Feature Img

rafiqullah-khan-fরবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মের একশত পঞ্চাশ বছরে আমরা পদার্পণ করলাম। কেবল বাংলা সাহিত্য নয়, বিশ্বসাহিত্যের পটভূমিতেও এরূপ দৃষ্টান্ত বিরল যেখানে একজন কালজয়ী মহাপুরুষের জন্মদিন দুই দেশ যৌথভাবে উদযাপন করছে। এজন্য বাঙালি নিঃসন্দেহে সৌভাগ্যের দাবিদার। রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনা করেছেন, এবং তাঁর জন্ম-মৃত্যুর ক্ষণগণনা আমরা বাংলা সনের হিসেবেই করে এসেছি দীর্ঘকাল। বিশ শতকের আশির দশক পর্যন্ত সকল বাঙালি একই দিন রবীন্দ্রনাথের জন্ম ও প্রয়াণদিবস স্মরণ করত। কিন্তু দুর্ভাগ্য বাঙালির! বাংলাদেশ ও ভারতে এখন পঁচিশে বৈশাখ ও বাইশে শ্রাবণ দুই দিনে উদযাপিত হয়। বাংলাদেশে যেদিন বাংলা নতুন বছরের সূচনা ভারতে তার পরের দিন। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় রবীন্দ্রনাথ অখণ্ড বাংলা ও বাঙালির স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি হয়ত ভাবতেও পারেন নি, এক সময় বাংলা ভূখণ্ড ভাঙবে এবং সত্তর বছরের মধ্যে ভেঙে যাবে তাঁর জন্মদিনের হিসাব।

২০১১ খিস্টাব্দের ৬ মে থেকে (বাংলাদেশের হিসেবে ২৩ বৈশাখ এবং ভারতের হিসেবে ২২ বেশাখ) বাংলাদেশ ও ভারত যৌথভাবে রবীন্দ্রনাথের সার্ধশত জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠানমালা শুরু করেছে। বাঙালির ইতিহাসে এর আগে কোনো কালজয়ী প্রতিভার একশত পঞ্চাশতম জন্মদিন পালিত হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। আবার দুই দেশ যে যৌথভাবে করছে, তার অপূর্বত্ব ও ঐতিহাসিকতাও বিস্ময়কর। বিশ্বজনীন এই সৃষ্টিশীল প্রতিভা বাংলা ভাষায় রচনা করেছেন তাঁর বিশাল ও বিচিত্র সৃষ্টিভাণ্ডার। তাঁর রচিত গান বাংলাদেশ এবং ভারতের জাতীয় সঙ্গীত। এ ঘটনাও মানুষের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইতিহাসে বিরল। তিনি একই সঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতি ও ভারতীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এবং দুই বিশ্বযুদ্ধক্লান্ত বিশ্বসংস্কৃতির জন্যও রেখে গেছেন শান্তির অনুসরণীয় দিকনির্দেশনা। ১৯৪৭-পূর্বকাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ও ভারত ব্রিটিশ উপনিবেশের অধিপত্যসূত্রে শাসন-শোষণ ও নিপীড়নের অভিন্ন অভিজ্ঞতার শিকার। উনিশশো সাতচল্লিশের দেশ বিভাগ কাল থেকেই ভারত স্বাধীন সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র আর বর্তমান বাংলাদেশ সাহিত্য ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে প্রগতি ও সাম্যের পথে অগ্রগামী হলেও সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বের মধ্যযুগীয় বর্বরতার শিকার। এবং উপমহাদেশের রাজনীতিতে ভ্রান্ত দ্বিজাতিতত্ত্বের ধারণা ও প্রয়োগ মিথ্যা প্রমাণিত হয় ১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। সেই যুদ্ধে ভারতের অতুলনীয় সহায়ক ভূমিকার কথাও আমরা জানি। ২০১০ সালে বাংলাদেশ ও ভারত যৌথভাবে রবীন্দ্রনাথের সার্ধশত জন্মজয়ন্তী উদযাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। দুই দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও ক্ষমতার সংস্কৃতি ভিন্ন হলেও এ উদ্যোগকে তাৎপর্যপূর্ণ মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিশাল সৃষ্টিশালায় সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার যে দর্শন ও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, পাশ্চাত্যের রাজনীতি ও পুঁজির প্রভাবে দুটি দেশই তা থেকে অনেক দূরবর্তী। জনকল্যাণ ও কৃষিভিত্তিক সমাজের উপযোগী অর্থনৈতিক পরিকল্পনার প্রায়োগিক পরীক্ষা রবীন্দ্রনাথ করেছিলেন এই বাংলাদেশ ভূখণ্ডেই; শিলাইদহ-শাজাদপুর-পতিসরে। শিক্ষা ক্ষেত্রেও সাধারণ মানুষের উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা শুরু করেছিলেন এ দেশে। পরে বর্তমান ভারতীয় বঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেন শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতী। বাংলাদেশ কিংবা ভারত, কোনো দেশেই রবীন্দ্রনাথ প্রবর্তিত শিক্ষানীতি ও শিক্ষাপদ্ধতি অনুসৃত হয়না। ব্রিটিশ উপনিবেশের শিক্ষাব্যবস্থাকেই জোড়াতালি দিয়ে চলছে এ দু দেশের শিক্ষাকার্যক্রম।

আজ যে রবীন্দ্রমুগ্ধতার অবিশ্বাস্য বিস্তার দেখতে পাই ভারত ও বাংলাদেশে, তার সঙ্গে যথাযথ মূল্যায়ন ও মননশীলতার সংযোগ প্রয়োজন। আমাদের সৌভাগ্য যে বাংলা ভাষায় লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ। আর আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। আমার বিবেচনায়, রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষায় সাহিত্যরচনা করে আমাদের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে একটা চিরকালীন মানদণ্ড দিয়ে গেছেন। তাঁর জন্মের পর থেকে উপমহাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সৃষ্টি হয় বিচিত্রমুখী আলোড়ন। তিনি ভারতবর্ষের একমাত্র মনীষী, যাঁকে সামাজিক ও রাজনৈতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশ ও ভারত সর্বোচ্চ আসন দিয়েছে। জন্মশতবর্ষের আয়োজন থেকে তার কিছুটা প্রমাণ পাওয়া গেল। তবে বাঙালির কাছে রবীন্দ্রনাথের অবদানের তাৎপর্য অনেক বেশি। তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্বমানের উপযোগী করতে আমৃত্যু সাধনা করে গেছেন।

কোনো প্রতিভার মূল্যায়নে ব্যক্তির ভূমিকাই মুখ্য। রাষ্ট্রশক্তির মধ্যে এত বিচিত্র রুচি ও দৃষ্টিভঙ্গির বসবাস, যার পক্ষে মূল্যায়নের নির্দিষ্ট কোনো মানদণ্ড থাকে না। এক-কালে আদর্শ-ঐক্য বলে একটি রাজনৈতিক ধারা প্রচলিত ছিল। এখন সেটিও মৃতপ্রায়, বলা যায় সমাধিস্থ। রাষ্ট্রের মধ্যেও রয়েছে অনেক দল যারা সকলে অভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শ লালন করেন না। সুতরাং আজ যা যৌথ, ভবিষ্যতে তা বিভক্ত হতে পারে শতভাগে। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যদি এই ধরনের বিভক্তি ঘটে, তা হবে অবশ্যই দুর্ভাগ্যজনক। কবি-কথিত “এত ভঙ্গ বঙ্গদেশ” রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রেও যদি ঘটে যায়, সেটা ভবিষ্যতের জন্যে হবে কলঙ্কজনক। যে-কারণে প্রয়োজন রবীন্দ্রসৃষ্টির যুগোপযোগী মানদণ্ড। এই নতুন মানদণ্ড নির্ণয় করতে গেলে সাহিত্যবোধ ও বিশ্লেষণের প্রচলতি মানদণ্ড অনেকটাই তাৎপর্যহীন হয়ে উঠতে পারে। এ-প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সাধারণ মানুষকে দেখা ও অনুভব করার কয়েকটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যেতে পারে:
১. আমার যৌবনের আরম্ভকাল থেকেই বাংলাদেশের পল্লীগ্রামের সঙ্গে আমার নিকট পরিচয় হয়েছে। তখন চাষীদের সঙ্গে আমার প্রত্যহ ছিল দেখাশোনা ওদের সব নালিশ উঠেছে আমার কানে। আমি জানি ওদের মতো নিঃসহায় জীব অল্পই আছে, ওরা সমাজের যে তলায় তলিয়ে সেখানে জ্ঞানের আলো অল্পই পৌঁছায়, প্রানের হাওয়া বয় না বললেই হয়।

তখনকার দিনে পলিটিক্স নিয়ে যাঁরা আসর জমিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে একজনও ছিলেন না যাঁরা পল্লীবাসীকে এদেশের লোক বলে অনুভব করতেন। আমার মনে আছে পাবনা কনফারেন্সের সময় আমি তখনকার খুব বড়ো একজন রাষ্ট্রনেতাকে বলেছিলুম, আমাদের দেশে রাষ্ট্রীয় উন্নতিকে যদি আমরা সত্য করতে চাই তা হলে সব-আগে আমাদের এই তলার লোকদের মানুষ করতে হবে। তিনি সে কথাটাকে এতই তুচ্ছ বলে উড়িয়ে দিলেন যে, আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলুম যে, আমাদের দেশাত্মবোধীরা দেশ বলে একটা তত্ত্বকে বিদেশের পাঠশালা থেকে সংগ্রহ করে এনেছেন, দেশের মানুষকে তাঁরা অন্তরের মধ্যে উপলব্ধি করেন না।
২. আমাদের দারিদ্র্য, মহামারী, সাম্প্রদায়িক বিরোধ আর যন্ত্রশিল্পে আমাদের পশ্চাৎপদতা, অর্থাৎ যা কিছু আমাদের জীবনকে বিপর্যস্ত করে সে সবই শিক্ষার অভাবের ফল। … … আমি স্বপ্ন দেখি সেই দিনটির যেদিন আর্য সভ্যতার ঐ প্রাচীন ভূমির সব মানুষ শিক্ষা ও সাম্যের মহাশীর্বাদ লাভ করবেন।

রবীন্দ্রনাথ এ কথাগুলো বলেছেন ১৯৩০ সালে রাশিয়া ভ্রমণকালে। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রোম্যান্টিক ও অধ্যাত্মবাদী কবি ধর্মের অপব্যবহার সম্পর্কেও উচ্চারণ করেছেন চরম বাক্য :
এ পর্যন্ত দেখা গেছে, যে রাজা প্রজাকে দাস করে রাখতে চেয়েছে সে রাজার সর্বপ্রধান সহায় সেই ধর্ম যা মানুষকে অন্ধ করে দেয়। . .. ধর্মমোহের চেয়ে নাস্তিকতা অনেক ভালো।

পাঠ্যপুস্তকে যেভাবে রবীন্দ্রনাথকে উপস্থাপন করা হয়, তার পরিবর্তন প্রয়োজন। আমাদের মধ্যে নেই দেশপ্রেম, মানবপ্রেম এবং প্রকৃতিপ্রেম, নেই পরিবেশের প্রতি সচেতন মনোযোগ। রবীন্দ্রনাথের এ বিষয়ে প্রচুর রচনা রয়েছে সাহিত্যের সকল আঙ্গিকে। পাঠ্যপুস্তকে এগুলোকে সংযোজন করতে হবে। বর্তমান বিশ্বে ধর্মমোহকে পুঁজি করে যে অভাবনীয় রক্তপাত সে সম্পর্কেও রবীন্দ্রনাথের অসাধারণ সব লেখা। রাষ্ট্র এখন রবীন্দ্রনাথকে রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ করেছে তার অস্তিত্ব ও সম্পর্কের প্রয়োজনে। তার কিংবা তাদের এখন উচিত হবে প্রাসঙ্গিক রবীন্দ্রনাথকে সকলের সামনে তুলে ধরা। তাহলেই কেবল সম্ভব বাঙালি জীবনে রবীন্দ্রনাথের অবদানের যথার্থ মূল্যায়ন। রবীন্দ্রনাথ বাঙালি ও বাংলা ভাষাকে চিরকালের জন্যে বিশ্বজনীন মর্যাদা দিয়েছেন, আমাদের উচিত হবে নিজের কল্যাণেই রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর সৃষ্টির প্রাসঙ্গিকতা শনাক্ত করে জীবনের প্রায়োগিক ক্ষেত্রে তাকে প্রতিষ্ঠা করা। তা না হলে কয়েক লক্ষ বর্গমাইলের এই যৌথ আয়োজন কেবল ইতিহাসেরই অংশ হয়ে থাকবে, আর কিছু নয়।

রফিকউল্লাহ খান: গবেষক, প্রবন্ধিক ও সাহিত্য-সমালোচক।

Responses -- “যৌথ আয়োজনের নব্য-সংস্কৃতি ও অনুভাবনা”

  1. aziz hashan

    লেখক যে প্রশ্নগুলো তুলে ধরেছেন তার সমাধান জরুরি। যদি বিদেশি কোম্পানির স্পন্সরে কেবল জাকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে স্মরণই লক্ষ্য হয় তা হলে কোনো কথা নেই। তবে জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর তাগিদ থাকলে অবশ্যই প্রশ্নগুলোর সমাধান করে দেশের শিক্ষা ও রাজনীতির পরিবর্তন আনা জরুরি। ধন্যবাদ লেখেককে সীমাবদ্ধতার বেড়াজাল উন্মোচনের আন্তরিক প্রয়াসের জন্যে।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—