরুদ্ধে মৌনব্রত অবলম্বন করা;

খ. সারা দেশে দলের কর্মসূচি ঘোষণা করা ও তা বাস্তবায়ন করা;

গ. সারা দেশে সাংগঠনিক সফর পরিচালনা করা।

৯. উপসংহার:

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল। অন্যায়ের কাছে মাথা না নোয়াবার এ দল বারবার সামরিক-বেসামরিক স্বৈরশাসকদের উদ্যোগে বাইরে থেকে ও ভেতর থেকে আক্রমণের শিকার হয়েছে। দলের অনেক নেতা সেসব আক্রমণের সঙ্গে আপোষ করেছেন, দল থেকে চলে গেছেন। আজ ২০১৬ সালে জাসদের সামনে একটি কার্যকর রাজনৈতিক দল হিসেবে দাঁড়াবার যে সুযোগ এসেছে সে সুযোগ নষ্ট করে দিতে উদ্যত হয়েছে এ সময়ের রাজনীতির প্রধান শত্রু বিএনপি-জামাত-জঙ্গীবাদের পুতুল মঈনউদ্দিন-শরীফ-মুশতাক-নাজমুল জোট।

অতীতের সকল ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত-আক্রমণের মতোই এবারের আক্রমণও জাসদ প্রতিহত করবে। জাসদ এগিয়ে যাবে তার অভীষ্ঠ লক্ষ্যে।

জিয়াউল হক মুক্তাজাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির প্রচার ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক

Responses -- “জাসদের সম্মেলন ও কাউন্সিল: একটি পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ”

  1. আলমগীর

    তথ্যবহুল লেখা। দরকার ছিল। লেখককে অনেক ধন্যবাদ সঠিক প্রেক্ষাপটটি তুলে ধরার জন্য।

    Reply
  2. Bangladeshi

    আচ্ছা চলমান ইউপি নির্বাচনে বাংলাদেশের “একমাত্র” তথাকথিত গণতান্ত্রিক, শক্তিশালী, প্রভাশালী দল জাসদের রেজাল্ড কি?! কয়টি ভোট পেয়েছে?! ৪জন একত্রিত হলে তারা ভেঙ্গে ৩দলে পরিণত হয়- এ হলো আমাদের দেশের জাসদ ও তথাকথিত সমাজতন্ত্রী-বামপন্থী দলগুলোর অবস্থা। তাদের আবার কাউন্সিল অধিবেশন ও কমিঠি! নিজের প্রতীকে দাঁড়িয়ে, নিজের শক্তিতে এমপি তো অনেক দূরে, ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার হওয়ার যোগ্যতা যাদের নেই তারাই আবার পদ-পদবী নিয়ে করে ভাঙ্গাভাঙ্গি! বাংলাদেশের একমাত্র স্বীকৃত সন্ত্রাস-অস্ত্রবাজী রাজনীতির ধারক-বাহক-জনক ইনুদের জাসদ এখন সহযোগী হয়েছে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের।

    Reply
  3. মো: রাশেদুল আলম লিটন, সাংগঠনিক সম্পাদক, জাসদ, ঠাকুরগাঁও জেলা

    শুধুমাত্র পদের জন্য দল থেকে বেরিয়ে যাওয়া নয়। কারণ পূর্ব পরিকল্পিত না হলে এত তাড়াতাড়ি কমিটি ঘোষনা করা সম্ভব না। তারা যেহেতু বলছে সভাপতি নিয়ে কোন আপত্তি নেই তাহলে তারা যে পাল্টা কমিটি ঘোষনা করলো সেই কমিটি ইনু-প্রধাণ করত। আসলে এর পেছনে আরো বড় কোন উদ্দ্যেশ্য বা শক্তি আছে। জাসদ এর আগেও এর চেয়ে বড় বড় দূর্যোগের মোকাবেলা করেছে এবারও করবে এবং জাসদ সমাজতন্ত্রের সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষে অবিচল থাকবে।

    Reply
  4. R. Masud

    ১৯৪৭ সাল থেকে ২৪ বছরের প্রতারনায় হাড় আর চামড়া ছাড়া বাকী ছিলনা যেই দেহেr সেই দেহেরই চামড়ায় হাজারো খত আর বেশীর ভাগ হাড়ই ভেঙ্গে যায় ৯ মাসের মুক্তি যুদ্দে।
    যে কোন মানুষেই এই সময় ভাবে, সবার আগে ভাবে, তার চামড়ার ক্ষত সারিয়ে ভাঙ্গা হাড় জোড়া লাগিয়ে দেহ টাকে দাড়াতে সুযোগ করে দেওয়া। তারপর পুস্স্টি আর সেবা যত্ন দিয়ে কর্মক্ষম করে তোলা–
    এই দেহকে কাজ করতে বলে কিছু চাওয়া হোল পাগলের কান্ডকারখানা ।

    তার উপর চোর গুলোতো ছিলই যারা ঐ দেহের জন্য জোগাড় করা খাবার আর ঔষদ গুলো নিয়ে নেওয়ার–
    দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সনের সময়কালে জাসদ যা করেছিল তার ফল হিসাবে আমরা পেয়েছিলাম
    ১) খত চামড়ায় আরও খত বাড়ানো আর ভাঙ্গা হাড়ের দেহে আর হাড় ভাঙ্গা
    ২) তার সাথে বিষাক্ত ভাইরাস ঐ দেহে ডুকার সুযোগ করে দেওয়া । যার ফলে পুরা শরীরটাই বিষে ভরে যায় ।
    ৩) চুরি করা চোর গুলোকে ধরা আর শায়েস্তা করার জন্য যেই সময় আর এনারজির দরকার ছিল তা দিয়ে জাসদ সহ অন্য আরও চক্রান্তকারীদের সামলাতে খরচ করা– ফল হিসাবে যেই ডাক্তার ঐ দেহের দেখভাল করছিল তাকে মুছে ফেলা হয়।

    মজার ব্যাপার হোল, ডেকে আনা বা দেহের ভীতরই থাকা ভাইরাস গুলো তাদের ডেকে আনা জাসদকেও ছাড়েনি।
    সুখের ব্যপার হোল, বিষে ভরা শরীর টা ২১ বছর সময় লাগিয়ে একটু একটু করে উঠে দাড়ানোর যাত্রা শুরু করতে পেরেছে
    অমন অপুস্ট শরীর নিয়ে যুদ্দ করে জয় চিনিয়ে আনা স্বাধীনতাকে আজও তাই অনেক অনেক বেশী দামী মনে হয় তাদের ্কাছে যারা সত্যিকার ভাবে এই দেশকে ভালবাসে ।
    সব শেষে জাসদ কে বলবে ১৯৭২-১৯৭৫ এর ভুলের জন্য যেই ডাক্তার কে মুছে ফেলা হয় তার মাজার টুঙ্গিপাড়া গিয়ে, মাফ ছেয়ে শুদ্ধি হয়ে আসা – তারও সাথে
    তাকে ১৯৭২-১৯৭৫ এর সব দোষ স্বীকার করে , কি হয়েছিল, কেন করেছিল সব খুলে বলে নিজকে আরও শুদ্ধ করা indispensable (না করলেই নয়)।
    আর এতেই সত্যিকারের দেশের ভাল চায় রাজনীতির দল হিসাবে দাড়াতে পারবে।

    Reply
  5. হেলাল উদ্দিন

    # হেলাল উদ্দিন।
    দলের ভাঙ্গন, বাসদ সৃষ্টি, এ সকল সময় কোন কোন নেতা কি কি বলেছেন, এগুলু জাসদের সাধারন করমিদের মনে থাকে না, এটা মনে হয় জাসদ নেতাদের বদ্দমুল ধারনা। এটা যদি না হত তাহলে জাসদ-জাসদ ঐক্য চাই বলে আবার কুন জাসদ উপহার দিতে চাচ্ছেন কেউ কেউ? আর মুক্তা ভাই যে বিশ্লেষণটা দিলেন না সেটা হল, জাসদের কমিটিতে ম.খা. বাদল, শ. আম্বিয়া দের রেখে তাঁদের ডাকাডাকি করছেন কি জন্য? আবারো এ রকম খিচুড়ি জাসদ করতে হবে সাধারন কর্মীদের???????????????

    Reply
  6. সৈয়দ আলি

    জাসদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ উপদান নয়। ট্রটস্কিপন্থী তথা মার্কিন সাম্রাজবাদের দালাল কাপালিক জাসদ সৃষ্টি করেছিলো এ দেশের মু্ক্তিপাগল, ত্যাগী ও সমাজবদলাখাঙ্খী তরুনদের পরিচয় প্রকাশ ও এদের নির্মূল করার প্রয়োজনে। এরপরে ঝাঁকের কই কাপালিক ফিরে গেছে তার আসল ঠিকানায়, ত্রিশ হাজার তরুন-তরুনীর রক্ত সে আমেরিকান ক্লিনেক্সে মুছে ফেলেছে। খেল খতম পয়সা হজম।
    ৭৫ পরবর্তী জাসদের ভুমিকার দু’টি স্রোত লক্ষ্য করা যায়। এক ধারে শহুরে এ্যাডভেঞ্চারিস্ট কিছু মাথাগরম তরুন, অন্যদিকে কুকুরের মতো জিহ্বা বের করে শ্বাস ফেলা কিছু রুটি-হালুয়ার উমেদার। এডভেঞ্চারিস্ট গোস্টি এদের কাছে পরাজিত হলে পরে শুধু পড়ে থাকে হালুয়া-রুটি বুভুক্ষু কিছু সুবিধাবাদী। তাদের লেগে থাকার পুরস্কার তারা পেতে ত্রিশ বছরের বেশি লাগলেও শেষতক তাদের মোক্ষ লাভ হয়। তারা কেউ মন্ত্রী, কেউ এমপি, কেউবা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অথবা সাংবিধানিক পদ পেলে সরকারের ছুঁড়ে দেয়া ছেঁড়া রুটি তাদের ভাগ্যে মেলে। সে পদগুলো রক্ষা করতে বাদশাহী দরবার বা মহারাজাদের সভার বিদূষকদের চেয়ে হীন ভুমিকা তারা পালন করে যাচ্ছে। প্রকাশ্যে অপমানিত হয়ে এরা হে হে হে করে ওরা হাসে। দ্বিগুন উৎসাহে একটি ফ্যাসিবাদী সরকারের সমর্থনে নয়া নয়া তত্ব দিয়ে তাদের অবস্থান জায়েজ করছে।
    বক্ষ্যমান নিবন্ধটি পড়লে কেউ কেউ শুরুতে মনে করতে পারেন যে এটি বুঝি পার্টির দ্বন্দ্ব নিয়ে একটি দলিল। যতো বেশি পড়া হয়, ততই রুটি-হালুয়ার ভাগ রক্ষার লড়াইয়ের উৎকট গন্ধ প্রকাশ পেতে থাকে। একটু অগ্রসর পাঠকেরা স্মরণ করতে পারেন যে রুটি-হালুয়া প্রত্যাশী আরেকটি গ্রুপের ডাক্তার সাহেব একখানা দলিল প্রকাশ করার প্রয়াসী হয়েছিলেন। এর প্রতিক্রিয়াতেই আলহাজ্ব সাহেবের গ্রুপের এই মুরীদ বিডিনিউজ২৪.কম এর ব্যান্ডওয়াইড্থ বরবাদ করলেন। কি পাওয়া যাচ্ছে এই নিবন্ধে? কোমর বেঁধে হাজী সাহেব ও তদীয় চামচদের রক্ষা করার জন্য অপরাংশের জন্য কুৎসা ও গালাগালি। গুরুত্ব না থাকলেও আমরা লেখককে আমাদেরকে বিনোদিত করার কৃতিত্বটুকু দিতে মাইন্ড করবোনা।
    পূনঃশ্চ: পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদানুসারে দুই যুযুধান পক্ষই নাকি আপোষ-মীমাংসার পথে যাচ্ছে। ভাইয়া, তুমভি খাও, হামকো ভি খানে দো।

    Reply
  7. ্সহিদুল কবির বিপুল

    এই মতামত টা পড়ে জাসদ কাউঞ্চিল এর পুরনাঙ্গ চেহারা টা ভেসে উঠল। বিস্তারিত জানার পর আশাকরি সারা দেশের নেতাকরমিদের মধ্য যে সংসয় তৈরি করার অপচেষ্টা করছিলেন দলতেগিরা সেটা কেটে যাবে। একটি সময় উপযোগী লেখার জন্য ধন্যবাদ।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—