Feature Img

jagadishপ্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও মুহাম্মদ ইউনূসের লড়াইটাকে প্রচার করা এমনভাবে যেন তা মহাভারতের দুষ্ট কৌরব গোষ্ঠী ও সত্যবান পাণ্ডবদের লড়াইয়ের আধুনিক রূপ।

ধারণাটা এমন যে সন্ত ইউনূসকে- যিনি ক্ষুদ্রঋণের রূপকার- শাস্তি দিতে রাজনীতির খেলা খেলছেন প্রতিশোধপরায়ণ প্রধানমন্ত্রী; কেননা তিনি রাজনীতিতে আসার হুমকি দিয়েছিলেন। এমনকি রাশিয়ার ব্যবসায়ী মিখাইল খোদোরকভস্কির বিরুদ্ধে ভ্লাদিমির পুতিন যে প্রচার চালিয়েছিলেন তার সঙ্গেও তুলনা করা হচ্ছে শেখ হাসিনাকে।

কিন্তু গ্রামীণের ঘটনাটা আরো জটিল। সুচারু জনসংযোগের মাধ্যমে ইউনূসের প্রচারণায় বিষয়টি যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে তা ঠিক নয়।

প্রথমত শেখ হাসিনা কোনো সাধারণ রাজনীতিক নন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের মেয়ে। তাঁকে [মুজিবুরকে] প্রায়ই জাতির জনক হিসেবে উল্লেখ করা হয় যাকে ১৯৭৫ সালের অগাস্টে সেনাবাহিনী হত্যা করে।

২০০৯ সালের স্বচ্ছ নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেন হাসিনা। তিনি নারীদের সেই ছোট তালিকাটির একজন যারা উত্তরাধিকারসূত্রে নয়, নিজের যোগ্যতায় প্রধানমন্ত্রিত্ব অর্জন করেন তাঁর বাবা ও ভাইবোনদের হত্যার দীর্ঘদিন পর। তাঁর পরিবারকে হত্যার সময় শেখ হাসিনা ছিলেন জার্মানিতে- এ কারণে তিনি বেঁচে যান। বছরের পর বছর ধরে রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরি করেন তিনি।

হাসিনা একটি ইসলামি দেশের নির্বাচনে ভোটে জিতেছেন- এ ঘটনা একজন নারীর জন্য কম অর্জন নয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ইউনূসের পাশে আমেরিকাকে পেয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন একটি বন্ধু সরকারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার মতো দোষ করছেন, যা প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার পরিচালন নীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

দ্বিতীয়ত, এখন যারা শেখ হাসিনার অর্জনকে উড়িয়ে দিচ্ছেন তারা একই সময়ে ইউনূসের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী। প্রায়ই বলা হয়, ইউনূস ক্ষুদ্রঋণ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা। বস্তুত, আসল প্রতিষ্ঠাতা হলেন ভারতের আহমেদাবাদের ইলা ভাট। মহাত্মা গান্ধীর অনুসারী ভাট ১৯৭৪ সালে এসইডব্লিউএ’কে (সেল্ফ-ইমপ্লয়েড উওমেন্স অ্যাসোসিয়েশন) নামে একটি ব্যাংক হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশের জোবরা গ্রামে ইউনূস তার গ্রামীণ ব্যাংক প্রকল্প শুরু করার দুবছর আগে এটি করেন ভাট।

এসইডব্লিউএ সবসময় ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এটি সবসময় কঠোর আইনে পরিচালিত এবং বিশেষ কোনো সুবিধা এটা কখনো চায় না। গ্রামীণ ব্যাংকের মতো এটি কখনো বিদেশি তহবিল পায়নি (যেমন ধরুন নরওয়ের কাছ থেকে ১০ কোটি ডলার অনুদান পাওয়া এবং তহবিল পরিচালনা, যা থেকে ইউনূসের বিরুদ্ধে প্রাথমিক অভিযোগগুলো ওঠে)। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ৯-১২ শতাংশ বাৎসরিক লভ্যাংশ দিয়েছে এসইডব্লিউএ। ইউনূস বিপুল অংকের বিদেশি অর্থের মাধ্যমে গ্রামীণের লোকসান আড়াল করেছেন বলে সন্দেহ করা হয়। অন্যদিকে, এসইডব্লিউএ দেখিয়েছে গরীব আত্ম-কর্মসংস্থান করা নারীরা একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মালিক হতে এবং বাইরের অর্থ ছাড়া এটি চালাতেও পারে।

তৃতীয়ত, ৪০ বছর আগে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যা পার হয়ে স্বাধীনতা অর্জন করে বাংলাদেশ। তাই অনেক বাংলাদেশি বিপুল বিদেশি অর্থের প্রবাহ পছন্দ করেন না। কেননা ওই ধরনের অর্থ গ্রামীণ এবং ইউনূসকে প্রায় দেশটির গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের প্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলেছে; এই বিষয়টি কোনো সরকারই পছন্দ করবে না। আসলে ইউনূস ও শেখ হাসিনার লড়াইয়ে ক্লিনটনের হস্তক্ষেপ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি প্রভাবের বিপদটিই প্রকাশ করে।

এছাড়া আছে ক্ষুদ্রঋণের বিষয়টি। এটি যে দারিদ্র-বিরোধী কৌশলের একটি হাতিয়ার তা প্রমাণিত। কিন্তু ১৯৯১ সালে ভারতে শুরু হওয়া ব্যাপক অর্থনৈতিক সংস্কারের একটি বিশাল প্রভাব পড়ে দারিদ্র মোচনে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশে ভারতের মতো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটেনি। উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে এমন নীতিতে বাংলাদেশ আটকে ছিলো দশকের পর দশক- দুবছর আগে নির্বাচিত হয়ে হাসিনা এটি বলেছেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী অর্থনীতিক এবং দেশটির কৌশলগুলি প্রবৃদ্ধি-রোধী সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে আটকা পড়ে যা তারা অর্ধশতাব্দি আগে শিখেছিলেন ক্যামব্রিজ এবং লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সে।

ভারতের সংস্কারমূলক সামষ্টিক অর্থনৈতিক কৌশলের ফলে ইলা ভাটের এসইডব্লিউএ দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিতদের লাভবান করে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের সংস্কারহীন সামষ্টিক অর্থনৈতিক কৌশলের খাদে ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংক বড় জোর ক্ষুদ্রঋণের এক ফোঁটা শিশির দিতে পারে। আমার কি আশা করতে পারি যে, গ্রামীণের ঘটনাটা উদারপন্থী সেইসব সংস্কারের আগের অধ্যায় যা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রূপান্তর আনবে?

[ইংরেজি থেকে অনূদিত]

জগদিশ ভগবতী : ভারতীয় অর্থনীতিবিদ। কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি ও আইন বিষয়ের অধ্যাপক।

১৩ Responses -- “গ্রামীণ বনাম বাংলাদেশ”

  1. Hasan

    Yunus is not only our countries issue. Here involved directly Indian politic because India don’t want to grow up any Bangladeshi international face like মুহাম্মদ ইউনূস. He is our pride.

    Reply
  2. Md. Mahbubul Haque

    ভারতীয়রা সারা সময়ই ভারতীয়। আর কিছু ভারতীয় বুদ্ধিজীবীরা তাদের জ্ঞানকে পুঁজি করে তাদের নীতিটাকেই মূলত প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।

    Reply
  3. mukta Sarawar

    শুধু ক্লিনটনের চাপ দেখলেন, বাংলাদেশে ভারতের চাপের কথা ভূলে গেলেন 🙁
    ইউনুসকে নিয়ে কিছু বলতে চাইনা। তাবেদারি করে নোবেল পাওয়ার মধ্যে কোন ক্রেডিট নাই।

    Reply
  4. SKR

    একচোখা দৃষ্টিভঙ্গি। এখানে ড.শেখ হাসিনা একজন সন্ত।

    “প্রথমত শেখ হাসিনা কোনো সাধারণ রাজনীতিক নন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের মেয়ে।”

    “তিনি নারীদের সেই ছোট তালিকাটির একজন যারা উত্তরাধিকারসূত্রে নয়, নিজের যোগ্যতায় প্রধানমন্ত্রিত্ব অর্জন করেন তাঁর বাবা ও ভাইবোনদের হত্যার দীর্ঘদিন পর।”

    Reply
  5. afsanul alam

    ইউনুস ইস্যুতে বিএনপির অবস্থান যেমন আওয়ামী বিরোধিতার কৌশলজাত, জগদিশ ভগবতীর অবস্থান তেমনি। এ লেখার ইংরাজী ভার্সন আগে মার্চের ৩০ তারিখে আলজাজিরার ওয়েবের মতামত বিভাগে পড়েছিলাম। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে একটা আলাদা ধারণা ছিল যে এখানকার একাডেমিকরা কোন বিষয়কে ক্রিটিক্যালি দেখতে পছন্দ করেন, ক্ষমতা রাখেন। ভাড়াটে থিঙ্কটাঙ্কের লোকের মত তাঁরা নন। এডওয়ার্ড সাঈদ বা একালের হামিদ দাবাশি অথবা আলজাজিরার আলোচনায় অংশ নেয়া ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঊকে দেখে এমন ধারণা করতাম। কিন্তু কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে ধারণা যত উচু জায়গায় রেখেছিলাম জগদিশ ভগবতী একজন অর্থনীতি ও আইনের শিক্ষক এই পরিচয় মনে রেখে তাঁর এই লেখা পড়ে তা ততটাই নীচে নেমে গেল। তিনি অর্থনীতি বা আইনের দিক থেকে দেখে মাইক্রোক্রেডিটের কোন বিচারে না গিয়ে সরাসরি মাইক্রোক্রেডিটের পক্ষে কোন ব্যাখ্যা রেফারেন্স ছাড়াই সাফাই দিয়ে বলেছেন, “এটি যে দারিদ্র-বিরোধী কৌশলের একটি হাতিয়ার তা প্রমাণিত”। কোথায় কীভাবে প্রমাণিত আমাদের জানালেন না। দুনিয়ায় যা কিছু ঘটার কথা জানা যায় তা অনেক আগেই ভারতের কেউ না কেউ আবিস্কার করেছেন – এমন আলাপ আমরা প্রায়ই শুনি। জগদিশ ভগবতীও আমাদের জানাচ্ছেন, ইউনুসের বিখ্যাত বা কুখ্যাত মাইক্রোক্রেডিটের আগেই এর আসল আবিস্কারক গুজরাটের আহমেদাবাদের এক ইলা ভাটের কথা। তাহলে দাড়াচ্ছে, ইউনুস না, ইলা ভাটের মাইক্রোক্রেডিটের কারবার দেখে, পিপলি সিনেমাখ্যাত ঋণের দায়ে কৃষকের আত্মহত্যার ঘটনা অথবা ভারতে মাইক্রোক্রেডিটের বাণিজ্যিক সুদী-ব্যবসার লোভনীয় সম্ভাবনা দেখে বিনিয়োগের জন্য আমেরিকার ওয়াল ষ্ট্রীটের কেঁপে ঊঠা ঝাপিয়ে পড়া – এসবের দায় কৃতিত্ত্বও নিশ্চয় আহমেদাবাদের সেই ইলা ভাটের? জগদিশ ভগবতী একজন অর্থনীতি ও আইনের শিক্ষক হিসাবে কীভাবে একে ন্যায্য মনে করেন তা জানার সুযোগ থেকে তিনি আমাদের বঞ্চিত রাখলেন।
    তিনি ইউনুসের ঘটনায় ওবামা ও হিলারিকে “বন্ধু (বাংলাদেশ) সরকারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার মতো দোষ করছেন” বলে ফতোয়া দিয়ে দিলেন। খুশি হলাম, ভাবতে চাইছিলাম একজন জগদিশ ভগবতীকে পেলাম। কিন্তু তিনি হাসিনা সরকার গঠনের শুরু থেকে সর্বক্ষণ ট্রানজিট, পানি, বর্ডার ইত্যাদি নিয়ে তাঁর উপর ভারতের চাপ হস্তক্ষেপও চোখে দেখলেন না কেন?
    আজ নেতা হিসাবে একা হাসিনা দলের নীতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণে কেমন সে বিচারে অনেকেই তাকে খালেদার থেকে বেশি নম্বর দিবেন। কিন্তু সেগুলো বুঝতে, অর্জন করতে হাসিনার অন্তত প্রথম দশ বছর খরচা হয়ে গিয়েছিল। তবে প্রথমত তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে নেত্রী, পরে নিজের যোগ্যতা অর্জন ও “চাচাদের” হঠিয়ে তাদের হাত থেকে দলের কর্তত্ব একা নেয়া। অথচ হাসিনাকে খুশি করতে জগদিশ ভগবতী বেমাক্কা সার্টিফিকেট দিলেন উত্তরাধিকারসূত্রে নয়, যোগ্যতায় তিনি নেত্রী। আওয়ামী লীগের ১৯৮০ এর সম্মেলনে ডেলিগেটদের উপর রাজ্জাক-মহিউদ্দিনদের প্রবল প্রভাবে কোনঠাসা তোফায়েল-কামাল, এই পরিস্থিতিতে ডঃ কামাল হোসেনের তুরুপের তাস ছিল হঠাৎ করে সভাপতি হিসাবে হাসিনার নাম প্রস্তাবনা – এই ছিল ঘটনা। সম্মেলনে হেরে গিয়ে রাজ্জাক ও তাঁর অনুসারী ছাত্রলীগ আলাদা দল করেছিল, “বাকশাল” এই নামে। আর ঢাকা শহরের দেওয়াল চিকা মেরে ভরিয়েছিল, “রক্তের উত্তারাধিকার মানি না”।

    Reply
  6. আরমান

    ক্ষুদ্র ঋণ তাহলে ভারতেরই আবিষ্কার !! এতোদিন কোথায় ছিলেন ?

    Reply
    • Bangladesh

      Ela Ramesh Bhat shomporke oneke janen na. ei likhar madhdhome oneke seta jante parlo. thanks to the author.

      BRAC kintu Grameen Bank er o age tader operation start korechhilo !!! seta o to oneke janen na!!

      Reply
  7. আরজু

    he is writing as- ”হাসিনা একটি ইসলামি দেশের নির্বাচনে ভোটে জিতেছেন- এ ঘটনা একজন নারীর জন্য কম অর্জন নয়।”(”Moreover, Sheikh Hasina has gained political power at the polls in an Islamic country, which is no mean feat for a woman.”)

    what d u mean? r u describing Bangladesh as an ‘Islamic’ Country ?
    Bangladesh is not a Islamic country, no way. Bangladesh is a Secular Democratic State.

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—