Feature Img

habiburআধুনিক সাংবাদিকতার জন্ম মুদ্রণযন্ত্রের কল্যাণে। ১৪৫৬ সালে গুটেনবার্গ বাইবেল প্রকাশিত হওয়ার পর মুদ্রণ-যোগাযোগ মিলন হিসেবে আবির্ভূত। মিশনারিদের হাতে তা দেশে দেশে বিকাশ লাভ করেছে। আমাদের দেশেও।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালের মুদ্রণ ও প্রকাশনা আইন এবং ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সীমিত করে। ১৯৭৫ সালে একদলীয় রাষ্ট্র্রপতি শাসিত সরকার পদ্ধতি প্রবর্তনের পর রাষ্ট্রীয় মালিকানায় প্রকাশিত চারটি সংবাদপত্র ছাড়া অন্যসব সংবাদপত্রের প্রকাশণা নিষিদ্ধ হয়। ১৯৭৫ সালের আগষ্টে সরকার পরিবর্তনের পর সংবাদপত্রে স্বাধীনতা পর্যায়ক্রমে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিশেষ ক্ষমতা আইন এবং মুদ্রণ ও প্রকাশন আইনে সংশোধন করে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে অনেকখানি অবারিত করে। ১৯৯৮ সালের প্রেস ইনস্টিটিউটের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, মাত্র ১২ শতাংশ পাঠক প্রকাশিত খবর বিশ্বাসযোগ্য মনে করে এবং ৫৫ শতাংশ পাঠক মনে করে পত্রিকাগুলোর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে।

২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ ফৌজদারি কার্যবিধি (সংশোধন) বিল পাস হয়েছে। সংশোধনীতে মানহানিকর সংবাদ প্রকাশের অভিযোগ করা মামলায় কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সরাসরি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির বিধান বাদ দেওয়া হয়েছে। ফৌজদারি আইনে জামিনযোগ্য মামলায় সাধারণত ওয়ারেন্ট জারি হয় না; সমন জারি হয়। কিন্তু মানহানি-সংক্রান্ত ধারায় জামিনযোগ্য মামলা হলেও ওয়ারেন্ট জারির ক্ষমতা ছিল। এটি করা হয় ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে কোনো সংবাদ পরিবেশন যেন না করে এ পথ বন্ধ করার জন্য। বর্তমানে মানহানি-সংক্রান্ত মামলায় সমন জারি করাই যথেষ্ট। কারও বিরুদ্ধে সমন জারি হলে আদালতে এসে জামিন চাইতে পারে। কিন্তু সরাসরি ওয়ারেন্ট জারি করে হেনস্তা করার প্রয়োজন নেই। এখন সাংবাদিক, লেখকের ওপর রাজনৈতিক হয়রানি করার সুযোগ কমে যাবে। সাংবাদিকেরাও নির্বিঘ্নে সত্য খবর প্রকাশ করতে পারবেন। এই সুযোগে পত্রপত্রিকায় মিথ্যা ও বানোয়াট সংবাদ পরিবেশনের সুযোগ বেড়ে যাবে কিনা এখন তা দেখা যাবে।

একটি প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে একটা সাংবাদিক সংগঠন গড়ে তোলা ব্যতিক্রমী ব্যাপার বলতেই হবে। তবে তার পরের প্রশ্ন হচ্ছে সেই প্রতিষ্ঠানটি কী। সেটি একটি শিক্ষাঙ্গন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাঙ্গন। সে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। যাকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কায়েমী স্বার্থবাদীরা মক্কা বিশ্ববিদ্যালয় বলতো। সেই বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু সকল অশুভ ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা প্রমাণিত করে টিকে গেছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কী হয় কী করে বা কী করে না তা অনুসরণ করার চেষ্টা করে দেশের অন্যসব বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। ১৯৪৭-এ এটি জাতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। এখান থেকে সাংস্কৃতিক ও স্বাধীনতা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। এখানে ভাষা আন্দোলনের শুরু। এই চত্বরেই স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হয়। এবং দখলদার সেনারা টার্গেট করে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাবী শিক্ষক ও ছাত্রদের খুন করে। এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে ভাষা আন্দোলনের সময় শহীদ হন বরকত ও অন্যান্যরা। এখানেই মুক্তিযুদ্ধের অন্তিমকালে শহীদ হন আমার শিক্ষক সন্তোষ কুমার ভট্টাচার্য, আমার সহপাঠী আবুল খায়ের, আমার ছাত্র গিয়াসুদ্দিন আহমেদ ও আরো অনেকে যারা আমাদের সকলের শ্রদ্ধার পাত্র। এই প্রাঙ্গনে স্বৈরাচারী বিরোধী আন্দোলনের সময় শহীদ হন ড. মিলন।

তারপর এই প্রাঙ্গণে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর প্রথম একুশে ফেব্রুয়ারি ঘটে উদ্দাম উচ্ছৃঙ্খলতা ও নারী নির্যাতন। এখানেই মহসিন হলে ঘটে নৃশংস হত্যাকান্ড। ব্রিটিশ আমলে স্কুলেও পুলিশ ঢোকার আগে প্রধান শিক্ষকের অনুমতি প্রার্থনা করতো। এখন এই প্রাঙ্গণে পুলিশের ফাঁড়ি আছে। তবু শান্তি লঙ্ঘিত হচেছ বারবার। দুর্বৃত্তরা শাস্তি পায় না, বুক ফুলিয়ে হাঁটে।

এখানেই আবার প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। দেওয়ালে দেওয়ালে পোস্টার বলে ‘সামরিক শাসন উঠিয়ে নাও’। পাশেই আর এক পোস্টারে লেখা থাকে সামরিক শাসন কেউ উঠিয়ে নেয় না, তুলে ফেলে দিতে হয়। এই প্রাঙ্গনে আলো-অন্ধকার সত্য-মিথ্যা আশা-হতাশার নানান পরিবর্তন আমরা দেখেছি। এই প্রাঙ্গণের প্রতি আমাদের ভালোবাসা ও আস্থা এখনো অটুট আছে।

Reporters Sans Frontiers-এর ২০১০ সালের ranking অনুযায়ী সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো দেশ ফিনল্যান্ড। এ ranking-য়ে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের অবস্থান যথাক্রমে ২০ ও ১৯, বাংলাদেশ রয়েছে ১২৬তম অবস্থানে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে আছে পাকিস্তান (১৪১তম) ও শ্রীলংকা (১৫৮তম)। সবচেয়ে এগিয়ে থাকা মালদ্বীপ ৫২তম।

দেশে তথ্য অধিকার আইন প্রবর্তিত হয়েছে। এর সীমারেখা ও গভীরতা ধীরে ধীরে উন্মোচিত হবে। নাগরিকের বাকস্বাধীনতা ও প্রেস স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে পড়বে যদি না তথ্য আহরণের কিছু স্বাধীনতা না ভোগ করে। দেশের আইন, নিরাপত্তা ও প্রেস স্বাধীনতার মাঝে একটা সামঞ্জস্যপূর্ণ ভারসাম্য রক্ষার জন্য সাংবাদিকদের সচেষ্ট থাকতে হবে। অযথা অস্থিরতা বৃদ্ধির জন্য সাংবাদিকরা স্কুপ করবেন না। সাংবাদিকতাসহ বহু মর্যাদাপূর্ণ পেশার যে গুণগত অবনমন ও স্খলন ঘটেছে তার প্রতিরোধে সাংবাদিকরা আত্মমর্যাদার সঙ্গে যে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন তার জন্য আমি তাদেরকে মোবারকবাদ জানাই। গণতন্ত্র, আইনের শাসন, সামাজিক ন্যায়বিচারের মৌল নীতির প্রতি আমাদের অবিচল আস্থার জন্য আমরা আবেগে সোনার বাংলার কথা বলি এবং স্বপ্ন দেখি সুখী বাংলাদেশ গড়ার। সেই লক্ষ্যে সাংবাদিকদের সাহসিকতার সঙ্গে আত্মনিবেদন প্রত্যাশা করি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে পঠিত বক্তৃতা।

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান :  ১৯৯৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা।

Responses -- “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাংবাদিকতা”

  1. Azim

    অসংখ্য সালাম শ্রদ্ধেয় প্রিয় বিচারপতি হাবিবুর রহমান সাহেব। আমি আপনার লেখা যখনই পাই তখনই পড়ি। নিজের অজান্তে অপেক্ষা করি আপনার লেখার জন্য। সাধাসিধে কথা সবসময় সাধাসিধে মানুষের ভালো লাগে। আবারো অপেক্ষায় থাকলাম কখন আপনি লিখবেন।

    Reply
  2. Aminul Islam Sujon

    স্যার, চমৎকার বলেছেন। বরাবরই বলেন। গণমাধ্যম সমাজের দর্পন হিসাবে পরিচিত ও পরিগণিত। তাই গণমাধ্যমকে স্বচ্ছ থাকতে হয়। সঙ্গত কারণে গণমাধ্যমের উদ্দোক্তা ও সংবাদকর্মীদের সৎ হতে হয়। কারণ, সৎ না হলে স্বচ্ছ থাকা যায় না।
    দুঃখজনক, আমাদের অধিকাংশ গণমাধ্যমের উদোক্তা সম্পূর্ণ ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য নিয়ে এবং ব্যবসা প্রসারে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহারকল্পে সংবাদপত্র, রেডিও-টিভি চ্যানেল প্রকাশ/প্রদর্শন/শ্রবণানুষ্ঠান করে যাচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় জীবিকার অনিশ্চয়তায় সংবাদকর্মীরা প্রায় নিরুপায়।

    Reply
  3. Ershad Mazumder

    লাখো ধন্যবাদ ও সালাম শ্রদ্ধেয় প্রিয় বিচারপতি হাবিবুর রহমান সাহেব। আপনার বক্তব্যের সাথে আমি একশ’ ভাগ একমত। এমন একটি বক্তব্য পেশ করার জন্যে আপনাকে প্রাণঢালা অভিনন্দন জানাচ্ছি। এ রকম মত প্রকাশ করে আপনি দীর্ঘজীবী হোন।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—