বুম… বুম… বুম!

কামানের গোলার শব্দ!

আমি ভেবেছিলাম যুদ্ধ শেষ। তাহলে বাইরে কী হচ্ছে?

Pic - 555

আমি দৌড়ে আমার আর ভাইয়ার রুম থেকে বেরিয়ে আম্মার কাছে গেলাম।

“কী হচ্ছে, আম্মা? যুদ্ধ না শেষ? আব্বু কই?”

“এটা টোয়েন্টি-ওয়ান গান স্যালিউট।”

“মানে?”

“এটা তোমার জন্মদিনের জন্য।”

১৯৭২ সালের ছাব্বিশে মার্চ, আমার জন্মদিন! এর চেয়ে ভালো কিছু হতে পারে না। ছয় বছর বয়স হল আমার।

আমি সারা বাড়ি আব্বুকে খুঁজলাম। সকালে উঠে সবার আগে সেদিন আমি তাঁরই মুখ দেখতে চেয়েছিলাম। তিনি আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ।

আমি তাঁকে কোথাও পেলাম না। অবশেষে আম্মা আমাকে বললেন, আব্বু নাকি আমার জন্য একটি প্যারেড আয়োজন করতে গেছেন, ঠিক যে রকম কথা শিশুদের সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বলা হয়।

প্রকৃত ঘটনা ছিল, আমার বাবা ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্যারেড কমান্ডার।

১৯৭২ সালের মার্চে তিনি ছিলেন কর্নেল সফিউল্লাহ, যুদ্ধকালীন ‘এস’ ফোর্সের কমান্ডার, যা পরে ৪৬ ব্রিগেড হয়। পরে ১৯৭২ সালের পাঁচই এপ্রিল তিনি বাংলাদেশের সেনাপ্রধান হন।

ঢাকা পুরাতন বিমানবন্দরে বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীনতা দিবসের প্যারেড আয়োজনে ব্যস্ততার কারণে তিনি আসলে আমার জন্মদিন প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন। অন্তত সেটাই আমার সেদিন মনে হয়েছিল।

পুরো পরিবার কুচকাওয়াজে গিয়েছিল। আমি তখনও ভাবছিলাম, এর সব কিছুই আমার জন্য করা হচ্ছিল। কারণ সেদিন তো শুধু আমার জন্মদিন।

যা-ই হোক, আমরা প্যারেড গ্রাউন্ডে গেলাম। সব কিছু সাজানো-গোছানো। আমার জন্মদিনের আয়োজন সম্পন্ন। আব্বুর স্যালুট নেওয়ার জন্য আমি প্রস্তুত।

আমি আম্মা ও ভাইয়ার সঙ্গে সামনের সারিতে বসেছিলাম, ঠিক ছোট একটি মঞ্চের পিছনে। মঞ্চ কেন করা হয়েছিল সে বিষয়ে আমার কোনো ধারণা ছিল না। তবে মনে মনে চেয়েছিলাম, ওইটা আমার জন্যই করা হয়েছে। ভুলে যাবেন না, ওই দিন ছিল আমার জন্মদিন!

কিন্তু কুচকাওয়াজ শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটে গেল। কিছু মানুষ মঞ্চে উঠে গেল; তাদের দেখে মনে হল যেন ওটা তাদেরই জায়গা, আমার নয়!

কিছুক্ষণের মধ্যে কুচকাওয়াজ শুরু হল, আমার আব্বু, আমার কাছে সবচেয়ে হ্যান্ডসাম মানুষ, সেনা ইউনিফর্মে ‘মার্চ পাস্ট’ করে যাচ্ছিলেন।

বিষয়টি আমাকে এতটাই আন্দোলিত করেছিল যে, ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারছিলাম না। ওই দিনটা ছিল আমার এবং সব ঐশ্বর্য নিয়ে বাবা আমার সামনে হাজির হলেন, বেল্ট-বাকল ও পদকগুলো জ্বলজ্বল করছিল। সবার সামনে আব্বু ডান দিকে মাথা বাঁকিয়ে স্যালিউট দিল! সব কিছু আমার জন্য!

 

Pic - 444

 

তবে আমি সালামটি গ্রহণের ঠিক আগেই মঞ্চের একজন তা করে ফেললেন। আমি এটা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। কেউ একজন আমার দিনটাই মাটি করে দিলেন।

পরে অনুষ্ঠানের পুরোটা সময় আম্মার পাশে আমি চুপ করে বসে ছিলাম। তখন সময় কাটানো ছিল আমার জন্য খুবই কঠিন, আব্বুর ফিরে আসা এবং তাঁর কাছে এমনটা কেন ঘটল তা জানার অপেক্ষায় ছিলাম।

আব্বু এলেন। তাঁর সঙ্গে সেই মানুষটিও এলেন, যিনি আব্বুর সেই সালাম গ্রহণ করেছিলেন, যেটা আমি ভেবেছিলাম আমার জন্য।

লম্বা শক্তিশালী একজন মানুষ, যাঁর ভরাট, জোরালো কণ্ঠস্বর। তাঁর হাসি যেন একেবারে ভেতর থেকে আসছিল।

হাসতে হাসতে তিনি আম্মার সঙ্গে কথা বলছিলেন।

আমি এটা আর মেনে নিতে পারছিলাম না। আমার এটা জানতেই হবে তাঁর কাছ থেকে, কেন তিনি এটা করলেন।

আমি সরাসরি ‘বড়দের’ দিকে হেঁটে গেলাম এবং বললাম, “আমি রীমা এবং আজ আমার জন্মদিন। আব্বু যে স্যালিউট দিল সেটা তো আমার জন্য ছিল, তাইলে তুমি কেন নিলা? তোমার কোটের কোনো হাতা নেই কেন? আমার আব্বুর সব স্যুটে তো হাতা আছে!”

তিনি খুব গুরুত্ব দিয়ে আমার দিকে তাকালেন, তাঁর হাত দুটো ‘মুজিব কোটের’ পকেটে ঢুকিয়ে মুঠো বের করে এনে দেখালেন তাঁর খালি হাত। বললেন, “দেখছ, আমি গরিব। আমার কোনো পয়সা নেই। সে জন্য আমার কোটের কোনো হাতা নেই।”

২৬ মার্চ, ২০১৬। আবার আমার জন্মদিন। পঞ্চাশ বছর হল আমার।

আমি এখন যা জানি তখন (১৯৭২) যদি তা জানতাম তাহলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রথম দেখার মুহূর্ত অন্য কোনোভাবে ধারণ করে রাখতে পারতাম।

কাজী ফারহানা জাবীনব্যাংকার; মুক্তিযুদ্ধের ‘এস’ ফোর্সের প্রধান, অন্যতম সেক্টর কমান্ডার ও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সেনাপ্রধান কে এম সফিউল্লাহর কন্যা

১৯ Responses -- “দেখেছ, আমি গরিব, আমার কোনো পয়সা নেই”

  1. Disha

    অনেক emotional একটা লেখা রীমা। অনেক ভালো লাগলো পড়ে, তুমি অনেক Lucky এমন একজন বাবাকে পেয়েছ । ২৬শে মার্চ দিনটি বাংলাদেশের মানুষের জন্যে অনেক স্মরনীয় এবং তুমিও অনেক lucky এইদিনটি তোমার জন্মদিন । ❤️❤️

    Reply
  2. Firoze Shawkat Ali

    Happy belated Birthday . Nice writing .While reading I could visualize you were standing beside the great man and complaining. I also remember attending the same ceremony with my dad who was in army and he was a freedom fighter too.

    Reply
  3. মোঃ হেলাল উদ্দিন

    কাজি ফারহানা জাবিন,
    আপনি এত এত এত সুন্দর ভাবে আপনার সেদিনের মনের ভাব আপনার লেখার মাধ্যমে তুলে ধরতে পেরেছেন যেন মনে হল বিষয় টি আমার সামনেই হোল ।
    এছাড়া আপনি এমনি একজন ভাগ্যবান মানুষ যে বঙ্গবন্ধুর সাথে ওভাবে বালক সুলভ আলাপ করেছেন। একজন বাঙালি হিসেবে এমন ভাগ্য আর ক জনেরই বা আছে বলুন।
    আমি তো কেবল ওনাকে দূর থেকে দেখেই নিজেকে ভাগ্যবান ভাবছি।
    আপনার আরও লেখার অপেক্ষায় রইলাম।

    Reply
    • Kazi Farhana Zabin

      Thank you Mr. Helal.
      I really was hoping for such a response but I didn’t, in my wildest dream, realize that it will actually happen.
      You are right. I have been very fortunate in my lifetime to have had the opportunity to be part of history. . . so up close and personal.
      Good wishes to you.

      Reply
  4. Mohammad Sohel Miah

    Dear Apa,
    you are really one of the happiest and proud daughter of Maj Safiullah……………….”independence day” the day you born you feel always freedom which chance I never got but as a son of freedom fighter I always feel proud as like you. Hope and pray for your good health and happy life.
    Thanks Bdnews24.com for publishing your heart touching and emotional writing.
    Sohel

    Reply
  5. এস.এম. কাঞ্চন

    সেরাদের সেরা তুমি অভিন্দন তোমাকে……….তুমি বললাম বলে তুমি রাগ করো না এটা আমার মনের ভাষা ধন্যবাদ

    Reply
  6. Md Abul Bashar shek

    বাহ অনেক সুন্দর একটা লেখা, আমার চোখ থেকে আপন মনে জল গড়িয়ে পড়ল
    ভালো সে যে আসলেই ভালো,,, শুভ জন্মদিন

    Reply
    • Kazi Farhana Zabin

      I am touched and honored Mr. Bashar at your reaction.
      I never realized that my writing could move anyone to this extent.
      I am grateful to bdnews24.com to have created that window for me to share my experiences of history, memories of legends of this land and dreams of a daughter of a Freedom Fighter.

      Reply
  7. Mahmud

    অসম্ভব সুন্দর অনুভূতি ও লেখার ধরণ,
    বেশ ভালো লাগলো

    শুভ জন্মদিন,
    সৃতিতে অমলীন

    Reply
    • Kazi Farhana Zabin

      Thank you very much Mr. Mahmud.
      This is my first bit of writing and i am honored that you liked it.
      I wanted the readers to see and feel what “that 6 year old Reema” saw and felt.
      Reema

      Reply
  8. Md. Firoz Uddin

    Dear Farhana,
    I am also emotional to read your article. At least you met him. We never got that chance but we keep him in our heart for whom we are an independent nation. Pray for his departed soul. Be Bangladesh prosperous by the leadership of his daughter.

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—