Feature Img

সেলিম রেজা নিউটন
সেলিম রেজা নিউটন

(ক) স্বাধীনতা-প্রতিমার দেউলিয়াত্ব এবং মিডিয়ায় টম অ্যান্ড জেরি খেলা

অ্যাসাঞ্জ হয়ত একজন দুইজন সুইডিশ নারীকে ধর্ষণ করেছেন কিংবা করেন নি (যেটা জানার জন্য হঠাৎ করে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে মেরুদণ্ডহীন সরকার), কিন্তু এ নিয়ে কোনো প্রশ্নই নাই যে তিনি স্ট্যাচু অফ লিবার্টিকে বিবস্ত্র করে ফেলেছেন এবং সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছেন, কেমন বেশ্যা [দেউলিয়া] সে হয়েছে ইদানিং। (শেরউড রস, ২০১০; অনুবাদ: স.র.ন.)

‘স্ট্যাচু অফ লিবার্টি’ ভাষ্কর্যটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের সুদীর্ঘ, সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত। ‘স্ট্যাচু অফ লিবার্টি’ তাঁদের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, ব্যক্তির অবাধ বিকাশ ও বাকস্বাধীনতার প্রশ্নাতীত প্রতীক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতাযুদ্ধের এই সারসত্তা-প্রতীমাটি বাকস্বাধীনতার সর্বজনিন মার্কিন স্পিরিট হারিয়ে আজ দেউলিয়ার মতো করে ক্ষমতাবানদের তল্পীবহন করছে, এই অবস্থার রূপক হিসেবে (বা অন্য যেকোনো ক্ষেত্রেই হোক) ‘বেশ্যা’ শব্দের প্রয়োগ আমার জন্য অস্বস্তিকর ও আপত্তিকর। তথাপি, আমার মনে হয়, স্বাধীনতার নারী-প্রতিমাটির বিবস্ত্র ও বেশ্যা হয়ে পড়ার আগ্রাসী রূপকের মাধ্যমে যেন পুরো মার্কিন রাষ্ট্র-প্রণালীর ক্রমাগতভাবে ফ্যাসিস্ট-বলশেভিক হয়ে ওঠার ভীতিকর ও অধিকতর আগ্রাসী পরিস্থিতিটাকেই প্রতীকায়িত করতে চেয়েছেন শিকাগো ডেইলি নিউজ এর প্রাক্তন রিপোর্টার, মিডিয়া-অ্যাক্টিভিস্ট শেরউড রস।

কিন্তু, আমাকে কেউ বলুন, কখনো কি আপনারা এমন দেখেছেন যে ধর্ষণ-মামলার কোনো আসামীকে ধরার জন্য বিশ্বজোড়া লাল পরোয়ানা জারি করা হয়েছে? কখনো কি আমরা দেখেছি যে, একটি সাংবাদিকতা-প্রতিষ্ঠানের সর্বনাশ করার জন্য বিশ্বের প্রায় সমস্ত পরাশক্তি ও বিপুল সংখ্যক রাষ্ট্র প্রকাশ্যে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে? এঁরা কেউ তালেবান নয় কিন্তু-সভ্য ও উন্নত, আধুনিক সব রাষ্ট্র। একের পর এক এরকম রাষ্ট্রের চাপে ডোমোইন-নামের রেজিস্ট্রেশন বাতিল করার মাধ্যমে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে সংবাদ-প্রতিষ্ঠানটির অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় ওয়েবসাইট। বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে তার পে-পল অ্যাকাউন্ট। প্রকাশ্যে আহবান জানাচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম যুদ্ধরাষ্ট্র, যেন দেশেবিদেশে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোনো সংস্রব না রাখে উইকিলিকস নামক মিডিয়া-সংগঠনটির সাথে। জনগুরুত্বসম্পন্ন ও সঠিক তথ্য প্রকাশ ও পরিবেশনের দায়ে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে পর্যন্ত অভিহিত করা হচ্ছে একটি মিডিয়াকে। যে-তথ্য প্রকাশের ওপর সারা পৃথিবীর জনসাধারণের মঙ্গল-অমঙ্গল নির্ভর করে সেই তথ্য প্রকাশের নৈতিকভাবে ন্যায্য ঘটনাকে নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এরকম কখনো ঘটতে দেখেছি কি আমরা?

অতিশয় লক্ষণীয়: উইকলিকসের তথ্যপ্রকাশকে এ পর্যন্ত বেআইনী বলে কেউ অভিযোগ তুলতে পারেন নি। এরকম অভিযোগও কেউ করতে পারেন নি যে, তাদের প্রকাশিত তথ্য বেঠিক। তাহলে কীসের দোষে তাদের বিরুদ্ধে বিশ্বক্ষমতাধরদের এই যুদ্ধঘোষণা? সাংবাদিকতা করা কি বেআইনী কাজ? মহাজনগুরুত্বপূর্ণ যেসব বিষয়ে সরকারগুলো বিশ্বসমাজের সাথে প্রকাশ্যে মিথ্যাচার করেছে, সেগুলো প্রকাশ করা কীভাবে অসাংবাদিকতাসুলভ হতে পারে? ইন্টারনেট কি তাহলে স্বাধীন একটা তথ্যক্ষেত্র হিসেবে নিজের জন্মবৈশিষ্ট্য বহাল রাখতে পারবে না? পরাশক্তির মিথ্যাচার কি চির অপ্রকাশিত থেকে যাবে? বিশ্বের জনসাধারণকে সত্য জানানোর অধিকার কি অপরাধ বলে গণ্য হবে?

এত এত প্রশ্ন আমি এই জন্যই তুলছি যে আমাদের অধিপতি ধারার মিডিয়া এই প্রশ্নগুলো তুলছেই না, যদিও প্রশ্নগুলো প্রশ্নাতীত রকমের গুরুত্বপূর্ণ। অথচ উইকিলিকসের প্রকাশিত তথ্য নিয়ে, তার ভালোমন্দ নিয়ে, প্রকাশের ন্যায্যতা-অন্যায্যতা নিয়ে গাড়ি গাড়ি কথামালা দিয়ে পাতা ভরানো হচ্ছে প্রতিদিন। আর থাকছে উইকিলিকস সংক্রান্ত ঝালমুড়িচানাচুর-খবরাখবর। অ্যাসাঞ্জ কোথায় পালিয়ে আছেন, তিনি হ্যাকার ছিলেন কিনা, তার চুলের রঙ কি রকম, তিনি রাগী মানুষ কিনা, কথা বলেন কীভাবে (শান্ত স্বরে), এইসব খুচরা তথ্যে মিডিয়া সয়লাব। একটি পত্রিকা তো এমনকি জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ খ্যাপাটে ধরনের মানুষ কিনা সেই প্রশ্নও তুলেছে। আমাদের সাংবাদিক বন্ধু মশিউল আলম তো তাঁর ‘হ্যাকার’-পরিচয়টাকেই শেষ পর্যন্ত বহাল রাখলেন (মশিউল আলম, ২০১০)। নিজের পরিচয় এবং সেই পরিচয়ের রাজনীতি সম্পর্কে জুলিয়ানের নিজের বিশ্লেষণ অনুধাবনযোগ্য। অ্যাসাঞ্জের নিজের ভাষায়:

এটা একটু বিরক্তিকরই আসলে। কেননা [হ্যাকার থাকা অবস্থায়] আমি একটা বইয়ের যৌথ লেখক হিসেবে কাজ করেছিলাম। এটা নিয়ে ডকুমেন্টারি আছে। লোকজন এটা নিয়ে প্রচুর কথা বলে। এটা থেকে তারা কাট-পেস্ট করতে পারে। কিন্তু সেগুলো সব ২০ বছর আগের কথা। আজকের দিনের প্রবন্ধে আমাকে কম্পিউটার হ্যাকার বলা হচ্ছে, এটা দেখা খুবই বিরক্তিকর।

এটা নিয়ে আমি লজ্জিত নই। আমি এটা নিয়ে রীতিমতো গর্বিতই বটে। কিন্তু, কেন তারা এখন আমাকে কম্পিউটার হ্যাকার বলে চালাতে চায়, আমি তার কারণ বুঝতে পারি। কারণটা খুবই সুনির্দিষ্ট।

অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম যাঁরা আইএসপি চালু করেছিলেন আমি তাঁদের অন্যতম ছিলাম। সেটার নাম ছিল সাবআর্বিয়া। ১৯৯৩ সালে। তখন থেকে আমি প্রকাশক হিসেবে এবং কখনো কখনো সাংবাদিক হিসেবে কাজ করছি। আমরা এখন যা করছি তা যে প্রকাশনা-পেশার কাজ নয় এই মর্মে তাকে পুনঃসংজ্ঞায়িত করার একটা সচেতন প্রচেষ্টা আছে। অনেক দেশেই প্রকাশনা-পেশাটাকে সুরক্ষিত রাখা হয়ে থাকে। কিংবা সাংবাদিকতার কাজকর্মও অন্য নানাভাবে সুরক্ষিত থাকে। কিন্তু সচেতন প্রচেষ্টাটি হচ্ছে আমাদের কাজকে এমন কিছু (যেমন কম্পিউটার হ্যাকিং) হিসেবে পুনঃসংজ্ঞায়িত করা যার কোনো সুরক্ষা নেই। উদ্দেশ্যটা হলো, সাংবাদিকতা জগতের বা প্রেসের বাকিদের কাছ থেকে এবং আইনী সুরক্ষাগুলো থেকে আমাদেরকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। (ফোর্বস, ২০১০; অনুবাদ: স.র.ন.)


জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ ted.com ওয়েবসাইটে বলছেন, ‘Why the world needs WikiLeaks’

সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, উইকিলিকসকে বোঝার জন্য এবার যখন মন দিয়ে পত্রপত্রিকা দেখা শুরু করলাম, তখন দেখি উইকিলিকস জিনিসটা আদতে কী, এরা কী চায়, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর নথি প্রকাশ করে তাদের লাভ কী, এদের কাজের পদ্ধতি কী, ‘তথ্যফাঁস’ কথাটার মানেই বা কী (কথাটা কেমন যেন ফাঁসানোর অপগন্ধমাখা একটা কথা), এসব কোনোকিছুই বোঝা যাচ্ছে না। দুই-একজন শিক্ষিত মানুষকে জিজ্ঞাসা করলাম, তাঁদেরও একই কথা: বিস্তারিত কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। উইকিলিকসের মতো আনকোরা নতুন ধারার সাংবাদিকতার প্রসঙ্গ নিয়ে কথা তোলার সময় একথা খেয়াল না-করা কঠিন যে আমাদের দেশের সাংবাদিকতার এ এক জাত বৈশিষ্ট্য: সামগ্রিক ধারণাগত বিশ্লেষণ তাদের কাভারেজ থেকে উদ্ধার করা কঠিন।

আন্তর্জাতিক রিপোর্টিং-এর সামগ্রিক কাভারেজও এরকমই ইঙ্গিত দেয়: জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ যেন বিপথগামী কোনো অতিপ্রতিভা কিংবা ভিন্ন গ্রহের প্রাণী যে নাকি পাগল-বিজ্ঞানীর মতো একাই সমস্ত পরাশক্তিকে ধ্বংস করার কৌতুককর খেলায় মেতেছে, আর আস্ফালন করে বলছে “জারজদেরকে ধ্বংস করতে আমি মজা পাই” (স্পিগেল, ২০১০)। জার্মানির বিখ্যাত স্পিগেল পত্রিকাকে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে অ্যাসাঞ্জ অত্যন্ত সিরিয়াস সব কথাবার্তা তুলেছেন। (একটু পরে আমরা সেখান থেকে উদ্ধৃতিও দেব।) কিন্তু গুরুতর সব কথাবার্তা বাদ দিয়ে স্পিগেল-এর মতো একটা পত্রিকাও তাঁদের শিরোনামটা কী করল দেখুন: “জারজদেরকে ধ্বংস করতে আমি মজা পাই”। কী মজার একটা খেলা! মহাপ্রতিভাধর (এবং অবশ্যই বিপথগামী) একটা খ্যাপাটে লোক হঠাৎ করে দুনিয়ার সব বাঘা বাঘা জারজদেরকে ধ্বংস করার জন্য খেপেছে। সে আবার হ্যাকার জাতীয় বিপজ্জনক ও বেআইনী একটা প্রাণী। সে আবার রেপিস্টও বটে। (তা তো বটেই। এমন একটা লোক ধর্ষকামী না-হয়েই যায় না।)

এইসব কাভারেজ থেকে কি মনে হয় না, কেমন মজার একটা টম-অ্যান্ড-জেরি খেলা! জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ কোন গহীন আত্মগোপনে লুকিয়ে আছেন। সারা দুনিয়ার পুলিশ তাঁকে খুঁজছে। আর তারই মধ্যে আ্যাসাঞ্জ তাঁর নিজের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার জন্য ভুস করে ভেসে উঠছেন মাঝে মাঝে, ইন্টারনেট টেলিফোনির মাধ্যমে বড় বড় হুংকার দিচ্ছেন, ‘তথ্যযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে’ ঘোষণা দিচ্ছেন। আবার দেখছি, বৃটিশ পুলিশ জানে যে অ্যাসাঞ্জ বৃটেনেই লুকিয়ে আছেন, কিন্তু তাঁকে তাঁরা ধরতে পারছেন না, কারণ তাঁর নামে ইস্যু করা বহুল আলোচিত সেই আন্তর্জাতিক লাল পরোয়ানা জারির খোদ আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্যেই নাকি ভ্রান্তি আছে। অবস্থাটা কী! (আজকের একটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় শিশিরের কার্টুনটিতে সার্বিক এই টম-জেরি অবস্থারই অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক প্রকাশ ঘটেছে।)

যে আইনের শাসন নিয়ে এত বড়াই যে ধর্ষণ-মামলার একজন আসামীকে ধরতে পৃথিবীব্যাপী লাল পরোয়ানা জারি করা হচ্ছে, অথচ তার নিজেরই আইনের ফাঁক থেকে যাচ্ছে। কী তাড়াহুড়া! এক্ষুণি জেরি-ইঁদুর অ্যাসাঞ্জকে ঠেকাও, নইলে টম-বিড়ালের লেজের লোম ফুলে-ফুঁসে উঠছে। গোটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এবং তাঁর সমস্ত মিত্রদের তথা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিপদাপন্ন হয়ে পড়ছে (হিলারী বলছেন)। অ্যাসাঞ্জ যেন নতুন ওসামা বিন লাদেন, টেররিস্ট তো বটেই, রীতিমতো ভয়ংকর শত্রু। তাঁর বিরুদ্ধে তথ্যপ্রকাশের অভিযোগ আইনগতভাবে তোলাই যাচ্ছে না, তাতে কী? তাঁর প্রকাশিত-পরিবেশিত তথ্যকে অসত্য বলে দাবি পর্যন্ত করা যাচ্ছে না, তাতেই বা কী? কিছু না-পেলে অ্যাসাঞ্জের পরিচিতা নারীকে দিয়ে এক-দুইটা ধর্ষণের মামলা লাগাও, তারপর সেই মামলার অজুহাতে লাল পরোয়ানা জারি করো। এখন সেই পরোয়ানা নিয়েই প্রশ্ন, নতুন করে আবার জারি করতে হচ্ছে। তবু অ্যাসাঞ্জ এবং তাঁর সংগুপ্ত, আন্ডারগ্রাউন্ড কাল্ট ‘উইকিলিকস’কে ঠেকাতে হবে! নইলে সাম্রাজ্যের পতন।

(খ) সাম্রাজ্যের ভয়: উইকিলিকস কোনো গুপ্তকাল্ট নয়

অ্যাসাঞ্জ হয়ত একজন দুইজন সুইডিশ নারীকে ধর্ষণ করেছেন কিংবা করেন নি (যেটা জানার জন্য হঠাৎ করে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে মেরুদণ্ডহীন সরকার), কিন্তু এ নিয়ে কোনো প্রশ্নই নাই যে তিনি স্ট্যাচু অফ লিবার্টিকে বিবস্ত্র করে ফেলেছেন এবং সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছেন, কেমন বেশ্যা [দেউলিয়া] সে হয়েছে ইদানিং। (শেরউড রস, ২০১০; অনুবাদ: স.র.ন.)

আসলে ভয় পেয়েছে সাম্রাজ্য। ভয় পেয়েছে তার সামরিক-বেসামরিক কর্পোরেট-রাষ্ট্র, মিডিয়া এবং সমগ্র শাসকশ্রেণী। সেই কারণেই উইকিলিকসের বিরুদ্ধে এত সব বেআইনী রাষ্ট্রীয় চাপ, আস্ফালন ও আক্রমণ। সেই কারণেই মূলধারার মিডিয়ার বড় একটা অংশের কাভারেজের এই বিকৃতি। সেই কাভারেজে সবার আগে আড়ালে যাচ্ছে এই ঘটনা যে পুরো ব্যাপারটা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ বনাম সাম্রাজ্যের কোনো ব্যাপারই নয়। লাগাতার, নির্লজ্জ, সাম্রাজ্যিক মিথ্যাচার, গণহত্যা এবং ধ্বংসাত্মক যুদ্ধবিরোধী শক্তিশালী জনমতকে ধারণ করে গড়ে ওঠা একটা সামাজিক প্রতিরোধ আন্দোলনের ডুবোপাহাড়ের দৃশ্যমান চুড়ার ডাক নাম ‘জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ’। ডাক নামটা ‘উইকিলিকস’ হওয়াটাই ন্যায্য ছিল, এবং ঘটনাটা আদতেই ছিল তা-ই। কিন্তু, মিডিয়ার কৌশলী অপপ্রচার জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে সামনে-আনা খোদ উইকিলিকসকে এবং আরো পশ্চাদপটে বিরাজমান সামাজিক প্রতিরোধের শক্তিশালী ধারাটিকে আড়াল করতে সক্ষম হয়েছে।

উইকিলিকস যে গোপন কোনো কাল্ট নয়, এটা যে সুপ্রতিষ্ঠিত ও সামাজিকভাবে সুপরিচালিত বেতনহীন স্বেচ্ছাসেবীদের একটা মিডিয়া-সংস্থা, যাদের সমস্ত কাজ চলে সামাজিকভাবে সংগৃহীত ডোনেশনের সাহায্যে, খোদ এই ব্যাপারটাকে উধাও করে দিতে না-পারলে এটা পশ্চিমের টোকনোপ্রিয় সমাজের তরুণতর ব্যক্তি-গোষ্ঠীবর্গের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারার সম্ভাবনাসম্পন্ন চরম বিপজ্জনক একটা সামাজিক ‘প্রযুক্তির-সাহায্যে-প্রতিরোধ’ ধরনের আন্দোলনে পরিণত হতে পারে, এই আশঙ্কাটাই আসল। এই আশংকাকে আড়াল করার জন্যেই এরকম টম-অ্যান্ড-জেরি রিপোর্টিং-এর রমরমা। অর্থাৎ, আমাদের দেশের মিডিয়া এক্ষেত্রে মোটের ওপর বিশেষ কোনো ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত দেখিয়েছে, তা নয়।

জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের সবচেয়ে বড় পরিচয়, তিনি সাংবাদিক। আমি জানি, অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, আমাকে এই কথার সপক্ষে শক্তিশালী প্রমাণ দাখিল করতে হবে। চেষ্টা করা যাক।

লন্ডনের সিটি ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা-বিভাগস্থ ‘অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা-কেন্দ্র’ (সেন্টার ফর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম, সিআইজে) অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার অংশ হিসেবে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ এবং উইকিলিকসের কাজকর্মকে সমর্থন জোগায়। তো, এই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা-কেন্দ্র তাদের ওয়েবসাইটে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের পরিচিতি-পাতায় কী পরিচয় দিয়েছে, পড়ুন:

জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ একজন অ্যাক্টিভিস্ট, সাংবাদিক, এবং উইকিলিকসের সম্পাদক।

জন্মসূত্রে অস্ট্রেলীয় অ্যাসাঞ্জ জীবনযাপন করেছেন, কাজ করেছেন, এবং গ্রেপ্তার হয়েছেন, তাঁকে আড়ি পাতা হয়েছে, তাঁকে সেন্সর করা হয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে ব্যর্থ মামলা করা হয়েছে চীন, ইরান, অস্ট্রেলিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যসহ আরো অনেক দেশে।

নতুন ধারার মিডিয়া হিসেবে, বিচারবহির্ভূত গুপ্তহত্যা উন্মোচন করার সুবাদে তিনি জিতেছেন ২০০৯ সালের ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া-অ্যাওয়ার্ড’ এবং ২০০৮ সালের ‘ইকনমিস্ট ইনডেক্স অন সেন্সরশিপ অ্যাওয়ার্ড’। পড়াশোনা করেছেন তিনি পদার্থ-বিজ্ঞান এবং মেডিসিন বিষয়ে। (অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা-কেন্দ্র, ২০১০)

কৌতূহলবশত অ্যামনেস্টির ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখা গেল, যে কারণে জুলিয়ানকে তারা মিডিয়া-পুরস্কার দিল সেটা ছিল উইকিলকসেই প্রকাশিত একটা দলিল: “Kenya: The Cry of Blood-Extra Judicial Killings and Disappearances”। অ্যামনেস্টির কথা থাক।

বরং চলুন, এবারে আমরা একে একে কয়টা দিক খেয়াল করি। ব্যাপারটা যদি এরকম হয় যে, ক] একেবারে মূলধারার আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতা সংক্রান্ত চর্চা ও শিক্ষার একটা কেন্দ্র হলো সিআইজে; খ] সিআইজে, অ্যামনেস্টি, এবং আইএফজে (সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক ফেডারেশন) উইকিলিকসকে সাংবাদিকতা ও প্রকাশনাগত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করছে, আর জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে বিবেচনা করছে সাংবাদিক-প্রকাশক হিসেবে; এবং গ] মূলধারার এই সাংবাদিকতার ধ্যানধারণার মধ্যে জনগরুত্বসম্পন্ন গোপন খবর প্রকাশ করে সবাইকে বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে দেওয়ার (বিপদবাঁশি-বাদনের) মতো ব্যাপার স্বাভাবিক ও ন্যায্য – তাহলে আমরা উইকিলিকস সংক্রান্ত যাবতীয় অন্তঃসারশূন্য অপপ্রচারের রাজনীতির স্বরূপটা বুঝতে পারব। এখন, এই ‘অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা-কেন্দ্র’ সম্পর্কে আরেকটু জানতে জানতে আমরা এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য-ইশারা পেয়ে যাব আশা করি:

… সিআইজে একটা মুনাফাবিমুখ প্রতিষ্ঠান। এরা সাংবাদিক, গবেষক, প্রোডিউসার এবং শিক্ষার্থীদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার অনুশীলন ও পদ্ধতি বিষয়ে। …

কেন্দ্রটি তথ্যের স্বাধীনতা, কম্পিউটারভিত্তিক রিপোর্টিং, এবং সতর্কীকরণের বাঁশি-বাজানো মানুষদের নিরাপত্তার ব্যাপারগুলোর প্রতি উৎসাহ ও সমর্থন জোগায়। বিশেষত এমন কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে যাঁদেরকে কাজ করতে হয় যেখানে স্বাধীন মতপ্রকাশ ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা হুমকির সম্মুখীন এবং যেখানে সত্য সাংবাদিকতা করাটা হয়ে উঠতে পারে অত্যন্ত বিপজ্জনক একটা পেশা।

সিআইজে-র প্রশিক্ষণসূচি এমনভাবে সাজানো হয়েছে যেন অবিচার, দুর্নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার সততা ও স্বচ্ছতা সম্পর্কে অন্তর্ভেদী রিপোর্টিংকে উৎসাহিত করা যায় এবং ক্ষমতাবানদেরকে জবাবদিহিতার সম্মুখীন করা যায়।

সিআইজে-র সমর্থকদের মধ্যে আছে সানডে টাইমস ইনসাইট টিমের রিপোর্টারবৃন্দ, ওয়ার্ল্ড ইন অ্যাকশনের প্রোডিউসারগণ, বিবিসি রেডিও ও টেলিভিশন, চ্যানেল ফোর, প্রাইভেট আই, চ্যানেল প্লাস (প্যারিস), সিবিএস সিক্সটি মিনিটস এবং নিউ ইয়র্ক টাইমস।

২০০৭ সালে সিআইজে রেজিস্টার্ড চ্যারিটির মর্যাদা অর্জন করে এবং একগুচ্ছ ফাউন্ডেশনের সাহায্য-সমর্থন লাভ করে যাদের মধ্যে আছে ওপেন সোসাইটি ইন্সটিটিউট, ডেভিড অ্যান্ড ইলেইন পটার ফাউন্ডেশন, ফোর্ড ফাউন্ডেশন, পার্ক ফাউন্ডেশন, লন্ডনের সিটি ইউনিভার্সিটি, এবং বেশ কিছু প্রাইভেট ট্রাস্ট। (উইকিপিডিয়া, ২০১০ক; অনুবাদ: স.র.ন.)

লক্ষণীয়: “সতর্কীকরণের বাঁশি-বাজানো মানুষদের নিরাপত্তার” যে ব্যাপারটাকে সিআইজে উৎসাহিত করে থাকে, ঠিক সেই কাজটাই অত্যন্ত দক্ষতা ও নিরাপত্তার সাথে সমাধা করার একটা ব্যবস্থারই নাম উইকিলিকস। কীভাবে, তা বলার আগে বলতে হবে এই বাঁশি বাজানোর ব্যাপারটা কী। যখন পুরো সম্প্রদায়ের চরম বিপদ ঘনিয়ে আসে তখন যে-ব্যক্তি চিৎকার করে, বাঁশি বাজিয়ে, ঢোল পিটিয়ে সবাইকে এই মর্মে সতর্ক করে দেন যে, মারাত্মক বিপদ অত্যাসন্ন, তখন সেই ব্যক্তিকে ইংরেজিতে বলে ‘হুইসিল-ব্লোয়ার’ বা ‘সতর্কীকরণের বাঁশি-বাজানো মানুষ’।

বিপদবাঁশি বাজানোর কাজটাকে শুধু সিআইজে-ই প্রমোট করে না, খোদ সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক ফেডারেশন পুরোদস্তুর এর পক্ষে। ইন্টারন্যালশনাল ফেডারেশন অফ জার্নালিস্টস বা আইএফজে নামে সমধিক পরিচিত এই সংগঠন কিন্তু যে-সে সংগঠন নয়। এটা সাংবাদিকদের বৃহত্তম সংগঠন। এর আদি প্রতিষ্ঠা ১৯২৬ সালে। এখন একশোটা দেশে এর সদস্যসংখ্যা ছয় লাখ। আসুন একটু ধৈর্য্য ধরে আইএফজে-র ২রা ডিসেম্বরের বিবৃতিটা পড়ি:

সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক ফেডারেশন (আইএফজে) আজ বিপদবাঁশি-বাদক ওয়েবসাইট উইকিলকসের বিরুদ্ধে ক্ষতিকর রাজনৈতিক বিরোধিতা ঘনিয়ে তোলার নিন্দা করেছে। সাইটটিকে বন্ধ করে দেওয়ার জন্য ওয়েবসাইটটির মূল সার্ভারের ওপর যুক্তরাষ্ট্র গতকাল চাপ প্রয়োগ করার ঘটনার পরে আইএফজে এই মর্মে অভিযোগ করেছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীন মতপ্রকাশের ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে।

আইএফজে-র সাধারণ সম্পাদক জনাব অ্যাইড্যান হোয়াইট বলেছেন, “জনসাধারণের জানার অধিকার প্রত্যাখ্যান করার কোনো প্রচেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। … [উইকিলিকসের বিরদ্ধে] মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জবাব অত্যন্ত বেপরোয়া ও বিপজ্জনক কেননা তা স্বাধীন মতপ্রকাশ ও গণতন্ত্রের মৌলিক নীতিমালার বিরুদ্ধে যায়।”

হোয়াইট বলেন, [উইকিলকসের প্রকাশিত] “এইসব তথ্য সিরিয়াস, পেশাদার সাংবাদিকদের দ্বারা প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে। জনগণের প্রতি এবং প্রকাশিত তথ্যের সাথে সংশ্লিষ্ট লোকজনের প্রতি নিজেদের দায়দায়িত্বের ব্যাপারে এই সাংবাদিকেরা পূর্ণ সচেতন। কিছু লোক যেমনটা দাবি করছেন সেরকম দাবি করাটা স্রেফ সমর্থনযোগ্য নয় যে এখানে জানমালের ঝুঁকি আছে। যা এখানে ক্ষতির শিকার হতে পারে তা হচ্ছে কেবল গোপনীয়তার সংস্কৃতি, যা জনজীবনের অরুচিকর দিকটার চারপাশ দিয়ে অতি দীর্ঘকাল যাবৎ পর্দা ফেলে রেখেছে।”

উইকলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ এবং তথ্যপ্রকাশের সাথে জড়িত সন্দেহে যাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরাকযুদ্ধের সেই সৈনিক ব্র্যাডলি ম্যানিং-এর মঙ্গল ও কুশলের ব্যাপারেও আইএফজে উদ্বিগ্ন। …

অ্যাসাঞ্জকে আত্মগোপনে যেতে বাধ্য করা হয়েছে …

হোয়াইট আরো বলেন, “বিপদবাঁশি-বাদকদের অধিকারকে এবং জনস্বার্থে দায়িত্বপূর্ণ রিপোর্টিং-এর অধিকারকে আইএফজে এবং এর সদস্যরা সমর্থন করেন”। (আইএফজে, ২০১০; অনুবাদ: স.র.ন.)

এরকম বিপদবাঁশি বাজিয়ে সমগ্র মার্কিন জনসাধারণকে ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে অত্যন্ত সফলভাবে সতর্ক করে দিয়েছিলেন নিক্সন-প্রশাসনের কর্মকর্তা ড্যানিয়েল এলসবার্গ। তাঁর উন্মোচিত অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বিপুলসংখ্যক দলিল তখন পেন্টাগন পেপার্স নামে বই আকারে প্রকাশিত হয়ে তুমুল আলোড়ন তুলেছিল। চলুন, এই বিপদবাঁশি-বাদক সম্পর্কে না-হয় স্বয়ং প্রফেসর নোম চমস্কির মুখ থেকেই শুনি। যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেসি নাও রেডিওর সঞ্চালক অ্যামি গুডম্যান চমস্কিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন “পেন্টাগন পেপার্সের সাথে আপনার কী যোগাযোগ ছিল?” উত্তরে চমস্কি:

ড্যান এবং আমি বন্ধু ছিলাম। টনি রুশোও ছিলেন। তিনিও কাগজগুলো তৈরী করেছিলেন এবং সেগুলোর উন্মোচনে সাহায্য করেছিলেন। ড্যান এবং টনির কাছ থেকে আমি প্রস্তুতপ্রায় অবস্থায় দলিলগুলোর কপি পেয়েছিলাম। আর, তখন কিছু মানুষ ছিলেন যাঁরা সেগুলো প্রেসের কাছে পৌঁছে দিচ্ছিলেন। আমি তাঁদের মধ্যে একজন ছিলাম। তারপর আমি হাওয়ার্ড জিনের সাথে মিলে, আপনি যেমনটা বললেন, এক ভলিউম প্রবন্ধ সম্পাদনা করি এবং দলিলগুলোকে সূচিবদ্ধ করি।

আমরা কিন্তু কোনো কিছু বদলাই নি। দলিলগুলো সম্পাদনা করা হয় নি। সেগুলো তাদের আদি রূপেই বহাল ছিল। আমি আর হাওয়ার্ড জিন যেটা করেছিলাম সেটা হলো একটা পঞ্চম খণ্ড তৈরী করেছিলাম, আর, দলিলগুলো বেরিয়েছিল বাকি চার খণ্ডে। পঞ্চম খণ্ডটিতে দলিলগুলোর অর্থ, তাৎপর্য ইত্যাদির ওপর বহু পণ্ডিতের বিচারবিশ্লেষণমূলক প্রবন্ধ ছিল। সাথে ছিল একটা নির্ঘণ্ট। দলিলগুলো ভালোমতো ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সেটা ছিল অপরিহার্য। তো, এই ছিল ‘বিকন প্রেস’ সিরিজের প্রকাশিত পঞ্চম খণ্ড।

অ্যামি গোল্ডম্যান: এখন আপনার ভাবনা কী? যেমন ধরুন, এই মাত্র আমরা নিউ ইয়র্ক রিপাবলিক্যান কংগ্রেসের সদস্য পিটার কিং-এর কথা বাজিয়ে শুনিয়েছি; তিনি বলছিলেন উইকিলিকসকে বৈদেশিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করা উচিত।

নোম চমস্কি: আমার মনে হয় এটা একটা অবান্তর কথা। আমাদের বোঝা উচিত (পেন্টাগন পেপার্সও এরকমই আরেকটা ঘটনা ছিল), প্রধান প্রধান যেসব কারণে সরকারের গোপনীয়তার দরকার পড়ে তার মধ্যে একটা কারণ হলো, নিজের দেশের জনসাধারণের হাত থেকে সরকারকে রক্ষা করা। যেমন ধরুন … পেন্টাগন পেপার্সের দলিলগুলোর দিকেও আপনি যদি তাকান তো দেখবেন ওখানে এমন সব জিনিস আছে মার্কিনীদের যা আগে থেকেই জানা থাকা উচিত ছিলো অথচ অন্যরা তাদেরকে তা জানতে দিতে চান নি। … এখনকার [উইকি-] উন্মোচনগুলো, আমি যত দূর দেখেছি, প্রথমত এই জন্য আগ্রহোদ্দীপক যে এগুলো আমাদেরকে কূটনৈতিক সার্ভিসের কাজকর্ম কীভাবে চলে সে সম্পর্কে জানায়। (ডেমোক্রেসি নাও, ২০১০; অনুবাদ: স.র.ন.)

বিপদবাঁশি-বাদকদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধানের মাধ্যমে উইকিলিকস এমন একটা সংবাদ-এজেন্সির মতো প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়িয়েছে যাঁদের মূল স্লোগানই হচ্ছে: “আমরা সরকারকে উন্মোচন করি”। কীভাবে উন্মোচন ঘটানো হয় সে সম্পর্কে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের মুখ থেকেইশোনা যাক:

গোপনীয়তার একটি বৈধ ভূমিকা আছে। উন্মোচনেরও একটি বৈধ ভূমিকা আছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, মানবতার বিরুদ্ধে বা আইনের বিরুদ্ধে যারা অপকর্মে লিপ্ত, বৈধ গোপনীয়তার দোহাই দিয়ে নিজেদের অপকর্ম আড়াল করাটাকে তারা খুব সহজ কাজ মনে করে থাকে। বিবেকসম্পন্ন মানুষেরা সুতীব্র সমালোচনা উপেক্ষা করে চিরকালই অপকর্মের উন্মোচন ঘটিয়েছেন। কোনোকিছু উন্মোচন করা হবে কিনা সেটা উইকিলিকস নির্ধারণ করে না। প্রকাশের সিদ্ধান্তটা নেন কোনো একজন বিপদবাঁশি-বাদক বা কোনো ভিন্নমতাবলম্বী মানুষ। ঐ মানুষেরা যাতে নিরাপদে থাকেন, জনসাধারণের যেন তথ্য জানা থাকে এবং ঐতিহাসিক কোনো দলিল যাতে প্রত্যাখ্যাত না-হয়, এটুকু নিশ্চিত করাই আমাদের কাজ। (স্পিগেল, ২০১০; অনুবাদ: স.র.ন.)

উইকিলিকস আসলে এক ধরনের নিরাপদ ড্রপবক্স প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছে। ব্যাপারটা ‘আপনার অভিযোগ এই বাক্সে ফেলুন’ জাতীয় একটা ইলেকট্রনিক বাকশোর মতো। সরকারের ও কর্পোরেটের মিথ্যাচার ও দূর্নীতির প্রমাণ সংক্রান্ত দলিলপত্র বা কোনো গোপন নথি পুরোপুরি গোপনে কেউ চাইলে সেই ড্রপবক্সে ফেলে দিয়ে আসতে পারেন। পরে উইকিলিকস যাচাই-বাছাই-সম্পাদনা (যথাসম্ভব কম সম্পাদনা) করার পর তাঁদের ওয়েবসাইটে এসব তথ্য প্রকাশ করে। উইকিলিকসের আসল সাফল্যটা এইখানে যে, গোপনীয়তার শতভাগ নিশ্চয়তা দেওয়ার মতো কম্পিউটার-নিরাপত্তা-প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন তারা।

মার্কিন নৌবাহিনীর পাসওয়ার্ড রচনার কৌশল অনুসরণ করে ও তাকে আরো বিকশিত করে নিরাপত্তাব্যূহ রচনা করার বুদ্ধি জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে দেন বৃটিশ কম্পিউটার এনক্রিপশন বিশেষজ্ঞ বেন লরি। বৃটেনের গার্ডিয়ান পত্রিকার সুবাদে জানা যাচ্ছে, অ্যাসাঞ্জকে কম্পিউটারের সংকেতলিপি-লিখনের ক্ষেত্রে পরামর্শ দিয়েছিলেন এই লরি। রিপোর্টার ডেভিড লেই এবং জোনাথন ফ্র্যাংকলিনের রিপোর্টে অ্যাসাঞ্জ সম্পর্কে লরি বলছেন:

“বলতে গেলে তিনি বেশ মডার্ন এক উদ্ভট মানুষ, যাঁর মধ্যে ভিন্নমতাবলম্বীদের নিয়ে কিছু একটা করার মতো ব্যাপার ছিল। … তিনি রীতিমতো একজন টেকি (প্রযুক্তি-দক্ষ লোক) এবং তিনি সংকেত লিখতে পারেন।”

অ্যাসাঞ্জের প্রথম দিকের স্কিমগুলোর মধ্যে একটা ছিল যাকে তিনি বলতেন “প্রত্যাখ্যানযোগ্য সংকেতলিপি-লিখন”। নির্যাতনের মধ্যেও ভিন্নমতাবলম্বীরা যেন গোপন তথ্য ফাঁস করে না দেন সে ব্যাপারে তাঁদেরকে সাহায্য করা যায় কিনা – চিন্তাটা ছিল এমন। টেক্সটগুলো স্তরে স্তরে সংকেতলিপিবদ্ধ করা হতো এমনভাবে যেন কেউ যদি পাসওয়ার্ড প্রকাশ করে দিতে বাধ্যও হন, নির্যাতক তবু বুঝতে পারবে না যে তথ্যের আরেকটা দ্বিতীয় স্তর থেকে গেছে, যা দ্বিতীয় আরেকটা পাসওয়ার্ড দিয়ে লুকানো।

অ্যাসাঞ্জ তারপর লন্ডনে হাজির হন এবং উইকলিকসের ব্যাপারে এই প্রস্তাব পেশ করেন যেন সেটা “একটা মুক্ত-সোর্স, গণতান্ত্রিক গোয়েন্দা এজেন্সি” হতে পারে। লরি বলেন: “প্রথমে আমি ভেবেছিলাম, যত সব গরম গরম কথা।” পরে কিন্তু তিনি [লরি] উৎসাহিত হয়ে ওঠেন। এমন একটা সংকেতলিপি-লিখন-সিস্টেমের ব্যাপারে তিনি পরামর্শ দেন, প্রথম যেটা তৈরি করেছিল মার্কিন নৌবাহিনী। এই সিস্টেম তিনটা আলাদা সার্ভার নিয়ে বানানো একটা চেইন হিসেবে কাজ করে এবং তথ্য-প্রকাশকদেরকে পরিচয় গোপন করে দলিল জমা দেওয়ার নিশ্চয়তা দেয়।

লরি ইন্টারনেট নিরাপত্তা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনসালট্যান্ট। আগে তার একটা ব্যবসা শুরু ছিল। সেটা শুরু হয় দুটো সামরিক বাংকার কেনার মাধ্যমে। দুটোই পরিত্যক্ত মার্কিন ঘাঁটি। একটা গ্রিনহ্যাম কমন-এ, আরেকটা কেন্ট-এ একটা রাডার স্টেশন। নিজেদের সার্ভারের নিরাপত্তা যারা চান সেসব ফার্ম ও ব্যাংকের কাছে তাঁর কোম্পানি বাংকারগুলো ভাড়া দেয়। কেন্টের বাংকারটা তো রীতিমতো মাটির অনেক গভীরে: “পারমাণবিক হামলার পরও রাডার-অপারেটররা সেখানে ৩০ দিন টিকে থাকতে পারবেন বলে মনে করা হতো”।

ওয়াশিংটন থেকে একটা ফ্লাইটে ফিরেই তিনি তাঁর অ্যাক্টনের এলোমেলো বাড়ির দরজায় খালি পায়ে দাঁড়িয়ে প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন, এবং আগ্রহভরে বুঝিয়ে বলছিলেন কেন তিনি উইকিলিকসকে অনুমোদন করেন … “ইন্টারনেটের প্রাইভেসি নিয়ে আমার আগ্রহ অনেক দিনের। ইন্টারনেটে নজরদারির ক্ষেত্রে বিপুল সুযোগ আছে এবং তা ভালো জিনিস নয়। আবার, এটা মজার একটা কারিগরি সমস্যাও বটে: নিজের পাছায় লাথি না-খেয়ে কীভাবে আপনি ক্ষমতাবান লোকজন সংক্রান্ত বিষয়আশয় প্রকাশ করতে পারবেন? বিপদবাঁশি-বাদনের চর্চাকে আসলে উৎসাহিত করা উচিত।”

“উইকিলিকসের সাফল্যে আমি রীতিমতো অবাক হয়েছি। প্রচুর পরিমাণে আগ্রহোদ্দীপক কাজ তারা করেছে। দেখেশুনে মনে হচ্ছে মানুষজন ঝুঁকি নেওয়ার জন্য প্রস্তুত।” (গার্ডিয়ান, ২০১০; অনুবাদ: স.র.ন.)

পাঠক চাইলে এই ফাঁকে গার্ডিয়ানের সাথে আমাদের পত্রপত্রিকার রিপের্টিং-এর পার্থক্যটুকু দেখে নিতে পারেন। সাথে আমরা গার্ডিয়ান পত্রিকার ঐ একই রিপোর্টে উইকিলিকসের পরামর্শক-সভার আরেক সদস্যের কাছ থেকে উইকিলকসের বৈশিষ্ট্য আরো একটু বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারি:

পরামর্শক-সভার আরেক সদস্য হচ্ছেন প্রাক্তন একজন মার্কিন ড্রাফট রেজিস্ট্রার সি জে হিংক। থাইল্যান্ডে তাঁর বাসা থেকে তিনি বললেন: “উইলিকস একটা বিকেন্দ্রীকৃত প্রপঞ্চ। আর তার মানে হলো, বারোটারও বেশি দেশে তাঁদের স্বেচ্ছাসেবীরা আছেন। এই স্বেচ্ছাসেবীরা খুব ঢিলেঢালা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সংগঠিত থাকেন যেন সরকার কাউকে শনাক্ত করতে না-পারে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে না-পারে।

আমার মনে হয়, প্রায় যেকেনো মানুষের পক্ষেই এরকম উন্মোচনের ঘটনা ঘটানো সম্ভব। (গার্ডিয়ান, ২০১০)।

(গ) সাম্রাজ্যের মোকাবেলা এবং ন্যায়পথ অবলম্বনের বিপদ

আমাদের বর্তমান সমাজব্যবস্থায় কারোর পক্ষে বিপদকে এড়িয়ে ন্যায়পথে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হওয়া যথার্থই অলৌকিক ঘটনা।

প্লেটো, রিপাবলিক

সাম্রাজ্যকে মোকাবেলার জন্য এই যে মানুষজনের প্রস্তুত হয়ে ওঠা, এটাই নোম চমস্কি নিরলসভাবে বলে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে: একমাত্র মার্কিন জনসাধারণই পরিস্থিতিকে বদলে দেবার মতো অবস্থায় আছেন, তারাই পারেন যুক্তরাষ্ট্রকে বদলে দিতে; এবং আজ সাধারণ মার্কিনীদের গর্ব করার মতো সময় এসেছে, কেননা তাদের সমাজ ড্যানিয়েল এলসবার্গের মতো মানুষকে বিকশিত করে তুলেছে (নিকোস রাপ্টিস, ২০১০)।

জেনেভা ও সিয়াটলের বিশ্বায়নবিরোধী সংগ্রাম, বিশ্ব জুড়ে সততা-স্বচ্ছতা-স্বাধীনতা সংক্রান্ত ধ্যানধারণার ব্যাপক প্রসার, এবং সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে মুক্তিপরায়ন প্রতিরোধ-আন্দোলনের অজস্রধারা-বিকাশেরই ধারাবাহিকতায় আজ গোটা পশ্চিমা সমাজের সর্বোচ্চ জ্ঞান-প্রযুক্তি-মুক্তিস্পৃহাকে আত্মস্থ করে রাষ্ট্রের কেন্দ্রিকতার বিপরীতে সমুদ্রস্রোতের মতো সদাবিকেন্দ্রীকৃত যে মহা-সমাজসমুদ্র জেগে উঠছে তারই গর্জন আজ শোনা যাচ্ছে উইকিলিকসের উন্মুক্ত উন্মোচনের মধ্যে।

প্রযুক্তিমনস্ক সামাজিক প্রতিরোধের ধারায় ভীত, শংকিত ও দিশেহারা শাসকশ্রেণী স্বাধীনতার মানসভূমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দিন দিন একটা প্রকাশ্যনির্লজ্জ, মিথ্যাচারী দানবে রূপান্তরিত করে ফেলছে। মার্কিন সাংবাদিক শেরউড রস (২০১০) সেই বিপদের কথাই তুলে ধরেছেন শিউরে ওঠার মতো ভাষায়:

মার্কিন প্রভু-প্রজাতির দ্বারা পরিচালিত নতুন সাহসী পৃথিবীতে বৈদেশিক কূটনীতিকরা বিনম্র তদ্বিরকারী মাত্র, সমকক্ষ কেউ নন; চাইলেই তাদের সাথে যেকোনো ধরনের মর্যাদাবিনাশী আচরণ করা যায়। এবং (সাবাশ!) মার্কিন জনসাধারণের সাথেও তা করা যায়। তাঁদের শরীর এখন এক্সরে করা হচ্ছে; বিমানবন্দরগুলোতে ছানাছানি করা হচ্ছে তাঁদের শরীর। তাঁদের টেলিফোনে আড়িপাতা হচ্ছে, এবং পড়া হচ্ছে তাঁদের ফ্যাক্স ও ইমেইল। তাঁদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং ক্রেডিট কার্ড গোপনে দেখা হচ্ছে। কোনো একটা রিপাবলিকান কনভেনশনে অথবা একটা বাণিজ্য সম্মেলনে প্রতিবাদ করার মতো সাংবিধানিক অধিকার চর্চা করার কারণে মার্কিনীদেরকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে এবং বিচারের সম্মুখীন করা হচ্ছে। প্রাইভেট ব্যাংকারদেরকে দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে জনসাধারণের খাজনার প্রায় সমস্তটাই হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তাঁদের সন্তানদেরকে এখন আগ্রাসন-যুদ্ধ লড়তে বলা হচ্ছে। যে যুদ্ধের ভিত্তি হলো গিয়ে সেইসব মিথ্যা, উইকিলিকস যা উন্মোচন করার মতো সাহসটুকু অন্তত দেখিয়েছে এবং মিসেস ক্লিনটন যা লুকাতে চাচ্ছেন। সংক্ষেপে বলতে গেলে, স্বাধীনতার জন্য আর আমেরিকার দিকে তাকায়ও না। সে এখন কোয়ান্টিকো ব্রিগেডের ভেতরে [সেনাবাহিনীর] পিএফসি ব্র্যাডলি ম্যানিং-এর সাথে বন্দী হয়ে আছে।” (শেরউড রস, ২০১০; অনুবাদ: স.র.ন.)

বন্দী আমেরিকাকে মুক্ত করার সংগ্রাম পরিচালনা করতে চিরস্বাধীনতাপ্রিয় মার্কিন জনগণ নিজেদের মতো করে সংগঠিত হচ্ছেন, প্রযুক্তি শিখছেন প্রতিরোধের জন্য। চলুন, আমরা তাঁদের সহযোগী হই, তাঁদেরকে সমর্থন করি, তাঁদের কাছ থেকে শিখি। সেই সাথে চলুন, আমরা আমাদের নিজেদের বাকস্বাধীনতার বিদ্যমান সীমা প্রসারিত করার প্রচেষ্টায় ধীরস্থিরভাবে সংগঠিত হতে শুরু করি, এবং তার পাশাপাশি একটি পূর্ণস্বচ্ছ সরকার ও বেসামরিক একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা তুলি। দূর করি নিজেদের মানসবন্দিত্ব।

রাবি: ৭ই ডিসেম্বর ২০১০


হদিস

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা-কেন্দ্র (২০১০)। “Julian Assange”, Centre for Investigative Journalism (http://www.tcij.org/about-2/teachers-and-speakers/julian-assange), (Retrieved on December 3, 2010).

আইএফজে (২০১০)। “IFJ Condemns United States “Desperate and Dangerous” Backlash over WikiLeaks”, 02 December 2010, http:// www.ifj.org/en/articles/ifj-condemns-united-states-desperate-and-dang erous-backlash-over-wikileaks;  http://www.tcij.org/whistleblower-gui delines/wikileaks (Retrieved on December 6, 2010).

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল (২০১০)। “Amnesty announces Media Awards 2009 winners”. Amnesty International. 2 June 2009. http://amnesty.org.uk/news_details.asp?NewsID=18227 (Retrieved  on December 3, 2010).

অ্যালেক্স মেসি (২০১০)। Alex Massie, “Yes, Julian Assange is a Journalist”, http://www.spectator.co.uk/alexmassie/6437594/yes-julian -assange-is-a-journalist.thtml, Tuesday, 2nd November 2010, (Retrieved on December 6, 2010).

উইকিপিডিয়া (২০১০ক)। “Centre for Investigative Journalism”, http://en. wikipedia.org/wiki/Centre_for_investigative_journalism (Retrieved on December 6, 2010).

উইকিপিডিয়া (২০১০খ)। “Julian Assange”, http://en.wikipedia.org/wiki/ (Retrieved on December 6, 2010).

গার্ডিয়ান (২০১০)। David Leigh and Jonathan Franklin, “Whistle While You Work”, The Guardian, Saturday 23 February 2008, http://www. guardian.co.uk/theguardian/2008/feb/23/internet.usa (Retrieved on December 6, 2010).

ফোর্বস্ (২০১০)। Forbes, “An Interview With WikiLeaks’ Julian Assange”, 29 November 2010, http://blogs.forbes.com/andygreenberg/ 2010/11/29/an-interview-with-wikileaks-julian-assange/6/ (Retrieved on December 6, 2010).

মশিউল আলম (২০১০), “হাটে হাঁড়ি ভাঙা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ”, সম্পাদকীয় পাতা, প্রথম আলো, ৬ই ডিসেম্বর ২০১০।

ডেমোক্রেসি নাও (২০১০)। Noam Chomsky Interviewed by Amy Goodman: “WikiLeaks Cables Reveal “Profound Hatred for Democracy on the Part of Our Political Leadership”, http://www.commondreams.org/headline/2010/11/30-7, Published on Tuesday, November 30, 2010 by Democracy Now! (Retrieved on December 6, 2010).

নিকোস রাপ্টিস (২০১০)। Nikos Raptis, “The Lists of Death and Shame”, August 08, 2010, http://www.zcommunications.org/the-lists-of-death-and-shame-bynikos-raptis (Retrieved on December 6, 2010).

শেরউড রস, ২০১০। Sherwood Ross, “Assange is Headed for Prosecution for Publishing the Truth about U.S.”, December 01, Z Net: www.zcommunications.org/assange-is-headed-for-prosecutionfor-pub lishing -the-truth-about-u-s-by-sherwood-ross (Retrieved on December 5, 2010).

স্পিগেল (২০১০)। Interview with Assange, “WikiLeaks Founder Julian Assange on the ‘War Logs’: I Enjoy Crushing Bastards”, SPIEGEL, 26 July, Germany, www.spiegel.de/international/world/0,1518,708518,00. html (Retrieved on December 5, 2010).

লেখক: গবেষক এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।
—–
ফেসবুক লিংক । মতামত-বিশ্লেষণ

২৫ Responses -- “জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ কি খ্যাপা বিজ্ঞানী, বিন লাদেন, নাকি ভিনগ্রহের প্রাণী?”

  1. Ali adel

    Wikiliks er news e Muslim world er ki love hoyese ? Love hoyese Ei je Newton shaheber moto buddhujibi kisu lekhar moshla peyesen.

    Reply
  2. Rashel Mahmud

    নিউটন ভাই, যে তথ্য ফাঁস/প্রকাশ হয়েছে তাতে আমাদের বা বিশ্ববাসীর কী উপকার হয়েছে!

    Reply
  3. Sorbachin

    লেখাটি অসাধারণ হয়েছে। লেখক ধন্যবাদ পাবেন। তবে লেখাটির দীর্ঘতা আমাকে ক্লান্ত করেছে। আমরা সবাই মোটামুটি জানি এই বিষয়ে। ছোট কিন্তু জিস্ট হলে কয়েকবার পড়তাম। তবুও ধন্যবাদ।

    Reply
  4. জ.ই মানিক

    চমত্‍কার তথ্যবহুল প্রতিবেদন।অজানা অনেক কিছুই জানতে পারলাম।দেশীয় সংবাদ মাধ্যমগুলোকে সাংবাদিকতার দায়বদ্ধতা থেকে সত্য প্রকাশে এগিয়ে আসা উচিত।
    আন্তরিক অভিনন্দন জানাই।

    Reply
  5. Milton Reza

    সত্য কথা এভাবে বলার যোগ্যতা ও সাহস কজনের আছে আমাদের এই অভাগা দেশে। সাহসহীন সুবিধাভগী ডিগ্রীধারীরা এবার কিছুটা উত্তাপ বোধ করবেন কি!!
    ধন্যবাদ ভাইজান,
    মিনু ভাই।

    Reply
  6. Mirza Kibria

    In Vietnam War, the American Citizens were the winner, and the US Government was looser,defeated and humiliated. Likely, Wikilese has waged a all out war where citizen of the world will be winner against killer, murderer and looter US hinious Government & its conspritors against global humanity.
    Wikilese has started a war where all citizen of the world are on the same platform with common reasons and unique cuases cited in this coverage.
    ‘am amazed with the feature, and stand with Wikilese.

    Reply
  7. Mahathirul Rahman

    আমাদের দেশের অনেক Offline হ্যাকার নির্যাতিত এবং দুই একজন এখনো জেল হাজতে । জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ – এই প্রথম একজন যিনি Online হ্যাকার হিসাবে রাষ্ট্র দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছেন ।

    Reply
  8. ওমর তারেক চৌধুরী

    আগ্রহ নিয়ে পড়তে বসেছিলাম, দু’দিন পর যদিও। প্রথমেই ধাক্কা খেলাম, বা খটাক লাগল ‘… পুরো মার্কিন রাষ্ট্র-প্রণালীর ক্রমাগতভাবে ফ্যাসিস্ট-বলশেভিক হয়ে ওঠার …’ বাক্যটি পড়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কী করে একাধারে ফ্যাসিস্ট এবং বলশেভিক হয়ে উঠতে পারে? এতো রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মৌলিক অবদান রাখার মতো প্রশংসনীয় ভাবনা। নাকি জোর করে নৈরাজ্যবাদী প্রমাণের চেষ্টা। নৈরাজ্যবাদও কি সকল বাস্তবতাকে উড়িয়ে দিতে পারে। আর নৈরাজ্যবাদী চিন্তাই আবার পরের বাক্যে কীভাবে আবার স্বীকার করে :’এঁরা কেউ তালেবান নয় কিন্তু-সভ্য ও উন্নত, আধুনিক সব রাষ্ট্র’। স্ববিরোধিতা হয়ে গেল কি? ওই একই প্যারা শেষ হয়েছে : ‘এরকম কখনো ঘটতে দেখেছি কি আমরা?’ এই প্রশ্ন দিয়ে। উইকিলিক যা করেছে, তার সাথে তুলনীয় না হলেও, (সংক্ষেপে বলছি, কাজেই ভুল ব্যাখ্যার ঝুকিঁ বা বিস্তৃত ব্যাখ্যার দাবি থেকে যাচ্ছে। আগ্রহীরা নিজ উদ্যোগে খুজেঁ নিতে পারেন ইন্টারনেটের কৃপায়) অনুরূপ উদ্দেশ্য থেকে তথ্য ফাঁসের ঘটনা আগেও ঘটেছে যাকে ‘নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র’। উদাহরণ, লাতিন আমেরিকায় দায়িত্ব পালনের সূত্রে বীতশ্রদ্ধ ও নির্মোহ সিআইএ ত্যাগকারী গোয়েন্দা কর্মকর্তা Philip Agee (তার বই CIA Diary এবং On the Run দেখুন)। অ্যাজি তার অভিজ্ঞতা ও তথ্য থেকে পরবতীতে উদ্যোগ নিয়েছিলেনে পৃথিবীর কোনো দেশে মার্কিন দূতাবাসের কোন কর্মকর্ত সিআইএ এজেন্ট, তাদের তালিকা প্রকাশ করার, তাদের শনাক্ত করার উপায় বাতলে দেবার । এর ফলে অনেক এজেন্ট এক্সপোজড হয়ে যায়, বিপদে পড়ে, মারা যায় (সম্ভবত, যদি আমার স্মৃতি বিভ্রাট না ঘটে থাকে।)। এবং তখনও ‘নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য’ করে অ্যাজিকে মারার জন্য মরীয়া হয়ে ওঠে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। অ্যাজি দেশের পর দেশ থেকে পালিয়ে বেঁচেছিলেন। বছর ৫/৭ বা একটু আগে তিনি কিউবাতে মারা যান। On the Run বা তার সেই পলাতক জীবনের কাহিনী কোনো অংশে James Bond এর চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়। এই নিবন্ধেই পরে পেন্টগন পেপার্স এর উল্লেখ আছে। মূল কথা, প্রশ্নটি অনৈতিহাসিক, আবেগপ্রসূত ও ঢালাও।
    প্রশ্ন করা হয়েছে ‘ইন্টারনেট কি তাহলে স্বাধীন একটা তথ্যক্ষেত্র হিসেবে নিজের জন্মবৈশিষ্ট্য বহাল রাখতে পারবে না?’ বিষয়টি কি তাই হতে পারে? ইন্টারনেটের ‘জন্মবৈশিষ্ট্য’ ‘স্বাধীন’ [াতা] কিনা তা যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তির সামাজিক দিক নিয়ে যারা কাজ করেন, তারাই ভালো বলতে পারবেন। মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকলাম।
    ‘ড্রাফট রেজিস্ট্রার’ কথাটির মানে ভেঙে বলাটা সাধারণ পাঠকদের জন্য সুবিধাজনক হতো, যে কারণে ‘হুইসেল ব্রোয়ার’ কথাটি ভেঙে বোঝানো হযেছে।
    একটি চমৎকার, পরিপূর্ণ লেখা উপহার দেবার জন্য সেলিম রেজা নিউটনকে অভিনন্দন র্ইল।

    Reply
  9. Syeda Tasneem Towhid

    Can Amnesty International use the Information from Wikileaks to try the US military officers in the International Court of Justice for the lies they invent? Can any organization hold Hillary Clinton responsible for her illegal order of espionage? The international community knew about the imperialist manipulation of world politics, Wikileaks provided some proof.

    Reply
  10. রাজু

    চমৎকার লেখা। আরেকটু যোগ করতে চাই। বিষয়টা শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কিত নয়। ক্যবলগুলো তাঁদের পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্ত-ও নয়। বরং আমরা দেখতে পাই বৈশ্বক রাজনীতির কূটনীতি কতটা শঠতাপূর্ণ। পৃথিবির কতজন মুসলিম বিশ্বাস করতে পারে যে ইরানের উপর আক্রমন চালাতে আরব রাষ্ট্রগুলো, বিশেষ করে সৌদি আরব আগ্রহী? কতজন মেনে নিতে পারে যে ইসরায়েলের সাথেও মার্কিন যুক্ত্রাষ্ট্রের টানাপোড়েন চলতে পারে? উইকিলিক্সের সবচেয়ে বড় অবদান আসলে এখানেই। আমাদের পরিচিত ধারণা আর বিশ্বাসকে এটি পালটে দিতে সাহায্য করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনৈতিক আচরণের কথা সবাই কম-বেশী জানে ও বোঝে। কিন্তু তাঁরা যে একা নন এটাই এখন প্রমানিত।

    Reply
  11. Nasrul Anwar

    নিপীড়নের শিকার অন্য পৃথিবীর মানুষ আজ Julian Assange-এর পাশে দাঁড়াতে পারে, তাঁকে সমর্থন করতে পারে। পারি আমরাও…। তাঁর উন্মোচনকে স্বাগত জানানো বোধহয় ‌‌’অক্ষমের প্রার্থনা’ হবে না; এটা প্রতিবাদ। ইউকিলিকস প্রকাশিত তথ্য নিয়ে রমরমা প্রতিবেদন নয়, উইকিলিকস ও জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে পরা(অপ)শক্তির ষড়যন্ত্রগুলো পাঠককে জানাতে আমাদের প্রভাবশালী সংবাদপত্রগুলোর এগিয়ে আসা উচিত।

    Reply
  12. dupur mitra

    বন্দী আমেরিকাকে মুক্ত করার সংগ্রাম পরিচালনা করতে চিরস্বাধীনতাপ্রিয় মার্কিন জনগণ নিজেদের মতো করে সংগঠিত হচ্ছেন, প্রযুক্তি শিখছেন প্রতিরোধের জন্য। চলুন, আমরা তাঁদের সহযোগী হই, তাঁদেরকে সমর্থন করি, তাঁদের কাছ থেকে শিখি।

    Reply
  13. সৈয়দ আলি

    নিউটন, তরুন বন্ধু, অসাধারণ এই গভীর রচনা। আপনাকে গভীর শ্রদ্ধা জানাই। আসলে উত্তর আমেরিকায় বাস করে বৈশ্বিক পুঁজির দাসানুদাস সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র গুলির মুখোশ উন্মোচন করা প্রায় অসম্ভব। পুঁজি নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া, যা কিনা উত্তর আমেরিকার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের একমাত্র শিক্ষক মশাই, জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে রীতিমতো দানব বানিয়ে ফেলেছে, আর গোটা উত্তর আমেরিকার মানুষেরা কপ কপ করে সেই জ্ঞান গিলছে। ইয়াহুতে গেলে দেখা যায় আমেরিকানরা কী ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে দেখাচ্ছে। কিছু মূর্খতো তাকে বিশ্বাসঘাতক দেশদ্রোহী বলে তার কল্লা চাইছে (ওই মুর্খরা এটাও জানেনা যে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ আদৌ আমেরিকান নয়)। তাই, জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের পক্ষে আওয়াজ তুলতে হবে ষ্ট্যাচু হয়ে যাওয়া লিবার্টির দেশ আমেরিকা থেকে নয় বরং বাংলাদেশের মতো মুক্ত দেশ থেকে, যদিনা আমাদের দেশপ্রেমিক সরকার বাহাদুর আমার জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের সমর্থকদের রিমান্ডে পাঠাতে শুরু করে!

    Reply
  14. ইমন

    মন্তব্য প্রতিবেদন হিসেবে লেখাটা বেশি বড় হয়ে গেল। দিনশেষের ক্লান্তিও তো থাকে নাকি?

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—