Feature Img

farseem-f111মহামহিম সূর্য কহিলেন: (হে ময়দানব) আমি তোমার ইচ্ছা অবগত আছি, আমি তোমার আরাধনায় সন্তুষ্ট। আমি, তোমাকে গ্রহদিগের সুমহান ব্যবস্থা শিখাইব যাহার উপর কালগণনা প্রতিষ্ঠিত আছে।
সূর্য-সিদ্ধান্ত, ১ম শ্লোক, প্রথম অধ্যায়

‘হ্যালো, স্যার, তরুণ বলছি রাজারবাগ ডিএমপি অফিস থেকে।’
‘হ্যাঁ, তরুণবাবু, বলেন আবার কী সমস্যা হলো।’
‘স্যার, একটু আসতে হবে, কমিশনার সাহেবের সাথে মিটিং।’
‘কবে? আমার তো শনি-রবিবার ক্লাস থাকে। সোম-মঙ্গলে মিটিং ফেলা যায় কি-না দেখেন।’
‘ঠিক আছে, স্যার, আগামী সোমবার, সকাল সাড়ে নয়টায় তাহলে আসেন।’
আমি আমার সামনের সুদৃশ্য ডেস্ক-ক্যালেন্ডারটিতে দাগ দিয়ে তারিখটি চিহিৃত করি। আমার সামনের এই ক্যালেন্ডারটি খুবই চিত্তাকর্ষী। ফি-বছর ‘পারসোনা’ সংগঠনটি খুবই সুন্দর ডেস্ক-ক্যালেন্ডার প্রকাশ করে থাকে। আমার স্ত্রীর কল্যাণে তারই একটি আমি ব্যবহার করতে পারছি। ক্যালেন্ডার আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অত্যন্ত জরুরী একটি অঙ্গ। এটি আমাদের চোখের সামনে থেকেও যেন নেই। বাতাসের মতোই। হাত বাড়ালেই পাওয়া যায় বলে তাকে নিয়ে তেমন একটা চিন্তা-ভাবনার কোনো অবকাশ থাকে না। চিন্তা করুন একটি দিন যার কোনো বার নেই, ঘন্টা-মিনিটের হিসেব নেই, কোনো সপ্তাহ-মাস-বছর নেই। নাহ, ভাবাই যায় না! আধুনিক সভ্যতার একটি দিনও ক্যালেন্ডার ছাড়া চলা যায় না। উপরোক্ত কথোপকথেনের সময়ে আমি আনমনে যে ক্যালেন্ডারটি টেনে নিলাম, সেই ক্যালেন্ডারটির একটি ইতিহাস আছে। সে বড় জটিল এক ইতিহাস।

ক্যালেন্ডার বা পঞ্জিকা একটি বিমূর্ত বা অ্যাবস্ট্রাক্ট জিনিস। বহু প্রাচীনকাল থেকে মানুষ দিন গণনার নানা কৌশল রপ্ত করেছে। সময়ের হিসাব রাখা একটা দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় বিষয়। বিশেষ করে, সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে সময়ের হিসাবও ক্রমান্বয়ে জটিল হয়েছে। একটা বড় সভ্যতা বা যেকোনো রাজত্ব টিকিয়ে রাখতে রাজস্ব আদায় খুবই জরুরী। এই রাজস্ব আদায় নির্ভর করে বছরের ঋতুর উপর। কারণ কৃষিজীবি সমাজের ফসলের চাষ ও নবান্ন ঋতুর সাথে তাল মিলিয়ে চলে। তাই দেখা যায় কৃষিকাজ আবিষ্কারের পরপরই প্রাচীন জ্যোতিবির্দরা আকাশের দিকে আরো মনোযোগ দিয়ে তাকাচ্ছেন আর জটিল গণনার মাধ্যমে এলাবোরেট সিস্টেম সৃষ্টি করছেন। কৃষির সূচনার পূর্বে, কিংবা বলা যায় প্রথম দিককার রাজত্ব সৃষ্টির পূর্বে, মানুষ যখন প্রধানত পশুজীবী ছিল, তখন সময় গণনার অতোটা দরকার ছিল না। চাঁদের সাহয্যে পক্ষকাল গণনা বা সাধারণ মাসের হিসাবই যথেষ্ট ছিল। আকাশের তারা দেখে বছর সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধারণা হলেই চলত। গ্রীষ্ম ও শীত এই দুই প্রধান ঋতু এবং তার সাথে উপযোগী তৃণভূমির খবরই সে সময়ে যথেষ্ট ছিল। কিন্তু সমাজ বড় ও জটিল হওয়ার সাথে সাথে, প্রথম সভ্যতা পতনের কিছু আগে থেকেই বছর গণনার হিসাব চলতে থাকে।

প্রাচীন মানুষের কোনো দুরবিন ছিল না। খালি চোখের সাহায্যেই যা কিছু পর্যবেক্ষণ করতে হতো। সৌভাগ্যক্রমে, প্রকৃতি মানুষকে কিছু প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়েছে যার সাহায্যে সে প্রাথমিক সময় গণনা করতে পারে। রাতের আকাশ একটু পর্যবেক্ষণ করলেই দেখা যাবে আকাশের প্রায় সব বস্তুই একটা নিয়ম মেনে আসা-যাওয়া করে। রাতের আকাশের সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে সহজ ‘ঘড়ি’ হলো চাঁদ। চাঁদ একটা মোটামুটি নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে বড় হয়, পূর্ণিমা হয়, তারপর সুন্দর নিয়ম মেনে তার ক্ষয় হয়, অমাবস্যা হয় ইত্যাদি। এছাড়া আছে হাজার হাজার তারা। এসব তারা নিয়ম মেনে আকাশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে চলাচল করে। এই সব জ্যোতিষ্কের পর্যবেক্ষণ থেকে মানুষ সময়ের হিসাব রাখতে শিখেছে।

আকাশের জ্যোতিষ্কের পর্যাবৃত্ত বা পিরিয়ডিক গতির মূলে আছে সূর্যের চতুষ্পার্শ্বে পৃথিবীর বার্ষিক গতি, নিজ অক্ষের চারদিকে পৃথিবীর আহ্নিক গতি এবং পৃথিবীর চারিদিকে চাঁদের ঘূর্ণন। এই সব ঘূর্ণন সম্পর্কে মানুষ অনেক পরে জানতে পেরেছে। কিন্তু প্রাচীন জ্যোতিবির্দেরা রাতের আকাশে জ্যোতিস্কের পর্যাবৃত্ত গতি খুব মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করতেন, তার হিসাব রাখতেন এবং গাণিতিক হিসাব করে মাস-বছর গণনা করতেন। খালি চোখে পর্যবেক্ষণ আর কিছু গাণিতিক পদ্ধতি ছাড়া তাদের কোনো হাতিয়ার ছিল না।

আকাশে সূর্যের অবস্থান থেকে দিবাভাগের সময় মাপা একটা প্রাচীন ঐতিহ্য। সম্ভবত অনেককাল আগে থেকেই কাঠির ছায়া দেখে দিনের সময় মাপা হতো। এমনকি মেগালিথিক সভ্যতায় ইউরোপে বিভিন্ন কাঠামো দেখা যায় যা বছরের বিভিন্ন সময়ের সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সাথে বিশেষ ভাবে অ্যালাইন করা। ইংল্যান্ডের স্টোনহেঞ্জ এই জাতীয় প্রোটো-মানমন্দিরের সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ। স্টোনহেঞ্জের বিরাট পাথুরে কাঠামোর মাঝে অনেক খিলান বা আর্চ দেখা যায় যার কোনোকোনোটি বছরের নির্দিষ্ট সময়ের সূর্যোদয়কে চিহ্নিত করে। অর্থাৎ যখন নির্দিষ্ট কোনো খিলানের মধ্য দিয়ে সূর্যের উদয় দেখা যায়, তখন কোনো বিশেষ ঋতুর সূচনা হয়। পরবর্তী ঋতু আসে অন্য কোনো খিলানের মধ্য দিয়ে সূর্যকে দেখা গেলে। এইভাবে বছরের একটা হিসাব রাখা হতো এবং ঐ কাঠামোটি একটি ক্যালেন্ডার বা পঞ্জিকা হিসেবেই সম্ভবত ব্যবহৃত হতো।

প্রাচীন জ্যোতির্বিদেরা অবশ্যই লক্ষ করেছেন আকাশের নির্দিষ্ট কিছু তারামন্ডলীর আগমন-নির্গমন ঘটে বছরের নির্দিষ্ট ঋতু অনুযায়ী। সূর্যাস্তের পরপরই পশ্চিমাকাশে কিছু নির্দিষ্ট তারাকে দেখা যায়। প্রাচীন মিশরীয়রা জানতেন যে আকাশে লুব্ধক নক্ষত্র দেখার সাথে নীলনদের বন্যার একটা সম্পর্ক আছে। এভাবেই প্রাচীন তারামন্ডলীর উদ্ভব ঘটে। ঋতুর সাথে সংশ্লিষ্ট বিশেষ তারামন্ডলীকে চিহ্নিত করার জন্য আলাদা আলাদা তারাচিত্র কল্পনা করা হয়। প্রাচীনতম তারাচিত্রগুলো বিশ্লেষণ করে এবং প্রাচীন কবিতায়-গাথায়-গল্পে তাদের অবস্থান যেভাবে বর্ণিত হয়েছে তার বিশ্লেষণ থেকে আধুনিক বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন যে প্রাচীনতম তারাচিত্রগুলোর কল্পনা সূচিত হয়েছে বহুপূর্বে, খ্রিষ্টপূর্ব ২১০০ অব্দ বা তারও আগে। ৩৪০ উত্তর ও ৩৬০ উত্তর অক্ষাংশের মাঝে বসবাসকারী মানুষের হাতেই এই তারামন্ডলী বা কনস্টেলেশন তৈরি হয়েছে।

সুপ্রাচীন নগরী এলামের বাসিন্দারা প্রচলিত তারাচিত্রের কয়েকটি মণ্ডলীকে পূর্ণাঙ্গ আকারে ব্যবহার করত বলে মনে হয়, তারপর ব্যাবিলনিয় ও আক্কাদীয়দের হাত ঘুরে এই তারাচিত্র ভুমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মানুষের হাতে পড়ে। ক্রিট দ্বীপের মিনোয়ানরা ছিল নৌবিদ্যায় খুবই পারদর্শী। সম্ভবত এরাই এই তারাচিত্রে সমুদ্রগামী জীবের আকৃতির কল্পনা (যেমন হাইড্রামন্ডলী ) জুড়ে দেয়। এতে তাদের নৌচালনায় দিকনির্দেশনায় সুবিধা হতো। এদের হাত ঘুরে এই তারাচিত্র পৌঁছে প্রাচীন গ্রিকদের হাতে। সেখানে এক প্রাচীন কবি আরাতুসের বর্ণনা থেকে তারাচিত্রের বর্ণনা উদ্ধার করে হিপার্কাস (খ্রি.পূ. ১৪০) অয়নচলনের ধারণা প্রথম প্রদান করেন। এইসব তারাচিত্র বা তারামন্ডলীই আমরা আজো ব্যবহার করি।

সূর্যের চারিদিকে পৃথিবীর পরিভ্রমণের ফলে আকাশে সূর্য একপাশ থেকে আরেকপাশে যাচ্ছে দেখা যায়। সূর্যের এই আপাত গতিপথকে ক্রান্তিবৃত্ত বা সূর্যপথ বা একলিপ্টিক বলে। পৃথিবীর অক্ষ ২৩ ডিগ্রি হেলে থাকে বলে উক্ত ক্রান্তিবৃত্ত ও বিষুবরেখাও একই কোনে আনত থাকে। এইসব তথ্য খুব সুন্দর ভাবে যেকোনো অ্যাস্ট্রনমি বইয়ে আঁকা থাকে (যেমন ‘জ্যোতির্বিজ্ঞান শব্দকোষ’, বাংলা একাডেমী)। কিন্তু প্রাচীন জ্যোতির্বিদদের বহু প্রজন্মের সাধনায় বহুকালের হিসাব নিকাশের ধারাবাহিক ঐতিহ্য থেকেই এটা জানতে হয়েছে। এই ক্রান্তিবৃত্তকে ১২টি ভাগে ভাগ করে রাশিচক্রের কল্পনা করা হয়। যেহেতু বহুকাল পূর্বে প্রাচীন জ্যোতিবির্দদের না ছিল কোনো দুরবিন, না ছিল কোনো মানমন্দির বা সেক্সট্যান্ট যন্ত্র, তাই তারা রাশিচক্রের পুরো ৩৬০ ডিগ্রি বৃত্তীয় গতিপথকে ১২টি ভাগ করে প্রতি ৩০০ অঞ্চলকে চেনা-বোঝার সুবিধার্থে এক-একটি তারামন্ডলীর সাথে সম্পৃক্ত করলেন। এই তারামন্ডলীগুলোকে কোনো পরিচিত আকৃতিতে (যেমন সিংহ বা কন্যা ইত্যাদি) কল্পনা করে নিলে মনে রাখতে সুবিধা হয়। তখন তো আর খাতা-কলম অতো সহজে মিলত না! এই ক্রান্তিবৃত্তের কোনো বিন্দুতে যে তারাটি দেখা যায়, ১২ মাস পরে ঐ বিন্দুতে ঐ তারাটি আবার ফিরে আসে। এভাবে যে বছর গণনা করা হয় তাকে বলে নাক্ষত্র বছর বা সাইডেরিয়াল ইয়ার। একই ভাবে ক্রান্তিবৃত্তের যেকোনো বিন্দুতে সূর্যের ফিরে আসতেও প্রায় একই সময় লাগে এবং এভাবে গণনা করা বছরকে বলে ক্রান্তি বা লৌকিক বছর বা ট্রপিকাল ইয়ার। এই দুইভাবে গণনাকৃত বছরের হিসাবে খুব সূক্ষ্ম তারতম্য আছে। আধুনিক হিসাবে এক ক্রান্তি বছরে থাকে ৩৬৫.২৪২২ দিন, কিন্তু নাক্ষত্র বছরে থাকে ৩৬৫.২৫৬৪ দিন। এই পার্থক্যের কারণে একশ বছরে প্রায় চৌত্রিশ ঘন্টার পার্থক্য হয়, এজন্য একটি পুরো দিন সমন্বয় করতে হয়। কিন্তু দশ-বিশ বছরে এই পার্থক্য খুব সামান্যই থাকে। তাই কোনো কোনো গণনাকারী এই পার্থক্যকে ধর্তব্যেই আনেননি, তাদের দোষও দেয়া যায় না। আজকের মতো তখন তো আর ক্যালেন্ডারের দরকার অতো গুরত্বপূর্ণ ছিল না, কিংবা অতো সূক্ষ্ম হিসাবেরও দরকার ছিল না। দৈনন্দিন লৌকিক আজ সারলেই চলে, আন্তর্জাতিক হিসাবের ব্যাপ্যার তো দূরস্ত। সূর্যের পরিভ্রমণের একটি পুরো বছরে চারটি বিশেষ দিন আছে, যেগুলো খুব সহজেই পর্যবেক্ষকরা চিহ্নিত করেছিলেন। একটি হলো যেদিন দিন ও রাত সমান হয়, সেদিন ২১শে মার্চের কাছাকাছি হয়, উত্তর গোলার্ধে তখন বসন্তকাল। বসন্তকাল একটি উৎসবের মাস, এইসময় নতুন ফসল ঘরে ওঠে, এইদিনটি থেকেই বর্ষ গণনা করার রেওয়াজ আছে বেশির ভাগ সংস্কৃতিতেই। এই দিন সূর্য ওঠে ঠিক পূর্ব দিকে। এর পর থেকে সূর্যের উদয় একটু একটু করে উত্তর দিকে সরতে থাকে। এইসময়কে বলে উত্তরায়ণ। উত্তরায়ণের শেষ ঘটে মধ্যগ্রীষ্মে ২১শে জুনের কাছাকাছি। একে তাই বলে উত্তর অয়নান্ত বা সামার সলস্টিস। ভারতবর্ষে এই দিনটিকে কর্কটসংক্রান্তি পালন করা হয়। এই দিন দিবাভাগের দৈর্ঘ্য সর্বাধিক হয়। এরপর সূর্যের উদয় আবার দক্ষিণ দিকে সরে আসতে থাকে এবং একসময় ঠিক পূর্বদিক বরাবর উদয় হয়। এইসময়ে দিন ও রাত আবার সমান হয়। এই সময়টি ঘটে ২১শে সেপ্টেম্বর নাগাদ। এরপর শুরু হয় শীতের আগমন। সূর্যের উদয়ও আস্তে আস্তে দক্ষিণ দিকে সরতে থাকে। শুরু হয় দক্ষিণায়ন এবং এর শেষ হয় ২১শে ডিসেম্বর নাগাদ দক্ষিণ অয়নান্ত দিনে তখন উত্তর গোলার্ধে দিন হয় ক্ষুদ্রতম। এই দিনের পর আবার সূর্যোদয় একটু একটু করে উত্তরে সরে এসে ঠিক পূর্বদিকে আবার উদিত হয় ২১শে র্মাচ নাগাদ। কাজেই বারোমাসের মধ্যে এই চারটি বিশেষ দিন লক্ষ না করে উপায় নেই তাদের বিশেষ লক্ষণের জন্যই। ক্রান্তিবৃত্তে এই চারটি দিনকে চারটি বিশেষ বিন্দু বলে চিহ্নিত করা হয়। এদের বলে ক্রান্তিবিন্দু বা কার্ডিনাল পয়েন্টস। কাজেই এইসব বৈশিষ্ট্যকে পর্যবেক্ষণ করে, দিন-রাতের বৈশিষ্ট্যকে লক্ষ রেখে, ঋতু পরিবর্তনকে মাথায় রেখে, রাতের আকাশে কোন তারা কোন মুহুর্তে কোথায় দেখা যাচ্ছে সেটার সাপেক্ষে প্রাচীন জ্যোতির্বিদেরা বছর গণনা করার প্রয়াস পান।
আমেরিকান এফিমেরিস অনুযায়ী:
২০১০: বিষুববিন্দু – মার্চ ২০-১৭:৩২, সেপ্ট ২৩-০৩:০৯
অয়নান্ত – জুন ২১-১১:২৮, ডিসে ২১-২৩:৩৮
২০১১: বিষুববিন্দু – মার্চ ২০-২৩:২১, সেপ্ট ২৩-০৯:০৫
অয়নান্ত- জুন ২০-১৭:১৬, ডিসে ২২-০৫:৩০
২০১২: বিষুববিন্দু – র্মাচ ২০-০৫:১০, সেপ্ট ২২-১৪:৪৯
অয়নান্ত – জুন ২০-২৩:০৯, ডিসে ২১-১১:১২
২০১৩: বিষুববিন্দু – র্মাচ ২০-১১:০২, সেপ্ট ২২-২০:৪৪
অয়নান্ত – জুন ২১-০৫:০৪, ডিসে ২১-১৭:১১
২০১৪: বিষুববিন্দু – র্মাচ ২০-১৬:৫৭, সেপ্ট ২৩-০২:২৯
অয়নান্ত – জুন ২১-১০:৫১, ডিসে ২১-২৩:০৩
২০১৫: বিষুববিন্দু – র্মাচ ২০-২২:৪৫, সেপ্ট ২৩-০৮:২১
অয়নান্ত – জুন ২১-১৬:৩৮ ডিসে ২২-০৪:৪৮

[নেভাল ওশানোগ্রফি পোর্টাল, retrieval on May3, 2011]

কিন্তু ক্রান্তিবছর ও নাক্ষত্র বছরের মধ্যে ঐ সূক্ষ্ম তারতম্যের কারণ কী? একশ বছরে চৌত্রিশ ঘন্টা বা বছরে ২০ মিনিটের সামান্য বেশি এই পার্থক্যের কারণ হলো অয়নচলন। অয়নচলন জানার আগে ক্রান্তিবিন্দু চারটির নাম জেনে নেই। ২১শে মার্চ নাগাদ যখন দিন ও রাত্রি সমান তখনকার তারিখকে বলে মহাবিষুব বা বাসন্ত বিষুব বা ভার্নাল ইকুইনক্স। অনেককাল আগে এই ঘটনা ঘটত যখন সূর্য মেষরাশিতে প্রবেশ করত। তাই এই বিন্দুটির অপর নাম মেষাদি বিন্দু বা ফার্স্ট পয়েন্ট অব এরিস ()। ২১শে জুন ও ২১ ডিসেম্বরের কাছাকাছি বিন্দুদ্বয়কে যথাক্রমে বলে কর্কট সংক্রান্তি (সামার সলস্টিস) ও মকর সংক্রান্তি (উইন্টার সলস্টিস)। আর ২১শে সেপ্টেম্বর নাগাদ যে ক্রান্তিবিন্দুটি অবস্থিত তাকে বলে জলবিষুব বা অটামনাল ইকুইনক্স। অনেক কাল আগে এই দিনটিতে সূর্য তুলারাশিতে থাকত বলে এর অপর নাম তুলাদি বিন্দু (তুলারাশির আদিবিন্দু বা ফার্স্ট পয়েন্ট অব লিব্রা, )। এই চারটি বিন্দু, আগেই বলেছি, ক্রান্তিবৃত্তের চারটি অবস্থানের সাথে সংশ্লিষ্ট। কিন্তু একইসাথে তারা বছরের চারটি বিশেষ দিনকে সূচিত করে। যেহেতু এই চারটি বিন্দুর তথা দিনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য বিশেষ লক্ষণযুক্ত বা সচরাচর অন্য দিন থেকে পৃথক, তাই এই চারটি দিনের যেকোনোটি থেকেই বর্ষ শুরু করার রেওয়াজ আছে। এই চারটি ক্রান্তিবিন্দুর মধ্যে বিষুবন বিন্দু দুটির কিছুটা আলাদা তাৎপর্য আছে। এই দুই বিন্দুতে ক্রান্তিবৃত্ত ও বিষুবরেখা পরস্পরকে ছেদ করে। দেখা যায়, এই বিষুববিন্দু দুটি স্থির থাকে না, এদের চলনকেই অয়নচলন বলে। সুপ্রাচীন ব্যাবিলনিয়রা সম্ভবত এই অয়নচলনের ব্যাপারটা টের পেয়েছিল। গ্রিক জ্যোতির্বিদ হিপার্কাস অয়নচলনের ব্যাপারটা খুব ভালোভাবেই জানতেন। অয়নবিন্দুসমূহের এই চলনের ফলে মেষাদি বিন্দু পেছাতে থাকে ও তুলাদি বিন্দু আগাতে থাকে। যেহেতু পৃথিবী কোনো আদর্শ গোলক নয় (এর পেটটা মোটা আর দুই মেরু চ্যাপ্টা; অবলেট স্ফেয়ার), তাই সূর্য ও চন্দ্রের মিলিত আকর্ষণ ঠিক এর কেন্দ্রে কাজ করে না, যার ফলে এর অক্ষরেখারও একটি ঘূর্ণন ঘটে। একেই বলে অয়নচলন যার পরিমাণ প্রায় ২৬০০০ বছর। যেহেতু পৃথিবীর অক্ষরেখাই ঘুরছে, সেহেতু এর বিষুবরেখা ও একলিপ্টিকের ছেদবিন্দু দুটিও আর স্থির থাকতে পারে না। অক্ষরেখার ঘূর্ণন বা অয়নচলনের কারণে ধ্রুবতারাও ধ্রুব থাকে না।

অনেককাল আগে প্রচেতা নক্ষত্র ছিল ধ্রুবতারার অবস্থানে। এখন লঘু সপ্তর্ষির প্রধান তারাটি ধ্রুবতারার অবস্থানের কাছাকাছি থাকায় একেই ধ্রুবতারা হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রায় পনেরো হাজার বছর পর অভিজিৎ নক্ষত্র ধ্রুবতারা হবে।
একটা কথা বলে রাখা ভালো, যখন বলা হয় প্রাচীন ব্যাবিলনিয়রা অয়নচলন সম্ভবত বুঝতে পেরেছিলেন তার কিন্তু একটা গভীর তাৎপর্য আছে। এটা বলা যতোটা সহজ মনে হচ্ছে, আসল কাজটি কিন্তু খুব জটিল ছিল। কারণ ছাব্বিশ হাজার বছর পর্যায়কলের একটা ঘটনা টের পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। এর জন্য চাই সুদীর্ঘকালীন পর্যবেক্ষণ ও তার লিখিত বিবরণী সংরক্ষণ। কয়েকশত বছরের লিখিত বিবরণী না থাকলে বিষুবন বিন্দুগুলোর চলন বোঝার কোনো উপায় নেই। একমাত্র ব্যাবিলনিয়দেরই লিখনের (কিউনিফর্ম লিপি) সুপ্রাচীন ঐতিহ্য ছিল। তাই মনে করা হয় তারা অয়নচলনের ব্যাপারটা সম্ভবত ধরতে পেরেছিল। অয়নচলনের কারণেই ক্রান্তিবছর ও নাক্ষত্র বছরের পার্থক্য দেখা দেয়। এই পার্থক্য আমলে না নিলে প্রাকৃতিক ঋতুর সাথে সন-তারিখের হিসাব মিলবে না। এক ঋতুর উৎসব গিয়ে পড়বে আরেক ঋতুতে। ক্যালেন্ডার তৈরিতে তাই এই বিষয়টা খেয়াল রাখতে হয়। অনেকের মনে হতে পারে যে, বছরের হিসাবে এতো দশমিকের হিসাব কেন, হয়ত আমরা যে একক দিয়ে মাপছি সেটা সঠিক নয়। সঠিক একক হলে হয়ত বছরের হিসাবের একটা আস্ত বা পূর্ণমান পাওয়া যাবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সূর্যের চারিদিকে গ্রহের আবর্তন কালের কেপলারের তৃতীয় সূত্রে ‘পাই’ রশিটি থাকে। বৃত্তের পরিধি ও ব্যাসের অনুপাত এই ‘পাই’ একটি তুরীয় বা ট্রান্সেন্ডেন্টাল সংখ্যা যাকে পূর্ণমানে কখনোই প্রকাশ করা যাবে না। তুরীয় সংখ্যার মৌলিক কাঠামো এমনই রহস্যময় যে, যেভাবেই লেখা হোক না কেন বা যে এককই লেখা হোক না কেন, এটি কখনোই পূর্ণ-সংখ্যক হবে না। কারণ এটি একটি অনুপাত এবং এটি এককের উপর নির্ভর করে না। এছাড়াও সূর্য-চাঁদ ও অন্যান্য গ্রহের মিলিত মহাকর্ষীয় আকর্ষণের প্রভাবে পৃথিবীর অক্ষেরও ঘূর্ণন হয় এবং এর বিচলন (নিউটেশন) ঘটে। এই সমস্ত কারণে বর্ষগণনা খুব জটিল হয়ে যায়। প্রফেসর অজয় রায়ের ভাষায়, বর্ষগণনা একটি চলমান প্রক্রিয়া। যেমন বর্তমান গ্রেগরিয় পদ্ধতিতে প্রতি চার বছর অন্তর ফেব্রুয়ারি মাসে একটি অতিরিক্ত দিন যোগ করতে হয়। ঠিক তেমনি কিছু দিন পরপরই সংশোধনের মাধ্যমে বছর গণনার পঞ্জিকাকে সময়োপযোগী রাখতে হয়।
বছর গণনা সত্যিই জটিল কর্ম, যদি আমরা আধুনিক বিজ্ঞানের অধিকতর সূক্ষ্মতায় বিচার করি। তবে সাধারণ প্রয়োজনে দিনের সূর্য ও রাতের চাঁদ-তারা দেখে ক্যালেন্ডার প্রণয়ন করা সম্ভব। লৌকিক প্রয়োজনে তা-ই করা হয়েছে, বেশ কিছু দিন পরপর প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হয়েছে। সমস্যা দেখা দেয় তখনই যখন সঠিক সময়ে সঠিক সংশোধনটি করা হয়না বা উপেক্ষা করা হয়। এটাই বর্ষগণনার মোটামুটি সংক্ষিপ্ত সহজ ইতিহাস। পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে বিভিন্নভাবে বর্ষগণনা করা হয় এবং এইসব বর্ষ-পঞ্জিকা সেইসব অঞ্চলের সংস্কৃতির প্রতীক। মানুষেরই প্রয়োজনে ক্যালেন্ডার বানানো হয়, তার উৎসবাদি যাতে সঠিক সময়ে সম্পাদিত হয়, তার ধর্মীয় প্রয়োজন ও রাষ্ট্রের রাজস্ব ও অন্যান্য প্রয়োজন যাতে যথাযথভাবে মেটে সেভাবেই ক্যালেন্ডার গণনা করা হয়। আমাদের বাংলা সনও অনেকটা ঠিক সে প্রয়োজনেই গড়ে উঠেছে। ভারত উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রমাব্দ, শকাব্দ ইত্যাদি নানারকম বর্ষগণনার চল আছে। এসবই এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও জ্যোতির্বিদ্যা চর্চার উৎকর্ষের উপর নির্ভরশীল ছিল।

ভারতীয় জ্যোতিবির্দ্যার তিনটি কালবিভাগ আছে – বৈদিকযুগ (খ্রিষ্টপূর্ব ১৪০০-এর পূর্ববর্তী), বেদাঙ্গ জ্যোতিষ (খ্রিষ্টপূর্ব ১৪০০-৪০০ খ্রিষ্টাব্দ) ও সিদ্ধান্তকাল (৪০০-১২০০ খ্রিষ্টাব্দ)। বৈদিকযুগের জ্যোতির্বিজ্ঞান সাধারণ পর্যায়ের এবং বেদাঙ্গ জ্যোতিষও খুব একটা উচ্চাঙ্গের নয়। সিদ্ধান্তযুগের পাঁচটি সিদ্ধান্ত গ্রন্থের মধ্যে সর্বাপেক্ষা শুদ্ধ হলো ‘সূর্য-সিদ্ধান্ত’। কিন্তু ডক্টর মেঘনাদ সাহা এই ‘সূর্য-সিদ্ধান্ত’কে মূলে বিদেশী ও ব্যাবিলনিয় ভাবধারায় রচিত বলে মত দিয়েছেন। কিন্তু আমাদের দেশীয় পন্ডিতবর্গের কাছে ‘সূর্যসিদ্ধান্ত’ এতোটাই প্রভাবময় যে তারা ১১০০ খ্রিষ্টাব্দের পর আর রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণ করতেই ভুলে গেছেন। সৈদ্ধান্তিক মন্ত্রকেই আপ্তবাক্য ধরে ধারাবাহিক ভাবে যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ করে গেছেন। নতুন বছর শুরু করার বিষয়ে ‘সূর্য-সিদ্ধান্তের’ বিধান হলো এরকম যে মহাবিষুব (ভার্নাল ইকুইনক্স) থেকে বর্ষ গণনা শুরু করতে হবে। সিদ্ধান্ত যুগেরও বহুকাল আগে হিন্দু জ্যোতিষে রাশিচক্রের শুরু হতে অশ্বিনী নক্ষত্রে (মেষরাশিতে) এবং শেষ হতো রেবতী যোগতারায়। কিন্তু অয়নবিন্দুসমূহের পশ্চাদগামী গতির ফলে উক্ত মেষাদি বিন্দু পিছিয়ে গিয়ে রেবতী নক্ষত্রে পড়ে যা আসলে মীনরাশির অন্তর্ভুক্ত একটি অনুজ্জ্বল তারা। সিদ্ধান্ত যুগে অর্থাৎ ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ উক্ত মেষাদি বিন্দু রেবতী তারার সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল। সে যুগের ভারতীয় জ্যোতির্বিদরা অয়নচলন জানতেন কিনা সন্দেহ আছে, জানলেও বছর গণনায় তারা সেটা অগ্রাহ্য করেছিলেন। ফলে সিদ্ধান্ত যুগের পর থেকে জিটা-পিসিস বা মীনরাশির রেবতী তারা দেখেই বর্ষগণনা শুরু হতে থাকে। কিন্তু এখন মহাবিষুব বিন্দুটি থেকে রেবতী নক্ষত্র বেশ খানিকটা পশ্চিমে সরে গেছে। উপরন্তু একলিপ্টিকের উপর বিষুববিন্দুদ্বয়কে সিদ্ধান্তযুগে স্থানু বিন্দু মনে করা হতো, যদিও আদতে তারা স্থানু নয়। যদি কোনো তারার সাপেক্ষে বছর গণনা হয় তবে তা হবে নাক্ষত্র বছর যেটা ক্রান্তি বছর থেকে প্রায় ২০ মিনিট দীর্ঘ।

এই দৈর্ঘ্য দেড়হাজার বছরে প্রায় ২৩/২৪ দিনের পার্থক্য সৃষ্টি করে। ফলে আমাদের নববর্ষ শুরু হবার কথা ছিল ২১শ মার্চ, কিন্তু সেটা এখন চব্বিশ দিন পিছিয়ে গিয়ে পড়েছে ১৪ই এপ্রিল। এর মূলে রয়েছে সূর্য-সিদ্ধান্তের বছর দৈর্ঘ্য (৩৬৫.২৫৮৭৫ দিন) ও ক্রান্তি বছরের (৩৬৫.২৪২২ দিনের) মধ্যে প্রায় ০.০১৬ দিনের পার্থক্য। প্রফেসর অজয় রায় বলছেন,
“মহাবিষুব সংক্রান্ত বিন্দু ছিল সৌর বছরের শেষদিন (৩০ অথবা ৩১শে চৈত্র); রোমান বর্ষপঞ্জি অনুসারে এটি ঘটে ২১মে মার্চ (যা বাংলা সন অনুযায়ী ৭/৮ই চৈত্র)। এই পশ্চাদগামিতার ফলে মহাবিষুব সংক্রান্তি (ভার্নাল ইকুইনক্স) ৩০শে চৈত্রের পরিবর্তে নাক্ষত্রিক বছর ধরে পঞ্জিকা প্রস্তুত করলে ঋতুর অনুষ্ঠানাদি ঘটার যে মৌলিক নীতি পঞ্জিকাকারগণ অনুসরণ করতে চান তা থেকে তারা বিচ্যুত হয়ে পড়েবন। বস্তুত ইতোমধ্যেই হয়ে পড়েছেন। সুতরাং সূর্যসিদ্ধান্ত মোতাবেক নিরায়ন (অয়নহীন) গণনা পদ্ধতি অব্যাহত থাকলে আগামী ২০০০ বছরের মধ্যে আমরা যথাযথ ঋতু থেকে একমাস এগিয়ে যাব অর্থাৎ যেসব অনুষ্ঠান হওয়ার কথা বসন্তকালে তা উদযাপিত হবে মধ্য শীতে।”

রোমান ক্যালেন্ডারে বর্ষারম্ভ হতো মার্চ মাসে, যখন বাসন্ত বিষুব হয়। তাই সেপ্টেম্বর-অক্টোবর-নভেম্বর-ডিসেম্বর মাস হতো যথাক্রমে সপ্তম-অষ্টম-নবম-দশম মাস। নামের মধ্যেই কিন্তু প্রাচীন ঐহিত্য লুকিয়ে আছে। একইভাবে, বাংলা মাসের নাম হয়েছে চাঁদ কখন কোন নক্ষত্রের কাছে থাকে তার নামানুসারে। যেমন যে চান্দ্রমাসে সাধারণত বিশাখা নক্ষত্রে পূর্ণিমা শেষ হয় তাকে বৈশাখ মাস বলে, এই মাসেই সূর্য মেষরাশিতে থাকার সম্ভাবনা বেশি তাই বাংলা নববর্ষ শুরু হয় বৈশাখ মাসে। কিন্তু বৈদিক কালে (এমনকি অনেকের মতে সিন্ধু সভ্যতার মহেঞ্জোদারোতেও) অগ্রহায়ণ মাসে বর্ষ শুরু হতো। কারণ মকরসংক্রান্তিতে বর্ষশুরুর কথা বেদাঙ্গ জ্যোতিষে আছে। তাই এই মাসটিও তখন খুব পবিত্র বলে গণ্য হতো। ‘অয়ন’ মানেই বছর, তাই ‘অগ্রহায়ণ’ মানে বছরের শুরু। সেই সময়ে, অর্থাৎ মকরসংক্রান্তিতে, সূর্য তুলারাশিতে। তাই সূর্যাস্তের পর পশ্চিমাকাশে তুলারাশির বিশাখা নক্ষত্র দেখা যায়। আর তখন পুবাকশে উঠে আসে কৃত্তিকা নক্ষত্রমন্ডলী। তাই বৈদিক সাহিত্যে তুলা ও কৃত্তিকার বিশেষ উল্লেখ লক্ষণীয়। সে সময়ে কার্তিকের পূর্ণিমা হতো দিন-রাত্রি যখন সমান তার কাছাকাছি সময়ে (২১শে সেপ্টেমর), কিন্তু অয়নচলন আমলে না নিয়ে বর্ষগণনার ফলে এখন সেটা গিয়ে পড়ছে নভেম্বরের মাঝামাঝি। অয়নচলন না মানার ফলে, ড. বিমান নাথের মতে,
“এই জন্য আমাদের নববর্ষ বলা নেই কওয়া নেই এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি এসে পড়ে। আসলে সিদ্ধান্তযুগের প্রথমে নববর্ষ পালন করা হত ২১ মার্চ যখন দিন আর রাত সমান (আর যখন সূর্য কৃত্তিকা নক্ষত্রমন্ডলীতে)। সেটাই ২৪ দিন পিছিয়ে গিয়ে পড়েছে ১৫এপ্রিল নাগাদ। ওই একইকারণে মকরসংক্রান্তি ২২ ডিসেম্বর না হয়ে জানুয়ারির মাঝামাঝি পালন করা হচ্ছে। এই সবই হল ‘সিদ্ধান্ত’ যুগের বইয়ের ভুলকে মাছিমারা কেরানির মতো মেনে চলার মাশুল। মেঘনাদ সাহার নেতৃত্বে ১৯৫৫ সালে এই ভুল গণনা বন্ধ করার জন্য একটা সরকারি কমিটি তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা। আমাদের পঞ্জিকা রচয়িতারা সেই মান্ধাতার ভুলটাই মেনে চলেছেন এখনও।”

ঠিক একইকারণে ২০০০ সালে (১৪০৬ বঙ্গাব্দ) মহাবিষুব ঘটল ২১শে মার্চ অথচ বাংলাদেশ বহুল প্রচলিত লোকনাথ পঞ্জিকার মতে তা ঘটল ৭ই চৈত্র হা হতোস্মি! এই ভুল দূর করতেই ডক্টর মেঘনাদ সাহার নেতৃত্বে ক্যালেন্ডার রিফর্ম কমিটি করা হয়। কমিটির মূলকথা ছিল যা ভুল হবার হয়েছে, আর নয়, এবার ভুলটাকে এমনভাবে সংশোধন করা উচিত যাতে ভবিষ্যতে আরো ভুল না হয়। এবং নিরয়ন (নাক্ষত্র) পদ্ধতিতে বছর না গুণে সায়ন (ক্রান্তি) পদ্ধতিতে বছর গোনা হোক। আর কিছু সামান্য টুকটাক নিয়ম-শৃঙ্খলার প্রবর্তন। কিন্তু সে কথা কেউ মানেনি।

বাংলা নববর্ষ শুরু কবে হলো তা নিয়ে মোটমুুটি সবাই একমত। সম্রাট আকবর তাঁর রাজত্বের সময়ে ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে একটি নতুন সন ‘এলাহি সন’ শুরু করেন। যদিও এর গণনা শুরু হয় তার রাজত্ব শুরুর দিন থেকে অর্থাৎ ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে বা ৯৬৩ হিজরি থেকে। এই ইলাহি সন মূলে হিজরি সন যা চাঁদের হিসাবে গণিত হয়। কিন্তু ৯৬৩ হিজরি থেকে শুরু হওয়া ইলাহি সন গণনা করা হতো সৌরবছরের হিসাবে। তাই ৯৬৩ হিজরি পর্যন্ত সেটি চান্দ্র হিজরি সন, কিন্তু তারপর থেকে সালটি সৌরসন। এই ইলাহি সনই বঙ্গ অঞ্চলে রাজা টোডরমলের পৃষ্ঠপোষকতায় চালু হয়। কেবল ফার্সি মাস-নামের বদলে প্রচলিত বাংলা মাস-নাম গৃহীত হয়। এটাই বঙ্গাব্দের স্বীকৃত ইতিহাস। অবশ্য সবাই এটা মানেন না। অনেকের মতে এটি আসলে রাজা শশাঙ্ক প্রবর্তন করেছিলেন ৫৯৪ খ্রিস্টব্দের ১২ই এপ্রিল। অনেকের মতে আরাকান রাজা মঙ্গৎ রায় মুসলমান হয়ে তার নাম বিকৃত হয়ে যায় এবং তার নামে প্রচলিত ‘বল্লালী সনই’ প্রকৃত পক্ষে বঙ্গাঙ্গ। কিন্তু অধিকাংশ পণ্ডিত এই মতগুলোর সাথে একমত নন। তবে শুরু হবার পর থেকে, যে-ই শুরু করুক না কেন, বর্ষগণনা চলছিল সেই আগের সিদ্ধান্ত সূত্র মেনেই। সিদ্ধান্ত সূত্রের গরমিল সংশোধনের জন্য বাংলা একাডেমী ১৯৬৩ সনে ‘বাংলা পঞ্জিকা সংস্কার’ নামে একটি কমিটি গঠন করে। এই কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন স্বনামধন্য বহু ভাষাবিদ পন্ডিত ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। এর সদস্য ছিলেন পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক আবুল কাসেম, গণিতের অধ্যাপক আব্দুল জব্বার, সৈয়দ আলী আহসান, তারাপদ ভট্টাচার্য, পন্ডিত অবিনাশ চন্দ্র প্রমুখ। তারা কিছু সুপারিশ করেন যার মূল প্রেরণা ছিল মেঘনাদ সাহার পঞ্জিকা সংস্কারের রিপোর্টটি। এই শহীদুল্লাহ কমিটির কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে ১৯৯৪ সালে বাংলা একাডেমী আরেকটি কমিটি করে। সেই কমিটি নিম্নœলিখিত সুপারিশ করে :
১. সাধারণভাবে বাংলা বর্ষপঞ্জীর বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত প্রতিমাস ৩১ দিন এবং আশ্বিন থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত প্রতিমাসে ৩০ দিন গণনা করা হবে;
২. গ্রেগরিয় বর্ষপঞ্জীর অধিবর্ষে যে বাংলা বছরের ফাল্গুন মাস পড়বে, সেই বাংলা বছরকে অধিবর্ষ গণ্য করা হবে;
৩ অধিবর্ষে ফাল্গুন মাস ৩১ দিনে গণনা করতে হবে।

এই কমিটি ড. শহীদুল্লাহ কমিটির মূল সুপারিশ অনুযায়ী ১৪ এপ্রিল থেকে বর্ষগণনার ব্যাপারটিও বজায় রাখে। এরপর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় আরো কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ। যেমন তারিখ পরিবর্তনের সময় আন্তর্জাতিক নীতি অনুযায়ী মধ্যরাত ১২:০০ টায় হবে। এই সিদ্ধান্তটি অবশ্য চিরায়ত বঙ্গজ সংস্কৃতির কিছুটা অপ্রতিষঙ্গী, কারণ লৌকিক জীবনে সূর্যের উদয় থেকে পরবর্তী উদয়ের আগ পর্যন্ত দিন গণনা করা হয়। ঐ কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক ১৯৯৫ সালের ১৪ই এপ্রিল বা ১৪০২ বঙ্গাব্দের ১লা বৈশাখ থেকে উক্ত সুপারিশমালা অনুসরণ করে আসছে। এই ক্যালেন্ডারই এখন আমরা অনুসরণ করে আসছি। গত প্রায় ষোল বছর এই ক্যলেন্ডারই অনুসৃত হচ্ছে। কিন্তু কেন যেন এতোদিন পর কারো কারো মনে পড়ল, ‘আরে ওপার বংলার দাদাদের পঞ্জিকাটা তো দেখা হয়নি।’ অবাক!
আমাদের দেশীয় একজন মুসলিম ধর্মাবলম্বী মানুষের প্রয়োজন হয় দুটি বর্ষপঞ্জীর একটি সৌর গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার, অন্যটি চান্দ্র হিজরি বর্ষপঞ্জী। পক্ষান্তরে, একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বীর প্রয়োজন তিনটি ক্যালেন্ডারের সৌর গ্রেগরিয়ান, সৌর বঙ্গাব্দ ও চান্দ্র তিথি-পূর্ণিমার হিসাব সমন্বিত চান্দ্র পঞ্জিকা। শেষের দুটোই সিদ্ধান্তযুগের নিয়ম-নীতি দ্বারা প্রভাবিত। সেই যে সিদ্ধান্ত গ্রন্থে বলে দিয়েছে রেবতী নক্ষত্র (বা যোগতারা) থেকে বর্ষগণনা শুরু করতে, ব্যাস তারপর থেকেই চোথাবাজ পঞ্জিকাওয়ালারা তা-ই করে চলেছেন। আর সেজন্যেই সনাতনীদের বিরোধিতার মুখে ভারতে বা পশ্চিমবঙ্গে মেঘনাদ সাহার সংশোধনী প্রবর্তন করা যায়নি। সেজন্যই বাংলাদেশের সাথে পশ্চিমবঙ্গের নববর্ষ মেলে না। এই বিষয়টা আমাদের দেশীয় বিশেষ ঘরাণার পন্ডিতদের না-পসন্দ। এই না-পসন্দটা আবার গত দু-বছরে একটু বেশি চোখে পড়ছে। দৈনিক কালের কন্ঠের ১৪ই এপ্রিল ও ২৭শে এপ্রিল ২০১১তে প্রকাশিত বেশ কয়েকটি প্রবন্ধে এই বিষয়টা উঠে এসেছে। ফরহাদ মাহমুদ লিখছেন (১৪ই এপ্রিল ২০১১): ‘মেনে নিলাম চিরাচরিত পঞ্জিকা বিজ্ঞান সম্মত ছিল না। এখন যেটি করা হয়েছে সেটি কি বিজ্ঞান সম্মত? ’ আবার দেখুন ড.পন্ডিত দেবাচার্যের (ছদ্মনাম?) মতে ‘ত্র“টিপূর্ণ’ মেঘনাদ সাহার সংস্কার অপেক্ষা চিরকালীন বর্ষপঞ্জীর ব্যবস্থাটি “প্রাকৃতিক নিয়মে অত্যন্ত সমৃদ্ধ”। তিনি আরো বলছেন,
“বঙ্গাব্দের নিয়ম-শৃঙ্খলা ও গাণিতিক বিষয়, যে বিষয় হলো সূর্যকেন্দ্রিক, অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এবং বৈজ্ঞানিকভাবে দিন পঞ্জিকা তৈরি হয়েছে। পৃথিবী বার্ষিক গতিতে যেদিন ৩৬০ ডিগ্রি অতিক্রম করে ০ ডিগ্রিতে অবস্থান করে, সেদিন হবে চৈত্র সংক্রান্তি বা বছরের শেষ দিন। ০ ডিগ্রি থেকে যখন এক ডিগ্রিতে অবস্থান করবে, সেদিন পহেলা বৈশাখ। এখানে কোনো ধর্ম, দেশ বা স্বার্থকে অবলম্বন করা হয়নি। বিজ্ঞজন অনুধাবন করুন, বঙ্গাব্দ কতটা বৈজ্ঞানিক এবং আমরা যে সৌরজগতে অবস্থান করি, সেই সৌর বছরকেই বঙ্গাব্দ বলা হয়। এ হিসাবে অবৈজ্ঞানিক মতবাদ কোথায়?” (দৈনিক কালের কণ্ঠ, ২৭শে এপ্রিল ২০১১)

সমস্যাটা যে কোথায় এই দুই লেখক তা ধরতে পারেননি। মেষাদি বিন্দু থেকে বর্ষগণনায় অয়নচলনের যে ব্যাপারটা জড়িত সেটা জানা না থাকায় বিজ্ঞান-অবিজ্ঞানের প্রশ্ন আসছে। আসলে মেঘনাদ সাহা তাঁর সুলিখিত কয়েকটি প্রবন্ধে এবং ক্যালেন্ডার রিফর্ম কমিটির রিপোর্টে এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। সেটা তো আর পড়বার সুযোগ সুলভ নয়, তাই আমি বলব শামসুজ্জামান খান সম্পাদিত “বাংলা সন ও পঞ্জিকা : ইতিহাস ও ঐতিহ্য” (সূচীপত্র প্রকাশনী, ২০০৯, ঢাকা) নামের একটি ভারি সুন্দর ও তথ্যবহুল বই আছে সেটা পড়ে দেখতে। বিশেষ করে ডক্টর অজয় রায় একটি দীর্ঘ প্রবন্ধে সনাতনী সিদ্ধান্তযুগের বর্ষপঞ্জীতে কী ধরনের ত্র“টির সূত্রপাত হয় তার বিস্তারিত গাণিতিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এই প্রবন্ধটিও উক্ত বইয়ে সংকলিত হয়েছে। সেই প্রবন্ধে আরো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের পাশাপাশি ড. অজয় রায় আরো জানিয়েছেন,
“হিন্দু ধর্মীয় অনুষ্ঠানভিত্তিক ছুটির দিনগুলোর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে স্পষ্ট হবে যে প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান চান্দ্র পঞ্জিকা দ্বারা নির্ধারিত। এই চান্দ্র সম্পৃক্ততাকে সম্পূর্ণ বিসর্জন দিতে হলে যে বিপ্লবাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এবং অতীত থেকে আমাদের বিচ্ছিন্ন করতে যে মানসিকতা প্রয়োজন সে জন্য কি হিন্দু সমাজ প্রস্তুত? এর ফলে একজন সাধারণ হিন্দু নাগরিককে বুঝে হোক আর না বুঝে হোক পঞ্জিকাকারদের ভ্রান্ত নিদান মেনে চলতে বাধ্য হতে হবে।”

বাংলা সন ও পঞ্জিকা নিয়ে এই প্রতর্ক কিন্তু আরো আগে থেকেই ফেনিয়ে উঠেছে। ড. শিশির ভট্টাচার্যি লিখেছেন (কালের কন্ঠ, ৬ এপ্রিল ২০১১),
“পঞ্জিকা জ্যোতিবির্জ্ঞানের বিষয়। ভাষাবিদ বা সুসাহিত্যিকদের দ্বারা পঞ্জিকার সংস্কার সম্ভব নয়। অথচ বাংলাদেশে যে পঞ্জিকা-সংস্কার কমিটি গঠন করা হয়েছিল তার নেতৃত্বে ছিলেন একজন বিখ্যাত ভাষাবিদ। সেখানে কোনো বিজ্ঞানী ছিলেন বলে শুনিনি। সংস্কারের নামে ঐতিহ্যবাহী বাংলা পঞ্জিকাকে খন্ডিত করার কোনো অধিকার আমাদের নেই। যদি সংস্কার করতে হয় তাহলে উভয় বাংলার যৌথ উদ্যোগেই তা করা সমীচিন হবে।”

উল্লেখ্য যে, বাংলা একাডেমীর পঞ্জিকা সংস্কার কমিটিতে একদিকে যেমন বিজ্ঞানীরা ছিলেন অপরদিকে সনাতন পন্ডিতেরাও ছিলেন। কাজেই ড. ভট্টাচার্যের উপরোক্ত উক্তিটি ঠিক নয়। তাছাড়া ‘সিন্ধান্তযুগের ভুলকে মাছি মারা কেরানির মতো’ কপি করতে অস্বীকৃতি জানানো বা সে ভুলকে ঠিক করার জন্য সংশোধনের সুপারিশ করাতে মেঘনাদ সাহাকে ঐ একই ঘরানার পন্ডিতদের তোপের মুখে পড়তে হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশে গত পনেরো বছর যাবৎ প্রচলিত বর্ষপঞ্জীর বিরুদ্ধে দেশের জ্ঞানী-গুণীরা কখনোই বিরূপ মন্তব্য দেননি, কোনো বিজ্ঞানী এর বিরোধিতা করেননি। তবে আজ কেন? আমরা হয়ত বুঝতে পারি কেন ঠিক এখনি এই ঘরানার পন্ডিতেরা এই প্রতর্ক তুলছেন, যখন দেখি যে তাঁরা দুই বাংলা মিলিয়ে নববর্ষ পালন করার কথা বলেন। শুনেছি ওপার বাংলার প্রধানতম সাহিত্যিক বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, ‘তোমরা আমাদের না জানিয়েই করে ফেললে? একবারও জিজ্ঞাসাও করলে না?’ মনে হচ্ছে, এখন আমাদের নিজেদের জাতিগত বা ব্যক্তিগত সিন্ধান্তও দাদাদের জানিয়ে করতে হবে। ভাষা আন্দেলন ও ১৯৭১ ওঁদের জিজ্ঞেস করে অনুমতি নিয়ে না করায়, ভারি ‘খন্ডিত’ হয়েছে ওসব অর্জন। অবাক!

শামসুজ্জামান খান এক সাক্ষাৎকারে আশাবাদ জানিয়েছেন যে এক সময়ে ভারতেও সংস্কারযুক্ত বর্ষপজ্ঞী অনুসৃত হবে। ঐ সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন,
“ভারতীয় পঞ্জিকা ব্যবসায়ীদের ব্যবসায়িক স্বার্থের কারণেই (দুই বাংলার পঞ্জিকায়) পার্থক্য বজায় থাকছে। সংস্কারে আচ্ছন্ন থাকার কারণে ওখানকার বাঙালিরা এ ব্যাপারে সোচ্চার হচ্ছে না।”(দৈনিক কালের কন্ঠ, ১৪ই এপ্রিল ২০১১)
শামসুজ্জামান খান অত্যন্ত খাঁটি কথা বলেছেন। তবে আমরা আতঙ্কিত হই যখন দেখি ঐ বিশেষ ঘরানার পন্ডিতেরা নিজেদের নামে মাস-নাম প্রবর্তন করতে চাইছেন, নতুন বর্ষপঞ্জীর নাম দিতে চাইছেন ‘মুজিব সন’ ( দেখুন ৬ এপ্রিল ২০১১, কালের কন্ঠ)। ক্যালেন্ডারেও কি তবে রাজনীতি ঢোকানো হবে, নামের সেই অন্তহীন কাটাকুটির খেলা?

বাংলার প্রাজ্ঞ অধ্যাপক ভীষ্মদেব চৌধুরী গত ৩রা এপ্রিল ২০১১ তে প্রথম আলোতে অত্যন্ত আবেগী প্রশ্ন রেখেছেন রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন দুই বাংলায় দুই পৃথক দিনে পালিত হলে তার নিরাকরণ কী? সমস্যাটি ইমোশনাল সন্দেহ নেই। এর সমাধানে এক হতে পারে আমরা এ-পার বাংলায় যে সুন্দর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিটি অনুসরণ করছি তা ছুড়ে ফেলে দিয়ে ভুল নিদানের চিরাচরিত পদ্ধতি অনুযায়ী বর্ষগণনা শুরু করতে পারি। অথবা ও-পার বাংলার পঞ্জিকাকাররা ভুল গণনার পরিবর্তে সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করবেন। ৮ই মে ২০১ তে বিডিনিউজে শ্রদ্ধেয় চঞ্চল আশরাফ বলেছেন, ‘আর খ্রিষ্টিয় বছরের দিনগুলোর হিসাব তো হয় ঘড়ি ধরে, যেখানে বাংলা বছরের দিনগুলো হয় সূর্যোদয়ে’। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ মন্তব্যটিকে খুব একটা বিজ্ঞানসম্মত বলা যায় না। তিনি আরো যোগ করেছেন,
“বাঙালির কাছে গ্রহণযোগ্য একটি অভিন্ন বর্ষপঞ্জি চাই, খ্রিষ্টিয় ক্যালেন্ডারের সঙ্গে সমন্বয়ের টেনশন থেকে মুক্ত। তা একান্তই বাঙালির সৌরবছরের পঞ্জিকা, চাঁদ কিংবা ঘড়ির সঙ্গে মিলিয়ে নেয়ার ভাবনা এতে যেন ব্যাঘাত না ঘটায়।”
মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন, কিন্তু এমন প্রেসক্রিপশন বর্ষপঞ্জির ধারাবাহিক ঐতিহ্যের সাথেও মানানসই নয়। সূর্য-সিদ্ধান্তে অন্তত রেবতী নক্ষত্রের দিকে তাকাতে বলা হয়েছে।

আজ যদি রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকতেন আর তাঁকে যদি প্রশ্ন করা হতো আপনার জন্মদিন আপনি কোন ক্যালেন্ডার অনুযায়ী করতে চান, আমার দৃঢ় বিশ্বাস তিনি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিই অনুসরণ করতেন। মনে রাখতে হবে, রবীন্দ্রনাথ ‘বিশ্বপরিচয়’ নামের একটি অসাধারণ মননশীল বিজ্ঞান বইয়ের রচয়িতা, তিনি সেই লেখক যাঁর লেখনিতে বিজ্ঞান-ভাবনা বারবার উঠে এসেছে, তিনি সেই আচার্য যিনি শান্তেনিকেতনে ছাত্রদের জন্য দুরবিন রেখেছিলেন। এই বিশ্বকবি অন্তত পাঁজি-পুথির বিচারে আচারসিদ্ধ কিন্তু বস্তুসিদ্ধ নয় এমন ক্যালেন্ডার মানতেন বলে মনে হয় না।

আমি মনে করি, বর্ষপঞ্জী একটি জাতীয় সম্পদ। এটা শুধু সনাতনদের বজ্রমুষ্টিতে আবদ্ধ থাকার নয়, কিংবা দাদাদের পরামর্শ মতো বদলানোরও নয়। এখন যেমন আমরা গরমে ঘামতে ঘামতে ইলিশের বদলে জাটকা খেয়ে বর্ষবরণ করি, আগে তো তা ছিল না! এক সময়ে এটা হেমন্তের স্নিগ্ধ আবহাওয়ায় পালন হতো, কিংবা ‘বসন্তের এত ফুল ফোটে, এত বাঁিশ বাজে, এত পাখি গায়’-এর মতো ফুরফুরে মেজাজে পালিত হতো। কিন্তু সৈদ্ধান্তিক পন্ডিতদের মত মানতে গিয়ে এখন আমাদের দেদারসে ঘামতে হচ্ছে।

আমরা হয়ত সব বিষয়ে ‘দাদাগিরি’ মানতে চাইব না। ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের রেবতী তারার দিকেই চেয়ে থাকব, নাকি দুরবিনে চোখ রাখব সেটা আমাদেরই ঠিক করতে হবে।

তথ্যপঞ্জি:
১/ শামসুজ্জামান খান সম্পাদিত ‘বাংলা সন ও পঞ্জিকা: ইতিহাস ও ঐতিহ্য,’ সূচীপত্র, ২০০৯, ঢাকা। ২/ বিমান নাথ,‘‘মৃত্যু, প্রেম, নববর্ষ এবং একটি নিরীহ গাছ,’ দেশ, ১৭ই এপ্রিল ২০০৯। ৩/ আর্চি রয় ও ডি. ক্লার্ক, ‘অ্যাস্ট্রনমি: প্রিন্সিপল্স এন্ড প্র্যাকটিসেস,’৪র্থ সং, ২০০৩। ৪/ অরূপরতন ভট্টাচার্য, ‘প্রাচীন ভারতে জ্যোতির্বিজ্ঞান,’ দে’জ পাবলিশিং ১৯৯৯। ৫/ মেঘনাদ সাহার প্রবন্ধ ‘সমালোচনার উত্তর’। ৬/ ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী, ‘জ্যোতিবির্জ্ঞান শব্দকোষ,’ বাংলা একাডেমী, ১৯৯৮।

ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: বিজ্ঞান গবেষক ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।

Responses -- “রেবতী নক্ষত্র, অয়নচলন, ‘সূর্য-সিদ্ধান্ত’ ও বাংলা নববর্ষ”

  1. Harun Al Nasif

    The Government of India set up a committee to reform our calendars in 1955 with the renowned physicist Meghnad Saha as its chairman. It surveyed the existing calendars and the methods of corrections adopted in each, and concluded that “the Hindu calendar… is a most bewildering production of the human mind and incorporates all the superstitions and half-truths of medieval times…. In spite of these errors, very few have the courage to talk of reform… the beginning of the year is now wrong by nearly twenty-three days, the result of accumulated error of nearly 1,400 years.”

    The committee went on to lament “We are content to allow religious life to be regulated by the encyclopaedia of ‘errors and superstitions’ which is called the Hindu almanac, and to regard it as a scripture.”

    The committee recommended that the year should start on March 22 and the first month should be called Chaitra instead of Vaisakh – so that the difference between the old dates and the new dates would be approximately 6 (= 30-24) days.

    The Indian National Calendar was adopted in 1957 based on its report, and if one followed its recommendations – similar to the conventions in the Gregorian calendar – then it would stand corrected for several millennia to come.

    But this National Calendar is hardly used anywhere outside the confines of the pages of gazettes or broadcasts of All India Radio, while lay people remain blissfully at the mercy of traditional calendar makers.

    It is true that people take time to adopt new calendars; the Gregorian calendar took many years before a large number of countries adopted it. England was wary of adopting the recommendations of the Vatican, and finally relented after two centuries (in 1752 A.D.). One could argue that the delay by half a century in India is not too hopeless, but with no debates or discussions taking place, it seems unlikely that India’s traditional calendar makers will change their attitude in the near future.
    The medieval hangover of Indian calendars continues, and we deny it the remedy it badly needs

    BIMAN NATH, Medieval mistake:The story of India’s faulty calendars
    Frontline: Volume 25 – Issue 06 :: Mar. 15-28, 2008

    Reply
  2. Harun Al Nasif

    ধন্যবাদ, চমৎকার,তথ্যবহুল এবং যুক্তিসঙ্গত আলোচনা।

    Reply
  3. Dr. Md. Mustafizur Rahman

    অনেক সাধুবাদ লেখককে । এত সুন্দর লেখার কারনে। খুব ভাল লাগল।

    Reply
  4. ইমরুল

    লেখাটা ভালো লাগছে। সন-তারিখ নিয়া আগ্রহ আমার কম, কিন্তু ‘দাদা’দের সাথে মিল দেয়া’র ব্যাপারটাতেই চোখ পড়ছে (শুনেছি ওপার বাংলার প্রধানতম সাহিত্যিক বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, ‘তোমরা আমাদের না জানিয়েই করে ফেললে? একবারও জিজ্ঞাসাও করলে না?’ )… একটা ‘ভারতীয়করণ’-এর প্রক্রিয়া চলছে বাংলাদেশে, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-সাহিত্য, প্রায় সব জায়গাতেই… একটা ইন্টার-আ্যাকশনের ব্যাপার থাকেই, কিন্তু সেইটাকে ‘অথরিটি’র জায়গায় বসিয়ে দিলেই সমস্যা… এই ব্যাপারে অ-সচেতনতাগুলারে আইডেন্টিফাই করার দরকার আছে – এই জায়গাটাতে লেখাটা ভালো লাগছে।

    – ইমরুল।

    Reply
  5. umme hasina jannatul ferdous

    ধন্যবাদ, এত চমৎকার এবং তথ্যবহুল এবং যুক্তিসঙ্গত আলোচনার জন্য।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—