Feature Img
Suicide - 1

দু’ দিন ধরে দুঃসহ সময় পার করছি আমরা। সাংবাদিক জয়শ্রী জামান ও আলিমুল হকের দুই সন্তান চিরশ্রী জামান মনমন (১৭) ও মোহাম্মদ বিন আলীম (১৫) গত সোমবার আত্মহত্যা করলে শুধু সাংবাদিক সমাজই নয়, গোটা দেশ শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে। জয়শ্রী ও আলিমুলের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটেছে বেশ ক’বছর আগে। তাদের দুই সন্তানের একসঙ্গে আত্মহত্যার ঘটনাটি বাবা-মায়ের বন্ধন অটুট না থাকলে যে ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে, সেই নির্মম সত্যটাই প্রমাণ করে দিয়েছে।

অথচ এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়ার বদলে আমরা মেতে উঠেছি কুৎসিত সাংবাদিকতায়। নারীর চরিত্র হননে মত্ত হয়েছে আমাদের গণমাধ্যমের একটি অংশ। কয়েকটি পত্রিকায় এই ঘটনায় আঙুল তোলা হয়েছে জয়শ্রী জামানের দিকে, যা আমাদের ভীষণভাবে মর্মাহত করেছে। একই রকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখতে দেখতে আমরা ক্লান্ত। সাংবাদিকতার নীতির বাইরে গিয়ে কল্পিত গল্পগাথা যে সমাজকে বিভ্রান্ত করতে পারে সে কথাটাও আমরা ভুলে গেছি।

২০১১ সালে স্বামীর নির্যাতনের শিকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রোমানা মঞ্জুরের কথা আমরা এখনও ভুলে যাইনি। রোমানার স্বামী হাসান সাইদ মারা যাবার পর পুরো পরিস্থিতিই বদলে গেল। রোমানার ওপর হওয়া অত্যাচারের কথা সমাজ, গণমাধ্যম ভুলে গেল। তখন প্রকাশিত হতে থাকলে কথিত ‘ইরানি’ বন্ধুর সঙ্গে রোমানা মঞ্জুরের ছবি আর সূত্রবিহীন মেইল। অথচ রুমানা দেশের বাইরে পড়াশুনা করছিলেন। তখন যে কারও সঙ্গে তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠতেই পারে। এটা খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। এজন্য তো তার ওপরে করা অত্যাচার জায়েজ হয়ে যায় না।

আমরা ভুলে যাইনি ২০১০ সালে জুরাইনে দুই সন্তান নিয়ে মায়ের আত্মহত্যার কথা। সেখানেও একজন নারী সাংবাদিককে নিয়ে বিস্তর লিখেছে গণমাধ্যম। কয়েকটা দিন যাওয়ার পর দেখলাম, মূল ঘটনা পাশ কাটিয়ে দেদারসে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে লেখা হচ্ছে সেই নারী সাংবাদিককে নিয়ে। আত্মহত্যার মূল ঘটনাটি লিখতে মজা না পেয়ে নারী সহকর্মীকে নিয়ে হলুদ সাংবাদিকতাতেই বিকৃত আনন্দ ছিল অনেকের। সমুদ্র সৈকতে কিংবা ঘরের ভেতরে তোলা টি-শার্ট পরা ছবি দিয়ে সেই ঘটনার আপডেট জানানো হয়েছে বহুদিন।

ঐশীর ঘটনাটিও আমাদের সমাজকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াটাই যেন একমাত্র কারণ ছিল কিংবা জিন্স-টি-শার্ট। ঘটনার মূলে যাওয়ার চেয়ে ঐশীকে নিয়ে লেখালেখিই আনন্দের বিষয় ছিল অনেকের। লক্ষ্য ছিল জিন্স-টি-শার্ট পরা টিনএজ একটি মেয়ের ছবি দিয়ে নিউজ করে পত্রিকার পাঠক আর অনলাইনগুলোর হিট বাড়ানো।

সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি নিহত হওয়ার পরও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। আমাদের প্রিয় বন্ধু-সহকর্মী রুনির মৃত্যুর পর কতে কথা শুনেছি। হ্যাঁ, সব কথাই হয়েছে রুনিকে নিয়ে (প্রিয় বন্ধু সাগরকে নিয়ে বললেও সেটা সুখকর হতে না আমাদের কাছে)। রিপোর্টের লাইনে লাইনে রুনির চরিত্রহনন করা হয়েছে নানাভাবে। যার কারণে এখনও আমরা সাগর-রুনি হত্যারহস্য জানতে পারিনি। তবে রুনির বেলায় আমরা, রুনির বন্ধু-সহকর্মী ও স্বজনেরা প্রতিবাদ করেছিলাম।

জয়শ্রী জামানকে নিয়ে লেখা সংবাদগুলোর বেলায়ও আমরা একযোগে প্রতিবাদ জানাচ্ছি। জয়শ্রীর দুই সন্তানের আত্মহত্যার ঘটনা তো প্রত্যেক অভিভাবকের বিবেক জাগিয়ে তোলার কথা। নিজের সন্তানের নিরাপদ জীবনের জন্য সচেতন হয়ে উঠার কথা। আমাদের মনে রাখতে হবে, বাচ্চা দুটি ছিল জয়শ্রী জামানের প্রাণ। এই দুই সন্তানের জন্যই জয়শ্রীকে ছুটে বেড়াতে হত রাজধানীর এই প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। মনমন আর আলীমকে আঁকড়ে ধরেই বাঁচতে চেয়েছিলেন জয়শ্রী। আজ যখন ওরাও চলে গেল তখন তার আর তো হারাবার কিছু নেই।

তবুও সব হারানো নিঃস্ব জয়শ্রীকে আমরা বাঁচতে দিচ্ছি না। একজন সন্তানহারা মায়ের আর্তচিৎকার আমাদের কর্ণকুহরে পৌঁছে না। আমরা মানবিকতার হাত প্রসারিত করে তার পাশে দাঁড়াইনি। বরং কীভাবে তার বেঁচে থাকার শেষ সম্বল ‘সম্মানটুকু’ ধুলিসাৎ করা যায় সে জন্য যেন কেউ কেউ আদাজল খেয়ে লেগেছে। যার সব হারিয়েছে তাকেই দায়ী করা হচ্ছে কারণ হিসেবে। হায় রে সাংবাদিকতা!

অত্যন্ত মেধাবী মনমন ও আলীমকে নিয়েই দু’চোখে রঙিন স্বপ্ন ছিল জয়শ্রীর। মনমন চারটি স্টার মাকর্সসহ ‘এ’ পেয়েছিল ‘ও’ লেভেলে। গিটার বাজাত। জাপানি ভাষা জানত। মনমনও মায়ের মতোই বিনয়ী ও ভদ্র ছিল। অথচ ওই দুটি বাচ্চাকেও মাদকাসক্ত বানানোর অপচেষ্টা হয়েছে। গতকাল কয়েকটি পত্রিকা লিখেছে, “বাবা তাদের জীবন থেকে আগেই চলে গেছেন। মাও সে পথেই হাঁটছেন।” মা যে সে পথে হাটঁছেন এটা কীসের ভিত্তিতে বলছে পত্রিকাগুলো?

অথচ কম্যুনিটির প্রতি দায়িত্বশীল হয়ে এবং ব্যক্তিগত ব্যাপার বলে দূরে সরে না থেকে আমরা যদি জয়শ্রী-আলিমুলের সাজানো সংসারটি ধরে রাখার চেষ্টা করতে পারতাম তাহলে হয়তো আজ দুটি মেধাবী শিশুকে অকালে ঝড়ে যেতে হত না। আমরা যদি মেধাবী মেয়েটির জন্য একটা চাকরির ব্যবস্থা করতে পারতাম তাহলে হয়তো সন্তান দুটিকে নিয়ে আরেকটু ভালোভাবে থাকতে পারত জয়শ্রী। আমাদের মধ্যে অনুতাপ তো নেই-ই, কেউ কেউ দুঃখজনক বিষয়টিকেও মিথ্যার প্রলেপ দিয়ে ‘সংবাদ-পণ্য’ করার চেষ্টা করছেন।

সমাজের বিবেক, সমাজের দর্পণ হিসেবে যারা কাজ করছেন, তারা কি দয়া করে একবার ভেবে দেখবেন বিষয়গুলো?

আমরা, জয়শ্রী জামানের বন্ধু ও সহকর্মীরা

বৃন্দলেখক:

দিল মনোয়ারা মনু, ইখতিয়ারউদ্দিন, তানবীর সিদ্দিকী, পারভীন সুলতানা ঝুমা, ফজলুল বারী, মাহমুদ হাফিজ, ফরিদা ইয়াসমিন, সুপ্রীতি ধর, জাহিদ নেওয়াজ খান, প্রভাষ আমিন, সুমি খান, ইলিয়াস খান, মানস ঘোষ, রানা হাসান, অঞ্জন রায়, মেনন মাহমুদ, কাওসার রহমান, রোজিনা ইসলাম, আঙ্গুর নাহার মন্টি, জাহানারা পারভীন, নাদিরা কিরণ, ফারহানা মিলি, শারমীন রিনভী, সুলতানা রহমান, জুলহাস আলম, শাহমিকা আগুন, আলফা আরজু, জাকিয়া আহমেদ, শাহনাজ গাজী, লীনা পারভীন, সাজু রহমান, ফাতেমা জোহরা হক কাকলী, গোধূলী খান, ইশরাত জাহান ঊর্মি, শরীফা বুলবুল, সাবরিনা সুলতানা চৌধুরী, শাহেদা ফেরদৌসী, ফারহানা লাকি, মুনমুন শারমীন শামস্, সেবিকা দেবনাথ, জেসমিন পাপড়ি, মোরসালিন মিজান, তাসকিনা ইয়াসমিন, লাবনী গুহ রায়, দৌলত আক্তার মালা, শামীম আরা শিউলি, রুখসানা ইয়াসমিন, সাবরিনা করিম মোর্শেদ ও ঝর্ণামনি।

Responses -- “মিডিয়াকে বলছি, দায়িত্বশীল হোন, প্লিজ”

  1. Nabiul

    এ বিষয়ে লেখার ইচ্ছা ছিল না কিন্তু লিখতে হচ্ছে বাধ্য হয়ে।

    বিচ্ছেদ আছে, তার পদ্ধতিও আছে। যার যে রকম ইচ্ছে সে রকম করে চললে হবে কেন? দাম্পত্য জীবন শুধুমাত্র স্বামী-স্ত্রীর, যতক্ষণ না সন্তান হয়। সন্তান হবার পর সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হল সন্তান…

    Reply
  2. আদিত শরীফুল

    আত্মহত্যার ঘটনাটি বাবা-মায়ের বন্ধন অটুট না থাকলে যে ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে, সেই নির্মম সত্যটাই প্রমাণ করে দিয়েছে। এই ঘটনা থেকে শিক্ষা না নিয়ে কিছু কিছু সাংবাদিক, সাংঘাতিক কাজ করে চলেছে। তবে ব্যতিক্রমও আছে।

    “জয়শ্রী জামানের বন্ধু ও সহকর্মীরা”, যারা এ লেখা লিখেছেন, সবাইকে সাধুবাদ জানাচ্ছি। ‘মনোবল হারাবেন না জয়শ্রী’ শিরোনামে আরেক জন সাংবাদিকও একই ধরনের লেখা লিছেছেন।

    সবাইকে ধন্যবাদ, যারা জয়শ্রীর পাশে আছেন সবসময়!

    Reply
  3. sumi

    স্বাধীনতা হল নিজের অধীনতা। নিজ বা স্বীয় বিবেক, রুচি, জ্ঞান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বিবেকহীন, রুচিবর্জিত, জ্ঞানপাপীদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তৈরি আইনের প্রয়োজনীয়তা বা উপযোগিতা সম্পর্কে এখন ভাবুন।

    Reply
  4. কামাল উদ্দিন সুমন

    একসঙ্গে দুই সন্তান হারনোর বেদনা কে সইতে পারে বলেন? তার উপর জয়শ্রী জামানকে নিয়ে ‘মনগড়া’ লেখা তার কষ্ট আরও বাড়িয়ে দেয় কিনা?

    আপনার বিবেককে প্রশ্ন করুন..

    Reply
  5. Masum Ahmed

    লেখাটির সঙ্গে আমি পুরো একমত। আমরা কোনো ঘটনার গভীরে না গিয়ে, মূল সত্য অনুধাবনের চেষ্টা না করে কেবল অবয়ব অবলম্বন করে সংবাদ-পণ্য বিপণনে ব্যস্ত হয়ে পড়ছি। যত পাঠক, যত হিট, তত বিজ্ঞাপন– এ ধরনের অসুস্থ বাস্তবতার কবলে পড়ে আমাদের মানবিক মন আজ বিপন্ন ও পরাস্ত।

    যে সাংবাদিতকতা সত্য পরিবেশনের মাধ্যমে সমাজকে সঠিক পথ দেখায় না, সমস্যা সমাধানে প্রচেষ্ট হয় না, যে সাংবাদিকতায় সুন্দরের আবাহন নেই, যে সাংবাদিকতায় উস্কানি প্রশ্রয় পায়, সেই সাংবাদিকতা অবশ্যই ঘৃণিত ও পরিত্যাজ্য।

    Reply
  6. সিরাজ

    বাবা-মায়ের বন্ধন অটুট না থাকলে সন্তানকে আত্মহত্যা করতে হবে কেন? বিচ্ছেদ একটি স্বাভাবিক বিষয় কি না? এটি কি হতে পারে না? হচ্ছে না?

    এই দুজনের আত্মহত্যার পেছনের কারণ নিশ্চয়ই এদের বা এদের কেয়ারগিভারদের কারও মানসিক সমস্যা। কেউ চারটি স্টার মাকর্সসহ ‘এ’ পেলে বা গিটার বাজাতে পারলে বা জাপানি ভাষা জানলে বা কেউ বিনয়ী ও ভদ্র হলেই যে সে মানসিকভাবে পরিপক্ক হবে বা তার বাস্তব জ্ঞান থাকবে তার নিশ্চয়তা নাই।

    যতটুকু সংবাদপত্রে এসেছে তাতে মনে হয় দুর্ভাগা ভাইবোন দুটোর সমাজবিচ্ছিন্নতা ছিল। সাধারণত কেয়ারগিভারের মানসিক সমস্যা, যেমন সোশ্যাল ফোবিয়া, অ্যাভয়ডেন্ট পারসোনালিটি ইত্যাদি সমস্যা থাকলে তারা সন্তানদের সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে আগলে রাখতে চায়।

    বিষয়টির জন্য বিচ্ছেদকে দায়ী না করে ভিকটিমদের সবার মনোবিশ্লেষণ দরকার যাতে এমনটি আর কারও ক্ষেত্রে ঘটা প্রতিহত করা যায়।

    Reply
  7. Bangladeshi

    সেই জন্যই তো সংবাদপত্রের পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া যায় না। কঠিন নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। ইদানিং সাংবাদিকতাও ব্যবসা হয়ে গেছে…

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—