Feature Img

tareq-fসংবিধানের বহুল আলোচিত পঞ্চদশ সংশোধনী সংসদে পাস হয়েছে অনেকদিন হলো। কিন্তু এ নিয়ে বিতর্কের শেষ এখনো হয় নি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি আর রাজা দেবাশীষ রায়ের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য থেকে আমরা সেটা পরিষ্কার বুঝতে পারছি।

অনেকেই আশা করেছিলেন, বৃহত্তর ঐক্য স্থাপনের লক্ষ্যে ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকার সংবিধান সংশোধনে তাড়াহুড়ো করবে না। বাস্তবে তারা সেটাই করেছেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঘটনা উল্টো পথেই গেল। নানা ধরনের বিতর্কিত ধারা ও গোজামিল রেখে এমনকি নিজেদের জোটভুক্ত বাম রাজনৈতিক দলগুলোর কথাও পাত্তা না দিয়ে আওয়ামী লীগ যেন এককভাবেই পাস করলো পঞ্চদশ সংশোধনী। শেষের দিকে অনেকটা তড়িঘড়ি করায় মহাজোট সমর্থক দল বা মতের মানুষ কিম্বা এর বাইরেও যারা কোন না কোনভাবে তাদের চিন্তা ধারন করেন, তারাও প্রবলভাবে হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন।

অন্যদিকে বি.এন.পিসহ সমমনা দলগুলো জানিয়েছে, সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা না থাকায় তারা মহাজোট সরকারের সাথে আর আলাপে আগ্রহী হয়নি। আন্দোলনই তাদের দাবী আদায়ের পথ এখন। উল্লেখ্য, সংবিধান সংশোধনে মোট ৫৫ দফা প্রস্তাব পেশ করা হলেও আমাদের রাজনীতি, সংবিধান, আদালত আর গোটা দেশের মানুষের চিন্তাই যেন এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে আটকে গেছে। পরিহাসের বিষয় হলো, মাত্র দেড় দশক আগে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে দেশে চরম অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। তখন সেই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল আজকের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। আর সরকার ছিল বি.এ.পির। আজ ক্ষমতায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার। আর বি.এন.পি বসেছে বিরোধী আসনে।

আমাদের রাজনীতিবিদ ও আইন প্রণেতারা এমন এক সময়ে এই আপাতঃ নিরর্থক বিষয়ে কুতর্কে মেতেছেন — যখন দেশের মানুষ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির উর্ধ্বমুখী চাপে নাভিশ্বাস ফেলছে। পুলিশ নামের রাষ্ট্রীয় বাহিনী যাকে খুশি তাকে মারবো কায়দায় মানুষ খুন করে চলেছে একের পর এক। যানজটে অসহায় নগর জীবন। টেন্ডারবাজি, নদী – খাল-বিল দখল হয়ে দাড়িয়েছে ক্ষমতাবানদের রুটিনওয়ার্ক। লোডশেডিং আর জ্বালানী সংকটে মানুষের দৈনন্দিন জীবন দুর্বিষহ। ব্যবসা বানিজ্যও প্রায় স্থবির।

এখানে উল্লেখ না করলেও চলে, ’৭২ সনে প্রণয়নের পর আমাদের সংবিধানের এত ব্যাপক সংশোধনের উদ্যোগ আর নেয়া হয় নি। যদিও নানা সময়ে ঘটে যাওয়া নানা পরিবর্তনে এর মৌলিক চরিত্র অনেকটাই পাল্টে গেছে। এক্ষেত্রে সংবিধানের ৪র্থ, ৫ম বা ৮ম সংশোধনীর কথা তো বহুবার আলোচিত হয়েছে। তবে, সংবিধান সংশোধনের একটি প্রস্তাব কিন্তু গত ৩৯ বছর ধরেই ঝুলে আছে। তা হলো, আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান। এই দাবীটি বাহাত্তরেই তোলা হয়েছিল। ’৭০ এর নির্বাচনে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত স্বতন্ত্র গণপরিষদ সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা আদিবাসীদের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে সেদিন গণপরিষদে জোর গলায় বাঙালি ভিন্ন অন্য জাতিসত্বার মানুষদের স্বীকৃতির এই দাবী তুলেছিলেন। কিন্তু ’বাঙালী জাতীয়তাবাদী’দের প্রবল চাপে আর হুঙ্কারে সেদিন গণপরিষদে তার কণ্ঠ চাপা পড়ে গিয়েছিল। একাধিকবার ওয়াক আউট করেও কুল হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য অংশে বসবাসরত আদিবাসীদেরও সেদিন বাঙালী পরিচয় মিলেছিল সংবিধানের বদৌলতে।

তার ফলও মিললো হাতে নাতে। ’৭৩-এর নির্বাচনের আগে বঙ্গবন্ধু রাঙামাটি সফরে গেলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের তিনি আহবান জানালেন, তোমরা বাঙালি হয়ে যাও। একথা বলার সময় তিনি ভুলে গেলেন জিন্নাহ সাহেবের কথা। পাকিস্থানের জাতির জনক যে কায়েদে আজম ’৪৮ সনে ঢাকায় এসে বলেছিলেন একই কথা –Urdu and Urdu shall be, will be the state language of Pakistan। ২৫ বছর পর নিজ দেশের প্রান্তসীমায় বসবাসকারী ভিন্ন ভাষাভাষী কিছু মানুষ যারা বাংলাদেশেরই বাসিন্দা, মুক্তিযুদ্ধে যারা রেখেছে অবদান, করেছে যুদ্ধ সেদিন বঙ্গবন্ধু এসব বিবেচনায় না এনেই তিনি বলে ফেলেছিলেন — তোমরা বাঙালি হয়ে যাও। যদিও তার বক্তব্যের যথার্থতা নিয়ে, মহাজোট সমর্থক বুদ্ধিজীবিদের কারো কারো মনে সংশয় আছে। কেউ কেউ এমনও মনে করেন, তিনি সরল মনেই কথাটি বলেছিলেন।

ইতিহাস বড়ই নিষ্ঠুর। তার এই ’সরল’ উক্তির কারণে পরবর্তী দু’দশকেরও বেশি সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের রীতিমতো জেরবার হতে হয়েছে। ভিটেমাটি হারিয়ে, হত্যা, গুম, জখম, ধর্ষণ, লুটপাট, দেশত্যাগ, গণঅপহরন — হেন প্রকার নির্যাতন নেই যা মুজিব পরবর্তী দুই সামরিক শাসক জিয়া ও এরশাদ তাদের ওপর চাপিয়ে দেয় নি। গোটা পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদেরই এই সন্ত্রাসের মুখোমুখি হতে হয়েছে। কী অপরাধ তাদের ? তারা নিজেদের পরিচয় চেয়েছিলেন, দেশের সংবিধানে তাদের জাতিগত অধিকার চেয়েছিলেন। তাদের বলা হোল, তোমরা বিচ্ছিন্নতাবাদী। তোমরা ভারতের দালাল। কি পরিহাস, উপনিবেশিক পাকিস্থান রাষ্ট্রে যারা বাঙালিদের অধিকার নিয়ে কথা বলতো– পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাদেরও ভারতের দালাল বলতো।

তাদের দাবিয়ে রাখবার জন্য ’ডিভাইড এন্ড রুল’ পলিসি প্রয়োগ করা হলো যা ঔপনিবেশিক বৃটিশ শাসকরা একসময় এদেশে প্রয়োগ করেছিল। দেশের অন্য জেলাগুলো থেকে বিশেষতঃ নদীভাঙা হতদরিদ্র মানুষ আর ভূমিহীনদের রীতিমতো প্রলোভন দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়া হলো। রাষ্ট্র, সেনাবাহিনী, সিভিল আমলাতন্ত্র, রাজনীতিবিদ — সকলের মিলিত ষড়যন্ত্রে সম্ভব হলো এই ব্যাপক মানব স্থানান্তর। ’৪৭এর দেশভাগের পর সাম্প্রতিক সময়ে এত ব্যাপক সংখ্যক মানুষের স্থানান্তর আর দেখা যায় নি। ব্যাপারটা নিরবে ঘটেছে। দেশের অন্যান্য এলাকার কয়েক লক্ষ বাঙালি তাদের ঠাই খুঁজে পেল পার্বত্য চট্টগ্রামে। ফলশ্রুতিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যাসহ অন্য আদিবাসীরাও ব্যাপক হারে দেশত্যাগে বাধ্য হলো। তাদের আশ্রয় হলো পার্শ্ববর্তী ভারতের ত্রিপুরা, অরুনাচল, মিজোরাম প্রদেশে। বাকি যারা রইলেন, তাদের অবস্থা হলো — নিজ দেশে পরবাসীর মতো। রাষ্ট্র তার এই নাগরিকদের রীতিমতো দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করলো এভাবে। আর গোটা পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থানান্তরিত বাঙালি ও আদিবাসী — এই দুই জনগোষ্ঠীকে পরস্পরের মুখোমুখি দাড় করিয়ে দিল। বিভক্তির এই খেলাটি পাকিস্থানের ঔপনিবেশিক শাসকরাও খেলেছিলেন। তখন তাদের তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল, ভারতের বিহার থেকে আগত মুসলিম বিহারীরা। যে হতভাগ্য জনগোষ্ঠী নিজের জন্মভূমি ছেড়ে কেবল মুসলিম একটি রাষ্ট্র লাভের আশায় পাকিস্থানে এসেছিল।

ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকার ও তার সমর্থক কিছু বুদ্ধিজীবির ভাব দেখে মনে হচ্ছে, আদিবাসীরা কেবল পার্বত্য চট্টগ্রামেই বসবাস করেন। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে আদিবাসীদের তাতে আদিবাসী হিসেবে অন্তর্ভুক্তির দাবি উঠলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়,আদিবাসীদের স্বীকৃতি দেয়ার বিরুদ্ধে নাকি গোয়েন্দা রিপোর্টও সরকারের কাছে দেয়া হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, আদিবাসীদের স্বীকৃতি দিলে, পার্বত্য চট্টগ্রামে অনেক অঘটন ঘটে যাবে। এমন কি পূর্ব তিমুরের অবস্থাও তৈরি হতে পারে সেখানে। তাদের অধিকারের স্বীকৃতি দিলে নাকি পার্বত্য চট্টগ্রামে খ্রীস্টান রাষ্ট্রও তৈরি হতে পারে।

কিন্তু , বাংলাদেশের আদিবাসীদের সম্পর্কে যারা খানিকটা খবরও রাখেন, তারা জানেন — শুধু পার্বত্য এলাকায় নয়, সারা বাংলাদেশেই নানা জাতের এই মানুষেরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। এমনকি, বলা হয়ে থাকে, সংখ্যার দিক থেকে তো বটেই, জাতিগত বৈচিত্র্যের দিক থেকেও উত্তরবঙ্গে সর্বাধিক সংখ্যক আদিবাসী বসবাস করেন। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল বা ময়মনসিংহের নানা এলাকায়ও তাদের সংখ্যা খুব একটা কম নয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে তবে এত উদ্বেগ কেন ? কারণ একটিই, পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীরা রাজনৈতিকভাবে অনেক সচেতন এবং সংগঠিত। নিজেদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে তারা দীর্ঘকাল ধরেই আন্দোলন চালিয়ে আসছে। উত্তরবঙ্গসহ দেশের অন্য এলাকার আদিবাসীরা সংগঠিতভাবে তাদের অধিকারের কথাটি অত জোরালোভাবে বলতে পারছেন না।

দেশের অন্য এলাকার আদিবাসী মানুষগুলোও যে খুব ভাল আছেন — এমনটা বলা যাবে না। বছর ৬/৭ আগে পেশাগত একটি কাজে উত্তরবঙ্গের আদিবাসী অধ্যুষিত জেলাগুলোয় দীর্ঘ সময় থাকবার সুযোগ হয়েছিল। তখন উত্তরবঙ্গের রাজোয়াড়, পাহান, কুর্মী, লহড়া, মালো, মুড়ীয়াড়ী বা ভূইমালী নামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষজনকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। অপেক্ষাকৃত কম জনসংখ্যার এই নানা জাতির মানুষগুলোর অবস্থা এতটাই করুন যে, নিজেদের আত্মপরিচয়টুকুও ধরে রাখতে পারছে না তারা। একদিকে দারিদ্র আর অন্যদিকে মূলধারার বাঙালিদের ক্রমাগত নিপীড়ন, ভূমি থেকে উচ্ছেদ, নারী অপহরন, লুটপাট, আগুন দেয়ার মতো ঘটনা উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের প্রায়শই মোকাবেলা করতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে নিরুপায় হয়ে অনেকে ধর্মান্তরিতও হচ্ছে। কারন আর কিছুই নয়– নিরাপত্তা। আর্থিক ও সামাজিক — দুরকম নিরাপত্তার আশায়ই আদিবাসীদের অনেকে ধর্মান্তরিত হচ্ছেন। এই প্রবণতা শুধু উত্তরবঙ্গ নয় — দেশের অন্য আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায়ও দেখা গেছে। অন্যদিকে, রাষ্ট্র এই মানুষগুলোকে কোন অধিকার দেয়া তো দূরে থাক–যতরকমভাবে সম্ভব তাদের বঞ্চিত করছে।

মধুপুর বা সিলেটে যারা বসবাস করেন সেই গারো, হাজং, কোচ, খাসিয়া বা মনিপুরীরাও খুব ভালো অবস্থায় নেই। পীরেন স্লান আর চলেশ রিছিলের হত্যাকাণ্ডের কথা নিশ্চয়ই এখনও ভুলে যান নি অনেকে। তাদের হত্যাকাণ্ডের পর তো ক’বছর কেটে গেল– এই হত্যার কোন বিচার কি হয়েছে ? উল্টো বন বিভাগের উদ্যোগে ইকোপার্ক করবার জন্য ভূমি অধিগ্রহণের কারণে ভবিষ্যতেও যে আর কোন পীরেন স্লান নিহত হবে না — সেই গ্যারান্টিই বা কে দেবে । গোটা মধুপর এলাকার শালবন অঞ্চলকেই ইকো পার্কের নামে দেয়াল দিয়ে ঘিরে ফেলবার চেষ্টা কয়েক বছর ধরেই চলছে। এক সময়কার গভীর শালবন এখন অনেকটাই ফাকা ফাকা। বন কেটে আনারস আর কলার বাগান করা হয়েছে। একাজে স্থানীয় আদিবাসীদেরও জড়িত করা হয়েছে। এখানেও মূল কর্তৃত্ব কিন্তু বাঙালিদের হাতেই। ইকোপার্ক বিষয়ে সরকারের দাবী, অনেক পর্যটক আকৃষ্ট হবে তাতে। আর দেশ বিদেশ থেকে পর্যটকরা এখানে এসে বন যেমন দেখবেন, তেমনি বনের মানুষ হিসেবে আদিবাসীদেরও প্রদর্শন করা হবে তাদের কাছে। তাদের জীবন তাই দেয়াল দিয়ে ঘিরে ফেলা হচ্ছে। বন্ধ গেট থাকবে সেখানে। তালা খোলা হলে তারা লোকালয়ে আসবে আবার সন্ধ্যা হলেই তাদের সেই দেয়াল ঘেরা বনে ফিরিয়ে নেয়া হবে।

কাজেই,এদেশেও যে আদিবাসীরা অনেকটা এই নয়া উপনিবেশের শিকার– তা আর বিস্তৃত না বললেও চলে। আমাদের রাষ্ট্র আর প্রতিপালক শাসকগোষ্ঠী এখন সংবিধানে তাদের নতুন নামকরণ করেছে। এখন আদিবাসীদের আদিবাসী বলা যাবে না। তারা পরিচিত হবেন—-উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতি সত্বা আর ক্ষুদ্র নৃত্বাত্বিক গোষ্ঠী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে এই বিশেষ গোষ্ঠীর মানুষদের সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও উন্নয়নের দায়িত্ব সরকারকে দেয়া হয়েছে। অনেকটা পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী যেভাবে সংরক্ষন করা হয়–সেভাবেই যেন এইসব ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক মানুষদের সংরক্ষণ করা হবে। কারণ এই একই কায়দায় তাদের সংরক্ষণ করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি দেশ। মাঝে মাঝে বিশেষ দিনে আর আয়োজনে বিশেষ অতিথি এল, তাকে আমাদের ’ট্রাইবাল’ সংস্কৃতির খানিকটা দেখাবো। এখন যেমন শিল্পকলা একাডেমীসহ নানা জাতীয় প্রতিষ্ঠান তাদের প্রদর্শন করে থাকে।

আমাদের মাননীয় মন্ত্রীরা এর সপক্ষে যুক্তিও তুলে ধরেছেন। তারা বলছেন, আই.এল.ও কনভেনশনে যেমন তাদের বিজিত দেশের বাসিন্দা বলা হয়েছে –বাংলাদেশের এই বিশেষ মানুষগুলো তো সেরকম নন। তারা কোন ঔপনিবেশিক আক্রমণের শিকার তো হন নি। তাদের দেশ তো কেউ দখল করে নেয়নি। এমনকি, কারা আদিতে এসেছেন–এ ধরনের কুতর্কও তোলার চেষ্টা করছেন কেউ কেউ। উদ্দেশ্যটি পরিস্কার, সংবিধানে তাদের যে নতুন পরিচয় নির্ধারণ করা হয়েছে তা যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করবার চেষ্টা করা। যাতে বোঝা যায়, দেশের এসব ভিন্ন ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষগুলো এদেশে বিশেষ ধরনের নাগরিক।

এখন তাদের পরিচয়ও নতুন করে নির্ধারণ করা হয়েছে। তাদের বাঙালি পরিচয়টি আগে থেকেই ছিল। এবারের সংবিধান সংশোধণীতেও তারা নিজ নিজ জাতির মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি পেল না। বাংলাদেশ নামের এই রাষ্ট্রে চার দশক আগেও আদিবাসীদের অবস্থান যা ছিল, আজও তা রয়ে গেল। বরং সংবিধানে তাদের বিশেষ নামে অভিহিত করে আমরা বাঙালি হিসেবে যে নব্য উপনিবেশিক একটি পরিচয় তাদের জন্য নির্ধারণ করে দিলাম, সেটি এখন প্রমাণিত। এই পরিচয় নির্মানের রাজনীতি এখন গোটা দুনিয়া জুড়েই চলছে। মার্কিনীরা দুনিয়ার সব দেশেই মুসলিম নামধারী কোন মানুষ পেলে তাকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিচ্ছে। গোটা পশ্চিম দুনিয়ায় মুসলমান মানেই সন্ত্রাসী। বিশেষ একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের এই বিশেষ পরিচয় যে নব্য উপনিবেশিক ধারণারই বিস্তার ঘটায় — তা বোধ হয় বিস্তৃত না বললেও চলে। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশের আদিবাসীদের কেবল সংখ্যার বিচারে উপজাতি, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ইত্যাদি নামে আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশও রাষ্ট্র হিসেবে সেই নব্য উপনিবেশিক রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হলো।

তারেক আহমেদ

১৯ Responses -- “ঔপনিবেশিক খোঁয়াড়ি ও আদিবাসী প্রসঙ্গ”

  1. মাসর

    আমাদের দেশের এনজিওদের টাকার লোভ এত বেশি যে, দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে একটা মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করতে উঠে পড়ে লেগেছে। বাংলাদেশে আদিবাসী একমাত্র বাঙালিরাই। আর কেউ নয়।

    Reply
    • আদিবাসী

      পৃথিবীকে একটাই দেশ আছে যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ শাসক জাতি নিজেদেরকে আদিবাসী এবং বাকিদের বহিরাগত বলে দাবি করে— দেশটির নাম বাংলাদেশ। বিপন্ন নিপীড়িত শোষিত বিলুপ্তপ্রায় আদিবাসী বাঙালি জাতিসত্তার জয় হোক… আমিন!

      বাঙালি শব্দটির জন্মই হয়েছে ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের মাধ্যমে। আর পার্বত্য অঞ্চলে যে আদিবাসী বাস করে তা, ১৯০০ সালে ব্রিটিশরাও উল্লেখ করেছেন। আদিবাসী বলতে, যারা আগে এসেছেন তাদের বুঝানো হয়নি, আদিবাসী মানে আদি বাসিন্দা– এই সরলীকৃত ভুল ধারণা ও বিতর্ক অনেকের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে।

      আর জাতিসংঘ ও আমেরিকার দ্বারা আমাদের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করার এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে রিস্ক বা চক্রান্তের কথা আলোচনা হয়, সে ক্ষেত্রে আমার একটা প্রশ্ন আছে, ব্যাপারটা বোধ করি এত সহজ নয়, ভারতও তো জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণায় সই করেছে (আমার ভুল হয়ে না থাকলে), সেখানে indigenous এই লেখা ছিল।

      আমরা এত বড় পলিটিক্স বুঝে গেলাম, ভারত বুঝল না, এটা কেমন করে হয়? ব্যাপারটার গভীরতা সম্ভবত আরেকটু বেশি… একটু ভেবে দেখার প্রয়োজন…

      একই সঙ্গে একটি বিষয়ে প্রাথমিক আলোকপাত করি, সময়ের অভাবে এই মুহূর্তে সম্ভব নয় এক লহমায় বিস্তারিত আলোচনা করা… একই সঙ্গে অন্যান্যদের মতামত ও আলোচনাও এখানে প্রত্যাশিত এবং খুবই আগ্রহী তা শুনতে।

      ইংরেজি Indigenous শব্দটির যে ব্যাপকতা ও অর্থবহতা, আমাদের প্র্যাকটিস বলুন, সহজভাবে গ্রহণ করতে পারার অক্ষমতা বলুন অথবা সাংস্কৃতিক মান ও বোঝাপড়ার সীমাবদ্ধতা বলুন, যে কারণেই হোক, বাংলা ‘আদিবাসী’ শব্দটি দ্বারা তার সমার্থক অর্থ আমরা প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়েছি সামগ্রিকভাবে। আদিবাসী যখন ‘আদি অধিবাসী’, তখন এই প্রশ্ন আমি অনেক জায়গায় উঠতে শুনেছি যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও অপরাপর পাহাড়ি ভূখণ্ডের ক্ষেত্রে পাহাড়িদের বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে আদিবাসী বললে, সমতল ভূমিতে অবস্থানের বিবেচনায় একই রাষ্ট্রে কেন বাঙালিরাও আদি আধিবাসী হিসেবে আদিবাসী নামে স্বীকৃত হবে না?

      এর ব্যাখ্যায় একটি উল্লেখযোগ্য component হতে পারে Non-dominant nations in the state… কিন্তু বাংলা ‘আদিবাসী’ শব্দটি এ ক্ষেত্রে একটি শাব্দিক জটিলতার সৃষ্টি করে অথবা এর সুযোগটি রাষ্ট্রের শাসক শ্রেণি নিচ্ছে!

      সে ক্ষেত্রে এর সমাধানের রাস্তা কী হতে পারে? আমরা কি শব্দটির ব্যাপকতা বিশ্লেষণ করে নতুন শব্দ চয়ন করব, নাকি প্রচলিত শব্দটির বহুমাত্রিকতা কীভাবে সাধারণ মানুষের কাছে সহজে বোধগম্য করে তোলা যায় তার জন্য সচেষ্ট হব।

      সেটা কীভাবে?

      Reply
  2. অনিরুদ্ধ প্রজা

    ‘চাকমা’কে চাকমা, ‘মারমা’কে মারমা, ‘তংচঙ্গা’কে তংচঙ্গা ইত্যাদি জাতিগত নামে না ডেকে হঠাৎ করে তাদের সবাইকে ‘আদিবাসী’ নামে অভিহিত করার অন্তির্নিহিত চক্রান্তটা উদ্ঘাটিত হয়ে পড়েছে বলেই সরকার তাদেরকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে নারাজ। এবং সেইটা যথার্থ। তাদের ‘আদিবাসী’ অভিধায় অভিহিত হওয়ার এত প্রবল ইচ্ছে কেন? একটু কি বিষয়টা চিন্তা করে দেখবেন??

    সংখ্যালঘু জাতি হিসেবে তারা বিভিন্নভাবে বঞ্চিত হতে পারে। আসুন আমরা সবাই জাতি হিসেবে তাদেরকে তাদের স্ব-স্ব নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ে সম্বোধন করি। তাদের বঞ্চনার প্রতিবাদ করি। কিন্তু তাদের সবাইকে একটা পদবাচ্যে সম্বোধন করার পক্ষাপাতিত্বের পেছনে পাশ্চাত্যের হিডেন এজেন্ডার বিষয়ে সচেতন হই।

    Reply
  3. Arook toppo

    ধন্যবাদ এই লেখার জন্য। রাজনীতি নয়, বাঙালির হৃদয় মন দিয়ে উপলব্ধি করুন। আমার মনে হয় আওয়ামী লীগ সরকার দল হিসেবে বর্তমান কোন নীতি বা দর্শন ধারণ বা লালন করে না। আদিবাসী হিসেবে আপনি আমাকে স্বীকৃতি দেন আর না দেন আমি বলব আমি একজন আদিবানী উরাঁও জাতির লোক। আমাদেরকে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়া যতটা না ছোট করা হয়েছে তার চেয়ে বেশী ছোট হয়েছেন আপনারা যারা বাঙ্গালীদেরকে উদার ও অন্সম্প্রদায়িক জাতি হিসেবে মনে করেন। বাঙালি জাতি কি আসলেই তাই?

    Reply
  4. কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর

    লেখাটি বেশ ভালো লাগল। এতে পাহাড়ি-আদিবাসীদের সম্পর্কে অনেক কিছুই জানা গেল।

    Reply
  5. রিপনচন্দ্র মল্লিক

    দেশের দুই বড় দলের এমন সহনীয় কার্যক্রম আমাদেরকে আরো বেশি সামাজিক করে তুলবে বলে মনে হয়।

    রিপনচন্দ্র মল্লিক
    মাদারীপুর

    Reply
  6. মো: হায়দার

    লেখাটি সুন্দর,কিন্তু কিছু প্রশ্ন ছিল। ১। নৃ-বিজ্ঞান অনুসারে আদিবাসীর সঠিক সংজ্ঞা কী? পাহাড়ে বা বনে জংগলে ৫/৬ শত বছর ধরে বাস করলেই কি আদিবাসী বলা যাবে? ২। যদি তারা আসলেই আদিবাসী হয় তবে তাদের আদিবাসী স্বীকৃতি দেয়া হোক। আর যদি বিশেষ ধর্ম গোষ্ঠীর ধর্ম প্রচার আর কিছু প্রতিষ্ঠানের পয়সা খাওয়া লোকদের ষড়যন্ত্র হয়, তবে সে সব কথিত উদার দালালদের ফাসিঁর ব্যবস্থা করা উচিত। উপজাতিদের সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে মূল স্রোতে একীভূত করে নেয়া দরকার। সাদা চামড়ার ষড়যন্ত্র রুখতে সরকারের উচিত বিশেষ স্থানগুলোতে অধিক মনোযোগ দেয়া। নিপীড়ন নয়, বরং সাদা চামড়াদের ষড়যন্ত্র নিরূপন করে, কৌশলে সমস্যার সমাধান করতে হবে। এ দেশে প্রকৃত আদিবাসী বাঙলার কৃষক, হাজার বছর ধরে যারা ব-দ্বীপে বসবাস করছে। যুদ্ধে তাড়া খেয়ে ভিন্ন দেশ থেকে এসে বসতি গড়ে তুলে আদিবাসী হওয়া যায় কিনা আমার বোধগম্য নয়। অবশ্য আমার জানার ভুল থাকতে পারে। আমি পত্রিকাতেই জেনেছি।

    Reply
  7. বিপ্লব রহমান

    গুঢ়তম সত্যি এই যে, আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া একটি দল। উপরন্তু বহু জাতীয়তার স্বীকৃতি দান দলটির অন্যতম ক্যাপিটাল একক ‘বাঙালি জাতীয়তা’র ধারণাকে খানিকটা বিপাকে ফেলতে পারে। তাই শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের চেতনায় ‘বাঙালি’ বাদে অন্য জাতীয়তাবাদের স্থান নেই।

    তারেক ভাইকে ধন্যবাদ ভাবনাটিকে উস্কে দেওয়ার জন্য। এই লেখাটি লিংকসহ ফেসবুক গ্রুপ “পাহাড়ের রূদ্ধকণ্ঠ CHT Voice”, আদিবাসী বাংলা ব্লগ [w4study.com],গুগল+ এ শেয়ার করলাম।

    Reply
    • স্বাধীন শোয়েব

      লেখক বেশ কায়দা করেই উপজাতিদের বিদ্রোহ আড়াল করলেন দেখা যাচ্ছে।

      হ্যাঁ, ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী হিসেবে তারা সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর দ্বারা উৎপীড়নের শিকার হয়েছেন। শেখ মুজিবের সময়ে হয়েছেন অবজ্ঞার শিকার, কিন্তু প্রতিবেশি দেশের অস্ত্র সহযোগিতা নিয়ে তারা যে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন করেছে সেটা বেমালুম চেপে গেলেন।

      আর পার্বত্য শান্তিচুক্তির ভেতরেও তাদের উপজাতি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আমার প্রশ্ন হল, হঠাৎ করে কেন তাদের আদিবাসী হিসেবে দাবি করা হচ্ছে? তাদের নিজেদের নেই আদি পেশা, এমনকি আদি ধর্মটাও বিসর্জন দিয়ে খ্রিস্টান হয়ে গেছেন বলতে গেলে সবাই (বাংলাপিডিয়া দেখুন)।

      লেখক ওইসব বিতর্কে না গিয়ে বরং তাদের কেন আদিবাসী বলা হবে সেইটা নিয়ে কিছু জ্ঞান দিন।

      Reply
  8. Abir Hossain

    ’৭৩-এর নির্বাচনের আগে বঙ্গবন্ধু রাঙামাটি সফরে গেলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের তিনি আহবান জানালেন, তোমরা বাঙালি হয়ে যাও। আসলে বঙ্গবন্ধুই তো সমস্যাটা শুরু করেছিলেন যা এখনো চলছে। তবে সমস্যা থেকে মুক্তি চাই।

    Reply
  9. রুবেল

    ‘৭০ বা ‘৭২-এ মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা কিন্তু পার্বত্যবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসাবে স্বীকৃতির দাবী করেনি। আদিবাসী হিসাবে স্বীকৃতির বিষয়টি এসেছে সাদা জাত যারা আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডসহ অনেক দেশের আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে নিজেদের প্রভুত্ব কায়েম করেছে তাদের সৃষ্ট এনজিও’দের শিখিয়ে দেওয়া বুলি থেকে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বসবাসরত বিভিন্ন জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি তাদের জাতিসত্ত্বা হিসাবেই আসা উচিত, আদিবাসী হিসাবে নয়।
    আমার ১০ বছরের ছেলে আমাকে যখন প্রশ্ন করে বাঙ্গালীরা কোথা থেকে এসেছে? আমি তাকে কি বলব, বাবা তোমার দাদার দাদা যেদিন ডোম থেকে মুসলমান ধর্ম গ্রহন করেছিল সেদিন থেকে এ দেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের ভাষ্যমতে আমরা সৌদিআরব থেকে এসেছি। আর যদি আমরা এখনও ‘ডোম’ থাকতাম তবে তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের মতে এখনও আদিবাসীই থাকতাম!

    Reply
    • Mahee

      আমিও রুবেল সাহেবের সাথে একমত। কোনো নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীকে আদিবাসী বললে মনে হয় অন্য যারা আছে তারা অ-আদিবাসী। ভালো হবে যার যার জাতিগোষ্ঠীর পরিচয়ে বড়ো হওয়া। যেমন বাঙালি, চাকমা, মারমা…।

      Reply
    • বিপ্লব রহমান

      @ রুবেল,

      প্র চ ণ্ড দ্বি ম ত।

      আপনি বলছেন, [“‘৭০ বা ‘৭২-এ মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা কিন্তু পার্বত্যবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসাবে স্বীকৃতির দাবী করেনি।”]

      ঠিক তাই; তবে আপনি যে ঐতিহাসিক সত্যটি চেপে যাচ্ছেন, সেটি হচ্ছে:

      এম এন লারমা ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর, স্বাধীনতার বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবের কাছে ‘পাহাড়ে আঞ্চলিক স্বায়ত্ত্বশাসনের’ চার দফা দাবি তুলে ধরেন। সে সময় শেখ মুজিব ঘৃণাভরে এই দাবি উপেক্ষা করেন। একই বছর ৩১ অক্টোবর বাংলাদেশের সংবিধানে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভাষাগত সংখ্যালঘু পাহাড়িদের ‘বাঙালি’ হিসেবে আখ্যায়িত করার প্রতিবাদে তিনি গণপরিষদ অধিবেশন বর্জন করেন। পরে তিনি ১৯৭২ এর খসড়া সংবিধানে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভাষাগত সংখ্যালঘুদের সাংবিধানিক স্বীকৃতিও দাবি করেন; দাবিটি ভেসে যায় উগ্র জাতীয়তাবাদী ‘বাঙালি’ চেতনার স্রোতে। [দ্রষ্টব্য: গেরিলা নেতা এমএন লারমা, http://w4study.com/?p=1433%5D

      আপনি বলছেন, [“স্বীকৃতির বিষয়টি এসেছে সাদা জাত যারা আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডসহ অনেক দেশের আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে নিজেদের প্রভুত্ব কায়েম করেছে তাদের সৃষ্ট এনজিও’দের শিখিয়ে দেওয়া বুলি থেকে।”]

      মাফ করবেন। আপনি ‘আদিবাসী’ অভিধার অপব্যাখ্যা দিচ্ছেন। এই অভিধার ব্যবহার ভারত উপমহাদেশে চলে আসছে [পুনর্বার–ভারত উপমহাদেশে ‘আদিবাসী’ অভিধার ব্যবহার চলে আসছে] প্রায় দেড়শ বছর ধরে, আপনার কথিত এনজিও ধারণাটির অনেক আগেই।

      ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন ভারতের ঝাড়খণ্ডের সাঁওতাল বিদ্রোহ বা সান্তাল হুলকে সে সময় ব্রিটিশ সরকার ‘ইন্ডিজেনাস/নেটিভ/ট্রাইবেল রিভল্ট’ হিসেবে উল্লেখ করে; এসব অভিধার সবকটিই বাংলায় ‘আদিবাসী’ [আদি বাসিন্দা নয়, বরং আদি অধিবাসী] অভিধার সমর্থক। নিখিল ভারত কমিউনিস্ট পার্টি সান্তাল হুলের বিশ্লেষনে [এবং পরে ভাষাগত সংখ্যালঘু প্রান্তিক জনজাতির অন্যান্য বিদ্রোহ বিশ্লেষণেও]’আদিবাসী’ কথাটি ব্যবহার করলে অভিধাটি জনপ্রিয়তা অর্জন করে। [দ্রষ্টব্য: আদিবাসীর সঙ্গা, http://en.wikipedia.org/wiki/Adivasi%5D

      এছাড়া ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধিতে তো বটেই অসংখ্য আইন ও সরকারি নথিপত্রে পার্বত্যাঞ্চলসহ সমতলের ভাষাগত সংখ্যালঘু প্রান্তিক জনজাতিকে [‘ইন্ডিজেনাস/ট্রাইবেল’] ‘আদিবাসী’ হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছে।

      আপনি বলছেন, [“যদি আমরা এখনও ‘ডোম’ থাকতাম তবে তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের মতে এখনও আদিবাসীই থাকতাম!”]

      দুঃখিত। আপনি ‘আদিবাসী’র ঐতিহাসিক সত্যকে অস্বীকার করতে গিয়ে নিজস্ব জাতিস্বত্তার খেইটিও হারিয়ে ফেলছেন। যে ‘আদিবাসী’তে আপনার এতো অবিশ্বাস, জানেন তো, বাঙালির শেকড় কিন্তু ওই ‘আদিবাসী’তেই গাঁথা। [দ্রষ্টব্য:প্রতিকের দেশি, বিদেশি, আদিবাসি, http://w4study.com/?p=2126%5D

      আপনি বলছেন, [“পার্বত্য চট্টগ্রামের বসবাসরত বিভিন্ন জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি তাদের জাতিসত্ত্বা হিসাবেই আসা উচিত, আদিবাসী হিসাবে নয়।”]

      আপনার এই মতে আবারো উগ্র জাত্যাভিমান প্রকাশ পেলেও ভাষাগত সংখ্যালঘু জাতিগুলোর সাংবিধানিক স্বীকৃতির আকাঙ্খাটুকু প্রকাশ পেয়েছে, সে জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার এই দাবিটিও পূরণে অক্ষম; কেন? তা পৃথক মন্তব্যে আগেই বলেছি। অন্যদিকে উগ্র দক্ষিণপন্থী ও মৌলবাদ ঘেঁষা বলে কথিত ‘বাংলাদেশী’ জাতীয়তাবাদের অধিকারী বিএনপির পক্ষেও দাবিটি পূরণ সম্ভব নয়; এছাড়া বিএনপি ও সমমনা দলগুলো বরাবরই আদিবাসী পাহাড়ি এবং শান্তিচুক্তি বিরোধী চেতনার ধারক।

      আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

      Reply
      • সৈয়দ আলী

        তারেক আহমেদকে ধন্যবাদ একটি অত্যন্ত জরুরী জাতীয় বিষয় নিয়ে সাফ সাফ কথা বলার জন্য। আর বিপ্লব রহমানকে ধন্যবাদ এদেশের জাতিগত সংখ্যালঘুদের পক্ষে সত্য ও ঐতিহাসিক বক্তব্য উপস্থাপন করার জন্য। আদিবাসীর অর্থ যদি হয় ভুমিজ সন্তান, তাহলে হাজার বছর ধরে বরেন্দ্রভুমি ও পাহাড়ে বসবাসরত মানুষেরা যথার্থই আদিবাসী। মূলধারার বাঙালী সংস্কৃতি ও জীবনযাপন পদ্ধতি থেকে তাদের জীবন সম্পুর্ণ ভিন্ন। সমস্যা হচ্ছে, বিপ্লব রহমানকে আক্রমন করে যে সব বক্তব্য রাখা হচ্ছে তার দুটি ধারা আছে। একধারায় “নেতা বলেছিলেন তই তা বেদবাক্য এবং বর্তমান নেত্রী বলেছেন তাই শিরোধার্য্য” মার্কা উগ্র জাতীয়তাবাদী কিছু অর্ধশিক্ষিত “পন্ডিত”, আরেক ধারায় পাহাড়ি-আদিবাসী জনগনের সম্পদ আত্মসাৎকারী অপরাধীরা। একথা মনে রাখা জরুরী যে উগ্র জাতীয়তাবাদই ফ্যাসিবাদের জন্ম দেয়। এর আলামত আমরা স্বাধীনতার পরে থেকেই দেখে আসছি।। বিপ্লব রহমান এবং তারেক আহমেদ যথার্থই বলেছেন যে স্বাধীনতার পরে থেকেই জাতিগত ও ভাষাগত সংখ্যালঘুদের উপর যে বঞ্চনা ও নিপীড়ন চালানো হচ্ছে, তার অবধারিত পরিনতি হচ্ছে সশস্ত্র বিদ্রোহ। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙলাভাষী সচেতন ও সংবেদবনশীল মানুষদের জন্য জরুরী ফ্যাসিবাদী যে দৃষ্টিভঙ্গী বাংলাদেশ রাষ্টযন্ত্র গ্রহন করেছে, তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রসীমার মধ্যে বসবাসরত প্রতিটি ধর্মীয়, জাতিগত এবং ভাষাগত সংখ্যালঘুর অধিকারকে স্বীকার করে ভবিষ্যৎ প্রগতির পথে এগিয়ে চলা। বর্তমান বিতর্কের আরো একটি দিক রয়েছে। একথা সকল ইতিহাসমনস্ক ও শিক্ষিত মানুষের জানা আছে যে, ভারতেও জাতিগত সংখ্যালঘুরা তাদের অধিকার অর্জনের জন্য লড়ছে। তাই বর্তমান ভারত-বান্ধব সরকার কোনভাবেই বাংলাদেশের জাতিগত সংখ্যালঘুদের অধিকার আইনগতভাবে স্বীকার করে ভারতের জাতিগত সংখ্যালঘুদের আন্দোলনকে বেগবান করতে দিতে পারেনা। এই কারনেই বাংলাদেশের “আদিবাসী” সমস্যা বলতেই পার্বত্য চট্টগ্রামের ভুমিজ জনগনের দিকে অঙ্গুলী নির্দেশ করে সমস্যাটির আকার ক্ষুদ্র ও গুরুত্বহীন করার প্রয়াস পাচ্ছে। অথচ দেশের সর্বত্রই আদিবাসীরা ছড়িয়ে আছে (তারেক তাদের কথা উল্লেখও করেছেন)। আসলে এই সমস্যার সমাধানের জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রের গোড়া থেকে টান দিতে হবে, এবং বাংলাদেশের সকল জনগনের উপর জগদ্দল পাহাড়গুলুকে সেই বোকা বুড়োর মতো সরাতে হবে। তাতে যত প্রজন্মের প্রচেষঠাই লাগুক। ধন্যবাদ।

      • বিপ্লব রহমান

        @ সৈয়দ আলী,

        ভাবনাটিকে সমৃদ্ধ করার জন্য আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ। আর দেখুন, এখন তো রাষ্ট্রীয় পর্যায়েই বলা হচ্ছে, [এদেশে বাঙালিরাই আদিবাসী; উপজাতিরা বহিরাগত] — ইত্যাদি। আর কিছু ব্যক্তি বুঝে না বুঝে উগ্র জাত্যাভিমান ও মৌলবাদী গোঁড়ামির কারণে (এটি মোটেই দেশপ্রেম নয়) একে আবার সমর্থনও দিচ্ছেন।

        যদি তাই-ই হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশই হবে বিশ্বের প্রথম আদিবাসী রাষ্ট! আর বিদেশী হিসেবে ভাষাগত সংখ্যালঘু জনজাতিরা এদেশে বিদেশী অতিথি হিসেবে স্বসন্মানে বসবাস করবেন!! উরি বাপ্রে!!! 🙂

    • মাসর

      সম্পূর্ণ একমত। কোন বিদেশি সাহায্যপুষ্ট এন জি ও আমাদের জাতীয় পরিচয়কে পরিবর্তন করতে পারবেনা। বাঙ্গালীরাই এই দেশের একমাত্র আদিবাসী।

      Reply
  10. Azim

    ………অনেকেই আশা করেছিলেন, বৃহত্তর ঐক্য স্থাপনের লক্ষ্যে ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকার সংবিধান সংশোধনে তাড়াহুড়ো করবে না। বাস্তবে তারা সেটাই করেছেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঘটনা উল্টো পথেই গেল। নানা ধরনের বিতর্কিত ধারা ও গোজামিল রেখে এমনকি নিজেদের জোটভুক্ত বাম রাজনৈতিক দলগুলোর কথাও পাত্তা না দিয়ে আওয়ামী লীগ যেন এককভাবেই পাস করলো পঞ্চদশ সংশোধনী………….
    লেখার জন্য ধন্যবাদ। ভালোই লিখেছেন। আসলে যে যায় লঙ্কায় সে–ই হয় হনুমান…! আমাদের বেশ’কয়েক মন্ত্রীর দক্ষতার অভাব রয়েছে যা হয়তো কেউ স্বীকার করতে চাইবেন না। কিন্তু সত্য হল এনাদের দূরদর্শিতার অভাবে দেশের আদিবাসী থেকে কোনো মানুষ-ই ভাল নেই…।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—