আজকের দিনে এসে, ইতিহাসের বিষয়ের চেয়ে বিভিন্ন বিতর্ক নিয়ে অনেক বেশি আলোচনা হয়। এর ফলে যে সব প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই সময়কাল জানা সম্ভব তার চেয়ে অধিক সময় কাটছে বিতর্ক করে। এটা গবেষকদের জন্য সুসংবাদ নয়। কিন্তু যখন কোনো দেশে, ইতিহাসের বিষয় রাজনীতির অংশ হয়ে যায় তখন এটা হয়েই থাকে।

এটা নিয়ে খুব একটা কিছু করার নেই। তবে রাজনীতি বা তার প্রয়োজনে ইতিহাসচর্চা গবেষকদের বিষয় হওয়া উচিত নয়। কিছু কিছু পেশার জন্য রাজনীতি প্রয়োজন হলেও হতে পারে, কিন্তু কিছু পেশার জন্য রাজনীতি খুবই ক্ষতিকর। দুর্ভাগ্যবশত, ‘দেশপ্রেমের’ অজুহাতে কিছু ক্ষেত্রে এটা হয়েছে বা হচ্ছে। তবে যে সব পেশার রাজনীতি থেকে সবচেয়ে বেশি দূরত্ব বজায় রাখা উচিত তার মধ্যে দুটি হচ্ছে, সাংবাদিকতা ও সমাজ-বিষয়ক গবেষণা।

২.

যদিও আমাদের ঘটনা একটি, অর্থাৎ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, কিন্তু এর পরিসর একাধিক। আমরা দেখি প্রথম পর্যায়ের প্রচেষ্টার মধ্যে রয়েছে দলিলপত্র সংগ্রহ ও সংরক্ষণের প্রকল্প যেটির কাজ শুরু হয় কবি হাসান হাফিজুর রহমানের অধীনে, ১৯৭৮ সালে। কাজ করতে গিয়ে গবেষকদের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, সরকারি আমলা ও প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই দলিল নষ্ট করেছে অথবা দলিলের ক্ষতি করেছে বা লুকিয়ে ফেলেছে ইত্যাদি। এমনকি মুজিবনগর সরকারও যত্ন করে ভারত থেকে সেই সরকারের দলিলপত্র বাংলাদেশে আনেনি। এর ফলে আমরা বলতে পারব না যে, আসলে কত দলিল পাওয়া গেছে বা কত দলির হারিয়ে গেছে।

নানা কারণে অনেকে আবার দলিল লুকিয়ে ফেলেছে। যেমন এটা ঘটেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে যেখানে বহু ফাইল গায়েব করা হয়েছিল। একজন কর্মী আমাকে জানান যে, পরবর্তী পোস্টিংএর অসুবিধার কথা চিন্তা করে এই সব দলিল গায়েব করা হয়।

বাংলাদেশে সেনাবাহিনী কোনো দলিল বেসামরিক হাতে দেননি। এটা দেবার কথা ছিল, কিন্তু দেওয়া হয়নি।

এভাবে সরকারের যে ইতিহাস অর্থাৎ মুজিবনগরের যে ইতিহাস তাও অনুমান-নির্ভর হয়ে উঠতে পারে দলিলপত্রের অভাবে। এই প্রকল্পের দলিলপত্র সিরিজের তৃতীয় খণ্ডে মুজিবনগর সরকার পরিচালনার ইতিহাস পাওয়া যায়। তবে এই সব দলির পাওয়া গেছে কপাল-গুণে। কারণ যে মন্ত্রণালয়ে এই সব দলিল ছিল তারা জানতও না যে, এই সব ওখানে আছে। তাই রক্ষিত হয়েছে। যাহোক, তবু তো একটি চিত্র পাওয়া যায়– কীভাবে একটি মুক্তিযুদ্ধের সরকার বহু অসুবিধা ও সীমাবদ্ধতার মধ্যে পরিচালনা করা হয় তা আমরা জানতে পারি। এই সরকার কী করছে এবং কী করেনি বা করতে পারেনি সেটা সম্পর্কেও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।

৩.

তবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে একটি জনযুদ্ধ যাতে অংশগ্রহণ করে সকল মানুষ, কেবল কয়েক জন দালাল ও বিশ্বাসঘাতক ছাড়া। অতএব এই জনযুদ্ধের অভিজ্ঞতা বহুমাত্রিক ও বিবিধ। এই সব অভিজ্ঞতা সরাসরি যাপিত জীবনের বিষয়। তার মনে কেবল তাদেরই জানার কথা যারা এই অভিজ্ঞতার মাঝ দিয়ে গেছেন। অর্থাৎ প্রতিটি ইতিহাসের যে সাক্ষী, কেবল সে-ই এই ইতিহাস বলতে পারে। এ ক্ষেত্রে দেশের প্রত্যেক মানুষই সাক্ষী এবং তাদের কথা জানতে হবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কাজ হয়েছে কম। যেটা হয়েছে তাকেও অনেক ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য মানের বলা যেতে পারে না।

১৯৭৮ সালে যখন আমি এ নিয়ে গবেষণা করি তখন অনেক মানুষ বেঁচে ছিলেন এই ইতিহাস বলার জন্য। কিন্তু এই জিজ্ঞাসা বা সামাজিক ইতিহাসচর্চার তাগিদ ততটা ছিল না কারও। পরে, ১৯৯৩ সাল থেকে ২০০০ সময়কালে কাজ করার সময়ও সাক্ষী পেয়েছি। কিন্তু খেয়াল করলাম, তথ্য অর্থাৎ মানুষের অভাব।

আরও পরে, ২০০৬ সালে যখন সন্ধান করেছি তখন চিন্তিত হয়েছি এই কাজ কত দিন করা যাবে তা নিয়ে। ২০১৩ সালে এসে যথেষ্ট শ্রম দিতে হয়েছে এই মানুষজনকে শনাক্ত করতে এবং তাদের কাছ থেকে তথ্য জানতে গিয়ে। বর্তমানে ২০১৬ সালে এসে আবার সামাজিক ইতিহাস সংগ্রহের চেষ্টা করেছি। এটাই সম্ভবত হবে আমার গবেষণা করার শেষ প্রচেষ্টা, যেহেতু আর তেমন সাক্ষী পাওয়া যাবে কি না সে ব্যাপারে সন্দেহ রয়েছে।

মনে হয় আমাদের ইতিহাসচর্চার যে সম্পদ বা রসদ লাগে তার অন্তিমলগ্নে এসে দাঁড়িয়েছি আমরা। এরপর আলোচনা হতে পারে, বিশ্লেষণ হতে পারে। কিন্তু মৌলিক ইতিহাস-গবেষণা সম্ভব না-ও হতে পারে।

আফসান চৌধুরীলেখক, সাংবাদিক ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক

Responses -- “মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস-চর্চা ও সাক্ষ্যের সংকট”

  1. setu mohammad

    ইতিহাস আপন গতিতে চলে কথাটি খুবই সত্য। ভয় পাবার কিছু নাই। সত্য এবং মিথ্যা মিলিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উপর অনেক লেখা বেরিয়েছে। কিছু গবেষণাধর্মী কিছু গল্প-উপন্যাস-কবিতা-গান, আবার কিছু ইতিহাস ভিত্তিক লেখাও বাজারে আছে। ওদিকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের দেশি-বিদেশি পত্র-পত্রিকা গুলও কিছু সত্য ধরে রেখেছে। কাজেই সত্য হারাবার নয়। যদিও পাকিস্তান সেনাবাহিনী বা সরকার তাদের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চায়নি,আমাদের সম্পদের ভাগ দেয়নি বরং তারা নির্লজ্জ ভাবে হত্যা-খুন-ধর্ষণ-লুটপাটের কথা আমাদের দেশের আল-বদর,রাজাকার জামাতের মতই অস্বীকার করে চলেছে তাতে ইতিহাস থেমে নাই। পাকিস্তানের অনেক কবি-সাহিত্যিক-মানবাধিকার কর্মী প্রকৃত সত্য তাদের লেখায় তুলে ধরেছে। কাজেই ভয়ের কিছু নাই । মিথ্যা কালক্রমে হারিয়ে যাবে এবং সত্য টিকে থাকবে।সত্যের জয় অনিবার্য ।

    Reply
  2. Razzak

    কিন্তু যে আইনের কথা শুনছি, তাতে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মুক্ত গবেষণার সুযোগ কি থাকবে? ইতোমধ্যে যা আমরা জেনেছি, তার চেয়ে বেশি কিংবা ভিন্ন কিছু বলার, শোনার, লেখার কিংবা বিশ্লেষণের সুযোগ কি থাকবে?

    Reply
  3. naser

    Who were only 14 years old in the year 1971, they are still alive. They can still remember how many people were killed in their respective villages. So at least the research on the death number of the people can be done and if it takes even 15 to 20 years more.

    Reply
  4. R. Masud

    একটা কথা আমাকে খুব অবাক করে,
    পৃথিবীর যেখানে যত অধিকার আদায়ের সংগ্রাম/যুদ্দ হয়ে আধিকার আদায় করেছে সেখানে শত্রুপক্ষের হয়ে ডেটা গোচানো, এনাল্যাইসিস করে শত্রু পক্ষের দোষ কমানোর চেষ্টা করা জাতি , বাংলাদেশ ছাড়া আর দুটো আছে বলে মনে হয়না।
    সংগ্রামে/যুদ্ধে যারা হারে তারা নিজেরা হাজার দোষ করে থাকলেও অন্য পক্ষের উপর খারাপ কাজ করেছে বলে দুনিয়া ইয়ল্টে গেলেও স্বীকার করেনা, যেমন
    ১) পাকিস্তানীরা ১৯৭১ এর যুদ্দে অন্যায় করেছিল তার সামান্যও স্বীকার করেনা
    ২) জাপানীরা চীন, কোরিয়া ইত্যাদিতে যা করেছিল তার অতি সামান্যই স্বীকার করে
    ৩) আমেরিকা ভিয়েতনামে যে আনাচার করেছে তার স্বীকার আজ পর্যন্ত নাই
    ৪) ইত্যাদি ইত্যাদি
    পাকিস্তানে কি ১৯৭১ এর দোষের জন্য জেগে ঊঠা ফেরস্তা আছে?? তাহলে বাংলায় কেন, পাকিস্তানের দোষ কমানোর জন্য উঠে পড়ে লাগা অজাত গুলো আছে??
    একজন চীনা, কোরিয়ানো নাই যে যুদ্দের ব্যাপারে জাপানের পক্ষে কথা বলে, আজকের ভীয়েতনামেও একজনও পাওয়া যাবেনা, যে বলবে ঐ যুদ্দে আমেরিকা খারাপ করেনি ।
    মজার ব্যাপার হলো এই বাংলাদেশে তা গন্ডায় গন্ডায় পাওয়া যাচ্ছে তাদের অনেকেই আবার বাঙ্গালী জাতীয়তা বাদ নিয়ে কথা বলে।
    ভন্ডামীর সীমা আর কতদূর যাবে–!!!!
    পৃথিবীর কোন যুদ্ধে মারা/হত্যা করা সংখ্যার পারফেক্ট দলিল আছে???
    বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ বলে বলে গলা ফাটানো হাজারো অজাত এই বাংলায় আছে, তারা সংখ্যা নিয়ে প্রমান চায় —
    তাই মাঝে মধ্যে মনে হয়, হুমায়ুন আজাদের ভাষায় বলি
    — বাঙ্গালী নামটা লিখে মুতে দিতে ইচ্ছা করে —

    Reply
  5. শফিক আল্ কাজী

    মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে আপনার “গবেষণার” তথ্য নিয়ে একটা লেখা আপনি আ চৌ এই পত্রিকায় লিখেছিলেন গত বছর! বিবমিষা উদ্রেককারী ছিলো সেটা। অবশ্য অনেকে সেটাকে এক ধরনে বিনোদন হিসেবে নিয়েছিলেন । আবার আপনার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চার ডংকা শুনে শংকিত বোধ করছি!

    Reply
  6. সৈয়দ আলি

    আমি আপনার অভিজ্ঞতার স্বাক্ষী। স্বাধীনতা যুদ্ধের নির্মোহ ও তথ্যভিত্তিক ইতিহাস রচনার আশা সুদুর পরাহত। আমার নিজের সংগ্রহে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৯ পর্যন্ত অজস্র নামী-অনামী দূর্লভ দেশী-বিদেশী সাময়িকী, স্মৃতিকথা, সাক্ষাৎকার ছিলো। ২০০০ সালে দেশত্যাগের সময় ১৬ কার্টন ভর্তি সব বেহাত হয়ে যায়। এখন অবাক হয়ে শুনি, ১৯৭২ সালে যে যে কথা বলেছেন, তিনি বর্তমানে সম্পূর্ণ উল্টো কথা বলছেন। হায়, আমার কাছে কোন প্রমান নেই যে আমি তাদের রুখে দাঁড়াবো।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—