ফেব্রুয়ারি মাসে চমকে দেবার মতন লোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটেছে এটিএম-সংক্রান্ত, যেখানে প্রায় ১২০০টির মতন কার্ডের তথ্যাদি চুরি করে একটি সংঘবদ্ধ জালিয়াত চক্র তিনটি ব্যাংক থেকে কোটির অধিক টাকা তুলে নিয়ে যায়। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর আশু তৎপরতায় একজন বিদেশিসহ চার জনকে আটক করা হয়েছে। এদের তিনজন একটি দেশি ব্যাংকে কর্মরত। কার্ড জালিয়াতির বিষয়টি প্রথমবারের মতন ঘটেনি, কিন্তু এটি এত দিন পর্যন্ত ক্রেডিট কার্ডের মধ্যেই সীমিত ছিল, যা কি না এখন এটিএম পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে।

বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক গ্রাহকদের সুবিধার্থে পেমেন্ট ব্যবস্থাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যবস্থা করার নিমিত্তে BFTN, RTGS ইত্যাদির সমন্বয় সাধন করেছে। এখন গ্রাহকেরা যেমন তাৎক্ষণিক সেবা পাবেন তেমনি পাবেন স্বাচ্ছন্দ্য ও আপাত নিরাপত্তা। বিবিধ অনলাইন সাইট ব্যবহারের মাধ্যমে গ্রাহকরা বিশ্বমানের সেবা পাচ্ছেন, যা ক্রমে আরও প্রসারিত হয়ে অর্থনীতির চাকা জোরদার করবে, অর্থনীতির বুনিয়াদ অবশ্যই শক্তিশালী করে তুলবে।

তবে যে কোনো প্রগতির অন্য প্রান্তে থাকে বিশেষ কিছু চ্যালেঞ্জ। এটিএম-সংক্রান্ত ঘটনাও গ্রাহককে ডিজিটাল সেবা প্রদানের পথে একটি বিশেষ চ্যালেঞ্জের দিক চিন্তায় নিয়ে আসে।

মোবাইল কানেক্টিভিটির এ যুগে আমরা সবাই সংযুক্ত, যা কি না কোনো নির্দিষ্ট ভৌগলিক সীমারেখার মধ্যে আবদ্ধ নয়। ফেব্রুয়ারি ২০১৩ সালের ঘটনা, যেখানে কেবল একটি দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ আরও কটি দেশে সংঘবদ্ধ একটি দল প্রায় পাঁচ কোটি ডলার চুরি করে। এ ধরনের আন্তর্জাতিক সংঘবদ্ধ চক্রের চাতুর্য মোকাবেলা করা প্রকৃত প্রস্তাবে কঠিন কাজ। একটি সমীক্ষায় দেখা যায় যে, কেবল যুক্তরাজ্যেই এ প্রকার সাইবার ক্রাইমে আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের বার্ষিক ক্ষতির পরিমাণ এগার বিলিয়ন পাউন্ডের অধিক।

সাইবার ক্রাইম বলতে কম্পিউটার প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে যে কোনো প্রকারের অপরাধ বুঝায়। এর ফলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ যেমন প্রভূত অর্থ জালিয়াতির শিকার হতে পারে, তেমনি হতে পারে অর্থপাচার-সংক্রান্ত জটিল আইনি ব্যবস্থার সম্যক শিকার।

আমাদের প্রজন্মে বিদ্যালয়ের বিতর্ক প্রতিযোগিতাগুলোর মধ্যে একটি বিষয় প্রায়শই থাকত; তা ছিল, আনবিক শক্তি মানব সভ্যতার জন্য আশীর্বাদ না অভিশাপ? তেমনি এখন হয়তো-বা বিষয়টির একটু আঙ্গিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এমনটি হতে পারে, তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্বের জন্য আশীর্বাদ না অভিশাপ?

বিষয়টি প্রকৃত প্রস্তাবে প্রায়োগিক। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মধ্য দিয়ে বিশ্ব যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন মুঠোফোন আকারে সত্যিকারার্থে আমাদের তালুবন্দি। বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমের মধ্য দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বসবাসরত আত্বীয় বা বন্ধুর সঙ্গে যেমন ক্ষণিকে যোগাযোগ করা যায়, তেমনি নিত্য প্রয়োজনীয় ব্যবসায়িক যোগাযোগের গতিও হয়েছে ত্বরান্বিত। বিভিন্ন অনলাইন সাইট ব্যবহারে বিশ্ব বাণিজ্যও হচ্ছে উপকৃত। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে একই গতিধারায় আর্থিক ব্যবস্থাপনা তথা ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার অধীনে আর্থিক লেনদেন ও কলেবরে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এ ব্যবস্থাপনার আপাত দুর্বল দিকসমূহের সুযোগে যে অপরাধচক্র মরিয়া হয়ে উঠবে, নিত্যনতুন উদ্ভাবনার জন্ম দেবে, সেটা খুব স্বাভাবিক। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি কমিশনের তদারকিতে আণবিক বোমাতঙ্কের ব্যাপ্তি হ্রাস পেলেও সাইবার ক্রাইম নিয়ন্ত্রণ করা সত্যি বিরাট একটি চ্যালেঞ্জ।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের জন্য মানব সম্পদ সবচেয়ে মূল্যবান এবং স্পর্শকাতর। এ সম্পদের মেধা যেমন, তেমনি সততার বিষয়টি একইভাবে প্রণিধানযোগ্য। আন্তর্জাতিক জালিয়াত চক্র বিভিন্ন প্রক্রিয়ার আশ্রয় নিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মেইনফ্রেম কম্পিউটার আক্রমণ করে এবং সেখানে থাকা তথ্যাদি হস্তগত করে। তারপর বিভিন্নভাবে এগুলো ব্যবহার করে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে গচ্ছিত অর্থ, তা সেটি গ্রাহকেরই হোক বা হোক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের, নিজেদের কাছে সরিয়ে নেয়।

সাধারণত জালিয়াত চক্র ইমেইলের মাধ্যমে এ কাজ করে থাকে যা Phishing বা Malawareএর মধ্য দিয়ে ঘটে থাকে। প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কর্মচারীদের অজ্ঞতা বা অসৎ উদ্দেশ্য সে সমস্ত ইমেইলকে ওই আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মেইনফ্রেম আক্রমণে সহায়কের ভূমিকা পালন করে। তাই বিষয়টি বিশেষ ব্যবস্থাপনায় নিয়ে আসা আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের আবশ্যিক কাজগুলোর একটি হতে হবে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো এবং তারা যে তথ্যপ্রযুক্তির প্ল্যাটফরম ব্যবহার করে তা বুনিয়াদিভাবে কতটুকু শক্তিশালী সেটিও বিশেষ পর্যবেক্ষণ ও তদারকিতে থাকতে হবে। Firewall সুদৃষ্ট হওয়াটি অবকাঠামোর একটি বিশেষ স্তম্ভ। গ্রাহক সচেতনতা, যেমন নিজের পাসওয়ার্ড সংরক্ষণ, এটিএম ব্যবহারে সাবধানতা, অনলাইন কেনাকাটার সময় ওই সাইটের ব্যাপারে পূর্ব থেকে জানা থাকা সমীচিন।

এ পদক্ষেপগুলো হয়তো-বা পুরোপুরিভাবে নিশ্চিত নিরাপত্তা দিতে পারবে না, কিন্তু ঝুঁকির হাত থেকে আপাত নিরাপত্তা দিতে পারবে।

মাসিউল হক চৌধুরীকলামিস্ট, ব্যাংকার।

Responses -- “সাইবার ক্রাইম ও নিরাপত্তা”

  1. রামারাও সিদ্ধা

    লেখা পড়ে তার সারমর্ম বুঝতে না পারার শতভাগ ব্যর্থতা নিয়েই বলছি, কবিরাজ দিয়ে ক্যান্সারের চিকিৎসা হয় না।

    Reply

Leave a Reply to Shaheen Mahmood Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—