Feature Img

আমার অন্যান্য লেখালেখির যে বুদ্ধিবৃত্তিক মেজাজ, আরগুমেন্ট বা কাউন্টার আরগুমেন্ট, তথ্য-উপাত্তের বাড়াবাড়ি এবং একটা একাডেমিক ফুটনোটিং-এর প্রবণতা, এ নিবন্ধটি তা থেকে চরিত্রগত, কন্টেন্টগত এবং উপস্থাপনাগতভাবে সামান্য তফাতে লেখা। কেননা, এটা যতটা অভিজ্ঞতা-লব্ধ (এম্পিরিক্যাল), ততটা বিশ্লেষণধর্মী (অ্যানালাইটিক্যাল) নয়। যদিও এম্পিরিক্যাল তথ্যের প্রয়োজনীয়তাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়; কেননা অভিজ্ঞতাই মজবুত জ্ঞান কিংবা মৌলিক জ্ঞানের পাটাতন তৈরি করে। তাছাড়া, আমি সবসময় মনে করি ব্যক্তির অভিজ্ঞতার একটা সামষ্টিক তাৎপর্য আছে; ফলে এর একটা সামাজিক গুরুত্বও আছে। কেননা ব্যক্তি সমাজবিচ্ছিন্ন সত্তা নন। ব্যক্তিক অভিজ্ঞতা মূলত সমাজের বিদ্যমান ব্যবস্থার এক ধরনের ক্রিটিক্যাল রিফ্লেকশন।

এ লেখার মূল নিশানা হচ্ছে, যে কোনো ধর্মীয় উৎসব একটি বিশেষ ধর্ম-সম্প্রদায়ের একার বা নিজস্ব কোনো ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান হিসেবে না দেখে ধর্ম-নির্বিশেষ একটা জায়গা থেকে দেখা যায় কিনা তা বোঝার চেষ্টা করা। পাশাপাশি, ধর্ম যে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান (কালচারাল ইনস্টিটিউশন), যা তার আচার-অনুষ্ঠানের ভেতর দিয়ে প্রতিভাত হয়, সেটা উপলব্ধির চেষ্টা করা। ভূমিকা হিসেবে এটাই কাফি!

|| দুই ||

২০১২ সালে জার্মানিতে অবস্থানকালে বেশ মজা করে ‘ক্রিসমাস ডে’, বলতে গেলে ‘ক্রিসমাস-উইক’, পালন করেছিলাম। তখন আমি সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছিলাম:

“সব ধরনের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের একটা সর্বজনীন চরিত্র আছে। দুর্গাপুজা আমার কখনও-ই হিন্দু সম্প্রদায়ের একার অনুষ্ঠান বলে মনে হয়নি। তেমনি ঈদের অুনষ্ঠানও আমার কখনও-ই মুসলমানদের একার ধর্মীয় অনুষ্ঠান মনে হয় না। এবার ইউরোপে এসে দেখছি, ক্রিসমাস আমার নিজেরই একটি উৎসব বলে মনে হচ্ছে এবং আমি সপরিবারে অত্যন্ত আনন্দ ও আন্তরিকতার সঙ্গে ক্রিসমাসের আনুষ্ঠানিকতা উদযাপন করছি।

২৪ তারিখ সন্ধ্যায় [ক্রিসমাস ইভ] ক্রিসমাসের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেছি। আগামীকাল ক্রিসমাস-দিন উদযাপন করব। আসলে ধর্ম এবং ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা একজন কীভাবে নেবে সেটা নির্ভর করছে তার সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক গড়নের উপর। তাই হয়তো বলা হয়, ‘শিক্ষিতের [স্বশিক্ষিত] ধর্ম হচ্ছে তার সংস্কৃতি, আর অশিক্ষিতের [ধর্মান্ধদের] সংস্কৃতি হচ্ছে তার ধর্ম‘। জগতের সকল ধর্মান্ধতা নিপাত যাক। সবাইকে ক্রিসমাসের শুভেচ্ছা।”

[রাহমান নাসির উদ্দিন, ফেইসবুক স্ট্যাটাস, ডিসেম্বর ২৫, ২০১২]

ধর্ম যে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান যা তার আচার-অনুষ্ঠানের ভেতর দিয়ে প্রতিভাত হয়, সেটা উপলব্ধির চেষ্টা করা
ধর্ম যে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান যা তার আচার-অনুষ্ঠানের ভেতর দিয়ে প্রতিভাত হয়, সেটা উপলব্ধির চেষ্টা করা

আমার এই যে ক্রিসমাস পালন করবার আনন্দ এবং অভিজ্ঞতা সেটা কেবলই একটি ইউরোপীয় সমাজে বসবাস করবার কারণে কিনা সেটা আমি পুরোপুরি নিশ্চিত নই। তবে এভাবে ‘ক্রিসমাসে ডে’ পালন করাটা আমার তরফে যতটা না ছিল ধর্মীয় ভাবনা, ততোধিক ছিল ক্রিসমাস-কেন্দ্রিক উৎসবের অংশীদারিত্ব। ঠিক তখনই বালকবেলার কথা ‘কান টানলে মাথা আসে’ তত্ত্বের হাত ধরে আলোচনার টেবিলে এসে হাজির হয়।

আশির দশকের কথা। কক্সবাজারে তখন বেশ ধুমধাম করে দুর্গাপুজার আয়োজন হত; এখনও হয়। কক্সবাজারের বিশাল সমুদ্রসৈকতে বিরাট আয়োজনে সমুদ্রের বিস্তৃত জলরাশিতে প্রতিমা বিসর্জনের দৃশ্য দেখা, সে উৎসবে অংশ নেওয়া এবং সে অনুষ্ঠানের অভিজ্ঞতা আমার জীবনের সুন্দরতম অভিজ্ঞতাগুলোর অন্যতম।

বালকবেলায় আমার উৎসব ছিল তিনটি, রোজার ঈদ, কোরবানির ঈদ আর দুর্গাপুজা। দুর্গাদেবীর বিসর্জনের আগে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে পুজার আয়োজন দেখা, দুর্গাপুজা-কেন্দ্রিক বহুমাত্রিক উপসনার রিচ্যুয়ালস উপভোগ, নানান সুরেলা ভজনা-সঙ্গীত কিংবা রাতভর ঠাকুরের প্রার্থনা সঙ্গীত শোনা এবং ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো, একত্রে খাওয়া-দাওয়া, নতুন জামা কেনা, নিজেদের মধ্যে উপহার আদান-প্রদান ইত্যাদি আমাদের বাৎসরিক উৎসব-জীবনের অংশ ছিল।

সত্যিকার অর্থে, বালক বয়সের সে আয়োজনে এবং উৎসবের অংশীদারিত্বে হিন্দু-মুসলিমের দ্বি-ধর্মীয় সত্তার ধারণা কোনোভাবেই মাথায় কাজ করত না। হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যকার ধর্মীয় বিভেদরেখা তখনও এতটা দৃশ্যমান ছিল না, যা এখন আছে। এখন মনে হয়, যখন নাবালক ছিলাম হয়তো তখন অনেক সেক্যুলার ছিলাম, কিন্তু যখনই সাবালক হতে শুরু করলাম, তখন আর সেক্যুলার থাকলাম না বা থাকতে পারলাম না।

যখন বিদ্যা-বুদ্ধি বাড়তে থাকল, শিক্ষা-দীক্ষা বিস্তারিত হতে থাকল, তখনই হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যকার ফারাক বুঝতে শুরু করলাম। মনে হচ্ছে, শিক্ষা আমাকে অধিকতর সম্প্রদায়িক বানিয়ে দিয়েছে! মনে হচ্ছে শিক্ষার প্রসার আমাদের অযুত বছরের প্রাকৃতজনের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার অসাম্প্রদায়িক চেতনা ক্রমান্বয়ে সংকুচিত করে দিচ্ছে।

এটা একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে শুরু করল যখন খোদ রাষ্ট্র ‘সাবালক’ হতে শুরু করল। আজকে যে বিভিন্ন পুজামণ্ডপে দেবীর মূর্তি ভাঙার ঘটনা ঘটে, এটা হচ্ছে আমাদের সমষ্টিগত সাবালকত্বের ফসল, কিংবা আমাদের রাষ্ট্রীয় সাবালকত্বের সাক্ষাৎ প্রতিফল।

|| তিন ||

বেশ কয়েক বছর ধরে পুজা আর কোরবানির ঈদ অনেকটা কাছাকাছি সময়ে বা প্রায় একই সঙ্গে হচ্ছে। ফলে ঈদের ছুটি আর পুজার ছুটি একসঙ্গে পালিত হচ্ছে। উৎসবের আয়োজন, অংশগ্রহণ এবং আনন্দ-ভোগও কমবেশি একসঙ্গেই হচ্ছে। এটা শুভ লক্ষণ। কিন্তু অশুভ ঘটনাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। মূর্তি ভাঙা, মন্দির ভাঙা, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের উপর অত্যাচার, ভূমি-দখল এবং নানান-মাত্রিক সামাজিক-রাজনৈতিক বঞ্চনার ঘটনাও সমান্তরালে ঘটছে কিংবা ক্ষেত্র-বিশেষে ক্রমবর্ধমান।

তাই ঈদ এবং দুর্গাপুজা ঘিরে সর্বজনীনতা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাম্প্রদায়িকতার আলোচনা এখন বিশেষ মনোযোগের সঙ্গে হতে পারে।

দুর্গাপুজা কেন ‘সর্বজনীন দুর্গোৎসব’, এটা নিয়ে টুকটুাক কিছু লেখাজোঁকা চোখে পড়ে। মামুলি এবং কিছু পপুলার লেখালেখিও আছে কিন্তু ‘দুর্গাপুজা’ ও ‘সর্বজনীতা’র ধারণা কীভাবে এবং কবে থেকে একসঙ্গে উচ্চারিত হয়, কীভাবে দু‘টি শব্দ একসঙ্গে জুড়ে দিয়ে ‘সর্বজনীন দুর্গোৎসব’ শব্দবন্ধ ধারণ করেছে, কবে থেকে বাঙালি সমাজে এবং বাংলাদেশে এ উৎসব চালু হয়েছে, তা নিয়ে গভীর চিন্তাজাত গবেষণা এবং একাডেমিক লেখালেখি খুব একটা দৃষ্টিগোচর হয়নি।

কোন সময় থেকে দেবী দুর্গার পুজা শুরু হয় তা নিয়ে বিতর্ক আছে। চণ্ডী’র ব্যাখ্যা অনুযায়ী, রাজা শুলথ এবং সমাধি বৈশ্য প্রথম দেবী দুর্গার আরাধনা শুরু করেন মেধসমুনীর প্রার্থনালয়ে, যা বর্তমানে চট্টগ্রামের কানুনগো পাহাড়ে ‘মেধসমুনীর আশ্রম‘ নামে পরিচিত। চণ্ডী‘র এ কাহিনীতে সুর্নির্দিষ্ট সন-তারিখ উল্লেখ নেই।

উৎসবের আয়োজন, অংশগ্রহণ এবং আনন্দ-ভোগও কমবেশি একসঙ্গেই হচ্ছে, এটা শুভ লক্ষণ
উৎসবের আয়োজন, অংশগ্রহণ এবং আনন্দ-ভোগও কমবেশি একসঙ্গেই হচ্ছে, এটা শুভ লক্ষণ

কিছু কিছু জনপ্রিয় ইতিহাস বাজারে জারি আছে। যেমন এটা মোটামুটি সবাই, বিশেষ করে যারা এসব বিষয়ে খোঁজ খবর রাখেন, জানেন এবং মানেন যে, মোঘল আমলে ১৬০৬ সালের দিকে বাদশা’র উৎসাহে প্রথম সর্বজনীন শারদীয় দুর্গোৎসব শুরু হয় রাজশাহীর তাহেরপুরের রাজা কংশনারায়ণের উদ্যোগে। তাছাড়া প্রায় একই সময়ে নদীয়ার জমিদার ভবানন্দ মজুমদারও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার ভেতর দিয়ে সর্বজনীন দুর্গোৎসবের আয়োজন করেন বলে জনসাধারণ্যে প্রচলন আছে।

শারদীয় দুর্গাপুজার আচার-অনুষ্ঠানের মূল ভিত্তি হচ্ছে দেব-দেবতাদের বিচরণ এলাকার স্বর্গরাজ্যে হানা দেওয়া অশুভ শক্তি ‘অসুর’। তার ভয়ে দেব-দেবতারা পালিয়ে বেড়াতেন। অনেকে তাকে হত্যা করবার চেষ্টা করেও সফল হতে পারেননি। ‘অসুর’ দম্ভ করে বলতেন, ‘কোনো পুরুষের পক্ষে আমাকে হত্যা করা সম্ভব নয়’। এক সময় তার গভীর তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে দেবতা ব্রহ্মা তাকে এ অমর ‘বর’ দিয়েছিলেন। কিন্তু বর পেয়ে ধীরে ধীরে তার আসল চেহারা বেরিয়ে পড়ে, বরের বলে ক্রমান্বয়ে বদ হয়ে উঠে ‘অসুর’।

স্বয়ং ব্রহ্মা তাতে বিব্রত বোধ করেন কিন্তু বর-অর্পণের নিয়ানুযায়ী নিজের দেওয়া বর ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। অন্য দেবতাদের সঙ্গে পরামর্শ করে তিনি ঠিক করলেন, নারী শক্তি দিয়ে ‘অসুর’ বধ করবেন, যেহেতু তাকে কোনো পুরুষ হত্যা করতে পারবে না। নারীরূপে দুর্গার আগমন তখনই। আশ্বিন মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশী তিথিতে দেবীর আবির্ভাব। শুক্ল দশমীতে ‘অসুর’ বধ করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন তিনি।

দুর্গাপুজার আদি সময়কাল মূলত বসন্তের শেষ দিকে বা চৈত্র মাসে (মার্চ-এপ্রিলের দিকে), তাই একে বলা হয় ‘বাসন্তী পুজা’। এখনও সেটা হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত আছে। শরৎকালে বা অকালে দেবী দুর্গাকে ডেকে পুজা (শব্দান্তরে বোধন) দেওয়া হয় বলে শারদীয় দুর্গাপুজাকে ‘অকালবোধিনী’ও বলা হয়। কী কারণে চৈত্র থেকে শরতে এ উৎসব আয়োজনের সময়কাল সময়ান্তরিত হয়েছে, তার কোনো সঠিক সর্বজন-গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। হিন্দু মিথোলজিতে, বিশেষ করে ‘রামায়ণ’ এ, কেন শরৎকালে দুর্গাপুজার উৎসব হয় তার একটা ব্যাখ্যা আছে।

‘রামায়ণ’ এর বয়ান অনুযায়ী, শরৎকালের দুর্গাপুজার প্রচলন শুরু হয় রামচন্দ্রের সময় থেকে। রাবণের কাছ থেকে বন্দি সীতাকে উদ্ধার করতে যাওয়ার আগে রাম দুর্গাপুজার আয়োজন করেছিলেন। তখন ছিল শরৎকাল। এই শরৎ থেকেই শারদীয়।

হিন্দু মিথোলজিতে আরেকটি বয়ানে বলা হয়েছে যে, বন্দি সীতাকে উদ্ধার করতে গিয়ে রাজা রামচন্দ্র একটা বিশাল সমুদ্রের মুখোমুখি হন, যেটা পার হওয়া তার জন্য অসম্ভব হয়ে উঠে। যখন তিনি আশাহত হয়ে পড়ছিলেন, তখনই সমুদ্রের দেবতা (কারও কারও মতে স্বপ্নে!) দেখা দেন। দেবতা পরামর্শ দেন, যদি মহাদেবী দুর্গাকে ১০৮ নীলপদ্ম দিয়ে পুজা করে সন্তুষ্ট করা যায়, তবেই এ সমুদ্র পার হওয়া সম্ভব।

তখন রাজা রামচন্দ্র বহু কষ্টে ১০৭ নীলপদ্ম জোগাড় করতে পারেন। একটি নীলপদ্মের জন্য তার আশা অপূর্ণ থেকে যাবে, তাই তিনি নিজের চোখের (তাঁর চোখের মণি ছিল নীল) মণি খুলে দেবীর জন্য পুজা দিতে উদ্যত হলে, দেবী সন্তুষ্ট হয়ে রামচন্দ্রর আশা পূর্ণ করে নদী পার করে দেন। তখন থেকেই দেবীকে শরৎকালে পুজা দেওয়ার রেওয়াজ চালু হয়।

ধর্মীয় ব্যাখ্যা যাই থাক-না-কেন, দীর্ঘদিনের আনুষ্ঠানিকতা, সে আনুষ্ঠানিকতায় ধর্ম-নির্বিশেষ সাধারণ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আন্তরিক অংশগ্রহণ এবং বাঙালি সংস্কৃতির যে উৎসবপ্রবণতা তার ধারাবাহিকতায় শারদীয় দুর্গোৎসব বিশেষ ধর্ম ছাপিয়ে একটা সর্বজনীন সাংস্কৃতিক চরিত্র ধারণ করেছে। এ যেন বাংলার বর্ণিল ঋতুবৈচিত্রের সুবিশাল ক্যানভাসে একটি ধর্মনিরপেক্ষ সর্বজনীনতার সম্প্রীতির আল্পনা। এটি চরিত্রগতভাবেই একটি প্রকৃতির উৎসব; কেননা ঋতু মেনে তিথি গুণে বার মাসে তের পুজার হাত ধরে এ উৎসবের আয়োজন করা হয়।

|| চার ||

গ্রামীণ সমাজের ব্রাত্যজনের জীবনে ধর্ম যেমন একটি সাংস্কৃতিক উৎসব, তেমনি সে উৎসবে সকল ধর্মের মানুষের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণের ভেতর দিয়ে ধর্মীয় উৎসবই হয়ে উঠে প্রকারান্তরে সর্বজনীনতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতীক। কিন্তু শহুরে নাগরিক মধ্যবিত্তের জীবনে বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় উৎসব-কেন্দ্রিক নানান সাম্প্রদায়িক আচার চালু আছে। এ সাম্প্রদায়িকতা বিস্তারের ক্ষেত্রে মিডিয়ার একটা ভূমিকা আছে।

উৎসবে সকল ধর্মের মানুষের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণের ভেতর দিয়ে ধর্মীয় উৎসবই হয়ে উঠে প্রকারান্তরে সর্বজনীনতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতীক
উৎসবে সকল ধর্মের মানুষের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণের ভেতর দিয়ে ধর্মীয় উৎসবই হয়ে উঠে প্রকারান্তরে সর্বজনীনতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতীক

বাংলাদেশের দ্রুত বিকাশমান মিডিয়ার একটা বিশেষ চরিত্র হচ্ছে এ ধরনের ধর্মীয় উৎসবগুলো কাভার করার ক্ষেত্রে, এগুলোকে যতটা ‘সাম্প্রদায়িক উৎসব’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, ততটা এর ‘সর্বজনীন’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ জায়গা থেকে নয়। যেমন, বৌদ্ধ ধর্মের বিশেষ দিনে সংবাদপত্রগুলোতে বিশেষ নিবন্ধ লিখেন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজন। একইভাবে খ্রিস্টানদের বড়দিনের উৎসবে যেসব বিশেষ নিবন্ধ ছাপানো হয়, সেগুলো লিখেন খ্রিস্টানরা। মুসলমানদের উৎসব অ্যাড্রেস করা হয় কোনো হুজুর বা মাওলানা দিয়ে। সমভাবে, হিন্দু সম্প্রদায়ের দুর্গাপুজা কেন্দ্র করে বিশেষ নিবন্ধ লিখবেন হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যক্তি।

হয়তো এর একটা গুণগত দিকও আছে; কেননা পপুলার ধারণা হচ্ছে ‘যার ধর্ম সেই অধিকতর ভালো লিখতে পারে’ এবং তাই এই নীতিমালা অনুসরণ করা। কিন্তু সেটা সবসময় সত্য নয়। মুসলমানদের পবিত্র কোরআনের প্রথম বাংলা অনুবাদকারী ছিলেন একজন হিন্দু যার নাম গিরিশচন্দ্র সেন। তাই এ যুক্তি এখানে টেকে না। আমি মনে করি, এটা মিডিয়ার একটি সাম্প্রদায়িক পলিসি। দুর্গাপুজা নিয়ে আমার এ লেখা তাই এ ধরনের সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তির বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিবাদ।

উৎসব-কেন্দ্রিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের যে রীতি আমাদের দেশে চালু আছে তা-ও চরমভাবে সাম্প্রদায়িক। কারণ জেনে কিংবা না-জেনে, সচেতন কিংবা অচেতনভাবে সমাজের সকল সম্প্রদায়ের একটা বড় অংশের মানুষ সাম্প্রদায়িকতার সুক্ষ্ম কিছু বিষয় অনুশীলন করে যা মূলত আমাদের সর্বজনীনতাবোধ ও ধর্মনিরপেক্ষতার দর্শন খাটো করে দেয়। সমাজের প্রতিষ্ঠিত রীতি হিসেবে আমরা দেখি– ইদানিং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সূত্রে বিষয়টি আরও দৃশ্যমান হয়েছে– শারদীয় দুর্গাপুজার শুভেচ্ছা জানাবেন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ, মেরি ক্রিসমাসের শুভেচ্ছা জানাবেন খ্রিস্টানরা আর ঈদের শুভেচ্ছার মালিক-মোখতার মুসলিম সম্প্রদায়, কিন্তু এটা কেন?

আমরা নিজেদের অসাম্প্রদায়িক বলে জাহির করব, ভরা মাহফিলে ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসম্প্রদায়িকতার ঢোল বাজাব, আর অচেতন মনোজগতে সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তি লালন করব, তা হয় না, হতে পারে না। এটা এক ধরনের আত্মপ্রতারণা যা আমাদের শুভেচ্ছা-বিলানোর সংস্কৃতি থেকে প্রতিভাত হয়।

সব উৎসবের আকাঙ্ক্ষা হোক, জগতের সকল সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তি নিপাত যাক। সবাইকে উৎসবের শুভেচ্ছা।

রাহমান নাসির উদ্দিননৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Responses -- “ধর্মনিরপেক্ষতা ও উৎসবের সর্বজনীনতা”

  1. R. Masud

    যে ব্যাপার যত বেশি অযথা স্পর্শকাতর, সেই ব্যাপারটি থেকে দূরে থাকার একমাত্র উপায় হল, তা উপড়িয়ে ফেলা। যেমন ধরুন, মানুষের দাঁত আর মানুষের সমাজ দিয়ে বিচার করলে, এই ইহুদি জাতটার কথাই ধরুন না কেন– জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত এই (প্রায়) ৩৫০০ বছরে কম করে হলেও তিন তিন বার (ব্যাভিলিয়নের রাজের হাতে, রোমান রাজের হাতে, তারপর হিটলার দিয়ে) প্রায় মূল থেকে তুলে দিয়ে নিপাত করার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রতিবারই এদের নিজেদের সংস্কারের প্রতি ‘অতিবেশি’ স্পর্শকাতর ভাব দেখানোটাই ঐ সবের জন্য দায়ী, ইতিহাস বলে।

    আজকাল আমরা মুসলমানরা কি ‘অতিবেশি’ স্পর্শকাতর নই (?) আমাদের নবী, ধর্ম কিম্বা ইসলামের খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে? একটুতেই আমাদের অনুভূতিতে আঘাত লেগে যায়। ভয় হয়, ‘অতিবেশি’ স্পর্শকাতর হয়ে, ঈহুদি কিম্বা দাঁতের মতো অকালেই বিলীন হয়ে যাই কিনা। তার নমুনা তো পাচ্ছি, একজন বিধর্মী যতজন মুসলমান মারছে, তার থেকে ৫ গুণ বেশি মারছি আমরা মুসলমানরাই অন্য মুসলমানকে– ইসলামরক্ষার জন্য আমরা বোমা বানিয়ে নিরপরাধ মানুষ খুন করার কাজে আমাদের এনার্জি খরচ করছি।

    ভয় হয়, সবশেষে আসা সবচাইতে উত্তম ধর্মটা আমাদের (মুসলমানদের) ভুলের জন্যই সবার আগে এই ধরণী থেকে বিদায় নেয় কিনা!!!

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—