- মতামত - https://opinion.bdnews24.com/bangla -

রাতারগুল: বন বিভাগের বাণিজ্য-ভাবনা

Hasan Morshed [১]২০১২, ২০১৩ সালে সারাদেশের পর্যটকদের কাছে এক বিস্ময়-গন্তব্য হয়ে দেখা দিয়েছিল ‘রাতারগুল জলারণ্য’। সীমান্তবর্তী গোয়াইনঘাট উপজেলাধীন হলেও, রাতারগুল সিলেট শহরের বেশ কাছাকাছি। কিন্তু এই কাছাকাছি ‘গন্তব্য’টুকুও প্রায় অচেনা ছিল সিলেটের মানুষের কাছেই। অরণ্য ও জলের আশ্চর্য সুন্দর এই মিতালী পর্যটকদের কাছে পরিচিত হতে শুরু করে ২০১১ সাল থেকেই।

পর্যটন-সম্ভাবনা একটা অঞ্চল কীভাবে দ্রুত বদলে দিতে পারে, তার উজ্জ্বল উদাহরণ রাতারগুল। বর্ষাকালেই মূলত পর্যটকরা যাচ্ছেন– মোটরঘাট, রাতারগুল গ্রাম এবং চিরিঙ্গি, এই তিনটি পথ ধরে। তিনটি পয়েন্টেই স্থানীয় মানুষেরা ছোট ছোট নৌকা নিয়ে থাকেন পর্যটকদের সেবা প্রদানের জন্য। যে দরিদ্র শ্রেণির মানুষজনের জন্য নদীতে মাছ ধরা ছাড়া বিকল্প কাজের সুযোগ ছিল না, তারা এখন রীতিমতো পর্যটনসেবায় নিয়োজিত।

পর্যটকদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য গত বছর রাতারগুল গ্রামের মানুষেরা স্বেচ্ছাশ্রমে এক কিলোমিটার রাস্তা তৈরি করেছেন। রাতের বেলা চাঁদের আলোর নিচে মাটি কেটে কেটে কাজ করেছেন স্থানীয় মানুষেরা। সে ছিল এক অপূর্ব আয়োজন!

বর্তমান রাতারগুল মাত্র ৩৩৮ একর জায়গাজুড়ে টিকে থাকা ছোট্ট একটা বন [২]
বর্তমান রাতারগুল মাত্র ৩৩৮ একর জায়গাজুড়ে টিকে থাকা ছোট্ট একটা বন

সাধারণ মানুষের স্ব-উদ্যোগের বিপরীতে আরও কিছু চিত্র ও দৃশ্যপট নির্মিত হয়েছে রাতারগুল ঘিরে। বর্তমান রাতারগুল মাত্র ৩৩৮ একর জায়গাজুড়ে টিকে থাকা ছোট্ট একটা বন। বর্ষায় বনের অর্ধেক ডুবে থাকে পানিতে। সারা বছর সাপ, বানর, পাখি ও আরও কিছু ছোট ছোট প্রাণি নিজেদের মতো করে এখানে সহাবস্থান করে।

কিন্তু গত তিন বছরে হুট করে হাজার হাজার পর্যটকদের ভিড় সহ্য করার মতো অবস্থা কি রাতারগুলের ছিল কিংবা আছে?

বহু বছর ধরে লোকচক্ষুর প্রায় আড়ালে থাকা এই ছোট্ট বনটি গত তিন বছরে সর্বাংশে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দায়িত্বজ্ঞানহীন পর্যটকেরা শহর থেকে বিরিয়ানি ও চিপসের প্যাকেট সঙ্গে করে নিয়ে গেছেন। জলারণ্যের জলে পলিথিনের প্যাকেট ফেলে এসেছেন। বনের ভিতরে উচ্চস্বরে বাজিয়েছেন চটুল গান। এতে বনের স্থায়ী বাসিন্দা পশু-পাখিদের কী ক্ষতি হচ্ছে সেটা বেশিরভাগ পর্যটক যেমন বিবেচনায় আনেননি, তেমনি তাদেরকে কেউ এটা মনে করিয়েও দেননি।

অথচ বহু বছর আগে থেকেই এটি সরকার-ঘোষিত Wild Life Sanctuary এবং এই বন্যপ্রাণি অভয়ারণ্যের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এখানে বন বিভাগের একটি বিট অফিসও রয়েছে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে দেখা যায়–

The Assam Forest Regulation 1891(VII of 1891) এর Section 17 এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ৯ জুন, ১৯৩২ এর Notification no-1774 R মূলে ঘোষিত রাতারগুল রিজার্ভ ফরেস্ট এবং The Forest Act 1927 (XVI of 1927) এর Section 4 এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ১৯ জানুয়ারি, ১৯৮৫ সনের Notification No-X11/For-13-19/84(P-I/45(2) মূলে ঘোষিত মহিষখেড় মৌজা ও বগাবাড়ি মৌজার প্রজ্ঞাপিত বনভূমিকে The Bangladesh Wild Life( Preservation) Order 1973 ( President’s Order 23 of 1973) এর Article 23 এর Clause(7) এর প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার Wild Life Sanctuary ঘোষণা করেন।

এই প্রজ্ঞাপনে রাতারগুল মৌজার ৩৩৫.৮২, বগাবাড়ি মৌজার ৩৭.৫০ ও পূর্ব মহিষখেড় মৌজার ১৩১.১৮ একর– সর্বমোট ৫০৪.৫০ একর অভয়ারণ্য হিসেবে অধিভুক্ত করা হয়।

কিন্তু বন বিভাগের কর্তৃত্বাধীন থাকা অবস্থায় বনের প্রকৃত অবস্থা কী সেটা দেখা যেতে পারে বন বিভাগেরই দলিল Statement of Land (Database) 2009 এ। এখানে দেখানো হয়েছে, সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার উত্তর সিলেট রেঞ্জ-২ এর রাতারগুল বিটের অধীনে দশটি মৌজা– মেওয়াবিল, ঘোড়ামারা কান্দি, ছদিভদি হাওর, শিয়ালা হাওড়, লক্ষির হাওড়, শিমুল বিল হাওড়, চলিতাবাড়ি, রাতারগুল, বগাবাড়ি ও পূর্ব মহেশখেড়ে বন বিভাগের আওতাধীন মোট ভূমির পরিমাণ ৩৩২৫.৬১ একর। এর মধ্যে মাত্র ৮১৯.৬১ একর বন বিভাগের দখলে আছে। বাকি তিন চতুর্থাংশ বেদখল!

গত তিন বছরে পর্যটক ও মিডিয়ার কল্যাণে পরিচিত হওয়ার আগে, বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে থাকা অবস্থাতেই এই বন প্রায় পুরোটা লোপাট হয়ে গেছে। আর টিকে থাকা সামান্য ৩৩৫.৮২ একর অংশ যখন দায়িত্বজ্ঞানহীন জনস্রোতের চাপে মৃতপ্রায় হয়েছে, তখনও বন বিভাগ নিঃশ্চুপ। কোথাও একটা সামান্য সাইনবোর্ড দিয়েও পর্যটকদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়নি যে, এটি একটি অভয়ারণ্য, নিঃশব্দ থাকুন, খাবার প্যাকেট ফেলা থেকে বিরত থাকুন।

গত বর্ষায় যখন ছোট ছোট সাধারণ নৌকার বদলে ইঞ্জিনচালিত নৌকা বনের ভেতর ঢোকা শুরু করল, তখনও বন বিভাগ চুপচাপ। বরং ওরা ব্যস্ত ছিল বন্যপ্রাণির জন্য তৈরি করা জলাধার বছরওয়ারী লিজ দিতে। পরবর্তীতে সিলেটের সচেতন মানুষদের আন্দোলনের মুখে এই অবৈধ লিজ প্রদান বন্ধ হয়।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বন বিভাগ তৎপর হয়ে উঠেছে এই ছোট্ট বনকে ইকোপার্ক বানাতে। প্রায় ছয় কোটি টাকার প্রজেক্ট অনুমোদিত হয়ে বনের ভিতর সুউচ্চ টাওয়ার উঠছে। শুধু তাই নয়, বন কর্মকর্তাদের জন্য আধুনিক কার্যালয় ও বাসস্থান এবং বনের ভেতর দিয়ে ইট-বিছানো রাস্তা হচ্ছে!

বন বিভাগের দায়িত্ব পর্যটনের বিকাশ নয়, বন সংরক্ষণ ও তত্ত্বাবধান [৩]
বন বিভাগের দায়িত্ব পর্যটনের বিকাশ নয়, বন সংরক্ষণ ও তত্ত্বাবধান

এই বনের সঙ্গে আত্মিকভাবে সংশ্লিষ্ট সচেতন মানুষেরা ইতোমধ্যেই এই প্রজেক্টের বিরোধিতা করছেন। একটি টিভি চ্যানেলে বিভাগীয় বন কর্মকর্তার সাফাই শুনছিলাম; তিনি বলছিলেন– ইকোপার্ক হলে এখানে ট্যুরিস্টদের ঢল নামবে, কর্মসংস্থান হবে ইত্যাদি।

একজন বিভাগীয় বনকর্মকর্তা যদি না বুঝেন যে, পর্যটকের ঢল নামলে লোপাট হতে হতে মাত্র এক বর্গ কিলোমিটার জুড়ে টিকে থাকা ছোট্ট একটা বন খুন হয়ে যাবে– তাহলে বুঝুন অবস্থা!

সবচেয়ে বড় কথা, বন বিভাগের দায়িত্ব পর্যটনের বিকাশ নয়, বন সংরক্ষণ ও তত্ত্বাবধান। যারা পর্যটন বুঝেন তারা জানেন, পর্যটনের বিভিন্ন ধরন রয়েছে। থিম পার্কের পর্যটন এক রকম– সমুদ্রতীরের আরেক রকম– বনের ভেতর আবার একেবারে আলাদা। বনের মধ্যেও আবার সুন্দরবনের পর্যটন হবে এক রকম; রাতারগুলের হবে আরেক রকম।

পর্যটন ও পরিবেশের মধ্যে যদি প্রাধান্যের প্রশ্ন আসে, নিঃসন্দেহে প্রাধান্য দিতে হবে পরিবেশে। পরিবেশ ধ্বংস করে পর্যটনের বিকাশ হবে আত্মঘাতী। পরিবেশ যদি বাঁচিয়ে রাখা যায়, তাহলেই পর্যটনের বিকাশ ঘটবে– এই কথাটি রাতারগুলের জন্য যেমন সত্য– উত্তর সিলেটের বিকাশমান আর সব পর্যটন গন্তব্য, লালাখাল, জাফলং, বিছনাকান্দির জন্যও তেমন।

এই অঞ্চলে যদি কেউ পর্যটন বিকাশের কথা বলেন, তাহলে সবার আগে এখানকার পরিবেশ সংরক্ষণের কথা তাকে ভাবতে হবে। জাফলংয়ে বন বিভাগের বিশাল জায়গা দখল করে পাথর ডাম্প করে রাখা হয়েছে। বন বিভাগ সেদিকে গুরুত্ব না দিয়ে বাণিজ্যিক গেস্ট হাউজ তৈরি করেছে!

বন বিভাগ যদি সত্যিই বনের প্রতি আন্তরিক থাকে, তাদের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত বেদখল হয়ে যাওয়া রাতারগুল বিটের ২৫০৬ একর বনভূমি উদ্ধার ও সংরক্ষণ। মূল কাজ বাদ দিয়ে পর্যটন বিকাশের ধোঁয়া তুলে ছয় কোটি টাকার প্রজেক্ট বাস্তবায়ন কতটুকু বিধিসম্মত– সেই প্রশ্নের সমাধান হওয়া প্রয়োজন। দ্রুত।

হাসান মোরশেদ: [৪] ব্লগার, পর্যটন ঊন্নয়নকর্মী।

৩ Comments (Open | Close)

৩ Comments To "রাতারগুল: বন বিভাগের বাণিজ্য-ভাবনা"

#১ Comment By জাহিদ হোসেন On এপ্রিল ১২, ২০১৪ @ ৯:২৭ পূর্বাহ্ণ

বনাঞ্চল ধ্বংস করে তা থেকে ফায়দা হাসিল এদেশে নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রায় প্রতিটি জেলায় এ ধরনের ছোটখাটো দর্শনীয় বনাঞ্চল বা হাওড়-বাওড় আছে এবং তা সংরক্ষণের অভাব সবসময়ই লক্ষ্য করা যায়। এ জন্যে যতটা দায় সবই আমরা অনেকে সাধারণ জনগণের উপরে চাপাতে চাই। কিন্তু বাস্তবতা তা নয়। জনপ্রতিনিধিরা এর জন্যে মূলত বেশি দায়ী।

এসব যে সংরক্ষণ করতে হবে সেই জ্ঞান-বুদ্ধি-বিবেক এদেশের জনপ্রতিনিধিদের একেবারে শূন্যের কোঠায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই। কারণ তারা সংরক্ষণের চেয়ে সেগুলো থেকে কীভাবে কিছু ব্যক্তিগত অর্জন বাড়ানো যায় সেদিকেই বেশি নজর দিয়ে থাকেন। তাই তো তারাগুলের মতো প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যাপ্তি আস্তে আস্তে ছোট হয়ে আসছে বেদখলের মাধ্যমে। অনেক জায়গায় অবশ্য এসব সংরক্ষণের নামে অবৈধ লিজ ও চাঁদাবাজি চলছে।

যদিও তারাগুলের জন্যে এলাকার জনগণ অনেক কাজ করেছেন, যেমনটি লেখক এখানে বলেছেন, কিন্তু তাও ছিল এই দর্শনীয় এলাকা থেকে পয়সা অর্জনের জন্যে এবং খোঁজ নিলে দেখা যাবে তার পিছে যে মাস্টারমাইন্ড ছিল তা কোনো জনপ্রতিনিধির।

এই রাস্তা নির্মাণ আর পর্যটনসেবা কি তারাগুলের প্রকৃতি ধরে রাখতে সহায়তা করবে? নিঃসন্দেহে নয়। আর তা থেকে টাকা আয় হয়তো অল্প কিছু মানুষের ভাগ্য ফেরাতে সহায়তা করবে। কিন্তু অতিরিক্ত মানুষের ভিড়ে একদিন হারিয়ে যাবে এখানকার সমস্ত প্রাকৃতিক বৈচিত্র, যেমনটা ঘটে গেছে আমাদের সুন্দরবন অঞ্চলে।

একসময়ে সুন্দরবনে মানুষ ভয়ে আতঙ্কে সহজে যেত না। এখন তা হয়ে গেছে মানুষের বিলাসভ্রমণের অভয়ারণ্য। আর বন্যরা তাদের অস্তিত্ব রক্ষায়ই সদা তৎপর রয়েছে। কারণ কোনো প্রাণি কোনো মানুষের আনন্দের বলি হয় তা বলা মুশকিল।

অন্যদিকে আমাদের দেশের ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলো এসব অঞ্চলের প্রচার এতই আকর্ষণীয়ভাবে করে যে আগে জানা না থাকলেও যাতে সবাই সেখানে ছুটে যায় সে ব্যবস্থার সৃষ্টি হয়। আর প্যাকেজ ট্যুরিজমের সরকারি-বেসরকারি ব্যবস্থা তো আছেই।

আবার রাস্তাঘাট আগের মতো বন্ধুর নয়। জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে সব ব্যবস্থা এখন আমাদের হাতের মুঠোয়। উন্নয়ন অনেক সময় প্রকৃতি ধ্বংস করে শুধুমাত্র সঠিক বিধিমালার অভাবে। মিডিয়ার প্রচার বা ট্যুরিজমের একটা বিধিমালা সরকার করে দিবে এটাই হওয়ার কথা। যা আমাদের আছে শুধু কাজীর খাতায়, বাস্তবে প্রয়োগ নেই।

এসব আসলে আমাদের জাতীয় সমস্যা যা সারা বিশ্বের সব দেশেই আছে। কিন্তু অন্যান্য দেশের আইন সভা এসব জাতীয় সম্পদ রক্ষায় যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছে। আমাদের দেশের পার্লামেন্ট ও রাজনীতিতে এ নিয়ে কোনো কাজই হচ্ছে না। বরং যাদের দিয়ে ভূত ছাড়াতে হবে তাদেরকেই এই ভূতে ধরে আছে। সাধারণ মানুষকে সঠিক পথ দেখায় তাদের নেতারা আর সেই নেতারাই আমাদের দেশে সবচেয়ে অন্ধকারে বসে আছে।

কারণ ওনাদের আগে ক্ষমতায় যেতে হবে, দেশের সম্পদ লুটপাট করার জন্যে। আর কীভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকা যায় সেই ফন্দি-ফিকিরই তারা বেশি করেন, প্রাকৃতিক সম্পদ বা জাতীয় অর্জন পাশ কাটিয়ে।

#২ Comment By শাহরিয়ার মুস্তাফিজ On এপ্রিল ১২, ২০১৪ @ ১১:৫৪ পূর্বাহ্ণ

সরকার না থাকলেই মনে হয় এই দেশটা ভালো থাকত। দেশের মানুষেরা নিজেরা উদ্যোগ নিয়েই চলত। বন বিভাগের আসল কাজ ফেলে পর্যটন উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছে; কারণ এটায় টাকা-পয়সা আছে। একটা প্রজেক্ট মানেই কয়েক কোটি টাকা।

আর এই দেশে পর্যটন উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে পর্যটকদেরও দায়িত্বশীল হওয়ার প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার।

#৩ Comment By অাব্দুল আলিম শাহ On এপ্রিল ১২, ২০১৪ @ ৬:৫০ অপরাহ্ণ

খুব বেশি অবাক হবার সুযোগ নেই। বন বিভাগ সারা দেশে যে কৌশলে বন শাসন করছে তাতে তারা নিজেরাও এখনও পর্যন্ত কোনো সফলতার কেচ্ছা শোনাতে পারেনি দেশবাসীকে। রাতারগুলের ক্ষেত্রে তাদের কাছ থেকে এর চেয়ে বেশি কিছু আশা করিনি আমি।

২০১১ সালে যখন প্রথম রাতারগুল ঘুরে এসে এটিএন নিউজে প্রতিবেদন করেছিলাম। তাতে বিজ্ঞজনেরা যা বলার চেষ্টা করেছিলেন– আর বর্তমানে ২০১৪ সালে এসে যে রাতারগুল নিয়ে আন্দোলন করতে পরিবেশকর্মীদের রাজপথে নামতে হয়েছে– তার সবকিছুই যেন আমাকে অবাক করে না।

২০১১ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর এই প্রতিবেদনের উপর এক ঘণ্টা টক শো (নিউজ আওয়ার এক্সট্রা) তে তৎকালীন পর্যটন মন্ত্রী বলেছিলেন, রাতারগুলকে তার স্বীয় বৈশিষ্টেই রাখা হবে। দেশের মধ্যে অন্যতম একটি এক্সপিডিশনাল ট্যুরিজম স্পট হিসেবে বিবেচনার কৌশল নিবেন তিনি। কিন্তু তিনি তো বাংলাদেশের মন্ত্রী!

অন্যদিকে, এর জন্য আমরাই (গণমাধ্যম) বেশি দায়ী। আগন্তুকদের খুব বেশি দায় দেওয়ার সুযোগটা অনেক কম। কারণ, গণমাধ্যমে যেভাবে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে, সারা দুনিয়ার পর্যটকদের তাতে হুমড়ি খেয়ে রাতারগুলে ভিড় জমানোটা খুব বেশি হয়নি তাদের।

বলছি শুরুর দিকের কথা। যে যেভাবে পারি রাতারগুলের বাহ্যিক সৌন্দর্য তুলে ধরে ‘বাহবা’ কুড়িয়েছি নিজেদের মিডিয়ায়। কিন্তু ভুল করেও রাতারগুল কী, কেমন করে আছে, কেন এটি অন্য বনের চেয়ে আলাদা কিংবা রাতারগুলের বংশপ্রণালীর খোঁজ করিনি কেউ। যা তথ্য দিয়েছি তাও আবার গৎবাধা। এখানে বসবাস করে এমন সব জীবজন্তুর হিসাব পাঠক/দর্শকের সামনে দিয়েছি, তাও আবার ভুল ছিল অধিকাংশই।

একটু বেশি বলা হল কি? না। ভুল বলছি, কারণ যে সংখ্যাই দিয়েছি তাতে বলছি এ্ই সব এখানে বসবাস করে। আসলে কি রাতারগুল-পরিবার এমন? সুয়াম্প ফরেষ্টের বৈশিষ্টই যেখানে রদবদলের, সেখানে কী করে নিশ্চিত হই যে, এখানে এত প্রজাতির প্রাণি বসবাস করে!

আমার কথা না মানতে পারেন। না মানলে কিছু যায় আসে না। তবে আসুন আমরা আরও পড়ি। জানতে চাই রাতারগুলকে এবং যার যার অবস্থান থেকে রাতারগুল বাঁচানোর আন্দোলনে অংশ নিই।