Feature Img

goutom-dasমেহেরজান সিনেমা নিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদী মনের অসুখ খোলাখুলি বাইরে এসে পড়েছে। মনের এই অসুখটা অনেক গভীরের, অনেক পুরানোও বটে। বাঙালি জাতীয়তাবাদী মন মেহেরজান নিয়ে তাদের আপত্তির ন্যায্যতা কতখানি তা তাদের চিন্তার মুরোদ দিয়ে গলা ও কলমের জোরে দেখিয়ে দিতে পারত। কিন্তু মোকাবিলার সে পথে তারা যায়নি। মাত্র আটদিন মেহেরজান-এর প্রদর্শনী সহ্য করার পর নিজের অসুখের উত্তাপে তারা প্রদর্শনী বন্ধ করে দেবার বীরত্ব দেখিয়েছে। মেহেরজান দেখানোর শুরু থেকেই তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল ছবিটা ‘নিষিদ্ধ করা হোক’। কেউ কেউ নাকি আতঙ্কিতও হয়ে পড়েছিলেন এরপর প্রশ্ন করেছেন, “মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ সরকারের সেন্সর বোর্ড এ ছবি মুক্তি দিল কী করে”। অর্থাৎ নিজের চিন্তার মুরোদের উপর তার ভরসা নাই, তাই শেষ অবলম্বন সেন্সর বোর্ড। অনেকে বলেছেন এ ছবি লাহোরের বদলে ভুল করে ঢাকায় রিলিজ করা হয়ে গেছে। এসব এলোপাথাড়ি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার পর জানিয়েছেন তিনি ছবি নিষিদ্ধের পক্ষে নন, বরং গভীর আগ্রহে সিনেমা হলে দর্শকের প্রতিক্রিয়া কী হয় তা দেখতে চান। কিন্তু সম্ভবত আট দিনে সাধারণ দর্শকের কাছ থেকে “কাম্য প্রতিক্রিয়া” না দেখতে পেয়ে নিজেরাই সেন্সর বোর্ডের ভূমিকায় নেমে পড়েন। ছবির প্রদর্শনী বন্ধ করে দেবার পর এদের কাউকেই বন্ধের বিপক্ষে দাঁড়াতে দেখা যায় নি। কেউ কেউ চিন্তার দৌড় অনুপাতে স্বভাবসুলভ “পাকিস্তানী লবির এজেন্ডা” আবিষ্কার করেছেন, এদের কেউ আবার নিজেকে আলাদা করে এসব “ষড়যন্ত্র তত্ত্বের” বাইরে থাকার কপট দাবি জানিয়ে শেষমেশ নিজেও সেই পাকিস্তানী এজেন্ডারই ইঙ্গিত দিয়েছেন। অর্থাৎ স্রেফ ‘পাকিস্তানের’ ভয় দেখিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চিন্তার ফ্রেমের মধ্যে সবাইকে বেধে রাখার সেই পুরানো অক্ষম প্রচেষ্টা। ঠিক যেভাবে পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খান সব কিছুর ভিতরে ‘হিন্দুদের’ ষড়যন্ত্র দেখতে পেতেন।

সব কিছুকে পাকিস্তানী এজেন্ডা বা একটা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব দিয়ে দেখার খপ্পর থেকে বেরিয়ে আমরা যদি আমাদের সংকীর্ণ চোখকে মুক্ত করি,মনকে স্বাধীন চিন্তা করার সাহস যোগাই তবে আমাদের বহু চিন্তার জট খুলে যাবে, ব্যাখ্যা মিলবে,আমাদের সমস্যা আর সম্ভাবনা দুটোই দেখতে পাব। বুঝব, প্রেম যদি সব দূরত্ব-বাধা ভেদী সর্বগামী এবং সার্বজনীন বলে মানি তবে পাকিস্তানী-বাঙালির মধ্যে প্রেম হতে না পারার কোন কারণ নাই। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রেও কী সম্ভব? সাথে ধর্ষণ যখন প্রকট সত্য হয়ে হাজির? এটা নির্ভর করে কীভাবে উপস্থাপন করছি। চিত্রনাট্য, দৃশ্যকল্প, অভিনয় ইত্যাদি ও সর্বোপরি পরিচালকের মুন্সিয়ানায় যদি ঘটনা বিশ্বাসযোগ্য,লজিক ও শক্ত জাষ্টিফিকেশন খাড়া করে উপস্থাপন করা যায়, ঘটনা ও চরিত্রের প্রতি দর্শকের সহানুভূতি আকর্ষণ করাতে সমর্থ হয় – তবে সেখানেও প্রেম সম্ভব ও ন্যায্য। এইক্ষেত্রে মেহেরজান ছবির দুর্বলতা আছে। কিন্তু মেহেরজানকে যারা পাকিস্তানী-এজেন্ডা আখ্যা দিয়ে ব্যাখ্যা করছেন এটা তাদের সংকীর্ণ চিন্তার সমস্যা। তাঁরা চিন্তার সংকীর্ণতা দেখিয়ে শেষ করেন নি, ছবি বন্ধের একশনে গিয়েছেন।

আশির দশক থেকে আক্ষেপ শুনে আসছি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোন মহাকাব্য লেখা হলো না বলে। এতে বক্তা যে মহাকাব্য পড়েছেন তা জানা গেছিল বড় জোর। কিন্তু কোন জনগোষ্ঠিতে মহাকাব্য রচিত হতে গেলে সামাজিক মানস গঠনে কী প্রাকপ্রস্তুতি লাগে, সামাজিক না হোক অন্তত নিজের সে পরিপক্কতা এসেছে কীনা – সে খবর এদের জানা হয় নাই। সংকীর্ণ “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা” বা বাঙালি জাতীয়তাবাদী মনের কর্ম এটা নয় তা বলা বাহুল্য। কারণ যে নাদান অপরিপক্ক চিন্তায় ঘুরপাক খাচ্ছে, এক্ষেত্রে সে নিজেই তো মস্ত এক বাধা। প্রাকপ্রস্তুতি সেরে পরিপক্ক হতে চাইলে সবার আগে আমাদের অন্তত নিজের জীবনকে নানাভাবে দেখতে জানতে হবে। কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদী মনের কাছে জীবন মানে “বাঙালি” – যার আগে কিছু নাই, পরেও কিছু নাই। এই ‘বাঙালি’ বলতে সাংস্কৃতিক নাকি রাজনৈতিক–সে কী বুঝে সেসবের সতর্কতা তার নাই। সে নিজেকে ‘বাঙালি’ বলে চিনেছে এই সত্যের বাইরে আর কোন সত্য কি আছে নাকি আর কোন সত্য হতেই পারে না? তাহলে সে কি আবার মানুষও? যদি মানুষ হয় তবে দুনিয়ার অপরাপর সব অপর মানুষের প্রেক্ষিতে সে কে? তাদের সাথে কোন সম্পর্ক, টান কি অনুভব করে? যদি না করে তাহলে তো বালাই নাই। যদি করে তাহলে অ-বাঙালি সব অপরের সাথে টান অনুভবের কারণ কী? কারণ যে নিজের বাঙালি পরিচয়কে একমাত্র সত্য জ্ঞান করে তাঁর তো অ-বাঙালি সব অপরের সাথে সম্পর্কিত–এ অনুভব থাকার কোন কারণ নাই। ফলে অপর সব মানুষ কী তাকে অর্থাৎ ‘বাঙালি’কে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে, অথবা সে নিজে অপরকে? জর্জ হ্যারিসনের কথাই ধরা যাক, নিশ্চয় তিনি বাঙালি ছিলেন না। তাহলে আমাদের বাঙালি জাতীয়তাবাদ হলো কি হলো না তাতে তাঁর কিসের ঠেকা? আর আমরাই বা এই অ-বাঙালি অপর মানুষটাকে আমাদের বাঙালি পরিচয়ের মধ্যে জায়গা দিব কোথায়, ধারণ করব কী করে।

এই পরিস্থিতিতে মেহেরজান সিনেমা প্রমাণ করল মহাকাব্য দূরে থাক ছকবাঁধা ফ্রেমে আটকে মুক্তিযুদ্ধের গল্পের বাইরে অন্য কোনভাবে জীবনকে দেখতে, অন্য কোথাও দাঁড়িয়ে দেখা বা দেখানোর চেষ্টার পরিণতি কী হতে পারে। বাঙালি জাতীয়তাবাদী সংকীর্ণ মন এখনো এতই নাদান যে এই প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানানোর মত পরিপক্কতা সে লাভ করে নাই। এর মানে এমন নয় যে মেহেরজান একটা ‘উৎরে যাওয়া’ ছবি। ‘উৎরে যাওয়া’ মানে–কী বলতে চাই, কীভাবে বলতে চাই, সিনেমা বানানোর পর তা বলতে পারা গেছে কী না এসব। এই বিচারে মেহেরজান সফল হতে পারেনি। তবে বলা যেতে পারে, সে কাজের একটা ছোট পরীক্ষা-নিরীক্ষার চেষ্টা এটা। আর এতটুকুতেই খড়্গ নেমে এসেছে। উগ্র জাতীয়তাবাদী মন একে তাড়া করে আঁতুড় ঘরেই মেরে ফেলতে চাইছে।

দুনিয়ার কোন দেশের যুদ্ধের ইতিহাস একাট্টা নয়। অসংখ্য বয়ান থাকে। এটা স্বভাবিক। বিভিন্ন জায়গায় দাঁড়িয়ে দেখা, বিভিন্ন স্বার্থের দিক থেকে দেখা, বিভিন্ন অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দিয়ে দেখার কারণে এসব ভিন্নতা দেখা যায়। ইতিহাসে বিতর্ক তাই ওর সমবয়সী। আবার এসবের মধ্য থেকে সাধারণ একটা বয়ানও বের করা যায়, অবিতর্কিত মুলধারার বয়ান। কিন্তু ইতিহাসের বিতর্ক আর পলিটিসাইজড ইতিহাসের বিতর্ক (যেটা আসলে ইতিহাস নিয়ে দলবাজীর কুতর্ক) এক কথা নয়। যেমন, ধরা যাক স্বাধীনতার ঘোষণা, যুদ্ধে শহীদের সংখ্যা, ধর্ষণ ঘটনার সংখ্যা ইত্যাদি নিয়ে যে তর্ক করা হয় তা ইতিহাসের বিতর্ক বলে মানা যায় না; এগুলো এমনভাবে করা হয় যেন এই তর্কের সমাধানের উপর নির্ভর করছে মুক্তিযুদ্ধ আদৌ হয়েছে কি হয় নি, অথবা যেন ২৫শে মার্চের কালোরাত্রির নৃশংসতা ইত্যাদি সব মিথ্যা হয়ে যাবে। অথচ ঘটনা হলো, ধর্ষণের ঘটনার সংখ্যা বা শহীদের সংখ্যা বেশি কিংবা কম হলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের হত্যাযজ্ঞ, অপরাধ, নৃশংসতা জায়েজ হয়ে যাবে না। শেখ মুজিবের অবদান খাটো হয়ে যাবে না। কিন্তু এমন একটা ভাব তৈরি করা হয়েছে যেন ধর্ষণের সংখ্যা বেশি হলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ক্রেডিট আর কম হলে ডিসক্রেডিট।

আবার আমরা লক্ষ্য করলে দেখব, এমন একটা লজিক তৈরি করা হয়েছে যেন, ১৯৭১ সালে শেখ মুজিবের ক্রেডিট কতখানি তা দিয়ে এখনকার আওয়ামী লীগের রাজনীতির ক্রেডিট রেটিং আমাদের করতে হবে এবং আওয়ামী লীগকেই ভোট দিতে হবে। একই লজিক বিএনপিরও। আর এইসব হাস্যকর লজিককে আমরা ইতিহাস-বিতর্ক বলে দাবি করতে দেখছি। এই খাঁটি দলবাজিগুলো নাকি “মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি”। জাতীয়তাবাদী মন ইতিহাসের নামে দলবাজির এই চক্করে আমাদের সবাইকে বেধে রাখতে চায়, তাদের চিন্তার ফ্রেমের বাইরে যে কোন চিন্তাকে শেকল পড়াতে চায়।

যুদ্ধ ব্যক্তি মানুষকে জনগোষ্ঠীগত মানুষের একজন, এক মানুষের মধ্যে হাজারও মানুষের অস্তিত্ব, মানুষের এক একক কমিউনিটিবোধ জাগাতে বাধ্য করে। এক মানুষ সারা পৃথিবীর মানুষের প্রতিনিধি হিসাবে দায়, দায়িত্ত্ব বোধ করে। এতে চিন্তার অর্গল খুলে যায় বলে নানান দিক থেকে জীবন পরখ করা, ছুঁয়েছেনে দেখার সুযোগ মিলে। মনের শঠতা, সংকীর্ণতা, স্বার্থপরতা, পলায়নপরতাগুলো কোন এক কোণে চাপা পড়ে যায়। এর মানে এই না যে রক্তমাংসের দোষত্রুটি-ওয়ালা মানুষের বদলে সবাই বইয়ের আদর্শ মানুষ বনে যায়। আদর্শ মানুষ তো আদর্শ-আইডিয়েল, বাস্তবের রক্তমাংসের রিয়েল মানুষ সে নয়। যদিও ইতিহাস লেখার সময় মানুষের আদর্শগত দিকটা প্রধান হয়ে উঠে। তবে এক্ষেত্রে, মানুষের আদর্শগত দিকটা যেমন সত্য, ঠিক তেমনি রক্তমাংসের মানুষের দোষত্রুটি আছে থাকে এটাও সমান সত্যি হয়ে তখনও থেকে যায়। তবে যারা শিল্পজগতের লোক, শিল্প করতে চায়, তাদের পছন্দ রক্তমাংসের মানুষ। তারা রক্তমাংসের মানুষ আর আদর্শ মানুষ – এই একই মানুষের ভিতরের দুইদিকের দ্বন্দ্বকে উপজীব্য করে শিল্প রচনার ভিত গড়ে।
সেসব দিক থেকে সুনির্দিষ্টভাবে মেহেরজানে কী আছে সে নিয়ে আলোচনার আগে বাঙালি জাতীয়তাবাদী মনের অসুখটা কী তা একটু বিশদ করে দেখব, সেখানে প্রবেশ করব।

সাংস্কৃতিক বাঙালি ও রাজনৈতিক বাঙালি
আমরা বাঙালী – দুটো অর্থে কথাটা বলা যায়।
বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির আগেও আমরা ‘বাঙালি’ ছিলাম, পরেও ‘বাঙালি’। এই বাক্যে ‘বাঙালি’ শব্দের ব্যবহার বাঙালি আমাদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট অর্থে। আমাদের নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যে জীবনযাপন, জীবন প্রকাশ করার ধরণ অর্থে। দুনিয়ায় বিভিন্ন কোণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আরও অনেকানেক নৃবৈশিষ্টের মানুষের পাশাপাশি আমরা আমাদের বৈশিষ্ট্য নিয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে। ভাষা, ধর্ম, সৃষ্টিশীলতা, জীবনকে দেখার ধরণ, পারস্পরিক সম্পর্কের রূপ, পরিবার, সমাজের ধরণ, খাদ্যাভাস ইত্যাদিতে প্রকাশিত আমাদের সুদীর্ঘ জীবন সংগ্রামের ছাপ যার প্রতিটি পরতে পরতে লুকানো। তবে এটা আবার একাট্টা না, মোটাদাগের সাংস্কৃতিক ফ্রেমের মধ্যে আভ্যন্তরীণ লড়াই সংগ্রাম আছে, বাঁক ফেরা আছে; যদিও নদীর স্রোতের মত তা বহমান, যাতে পরিবর্তন আছে তবে সদা বিকশিত। এভাবেই আকার নিচ্ছে, ভাঙছে আবার আকার নিচ্ছে। সব মিলিয়ে এককথায় একে বাঙালি সাংস্কৃতিক রূপ, বৈশিষ্ট্য বলছি।

অন্যদিকে যদি বলি, বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির আগে আমরা ‘বাঙালি’ ছিলাম না, এরপর ‘বাঙালি’ পরিচয় নিয়েছি; আর এরপরে কী হব এখন জানি না। তবে ভবিষ্যতে অন্যকিছু পরিচয় নিতেও পারি। এবার এই কথার মধ্যে যে ‘বাঙালি’ শব্দের ব্যবহার করেছি তার অর্থ কিন্তু এখানে রাজনৈতিক; সাংস্কৃতিক পরিচয় সীমা ছাড়াও রাজনৈতিক অর্থে বাঙালি। এতে আমাদের সাংস্কৃতিক বাঙালীত্ব ঘুচে গেল না, তবে যোগ হলো রাজনৈতিক পরিচয়। আর গুরুত্ত্বপুর্ণ কথা হলো, রাজনৈতিক পরিচয় বলতে এটা কোন চিরস্থায়ী ধরণের ব্যাপার নয়।

বাঙালি – এই শব্দ ব্যবহারের সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বলে এই ভাগটা সতর্কভাবে মনে রাখা দরকার। আমাদের বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিচয় আমাদের চয়েস বা পছন্দের বিষয় না; প্রকৃতি-প্রদত্ত। কিন্তু আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বিপরীতে রাজনৈতিক পরিচয়? এটা আমরা জনগোষ্ঠী হিসাবে নিজেরা নির্মাণ করি। এটা প্রকৃতি-প্রদত্ত নয়। একে আমরা ভাঙ্গতে পারি আবার গড়তে পারি। এবং তাই আমরা করি। এছাড়া আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, জনগোষ্ঠীর নিজে নির্মাণ করে নেয়া রাজনৈতিক পরিচয় একবার করে না এবং একটাই থাকে না। জীবনে লড়াই সংগ্রামের নানান সময়ে নানান রাজনৈতিক পরিচয় ধারণ করতে পারে। এটাই কোন জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক পরিচয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মধ্যে বড় ফারাক।

রাজনৈতিক পরিচয়- এই কথাটায় এমন কী আছে যা সাংস্কৃতিক নয়? কেন মনে ভাগ বজায় রাখার কথা বলছি? এর জবাব অনেকভাবে দেয়া যেতে পারে। সেসবে এখানে বিস্তার না ঘটিয়ে সংক্ষেপে মূল কিছু দিক উল্লেখ করব। কোন জনগোষ্ঠির সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট বলে যা আকার নেয় এর মূলে আছে নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট। যেমন, হিমালয়—সুউচ্চ পর্বত, এর পাদদেশের শেষ মাথায়, এর বরফগলা পানি, বিশেষ মিঠা পানি সমুদ্রে মিশে নিজ বৈশিষ্ট্য লোপ পাবার ঠিক আগে প্রায় সমতল এক ভূমিতে আমাদের জন্ম। পর্বতের বরফগলা বিশেষ মিঠা পানিতে কৃষি চাষাবাদ করে ও মাছ খেয়ে আকার পাওয়া কোন নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের জনগোষ্ঠী দুনিয়াতে আর কোথাও আছে কিনা খোঁজ করে দেখা যেতে পারে। গরুর দুধকে নানানভাবে প্রক্রিয়াজাত করে নতুন নতুন নানান খাদ্য ও খাদ্যাভাসের কথা দুনিয়ার নানান জনগোষ্ঠির মধ্যে চল আছে আমরা দেখতে পাই, যেগুলো আবার প্রায় নৃগোষ্ঠীর মধ্যে কমন। যেমন, মাখন, চীজ-পনির, দই ইত্যাদি। কিন্তু ছানা? রসে সিদ্ধ করা সেই ছানার রসগোল্লা? এটা এতই আন-কমন খাদ্য বা খাদ্যাভ্যাস যে ‘ছানা’ শব্দের ভাষান্তর মেলে না। সাধারণভাবে বললে ছানা একধরণের প্রসেসড মিল্ক। একই দুধ কিন্তু আমাদের প্রক্রিয়াজাত করণের মধ্যে এমন এক বিশেষ ধরণ আছে যার কারণে এটা দুধের অন্য আর সব সাধারণ প্রক্রিয়াজাত ফল মাখন, চীজ-পনির, দই ইত্যাদি থেকে একেবারে ভিন্ন। সব নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মধ্যেই এমন বিশেষ কিছু সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য থাকে যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। একথাগুলো পড়তে পড়তে পাঠককে জাতগর্বে বা আবেগে আপ্লুত হতে বারণ করি। কারণ আসল কথাটা এখন বলতে হবে। লক্ষ্য করলে দেখব, আমরা যা বাঙালি সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বলে চিনছি তা দাঁড়িয়ে আছে আমাদের নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, ভূগোল ইত্যাদির মৌলিক কাঠামোর উপর। আর গুরুত্ত্বপূর্ণ হলো, এই মৌলিক কাঠামোটা প্রকৃতি-প্রদত্ত, আমাদের কোন কেরামতি নাই। এটা প্রকৃতি-প্রদত্ত বা গিভেন, অনেকে যা গড-গিভেন বলতে পছন্দ করেন। আগে থেকে নির্ধারিত ঐ পটভূমির উপর বেঁচে থাকা, জীবনধারণ, যাপন করতে গিয়ে আমাদের কেরামতিটা অতটুকুই যে, আমাদের জীবন সংগ্রাম লড়াই ও তার মধ্যে দিয়ে আমাদের জনগোষ্ঠীর জীবন প্রকাশের বিশেষ ধরণ এটা—এককথায় যাকে আমরা সাংস্কৃতিক বাঙালি বলে জানছি। কিন্তু আমাদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যকে আকার দিচ্ছে আমাদের নৃবৈশিষ্ট্য, ভূগোল ইত্যাদির মৌলিক কাঠামো—এই পূর্বনির্ধারিত পটভূমি মেনে নিতে হচ্ছে কেন? কারণ, আমরা কেউই আল্লার সাথে চুক্তি করে বঙ্গদেশে জন্ম নেইনি; আমার নাক-বোচা, শ্যামলা, গড়ে সাড়ে পাঁচ ফুটের হব কিনা তা আমরা কেউই ঠিক করিনি; মাটিতে হিমালয় পর্বত থাকতে হবে যার পাদদেশে আবার বিস্তীর্ণ সমতলভূমি থাকতে হবে এমন নিশ্চয়তা জন্মের আগে আমাদের কেউ দেয়নি। এর মানে আকার পাওয়া সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের মৌলিক দিকগুলো পূর্বনির্ধারিত, প্রকৃতি-প্রদত্ত; কোন জনগোষ্ঠীর ওতে কোন হাত নাই। ওকে খণ্ডান বা বদলে নেয়া আমাদের পক্ষে অসম্ভব।

তাহলে এখানকার জন্য মুলকথা, আমাদের বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিচয় আমাদের চয়েস বা পছন্দের বিষয় না; প্রকৃতি-প্রদত্ত।
কিন্তু আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বিপরীতে রাজনৈতিক পরিচয়? এটা জনগোষ্ঠী নির্মাণের রাজনৈতিক কাজ করি। এটা প্রকৃতি-প্রদত্ত নয়। একে আমরা ভাঙ্গতে পারি আবার গড়তে পারি। এবং তাই আমরা করি। এছাড়া আরও গুরুত্ত্বপূর্ণ হলো, জনগোষ্ঠীর নিজের নির্মাণ করে নেয়া রাজনৈতিক পরিচয় একবার করে না এবং একটাই থাকে না। জীবন লড়াই সংগ্রামের নানান সময়ে নানান রাজনৈতিক পরিচয় ধারণ করতে পারে। এটাই কোন জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক পরিচয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মধ্যে বড় ফারাক।

রাজনৈতিক পরিচয় কথাটা একটু ভেঙ্গে বলি। রাজনৈতিক পরিচয় মানে রাষ্ট্র সংক্রান্ত বিষয়; একটা নতুন রাষ্ট্র গঠনে যা কালমিনেট অর্থে পরিণতি পায়। এখানে রাষ্ট্র বলতে আধুনিক রাষ্ট্র অর্থাৎ রাজা সম্রাটের সাম্রাজ্য অর্থে রাষ্ট্র নয়। যেমন ১৯৭২ সালে যে বাংলাদেশ রাষ্ট্র কালমিনেটেড, মোটাদাগে এর রাজনৈতিক পরিচয় বিনির্মাণ (রিকনষ্ট্রাকশন) শুরু মধ্য ষাটের দশকে। আমরা এক নতুন রাজনৈতিক পরিচয়, বাঙালি (সাংস্কৃতিক নয় রাজনৈতিক অর্থে) বা বাংলা ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদ পরিচয় ধারণ করে জনগোষ্ঠীগত ভাবে নতুন আকার নিতে শুরু করেছিলাম। এটা সাংস্কৃতিক অর্থে খেয়ে পড়ে জীবনযাপন বেচে থাকা ও স্রেফ জীবন প্রকাশ নয়; নতুন রাষ্ট্র গঠন, রাষ্ট্রে পরিণতি পাওয়ার মামলা; তাই রাজনৈতিক। প্রকৃতি-প্রদত্ত বিষয়াবলীর উপর মানুষের নিজস্ব অর্জন, চিন্তার মুরোদ হাজির করা। পাঠক হয়ত লক্ষ্য করেছেন, আগের বাক্যে ‘রিকনষ্ট্রাকশন’, ‘নতুন’ শব্দগুলো ব্যবহার করেছি। তার মানে রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে বা কনষ্ট্রাক্ট করে নেবার বিষয়; যা আগে থেকেই হয়ে বা গড়া থাকে না। এটা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মত প্রকৃতি-প্রদত্ত অর্থে গিভেন না। আবার ‘রি-কনষ্ট্রাকশন’ এর ‘রি’ অথবা ‘নতুন’ বলেছি—তার মানে এক্ষেত্রে আমাদের অন্য কোন রাজনৈতিক পরিচয় আগেও একবার নির্মিত হয়েছিল! হ্যাঁ, হয়েছিল। যেটা পাকিস্তান রাষ্ট্র। ভুল বা শুদ্ধের প্রশ্ন নয়; ফ্যাক্টস হলো, বাঙালি জাতীয়তাবাদ রাজনৈতিক পরিচয় ধারণের আগেও আমরা একবার মুসলমান ডাকনামের রাজনৈতিক পরিচয়ে পাকিস্তান আন্দোলনের ফসল বা পরিণতিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রে আকার পেয়েছিলাম। আর ওটা ছিল আমাদের প্রথম রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণ। এর আগে আমরা ছিলাম বৃটিশ-ইন্ডিয়া এই কলোনী রাষ্ট্রের প্রজা, আর এরও আগে মোঘল সাম্রাজ্যের প্রজা; ফলে আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণতি চাই এমন নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় এগুলোর কোনটাই নয়, ঘটনা নয়। তাই রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণ ওগুলোকে বলতে পারব না।

তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি, একটা রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণ গড়নের বিষয়টা আসলে কেবল একবারই নয়, বারবার তা নির্মাণ পুণর্গঠন হতে পারে; জনগোষ্ঠীর পরিচয়কে আবার নতুন করে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজন হতে পারে। একই পূর্ববঙ্গীয় জনগোষ্ঠীর আমাদের বিভিন্ন সব সম্ভাব্য পরিচয়ের মধ্য থেকে এক সময়, মূলত কলোনী ভূমিব্যবস্থা বা জমিদার-প্রজা সম্পর্কের অবসান ঘটাতে মুসলমান পরিচয় মুখ্য গণ্য করে একবার পাকিস্তান রাষ্ট্র এবং পরবর্তীতে সেই নিপীড়ক পাকিস্তান রাষ্ট্রে পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্যের নিগড় থেকে মুক্তি পেতে নতুন আর এক রাজনৈতিক পরিচয়ে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী বাংলাদেশ রাষ্ট্রে আমাদের উদ্ভব ঘটেছিল। এখান থেকে আমরা ধারণা করতে পারি, একই বাঙালি সাংস্কৃতিক জনগোষ্ঠী আগামীতে নতুন কোন রাজনৈতিক পরিচয়ে আবার নতুন রাষ্ট্রে পুণর্গঠিত হবার চেষ্টা করতে পারে।

উপস্থিত কোন রাষ্ট্রের মধ্যে বসে নতুন কোন রাজনৈতিক পরিচয় খাড়া করে রাজনৈতিক সংগ্রামের কাজ একটা নিরন্তর ঘটনা। কিন্তু কাকে রাজনৈতিক পরিচয় মেনে ধরে নিয়ে তা বারবার আগাবে তা নির্ভর করে জনগোষ্ঠীর মধ্যে দূর-মীমাংসিত বিরোধ স্বার্থসংঘাত কী রূপ, চেহারা নিয়ে হাজির হচ্ছে। তবে নতুন কোন রাজনৈতিক পরিচয় খাড়া করা মানে রাষ্ট্রের সীমানা ভেঙ্গে নতুন সীমানা নিয়ে রাষ্ট্র হবেই এমন নয়। একই বাংলাদেশ ভৌগলিক সীমার মধ্যে থেকেই রাষ্ট্র নতুন করে নতুন পরিচয়ে পরিগঠিত হতে পারে। বাংলাদেশের এখনকার রাষ্ট্র বদলে আগামীতে নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে একই ভৌগলিক সীমায় যদি নতুন রাষ্ট্র, কনষ্টিটিউশনে পুণর্গঠিত হয় তবে একাদেমিক ভাষায় একে নতুন বাংলাদেশের সেকেন্ড রিপাবলিক বলা হবে।

এখনকার জন্য মূল কথা হলো, সাংস্কৃতিক অর্থে বাঙালি একই জনগোষ্ঠী বারবার রাজনৈতিক পরিচয় বদল করতে পারে, রাষ্ট্র বদলে পুণর্গঠিত হতে পারে। তবে এখনকার ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র ভবিষ্যতে নতুন কোন রাজনৈতিক পরিচয় ধারণ করে বদলে গেলেও সাংস্কৃতিক অর্থে অর্থাৎ নৃতাত্ত্বিক, ভৌগলিক অর্থে সে একই বাঙালি জনগোষ্ঠীই থাকবে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ – এই রাজনৈতিক পরিচয় তার শেষ কথা নয়; এর যেমন শুরু আছে তেমনি শেষও আছে। আর, এটা সাংস্কৃতিক অর্থে শেষ হওয়া নয়। আবার, সাংস্কৃতিক পরিচয় বাঙালি বলে ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র ওর একমাত্র ও থিতু-রূপ হবে এমন ধারণার কোন ভিত্তি নাই।

আবার সাংস্কৃতিক পরিচয় বাঙালি –এটাও শুকিয়ে মরা অর্থে শেষ হতেও পারে। যেমন পশ্চিমবঙ্গের কথা ধরা যাক। ওর সাংস্কৃতিক পরিচয় এখনও বাঙালী হলেও রাজনৈতিক পরিচয়ে ওরা ৪৭ সাল থেকেই ভারতীয় জাতীয়তাবাদী। এখন ওর এই সাংস্কৃতিক পরিচয়টুকুও কী শেষ পর্যন্ত থাকবে? এটা নির্ভর করে সর্বভারতীয় যে আগামী রাষ্ট্র পরিচয় দাড়াবে তা সে বর্তমান ভারতীয় জাতীয়তাবাদ থাকুক আর যাই থাকুক—তাতে পশ্চিমবঙ্গের বাঙ্গালীর চিন্তার অবদান কতটুকু ও কী থাকবে এর দ্বারা। ঠিক একইভাবে দুনিয়াতে বাংলাদেশ বলে আগামীতে কিছু কি থাকবে? আলাদা করে চেনা যাবে? এটা নির্ভর করে গ্লোবাল চিন্তা জগতে আলাদা করে চেনা যায় এমন কোন অবদান যদি আমাদের থাকে তবে। নইলে এমনও হতে পারে কারও কোন সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে চাপে প্রভাবে আমরাও বিলীন হয়ে গেছি।

রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণ ও রেসিজমের বিপদঃ
এবার কথা আর একটু সরাসরি বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাথে প্রাসঙ্গিক করার চেষ্টা করব। রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণ মানে একইসাথে শত্রু-মিত্র নির্ধারণ করে ফেলাও বটে। কলোনী ভূমিব্যবস্থা অর্থাৎ জমিদারী-প্রজা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ইস্যুতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস পূর্ববঙ্গীয় প্রজাদের পক্ষে জমিদার-প্রজা সম্পর্কের অবসান ঘটানোর জন্য রাজনৈতিক অবস্থান নিতে পারে নি। বরং দেশভাগ ঘটনার শেষের দিকে বিশেষত ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের সময় থেকে সংখ্যাগরিষ্ট পূর্ববঙ্গের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গ বা হিন্দুদের রক্ষা করার নামে জমিদারদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। এসব ঘটনায় পূর্ববঙ্গ পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে মিলে মুসলমান প্রধান অঞ্চলগুলো নিয়ে দেশভাগের দাবির সাথে একাত্ম হয়ে যায়, আর এর নতুন রাজনৈতিক পরিচয় ‘মুসলমান’ নির্ধারিত হয়ে যায়। সেই সাথে বিপরীতে নতুন সম্ভাব্য পাকিস্তান রাষ্ট্রের শত্রুর পরিচয় হয়ে যায় ‘হিন্দু’; এটা এড়ানোর কোন উপায় অবশিষ্ট থাকে না। এখন মজার ব্যাপার হলো, পরবর্তীতে দেশভাগ ঘটে যারার পর নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানে জমিদারী বিলোপ ও প্রজাসত্ব আইন পাশ হয়ে যাবার পর ভূমিব্যবস্থায় বাস্তব শত্রু জমিদার বা সেই অর্থে ‘হিন্দু’ গরহাজির হয়ে যায়। অথচ ইতোমধ্যে ‘মুসলমান’ রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েম করে ফেলার কারণে চাইলেই ঐ রাষ্ট্রের শত্রু যে আর বাস্তবে ‘হিন্দু’ নয় সেই বয়ান থেকে সরে আসা সম্ভব হয় না। কারণ আগেই ধরে নেয়া হয়ে গিয়েছিল যে নতুন প্রোথিত রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তি ‘মুসলমান’। এটাই যে কোন রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণ, গ্রহণের আজন্ম স্ববিরোধ।

অবিভক্ত বৃটিশ ভারতে পূর্ববঙ্গের মুখ্য সমস্যা সংঘাত ছিল ভূমি ব্যবস্থা বা জমিদার-প্রজা সম্পর্কের অবসান ঘটানো। কিন্তু বিশাল ভারতবর্ষের হাজারো বিরোধ সংঘাতের মধ্যে পূর্ববঙ্গ নিজের দাবিকে সর্বভারতীয় পর্যায়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে পালটা ক্ষমতার রাজনৈতিক ইস্যু হিসাবে হাজির করতে পারার মত রাজনৈতিক শক্তি তার ছিল না। একই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল ১৯৪৭ সালের আগের দেড়শ বছর ধরে চলা বৃটিশ ভূমি চিরস্থায়ী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রজা-কৃষক আন্দোলন। তিতুমীর, শরিয়তুল্লাহ বা ফরাজী আন্দোলনকে বাইরের আবরণে দেখে ভুলে এগুলোকে ধর্মীয় আন্দোলন বলে মনে হতে পারে কিন্তু এগুলো মুলত বৃটিশ ভূমি ব্যাবস্থার বিরুদ্ধে কৃষকের জমি পাওয়ার আন্দোলন সংগ্রাম। জমিদার-প্রজা সম্পর্কের নিগড় থেকে মুক্তির আন্দোলন। কিন্তু এগুলোর কোনটাই সফল হতে পারেনি। কারণ এগুলো সর্বভারতীয় বৃটিশ রাষ্ট্রক্ষমতার বিপরীতে কোন পালটা ক্ষমতা হতে পারেনি, বড়জোর স্থানীয় ঘটনা হিসাবে থেকে গিয়েছিল। কিন্তু ১৯০০ সালের পরের ও ১৯৪৭ সালের আগে এই সময়কালে পূর্ববঙ্গের ভূমি ব্যবস্থা বা জমিদার-প্রজা সম্পর্কের বদলের আন্দোলনে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছিল। সর্বভারতীয় পর্যায়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে পালটা ক্ষমতা হয়ে উঠতে এবার সে রাজনৈতিক মৈত্রী গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল। এই রাজনৈতিক মৈত্রী গড়া ভাল না খারাপ অথবা ভুল না শুদ্ধ হয়েছিল সে বিচারে নয়, ফ্যাক্টস হিসাবে কী ঘটেছিল সেদিক থেকে বললে, পূর্ববঙ্গে প্রথম এলায়েন্সটা গড়ে উঠেছিল ভূমিব্যবস্থা বা জমিদার-প্রজা সম্পর্কের নিগড়ে আটকে থাকা প্রজা-কৃষক আর মুসলমান মধ্যবিত্তের মধ্যে; এরা কলকাতাকেন্দ্রিক ততদিনে গড়ে উঠা প্রথম প্রজন্মের মুসলমান মধ্যবিত্ত। পড়াশুনা, সরকারী চাকরি, ওকালতি ইত্যাদি নানান পেশা—সবমিলিয়ে এক শহুরে মুসলিম মধ্যবিত্ত, মোটাদাগে সোহরাওয়ার্দী এদের নেতা বা বলা যায় এটাই সোহরাওয়ার্দীর কনষ্টিটিউয়েন্সী। এরপর পূর্ববঙ্গে প্রথম এই এলায়েন্সটার সাথে পশ্চিম পাকিস্তানের এলায়েন্স— এটাই পালটা ক্ষমতা, বৃটিশ রাজ আর কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সক্ষম এক সংহত ক্ষমতা হয়ে উঠতে পেরেছিল। পূর্ববঙ্গের মুখ্য সমস্যা ভূমিবিরোধ একমাত্র এভাবেই অন্যেরা শুনতে বাধ্য হয় এমন শক্তি হয়ে উঠতে পেরেছিল, পূর্ববঙ্গের একমাত্র গতি হয়ে উঠেছিল। মুসলীম লীগ নামের এই এলায়েন্সের ভিত্তি একটাই –তাদের সবার শত্রু কমন, অবশিষ্ট ভারতের রাজনৈতিক শক্তি; আর ঐ এলায়েন্সের দাবি হলো মুসলমান প্রধান অঞ্চলগুলোকে নিয়ে তাদের আলাদা রাষ্ট্র হতে হবে। অর্থাৎ পূর্ববঙ্গ নিজের মূল দাবি জমিদার-প্রজা বিরোধের সমাধান শেষে, মুসলমান প্রধান অঞ্চলগুলোকে নিয়ে আলাদা রাষ্ট্রের মধ্যে খুঁজে নেবার একটা রাস্তা পেল। কিন্তু এতে নতুন সেই সম্ভাব্য রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিচয় ভিত্তি হয়ে উঠল ‘মুসলমান’।

ওদিকে নতুন রাজনৈতিক পরিচয় ‘মুসলমান’ মানে আসলে কী? নতুন পরিচয়ের মানে খুঁজতে গিয়ে তা শেষে গিয়ে দাঁড়াল পাকিস্তান রাষ্ট্রকে “ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক” রাষ্ট্র হতে হবে—এই পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। এখন পুর্ববঙ্গের দিক থেকে দেখলে তার প্রধান বিরোধ ছিল ভূমিব্যবস্থার সমাধান; কিন্তু কাম্য রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিচয় খাড়া করতে গিয়ে তা শেষে হয়ে দাঁড়াল “ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক” রাষ্ট্র। বুঝাই যাচ্ছে মূল জায়গা থেকে সরে যাওয়া এ এক লম্বা জার্নি; ছিল ভূমিবিরোধ সমাধান দাবি, কিন্তু শেষে তা হয়ে দাঁড়ালো ‘মুসলমান’ এই রাজনৈতিক পরিচয়ে এক “ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক” রাষ্ট্র। ইতোমধ্যে রাজনৈতিক পরিচয় খাড়া করতে গিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের শত্রুর পরিচয় দেয়া হয়ে গেছে হিন্দু। এটাই রাজনৈতিক পরিচয় খাড়া করতে যাওয়ার স্ববিরোধ ও বিপদ। কারণ দেশভাগ হয়ে যাবার পর, যখন বাস্তবে ভূমিব্যবস্থা বা জমিদার-প্রজা সম্পর্কের অবসান ঘটে গিয়েছে এরপর হিন্দুরা পাকিস্তান রাষ্ট্রের শত্রু একথা বলবার আর কোন মানে হয় না, ভিত্তি থাকে না।

শুধু তাই না, ভূমি বিরোধ অবসানের পর নতুন বিরোধ নতুন রাষ্ট্রে পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্ববঙ্গের সম্পর্ক কী হবে তা মুখ্য হয়ে উঠেছিল। সেসবের খবর করতে গিয়ে পূর্ববঙ্গের প্রতিটা প্রশ্নকে নতুন “পাকিস্তান রাষ্ট্রকে সংহত” করার নামে তা “পাকিস্তান রাষ্ট্রের চেতনা বিরোধী” বলে ট্যাগ লাগিয়ে দেয়া হতে লাগল। আরও একটু আগ বাড়িয়ে “পাকিস্তান রাষ্ট্রের চেতনা” মানে ‘ইসলাম’ বা “ইসলামী চেতনার” বিরোধীও বলা হতে লাগল।

‘মুসলমান’—এই রাজনৈতিক পরিচয় পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়েও আর এক বড় বিপদ ঢেকে আনে। বিপদটা হলো দেশভাগ ঘটে যারার পরেও শত্রুকে দেখানো, চেনানোর সমস্যা। নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানে জমিদারী প্রথা বিলোপ ও প্রজাসত্ব আইন পাশ হয়ে যাবার পর ভূমিব্যবস্থায় বাস্তব শত্রু জমিদার বা সেই অর্থে ‘হিন্দু’ হাজির নয়। ফলে এই নতুন বাস্তবতায় শত্রুকে আগের বাস্তবতার ভিত্তিতে দেখানো চেনানো বাস্তবে অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল। এমনকি জমিদারী উচ্ছেদ ঘটেছিল জমিদারকে কোন ক্ষতিপূরণ দেবার মত আপোষমূলক ছাড় না দিয়ে; ফলে ‘জমিদার-প্রজা’ ধরণের কোন পুরানো উৎপাদন সম্পর্কের জের থাকেনি, সমুলে উৎখাত হয়ে গিয়েছিল। হিন্দু-মুসলমান বলে নির্মম নৃশংস দাঙ্গা হয়েছিল ঠিকই কিন্তু এর তলে তলে পূর্ববঙ্গের ভূমিমালিকানা ব্যবস্থায় এত বড় ওলটপালট ঘটে গিয়েছিল অথচ মালিকানায় রদবদল অর্থে কোন ধরণের সামাজিক ঝাকুনি এতে তৈরি হয়নি। যেন কেউ টেরই পায়নি। এতে মজার এক ব্যাপার ঘটে। কোন সামাজিক ঝাকুনি তৈরি না করে, পূর্ববঙ্গের ভূমিমালিকানা ব্যবস্থায় এত বড় ওলটপালট ঘটে যাবার ঘটনা ঘটেছিল অথচ সবার মনে ছাপ ফেলেছিল, ঝাকুনি দিয়েছিল হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। আর ভূমিমালিকানা ব্যবস্থায় এত বড় ওলটপালট ঘটনার সুফল সবাই ভোগ করেছে। ওদিকে এই অবস্থায় নতুন পাকিস্তান রাষ্ট্র ততদিনে অদৃশ্য ‘হিন্দু’ শত্রুর ভয় দেখিয়ে রাষ্ট্র সংহত করতে চাইছে, পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্ববঙ্গের সম্পর্ক কী হবে সেসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুললে তাকে “পাকিস্তান রাষ্ট্রের চেতনা” মানে ‘ইসলাম’ বা “ইসলামী চেতনার” বিরোধীও বলে টুঁটি চেপে ধরতে চেয়েছে।
একইভাবে আমরা যদি পরবর্তীকালের ভাষাভিত্তিক বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ, এই ‘পরিচয়ের রাজনীতি (politics of identity) বিচার করতে বসি তবে আগের ‘মুসলমান’ ‘পরিচয়ের রাজনীতি’র সাথে এর অবাক করা মিল খুঁজে পাব।

পাকিস্তান থেকে আমরা আলাদা নিজের রাষ্ট্র হয়ে গিয়েছি ৪০ বছর হয়ে গেছে। পাকিস্তান এখন আমাদের উন্মেষ, বিকাশ, চিন্তাভাবনা চর্চার, সিদ্ধান্ত পরিচালনার ক্ষেত্রে বাধা– একথা বলবার কোন মানে হয় না। কিন্তু ‘পাকিস্তান’ আমাদের শত্রু –একথার বিপরীতে আমরা বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র করেছি। ঠিক যেমন ‘হিন্দু’ আমাদের শত্রু –একথার বিপরীতে পাকিস্তান রাষ্ট্র হয়েছিল।

পাকিস্তানের প্রেক্ষিতে, পূর্ববঙ্গের দিক থেকে মূলত জমিদার-প্রজা সম্পর্কের অবসান চাইতে গিয়ে রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে ‘মুসলমান’ এই রাজনৈতিক পরিচয় ধারণ করা, ঘটনাপ্রভাবে ‘হিন্দু’ শত্রুর বিরুদ্ধে পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েম হয়ত গ্রহণযোগ্য মনে করা যেতে পারে। কিন্তু এর মানে যদি হয় হিন্দুবিদ্বেষী হয়ে উঠা? ‘মুসলমান’ এই রাজনৈতিক পরিচয় ধারণ করা তাল সামলাতে না পেরে আগ বাড়িয়ে যদি হিন্দুবিদ্বেষী হয়ে যায়? তবে এটাকে রেসিজম বলে। যে কোন জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক পরিচয় গঠন, নির্মাণের সাথে সহজাতভাবে হাজির থাকে রেসিজম। এটাই ‘পরিচয়ের রাজনীতির (politics of identity) ভয়াবহ দিক। মুসলমান পরিচয়ের ভিত্তিতে ‘হিন্দু’কে শত্রু ঠাউরে পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েম করতে গিয়ে সে নিজের হিন্দুবিদ্বেষী বা হিন্দু-রেসিষ্ট (রেসিষ্ট হিন্দু নয়) হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া এড়ানো খুবই কঠিন। আর ঘটলে তা হবে ভয়াবহ। একইভাবে ‘পাকিস্তানী’কে শত্রু ঠাউরে বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র কায়েম করতে গিয়ে তার পাকিস্তানীবিদ্বেষী বা পাঞ্জাবীবিদ্বেষী হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। এর উপর কেউ যদি পাকিস্তান ও ইসলাম – শব্দ দুটোকে মনে মনে সমার্থক জ্ঞান করে তাহলে সে ইসলামবিদ্বেষী হবে সন্দেহ নাই।

রাজনৈতিক বা আকাদেমিক দুনিয়া রেসিজম (Racism) কথাটার সাথে আমাদের পরিচয়, সচেতনতার খুব বেশি দিন আগের নয়। সাউথ আফ্রিকার শাসকের সাদা-কালো বর্ণবাদের বিরোধিতা অথবা একালের বিভিন্ন দেশে গোত্র বা নৃজাতি (Race)দের মধ্যে পরস্পরকে খতম বা নির্মূল অভিযানমুলক সংঘাতের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইন, কনভেনশন ইত্যাদি এগুলোর চিহ্ন। আমাদের চিন্তার মধ্যে রেসিজমের ব্যাধি এমনই অদ্ভুত যে বহনকারী গর্বের সাথে যে কথা বলে সে কোনদিন খেয়াল করে দেখেনি যে ঐ বক্তব্য রেসিজমের ব্যাধিতে ভরপুর। মানুষকে যত ধরণের পরিচয়ে বিভক্ত করে হাজির করা সম্ভব বা বলা চলে মানুষে মানুষে যত ধরণের বিভক্তিমূলক চিহ্ন আবিস্কার করা সম্ভব যেমন, গায়ের রং, শরীরের গড়ন (বেটে-লম্বা, নাক খাড়া-বোচা ইত্যাদি), সমতল-পাহাড়ী বা কোস্টাল, ধর্ম, গোত্র, বংশ, প্রাচ্য-পশ্চিম, নারী-পুরুষ ইত্যাদি। এসব বিভক্তি চিহ্ন মানুষের মধ্যে আছে। এসব বিভক্তি টের পাওয়া সচেতন হওয়া কোন সমস্যা নয়। এবং সম্ভবত এই বিভক্তি চিহ্নের ভিত্তিতে রাজনৈতিক পরিচয় গঠন, নির্মাণ ঘটে থাকে, আমরা এড়াতে পারি না। কিন্তু এই বিভক্তি চিহ্নের ভিত্তিতে একটাকে অন্যটার বিরুদ্ধে শ্রেষ্ঠ গণ্য করা, হেয় গণ্য করা, খাটো বা নিচু করে দেখানো, উচু-নিচু ধারণা তৈরি করে বিদ্বেষী হয়ে যাওয়া রেসিজমের ব্যাধি, রেসিস্ট মন তৈরি করা।

জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্ব থাকে তৈরি হয়, সেই দ্বন্দ্বে লড়াই সংগ্রাম চলে, চলতেই থাকে। সে লড়াইয়ে স্বার্থে শত্রু-মিত্র সৃষ্টি হয়। কিন্তু সেজন্য রেসিজম তৈরি করা, ওর মর্ম অপর জাতবিদ্বেষী হয়ে পড়া জরুরী নয়।

কিন্তু জরুরী না হলেও রেসিজম, বিদ্বেষই ঘটতে দেখছি আমরা। পাকিস্তান রাষ্ট্র হিন্দু রেসিজমে ভুগেছিল। ঠিক একইভাগে বাঙালি জাতীয়তাবাদ পাকিস্তানবিদ্বেষী রেসিজমে ভুগছে। পাকিস্তানের বেলায়, পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েমের পর সে হিন্দুবিদ্বেষী হয়ে উঠেছিল। কোন নতুন চিন্তা, ঘটনাকে ভিন্নভাবে ভিন্ন কোণ থেকে দেখা, সমাজের নতুন কোন সমস্যা দ্বন্দ্ব সংঘাতের দিকে নজর কারা—সবকিছুকেই “পাকিস্তান রাষ্ট্রের চেতনা”, ‘“ইসলামী চেতনা’র” বিরোধী বলে ট্যাগ লাগিয়ে দমন নিপীড়ন, নিষিদ্ধ ঘোষণার পথে মোকাবিলা করা হয়েছিল। বাংলাদেশের বেলায়, বাঙালি জাতীয়তাবাদ আমাদের পাকিস্তানীবিদ্বেষী হতে বলছে। ‘পাকি’, ‘পাঞ্জাবী’, ‘সিন্ধী’ এসব শব্দে জাতিবিদ্বেষ ছড়িয়ে আমোদ জাগানোর চেষ্টা হচ্ছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বাইরে কোন নতুন চিন্তা, ঘটনাকে ভিন্নভাবে ভিন্ন কোণ থেকে দেখা, সমাজের নতুন কোন সমস্যা দ্বন্দ্ব সংঘাতের দিকে নজর কারা—সবকিছুকেই “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা” বিরোধী ট্যাগ লাগিয়ে দমনের পাকিস্তানী রাস্তা বেছে নিচ্ছে।

‘পাকি’’ বা ‘পাকিস্তানী’ বলে জাতবিদ্বেষ জাগিয়ে তোলার যারা চেষ্টা করেন তাদের পক্ষে যে যুক্তি তাকে পরীক্ষা করলে পাওয়া যায় তার সার বয়ানটা হলো, মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী রাষ্ট্র-সেনাবাহিনী নৃশংস অত্যাচার ধর্ষণ চালিয়েছে তাই।

এই বয়ানের ফাঁকির দিকটা হলো, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের ভূমিকা আমরা এখনো জ্বলজ্বলে স্মরণে রাখতে পারি, মাফ না করতে পারি কিন্তু এই সুযোগে আমাদের জাতিবিদ্বেষী রেসিস্ট হয়ে ওঠা ন্যায্য হয়ে যায় না। এমনকি পাকিস্তানের ভূমিকার কারণে যুদ্ধের ভয়াবহতা, বিভৎসতা দেখে কেউ যদি ট্রমাটাইজড হয়ে যান তখন বা এখন তবে সেই ট্রমার সাইকোপ্যাথিক চিকিৎসা করতে পারি। কিন্তু সেই ট্রমাকে মহৎ জ্ঞান করে মুকুট বানিয়ে আমরা নিজেদের স্বভাবে তা অন্তর্ভুক্ত করে নিতে পারি না, জাতিবিদ্বেষী রেসিস্ট হয়ে যেতে পারি না। বিভৎসতা দেখে আমাদের ঘৃণা জাগতে পারে, ট্রমাটাইজডও হয়ে যেতে পারি—এতদূর পর্যন্ত একটা স্তর। কিন্তু তা থেকে এবার জাতিবিদ্বেষী রেসিস্ট হয়ে ওঠা এটা দ্বিতীয় ধাপ—এর দায় যে হয়ে ওঠে তাঁর। ঘটনাচক্রে কোন ধর্ষণের ঘটনায় নারীর ট্রমাটাইজড হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। সে নারী এ থেকে পুরুষবিদ্বেষীও হয়ে যেতে পারেন। সমাজের দিক থেকে এ ঘটনায় মনোভাব হয় ঘৃণা, নিন্দা ও ধর্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তির। ধর্ষণের ঘটনার প্রত্যক্ষ পরোক্ষ কারণের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধের চেষ্টা করে। কিন্তু লক্ষ্যণীয় হলো, আমরা কেউ এজন্য সব নারীকে পুরুষবিদ্বেষী হয়ে উঠার জন্য তাগিদ দেই না। আবদারও করি না। করতে পারি না।

পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনে গৃহীত রাজনৈতিক পরিচয় ‘মুসলমান’ বিকৃত হয়ে ঐ রাষ্ট্রকে হিন্দুবিদ্বেষী রেসিস্ট এই জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল। আর বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র গঠনে গৃহীত রাজনৈতিক পরিচয় “বাঙালি” বাংলাদেশের অনেককে পাকিস্তানবিদ্বেষী রেসিস্ট জায়গায় নিয়ে গেছে।

গৌতম দাস: অনুবাদক ও প্রাবন্ধিক।

২৯ Responses -- “জাতীয়তাবাদী মনের অসুখ”

  1. Smritilekha

    আমার তো মনে হয়, আপনারা ভারত-বিদ্বেষী, ভারতকে নিয়ে সবসময় টেনশনে থাকেন। ভাবেন, ‘‘ওই ভারত আসছে….’’

    Reply
  2. akelamanush

    অসাধারণ লেখা। জাতীয়তাবাদ একটা অসুখের নাম। এই অসুখের আবিষ্কারকের নাম ম্যাকিয়াভেলি। মেহেরজান বন্ধ করে আমরা যে এ অসুখে তীব্রভাবে ভুগছি এর প্রমাণ দিলাম।অসাধারণ লেখা।

    Reply
  3. সালেহা বেগম রানী

    এই ছবির আলোচনায় জাতীয়বাদ শব্দটি কেন বার বার ঘুরে ফিরে আসে বুঝতে পারি না। এইটা তো কামনা বাসনার ছবি। ফ্রয়েডিয় ভাষায় বলতে গেলে অবচেতন কামনা। বুঝতে পারি গৌতম দাসরা জাতীয়বাদীদের ক্লীব ভাবেন। রমণীরা যখন তাদের বুক ‍উদম করে দেয় রমনে উন্মূখ পুরুষরা তখন তাতে সাধের আর্ট-এর আহ্লাদে ভেসে বেড়ায়। যুদ্ধের সময় নারী সস্তা, রমন সহজ, শান্তির সময় তাই অনেকে জাবর কাটতে পছন্দ করেন।

    Reply
  4. g85al

    ধন্যবাদ গৌতম দাস আপনাকে। লেখাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমি খুবই অল্প বয়সী একটা ছেলে। আমাদের দেশের রাজনৈতিক দল গুলাম জাতীয়তা বাদ নিয়ে আমার মনে অনেক খটকা। এক এক দল এক একটা বলে। আমার প্রশ্ন আসে মনে আমি আসলে কী। তাই আমি আমার দেশের ইতিহাস নিয়ে অনেক পড়ালেখা করলাম বিশেষ করে ১৭৫৭ সালের পর-এর ইতিহাস। এখনও আমি বুঝি নাই আমি কী। আবার আমি আমার অনেক পরিচয়ই পাইছি। আমার মনের অনেক প্রশ্নের উত্তর এখনও পাই নাই আর যা পাইছি সেগুলা নিয়ে একটা লেখা লিখছি আমি, আজ আপনার লেখার সাথে আমার লেখার অনেকটাই মিল খুঁজে পাইলাম কিন্তু সব প্রশ্নের উত্তর এখনও পাই নাই। সেটা হয়ত সম্ভবও না। কিন্তু সর্বোচ্চ যা জানতে পারি তাই ভালো। আমার প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমার আবেগকে স্থান দিই নাই আর যুক্তি, সত্য আর ইতিহাসকেই আমি আশ্রয় করেছি। তবে সঠিক ইতিহাস জানা অনেক কঠিন। ভালো থাকবেন।

    Reply
    • rony

      1757 er aager itihash bishesh kono dosh kore nai….ei je apni 1757 bachai korlen…etai ekta rajnoitik siddhanto. asha kori odiker itihashtao pore niben.
      apni khub olpo boyoshi chele bolar kono dorkar chilo na….ete kintu sondeho ta bere gelo aro.

      Reply
  5. raj sharma

    Too much nationality is always bad and brings frightening mentality. But on other hand, some degree of nationality can be inspiring to citizen.
    For example,(1) England does not allow immigrants who do not speak English. This is how they preserve nationality.
    (2) Including USA, many European countries do allow to build mosque using Arab style (with minarates). This is also an effort for nationality.
    (3)Uk inpsires citizen to obey the queen to presrve nationality. For many years the British have been united under that national ideas.

    There are many examples where nationality can be inspiring rather than rightness.

    But anyway This is good article. Religion can not be an element for natinality.It brings a divisions on people.

    More focus on both side would advisable.

    Tanks for your article.

    Reply
  6. r k rony

    লেখাটি এই মুহূর্তের রাজনৈতিক পর্যালোচনার চলতি বয়ানের-বাণিজ্যের জামাণায় অতি জরুরি ছিল । লেখককে ধ্যনাদ না দিয়ে আরও অগ্রসর ভূমিকা রাখার অনুরোধ করছি।

    Reply
  7. রোহান

    অসাধারণ একটি প্রবন্ধ। জাতীয়তাবাদী মনের একটি নতুন কিন্তু কদর্য চেহারা হাজির হল।
    আহমদ ছফা’র ‘বাঙালি মুসলমানের মন’প্রকৃতির লেখা মনে হয়েছে।

    প্রবন্ধের শুরু ‘মেহেরজান’ দিয়ে। ‘মেহেরজান’কে কেন জাতীয়তাবাদী দীঘল ছায়ায় বন্দী করে রাখা হলো তার খতিয়ান দিতে গিয়ে বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে হাল পর্যন্ত দীর্ঘ পথপরিক্রমা লেখকের জন্য কষ্টসাধ্য হলেও পাঠকের কাছে সুখপাঠ্য। এর কারণ লেখকের লিখার সরলতা নয়;বরং চিন্তার নৈবর্ত্তিকতা। তবে লিখার বড় একটা অংশে, উপসংহারেও মেহেরজানের হারিয়ে যাওয়াটা কাম্য ছিল না।

    লেখকের একটা টার্ম বুঝা গেলনা। উনি ‘রিকন্সট্রাকশন’ এর বাংলা করেছেন-বিনির্মাণ,আমার মনে হয় বিনির্মাণ শব্দটার ইংরেজি ‘ডিকন্সট্রাকশন। আর রিকন্সট্রাকশন এর বাংলা- পূনঃনির্মাণ।

    প্রবন্ধের শেষের বাক্যগুলোতে চিন্তার খোরাক আছে। লেখককে ধন্যবাদ।।

    Reply
  8. Istiaq Mujib

    After a long while read, touch and felt an impartial human interpretation of Bangalitto. Heat down salute to you and hope BD24 will more often gifted us your valuable views.

    Reply
  9. Ershad Mazumder

    ধন্যবাদ গৌতম দাস আপনাকে। লেখাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয়তাবাদ নিয়ে যারা গবেষণা করে তাদের কাজে লাগবে। জাতীয়তাবাদ নিয়ে আমাদের বাংলাদেশে নানা ধরনের কচকচানি আছে। এসব হলো রাজনৈতিক দল গুলোর স্বার্থপরতা ও দলবাজি। আপনার লেখার লক্ষ্য নিয়ে সবাই একমত নাও হতে পারে। দ্বিতীয় চিন্তা ও ভাবনা থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। আপনি নিশ্চয়ই মনে করেন না যে আপনার চিন্তাই শেষ চিন্তা। জতিসত্তা ভাষা স্থানিক রক্ত ভিত্তিকও হতে পারে। আধুনিক রাস্ট্রের সংজ্ঞা মোতাবেক জাতি হলে একটা রাস্ট্রের প্রয়োজন। শুধু ভাষা দিয়ে জাতি হওয়া যাবেনা। তাহলে আরবরা একটা জাতি হতে পারতো। কিন্তু হয়নি। ইংরেজী ভাষীরাও একটা জাতি হতে পারতা। কিন্তু হয়নি। সেখানে ইংলিশ আইরিশ ও ওয়েলস আছে। তারা সবাই মিলে ইউনাইটেড কিংডম ( ইউকে) বা গ্রেট বৃটেন হয়েছে। আমেরিকাতে বহু জাতি আছে। কিন্তু তারা সবাই মিলে আমেরিকান।

    Reply
    • rony

      “আধুনিক রাস্ট্রের সংজ্ঞা মোতাবেক জাতি হলে একটা রাস্ট্রের প্রয়োজন। শুধু ভাষা দিয়ে জাতি হওয়া যাবেনা।”

      আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না এই ধরনের সরলীকরন কোন ধরনের আলাপ থেকে উৎসারিত?
      ভাষাভিত্তিক জাতি ও জাতীয়তাবাদ উভয়ই রয়েছে। ব্যপারটা প্রেক্ষাপট আর আঞ্চলিক বিচিত্রতার উপর নির্ভর করে। এই লেখায় যতটা না জাতীয়তাবাদ নিয়ে তার চেয়ে বেশী উগ্র-জাতীয়তাবাদের উপর জোড় দেয়া হয়েছে।

      বাঙ্গালী জাতি ভাষাভিত্তিক। আপনার মত মানুষদের জন্য রাষ্ট্রের প্রয়োজন হয়ত খুব বেশি। কেননা তাহলে বলা সহজ হবে এই দেশ হবার আগে কোন জাতি ছিলনা। জাতি হয়ে উঠতে গিয়ে রাষ্ট্রের পত্তনকে অনেকেই সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখেন। শেষ পর্যন্ত হয়ত বলবেন এখানে কোন জাতি নাই, সবাই বাংলাদেশী। তাইত? তাহলে আপনার ‘কচকচানী’ থামান এবং আবার পড়ুন, কেননা লেখাটাই বুঝেন নাই আপনি।

      গ্রেট ব্রিটেনে কেউ বলে না আইরিশ জাতি বলে কিছু নাই, সবাই ব্রিটিশ; আর আমেরিকাতেও কেউ বিভিন্ন কমিউনিটির জাতিসত্ত্বাকে অস্বীকার করে বলে না সবাই আমেরিকান। জাতিসত্ত্বার পরিচয় আর রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিচয় এক নয়।

      এসব বিষয়ে দুনিয়ায় যথেষ্ট আলাপ হয়ে গেছে একাডেমি আর রাজনৈতিক অংগনে। সমস্যা হল উচ্চশিক্ষায় পিছিয়ে পড়া এই দেশে আপনাদের মত মানুষরা বেশ সহজেই হাস্যকর যুক্তি দিয়ে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের কথার যৌক্তিকতা প্রমান করতে চান ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে।
      করে যান। পৃথিবীতে হাস্য-রসের বড়ই অভাব !

      Reply
  10. Ananda Majumder

    একটি অসামান্য লেখা। এতো অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন লেখা খুব কম দেখা যায়। এই লেখা পাঠ, পর্যালোচনা ও সমালোচনার মধ্য দিয়ে আমাদের রাজনীতির নতুন ভাবধারা তৈরি যারা করতে আগ্রহী, তাদের জন্য ডিসকোর্স এই লেখায় আছে। লেখাটির প্রতিটি লাইন, স্তম্ভ নিয়ে এবং এর বুদ্ধিবৃত্তিক চলন নিয়ে নানাভাবে আলোচনার আশা রাখি। তবে এখন এই লেখার কিছু শব্দ আমার মধ্যে যে সহজাত উপলব্ধি বা আবেগ তৈরি করেছে, সে-ই শব্দগুলো নিয়ে আমার কথা লিখবো।

    শব্দ ১: মেহেরজান
    মুক্তিযুদ্ধে মুসলমানের ভূমিকা ও মেহেরজান
    রুবাইয়াত চলচ্চিত্রের স্পিরিচুয়্যালিটি নিয়ে অনেক কথার জাল বুনেছেন। কিন্ত ভালো করে জালে গাব দেয়া হয়নি। তার গাদ ফেলে দিলে কথার মর্ম দাঁড়ায়, প্রেক্ষাগৃহের মেহেরজান বাংলাদেশের কোনো গেরস্থ গৃহে আছে কি নাই, সে-ই ঐতিহাসিক খোঁজাখুঁজির দরকার নাই। এই চলচ্চিত্র মাইন্ডসেফিং বা হার্টসেফিং ভূমিকা নিচ্ছে, এটাই অনেকের জন্য সমস্যা। সমাজের উত্তরণের, দোমনাভাবের কাতরতা, সমাজে চিন্তাস্রোতের মধ্যে টানাপোড়ন, নারীর বেদনের নানা দিক ইত্যাদি ঘটনা ঘটে যাবার পরে আর কারো মনে থাকে না, ১৯৭১ সালের ন’ মাসের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যা ডক্যুওমেন্টশন হয়েছে (এবং যা হয়নি) সেখানে তো ঘটনার অন্তরালের অন্তঃস্থলের নানা দিক ধরা পড়বে না এটাই স্বাভাবিক। আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে আওয়ামী লীগের অভ্যুদয় মানে বাঙালী ও মুসলমান এরকম সোজাসাপ্টা নিষ্কণ্টক ভাগাভাগি হয় নাই। এই ছবির মহরত থেকে প্রিমিয়ার শো সর্বত্র আওয়ামীপন্থী বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের উপস্থিতি আমাদের নজর এড়ায় না। পাকিস্তানী মেজর ও মেহেরজানের মধ্যে ইশকের বয়ানে আমি ঢুকবো না। কারণ ঐ বিষয়ে যুদ্ধ, শিশ্ন-শিষ্ঠাচার, প্রেমের আচার অনাচার, দুখিনী নারীর বয়ানের মধ্যে পৌরুষ ও Phelluscentric সভ্যতার জেনিটাল উত্থান ও খোঁচাখুঁচি এবং সভ্যতার যে “কার্তিকওলানী” ব্যাধি এইসব কথার ভেতর আসবে, তবে প্রসঙ্গ মুক্তিযুদ্ধে মুসলমানের ভূমিকা।

    তার আগে একটুখানি বয়ান দরকার আছে। পয়লা তথ্য হলো, শিশ্নাস্ত্র সংক্রান্ত। এই পদ ব্যবহার না করে পারলাম না। পরে আরো ভালো শব্দ পেলে বদলাব। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে নারীকে টার্গেট বানানো হয়েছিলো। পাকিস্তানী বেয়াকুবগুলো… নারীর পেট থেকে যেন ভালো মুসুলমান বের হয়, তার জন্য বীর্য খরচ করার হুকুম জেনারেলরাই দিয়েছিলো। এটা স্রেফ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বাঙালী সুন্দরী ললনার যে স্বপ্ন করাচি বসে দেখা তার খায়েশ পূরণ নয়। নারীর উপর হামলা খুবই সুপরিকল্পত ছিলো। মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অসামান্য অবদানের রাজনৈতিক ও দার্শনিক অনুধাবনের উপর বাংলাদেশের নারী আন্দোলন দাঁড়াতে পারতো। নানা কারণে ও অনেক গভীর কারণে এটা হয়ে ওঠেনি।

    ২।বাঙালী প্রকল্প
    বাঙালী হিসাবে জন্ম নিয়েছি। এই ধ্রুব সত্য সংবিধানে লিখতে হল কেন? বুঝি না, তবে মেলা কারণ মাথায় এসেছে, কিলবিল করছে। আসলে পাকিস্তান আমলে আমরা মোসলমান হয়ে গিয়েছিলাম। এখন বাঙালী হতে হবে। এটা ধর্মনিরপেক্ষতার পরিপূরক শব্দ। কী ঘোরতর বিপত্তি! তা’হলে বাঙালীরা যুদ্ধ করলাম কোত্থেকে। যারা বলেছে, পাকিস্তান বাঁচলে ইসলাম বাঁচবে, তারাও তো বাঙালী। তা’হলে বাঙালী কন্সটিউন্সির বাইরে অন্য একটা কন্সটিউন্সি আছে। সেটা ইসলাম। আমরা বাঙালী–আর কিছু নই, তা-ই সেটা লিখিত-পঠিত, একেবারে কালি-কলমে খাঁটি করে লেখা ভালো। সংবিধান তো সব কন্সটিউন্সির প্রতিনিধিত্ব করে না। যেমন, একাত্তরের পরাজিত শক্তিকে করে না। ঐ শক্তির প্রধান অংশ ইসলামের নামে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের বিরোধিতা করেছে। তা-ই পরাজিত শক্তির “ইসলামী জাতীয়তাবাদী” রাজনীতির প্রতি মোক্ষম জবাব হল, বাঙালী জাতীয়তাবাদ। অন্য সব জাতিসত্তা গোল্লায় যাক। ১৯৭১ সালে কি আমরা বাঙালী জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করেছিলাম? একেবারেই না। আমরা যে কত ঘোরতর বাঙালী সেটা তো পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠি সব সময়ই বলে আসছে। সে-কারণেই তো রক্ত ঝরালাম। রবি ঠাকুরকে অর্জন করলাম। সে-ই জন্যই তো ১৯৭১ সালে ওরা আমাদেরকে একেবারে ইসলাম থেকে খারিজ করে দিয়ে “হিন্দু/মালাউন” বানিয়ে হত্যা করলো। তার মানে হল এই বাঙালীত্বের জন্য তো আমরা এই সংগ্রাম করি নাই। তা’হলে বাঙালী জাতীয়তাবাদ কথাটা গঠনতন্ত্রের মধ্যে ঢোকানোর রাজনৈতিক প্রয়োজন কী? আছে, এবং আমার মনে হয়, দুইটা বা তিনটা কারণ আছে। পয়লা কারণ, সকল বাঙালীকে এই রাষ্ট্রের অংশীদারিত্ব দিয়ে গৌরবান্বিত ও মহিমা দান। দ্বিতীয় কারণ ভয়ঙ্কর। ইসলাম বাঙালী মুসলমান বাঙালী সংক্রান্ত ফ্যাসিবাদি রাজনীতি, ঘোরতর সাম্প্রদায়িক রাজনীতি। একটা উদাহরণ দেই সাহিত্য থেকে। বাঙালী মুসলমান সাহিত্যিকরা অনেক ভাল, প্রাণজুড়ানো গদ্য লিখতেন। কারণ, তারা বাঙালী মুসলমানের মুখের ভাষায় লেখার চেষ্টা করতেন। রবি ঠাকুরও বাংলাকে সংস্কৃতের হাত থেকে বাঁচিয়ে গদ্যের এক নয়া ধারা তৈরি করেছেন। স্বাধীনতার কিছুকাল আগ থেকেই বাংলাকে বিশুদ্ধিকরণের জন্য আরবি, ফারসি সব শব্দ ঝেটিয়ে বিদায় করা হল। বাংলা গদ্য তার সুষমা ও লালিত্য হারালো। এর রাজনৈতিক মানে হলো, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াইকে ইসলামের বিরুদ্ধে একটা প্রকল্প আকারে খাড়া করা হল। নয় মাসেও কি মুসলমানরা পরীক্ষা দিয়ে [বাঙালীর পরীক্ষা] পাশ দিতে পারেনি। আমরা যে বাঙালী এটা কার কাছে প্রমাণ করছি! কার কাছে প্রমাণ করছি যে আমরা বাঙালী। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন তার মর্মের দিক থেকে একটি স্বাধিকার, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের জন্য জাতীয় উপাদানের দিকে আমাদের নজর ফিরিয়েছে। লোকসমাজের চিরকেলে অভ্যাস, ভাব, বিশ্বাস, মায়া-মহব্বত, আত্মীয়তা, সম্পর্ক, গান–সব একটা রাজনৈতিক পরিমণ্ডল পরিগঠনের জন্য পুঞ্জিভূত হওয়া শুরু করল। এটা স্বাভাবিক। এটা প্রয়োজন ছিলো। সবাইকে রাজনৈতিক করে তুলে একটা রাষ্ট্র পরিগঠনের প্রাথমিক পর্যায় এভাবেই তৈরি হয়। জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটে। কিন্তু কেউ দুনিয়ার কোথাও এটা লিখে রাখে না। বুকে ব্যাজ লাগিয়ে ঘুরে বেড়াতে হয় না এটা প্রমাণ করার জন্য যে, ভাই আমি মানুষ। আমি বাঙালী। তা’হলে এতো চিকন বুদ্ধির লোকেদের মাথায় এটা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারটা মগজে ঢোকার কারণ কোন হালকা ব্যাপার নয়। আজকে যখন সংবিধান সমীক্ষা করার কথা উঠছে, এর নানা সংশোধনীর একটা নৈতিক ও আদালতী ব্যাখ্যা পাচ্ছি, তখন সব খতিয়ে দেখা দরকার। বোঝা দরকার ১৯৭২ সালের সংবিধানের গাঠনিক উপাদান (যা বাক্যে প্রকাশ) কী, কোথা থেকে এলো? কত নড়বড়ে এই ঘর। এই কিতাবের বাতেনি দিকগুলো কীভাবে মতাদর্শিক বাগাড়ম্বতার তলায় লুকিয়ে আছে।

    যুদ্ধের অনুপ্রেরণা ছিলো এই যে, পাকিস্তানী জুলুম আর পরাধীনতার জিঞ্জির ছিঁড়ে বাঙালীরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতে যাচ্ছে। এটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হবে। এটি একটি কন্সটিউশ্যনাল রাষ্ট্র হবে। এটা শুধু পাকিস্তান রাষ্ট্রকে দুইভাগ করা নয়। এইটা একই কমলার দুই অংশ নয়। ওটা আপেল হলে আমরা বহুকোষবিশিষ্ট কমলা। আরেকটা মূল যে বৈশিষ্ট্য থাকবে এই রাষ্ট্রের সেইটা হল–এটা মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা শক্তি (সামাজিক ও রাজনৈতিক অর্থে), যারা লড়াই করেছে এবং জিতেছে–যারা প্রাণ দিয়েছে, যাদের সংসার তছনছ, ছত্রখান হয়ে গেছে, যাদের জীবন নতুন প্রাণশক্তির সন্ধান পেয়েছে, তাদেরকে এই রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদার করা। যুদ্ধের ন’ মাস সামাজিক শক্তির মেরুকরণ ও কেন্দ্রীভবনের এক অনন্যসাধারণ নয় মাস। ১৯৭০ সালের নির্বাচন দিয়ে বিচার করলে চলবে না। একটা বিমূর্ত বাঙালীয়ানার ভাব দিয়ে এই বিভক্তি, বিভাজন, যুদ্ধের মধ্য থেকে চিন্তার নানা স্রোতকে একই প্রবাহের দিকে, একই মোহনায় লুকিয়ে ফেলার জন্যি বেহুদা একটা বাঙালী প্রকল্প খাড়া করা হল। বাঙালী জাতীয়তাবাদী প্রকল্পটি একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রকল্প। এটা এমন নয় যে, আবেগে নিজেকে মহান বাঙালী বলছি। এটা এমনও নয় যে, বাঙালী হিসেবে, অর্থাৎ রাজনৈতিক সত্তার সর্বোচ্চ অভিপ্রকাশ হিসাবে যে রাষ্ট্রটা বানাচ্ছি সেখানে একটা আগামি দিনের সাংস্কৃতিক, জীবনাচারগত ও অপরাপর সকল জাতিগোষ্টির সাথে পার্থক্যসূচক সগৌরব ঘোষণা। এটা একটা ভাবাদর্শের কথা বলা হচ্ছে যার গোড়া ধরে এখন টান দেবো। তাতে যা হবার হবে। কপালে যদি জঙ্গি অভিধাও জোটে, অসুবিধা নাই।

    গোটা পাকিস্তান আমল জুড়ে পূর্ববঙ্গের সাংস্কৃতিক যে আন্দোলন, তার কেন্দ্রীয় চরিত্র হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তারো দোষ নাই। যে বাংলা ভাষার জন্য আমরা আন্দোলন করেছি, সে-ই বাংলা ভাষার তিনি ‘বিশ্বকবি’। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া যে বাঙালীর অস্তিত্ব অসম্ভব–সে-ই রবীন্দ্রনাথকে, যিনি বাংলা ভাষাকে প্রাণময় করেছেন এবং বঙ্কিম থেকে সহজ করেছেন, আমাদের উচ্চারণের যে আড়ষ্টতা আগে দাঁতে দাঁতে বাড়ি খেতো, মুখ তিতা হয়ে যেতো তা থেকে তিনি আমাদেরকে মুক্তি দিয়েছেন, তাকে পাকিস্তানীরা ব্যান্ড করল। এখন রবীন্দ্রনাথকে সাহিত্য আকারে আত্মস্থ না করে জীবনধারা আকারে প্রবর্তনের জন্য ১৯৪৭ সালের আগে যারা কলিকাতায় শিল্প, সাহিত্য, পত্রিকায় লেখালেখি, নাটক, দু’চার লাইন গান শিখেছেন তারা উঠে পড়ে লাগলেন পশ্চিম বাংলার দাদাদের কাছে এটা প্রমাণ করার জন্য যে আমরাও বাঙালী হিসাবে কম নই। রবীন্দ্রনাথের জোয়ারে ১৯৫২ সালের পর থেকে সব ভেসে যাওয়া শুরু করল। বাংলার লোকায়ত যা কিছু চর্চা, তা-ও বেছে বেছে। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, ঐ সময়টায় এই বাঙালরা (পূর্ব) জানলো যে, এতদিন তারা পুরা বাঙালী ছিল না, বাঙালী সত্তায় অপূর্ণতা রয়ে গেছে। তা-ই নতুন চর্চা, নতুন অনুশীলনের দরকার। পূর্ববাংলায় ১৯৪৭ সাল থেকে বা তারও আগে থেকে (বহু আগ থেকেই) ‘হিন্দু’রাই বাঙালীর সত্যিকারের প্রতিনিধি আকারে স্বীকৃত ও অধিষ্ঠিত ছিল। বাঙালী মুসলমানদের মধ্যে এই অনুধাবন তৈরি হয়েছিল যে, তাদের জীবনে বাঙালীয়ানার উপস্থিতি চরমভাবে কম। কিন্তু সীমান্তের বাঙালীরা, কৃষক, গেরস্থ বাড়ির মানুষদের, ফারায়েজি ও তিতুমীরের এলাকার লোকজন, আঁরা চাটগাইয়ারা বুঝে উঠতে পারছিলাম না আমরা এই বাঙালীর নবজাগরণের সাথে কীভাবে খাপ খাওয়াবো। এই পূর্ব বাঙলার বাঙালদের বঙ্গীয়করণ প্রক্রিয়ার ঢেউ গ্রামবাঙলাকে একদমই স্পর্শ করতে পারে নাই। গ্রামের বিদ্যালয় পর্যন্ত গিয়ে আছাড় খেয়ে ফিরে এসেছে। স্কুল মাস্টার পুরাতন কংগ্রেসীরা তবুও এই নবজাগরণ কিছুটা এগিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু এই জাগরণ যারা “ইতিমধ্যেই বাঙালী” তারা রাজনৈতিক মতাদর্শিক ভাবে মুসলিম লীগের মধ্যে নিজেরদেরকে অন্তত প্রকাশ্যে খাপ খাওয়াতে পারছিলেন না। আইয়ুবী শাসনামলে ব্যাপকভাবে মাস্টার মশাইরা ভারতে পাড়ি দিতে বাধ্য হলেন। বাঙালীর এই প্রকল্প অন্তত গ্রামাঞ্চলে মুখ থুবড়ে পড়লো। ইতিমধে অনেকেই গান শিখে গেছে, বাঙালী হবার সহজ পথও জেনে গেছে। কিন্তু মুশকিল হল, যে কৃষক হাঁস-মুরগি বেচে, ছেলেকে ছেলে ঠুস-ঠাস ইংরেজী বলে আর গ্রামবাংলায় (পুরা দেশ গ্রামই ছিলো) যে সংস্কৃতির সাথে পরিচয় ছিল, তা ভুলে গিয়ে, তাকে লোকজ বলে অবজ্ঞা করা শুরু করলো। বাংলার ভাব, বিশাল কাব্য ও গীতিকবিতার পরিমণ্ডল, জালাল খাঁর কবিতা, কবিদেরকে ঘিরে দর্শন ও ভাব চর্চার যে ‘সক্রেটিয়ান ধারা” সব কিছুই রবীন্দ্রনাথের ঔজ্জ্বল্যের ছায়ায় ম্রিয়মাণ করার জন্য যেন উঠে-পড়ে লাগলো। কিংবা এটাই হয়ে উঠল একটা রাজনৈতিক ধারার সাংস্কৃতিক প্রকাশ। যে ধারার ইসলামকে মোকাবেলা করতে হয়েছে নিজের অস্তিত্ব জাহির বা আত্মপ্রকাশের জন্য এছাড়া আর কোন পথ তার সামনে নাই। বাঙালী মধ্যবিত্ত এই ধারাকে আপন ভাবা শুরু করল। কিন্তু এই ধারার–যা মুসলিম লিগের গর্ভজাত–কিছু রক্তধারা তার শরীরেও প্রবহমান। বাঙালী পুঁজিপতি শ্রেণী তখনও গড়ে ওঠেনি। বাংলার পাট আর ধানচাষীরা এদেরকে সমর্থন দিল। এর অন্য কারণও ছিলো। গ্রামবাংলায় ক্ষমতাসম্পর্ক বদলে গেছে। গ্রামের জোতদার ও মুসলিম লিগের সম্পর্ক আর খামিরা থাকছে না।

    ৩। ফ্যাসিজম, রেসিজম ও দায়খালাসের বাঙালী
    বিরাট প্রশ্ন তুলেছেন। প্রশ্নের হা-এর মধ্যে জাতিগত শ্যোভেনিজম (বাঙালী জাতীয়তাবাদ) থেকে উদ্ভূত সকল ধরনের ফ্যাসিবাদের বিষয়টি আছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের যে স্বতঃস্ফূর্ত ধারা তার মধ্যে এমন এক জাতীয়তাবাদের বীজ নিহিত ছিলো, যার পরিসমাপ্তি মুক্তিযুদ্ধে ঘটে নাই। ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্রে আছে অন্য সব ভাষাকে দমন ও শ্রেষ্ঠত্ব জাহিরের বাঙালী নামক এক রাজনৈতিক প্রকল্পের দৌরাত্ম্য। আমাদেরকে সামনে-পেছনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করতে গিয়ে সাবধান হতে হয় কখন বাঙালীরা আক্রমণ করে বসে।

    ১৯৭১ সালের পর থেকে একুশে ফেব্রুয়ারির সাথে জনগণের সম্পর্ক ক্ষীণ হতে থাকে। প্রথমত, আমরা একটি ভাষাভিত্তিক জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৭১ সালে জাতীয় সংগ্রাম করি নাই। এটা অন্তত আমার (আমাদের) রাজনৈতিক প্রকল্প হতে পারে না। শেখ সাহেবের হুংকার আর তার ও তার পরিবারের দাসত্ব করার জন্য ১৯৭১ সালে এত মানুষ আত্মাহুতি দেয় নাই। পশ্চিম পাকিস্তানীদের সাথে আমাদের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ছাড়া আমাদের আর কোন গতি ছিলো না। যখনই হতো, এটা ঐতিহাসিক অনিবার্যতা আকারে হাজির হতোই।
    প্রতি বছর একুশ এলে আমরা ভীষণভাবে বাংলাভাষা প্রেমিক হয়ে যাই। বাংলার জন্য জান কোরবান করার শপথ নেয় একদল অতি অসংস্কৃত (বিভিন্ন দলের লেজুড়) সংস্কৃতিকর্মী। তাদের যন্ত্রণায় জনগণের কান ঝালা-পালা। তারা বাংলার পক্ষে মাতম তোলেন। অন্য ভাষাভাষীদের ভাষার প্রতি তারা এমনই উদাসীন যে, চাকমা স্কুল ছাত্রদেরকে গ্রেফতার করতেও দ্বিধা করেন না। ভাষা আন্দোলনের মর্ম কথা তো এটাই যে, প্রতিটি ভাষাগোষ্ঠি তাদের ভাষার অধিকারের জন্য লড়াই করবে। রাষ্ট্র অন্য ভাষাভাষীদের উপর নির্যাতন করবে না। কিন্তু এই রাষ্ট্র প্রতিদিন নিজের ভাষাকে বলাৎকার করছে।

    ভাষার জন্য লড়াই আমাদের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত পৌঁছাবার একটি উপাদান মাত্র। বাঙালী জাতির জাতীয়তাবাদ নামে যে রাজনীতি হাজির করা হলো, তা একদিকে ভয়ানক ফ্যাসিস্ত হয়ে উঠলো আওয়ামী লীগের পাল্লায় পড়ে। এই রাজনীতি বাঙালীর মধ্যে আসন গাড়তে পারলো ‘প্রগতিশীল’ রাজনৈতিক ধারার (যা কিছুই ছিলো) আওয়ামী লীগে আত্মসমর্পণ করা ও ভাসানিকে এক প্রকার গৃহবন্দি করার মধ্য দিয়ে। ১৯৭১ সালের পর শেখ সাহেব দেশে ফিরে এলেন বাঙালীর মহাজাগরণের পটভূমিতে। তিনি বাঙালীর বাপ হয়ে গেলেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম, সমতলের আদিবাসীসহ সবাইকে ‘বাঙালীকরণ’ করার ভয়ংকর রাজনীতিতে মেতে উঠলেন। ভাষাকে কেন্দ্র করে যে মাতম ২১ শে তে ঘটে, তার লেশমাত্র সারা বছর দেখি না। কিন্তু সারা বছর দেখি অন্য ভাষাগোষ্ঠির উপর দমন-পীড়ন।

    রাজনীতি যা কিছু বর্তমান, যা দৃশ্যমান–ঘটে চলেছে–কেবল সেই বিষয় না, যা ঘটতে পারে এবং ঘটাতে হবে সে-ই সব বিষয়ও। মার্ক্স হেগেলের গুরু-শিষ্য তর্ক ধার করে নিয়ে বলা যায় “what exists in accordance with the Idea” [117]–ভাবে কী বিরাজে তার খোঁজ করা। এই নিরিখে বাঙালীর নবজাগরণের যাকে জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম বলা হয় তার রাজনৈতিক পটভূমির রাজনৈতিক পর্যালোচনা দরকার। সে-ই পর্যালোচনার জন্য জানবাজি রাখা দরকার, হিম্মত দরকার। বাঙালীর সচেতন ও স্বতঃস্ফূর্ত উত্থান, নিজের সম্পর্কে হুঁশ ফিরে আসা, পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠির দমন-পীড়ন, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে পাকিস্তানীদের একাধিপত্য, এই অঞ্চলের ভাষা-ভাব ও সংস্কৃতির প্রতি অনীহা, সব কিছুকে হিন্দুত্বের মোড়কে ঢাকা ইত্যাদি সকল কারণ (দেশ বিভাগের সময় ও তারপর আইয়ুব আমলে বাঙালী হিন্দুদের দেশত্যাগ) সব মিলিয়ে যে ঘটনাবলী–তার উপাত্ত ও উপাদান নিয়ে একটি বাঙালী প্রকল্প খাড়া করা হলো। এই বাঙালী প্রকল্পের সারকথা হলো বাঙালী মোসলমানকে বাঙালী হতে হবে, পাকিস্তানীদের ইসলাম রক্ষা ও মুসলিম বানানোর বিপরীতে। দুই ভয়ঙ্কর আমাদের কাঁধে চেপে বসলো। এক ভয়ঙ্কর আরেক ভয়ঙ্করকে মোকাবিলা করছে। বামপন্থিরা মাঝখানে বসে দুই কুকুরের কামড়াকামড়ি দেখছে। আর দুই কুকুর বাংলার মানুষের লাশ নিয়ে টানাটানি করছে।

    তাই আত্ম পরিচয়ের সংকট নিয়ে এখনো রাজনীতি চলছে। বাঙালীর জাতীয় চেতনা বা যে কোন চেতনা সম্পর্কে আমাদের শোধ-বোধ নাই, এটা ধরে নিয়ে ১৯৪৮ সাল শুরু। পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলার দাবির ন্যায্যতা নিয়ে কোন প্রশ্ন নাই। কিন্তু যে বাঙালী প্রকল্প এখনো চলছে তা-ই নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। ইতিহাসকে ঘাড়ে-গর্দানে, ঘেঁটিতে ধরে সবসময় জল খাওয়ানো যায় না। আমরা যারা কর্তাসত্ত্বা রূপে মিছিলের সামনে বুক টানটান করে, বন্দুকের নল উপেক্ষা করে এগিয়ে যেতে চাই, তারা ইতিহাসের সকল দায় মোচনের মওকা পেলে বোধ হয় তা-ই করতাম কিন্তু সে কি সম্ভব? বাঙালী মোসলমানের বাঙালীত্ব প্রমাণের যে নিষ্ঠুর প্রয়াস–তার দায় কে নেবে! বাঙালী মুসলিম কমিউনিস্ট হয়ে প্রমাণ করেছে, মুক্তিসেনা হয়ে বীরের মতো প্রমাণ দিয়েছে, সে বাঙালী।

    এখন বলা হচ্ছে এবাদত-বন্দেগি বন্ধ করে দিয়ে, ঈমান-আমান সব ত্যাগ করে “সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে” মার্কিনীদের যুদ্ধের পক্ষাবলম্বন করে আরেকবার প্রমাণ কর–বাঙালী। আমি যে মুসলমান এবং আমার ঈমাম যে আবু হানিফা–যার সঙ্গে আগে জন্ম হলে মহান সক্রেটিসের মোলাকাত হতো–সে-ই কথা বলা না-জায়েজ ঘোষণা করেছে মার্কিনিরা, ইজরাইলিরা আর বিলাতি রাজনীতিবিদদের একাংশ। আমার এবাদত যদি বন্ধ হয়ে যায়, আর জগত যদি হয়ে ওঠে দারুল হরব–তবে রবুবিয়াতের রাজনীতির মর্মের ও মাহাত্ম্যের নবনির্ঘোষ–নব আওয়াজ বিনিমার্ণের যে কাজ সেটি আমরা করবো। যেখানে এবাদত সেখানেই মহব্বত। এবাদত কেবল পরোয়ারদিগারের কছে আত্মসমর্পণ নয়, সৃষ্টির জন্য করুণাময় আরতি। পার্থক্যজ্ঞান বা ভেদজ্ঞান–যা মানবেতিহাসের সকল প্রাণিকূলের এমনি এমনি আছে–সিদরাতুল মুন্তাহার–খুবই জরুরি। কেবলা আর কবর আজাবের ইসলাম নয়, জব্জা আর জিকিরের ইসলাম নয়, আমি রাজনৈতিক অর্থে ইসলামের কথা বলছি।

    Reply
    • rony

      সংবিধানে জাতিগত পরিচয় আর ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে যা এসেছে ১৯৭২ সালে তা মূলত বামপন্থী রাজনীতির চাপে পড়েই করা হয়েছিল। ইদানীংকার নবীন বামরা অবশ্য “ক্রিটিকাল” ভাবনায় মগ্ন হয়েছেন। সাথে যুক্ত হয়েছে আলী শরিয়তী হয়ে ওঠার খায়েশ। তাই আবার সেগুলোর সমালোচনাও হচ্ছে। সময়-সময় এরকম উগ্র অবস্থান না নিলে ভালো হত।
      সন্ত্রাসবাদের সমস্যা আর এর মোকাবেলার উপায় নিয়ে যতদিন না আমরা নিজেরা ভাবিত হব ততদিন এর নীরব বিকাশ ঘটেই যাবে। সবকিছুই মার্কিনীদের সমস্যা হিসেবে দেখলে কি হবে? মানবাধিকার বিষয়টা নিয়েও একই কথা শুনি। অবাক হই না কেন এদেশে অধিকার পরিস্থিতি খারাপ। কেননা বিষয়টা এখনো পশ্চিমা বিষয় হিসেবেই দেখছে অনেকেই।
      ইসলাম আর মার্ক্সবাদের সংমিশ্রন এখনকার নতুন বামদের ফ্যাশন। সন্দেহ নেই পড়তে ভালোই লাগে।

      Reply
  11. আজমল হোছাইন

    পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনে গৃহীত রাজনৈতিক পরিচয় ‘মুসলমান’ বিকৃত হয়ে ঐ রাষ্ট্রকে হিন্দুবিদ্বেষী রেসিস্ট এই জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল। আর বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র গঠনে গৃহীত রাজনৈতিক পরিচয় “বাঙালি” বাংলাদেশের অনেককে পাকিস্তানবিদ্বেষী রেসিস্ট জায়গায় নিয়ে গেছে।”গৌতম দা, আপনার কথা ঠিক আছে। কিন্ত একটা প্রশ্ন হল, মেহেরজান সিনেমার পরিচালক কিন্ত মুক্তিযুদ্ধ নিয় সিনেমা বানিয়েছে। কাজেই ওই সিনেমায় যা দেখানো হয়েছে তা ওই সময়ের ঘটনা বলে দর্শকরা ধরে নেবে। সে হিসাবে একটা ধর্ষিতা মহিলা ধর্ষক সারি থেকে কাউকে প্রেমিক হিসাবে বেছে নেবে তা হয় না। এই ভুল সে অবশ্যই করছে। সে যতই বলুক গবেষণা থেকে পেয়েছে। এখানে তার একটা সমস্যা রয়ে গ্যাছে।
    দুই নম্বরে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়া সিনেমা বানোনোর জন্য আরও অনেক ভাল কাহিনী ছিল, আছে। পরিচালক তার কোনটাই বেছে নেয় নাই। সে কেন একটা Pakistani soldierকে মহত বানাতে গ্যাল। অথচ দেখা গ্যাছে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যত সিনেমা তৈরি হয়েছে ওইসব সিনেমায় এমন কাউকে নায়ক বানানো হয় নাই যিনি একজন বীরশ্রেষ্ঠ ছিলেন। খুবই আশ্চর্য এসব সিনেমায় যতসব outlandish কাহিনী বেছে নেয়া হয়েছে। যারা মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে নিজের পরিচয় ধারণ করতে পারবে না তাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সিনেমা বানানোর দরকার নাই। তারা সাকিব খান আর সাবনুরকে নিয়ে বস্তীর ছেলে কোটিপতি সিনেমা বানাক। ওইসব সুশীল সিনেমার চাইতে এইগুলা অনেক ভালা সিনেমা।

    Reply
    • Istiaq Mujib

      Mr. আজমল হোছাইন, I don’t understand your point of critical view. I feel sorry when you say “খুবই আশ্চর্য এসব সিনেমায় যতসব outlandish কাহিনী বেছে নেয়া হয়েছে।(You have right to say) যারা মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে নিজের পরিচয় ধারণ করতে পারবে না তাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সিনেমা বানানোর দরকার নাই। (That’s not right, you can’t say)”. Who am I or some one to dictate a creator/artist what way s/he would inspire him/her to create or express him/herself? I may not like any ones creation so I won’t watch it but I can’t ask for to stop it. Do I ? This is a undemocratic view, fanatic and against the free will of expression.

      Reply
      • রোহান

        Mr. Azmol’s it-will-never-work like criticism is the outcome of an unfertile critical faculty.’যারা মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে নিজের পরিচয় ধারণ করতে পারবে না তাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সিনেমা বানানোর দরকার নাই’ it is a cheap comment. What will you say when any foreign director wants to make a movie on Bangladesh’s Liberation War? Will s/he identify himself/herself with the spirit of Bangladeshi liberation War ? A movie is a form of art- so the evaluation should also be on an artistic stand. You can talk about the movie’s artistic excellence or failure, not about the director’s political views whatsoever.
        Thanks

      • আজমল হোছাইন

        you become frustrated to read my comment. But War of liberation is turning point for our nation as a Bangladeshi, So when we made a art film on the premise of মুক্তিযুদ্ধ। we have to abide by the history of War of liberation. We have no right to corrupt our history of War of liberation. we can’t do it.

    • FreakyFact

      সহমত। মেহেরজানের মতো একটি সিনেমাকে এতো গুরুত্ব দেবার কিছু নেই। শৈল্পিক বিবেচনায় এটা তো একটি অখাদ্য সিনেমা। এটিকে নিয়ে এতো তাত্ত্বিক তকমা কেন লাগানো হচ্ছে তা বোধগম্য নয়।

      তবে লেখকের মেহেরজান সিনেমার এ্যাডকেসিটুকু বাদ দিয়ে বাকি আলোচনা এবং থিসিস ভাল লেগেছে। মেহেরজান টেনে আনায় বা সেটিকে সামনে রেখে আলোচনা এগোনোর কারণে লেখাটি একটু যেন কম গুরুত্বের হয়ে গিয়েছে।

      Reply
      • Zaman

        I cannot agree with you. Look, this cinema (may be trash)paves the way to positive thinking. May be, its a platform & we are going to thinking more deeply and positively about our cultural existence. I am very much delighted to read some more writing….just waiting

  12. shibu

    আপনি মেহেরজান দেখছেন? মিথ্যা কথা বইলেন না? যদি হাচা কথা কন তাইলে কই… আপনেরা যারা মেহেরজানের নামে তর্ক করতেছেন সেইটা একটা স্টান্টবাজি। এইগুলি করলে নিজের নাম হয় আমরা খানিকটা বুজি। আপনেরা অঅঅঅঅনেক সিরিয়াস ভাবে ফালতু বিষয় নিয়া মাথা ঘামান এইটা আবার প্রমাণিত হইল। আমার মনে হয় মেহেরজান ব্যান না হইলে আপনেই এর বিরুদ্ধে লেখতেন। এহন ভারি ভারি কথা না কইয়া ছবিটা আবার দেহেন। রুবাইয়াতের কাছে তো ছবিটা আছে। যাই হোক আপনার আর আমার তফাৎটা হইল আমি পর্নোগ্রাফি দেখি কম্পিউটারে লুকায়া। আর আপনে পর্নোগ্রাফি দেখতে চান বড় পর্দায় সদলবলে। মেহেরজান একটা পর্নোগ্রাফি। আপনের লগে গলা মিলাই জাতীয়তাবাদ, পাকিস্তানবিদ্বেষী রেসিস্ট, ইত্যাদি কথার ছলে আসেন আমরা আমাদের পর্নোগ্রাফি দেখার অধিকার নিয়া আওয়াজ তুলি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আপনের কাছে ফালতু বিষয় কিন্তু গোটা জাতির কাছে অনেক বড় বিষয়। আমিন!

    Reply

Trackbacks/Pingbacks

  1.  মেহেরজান প্রসঙ্গে ব্লগ ও অন্যান্য মাধ্যমে প্রকাশিত লেখার আর্কাইভ | নীড়পাতা
  2.  জাতীয়তাবাদী মনের অসুখ « goutamdas

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—