Feature Img

chanchol-fফেব্রুয়ারির বইমেলা শুরুর আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। এর সঙ্গে প্রতিধ্বনির মতো বারবার আছড়ে পড়ছে বেদনাদায়ক কিছু প্রসঙ্গ। যেমন লেখক-প্রকাশক সম্পর্ক, বাংলা একাডেমীর দায়িত্বশীলতা, মেলার পরিবেশ, প্রতিদিনের গৎবাঁধা, হাস্যকর ও অর্থহীন আলোচনার অনুষ্ঠান ইত্যাদি। এত কিছুর পরও এই মেলা বাংলাদেশের লেখকসমাজের জন্য অনেকটা তীর্থের মতোই: পুকুরের চতুর্দিকে লেখকরা ঘুরে বেড়ান, তবে শয়তানের উদ্দেশে পাথর ছোঁড়ার কাজটি হয় না। আগতরা সম্ভবত নতুন-নতুন বই আর বন্ধুদের পেয়ে শয়তানের কথা ভুলে যান। তাছাড়া কে শয়তান? কারা? শয়তান তো পুরো মেলা ঘিরে থাকে। অনুভব করলেও, তাতে যন্ত্রণা বোধ করলেও লেখকরা অসহায়; তবে প্রকাশের আনন্দে সারা মাস তারা এই অসহায়ত্ব টের পান না। ফলে, শয়তানকে ঢিল মারাও হয়ে ওঠে না সম্ভব।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কালে ‘চক্র’ শব্দটির বেশ ব্যবহার ঘটছে; এক সময় শব্দটি ছিল খুব সদর্থক, গঠন ও শৃঙখলাবাচক; যেমন ‘জীবনচক্র’, ‘ক্রীড়াচক্র’, ‘পাঠচক্র’ ইত্যাদি। কিন্তু যেদিন থেকে এটি পাকস্থলির সঙ্গে জড়াতে লাগল ‘চা-চক্র’র মধ্য দিয়ে, সেদিন থেকে এর পতনশীল অর্থের পরিসর উন্মুক্ত হতে থাকল। আজ ‘প্রকাশক’ শব্দটিও জড়িয়ে গেছে ‘চক্র’ শব্দটির সঙ্গে; এটি উচ্চারণমাত্র ওই নিন্দাসূচক ও গভীর নঞর্থক শব্দটি জেগে ওঠে এবং লেগে থাকে। বেশ আগে থেকেই লেখকরা চক্রটির কাছে অসহায়। মানসম্পন্ন লেখকরাও এদেশে প্রকাশকদের টাকা দেন বই বের করার জন্যে। বিনিময়ে তাকে কিছু বই অবশ্য দেয়া হয়; আর যা রয়ে যায় প্রকাশকের কাছে, তার হিসাবটা কী, ক’টাই বা বিক্রি হলো, জানার অধিকার ও উপায় কোনোটাই লেখকের নেই। কারণ লেখকের সাথে নেই কোন চুক্তিপত্র। বেশ আগে থেকেই প্রকাশনা ব্যবসা এক রকম পাটোয়ারি কারবারের মতোই; এখন এটা রূপ নিয়েছে ধাপ্পাবাজিতে। এবং ধাপ্পাটা চলে সমাজের সবচেয়ে অগ্রসর অংশের সঙ্গে।

রয়্যালটি চাইতে গেলে প্রকাশকের কাছ থেকে যে-বাক্যটি শুনতে লেখকরা মোটামুটি অভ্যস্ত, তা এই, ‘বই বিক্রি হয় নাই।’ তা হলে বইগুলো কোথায় গেল? কোন নক্ষত্রমণ্ডলে হারিয়ে গেল? বিক্রি যদি না-ই হলো, প্রতিষ্ঠানটি কেন প্রতি বছর বাংলা একাডেমীকে টাকা দিয়ে স্টল নেয়? কেন বই বের করে যাচ্ছে বছরের পর বছর? প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো কি স্বেচ্ছাসেবায় মুহ্যমান?

টাকা দিয়ে ছাপানো বইয়ের একটি সাধারণ ছবি হচ্ছে প্রকাশক এগুলোর বিপণনে তেমন আগ্রহী নয়। ফলে এগুলোর বিক্রির ব্যাপারটিও মহাজাগতিক। একটা চোরাগোপ্তা কিছু নিশ্চয়ই আছে। আর যারা টাকা ছাড়া বই ছাপার সুযোগ পান, তাদের যন্ত্রণা অন্যরকম। তাদের তো জানার অধিকারই নেই, কতো কপি বই ছাপা হয়েছে, বিক্রি হয়েছে কতো। কোনো কোনো প্রকাশক অবশ্য সেই হিসাব জানিয়ে লেখকদের বেশ ধন্য করে থাকেন। কিন্তু এই জানা কেমন জানা, তা তো ভুক্তভোগীরা জানেনই। এক প্রকাশক আমার কবিতার বই ছেপে আমাকে ধন্য করেছিলেন। রয়্যালটি নয়, ক’টি বই বিক্রি হয়েছে, জানতে গিয়ে যে-পরিস্থিতির মধ্যে পড়লাম, মনে হলো লেখক হওয়া এদেশে যতোটা অপরাধ, তার চেয়ে বেশি অপরাধ বই প্রকাশের সূত্রে কোনো প্রকাশকের সঙ্গে কথা বলা বা বলতে যাওয়া।

‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’য় স্টল বরাদ্দ থেকে বাংলা একাডেমী টাকা পেয়ে থাকে। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে এই মেলায় স্টল দেয়ার ক্ষেত্রে সম্প্রতি কিছু নিয়মকানুন হয়েছে। এগুলোতে রয়েছে প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা, রেজিস্ট্রেশন, ট্রেড লাইসেন্স এইসব বিষয়আশয়। কিন্তু বই প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রকাশকরা লেখকের সঙ্গে লিখিত কোনো চুক্তি করে কি-না, লেখকের রয়্যালটি তারা দেয় কি-না, টাকার বিনিময়ে বই বের করার ক্ষেত্রে কী নিয়ম থাকবে, প্রকাশিত বইগুলো মানসম্মত কি-না–এই বিষয়গুলোয় বাংলা একাডেমী মহা উৎসাহের সঙ্গে নীরবতা পালন করে যাচ্ছে। অভ্যাসটি প্রমাণ করে যে, মেলা উপলক্ষে অর্থ সংগ্রহ এবং এই কাজকে কিছু নিয়মের মধ্য দিয়ে বৈধ করে নেয়াই প্রতিষ্ঠানটির প্রধান একটি কর্তব্য। লেখকের টাকা যায় প্রকাশকের পকেটে; এই প্রক্রিয়ায় বাংলা একাডেমীও সেই টাকার ভাগ পায়। তাহলে কথাটা দাঁড়ায় এরকম: বাংলা একাডেমী ও প্রকাশকচক্র মিলিতভাবে লেখকদের ঠকিয়ে চলেছে! এই হলো আমাদের মহান একুশের চেতনার খুব সুন্দর উদাহরণ। এইসব অপকর্ম দেখার ও বছরের পর বছর সহ্য করে যাওয়ার জন্যে ভাষাভিত্তিক এই জাতিরাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে বাঙালির রক্ত ও অশ্রুর বিনিময়ে।

রয়্যালটি নিয়ে কিন্তু কিছু প্রীতিকর গল্পও আছে, যা আমরা শুনেছি দু’চারজন লেখকের কাছ থেকে। দু’চারটি প্রতিষ্ঠানের কথাও শুনেছি, যেগুলো থেকে বই বিক্রির টাকার একটা অংশ দেয়ার জন্যে লেখকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হতো। পতনশীলতা এদেশের ধর্ম, পিছিয়ে পড়া আমাদের একটা অনিবার্যতা। আগে লেখকদের সম্মান ছিল, যদিও লেখকরা সম্মানের জন্যে লিখতেন না। সব লেখক লিখতেন না টাকার জন্যে; কিন্তু প্রাপ্যটুকু লেখকের হাতে তুলে দেয়ার দায়িত্ববোধ কোনো কোনো প্রকাশকের মধ্যে তো ছিল!

আজ লেখকদের রয়্যালটির কথা ভাবতে নেই। ভাবলেও বলতে নেই। লেখকরা খালি লিখবেন। আর অপেক্ষা করবেন (কারো-কারো না করলেও চলবে) থলেভরা টাকা নিয়ে কখন প্রকাশকরা আসবেন, দুঃখিত, কখন লেখকরা সেই প্রকাশককে খুঁজে পাবেন, যার প্রডাকশন ভালো। কাগজ-ব্যবসায়ী কাগজের বিনিময়ে টাকা পাবেন; ছাপাখানার মালিক ছাপার কাজ করে পাবেন; বাঁধাইকারী বই বাঁধিয়ে; কিন্তু পাণ্ডুলিপি দিয়ে লেখকদের কিছু পেতে নেই, তিক্ত অভিজ্ঞতা ছাড়া!

যাই হোক, এসব একতরফা নেয়া আর পাওয়ার অশ্লীল ও অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে লেখকসমাজকে মুক্ত করতে কিছু ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। প্রথমত, রয়্যালটি পাওয়ার নিশ্চয়তাদানকারি একটি অবকাঠামো তৈরির পাশাপাশি, মেলায় প্রতিদিনের বিক্রিত বই থেকে উপার্জিত টাকার অন্তত দশ শতাংশ প্রকাশক/স্টলগুলো লেখকদের জন্য রেখে দেবে। কারণ এই মেলা উপলক্ষে প্রচুর বই বিক্রি হয়। এই টাকা কোনওভাবেই মেলাস্থলের বাইরে নেয়া যাবে না। এটা তারা বাংলা একাডেমী বা মেলা কর্তৃপক্ষের কাছে গচ্ছিত রাখতে পারেন। পরে প্রকাশক সেই টাকা লেখকদেরকে বাংলা একাডেমী থেকে তুলে নিতে বলতে পারেন মেলা শেষে। যদি কোনও লেখক টাকা না নেন, তবে তা দুস্থ বা আর্থিক অনটনে-পড়া লেখকদের মধ্যে বিতরণ করা যেতে পারে। অথবা সেই টাকায় গঠিত হতে পারে একটা তহবিল, যা গুরুতর অসুস্থ লেখকের চিকিৎসায় কিংবা লেখকের মৃত্যুর পর তার পরিবারের কল্যাণে কাজে আসবে।

দ্বিতীয়ত, একটা নীতিমালা খুব দরকার। মেলায় তো বটেই, সারা বছরই নিচুমানের অসংখ্য বই বের হয়। অন্য অনেক বিষয়ের সঙ্গে নিচুমানের বইয়ের মুদ্রণ ঠেকানোর বিষয়টিও নীতিমালায় থাকা জরুরি। প্রকাশকরা লেখকদের রয়্যালটি দেয় কি-না, এ-ব্যাপারে মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। রয়্যালটির পরিমাণও স্থির হওয়া জরুরি। প্রচ্ছদশিল্পীকে সম্মানী দেয়া হয় কি-না, দিলে তা গ্রহণযোগ্য কি-না এইসব ব্যাপারেও নজরদারি চাই।

তৃতীয়ত, ছাপানো বইয়ের সংখ্যা ও বিক্রির পরিমাণ সম্পর্কে স্বচ্ছতার জন্যে একটি পর্যবেক্ষক কমিটি গঠন করতে হবে। যাদের লেখা বইয়ের বিক্রি ভালো হয়, তারা প্রকাশকের কাছ থেকে একটা থোক টাকা পান। কিন্তু ছাপানোর কাজে ব্যবহৃত প্লেটগুলো প্রকাশকদের কাছেই থেকে যায়, যেগুলোর ব্যবহার বারবার হতে পারে। দেখা যায়, লেখককে বলা হচ্ছে এক হাজার কপি ছাপিয়ে পাঁচ শ’ বিক্রির কথা; কার্যত সত্যটি এই যে, তার চেয়ে বেশি বিক্রির ধান্দায় বেশি বই ছাপা হয়েছে; মেলায় ধান্দাটি সফল না-হলেও ক্ষতি নেই; বই তো কলা নয় যে, বাজারে বেশি দিন থাকলে পচে যাবে। আসল কথা, সারা বছর কী-পরিমাণ আয় হলো, তার হিসাব নেয়ার জন্যে এই খাতে অডিট হওয়া জরুরি। প্রকাশকদের রোজগার, জীবনযাপন ইত্যাদিও দেখা দরকার। লেখকদের বঞ্চিত করে প্রকাশকদের আরাম-আয়েশ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। হলে, ধরে নিতে হবে–রাষ্ট্রের মধ্যে, সরকারের মধ্যে গোলমাল আছে।

চঞ্চল আশরাফ :  কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও সমালোচক।

—–
ফেসবুক লিংক । মতামত-বিশ্লেষণ

১৯ Responses -- “যে-দেশে লেখক রয়্যালটি দেয় প্রকাশককে!”

  1. আবুল কাসেম চৌধুরী

    মনের কথা । নিজের পয়সায় ছাপিয়ে ছিলাম কয়েকটি বই । ঘরে রাখার যায়গা নেই । বাজার জাত করতে পারি নাই বউ এর শাপশাপান্ত তে ত্যাক্ত হয়ে একজনকে দিয়ে দিলাম । যে পৃষ্টায় প্রকাশক হিসাবে নিজের নাম ছিলো তা বদলে এখন কাটতি হয় ।

    Reply
  2. Debashish Bhattacharya

    খুব শক্তিশালী লেখা। বাংলাদেশের প্রকাশনার জগত বিষয়েও অনেক জানা গেল।

    Reply
  3. শহীদুল ইসলাম

    প্রকাশকরা ব্যবসায়ে মত্ত,এসব কি ভাববে তারা আর ভেবেই কি, যখন বানিজ্যে লক্ষী ভর করে তখন লেখক ছু……..

    Reply
  4. সাগুফতা শারমীন

    চঞ্চলভাই, আপনাকে অভিবাদন। এমনকি পুরানো খবরের কাগজও পয়সার বিনিময়ে কাগজওয়ালা কিনে নিয়ে যায়, ভাঙা লোহার জিনিসের বদলে অনেক ফিরিওয়ালা সমান ওজনের শাঁকালু দেয়…কিন্তু পান্ডুলিপির এবং তার সংশ্লিষ্ট বেদনা-পরিশ্রম-শ্রমঘন্টা-প্রয়াস-মননশীলতার চর্চ্চা ইত্যাদি একেবারে মূল্যহীন। মূল্য চাইলে অপমান জুটবে।

    Reply
  5. আদর্শ

    এই রকম আনকোরা, একচক্ষু ও অপেশাদার লেখা কেন বিডিনিউজ প্রকাশ করল বুঝের মধ্যে আসে না। এর আগেও লেখকদের পক্ষ থেকে এধরনের অভিযোগ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। যেহেতু একপক্ষ থেকে প্রকাশকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হচ্ছে, আরেক পক্ষের কথা শোনা/প্রকাশ করা কি পত্রিকার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না?

    আশা করি পত্রিকা কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে প্রকাশকদের বক্তব্য প্রকাশ করবেন। আশা করি তখন আলোচনায় অংশ নেয়া যাবে। এর বেশি কিছু বলার ইচ্ছা নাই।

    Reply
  6. Adhir Dutta

    লেখকদের নতুন প্রযুক্তির সহায়্তা নেয়া উচিত। যাতে করে প্রকাশকদের এই কুভাব থেকে তারা মুক্তি পেতে পারেন। কপি অনুপোযোগী পেনড্রাইভে করে তাদের লেখাগুলি নিজেরাই পাঠকদের জন্য প্রকাশ করতে পারেন।

    Reply
  7. শহিদুল ইসলাম মিন্টু

    আজ লেখকদের রয়্যালটির কথা ভাবতে নেই। ভাবলেও বলতে নেই। লেখকরা খালি লিখবেন। আর অপেক্ষা করবেন (কারো-কারো না করলেও চলবে) থলেভরা টাকা নিয়ে কখন প্রকাশকরা আসবেন, দুঃখিত, কখন লেখকরা সেই প্রকাশককে খুঁজে পাবেন, যার প্রডাকশন ভালো। কাগজ-ব্যবসায়ী কাগজের বিনিময়ে টাকা পাবেন; ছাপাখানার মালিক ছাপার কাজ করে পাবেন; বাঁধাইকারী বই বাঁধিয়ে; কিন্তু পাণ্ডুলিপি দিয়ে লেখকদের কিছু পেতে নেই, তিক্ত অভিজ্ঞতা ছাড়া!…..যথার্থ বলেছেন।
    ধন্যবাদ এই সাহসী লেখার জন্যে।

    Reply
  8. ঝুমু

    প্রকাশকরা কাগজ কেনা থেকে শুরু করে ছাপার প্রয়োজনীয় সব কিছুতে টাকা দেবেন, কিন্তু যে লেখকের লেখা নিয়ে এত আয়োজন, তাকে বঞ্চিত করবেন, এটা কেমন কথা? অথচ আমাদের দেশে এমনটাই হয়ে আসছে বছরের পর বছর ধরে। আর বিস্ময়করভাবে আমাদের লেখক সমাজও নিশ্চুপ? আমাদের অধিকাংশ লেখকেরা ব্যস্ত কেবল, কে কার চেয়ে বড় লেখক- এই তালিকার প্রস্তুতিতে। হয়ত তাই এই অব্যবস্থাটাই নিয়মে পরিণত হয়ে আছে এখনো!

    Reply
  9. আবদুর রব

    অপ্রিয় সত্য কথাটি বলার জন্যে চঞ্চলকে ধন্যবাদ।
    এই ব্যাপারে লেখক, প্রকাশক ও সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একসঙ্গে বসে সবার জন্য গ্রহণযোগ্য একটা সমাধানে আসার দাবী জানাচ্ছি।

    Reply
  10. সীনা

    ধন্যবাদ এরকম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে লেখার জন্য। প্রকাশকদের বিরুদ্ধে উল্লখিত অভিযোগগুলি যদি সত্যি হয় তাহলে বলতে হয় এটা রীতিমত অন্যায় কাজ প্রকাশকরা করে যাচ্ছেন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং বাংলা একাডেমী এ অন্যায়ের দায় এড়াতে পারে না। কিছু প্রতিষ্ঠিত লেখকরা নিশ্চয়ই তাদের প্রাপ্য পায় কিন্তু তারা কেন এ ব্যাপারে একটা সার্বজনীন নীতিমালা প্রণয়নে প্রকাশকদের চাপ দেয় না। এই প্রতিষ্ঠিত লেখকদের আমরা বুদ্ধিজীবী ভাবি কিন্তু তারা কম প্রতিষ্ঠিত লেখকদের প্রতি প্রকাশকদের এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করে না–এটা লজ্জার! এই বুদ্ধিজীবী লেখকরা দেশের অনেক অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলে, অনশন করে, তারা চাইলে একটা নীতিমালা (চুক্তিপত্র সহ অন্যান্য বিষয়ে যথাযথ আইন) প্রণয়ন কঠিন কিছু না এবং এতে প্রকাশকরা লেখকদের প্রতি অন্যায় আচরণ বন্ধ করতে বাধ্য হবে।

    আরেকটি বিষয়। লেখকদের যদি প্রকাশককে টাকা দিয়েই বই প্রকাশ করতে হয় তাহলে লেখকরা সেই টাকা দিয়ে নিজেই কেন বই প্রকাশ করে না? প্রকাশকের নাম বইয়ে থাকা কি খুব জরুরী? যেমন আপনার লেখা তো আপনার নামেই বিক্রি হবার কথা। দিনের পর দিন প্রকাশকরা আপনাদের সাথে অন্যায় আচরণ করছে, প্রতারণা করছে, আপনারা কেন সেই প্রকাশকের কাছে যান? লেখকদের কি
    আত্ম-সম্মান নেই? আপনারা যারা ভুক্তভোগী সবাই মিলে একটা বিকল্প ব্যবস্থার চিন্তা করেন। সবাই একজোট হয়ে প্রতিবাদ করেন। শুভ কামনা আপনার মত লেখকদের জন্য।

    Reply
  11. Fazlul Hoque Saikat

    আমার মনে হয়, বাংরাদেশের বেশিরভাগ লেখকের মনের ভেতরের অপ্রকাশিত কষ্টগুলোকে সাজিয়েছেন চঞ্চল আশরাফ। সমস্যাটা দীর্ঘদিনের। বাজে অভিজ্ঞতা অনেকের রয়েছে। অতি জরুরিভাবে, সংস্কৃতি বা শিক্ষামন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ লেখক রয়্যালিটি অথরিটি প্রতিষ্ঠা করা দরকার। মেলা আয়োজনকারী প্রতিষ্ঠান লেখকদের লিখিত অভিযোগ গ্রহণ করতে পারে; তার ভিত্তিতে প্রকাশকদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন। যে সকল প্রতিষ্ঠান গ্রন্থ ক্রয় করে – যেমন সরকার, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, শিক্ষা অধিদপ্তর, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্রালয়-কলেজ-গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংস্থা – তাদের কাছ থেকে গ্রন্থের তালিকা সংগ্রহ করে অথরিটি বা দাংয়ত্বশীল প্রতিষ্ঠান তা প্রচার-প্রকাশ ও বিতরণের ব্যবস্থা করতে পারে। সরকারি ও বেসরকারিভাবে প্রাতিষ্ঠানিক মনিটরিং হওয়া দরকার। সবচেয়ে বেশি দরকার লেখকদের সমন্বিত পদক্ষেপ। আগামী মেলা থেকে শুরু হতে পারে রয়্যালিটিবঞ্চিত লেখকদের অভিজ্ঞতা-বর্ণনা ও শোনার জন্য নিয়মিত আড্ডা অনুস্ঠানের ব্যবস্থা। মানবাধিকার সংস্থাগুলোও নিতে পারে বিশেষ পদক্ষেপ। আর সরকারকে করতে হবে দরকারি ও জরুরি হস্তক্ষেপ। লেখকদেরকে আর্থিকভাবে দৈন্যের মধ্যে রেখে জাতির অগ্রগমণ চিন্তা পুরোপুরো বোকামি। – ড. ফজলুল হক সৈকত, সহকারী অধ্যাপক, মানবিকবিজ্ঞান বিভাগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর।

    Reply
  12. আহমাদ মোস্তফা কামাল

    চমৎকার লেখা। কিন্তু সবার আগে যেটা দরকার সেটা হলো ‘চুক্তিপত্র ছাড়া পাণ্ডুলিপি প্রকাশককে দেব না’ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। আমি নিজে গত দু-বছর ধরে চুক্তিপত্র ছাড়া পাণ্ডুলিপি দিইনি। ফলাফলও পেয়েছি ভালো, অন্তত বছরশেষে বইয়ের হিসাবটা পাওয়া যাচ্ছে। এই হিসাবে ভুলভ্রান্তি থাকতে পারে, তবু একটা হিসাব তো পাচ্ছি। অথচ চুক্তিপত্র ছাড়া এর আগে আমার যেসব বই বেরিয়েছিলো সেসবের হিসাব এত বছরেও পাইনি। আর হ্যাঁ, এই বিষয়টি নিয়ে কপিরাইট কর্তৃপক্ষকে লেখকদের তরফ থেকে অভিযোগ জানালে আরো ভালো হয়।

    Reply
  13. Ershad Mazumder

    ধন্যবাদ প্রিয় চঞ্চল আশরাফ, আপনার লেখাটির জন্যে। আমাদের দেশের প্রকাশকরা ভারতীয় মাড়োয়ারীদের মতো। টাকাই প্রধান ও প্রথম লক্ষ্য। ভারতের বর বড় প্রকাশনা হাউজের মালিক মাড়োয়ারীরা। এমন কি তারা পশ্চিম বাংলার বড় বড় সিনেমা হলগুলোর মালিক। তারা লভজনক সিনেমাও প্রডিউস করে। সব কিছুতেই তারা মুনাফা খোঁজে। কবি লেখক সাহিত্যিকদেরও তারা টাকা দেয়।

    আমাদের দেশের কবি লেখক সাহিত্যিকরা টাকা চান না, তারা চান নাম বা সুনাম। পত্রিকা বা ম্যাগাজিন অফিসগুলোতে ঘুরে ঘুরে নিজেদের প্রচার চান। নাম না জানা বা আধা নাম না জানা লেখকরা প্রকাশককে টাকা দিয়ে নিজেদের বই প্রকাশ করে। বিনিময়ে কটা বই ফ্রি পায়। প্রকাশক লেখকের সহযোগিতা নিয়ে বইয়ের প্রকাশনা উত্‍সব বা বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করে। বই উন্মোচনের খবর তদবীর করে দৈনিক পত্রিকাগুলোতে ছাপাবার চেস্টা করে। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে অনেকেই বাংলা একাডেমী এওয়ার্ড, একুশে পদক স্বাধীনতা পদক পায়। শুনেছি একজন কবি আত্মহত্যার হুমকি দিয়ে একুশে পদক আদায় করেছেন। কবি লেখকদের তেমন কোন শক্তিশালী সংগঠন নেই। গায়ক গীতিকার নৃত্যশিল্পী অভিনেতা অভিনেত্রী সবার দাম বা সম্মানী বা পারিশ্রমিক বেড়েছে। সাহিত্যের মূল্য বাড়েনি।

    আরেক ধরনের দলীয় তাবেদার লেখক কবি আছে, যারা দলের আনুকূল্য পায়। নানা ধরনের গোপন ভাতা পায়।

    প্রিয় চঞ্চল, লেখকরা নিজেদের মূল্য জানে না বা বোঝে না। তারা দলবাজ হয়ে গেছে। তারা ঝগড়াটে ও কোন্দলপ্রিয়। জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রও দলবাজদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। ভারতের মতো বুক ব্যাংক করতে সরকারকে পরামর্শ দিন। সেই ব্যাংক লেখক কবি সাহিত্যিকদের ভাল বই প্রকাশ এবং লেখকের ন্যায্য সম্মানী বা পারিতোষিক দিবে। সরকার উত্‍সাহিত করলে বেসরকারী খাতও এই ব্যাপারে এগিয়ে আসতে পারে। প্রকাশকদের পদলেহন বা হস্তলেহন না করে নিজেদের শক্তিশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলুন। তখন ওরা আপনাদের পদলেহন করবে। ভেবে দেখুন, পারবেন কিনা।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—