মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির শ্রেষ্ঠ গল্প, যা শেষ হওয়ার নয়। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির আনন্দ-বেদনার গল্প। অস্তিত্বের প্রশ্নে বাঙালি স্বাধীন বাংলাদেশ চেয়েছে। তাই দেশকে স্বাধীন করতে ’৭১এ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও। এই যুদ্ধে নারীর ভূমিকা ছিল বহুমুখী। সারা বাংলাই তাদের জন্য ছিল রণাঙ্গন। তাই কেবল দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম হারানোর গল্প নয়, মুক্তিযুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণ ও অবদান আরও বড় পরিসরে দেখার মনোভাব থাকা চাই। এসব প্রসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা রোকেয়া কবীরের মুখোমুখি হয়েছেনবনশ্রী ডলি

 

বনশ্রী ডলি: মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইছি…

রোকেয়া কবীর: আমার মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার কথা বলতে গেলে মুক্তিযুদ্ধ কেন, তা কিছুটা বলা প্রয়োজন। মুক্তিযুদ্ধ হঠাৎ করে করিনি। অনেক বছরের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১এর মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির জন্য অবধারিত হয়ে গিয়েছিল। ১৯৫২এর ভাষা আন্দোলন ’৬২এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৯এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০এর নির্বাচন পূর্ব বাংলার বেশিরভাগ মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তত করেছিল। আমিও তাদের একজন।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এবং রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মী হিসেবে যুদ্ধে যাওয়ার মানসিকতা ও প্রস্ততি অন্য সবার চেয়ে কিছুটা অন্যরকম ছিল। সশস্ত্র যুদ্ধ শুরুর আগে ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা নিজেদের প্রস্তুত করার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার্থীদের সচেতন করার কাজটা নিয়মিত করেছি।

আমরা যারা ছাত্র সংগঠন করতাম তাদের মূল কাজ ছিল মানুষকে সংগঠিত করা। কেন মুক্তিযুদ্ধ করতে হবে, স্বাধীনতা আমাদের কেন দরকার, বাংলাদেশ হলে কী পাব– এসব বােঝানো, সংঘটিত করাই ছিল আমাদের কাজ। আমি ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী ছিলাম। তখন ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগসহ অন্য সংগঠনগুলোও এই দায়িত্ব পালন করেছে।

পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পরই মানুষের মোহ ভঙ্গ হয়। পাকিস্তান যেভাবে চলছিল তাতে মানুষ সব কিছুতেই বঞ্চিত হচ্ছিল। বিশেষ করে বাংলা ভাষায় যারা কথা বলি তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও নারী মুক্তির দাবিগুলো পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের আওতায় পূরণ হ্ওয়া সম্ভব নয়, এই সত্যিটা শিক্ষিত সচেতন মানুষদের বুঝতে দেরি হয়নি। বিষয়গুলো স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী বিভিন্নভাবে আলোচনা করতেন। ’৭০ সালে নির্বাচন হল, তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। আমার শিক্ষক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী প্রায় প্রতিদিন ক্লাসে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্যের বিষয়টি উল্লেখ করতেন।

এ ছাড়াও পাকিস্তানের শাসন-শোষণ, কী হ্ওয়া দরকার, এভাবে চলতে পারে না– এসব নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টি, আ্ওয়ামী লীগসহ রাজনৈতিক দলগুলোর আলাপ-আলোচনা, আন্দোলনসহ ছাত্র-জনতার দাবিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শিক্ষকরা সমর্থন দিয়েছেন প্রতিনিয়ত। এতে আমরা প্রভাবিত হয়েছি।

Rokeya Kabir - 111
“বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এবং রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মী হিসেবে যুদ্ধে যাওয়ার মানসিকতা ও প্রস্ততি অন্য সবার চেয়ে কিছুটা অন্যরকম ছিল”

নির্বাচনের পর থেকে পরিস্থিতি বদলে যেতে থাকে। ’৭১এর মার্চ। আলাপ-আলোচনার নামে যখন ইয়াহিয়া খান সময় নিচ্ছিল, তাতে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে, সাধারণ মানুষও বুঝেছিল সশস্ত্র যুদ্ধ ছাড়া আর উপায় নেই। মুক্তিযুদ্ধ কেবল পাকিস্তানি আর বাংলাাদেশের সেনাবাহিনীর যুদ্ধ ছিল না। এটি ছিল নারী-পুরুষের সম্মিলিত গেরিলা যুদ্ধ। পাকিস্তান সেনাবাহিনী এই বাংলাকে তাদের উপনিবেশ হিসেবে শাসন-শোষণ চালাত। সব দিক থেকে বঞ্চিত আন্দোলনরত পূর্ব বাংলার মানুষের উপর ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী গণহত্যা চালায়। এরপর ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণেই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন, “এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। জয় বাংলা।”

যার যা আছে তাই নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য আহবান জানান। বঙ্গবন্ধুর এই আহবানের পর আমাদের সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি আরও বেড়ে যায়।

সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ করা প্রসঙ্গে যদি বলি, পরিবারের সদস্যরা রাজনীতি করতেন। ঢাকায় এসে কলেজ জীবনেই ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে সক্রিয় হই। ফলে দেশের রাজনীতির হালচালের খবর সবসময় অন্যদের আগেই আমি পেতাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় রাজনীতিতে আরও সক্রিয় হই। ’৬৯এর গণআন্দোলনের সময় থেকেই বিভিন্ন স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে যেতে হত। ’৭০এর নির্বাচন এর পর থেকে এসব দায়িত্ব আরও বেড়ে গেল। পড়ালেখার পাশাপাশি রাজনীতি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করা ছিল আমার জন্য স্বাভাবিক ও নিয়মিত কাজ। এর ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে মুহূর্তও দেরি করিনি। আমার পরিবার ও স্বজনদের কাছেও তা ছিল স্বাভাবিক।

সে সময় স্কুল-কলেজে ক্লাস হত না। প্রতিদিন মিছিল-মিটিং, পথসভা, পল্টন ময়দানে সমাবেশ হত। ’৭১এর ১ মার্চ। সংসদ অধবিশেন স্থগিত করার ঘোষণা শুনে প্রতিবাদে ফেটে পড়েছে সাধারণ মানুষ। দুপুরের দিকে বড় ভাই মর্তুজা খানের কলাবাগানের বাসা থেকে ফেরার সময় সায়েন্স ল্যাবরেটরির মোড়ে যেতেই পরিচিত কয়েকজন বলে, “আপা, রিকশায় দাঁড়িয়েই আপনি বক্তৃতা দেন যে, এই ঘোষণা আমরা মানি না। আমাদের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

এসব বলতে বলতেই মিছিল শুরু হল। অন্যদিকে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদেরও বিভিন্ন কর্মসূচি ছিল। কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন ও সমমনা দলগুলো আগেই নিশ্চিত করেছে যে, সামরিক শাসকরা এত সহজে শাসন ছাড়বে না। তাই দাবি আদায়ে আন্দোলন সশস্ত্র সংগ্রামের পথে যেতে পারে।

অন্যদিকে আশা ছিল যে, পূর্ব বাংলার মানুষ আ্ওয়ামী লীগ ও ছয় দফায় যেভাবে সমর্থন দিয়েছে তাতে হয়তো তারা নির্বাচনের রায় মেনে নেবে। কিন্তু তা হয়নি। ঢাকা তখন উত্তাল। সারা দেশ ভেতরে ভেতরে ক্ষোভে ফুঁসছে। সবাইকে সামরিক যুদ্ধের প্রস্তুতির কথা জানান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। খবর পাই, যে কোনো দিন বিশ্ববিদ্যালয় রেইড হতে পারে। ১৩ মার্চ পার্টির নির্দেশে হল ছেড়ে বড় ভাই মর্তুজা খানের কলাবাগানের বাসায় চলে আসি। সব হল থেকেই ছাত্রছাত্রীরা নিরাপদ জায়গায় চলে যায়।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ আমাদের জন্য দিকনির্দেশনা ও সাহসের প্রেরণা ছিল। তখন প্রতিদিন পরিস্থিতি খারাপের দিকে চলে যেতে থাকে। রাজনৈতিক দল ছাড়াও সাধারণ মানুষ মরিয়া এই অবস্থা থেকে মুক্তি প্ওায়ার জন্য। ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকে প্রথম শুরু হয় সামরিক প্রশিক্ষণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ই্ওটিসি থেকে রাইফেল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে প্রশিক্ষণ শুরু করি। রাইফেলগুলো বের করতে সাহায্য করেছেন খেলাধুলা শরীরচর্চার প্রশিক্ষকরা। অবসরপ্রাপ্ত ল্যান্স নায়েকরা প্রশিক্ষণ দেন। অন্য সংগঠনগুলো প্রস্তত হচ্ছিল।

বনশ্রী ডলি: এই প্রশিক্ষণে মেয়েদের সংখ্যা কেমন ছিল? ঢাকার বাইরেও এমন প্রশিক্ষণ হয়েছে?

রোকেয়া কবীর: প্রায় ৪০ জন মেয়ে আর ছেলের সংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি ছিল। ছাত্র ইউনিয়নের মেয়েদের আলাদা ব্রিগেড ছিল যা কেন্দ্র থেকে সংগঠিত করা হত। প্রায় ১০ দিন প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর ডামি রাইফেল দিয়ে রাস্তায় মার্চপাস্ট করি। একদিন মার্চপাস্ট করে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির দিকে যাই। যাওয়ার সময় রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে মানুষ হাততালি দিয়ে আমাদের অভিবাদন জানায়, উৎসাহিত করে। সারা দেশের মানুষকে সশস্ত্র যুদ্ধেও প্রস্ততির সংকেত দেওয়াই ছিল এই মার্চপাস্টের উদ্দেশ্য।

১০ দিন প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম। প্রতিদিন প্রশিক্ষণের পর বিকেলে কলাবাগান, গ্রিন রোড, মগবাজারের পাড়ায় পাড়ায় ছাত্র-ছাত্রীদের সংগঠিত করে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। গৃহিণী, দোকানদার, রিকশাচালক, পাড়ার ক্লাবের সদস্যরাও যোগ দিয়েছে এতে। সময়টাই এমন যে, সবারই কিছু একটা করতে হবে এমন ভাব। তখন সারা দেশের শহরগুলোতে রাইফেল দিয়ে ট্রেনিং না নিলেও নারী-পুরুষ মিলেই বাঁশের লাঠি, সুপারি ও নারকেলে গাছের অংশ বন্দুকের মতো বানিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছে।

বনশ্রী ডলি: ২৫ মার্চ কোথায় ছিলেন এবং তারপর?

রোকেয়া কবীর: ২৫ মার্চ ঢাকা মেডিকেল কলেজে মিটিং শেষে খবর পাই, ঢাকা থমথমে, শহরে আর্মি মুভ করবে, ভয়ানক কিছু ঘটতে পারে। টার্গেট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বিডিআর দপ্তর। সন্ধ্যার পর পাড়ার অনেককে নিয়ে কলাবাগানে মিরপুর রোডে ব্যারিকেড দিই। রাত ১১টা, পাড়ার মানুষ আমার বড় বোন মনিরা ও আমাকে বাসায় চলে যেতে বলে। গভীর রাতে কয়েকবার কিছু শব্দ শুনে খাটের নিচে আশ্রয় নিই। কোনো বাড়ির আলো জ্বালানো নেই, নির্ঘুম অস্থির রাত কাটাই। কারফিউয়ের জন্য পরদিন বিভিন্ন জাযগায় আক্রমণের খবর শুন্ওে বাসা থেকে বের হতে পারিনি। ২৭ মার্চ জরুরি অবস্থা উঠিয়ে নিলে প্রথমেই রোকেয়া হলে যাই, গেইট বন্ধ থাকায় ঢুকিনি। মেডিকেলের দিকে যাই। জগন্নাথ হলে গিয়ে লাশ চাপা মাটির স্তুপ দেখতে পাই। মেডিকেলে য্ওায়ার পর ছাত্রনেতারা আমাদের বাসায় পাঠিয়ে দেন।

রাইফেল কাঁধে মার্চপাস্টের ছবি ছাপা হ্ওয়ায় তখন আমার মুখ পরিচিত। বাসায় থাকা নিরাপদ নয়, কলাবাগানে আরেক ভাইয়ের বাসায় চলে যাই। সেখানে দুদিন থাকার পর অন্য বাসা। এভাবে কয়েক বাসা বদলে কাপাসিয়ার এক গ্রামে চলে যাই। গ্রামে বেশ কিছুদিন থাকার পর একদিন কমিউনিস্ট পার্টির জ্ঞান চক্রবর্তীর চিরকুট পাই, তাতে লেখা ছিল, ‘শহীদুল্লাহর সঙ্গে চলে এসো।’ (শহীদুল্লাহ ভাই কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী ছিলেন)। এরপর আগরতলায় পৌঁছাই।

বনশ্রী ডলি: মক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে নারী ও তাদের অংশগ্রহণ, অবদান কতটা?

রোকেয়া কবীর: বেশিরভাগ মানুষই মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তাদের মধ্যে নারীরাও ছিল। মুক্তিযুদ্ধটা শুধু দুই পক্ষের সেনাবাহিনীর মধ্যে ছিল না। এটি ছিল গেরিলা যুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের চরিত্রটাও ছিল এমন যে, এত কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘরের নারী লড়াই শুরু করেছে। মুক্তিযুদ্ধের আগের সময়টাতে নারীদের সচেতন হ্ওয়া, প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ কম থাকলেও যুদ্ধ শুরু হ্ওয়ার পর অবস্থাটা বদলে যেতে থাকে। কারণ, নারীর ওপর আক্রমণ বিভিন্ন দিক থেকে আসে। একদিকে পরিবার আর নিজের জীবন বাঁচানো, অন্যদিকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও ধর্ষণের শিকার হ্ওয়ার ভয়। ফলে জীবনপণ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া, যুদ্ধকে এগিয়ে নিয়ে স্বাধীন হ্ওয়া ছাড়া কোনো উপায় তাদের ছিল না। নারীর অংশগ্রহণ ছাড়া এত অল্প সময়ে এই গেরিলা যুদ্ধ সফল হত না।

আর রণাঙ্গনে সশস্ত্র নারীর অংশগ্রহণ? আমার ছবি পত্রিকায় প্রকাশ পাওয়ায় গেরিলা যুদ্ধের জন্য অযোগ্য বিবেচিত হলাম। সিদ্ধান্ত হল যে, বিভিন্নভাবে কাজ করতে হবে। নির্দেশ পেলে অস্ত্র হাতে নিতে হবে। সে জন্যই আগরতলায় গিয়ে কাজ শুরু করি।

এ ক্ষেত্রে বলব, তখন তো সব জায়গায় ছিল নারী জন্য রণাঙ্গন। পরিস্থিতি বুঝে নারীরা তাদের অস্ত্র ব্যবহার করেছে। যে গল্পগুলোর কিছু উঠে এসেছে বিভিন্ন সময়। তারপরও সশস্ত্র যুদ্ধ করা নারীর সংখ্যাও কম নয়। যুদ্ধের সময় আমি আগরতলায় কাজ করেছি। ত্রিপুরা রাজ্যের ৩০টি ক্যাম্প ছিল। নারী যোদ্ধাদের খবর তখনই জানতাম। অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে এমন নারী মুক্তিযোদ্ধার ঠিক সংখ্যা নেই। প্রায় তিন হাজারের মতো হবে। যারা আর্মির সঙ্গে কাজ করেছেন তাদের হিসাবটা এসেছে। অনেকের নাম সেভাবে আসেনি।

যে কোনো সংগ্রামে নারীর অবদান কখনও তেমন স্বীকার করা হয় না। নারীকে ট্রাডিশনাল রোলে দেখতে চাওয়া হয় বলে তাদের অবদান নিয়ে ভাবনা কম থেকে গেছে সবসময়। এটা শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা পৃথিবীতেই। ফরাসি বিপ্লব বলুন বা প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, নারীর অংশগ্রহণ, অবস্থান ও অবদান ইতিহাসে ঠিক উঠে আসেনি। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।

মুক্তিযুদ্ধের জন্য আমি যেমন আগরতলায় গিয়েছি, সেখানে কমউিনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়ন কৃষক সমিতির যৌথ ক্যাম্প ছিল। সেখানে গিয়ে বিভিন্ন শরণার্থী শিবির ঘুরে মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহ করা, তাদের রাজনৈতিক ট্রেনিং দেওয়া, বিভিন্ন ক্যাম্পে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবার ব্যবস্থা করার কাজ করেছি। পাশাপাশি ক্যাম্পের শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় লিফলেট ও তথ্য সংগ্রহ এবং বিভিন্ন জায়গায় পাঠানোর কাজগুলো করতে হয়েছে। ছাত্রলীগসহ ছাত্র সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের নারীরা আমার মতো বিভিন্ন ক্যাম্পে এমন কাজগুলো করেছেন।

আবার ‘মুক্তির গান’ চলচ্চিত্রে দেখা গেছে, ট্রাকে চড়ে অনেক নারী শিল্পী ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে যুদ্ধ করেছেন। সেই সময়টাতে নারী-পুরুষ আলাদা করে চিন্তা করার সময় কম ছিল। এমন করে সংগঠিত দল ছাড়া শহর, গ্রাম-গঞ্জের নারীরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুদ্ধ করছে।

বাড়ির পুরুষরা যুদ্ধে চলে গেছে বা বাড়ি থেকে পালিয়েছে, তখন নারী সদস্যরাই একদিকে ঘর, সন্তান সামলানোর পাশাপাশি কৃষিকাজসহ ও লুকিয়ে অস্ত্র রাখা, মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়ে, রাত জেগে পাহারা দিয়ে তাদের পৌঁছে দেওয়া– এমন অসম সাহসের কাজ করেছে। অনেক নারী পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকার আলবদরদের দেশীয় অস্ত্র দিয়ে প্রতিরোধ করেছে। একদিকে নারী অস্ত্র হাতে নিয়েছে অন্যদিকে অনেক নারী পাকিস্তান সেনাবাহিনীসহ রাজাকার-আলবদরদের ধর্ষণের শিকার হয়েছে। অসংখ্য নারী বিধবা হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে। সার্বিকভাবে মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদান বলে শেষ করার নয়।

‘মুক্তির গান’ এর মতো আরও কিছু তথ্যচিত্র পাওয়া গেলে বোঝা যেত নারীরা কতভাবে অবদান রেখেছে। তবে ইতিহাস লেখকরা বেশিরভাগ পুরুষ। আফ্রিকায় একটা কথা আছে, যার সারমর্ম হল, “যে ইতিহাস যে লেখে সে-ই জয়ী হয়, সেটাই একসময় সত্যি হয়।”

তবে এটাই শেষ কথা নয়। মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদানের ইতিহাস লেখা শুরু হয়েছে এবং তা আরও হবে।

বনশ্রী ডলি: স্বাধীন বাংলাদেশ পাওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত বিষয়গুলো নিয়ে নারী মুক্তিযোদ্ধারা কী কাজ করেছেন? মহিলা মুক্তিযোদ্ধা সংস্থার ভূমিকা কী? কয়েকজন বীরাঙ্গনা এবং নারী মুক্তিযোদ্ধার জীবনভিত্তিক কয়েকটি সংকলন প্রকাশ করা হয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে। ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর এলে যাদের কাছে মক্তিযুদ্ধের কথা শুনতে চায় সবাই– এটুকুই কি আপনাদের দায়িত্ব?

 

Rokeya Kabir - 222
“‘মুক্তির গান’ এর মতো আরও কিছু তথ্যচিত্র পাওয়া গেলে বোঝা যেত নারীরা কতভাবে অবদান রেখেছে”

 

রোকেয়া কবীর: নাহ! আমরা আমাদের দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করতে পারিনি। দায়িত্ব অনেক কিছুই ছিল, যা বাংলাদেশ হওয়ার পর সরকার যেমন পারেনি তেমনি মুক্তিযোদ্ধারাও পারেননি। সরকারের প্রথম দায়িত্ব ছিল বীরাঙ্গনাদের পুনর্বাসন ও আহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া। পাকিস্তান সেনাবাহিনীসহ রাজাকার আলবদরদের বিচার করা। সরকার সেই কাজ শুরুও করেছিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে এরই মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়, যা সামাল দিতে সরকার চেষ্টা করছিল। দেশ স্বাধীন হলেও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ষড়যন্ত্রও ছিল দেশে-বিদেশে।

মাত্র সাড়ে তিন বছর পর ’৭৫এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে মেরে ফেলে সেনাবাহিনীর একদল সদস্য। এর পর জাতীয় নেতাদের মেরে ফেলা হল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুকে যেদিন বরণ করার জন্য প্রস্তুত, সেদিন সকালে ড. নীলিমা ইব্রাহীম আপার কাছে শুনলাম, “বঙ্গবন্ধু আর নেই, আর্মিরা তাঁকে মেরে ফেলেছে।” হল থমথমে। সেদিনই রোকেয়া হলে আর্মির সদস্য হলে আসে, তখন ড. নীলিমা ইব্রাহীম আপা আমাকে তাঁর পেছনে টেনে নেন, সেদিন আমাকে তিনি লুকিয়ে রেখে পরিস্থিতি সামলে নিয়েছিলেন। খুব মনে পড়ে সেদিনের কথা! বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলার পর পরিস্থিতিটা পুরো উল্টে গেল। মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে যায়, নারী মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থা আরও খারাপ হল।

মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী সরকার আসায় বঙ্গবন্ধু সরকার পরিচালিত ‘বীরাঙ্গনাদের পুনর্বাসন কেন্দ্র’ চালানো আর সম্ভব হয়নি। ড. নীলিমা আপা অনেকেই এই কেন্দ্র পরিচালনা করতেন। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক প্রতিষ্ঠানের কাজ মুখ থুবড়ে পড়ে। পরে এটি ‘নারী পুনর্বাসন কেন্দ্র’, এখন ‘জাতীয় মহিলা সংস্থা’ হয়েছে।

এরপর সামরিক সরকারের সময় এ দেশে বেসরকারি বেশ কিছু সংগঠন সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করেছে। তবে তখন মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করার কাজ করা যায়নি। ১৯৯৬-এর পর ব্যক্তিগতভাবে এবং আমার সংগঠন ‘নারী প্রগতি’-র সহায়তায় বীরাঙ্গনাসহ ৮৩ জন মুক্তিযোদ্ধাকে ঢাকায় সমাবেশ করে সংবর্ধনা দিই। এটাই প্রথম উদ্যোগ। তবে এ নিয়ে এগিয়ে নিতে পারিনি। বাংলা একাডেমির নেওয়া প্রকল্পের আ্ওতায় কিছু কাজ হলেও তা যথেষ্ট নয়। এরই মধ্যে ‘মহিলা মুক্তিযোদ্ধা সংস্থা’ নামে সংগঠন করি। পাঁচ-ছয় বছর সংগঠনটি সক্রিয় থাকার পর আর সেভাবে কাজ করেনি। এটি আমাদের ব্যর্থতা। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকারকে বার বার নানা ধরনের জঞ্জাল সরানোর কাজ করতে হয়েছে, এখনও হচ্ছে। তাই আমাদের পথচলা সহজ ছিল না কখনও।

২০০১ সালের পর তৃণমূল পর্যায় এসব তথ্য সংগ্রহের কাজ বা সরকারিভাবে প্রাতিষ্ঠানিক কাজ কোনোটাই করা সম্ভব ছিল না মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী পক্ষ ক্ষমতায় থাকার কারণে। যে কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে প্রয়োজনীয় অর্থ ও জনবল দরকার। এরপরও বলতে দ্বিধা নেই, বীরাঙ্গনাসহ যুদ্ধাহত এবং বিধবাদের জন্য তেমন কিছু করতে পারিনি। এখনও অনেককিছু করা বাকি রয়ে গেছে। সরকার কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয়েছে। এটা তাদের শান্তি ও স্বস্তি দিয়েছে। তাদের বাকি জীবনটা সুন্দরভাবে কাটানোর ব্যবস্থা করা দরকার।

বঙ্গবন্ধু তাদের ‘বীরাঙ্গনা’ নাম দিলেও পরিবার-সমাজ তাদের দায়িত্ব নেয়নি। অনেকে আত্মহত্যা করেছেন বা করতে চেয়েছেন। অনেককে সুস্থ করে বিয়ে দেওয়া হল, অনেকে দেশ ছাড়লেন। এভাবে অনেক নারীর অত্যাচারিত হওয়ার খবর আড়ালেই থেকে গেছে। কিছুদিন আগে কানাডা থেকে বাংলাদেশে এক যুদ্ধশিশু মনোয়ারা এসেছিল, সে এখন মা হয়েছে। তার কথা শুনছিলাম। সে আমাদের মনে করিয়ে দিল সেসব দিনের কথা। তাদের জন্য আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা যেন মনে করিয়ে দিয়ে গেল।

বনশ্রী ডলি: ব্যর্থতার দায় নিয়েছেন, আরও কিছু করার উদ্যোগ নেবেন?

রোকেয়া কবীর: কেবল নারীদের অবদানই নয়, মুক্তিযুদ্ধ বিষয় নিয়ে কাজ করতে চাই। নারীদের বিষয়ে কাজ করা আমার বিশেষ দায়িত্ব। ব্যক্তিগতভাবে কাজ করতে গেলে প্রয়োজনীয় রিসোর্স পেতে হবে। বিশেষ করে যুদ্ধে যারা অনেক বেশি অবদান রেখেছেন, তাদের জীবন সুন্দর করতে অনেক কাজ করার আছে। যা সরকার, রাজনৈতিক দলসহ সমাজের সব স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া সম্ভব নয়।

এ ছাড়াও যে বাংলাাদেশ পাওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধ, তেমন দেশ তো এখনও হয়নি। প্রথমত, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে চর্চা করা বড় বিষয়। এ প্রজন্মের নারীদের সেই চেতনার আলো দিতে হবে আমাদেরই। কেবল ক্ষমতার নানা কাঠামোতে নারী প্রতিনিধির কার্যকর ভূমিকার উপর নির্ভর করে অনেক কিছু। বিশেষ কয়েকটি আসনে নারীর ক্ষমতায়নই বড় কথা নয়। তবে এত কিছুর পরও এ দেশের নারীরা অনেক এগিয়েছে। আরও অনেক পথ বাকি। আরও অনেক উদ্যোগ নিতে হবে। যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে উঠতে সাহায্য করবে।

অনেকেই বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করছি। আমাদের আরও সংগঠিত হয়ে কাজ করা প্রয়োজন। কম করে হলেও চলচ্চিত্র নির্মাণ হচ্ছে। গণমাধ্যম সোচ্চার আগের চেয়ে অনেক বেশি। তবে এটা ঠিক যে দেরিতে হলেও কিছু কাজ হয়েছে। এভাবেই যা লেখা হয়নি, তা নিশ্চয়ই বর্তমান প্রজন্ম লিখতে এগিয়ে আসবে। কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনসহ আরও অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণ ও অবদানের বিষয়গুলো লিখেছেন। আরও অনেকেই লিখবেন। কারণ, মুক্তিযুদ্ধে কেবল দুই লক্ষ মা-বোন ইজ্জত দিয়েছেন বলে নারীর অবদান ঘিরে এক ধরনের চিন্তা করা ঠিক নয়। এই মনোভাব থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হ্ওয়ার পর নতুন প্রজন্ম যেভাবে মুক্তিযুদ্ধ ও দেশ নিয়ে ভাবছে তাতে আশাবাদী হই। তারা ঠিক পথেই হাঁটছে। প্রয়োজন তারা যেন বিভ্রান্ত না হয় সেদিকে নজর রাখা।

বনশ্রী ডলিলেখক, সাংবাদিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—