তারেক জিয়া সত্য বলেছেন। যেমন সত্য বলে তার দল বিএনপি। “শেখ মুজিব পাকিস্তানিদের কাছে আত্মসমর্পণের পর দিশেহারা জাতিকে স্বাধীন করতে মেজর জিয়াই স্বাধীনতা ঘোষণা করেন”– এটাও সত্য। বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন ১৫ আগস্ট, এ-ও সত্য। তেমনি সর্বশেষ সত্য হল– জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জন্য এসবই সত্য। কারণ এ ‘সত্য’গুলোই বিএনপির রাজনীতির প্রাণ।

প্রকৃত সত্যের প্রতি যাদের দায়বদ্ধতা, যারা প্রকৃত সত্য ও বানিয়ে নেওয়া, চাপিয়ে দেওয়া সত্যের মধ্যে পার্থক্য করতে জানেন এবং যারা ইতিহাসের সাক্ষী ও কুশলী তারা এসবে অস্বস্তি বোধ করেন। কিন্তু নির্মোহভাবে বিএনপির রাজনীতির তত্ত্ব ও চর্চা বিশ্লেষণ করলে বুঝতে পারা কঠিন নয় যে, সত্যের নামে এসব ‘হোক্স’ই (A hoax is a deliberately fabricated falsehood made to masquerade as truth) তাদের রাজনীতির প্রাণভোমরা।

মাঝখানে কিছু প্রক্রিয়াগত ও কৌশলগত বিলম্ব থাকলেও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলটির প্রকৃত জন্ম আগস্ট ১৫, ১৯৭৫, শেখ মুজিবের রক্তাক্ত লাশের উপর। আগস্ট পনেরোর সেই রক্তাক্ত ভোরে ঘাতকের গুলিতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি শেখ মুজিব, গড়পড়তা বাঙালির চেয়ে তাঁর দীর্ঘ দেহটি নিয়ে শুধু একাই নিহত হলেন না, শেষ হল একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরের বিকেলবেলায় এক অবিস্মরণীয় গৌরবের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিও।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলটির প্রকৃত জন্ম আগস্ট ১৫, ১৯৭৫, শেখ মুজিবের রক্তাক্ত লাশের উপর

ব্যক্তির মৃত্যুতে তার দেহ বর্জিত হয়, আর রাষ্ট্রের মৃত্যুতে সেটির চরিত্র। ইসলামিক রিপাবলিক পাকিস্তানের পূর্বাংশের মৃত্যুর বিনিময়ে যে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম, সেটির চরিত্র তাই আলাদা। সেটি ইসলামিক রিপাবলিক না হয়ে ধর্মনিরপেক্ষ, চর্চায় সম্পূর্ণ না হলেও অন্তত সাংবিধানিকভাবে। তিন বছর ন’মাস পরের আগস্টের ১৫ তারিখেই রাষ্ট্রের চরিত্র বদলাল আবার। মুজিবের হত্যাকারীদের ঘোষণায় ‘পিপলস রিপাবলিক’ বাংলাদেশ আবার হল ‘ইসলামিক রিপাবলিক’। এই নতুন ইসলামিক রিপাবলিকের প্রথম স্বীকৃতিদাতা কে? আরেক ইসলামিক রিপাবলিক, ‘পাকিস্তান’। তাদের দূতিয়ালিতে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর স্বীকৃতির ডালা নিয়ে এগিয়ে আসা, যারা আগের তিন বছর নয় মাসের পিপলস রিপাবলিকের কোনো স্বীকৃতি দেয়নি।

যদিও ক’দিন পর শক্তিশালী প্রতিবেশি ভারতের চাপে নামবদল রহিত হল কিন্তু অন্তর-আত্না বদল হল ঠিকই। পঞ্চম সংশোধনীর বদলে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল সংবিধানের শুরুতে সংযোজন করলেন ‘বিসমিল্লাহ’; ধর্মনিরপেক্ষতা হটিয়ে রাষ্ট্রের মূলনীতি হল ‘আল্লাহর উপর পূর্ণবিশ্বাস’। একাত্তরের পরে ঘাপটি মেরে থাকা, কারাগারে থাকা ঘাতক-দালালরা পুনর্বাসিত হল; গোলাম আযমসহ প্রধান ঘাতকরা ফিরে এল নিরাপদে।

তারপরের বাংলাদেশ আজকের বাস্তবতা।

ব্যক্তি মুজিব ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ঘাতক কারা সে আমাদের জানা, নামগুলো পরিচিত। কতিপয় মাঝারি র‌্যাংকের কিছু সেনাকর্মকর্তা আর লোলুপ রাজনীতিকের দল– স্রেফ এ-ই? আর কেউ নয়? ব্যক্তি মুজিবের সঙ্গে এই যে রাষ্ট্র নিহত হল, অন্তত রাষ্ট্রের চরিত্র– এ কেবল তাদেরই ষড়যন্ত্র? এই রাষ্ট্রহত্যার, এই মতাদর্শিক বদলের পেছনে কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক ইন্ধন, যোগসাজশ কিছুই নেই?

আমার মনে হয়, এই জায়গাটা একেবারে অনুচ্চারিত রয়ে গেছে বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে। যে কোনো রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনেই বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা থাকে। ধর্মজীবী পাকিস্তান থেকে ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের রূপরেখা প্রণয়নেও বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা ছিল গৌরবের। রাজনীতির মিছিলে কিংবা যুদ্ধের মাঠে তারা ততটা প্রকাশ্য না হলেও রূপকল্প প্রণয়নে তারাই ছিলেন অগ্রণী। তারপর আবার ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ বাংলাদেশ থেকে ‘বিসমিল্লাহ’ যুক্ত, ‘আল্লাহর উপর পূর্ণবিশ্বাসী’ বাংলাদেশ। যে মুসলিম বাংলার জন্য মুজিবরের মৃত্যুর কোনো বিকল্প ছিল না– তার রূপকল্পে কোনো বুদ্ধিজীবী ছিলেন না?

বুদ্ধিবৃত্তিক ইন্ধন রয়েছে ১৫ আগস্টকে খালেদা জিয়ার জন্মদিন হিসেবে প্রচার করার পেছনেও

শেখ মুজিবের প্রবাদপ্রতীম ইমেজের বিপরীতে জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে প্রচার ও প্রতিষ্ঠার চেষ্টা যেমন কেবলই নিম্নশ্রণির রাজনীতি নয়, এর পেছনেও রয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক ইন্ধন– তেমনি ইন্ধন রয়েছে ১৫ আগস্টকে খালেদা জিয়ার জন্মদিন হিসেবে প্রচার করার পেছনেও। কেবলমাত্র হতাশা, ক্ষোভ, রাগপ্রকাশ নয়– ঠাণ্ডা মাথায় বুঝা জরুরি যে এই সময়ে কেন আবার নতুন ‘হোক্স’– কেন আবার জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দাবি। এমন তো নয় যে, তারেক জিয়ার একদিন ঘুম ভাঙল আর ঘুম থেকেই উঠেই তিনি এই দাবি করে বসলেন। এই দাবির পেছনেও পরিকল্পনা আছে, আছে প্রস্তুতি, আছে বুদ্ধিবৃত্তিক আয়োজন।

তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে ইতিহাসের অনেক কিছুই এখন নতুন প্রজন্মের কাছে সহজলভ্য; সহজে মেলে এখন তর্ক-বিতর্ক-সিদ্ধান্ত। শেখ মুজিবকে আত্মসমর্পণকারী সাজিয়ে জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার প্রকৃত ঘোষক তথা মহানায়ক বানানোর ধান্দাবাজি এই সময়ে এসে আর ধোপে টিকছে না। গণধিকৃত জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ‘নাছোড়বান্দা প্রেম’, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধিতা, সরকারবিরোধী আন্দোলনের নামে দায়িত্বহীন সন্ত্রাস, নির্বাচন বর্জনের মাধ্যমে তৃণমুল সংগঠনকে হতাশ করে ফেলা– সবকিছু মিলিয়ে বিএনপির এই দিশেহারা সময়ে নতুন ‘হোক্স’ দরকার। এটা নিয়ে তর্ক হবে, আলোচনা হবে, কিছু মানুষ গিলবে, কিছু মানুষ উগড়াবে। মিথ্যে প্রচারণা যে রাজনীতির প্রাণভোমরা, নতুন মিথ্যেয় তার প্রাপ্তি ছাড়া হারানোর কিছু নেই।

শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে বিএনপির প্রতিষ্ঠা ও টিকে থাকার রাজনীতির পেছনের ‘বুদ্ধিবৃত্তিক মকারী’ সবসময় আলোচনার বাইরে থেকে গেছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রসঙ্গে আমরা কোনো কোনো বুদ্ধিজীবীকে নতুন করে চিনেছি। এমনিতে যাদের কেউ কেউ ‘সুশীল‘ কিংবা ‘বাম’ তকমাধারী– অথচ তাদের কথায়, লেখায়, আলোচনায় যুদ্ধাপরাধীদের ‘সাফাই’।

এই সময়ে বোধকরি বুদ্ধিবৃত্তিক মকারীর বিরুদ্ধে আরও সচেতন হওয়া জরুরি– যেমন শার্ল দ্যা গল উচ্চারণ করেছিলেন–

Intellectuals must be held accountable for the consequences of the ideas they propagate.

হাসান মোরশেদপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান গবেষক, www.1971archive.org

২২ Responses -- “তারেক জিয়ার সত্য-মিথ্যা: বুদ্ধিবৃত্তিক দায়বদ্ধতা”

  1. kazi Hussain

    এসব মিথ্যা বলা বন্ধ করতে হবে বিএনপিকে। সত্য স্বীকার করার মতো সাহস থাকতে হবে এই দলটির। ছাড়তে হবে জামায়াতে ইসলামীকে। তাহলেই এই দলটির বাংলাদেশে একটা ভবিষ্যত থাকবে।

    রাজনীতিতে শুধু ধর্মের ব্যবহার যথেষ্ট নয়…

    Reply
  2. rahman

    যদি আপনার যুক্তিগুলো যথার্থই মনে করেন তাহলে আরও বলেন, জিয়া শুধু ‘রাষ্ট্রপতি’ হিসেবেই ‘অবৈধ’ নন, বলেন তিনি ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ হিসেবেও অবৈধ। কেননা সামরিক বাহিনী একটি সাংবিধানিক রাষ্ট্রের প্রধান স্তম্ভ। বলেন, তিনি সেই স্তম্ভের আইন লঙ্ঘনই শুধু নয়, সাংবিধানিক রাষ্ট্রের শপথও ভঙ্গ করেছেন!

    এ জন্য তার বিরুদ্ধে কোনো মামলাও প্রযোজ্য নয়। তিনি ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার যোগ্য অবৈধ ঘোষণা দিয়েছেন। কাজে কাজেই সে যুদ্ধ এবং তার মধ্য দিয়ে সে নবীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ও কি ‘অবৈধ’ হয়ে যাবে? আর সেই সুবাদে পরবর্তী সব প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রীও কি তা-ই হবেন? এরপর কি আরেকটু অগ্রসর হয়ে সেটাই বলবেন নাকি!

    কিন্তু এ কথা তো ঠিক, শেখ মুজিবসহ আমরা/আপনারা সবাই জিয়ার সেই স্বাধীনতা ঘোষণার সুবিধাভোগী শ্রেণি ছাড়া আর কিছুই নই? বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধে কোন জন? মৃত্যুর পরোয়া না করা সেই সাহসী লোকটিই তো!

    কই, বীরপুঙ্গবরা সেদিন কোথায় ছিলেন? লেজ গুটিয়ে তো বেবাকতেই তখন ইঁদুরের গর্তে পালাইয়া ছিলেন। কেউ তো সেই বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধতে এগিয়ে আসেননি! কেন মৃত্যুর ভয়েই তো, নাকি?

    যেই মাত্র সাহসী একজন এগিয়ে এল, তখনই তো প্রথম এ দেশের চাষাভুষা, গ্রামের সাধারণ মানুষ সে ডাকে একযোগে ভল্লার মতো ঝাঁপিয়ে এল। আর উনারা কী করেছেন? শিক্ষার জোরে তাদের নেতা সেজে বসেছেন। এই তো তাদের যোগ্যতা। এর বেশি কিছু কী!

    সেই যে ভাসানী ও তার আগে-পরে শেখ মুজিবসহ কতজনেই স্বাধীনতার ঘোষণা করেছেন। কই, কেউ তো অস্ত্র ধরেননি? যে পর্যন্ত না ২৫ মার্চের কালরাত এল, তার আগে কেউ কি অস্ত্র ধরেছিল? তার মানে, ২৫ মার্চের ওই ঘটনা না ঘটলে জিয়ারও আত্মপ্রকাশ ঘটত না এবং বাংলাদেশেরও অভ্যুদয় ঘটত না। আপনারা ধরতেন অস্ত্র, আপনারা করতেন দেশ স্বাধীন?

    বয়েই গেছে! দেখছেন না এত বড় বিরোধী দল হওয়া সত্ত্বেও আন্দোলন গড়তে পারল না বিএনপি-জামায়াত গং? রাজনৈতিক দল কি এতসব পারে, যদি তাদের ওপর পুরা রাষ্ট্রযন্ত্রই ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানিদের মতো?

    এর জন্য চাই সে রকমই প্রতিরোধ, যে রকম প্রতিবন্ধকতা আসে। আর সেটা কি সাংবিধানিক রাজনৈতিক দলের পক্ষে সম্ভব? রাষ্ট্রদ্রোহিতা হয়ে যাবে না!

    সেই কাজটিই করে ফেলেছিলেন তরুণ মেজর জিয়া। এ যদি তিনি না করতেন তাহলে কখনও-ই কোনো সাংবিধানিক রাজনৈতিক দল হত না। তা কিন্তু কিছুতেই বাস্তবায়ন হত না, যতক্ষণ না মেজর জিয়া বা অন্য কোনো সামরিক কর্মকর্তা ব্যারাক থেকে বেরিয়ে গিয়ে তার শপথ ভঙ্গ করে বিদ্রোহী হয়ে উঠতেন।

    সেটা কি বেসামরিক লোকদের দিয়ে সম্ভব হত? সাধারণ আন্দোলনই তো গড়তে পারে না তারা। তার দৃষ্টান্ত সামনেই। বিএনপি-জামায়াত। আওয়ামী লীগ যে শিক্ষা দিল তাও ওরা প্রয়োগ করবে যদি আগামীতে ক্ষমতায় আসতে পারে।

    বাট আর কি ওরা ক্ষমতায় আসতে পারবে? ওদের সমর্থক হিসেবে যতক্ষণ আছেন, আওয়ামী সরকারের ভয় কী। ওই ইয়াহিয়া খানের নিয়মেই চলবে তাদের দমননীতি। কেননা এখন তো আর স্বাধীনতার ডাক দেওয়ার সুযোগ নেই।

    স্বাধীন তো হয়ে গেছে, যেভাবে পার দমন কর…

    Reply
  3. Md. Munzur Morshed

    জিয়া স্বাধীনতার ঘোষক, প্রথম রাষ্ট্রপতি হলে তার পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র বা মন্ত্রীপরিষদে কে কে ছিলেন– তারেকের কাছে আমার প্রশ্ন।

    প্রথম রাষ্ট্রপতি আবার এমএজি ওসমানীর নির্দেশে এক সেক্টর থেকে অন্য সেক্টরে বদলি হন কীভাবে?

    রাষ্ট্রপতি সাহেব কোন কোন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা প্রতিনিধির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন জানালে প্রাণখুলে হাসব!

    জেলে যাবার আশংকায় যিনি বাংলাদেশের মাটিতে পা দিতেই ভয় পান, তার রাজনীতি কতদিনের সহজেই অনুমেয়।

    আমি মনে করি, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে রাজনীতি করার জন্য জামায়াতের মতো বিএনপিও পাকিস্তানের সৃষ্টি।

    Reply
  4. aminur rashid

    ভালো বিশ্লেষণ। আমার ধারণা এই গ্রেটেস্ট ব্লান্ডারটি জনগণের মধ্যে ভুল ও মিথ্যার ঠাঁই করে দিতে ঘটানো হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ খুব সিম্পল কিন্তু সতর্ক। রাজনীতিবিদরা তাদের ভুল ধারণা দিতে চেষ্টা করছেন বটে, তবে সত্য অস্বীকার করা যাবে না। জনগণ জানে কে কী করেছে। তাই এটা খুব লজ্জার ব্যাপার যে, কিছু বুদ্ধিজীবী-প্রফেসর-সাংবাদিক-গ্রগতিশীল ছাত্রনেতা এসব ডাহা মিথ্যের বিরুদ্ধে কিছু বলছেন না।

    কবি দান্তের লেখা থেকে তুলে ধরছি–

    ‘‘নরকের সবচেয়ে অন্ধকার জায়গাগুলো তাদের জন্যই সংরক্ষিত থাকবে যারা নৈতিক সংকটের সময় তাদের ‘নিরপেক্ষতা’ ধরে রাখবেন।’’

    যত তাড়াতাড়ি তারা তাদের কর্তব্য বুঝতে পারবেন, তারা ততই দেশের ভালো করতে পারবেন, ভালো করতে পারবেন দেশের মানুষের, যদি সত্যিই তারা সেটা কেয়ার করেন।

    Reply
  5. rahman

    পল্টন ময়দানে বা রাজনৈতিক ময়দানে ‘স্বাধীনতার’ ডাক দিলেই যদি তিনি স্বাধীনতার ঘোষক হয়ে যান এবং এ সুবাদে যদি তিনিই পয়লা ‘প্রেসিডেন্ট’ হয়ে যান, তাহলে তো ভাসানীই তা হয়ে যেতেন (এবং তা হয়ে নিশ্চিত ‘ফাঁসিকাষ্ঠে’ ঝুলতেন, আর মুজিব যদি পয়লা ‘স্বাধীনতার ডাক’ দেন-ই এবং সে সুবাদে ‘প্রেসিডেন্ট’ হনই তাহলে ধরা দেওয়ার পরও, সংবিধান অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার তরতাজা প্রমাণ পাওয়ার পরও (যদি আওয়ামীদের মত অনুযায়ী, মুজিব পয়লা স্বাধীনতার ডাক দিয়েই থাকেন এবং প্রেসিডেন্ট ঘোষণাকারী হন) তাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে সেই ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলতে হল না কেন? এ প্রশ্নটি নির্বোধ, আহাম্মক ও জ্ঞানপাপী ছাড়া কে এডিয়ে যাবে)।

    এছাড়া রাজনৈতিক ময়দানে এ রকম আলটপকা স্বাধীনতার ঘোষণা আগে-পরে তৎকালে যখন-তখন অনেক ছোট-বড় নেতা দিয়ে বসেছিলেন। কিন্তু ওগুলো রাজনৈতিক বক্তব্যই। না হলে কিন্তু তখন তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ মামলা হয়ে যেত। কিন্তু তা হল না কেন?

    আর জিয়া ব্যারাক থেকে বেরিয়েই যাননি, তার এক উর্ধ্বতন অফিসার লে. কর্নেলকে হত্যাও করেন নিজ পথের কাঁটা সরাতে। আর এভাবে সামরিক ময়দানে স্বাধীনতার ডাক মানেই তো তার বিরুদ্ধে অবধারিত মৃত্যু পরোয়ানা জারি হয়ে যাওয়া। এই সাহস আর যা-ই হোক, কোনো সামরিক অফিসারের হওয়ার কথা নয়। আর এটাই হচ্ছে আসল ডাক।

    এ হল সেই ‘বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাজাবে কে,’ সে ডাকে সাড়া দেওয়া। এ ডাকে যে-সে সাড়া দেয় না। আওয়ামী লীগে, ছাত্রলীগে বহু বীরপুঙ্গব ছিল; কই তারা তো সে ডাক দিতে এগিয়ে আসেনি?

    আসল কথা হচ্ছে, এ ডাকেই সমরাস্ত্র প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু রাজনৈতিক ময়দানে স্বাধীনতার ডাক ফাঁকা বুলি ছাড়া কিছুই নয়। ফাঁকা বুলি বলেই ভাসানী বা তৎকালীন অপরাপর নেতার ডাকে তৎকালীন সরকার তাদের বিরুদ্ধে সাংবিধানিক কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। রাজনৈতিক ময়দানে, রেসকোর্সে, পল্টন ময়দানে, সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে ‘লগি-বৈঠা’, ‘দা-খুন্তি-কোদাল-সাবল’, ‘যার যা আছে’ মার্কা ঘোষণা দেওয়া যায়।

    তাতে বড়জোর মামলাও হবে। তারপরই জামিনে বেরিয়ে যাবে। কিন্তু ওই যে জিয়া যে ডাক দিয়েছিলেন, তাতে কিন্তু কোনো মামলাই হবে না। ডাইরেক্ট মৃত্যু পরোয়ানা।

    আরে, জিয়া তো তার হাতের মুঠোয় মৃত্যুকে বহন করে রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়তেই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেছিলেন। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রনীতি অনুযায়ী যিনি এ কাজটি করেন, তিনিই অল ইন অল।

    কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী রাষ্ট্রনীতিটা আধাআধি বুঝেই লম্ফঝম্ফ করেন। পুরোটা যদি জানতেন তাহলেই তারা বুঝতে পারতেন যে, জিয়া কী ঝুঁকিটা নিয়েছিলেন। যা কোনো বুদ্ধিজীবী, সাংবিধানিক নিয়মনীতিনিষ্ঠ রাজনীতিক, কবি-সাহিত্যিক-লেখক দ্বারা হত না।

    কিন্তু এখন তাদের ভাবখানা এমন যে তারাই দেশটা যুদ্ধ করে স্বাধীন করে দিয়েছে! কথার জারিজুরি ও কলম দিয়ে কি দেশ স্বাধীন হয়? এখানে সমরাস্ত্র ও প্রশিক্ষিত সৈনিকই প্রধান নিয়ামক।

    আর জিয়া কি বাধ্য শেখ মুজিবের অর্ডার মানতে? বরং তিনি অলরেডি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের শৃঙ্খলাভঙ্গের জন্য মৃত্যুদণ্ডতুল্য অপরাধ করে বসেছেন। নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করা তো খাড়ার ওপর মৃত্যুদণ্ডের অপরাধ করা। এতে যদি তিনি শেষপর্যন্ত অটল থাকতেন, আর যদি তা ধরে না রাখতে পারতেন তাহলে দেশ স্বাধীন হলেও পরবর্তী সরকার তাকে মৃত্যুদণ্ড দিত।

    এ কারণে জিয়া মুখ ফসকে নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণার পর আর এ নিয়ে কোনো কথা বলেননি। চুপ মেরে গেছেন। নির্বোধ, ব্যারাকের লোক বলেই রাজনীতিটা তখন অত বুঝতেন না বলেই নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণায় শেষ পর্যন্ত অটল থাকতে পারেননি।

    চাইলেই কিন্তু তিনি তা পারতেন। হয়ে যেতে পারতেন বাংলাদেশের জীবন্ত চে গুয়েভারা।

    Reply
  6. nimo

    অবিশ্বাস্য হলেও সত্য তারা এসব করতে পারছে!…

    আমার হাসি কিংবা কান্না পায় না, শুধু মনে হয় তারা পারছে। রাজনীতি একটু নোংরাই হয়, তাই বলে এতটা হতে পারে ভাবতে পারি না। তবু বাস্তবিকিই তারা পারছে…..!!!

    মূর্খের দেশেই কেবল এটি সম্ভব। আমরা তো মূর্খই…!!!

    Reply
  7. চ ম ক হাসান

    ইতিহাসে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ে ভাগ বসাতে বিএনপির এই আত্মপ্রসাদ লাভের প্রয়াস। বিভিন্ন ইস্যুতে রাজনৈতিক ‘কনফ্লিক্ট’ তৈরি করে প্রাধান্য বিস্তারের চেষ্টা বিএনপির মজ্জাগত অভ্যাস।

    সর্বশেষ ধাপে তারা করতে পারে ‘জাতির জনক’ ইস্যুতে….

    বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য, আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো ‘স্ট্যান্ডার্ড’ রাজনৈতিক দল নেই!

    Reply
    • trn111

      “বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য, আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো ‘স্ট্যান্ডার্ড’ রাজনৈতিক দল নেই!”
      perfect remark

      Reply
  8. শাহরিয়ার মুস্তাফিজ

    চমৎকার বিশ্লেষণ। অপরাজনীতির পেছনে অপ-বুদ্ধিজীবীদের হাত নিয়ে আলোচনা অবশ্যই দরকার।

    ধন্যবাদ লেখককে। আরও লেখা চাই।

    Reply
  9. Kibria Zahid Mamun

    ১ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৮ এ জন্ম নেওয়া বিএনপি কী করে ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ এ জন্ম নিল?

    আপনিও খালেদা আর তারেকের মতোই জিয়া প্রথম প্রেসিডেন্ট বলে মনে হয় ভুল বকছেন। আর মুজিবকে কারা মেরেছিল একটু বলবেন প্লিজ। জানামতে, মুক্তিযোদ্ধারা, যারা একদিন মুজিব সাহেবের ডাকে তখনকার পৃথিবীর আধুনিক আর্মির সামনে দাঁড়িয়েছিল!

    মুজিব সাহেব নিজেকে আজীবন প্রেসিডেন্ট ডিক্লেয়ার করেছিলেন। সমস্ত পত্রিকা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। দুর্নীতির কারণে চুয়াত্তরে দুর্ভিক্ষ হল। ভুলে গেলেন এসব!

    ছেলেভুলানো গল্প আমরা বুঝি, সত্য বলুন, সত্যের সঙ্গে থাকুন, নিরপেক্ষ হোন।

    Reply
    • Kintuki Tarkabagish

      লেখাটা ভালো করে পড়ুন। লেখক বলেছেন–

      “মাঝখানে কিছু প্রক্রিয়াগত ও কৌশলগত বিলম্ব থাকলেও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলটির প্রকৃত জন্ম আগস্ট ১৫, ১৯৭৫”।

      পথভ্রষ্ট মুক্তিযোদ্ধারা এইসব করেছে। বাকশাল কী আর কেন করা হ্য়ছিল ভালো করে জানুন। সঠিক ইতিহাস জানুন। দলের শেখানো বুলি থেকে বের হন। দলকানা হলে কখনও সত্য জানবেন না।

      দুর্ভিক্ষের কারণ ঠিক করে জানুন। ছেলেভুলানো মিথ্যা কথা আপনার দল বলতে পারে, ইতিহাস পারে না।

      আমার মনে হ্য় না যে একাত্তরে আপনার বোঝার মতো বয়্স ছিল, না হ্য় আপনি বর্তমান বুদ্ধিজীবীদের মতো জ্ঞানপাপী!

      Reply
      • kazi Hussain

        বাকশালের সংবিধান পড়ুন… চীনের ‘এক দেশ এক দল’ নীতির দিকে তাকান… তারপর মন্তব্য করুন…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—