- মতামত - https://opinion.bdnews24.com/bangla -

ক্ষমতাবানদের আগ্নেয়াস্ত্র ও আমাদের ক্ষণস্থায়ী স্মৃতিশক্তি

H M Mohsin [১]বাংলাদেশের মানুষের স্মৃতিশক্তি সম্ভবত খুবই ক্ষণস্থায়ী। খুব সহজেই তারা অনেক বড় বড় ঘটনা ভুলে যায়– সেটি পোশাক শিল্পের দুর্ঘটনাই হোক কী আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘গুম’, ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও খুন-খারাবির সঙ্গে সম্পৃক্ততার ঘটনাই হোক। তবে দেশের আমজনতাকে এ জন্য কেবল দোষ দেওয়া ঠিক নয়। প্রযুক্তির এ যুগে আমরা যেমন স্মার্টফোন থেকে পুরোনো ছবি বা ফাইল ডিলিট করে নতুন ছবি বা ফাইলের জন্য জায়গা তৈরি করি, আমাদের মস্তিষ্কও ঠিক সেভাবেই স্মরণক্ষমতার ব্যবহার করে।

দেশে প্রতিদিন এত চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে যে, নতুন ঘটনাগুলোর জায়গা করে দেওয়ার জন্য পুরনো ঘটনাগুলোর স্মৃতি মুছে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। আর এডিং ও ডিলিটিংএর এই প্রক্রিয়াটি কম্পিউটার প্রোগ্রামের ইনফিনিট লুপের মতো আমাদের মস্তিষ্কে চলতেই থাকে। এরই মধ্য দিয়ে আমরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খেয়াল বা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হই। যেমন ধরুন, আমাদের দেশে সংসদ সদস্য বা তাদের আত্নীয়দের মালিকানাধীন আগ্নেয়াস্ত্রের ট্রিগার মেকানিজম যে স্ট্যান্ডার্ডের চেয়ে লুজ (আলগা), সেটি কজন জানেন বা মনে রেখেছেন?

ভাবছেন উদ্ভট কথা বলছি? মোটেই নয়। কয়েকটি ঘটনার কথা মনে করিয়ে দিলেই ব্যাপারটি পরিস্কার হয়ে যাবে। গত কয়েক বছরে সাংসদ বা তাদের স্বজনদের পিস্তল থেকে ‘অসাবধানতাবশত’ বা দুর্ঘটনামূলকভাবে গুলি বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে বেশ কয়েকবার।

Cartoon - 2 [২]

পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই ২০১০ সালে ঘটে যাওয়া যুবলীগের কর্মী ইব্রাহিমের চাঞ্চল্যকর অপমৃত্যুর ঘটনা। ভোলার সাংসদ নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনের পিস্তলের গুলিতে তারই সহকারী ইব্রাহিম নিহত হয়। পিস্তল নাড়াচাড়া করতে গিয়ে ‘অসাবধানতাবশত’ গুলি বেরিয়ে গিয়ে তার মৃত্যু হয়েছে বলে তখন আমাদের গেলানো হয়েছিল। কেউ যদি পিস্তল নিয়ে নাড়াচাড়া করেও থাকে, গুলিভর্তি অবস্থায় নিজের দিকে তাক করে ট্রিগার নিয়ে খেলা করছিল বলে বিশ্বাস করা কঠিন।

পরিবারের অভিযোগ এবং আমজনতার সন্দেহ ‘সম্মানিত’ সাংসদের দিকে থাকলেও হত্যাকাণ্ড হিসেবে কিন্তু সেটি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং ধারণা করে নেওয়া যেতে পারে যে, সাংসদ শাওনের পিস্তলের ট্রিগার হয়তো লুজ (আলগা) ছিল। তাই ইচ্ছাকৃতভাবে ট্রিগার না টেপা সত্ত্বে্ও গুলি বেরিয়ে গিয়েছিল। অহেতুক সন্দেহ তত্ত্ব তৈরি না করে আলগা ট্রিগার মেকানিজমের দোষ মেনে নেওয়াই সমীচীন!

এই একই সাংসদ অবশ্য ২০০১ সালে হরতাল চলাকালীন বিরোধী দলের মিছিলে গুলির ঘটনায় তৎকালীন এক ক্ষমতাবান সাংসদের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে ওই ঘটনায় যেহেতু ‘আত্নরক্ষা’ বা প্রতিপক্ষকে নিবৃত্ত করার প্রচেষ্টা ছিল, তাই ট্রিগার মেকানিজমের দোষ দেওয়ার অবকাশ ছিল না।

২০১৫ সাল ছিল ক্ষমতাবানদের জন্য আগ্নেয়াস্ত্রের দুর্ঘটনা ঘটানোর প্রতিযোগিতায় পূর্ণ। ফেব্রুয়ারিতে বরিশাল সদর আসনের সাংসদ জেবুন্নেসা আফরোজের লাইসেন্স করা শটগানের গুলিতে তার মামাতো ভাই, আওয়ামী লীগ নেতা সাইদুর রহমান আহত হন। সাংসদের ভাষ্যমতে, তার নিজস্ব বাসভবনে বন্দুকের দোকানদার কর্তৃক শটগানটি পরিস্কার করার সময় অসতর্কতাবশত একটি গুলি বেরিয়ে যায়। ভাগ্যিস সাইদুর রহমান বেঁচে যান।

গুলিভর্তি অবস্থায় শটগান পরিস্কার করার ‘গল্প’ অবিশ্বাসীদের মনে সন্দেহের উদ্রেক করতেই পারে। প্রকৃত ঘটনা হয়তো কখনও জানা যাবে না। তবে আপাতত ওই শটগানের ট্রিগার মেকানিজমকে দোষ না দিয়ে আর উপায় কী!

এপ্রিল মাসে ঘটে ইংরেজি মুভি ‘হিট অ্যান্ড রান’এর মতো ঘটনা, ‘শ্যুট অ্যান্ড রান’– যেটি পরবর্তীতে জুন মাসে উদঘাটিত হয়। সাংসদ পিনুর ছেলে বখতিয়ার মদ্যপ অবস্থায় যানজট থেকে বাঁচার জন্য গুলি করলে একজন অটোরিক্সা চালক ও একজন রিকশাচালক নিহত হন। এরপর কোনো ঝুটঝামেলা ছাড়াই ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন সাংসদপুত্র ও তার বন্ধুবর্গ। সাংসদের ছেলে সাংসদের গাড়ি ব্যবহার করার পরও যদি তাদেরকে রাস্তা ছেড়ে দেওয়া না হয়, তাহলে রাগ করে সাংসদপুত্র গুলি করতেই পারেন!

বেরসিক পুলিশ পরবর্তীতে তদন্ত করে রনিকে শনাক্ত করে। এখন পর্যন্ত তাকে অপরাধী মনে হলেও পরবর্তীতে ঘটনার তদন্ত কোন দিকে মোড় নেয় সেটি অনুমান করার দায়িত্ব পাঠকের ওপরই থাকল।

মে মাসে ঘটে আপাতদৃষ্টিতে ‘অহিংস’ একটি গুলি-দুর্ঘটনা। সরকারদলীয় সাংসদ দবিরুল ইসলাম শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তার লাইসেন্স করা পিস্তল জমা দিতে গেলে সেটি থেকে ‘অসাবধানতাবশত’ একটি গুলি বেরিয়ে যায়। যদিও এ যাত্রায় হতাহতের কোনো ঘটনা ঘটেনি, তবে সন্দিহান ‘আমজনতার’ মনে সত্যিকার ঘটনার ব্যাপারে প্রশ্ন থেকে যেতেই পারে। ক্ষমতার বলয়ের কিছু মানুষের মালিকানাধীন আগ্নেয়াস্ত্রের ট্রিগার মেকানিজম যে সত্যিই আলগা হতে পারে, এ ঘটনা কিন্তু সেটি নির্দেশ করে।

অক্টোবরে সাবেক সাংসদ মোল্লা জালাল উদ্দিনের ভাইয়ের ছেলে হেদায়েত হোসেনের হাতে সাংসদের পুত্রবধূ সোনিয়া নিহত হন। খবরে প্রকাশ, একটি লাইসেন্স করা শটগান নিয়ে ‘ইয়ার্কি’ করে ভাবির মাথায় গুলি করেন হেদায়েত। এজাহারে একে ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২৭ বছর বয়সী হেদায়েত শটগান দিয়ে ভাবির মাথায় তাক করে ইয়ার্কি করতেই পারেন। তিনি কি আর জানতেন ট্রিগার চাপলেই গুলি বেরিয়ে আসবে? তাই সেটিকে ‘দুর্ঘটনা’ না বলে উপায় কী!

সে যাই হোক, পুরনো ওসব ঘটনার কথা বাদ দিয়ে এবার ২০১৫ সালের সবচেয়ে আলোচিত গুলি-দুর্ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দিই। পাঠক কি অনুমান করতে পারছেন কোন ঘটনার কথা বলছি? হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। বলছি অক্টোবরের শুরুর দিকে গাইবান্ধার সাংসদ মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনের গুলিতে শিশু সৌরভের আহত হওয়ার কথা। এ ঘটনায় অবশ্য ট্রিগার মেকানিজমের কোনো দোষ এখন পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। তবে ভেবে দেখুন তো, সাংসদের ইশারা উপেক্ষা করার ধৃষ্টতা কি দেখাতে পারে নয় বছরের এক শিশু! তাকে ‘উচিত শিক্ষা’ দেওয়ার জন্য পিস্তলের গুলির চেয়ে মোক্ষম অস্ত্র আর কী হতে পারে?

তবে সাংসদ এক অবাধ্য শিশুকে ‘উচিত শিক্ষা’ দিয়ে তার ওপর অর্পিত মহান দায়িত্ব পালন করতে চাইলেও দেশের বেরসিক মানুষ ও গণমাধ্যম প্রাথমিক পর্যায়ে সেটি সহজভাবে নিতে পারেনি। ‘সামান্য’ ঘটনায় দেশব্যাপী নিন্দার ঝড় ও সাংসদকে গ্রেফতারের দাবি উঠল। এক সময় আমজনতাকে ‘আইওয়াশ’ করার জন্য সাংসদকে গ্রেফতারও করা হল। তবে শুরুতে বলেছিলাম না, আমরা খুব কম সময়ে সব কিছু ভুলে যেতে পারি? শিশু সৌরভের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাও কিন্তু আমরা সবাই ভুলতে বসেছি।

আমাদের স্মৃতিশক্তির ক্ষণস্থায়িত্বের ফাঁকে তিন সপ্তাহ কারাগারে থাকার পর সাংসদ লিটন ৯ নভেম্বর জামিনে মুক্তি পান। লিটনের গ্রেফতারের আগে ওই ঘটনায় যত মিডিয়া কাভারেজ ছিল, তাকে জামিনে মুক্তি দেওয়ার পর তার সিকি আনাও নেই। জামিন আবেদনে ব্যাখ্যা দেওয়া হয় এভাবে যে, সাংসদ লিটনের সংসদ অধিবেশনে যোগদান অত্যন্ত জরুরি।

তিনি সাংসদ, সংসদে বসে দেশের মানুষের জন্য আইন প্রণয়ন করবেন, সেটি তো অবশ্যই জরুরি। তিনি অনুপস্থিত থাকলে অনেক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে দেশের! তবে গত অধিবেশনে তিনি কবার বক্তৃতা করেছেন বা মতামত দিয়েছেন– অর্থাৎ সংসদ অধিবেশনে যোগদান ও ভূমিকা রেখে দেশ ও জাতির কতখানি কল্যাণ করেছেন তিনি, সেটি জানতে পারলে খুবই ভালো হত।

সংসদ অধিবেশনে তার প্রত্যক্ষ ভূমিকা সমন্ধে জানতে না পারলেও জামিনে থাকা অবস্থায় হেলিকপ্টারে ভ্রমণের কষ্ট করে বিজয় দিবস উদযাপনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যে তিনি পালন করেছেন সেটি জানতে পেরেছি গণমাধ্যমের কল্যাণে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এত এত খবরের মধ্যে সাংসদ মহোদয়ের আকাশ-ভ্রমণের খবর প্রকাশের জন্য গণমাধ্যমকে ধন্যবাদ না দেওয়ার মতো কৃপণতা করব না।

শিশু সৌরভ হত্যা চেষ্টা মামলার তদন্তের বর্তমান অবস্থা কী জানা নেই। তবে পুরনো অনেক ঘটনার মতো এটিও কোনো দুর্ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলে, অথবা ‘লুজ-ট্রিগার’ মেকানিজমের ওপর দোষ চাপানো হলে মোটেই অবাক হব না। বাংলাদেশের মাটিতে ক্ষমতাসীন দলের একজন মহান সাংসদ ‘সামান্য’ একটি গুলির ঘটনায় তিন সপ্তাহ কারাগারে কাটিয়েছেন, সেটিই-বা কম কীসে?

সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে, উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যেতে হলে, ওসব গুলি-দুর্ঘটনা স্মৃতিশক্তি থেকে মুছে ফেলে (ডিলিট করে) নতুন ঘটনার জন্য জায়গা করে দেওয়াই বোধহয় শ্রেয়। পৌরসভার নির্বাচন হচ্ছে। বিরোধী পক্ষের আন্দোলন শুরুর হুমকিও চলছে। তাই আগামী কয়েক সপ্তাহ বেশ ঘটনাবহুল হবার প্রবল সম্ভাবনা। অতএব, সদ্য শূণ্য হওয়া ওই মেমোরি-স্লট আমাদের বেশ কাজে দেবে বলেই মনে হচ্ছে।

এইচ এম মহসীন: [৩] স্ট্র্যাটেজি প্রফেশনাল।

৩ Comments (Open | Close)

৩ Comments To "ক্ষমতাবানদের আগ্নেয়াস্ত্র ও আমাদের ক্ষণস্থায়ী স্মৃতিশক্তি"

#১ Comment By Mohammad Mohiuddin On ডিসেম্বর ৩০, ২০১৫ @ ৮:২১ পূর্বাহ্ণ

ভাইজান, আপনাকে একটি গুরুত্তপূর্ণ লেখার জন্য ধন্যবাদ দিচ্ছি। তবে দুঃখের কথা হল আপনার এমন লেখাটাও খমতাসীনরা পাগলের প্রলাপ বলে উড়িয়ে দেবে। তারপরেও আপনি লিখবেন,প্লিজ।

#২ Comment By md. abul hasanat On ডিসেম্বর ৩১, ২০১৫ @ ২:২৮ পূর্বাহ্ণ

kothay asana sadin bangladesh. khomotabandar sadin baba guli korar odikar thaktai para. jar khomota asa saito guli korba. bai aponi aponar likha bondo korben na.

#৩ Comment By এস এম মাহবুব হোসেন On জানুয়ারি ১, ২০১৬ @ ১:৪৫ অপরাহ্ণ

এরই নাম গণতন্ত্র। এখানে জনগণকে সকল ক্ষমতার উৎস বলা হয়। আবার এই জনগণের উপরেই সব নির্যাতন চলে।