Feature Img

Omi Rahman Pialকালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের (ইটস জাস্ট আ ট্রান্সমিটার) উদ্যোক্তা এবং জিয়াকে এতে সম্পৃক্ত করার পেছনে আছেন একজন অবাঙালি! অবিশ্বাস্য, তাই না? রহস্যময় এই চরিত্রের নাম মাহমুদ হোসেন। তিনি নায়ক না খলনায়ক তা মূল্যায়িত হওয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করেছেন; তবে তাতে রহস্যটা মেটেনি। বাস্তবতা হচ্ছে, ২৬ মার্চ রাত দশটায় ‘হ্যালো ম্যানকাইন্ড’ বলে ভরাট কণ্ঠের উচ্চারণে কালুরঘাট ট্রান্সমিটারটি আবারও সচল করেছিলেন মাহমুদ হোসেন। মৃত্যুর আগপর্যন্ত তার তৎপরতায় বোঝা গেছে, তিনি আসলে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন বাঙালিদের। তবে ঠিক কীভাবে সেটি রহস্যই রয়ে গেছে।

শুরু হোক মাহমুদ হোসেনের রহস্যময়তার। আরম্ভ করছি কালুরঘাটে সে সময় উপস্থিত এবং জিয়ার অন্যতম সহচর মীর শওকত আলীর স্মৃতিচারণ দিয়ে—

‘‘…কক্সবাজার যাওয়ার পথে কালুরঘাট ব্রিজ পেরুলেই রাস্তাটা একটা ঢালের তীক্ষ্ম বাঁক নিয়েছে। তারপর এগিয়ে গেছে সোজা পটিয়া, দুলাহাজরা এবং কক্সবাজার হয়ে মূল ভুখণ্ডের সর্বদক্ষিণের প্রান্ত টেকনাফের দিকে। ঢালের শেষ মাথায়, যেখানে রাস্তাটা আবার সোজা হয়েছে, একটা পেট্রোল পাম্প আছে। পাম্পটা ইতোমধ্যে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, অন্ধকারে ডুবে ছিল জায়গাটা। একপাশে কিছু গাছের গুঁড়ি স্তূপাকারে রাখা, কিছু খালি বাসও ছিলও এখানে। পলায়নপর ড্রাইভাররা ফেলে রেখে গিয়েছিল। পাম্প স্টেশনের আশেপাশে গোটাকতক গাড়ি আর পিকআপও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা ছিল। ক্রমশ রাত ঘনিয়ে এল।

রাত তখন আটটা। একটা গুঁড়ির উপর বসে কথা বলছিলাম আমি আর অলি। একটা বাসের ভেতর বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন জিয়া। হঠাৎ একটা লোককে এগিয়ে আসতে দেখলাম আমরা। মোটামুটি দীর্ঘকায়, চমৎকার চেহারা, মাথায় লম্বা চুল, বয়স মধ্য ত্রিশের মতো হবে। আগন্তুক আমাদের কাছে এসে জানালেন, জিয়ার খোঁজ করছেন তিনি। মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম আমি আর অলি। কারণ ওই অবস্থায় ব্যাপারটা কেমন যেন রহস্যময় মনে হচ্ছিল।

যাহোক, আমরা তার পরিচয় জানতে চাইলাম; জিয়াকে তিনি চেনেন কীভাবে। কিন্তু পরিচয় বা উদ্দেশ্য জানাতে রাজি হলেন না ভদ্রলোক। জিয়ার সঙ্গে দেখা করার জন্য জোর করলেন। আমি চমৎকার আমেরিকান উচ্চারণ ভঙ্গীতে আলাপরত আগন্তুককে নিয়ে ব্যস্ত। ঠিক তখন ক্যাপ্টেন অলি গিয়ে জিয়াকে নবাগতের উপস্থিতির কথা জানালেন। একটু বাদেই অলি ফিরে এসে বললেন, ভদ্রলোককে বাসের ভেতর নিয়ে যেতে বলেছেন জিয়া।

আগন্তুককে নিয়ে আমরা বাসে অপেক্ষারত জিয়ার কাছে এলাম। জিয়া আমাদের দুজনকে বেরিয়ে যেতে ইশারা করলেন। আগন্তুককে আগেই তল্লাশি করা হয়েছিল, জিয়ার একখানা ফটোগ্রাফ ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায়নি তার কাছে। আগন্তুকের সঙ্গে জিয়াকে একা রেখে বেরিয়ে এলাম আমরা।…’’

(মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় প্রথম প্রতিরোধ: লে.জে মীর শওকত আলী; গোলাম মোস্তফা সম্পাদিত ‘অনন্য জিয়াউর রহমান’, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, আগস্ট ২০০৪)

২৭ মার্চের সে রাতের ঘণ্টাখানেক একান্ত আলাপচারিতার পর আগন্তুক যখন বেরিয়ে গেলেন, জিয়া তার পরিচয় দিলেন সঙ্গীদের। লোকটা আমাদের বন্ধু, আমাদের একটা উপকার করতে চায়। কী উপকার, কী তার ধরন সে আলোচনায় একটু পরেই আসছি। কিন্তু মীর শওকতের লেখায় বা আর কোথাও সেই ফটোগ্রাফের রহস্য মেলে না। কীভাবে একজন বিদেশির বুকপকেটে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন অফিসারের ছবি এল তা জানা হয় না আমাদের। তার আগেই অবশ্য বিপ্লবী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে জিয়া বঙ্গবন্ধুর পক্ষে তার স্বাধীনতার প্রথম ঘোষণাটা পড়ে ফেলেছেন।

তবে জিয়াই প্রথম নন। চট্টগ্রাম শহরে প্রতিরোধ লড়াইটা ঢাকার ঘণ্টাকয়েক আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। এর নেতৃত্বে ছিলেন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের ক্যাপ্টেন রফিক। ২৫ মার্চ রাতে জিয়া যখন পরিস্থিতি আরও ভালো করে বোঝার জন্য ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যদের নিয়ে পটিয়ার দিকে সরে গেছেন (চট্টগ্রাম থেকে প্রায় দুই ঘণ্টার পথ), রফিক তাঁর সীমিত লোকবল ও সামর্থ্য নিয়েই জোর লড়াই লড়ছেন। সেদিন রাত দুটোয় রেলওয়ে হিলে রফিকের ট্যাকটিকাল হেডকোয়ার্টারে আমরা একই আগন্তুকের দেখা পাই।

আগন্তুকের নাম বা পরিচয় রফিক দেননি। মুক্তিযুদ্ধের ওপর লেখা তাঁর ‘লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে’ বইতে আমরা জানতে পারি, একটি বিদেশি রাষ্ট্রের তরফে তাঁকে সামরিক সাহায্যের প্রস্তাব দেন ব্যক্তিটি। শর্ত তার সঙ্গে কক্সবাজার যেতে হবে। ‘আমি যেতে পারব না, আমি ছাড়া এখানে আর কোনো অফিসার নেই’– রফিকের প্রত্যাখ্যানের পর অপরিচিত লোকটি তাঁকে বিকল্প প্রস্তাব দেন রেডিওতে ভাষণ দেওয়ার। আগের গ্রাউন্ডে এবারও প্রত্যাখ্যান করলেন রফিক। বরং একটি টেপরেকর্ডার এনে তাঁর ভাষণ রেকর্ড করে নেওয়ার পাল্টা প্রস্তাব দিলেন।

রফিক লিখেছেন:

‘‘…. এরপরেও অপরিচিত আগন্তুক তার সঙ্গে যাওয়ার জন্য আমার উপর এত চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন যে আমি খুবই সন্দিহান হয়ে পড়লাম। পুরা বিষয়টা পাকিস্তানিদের ফাঁদ হওয়া বিচিত্র নয়– আমি ভাবলাম। আমাকে রাজি করাতে না পেরে তিনি রেকর্ডিং যন্ত্রপাতি নিয়ে আবার আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলে গেলেন। কিন্তু ভদ্রলোক আর কখনও ফিরে আসেননি। পরে আমি জানতে পেরেছিলাম যে তিনি বাঙালি সামরিক বাহিনীর সদস্যদের অন্য একটি দলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তাদেরকে কক্সবাজারের দিকে যাওয়ার জন্য প্রলুব্ধ করেছিলেন। হয়তো কক্সবাজারের দিকে যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধের স্থান থেকে বাঙালি সৈন্যদেরকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া। শেষ পর্যন্ত জনগণ অবশ্য তাকে সন্দেহজনক কার্যকলাপের কারণে মেরে ফেলে। তবে তার এসব কার্যকলাপের পেছনে আসল উদ্দেশ্য কী ছিল সেটা হয়তো আর কখনও-ই জানা যাবে না।’’

rafiq1-ed 2-ec85e2b127-ed

এ পর্যন্ত সবাই ‘আগন্তুক’ হিসেবেই তার পরিচয় দিয়েছেন; সেটা আরও রহস্যময় করে তুলেছেন বেলাল মোহাম্মদ নিজে তার পরিচয় গোপন করে। অবশ্য ‘মাহমুদ হোসেন’ নামে আমাদের আলোচিত রহস্যপুরুষটির জাতীয়তা ও পরিচিতি সম্পর্কে পরস্পরবিরোধী তথ্য রয়েছে। মীর শওকত তার চোস্ত আমেরিকান ইংরেজিতে মুগ্ধ; রফিকের মনেই হয়নি তিনি বাঙালি। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সফল রূপকার বেলাল মোহাম্মদ নিশ্চিত করেছেন, তিনি বাঙালি। কিন্তু বেগম মুশতারী শফি তাকে উল্লেখ করেছেন ‘ভারতীয়’ বলে। বাংলাদেশে কবে থেকে আছেন এবং কী উদ্দেশ্যে এটা নিয়েও দুজনের মন্তব্য দু’ধরনের।

এখানে না বললেই নয়, সে সময় এনায়েতবাজারে ডাক্তার শফির বাসা কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের লোকদের একটি আড্ডা গড়ে উঠেছিল এবং বেলাল মোহাম্মদ ছিলেন সেখানকার নিয়মিত অতিথি। এটাও বলতে হবে যে, স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বেলাল মোহাম্মদ যে ক’টি সাক্ষাতকার দিয়েছেন তাতে তিনি মিথ্যে না বললেও সত্য গোপন করে গেছেন। কৌশলে আড়াল করেছেন ‘মাহমুদ এপিসোড’। কখনও তাঁর লেখায় এসেছে ‘গাড়ি চালাচ্ছিলেন আমার এক বন্ধু’।

এমনকি বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমে দেওয়া সর্বশেষ সাক্ষাতকারটিতেও একবারই মাহমুদের উল্লেখ ছিল তাঁর মুখে। সেখানে তাকে ‘আগ্রাবাদ হোটেলের প্রোমোটার জাতীয়’ কিছু বলা হয়েছে। ভিডিওতে তার নাম বলা হলেও যিনি সেটি শুনে শুনে লিখেছেন, তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ঠেকেনি মাহমুদ হোসেনকে, তাই বাদ দিয়েছেন!

আর বেলাল মোহাম্মদের ব্যাপারটা হল, উনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র নিয়ে একটি বই লিখেছেন। এরপর ‘স্বাধীনতার ঘোষক বিতর্ক’ নিয়ে বিডিনিউজের আগে ডয়চেভেলেও তাঁর একটি সাক্ষাতকার রয়েছে। সব ক্ষেত্রেই তিনি বইয়ের বক্তব্যটি ধরে রেখেছেন– কালুরঘাট ট্রান্সমিশন সেন্টারটি চালু করা, সেটার প্রতিরক্ষার জন্য রফিককে না পেয়ে পটিয়া থেকে জিয়াকে নিয়ে আসা। তারপর কৌতুকছলে বলা– ‘এখানে তো সবাই মাইনর, আপনিই একমাত্র মেজর, আপনি আপনার নামে একটি ঘোষণা পড়ুন না’। কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই জিয়া তাঁর অনুরোধে সাড়া দিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেছেন।

সুস্পষ্টভাবেই এসবের কৃতিত্ব বেলাল নিজের বলেই দাবি করছেন। এমনকি আঙুলে গুনে জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠকারী নবম ঘোষক, সম্মানী হিসেবে ১৫ টাকার ভাতা পেতেন তখনকার ঘোষকরা– এ জাতীয় রসিকতাও আছে তাঁর বয়ানে।

চারদিনের ওই শব্দ-লড়াইয়ে (প্রোপোগাণ্ডমূলক প্রচারণা অর্থে) বেলাল মোহাম্মদদের কৃতিত্ব কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু একটু ঘাঁটাঘাটি করলেই ছায়া এবং কায়াকে আলাদা করে ফেলা যাচ্ছে। রফিকের মুখেই আমরা শুনেছি, ২৫ মার্চ রাত দুটোয় তাঁর কাছে এসেছিলেন মাহমুদ, রেডিওতে ঘোষণা পাঠের আবদার নিয়ে। বেলালরা কালুরঘাটের ওই ট্রান্সমিশন সেন্টারটি মূল বেতারের বিকল্প হিসেবে চালু করার পেছনে মূল মন্ত্রণাটিও ক্ষুরধার মাহমুদ হোসেনের মাথা থেকে বেরিয়েছে ধরলে, অনেক হিসেবই দুয়ে দুয়ে চারের মতো মিলে যায়। মিলিয়ে দেন বেলাল নিজেই।

২৬ মার্চ সন্ধ্যার পর তাঁরা ওই বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র চালু করে অনুষ্ঠান সম্প্রচার শুরু করেন। রাতে যখন আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ হান্নান সেখানে গেলেন, তিনি বললেন এই ট্রান্সমিটার দিয়ে তিনি সেদিন দুপুরেই একদফা ঘোষণা পাঠ করে গেছেন (বিডিনিউজে বেলাল মোহাম্মদের সাক্ষাতকার ২য় পর্ব)। বইয়ে মূল বেতারের কথা বলে এড়িয়ে গেলেও, সাক্ষাতকারে আর সেটা অস্বীকার করেননি।

কথা হচ্ছে, হান্নান কীভাবে এই ট্রান্সমিশন সেন্টারটি ব্যবহার করলেন, কে তাকে দিয়ে ঘোষণা পাঠ করাতে সাহায্য করেছেন? বেলাল মোহাম্মদ এড়িয়ে গেছেন; আমার ধারণা উত্তরটা তাঁর জানা। মুশতারী শফিই আমাদের জানিয়ে দেন যে, ২৭ মার্চ সকালে তাঁর বাসা থেকেই গাড়ি করে বেলালকে নিয়ে পটিয়া রওনা দেন মাহমুদ। অথচ বেলাল মোহাম্মদ স্মৃতিচারণে এই যাত্রাকে ‘এক বন্ধুর গাড়িতে’ বলে চালিয়ে দিয়ে নিজেকে বসিয়ে রেখেছেন ‘ড্রাইভারের পাশের আসনে’।

আসা যাক বেলাল কীভাবে মাহমুদকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। মাহমুদ হোসেন নিজেকে মূখ্য চরিত্রে রেখে ‘অরিজিন অব হিপ্পিজম’ নামে একটা ছবি তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছিলেন যার প্রেক্ষাপট ভারতবর্ষ। পাশাপাশি তুলে ধরেছেন তার বিপ্লবী চরিত্র। লন্ডনে আইউব খানের এক সভায় নাকি বোমা হামলা চালিয়েছিলেন ভাইয়ের সঙ্গে মিলে। আর মুশতারী শফির বইয়ে ঠিক উল্টো চিত্র পাই আমরা। এখানেই আমরা জানতে পারি সাবেক ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইয়ের ভাতিজি ভাস্করপ্রভার স্বামী মাহমুদ হোসেন।

২৭ মার্চের রোজনামচায় মুশতারী লিখেছেন:

‘‘… এ সময় মাহমুদ হোসেন নামে একজন লোক এল আমার বাসায় বেলাল ভাইকে কোথায় যেন নিয়ে যেতে। মাহমুদ হোসেন ভারতীয় লোক। থাকে কখনও লন্ডন, কখনও আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায়। তার স্ত্রী নাকি ভারতের জনতা পার্টির নেতা মোরারজী দেশাইর ভাইঝি। নাম ভাস্করপ্রভা। তিনি প্রায় মাসকয়েক হল বাংলাদেশে এসেছেন। উদ্দেশ্য, বাংলাদেশের পল্লীগীতি ও বাউল সঙ্গীতের উপর ধারাবর্ণনা সহকারে লং প্লের রেকর্ড বের করবেন। বেলাল ভাইয়ের সাথে তার চুক্তি সংগৃহীত গানের ধারাবর্ণনা লিখে দেবার। উঠেছেন আগ্রাবাদ হোটেলে। চট্টগ্রাম রেডিওর সঙ্গীত প্রযোজক রামদুলাল দেবের সাথেও তার সখ্যতা গড়ে উঠেছে। উনি শিল্পীদের সংগ্রহ করে গানের রিহার্সেল করেন, রিহার্সাল হয় আগ্রাবাদ হোটেলেই। বেলাল ভাইও সেখানে যেতেন।

প্রায় ৬ ফিটেরও ওপর লম্বা কালো লোক, মাথাভর্তি কোকড়া ঝাঁকড়া চুল। দেখলে ভয় লাগে। আজ এসেছেন একটা কালো মরিস মাইনর গাড়ি নিয়ে। গাড়িতে দুজন ইপিআর জোয়ান, গাড়ির দুপাশে বন্দুকের নল বের করে। তার সাথে আরও এসেছেন আগ্রাবাদ হোটেলের সহকারী ম্যানেজার ফারুক চৌধুরী। কেন এসেছেন মাহমুদ হোসেন? কোথায় নিয়ে যেতে চান বেলাল ভাইকে? ডাক্তার শফিকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বেলাল ভাই বললেন, ‘মাহমুদ হোসেন এসেছেন আমাকে নিয়ে যেতে চান, সীমান্তের ওপারে অস্ত্র-সাহায্যের জন্য’।

আমিও কথাটা শুনলাম। শফি আঁতকে উঠে অনেকটা ধমকের সুরেই বলল, ‘খবরদার বেলাল, এ কাজে তুমি কিছুতেই যাবে না ওর সাথে’।

বেলাল ভাই বলল, ‘ঠিকাছে, সীমান্তের ওপারে যাব না, তবে পটিয়া পর্যন্ত যাই। শুনেছি বাঙালি সৈন্যরা এখন নাকি ক্যান্টনমেন্ট এবং শহর ছেড়ে পটিয়ার দিকে গেছে। সেখান থেকে কিছু আর্মড গার্ড নিয়ে আসি। কারণ কালুরঘাট ট্রান্সমিটার ভবনটি এখন নিরাপদ নয়’।

ও আর এই কাজে বাধা দিল না। বেলাল ভাই চলে গেল মাহমুদ হোসেনের সাথে।”

(‘স্বাধীনতা আমার রক্তঝরা দিন’, পৃষ্ঠা- ১০৪)

বেগম মুশতারী শফির ভাষ্যটাই সমর্থন করেছেন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ও মুক্তিযোদ্ধা লে. কর্ণেল নুরুন্নবী বীরবিক্রম। মাহমুদ হোসেন সম্পর্কে যাবতীয় খোঁজখবরের সূত্রপাতও তিনিই। তাঁর লেখা ‘জীবনের যুদ্ধ: যুদ্ধের জীবন’ (কলম্বিয়া প্রকাশনী) নামে একটি বই আছে। সেখানেই ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর রামগড় জেডফোর্স হেডকোয়ার্টারে জিয়ার সঙ্গে মদ্যপানের (রাম) ফাঁকে ফাঁকে নানা আলাপচারিতার উল্লেখেই আমি প্রথম পাই মাহমুদ হোসানকে। মিসিং লিংকগুলো জোড়া দেওয়ার প্রয়াসও তখন থেকেই।

2

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে এক অনুষ্ঠান শেষে নুরুন্নবীকে আমি ধরেছিলাম কথাগুলোর ব্যাখ্যা চেয়ে। আমার সঙ্গী ছিলেন সাংবাদিক ও তথ্যচিত্র নির্মাতা (সামরিক বাহিনীতে গণহত্যাখ্যাত) আনোয়ার কবীর। নুরুন্নবী আমাকে রেকর্ড করতে দেননি, তবে জানিয়েছেন শিগগিরই তার একটি বই বেরোবে যাতে এ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ থাকবে। তিনি যা বলেছিলেন তাই স্মৃতি থেকে হুবহু তুলে দিচ্ছি:

‘‘ওই লোকের পুরো নাম মাহমুদ হাসান (নুরুন্নবী তাকে ‘মাহমুদ হাসান’ বলে উল্লেখ করেছেন; আর তাঁর লেখায় বলেছেন শুধু ‘মাহমুদ’; আমরা অন্য সব জায়গা থেকে জেনেছি তার নাম ‘মাহমুদ হোসেন’)। সত্তরের নির্বাচনের পর থেকেই সে চট্টগ্রাম হোটেল আগ্রাবাদে স্থায়ী আবাস নেয়। লন্ডনে পড়াশোনার সুবাদে মোররাজী দেশাইর ভাতিঝির সঙ্গে প্রেম ও বিয়ে। বাংলাদেশের লোকসঙ্গীতের উপর গবেষণা ও তথ্যচিত্র নির্মাণের কথা বলে সে স্থানীয় মহলে বেশ খাতির জমিয়ে তোলে। তার গুণমুগ্ধদের মধ্যে ছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রখ্যাত বেলাল মোহাম্মদসহ অনেকেই। বেগম মুশতারী শফির স্মৃতিকথায়ও উল্লেখ আছে মাহমুদের। কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষণায় উদ্বুদ্ধ করার ব্যাপারে অগ্রগণ্যদের একজন ছিলেন মাহমুদ। জিয়া বেশ কয়েকবারই বিভিন্ন উপলক্ষে এই গল্প করেছেন তার অধীনস্তদের কাছে।”

নুরুন্নবীর ভাষ্য অনুযায়ী– মাহমুদ জিয়াকে জানান যে, তিনি পূর্ব পাকিস্তানে সিআইএর দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি নাকি এ রকম একটি হাস্যকর যুক্তিতে জিয়াকে কনভিন্স করেন যে, জিয়া যদি একটি বিপ্লবী পরিষদ গঠন করে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন তবে তার সাহায্যের জন্য একদিনের মধ্যে ফিলিপাইন থেকে সপ্তম নৌবহরকে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করে দেবেন তিনি। ২৭ মার্চ জিয়ার প্রথম ঘোষণাটার এটা অন্যতম রহস্য। যদিও উপস্থিতদের চাপে এরপর তিনি ঘোষণা পাল্টান।

মাহমুদ জিয়ার ছাড়পত্র, আগ্রাবাদ হোটেলের পিআরও এবং ক্যাশিয়ার ফারুক ও গনি এবং ইস্ট বেঙ্গলের দুজন সিপাই নিয়ে কক্সবাজার রওয়ানা দেন জনৈক উকিলের সঙ্গে দেখা করতে। এর মধ্যে মীর শওকত ও খালেকুজ্জামানও রওয়ানা হন। পথে দুলহাজারায় একটি ব্যারিকেডে না থেমে এগিয়ে যায় মাহমুদের মরিস মাইনর। পরের ব্যারিকেডে উত্তেজিত জনতা চড়াও হয় তাদের ওপর। মাহমুদ বাংলা বলতে পারতেন না, তাকে বিহারী ভেবে হত্যা করে উন্মত্ত স্থানীয়রা।

মাত্র একজন সিপাই প্রাণ নিয়ে কোনোমতে পালিয়ে আসে। কিন্তু জিয়ার দেখা পাননি; কারণ ২৮ মার্চ জিয়া অলি আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে নিজেই কক্সবাজারে যান। বাংলা ভালো বলতে পারেন না বলে তারও একই সমস্যা হয়, কিন্তু চট্টগ্রামের স্থানীয় লোক অলি সে যাত্রা তাকে পার করিয়ে নেন। কক্সবাজারে পৌছে সপ্তম নৌবহরের কোনো দিশা পাননি জিয়া। খোঁজ মেলেনি শওকতেরও, যিনি রিপোর্ট করেন ৭ এপ্রিল।

খানিকটা ফাঁক রয়েছে নুরুন্নবীর বক্তব্যে। প্রথমত, জিয়া ২৭ মার্চ যে ভাষণটি দেন তাতে নিজেকে তিনি সরকারপ্রধান দাবি করেননি। করেছেন ২৮ মার্চের ভাষণে (যা লে. শমসের মুবিন চৌধুরী বেশ কয়েকবার পাঠ করেন), তৃতীয় দফা ভাষণে (মাহমুদের মৃত্যুর পর আবার পাল্টে দেন ভাষা)। আবার মীর শওকতের ভাষ্য অনুযায়ী, রাত ৮টার দিকেই জিয়ার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাত মাহমুদের। তার অর্থ, পটিয়ায় তিনি এ বিষয়টি নিয়ে মুখোমুখি হননি জিয়ার। আর জিয়ার প্রথম ভাষণটি প্রচার হয় ৭টা ২০ মিনিটে (বেলাল মোহাম্মদের সাক্ষাতকার)। সে ক্ষেত্রে পরদিন জিয়ার ভাষণ এবং মাহমুদের কক্সবাজার যাত্রার যোগসূত্র ওই দ্বিতীয় ভাষণ।

জিয়া মাহমুদকে কেন বিশ্বাস করলেন এটা একটা রহস্যই বটে। কারণ সপ্তম নৌবহর ফুল থ্রটলে চললেও পাঁচ দিনের আগে বঙ্গোপসাগরে ঢোকার কোনো সুযোগ ছিল না। পাশাপাশি বিকল্প হিসেবে ভারত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের অপশনও রেখেছিলেন মাহমুদ। সে ক্ষেত্রে হেলিকপ্টার যোগাড়ের একটা ব্যাপার ছিল। মাহমুদ নিশ্চয়ই সে জন্য কক্সবাজার যাচ্ছিলেন না।

ফেরা যাক মাহমুদের সিআইএ পরিচয় দান নিয়ে (যা জিয়া নিজের মুখে বলেছেন নুরুন্নবীকে)। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মোররাজী দেশাই সিআইএ-র চর হিসেবে কাজ করেছেন বলে প্রমাণ মিলেছে। তার ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে বাবার হয়ে পাচার করা তথ্যের পেমেন্ট আনার। কাকতালীয়ভাবে জিয়ার শাসনামলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী পদে দ্বিতীয় দফা আসীন হয়েছিলেন মোরারজী। তখন মার্কিন ছাতার তলে উপমহাদেশেও বেশ একটা ‘শান্তি শান্তি’ ভাব চলে এসেছিল।

তবে বেলাল মোহাম্মদ বন্ধু মাহমুদের সম্মান রেখেছেন তার মৃত্যুর ব্যাপারটি বিস্তারিত জানিয়ে। অলি আহমেদের মুখেই তিনি খবরটা পেয়েছেন। বেলাল মোহাম্মদের ভাষ্যে:

‘‘সেই ২৭ মার্চ রাতেই তারা ভারতের উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের দিকে এগিয়েছিল তাদের গাড়ি। পথে পুলিশ ফাঁড়িগুলোর সামনে সামনে প্রহরা। একটা লম্বা বাঁশ রাস্তার এপাশ ওপাশ পাতা। সেখানে গাড়ি থামাতে হয়, পরিচয় বলতে হয়। তারপর ছাড়া পাওয়া যায়। বাঁশের একপ্রান্ত উপরে ঠেলে দিয়ে গাড়ি গলিয়ে নেবার পথ করে দেওয়া হয়। ফাঁড়িতে ফাঁড়িতে এমনি যাত্রাবিরতিতে সময় নষ্ট হয়।

মাহমুদ হোসেনের জন্য হয়তো এ ছিল অসহ্য। তিনি তাই জোরে গাড়ি হাঁকিয়ে দিয়েছিলেন। এপাশে ওপাশে পাতা বাঁশ ভেঙে এগিয়ে গিয়েছিল গাড়ি। পরের ফাঁড়িতে টেলিফোনে খবর চলে গিয়েছিল। মাহমুদ হোসেনের পুষ্ট শরীর ও দীর্ঘ চুল চকিতে দেখা গিয়েছিল। সন্দেহ হয়েছিল তিনি অবাঙালি বলে। পরের ফাঁড়ি হারবাংয়ে আটক করা হয়েছিল তাদেরকে। তারপর জিজ্ঞাসাবাদ। গাড়ির মধ্যে পাওয়া গিয়েছিল অনেক টাকাকড়ি। বিদেশি মুদ্রাও। মেজর জিয়াউর রহমানের দেওয়া পরিচয়পত্র হয়েছিল উপেক্ষিত।

ওখানে স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীরাও উপনীত হয়েছিলেন। মাহমুদ হোসেনকে দালাল ঘোষণা করা হয়েছিল। গুলি করা হয়েছিল তিনজনকে। মাহমুদ হোসেন, ফারুক চৌধুরী ও ওসমান গনি। সিভিল পোশাকধারী রাইফেলধারী দুজনকে এবং ড্রাইভারকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।

তিনটি লাশ দু’দিন শঙ্খ নদীতে ভাসমান ছিল। স্থানটির নাম ‘বুড়ো মৌলবীর ট্যাক’। দুদিন পর বুড়ো মৌলবী সাহেব দাফনের ব্যবস্থা করেছিলেন। ১৯৭৩ সালের প্রথমদিকে মাহমুদ হোসেনে পরিবারের সদস্যরা চট্টগ্রামে এসেছিলেন; তাদের নিয়ে আমি গিয়েছিলাম হারবাং এলাকায়। বুড়ো মৌলভী সাহেব তখন গত হয়েছিলেন। তার ছেলে কবরের স্থানটি দেখিয়েছিলেন। শঙ্খ নদীতে ভাঙনের ফলে স্থানটি তখন জলমগ্ন।’’

belal-ed

শামসুল হুদা চৌধুরীর ‘একাত্তরের রণাঙ্গন’-এ সংযোজন হিসেবে মাহমুদ হোসেনের নাম স্বাধীন বাংলা বেতারের চ্যাপ্টারে আছে (৭৫ নং পৃষ্ঠা)। সেখানে তাকে সদ্য লন্ডন থেকে প্রত্যাগত তরুণ ব্যবসায়ী বলে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। এ সূত্রমতে, ২৬ মার্চ রাত ১০ টার পর স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে এনার উদ্যোগে একটি অতিরিক্ত অধিবেশন প্রচারিত হয়। সহযোগী ছিলেন ফারুক চৌধুরী, রঙ্গলাল দেব চৌধুরী ও আরও কিছু কলাকুশলী। ২৭ মার্চ রাতেই মাহমুদ ও ফারুক নিহত হন অজ্ঞাতনামা আততায়ীদের গুলিতে।

এত কিছুর পরও রহস্যই থেকে যান মাহমুদ এবং তার অভিপ্রায়। স্রেফ অস্থিরতার কারণে ‘ক্যাজুয়ালটি অব ওয়ার’ হয়ে যান দুজন নির্দোষ মানুষকে সঙ্গী করে।

অমি রহমান পিয়াল: ব্লগার, অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট।

অমি রহমান পিয়ালব্লগার, অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট

১৫ Responses -- “রহস্যময় মাহমুদ হোসেন ও কালুরঘাট”

  1. arafat shuvo

    আপনার দুইটা পোস্ট পরলাম আজকে। ভালো লাগলো, বেশ ভালো লেখেন। আরো আগেই পরা উচিত ছিল।

    Reply
  2. রাগিব রেজা

    অনেক অজানা তথ্য জানতে পারলাম………….সেই সাথে আরও একটি বিষয় উপলব্ধি করলাম সে সময়ের লেখকরা নির্মোহ সত্য ঘটনার বর্ণনা দেননি, নিজের কৃতিত্ব বর্ণনার দিকেও তাদের ঝোঁক ছিল।

    Reply
  3. Dr. Abdul Karim

    বাংলাদেশের ইতিহাসের সব জায়গায় মেজর জিয়ার অদ্ভূত ও অস্পষ্ট ভূমিকা!

    আমার মতে, তিনি কোনো মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না, ছিলেন পাকিস্তানের একজন স্পাই….

    Reply
  4. রুদ্র সাইফুল

    লেখাটি পড়লাম। খেয়াল করলাম, এক জায়গায় তিনি লিখেছেন–

    ” … মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে এক অনুষ্ঠান শেষে নুরুন্নবীকে আমি ধরেছিলাম কথাগুলোর ব্যাখ্যা চেয়ে। আমার সঙ্গী ছিলেন সাংবাদিক ও তথ্যচিত্র নির্মাতা (সামরিক বাহিনীতে গণহত্যাখ্যাত) আনোয়ার কবীর। নুরুন্নবী আমাকে রেকর্ড করতে দেননি, তবে জানিয়েছেন শিগগিরই তার একটি বই বেরোবে যাতে এ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ থাকবে।”

    আরেক জায়গায় বেলাল মোহাম্মদকেও খানিকটা ঠেস দিয়ে কথা বলেছেন।

    মাঝে মাঝে ভাবি, অমি রহমান পিয়াল নিজেকে আসলে কী মনে করেন। হয়তো বিরাট কিছু। প্রিয় অমি রহমান পিয়াল, যার কথা বলছেন তাঁর নাম লে. কর্নেল এস আই এম নূরুন্নবী খান বীরবিক্রম। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম ঠিকমতা সঠিক বানানে লিখতে শিখুন।

    তিনি আপনার দোস্ত লাগেন না যে তাঁকে আপনি ‘ধরবেন’ ব্যাখ্যা চাওয়ার জন্য।

    Reply
    • অমি রহমান পিয়াল

      তিনি আমার দোস্ত লাগেন না বটে, কিন্তু আমাদের সম্পর্কটা বেশ বন্ধুত্বপূর্ণই। তো এইসব তো তোমার মতো গর্দভ বুঝবে না!

      Reply
  5. গোলাম আজম

    এটা পরিষ্কার যে আমেরিকা জানত বাঙালিদের জয় হবেই। তাই তারা আমাদের সংগ্রামে ‘তাদের’ বীরদের প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল, যাতে সম্ভাব্য এক বাঙালি জয়ের পর গঠিত রাষ্ট্রে তারা তাদের এজেন্টদের বসাতে পারে।

    তাই জিয়াকে দিয়ে আলাদা সরকার গঠন করে নিজেকে তার প্রধান দাবি করে আলাদা স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করানো, যাতে পরে তারা নিজ স্বার্থে তাকে ব্যবহার করতে পারে। সেই ‘বীর’দের ব্যবহার করে যাতে পরে তারা তাদের নিজেদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে পারে।

    যা আমরা এখন দেখছি, জিয়াকে ‘প্রথম রাষ্ট্রপতি’ দাবি করা সেই মাহ্মুদ হোসেনের কন্ঠ অনুসরণ করা নয় কি? কিন্তু জিয়া তো আসলে তা করেননি। তিনি নিজেকে মাহ্মুদ হোসেনের পরামর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্রপ্রধানও দাবি করেননি, আবার স্বাধীনতার ঘোষণাও নিজের হয়ে দেননি। বঙ্গবন্ধুর প্রতি আনুগত্য থেকেই তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন।

    এখানে স্পষ্ট যে সিআইএ যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদশে তাদের রাজনৈতিক স্তম্ভ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল কাউকে দিয়ে এবং জিয়া হয়েছিলেন সেই বলির পাঠা। রফিক হতে পারতেন, কিন্তু তিনি মানা করে দেওয়ায় জিয়ার ঘাড়ে পড়ে ভূত।

    স্বাধীনতার পর পঁচাত্তরে যা ঘটেছে তা বাংলাদেশে সিআইএ-র অভিলাষের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। তারা চেয়েছে মুজিবকে সরিয়ে তাদের ‘বীর’দের দ্বারা ইতিহাস অন্যভাবে লেখাতে। যাতে বাঙালিকে ‘পরিচয়হীন’ করে দাবিয়ে রেখে নতুন পরিচয় প্রদান করে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

    বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করিয়ে জিয়াকে ক্ষমতায় আনার প্রয়াস লক্ষণীয়। জিয়াকে দিয়ে স্বাধীনতাবিরোধীদের আবার বলিয়ান করা হয় নিজেদের আঞ্চলিক স্বার্থে। জিয়া স্বভাবতই দেশের প্রতি অনুগত থাকায় (যেমনটি ছিলেন মুজিবের প্রতি) বলির পাঠা কুরবানি করা হয়।

    তারপর আসে ইতিহাসকে সিআইএ-র নিজের মতো করে রূপ দেওয়া। জিয়ার অনুসারীরা নিশ্চয়ই তাকে বীরের বেশে দেখতে চাইবে, তা চাইবেন তার পুত্র-স্ত্রীরাও। তাহলে তাকে মেরে ফেললেই তো আমেরিকার লাভ!

    মাহ্মুদের কণ্ঠস্বর কি আমরা আজ তারেক-খালেদার মুখে শুনছি না?

    Reply
  6. সফি আহমেদ

    আবার শুরু হয়ে গেল বিতর্ক!

    জিয়া সাহেবের ছেলে লন্ডনে বসে কোন আড্ডায় কী বললেন আর সেটাই ‘Quote’ করে আমাদের দেশের এক ধরনের সাংবাদিক মহল বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ছাপিয়ে দিলেন! একটা দিয়াশলাই কাঠি জ্বালিয়ে দেওয়া আর কী! যদি আগুনটা লেগে যায়! শহরটা(গদি) উল্টে যায়!

    এর মধ্যে জিয়াপত্মী ঢাকায় ঢাক পেটাচ্ছেন যে, তাঁর স্বামী স্বাধীনতার ঘোষক এবং প্রথম প্রেসিডেন্ট। এই ঢোলের সঙ্গে আমাদের প্রধানমন্ত্রী অতিকথনের দোষে দুষ্ট তবলাটা ধরেছেন উল্টো করে। এর কারণে ঢোলের আওয়াজ বেশি শোনা যাচ্ছে।

    বন্ধুসকল, মেলাতে পারছি না অহেতুক একটি বিষয় নিয়ে এত টানাটানি কেন?

    জিয়া যদি স্বাধীনতার ঘোষক হন তবে দেশের স্বাধীনতা হরণের জন্য আরেকজনের ফাঁসি কামনা করছি। কারণ তাঁর ঘোষণায় ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের রাতে নতুন করে মার্শাল ল জারি হয়। ‘ফরমান’ হয় নতুন নতুন বিধি। হত্যা করা হয় লাখো নিরীহ বাঙালিকে। আমি জানি না এই ভদ্রলোক এখনও জীবিত আছেন কিনা। উনি বেঁচে থাকলে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে এখনই RED ALARM জারি হোক।

    এই ভদ্রলোকের অন্যায়ের কাছে গোলাম আযম-মুজাহিদ-ফারুক-রশীদ গং তো দুগ্ধপোষ্য শিশু! এই ভদ্রলোকের নাম সরকার কবীর উদ্দিন– রেডিও পাকিস্তানের নিয়মিত বাংলা সংবাদপাঠক। উনি যদি সংবাদ পাঠ না করতেন, ইয়াহিয়ার সামরিক আইন জারি সম্ভব হত না!

    আর হ্যাঁ, স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সবচেয়ে বড় বাংলাদশি পদকটি যাবে ইভা নাগের কাছে (মারা গিয়ে থাকলে মরণোত্তর)। কারণ আকাশবাণীর এই সংবাদপাঠিকাই প্রথম ঘোষণা দেন বাংলাদেশ স্বাধীন। ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর।

    কেউ কি আছেন শেখ হাসিনার কানে এই সংবাদটি পৌঁছে দেওয়ার! অন্তত একটা নোংরা অসত্য মিথ্যে নিয়ে যেসব বাগাড়ম্বর হচ্ছে, আর যেন বাড়াবাড়ি না হয়।

    জাতির কাছে সময় বড় মূল্যবান…..

    Reply
  7. গীতা দাস

    বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রচুর গবেষণা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে আরও কাজ করার জন্য অমি রহমান পিয়ালকে অনুরোধ করছি।

    Reply
  8. শেহাব

    আমার কাছে ভালো লেগেছে এই প্রবন্ধের যাচাইযোগ্যতা। সব তথ্যসূত্র দেওয়া থাকায় দরকার হলে যাচাই করে নেওয়া যাবে।

    Reply
  9. কুমার

    অনেক ধন্যবাদ… মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার জন্য। আশা করি এখন থেকে আর বিভ্রান্তির কোনো সুযোগ নেই।

    Reply
  10. বাঙালী.বাংলাদেশী

    ওই রহস্যজনক মাহমুদ যদি জিয়া সাহেবের সঙ্গে দেখা না করতেন, অন্যদের সামনে, তাহলে তাকে মরতে হত না। পরিচয়টা ফাঁস হয়ে পড়াতেই তাকে মরতে হয়েছিল, অনেকটা আরও পরের মঞ্জুর হত্যার মতোই।

    এত মানুষ থাকতে দেশের ওই চিপায় কেন নির্দিষ্ট সেই অখ্যাত মেজরের সঙ্গে যোগাযোগ??? কারণ মাহমুদের জানা ছিল কার সঙ্গে দেখা করতে হবে, কেন করতে হবে।

    আর সেটা ঢাকতেই পরে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করে নেওয়া!!!

    তার ফলেই পঁচাত্তর-পরবর্তী অবস্থা তৈরি হয়েছিল, যা এখন পর্যন্ত বিদ্যমান…..

    Reply
  11. Rupak Biswas

    হাই পিয়াল, ধন্যবাদ এই ঐতিহাসিক লেখাটির জন্য। আমাদের নতুন প্রজন্মের এসব তথ্য জানা উচিত।

    Reply
  12. Ajabul Morfud

    মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ঘোষণা বিষয়ক নতুন তথ্য জানতে পারলাম। অমি রহমান পিয়াল ভাইকে ধন্যবাদ জানাই।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—