Feature Img

Sanjib Royদেশে করপোরেট মিডিয়ার বাজার রমরমা। স্যাটেলাইট টেলিভিশনের বাজার বাড়ছে আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অনুষ্ঠান-আয়োজন। এই অগ্রগতি বারতা দেয় সমাজ-প্রগতির। যে সমাজ-প্রগতির সঙ্গে অনিবার্যভাবে নিশ্চিত হবার কথা নারীর অগ্রগতি আর দূর হবার কথা জেন্ডার-বৈষম্য। কিন্তু কার্ল মার্কসের পুঁজিবাদী সমাজ বিশ্লেষণ সত্য প্রমাণ করে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার এই করপোরেট মিডিয়া নারীকে পরিণত করেছে মুনাফাদায়ী পণ্যে।

ভিজ্যুয়াল মিডিয়া কী প্রিন্ট মিডিয়া, দুটোতেই নারী-পুরুষের সমতা নিয়ে বিশাল আয়োজন। বিশেষ দিনে, বিশেষ আয়োজনে নারীর অধিকার আর নারী স্বাধীনতার বুলি আউড়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির মহাযজ্ঞ সাধনের চেষ্টায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেন মিডিয়া পরিচালকেরা। কিন্তু সেসব মিডিয়াই প্রতি সেকেন্ডে নারীকে পণ্যরূপে উপস্থাপনে ছাড়িয়ে যায় প্রতিপক্ষকে। যেসব পত্রিকা বা ম্যাগাজিনে নারী দিবসে ব্যানার হেডলাইন হচ্ছে, নারীর প্রতি সহিংসতা নিয়ে বিশেষ পাতা এবং আলোচনা হচ্ছে– তারাই নারীশরীর প্রদর্শনবাদের নতুন মোড়কে হাজির করছে প্রতিদিন।

জেন্ডার-বৈষম্য নিয়ে গত তিন দশকে যে তাত্বিক এবং নারীবাদী চিন্তাবিদেরা কাজ করেছেন, তারা মনে করেন নারীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা গড়ে তোলা, বৈচিত্র্যময় কর্মক্ষেত্রে নারীর অভিগম্যতা এবং নীতিনির্ধারণে নারীর অংশগ্রহণ অবাধ করার কাজটি গুরুত্বের সঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। এই বিষয়গুলো যখন কমবেশি একটি ছন্দে এগিয়ে চলছে তখন করপোরেট মিডিয়া নারীকে বৈষম্যের আরেকটি নতুন বোতলে বোতলজাত করতে প্রায় অনেকটাই সফল হতে পেরেছে। করপোরেট মিডিয়া নারীকে বিক্রি করছে মুনাফার বাজারে। প্রতিটি সেকেণ্ডে, প্রতিটি আয়োজনে, প্রতিটি অনুষঙ্গে।

তাত্বিক ও নারীবাদী চিন্তাবিদেরা মনে করেন, নারীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা গড়ে তোলার কাজটি গুরুত্বপূর্ণ
তাত্বিক ও নারীবাদী চিন্তাবিদেরা মনে করেন, নারীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা গড়ে তোলার কাজটি গুরুত্বপূর্ণ

বিজ্ঞাপনের কথায় আসি। একটি সাবানের বিজ্ঞাপনে মেয়েটির উন্মুক্ত পিঠে লিখে দেওয়া হল ‘সীমাহারা’। নারীর উন্মুক্ত পিঠ দর্শকের চোখে উপভোগ্য, এই ধারণার উপর ভিত্তি করেই নারীশরীর বিপণন করা হল বিজ্ঞাপনটিতে। এমন অসংখ্য বিজ্ঞাপনের উদাহরণ দেশীয় চ্যানেলে পাওয়া যায়। চলচ্চিত্রে ‘আইটেম সং’ এখন যেন অনিবার্য হয়ে উঠেছে। সফল বাণিজ্যিক ছবি তৈরি করতে হলে একটা ‘আইটেম সং’ চাই-ই চাই। নারীবাদ কিংবা নারীর অগ্রগতির কথা যারা প্রতিনিয়তই বলছেন তাদের অনেককেই দেখা যাচ্ছে এসব চলচ্চিত্র নির্মাণের সামনে-পিছনে। সমাজ-প্রগতির অনুষঙ্গ হিসেবে যদি একজন নারীকে ‘আইটেম’ হিসেবে জনসমক্ষে বাজারজাত করা হয়, তাহলে জেন্ডার-বৈষম্য কতটুকু কমল-বাড়ল তার বিশ্লেষণটা একেবারেই অর্থহীন হয়ে পড়ে বলে মনে করি।

এবার আসি গণমাধ্যম প্রসঙ্গে। টেলিভিশনগুলো এখন সংবাদ-অনুষ্ঠান অথবা টক-শো করে সমাজ বাস্তবতার সবচেয়ে ঝকঝকে আয়না হিসেবে জায়গা করতে চায়। কিন্তু টেলিভিশন সংবাদ থেকে শুরু করে অনুষ্ঠানে নারীর উপস্থাপন প্রদর্শনবাদের সব চাহিদাই পূরণ করে। বইমেলা প্রাঙ্গনে বই নিয়ে আলোচনা বা অনুষ্ঠানে বা সংবাদে মুখে ‘রঙপালিশ করা’ নারীদের আধিপত্য। বইমেলার মতো জায়গায় রঙপালিশ থেকে বড়জোর শাড়ি-চাদরের বিশেষ সাজ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে। অন্যান্য অনুষ্ঠান আয়োজনে তো কোনো সীমারেখা নেই, যতটা প্রদর্শনযোগ্য করা যায়, যতটা বিক্রি করা যায় নারীর আকর্ষণীয়তা!

আর পত্রিকা বলি বা ম্যাগাজিন– দৈনিক কিংবা সাপ্তাহিক– কেউই কারও চেয়ে পিছিয়ে নেই নারীশরীর কতটা আকর্ষণীয়ভাবে চাররঙা পৃষ্ঠায় তুলে ধরা যায় সেই কাজে মুন্সিয়ানা দেখাতে। কত নতুন ভঙ্গিমায় হাজির করা যায় নারীর শারীরিক আকৃতি আর প্রত্যঙ্গগুলো, চলছে তারই প্রতিযোগিতা! অথচ একই পৃষ্ঠাতেই হয়তো কলামভর্তি নারীর অধিকার আর অগ্রগতির জ্ঞানগর্ভ লেখা।

মিডিয়ায় নারীকে পণ্য হিসেবে বিবেচনা আর পুরুষাধিপত্যের সমাজে বিনোদনের ভোগ্য অনুষঙ্গ হিসেবে তুলে ধরার এই প্রবণতাকে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা স্বীকার করে নিয়েছে। কিন্তু এর ফলে নারীর অগ্রগতি আর নারীর প্রকৃত মুক্তির লক্ষ্য আরও দিকভ্রষ্ট হয়েছে। ষাটের দশকের পর থেকেই পশ্চিমা সমাজে মিডিয়ায় নারীর উপস্থাপন নিয়ে নারীবাদী তাত্বিক, সমাজবিজ্ঞানী এবং নৃতাত্ত্বিক গবেষকেরা কাজ করছেন, বিশ্লেষণ করছেন। বেটি ফ্রেইডেনের ‘দ্য ফেমিনিন মিসটিক’ (১৯৬৩), লিন্ডা বাসবি’র ‘সেক্স রোল রিসার্চ অন দ্য ম্যাস মিডিয়া’ (১৯৭৫), লেসলি জে ফ্রায়েডম্যানের ‘সেক্স রোল স্টেরোটাইপিং ইন দ্য ম্যাস মিডিয়া: অ্যান অ্যানোটেটেড বিবলিওগ্রাফি’ (১৯৭৭), ডোনা অ্যালেন সম্পাদিত মিডিয়া ‘রিপোর্ট উইমেন’ (১৯৭৮), গেই টাকমেন, আরলেন কাপলান ড্যানিয়েলস এবং জেমস বেনেট সম্পাদিত ‘হার্থ অ্যান্ড হোম: ইমেজেস অব উইমেন ইন দ্য ম্যাস মিডিয়া’ (১৯৭৮) উল্লেখযোগ্য কিছু কাজ।

ষাটের দশক থেকে পশ্চিমা মিডিয়ায় নারীর উপস্থাপন নিয়ে বেটি ফ্রেইডেনের মতো নারীবাদী তাত্বিক, সমাজবিজ্ঞানী ও নৃতাত্ত্বিকরা কাজ করছেন
ষাটের দশক থেকে পশ্চিমা মিডিয়ায় নারীর উপস্থাপন নিয়ে বেটি ফ্রেইডেনের মতো নারীবাদী তাত্বিক, সমাজবিজ্ঞানী ও নৃতাত্ত্বিকরা কাজ করছেন

এই গবেষণাধর্মী রচনাগুলোতে উঠে এসেছে মিডিয়া করপোরেট মুনাফা আর বাজারজাতকরণের নেশায় কীভাবে নারীর প্রতিকৃতি বিকৃতভাবে তুলে ধরে এবং কীভাবে ‘ভালগার’ এবং ‘সেক্সিজম’-এর পুনরুৎপাদন করে।

আমাদের করপোরেট মিডিয়ায় নারীকে পণ্যরূপে হাজিরের মধ্য দিয়ে যে উপস্থাপনরীতি জনপ্রিয় করে তোলা হচ্ছে তার পিছনে কর্তৃপক্ষের একটিই যুক্তি– দর্শক এমনটিই চায়। দর্শকের কোন চাহিদা পূরণ করা, কোন চাহিদা তৈরি করা মিডিয়ার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে, সেটি অন্যদিনের আলোচনার বিষয়। এই আলোচনার শেষে এটাই বলা যায়, পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় দর্শকের খোরাক জোগানোর মধ্য দিয়ে মুনাফা অর্জনের কাজটিই মিডিয়ার কাছে প্রধান।

তাহলে নারীপ্রগতি, সমাজ-প্রগতির বুলিগুলো না আউড়ানোই শ্রেয়! কারণ করপোরেট মিডিয়া নারীকে যে মাত্রায় এবং যে ধরনে উপস্থাপন করছে তা সামগ্রিকভাবে নারীকে পিছিয়ে দিচ্ছে অন্ধকার সুড়ঙ্গের দিকে– নারীকে করে তুলছে আরও নারী।

সঞ্জীব রায়: গবেষক, সাংবাদিক।

Responses -- “করপোরেট মিডিয়ায় নারীর উপস্থাপন ও জেন্ডার-বৈষম্য”

  1. চঞ্চল আহমেদ

    এই সত্যগুলো ক’জন উপলব্ধি করতে পারে? যে মডেলদের দিয়ে ব্যবসয়ীরা ব্যবসা করছে, তাদের দেখে হাজারও মেয়ে তাদের অনুকরণ করে মডেল সেজে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাড়ছে প্রসাধনীর চাহিদা। হাজারও যুবকের বুকে দোলা দিচ্ছে এই সৌন্দর্য্য। বাড়ছে যৌন অপরাধ।

    আজকে নারীর যেখানে থাকার কথা ছিল, নারীরা নিজেরাই সেখানে থাকতে চাইছে না। মধ্যযুগের এ কথাটাই তাদের কাল ‍”আপনা মাংসে হরিণা বৈরী”।

    Reply
  2. MOHAMMAD MOHIUDDIN

    ভাই, এই গুরুত্বপূর্ণ লেখাটির জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। কিন্তু মি. মামুনদের মতো আধুনিক নারীলোলুপ কূপমণ্ডূকেরা আধুনিকতার ধুয়া তুলে আপনাকে একদম বাতাসে উড়িয়ে দিবে। তাছাড়া আমার অনেক মাতা, কন্যা, জায়া, ভগ্নীরা ও তাদের সত্যিকারের মর্যাদা কীসে তা এই কর্পোরেট যুগে বুঝে উঠতে পারছেন না।

    তাই আপনার লেখাটি অরণ্যে রোদন ছাড়া আর কিছুই হবে না। আপনার লেখাটি পড়ে ছোটকালের একটি গানের কথা মনে পড়ে– ‘‘টাকার পিছে দুনিয়া ঘোরে আমি ঘুরলে দোষ কী, প্রেম আগুনে সবাই পুড়ে, আমি পুড়লে দোষ কী?’’

    Reply
  3. হুমায়রা

    এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ দিকের কথা লেখক আলোকপাত করেছেন। সেটা হল ”দর্শক চায়”। তাহলে যদি দর্শকের চাওয়া কোনোভাবে বন্ধ করা যায় বা দর্শক পরিবর্তিত কিছু চায় তাহলেই মিডিয়ায় এমন বিজ্ঞাপন দেখতে হয় না। কিন্তু দর্শক চাইবে না– এমন পরিস্থিতি তৈরি করবে কে?

    সেটার জবাব হচ্ছে এই কাজটা করতে পারেন রাজনীতিবিদরা। কিন্তু গত বিশ-বাইশ বছর ধরে ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষের মনে ধারণা প্রবেশ করানো হয়েছে যে রাজনীতিবিদেরা দেশের জন্য কোনো কাজ করেন না, রাজনীতি খুব খারাপ যেন মানুষ রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়ে। ফলে রাজনীতি চলে গেছে দুর্বৃত্তদের হাতে।

    এখন সেই কাজ করে মিডিয়ার উপর দায় চাপানো হচ্ছে যে তারা যেন এই সব বিজ্ঞাপন প্রচার না করে। পুরো ব্যাপারটার মধ্যেই বড় ধরনের অসামঞ্জস্যতা আছে। দেশের রাজনীতি জনগণের কল্যাণে করতে পারলেই এসব কিছুই ঠিক হয়ে যাবে।

    Reply
  4. Habib

    অ্যাবসোলিউটলি ট্রু। কী হচ্ছে….? এই ধরনের নারীবাদের ব্যাপারে আমাদের অবশ্যই সচেতন হতে হবে।

    Reply
  5. Mamun

    আপনার সমস্যা কী, নারী মডেলরা যদি স্বেচ্ছায় বিজ্ঞাপনে অংশ নেয়?????

    আপনি যেসব ফেমিনিস্ট রেফারেন্স দিচ্ছেন সেগুলো সত্তর বা আশির দশকের। জীবনের সঙ্গে সঙ্গে ফেমিনিজমের দৃষ্টিভঙ্গিটাও এতদিনে অনেক বদলে গেছে। এখন এমনকি ফেমিনিস্টরাও ‘সেক্স করার জন্য টাকা নেওয়া বা মিডিয়ার সামনে পোজ দেওয়াকে’ সমর্থন দিচ্ছেন!!!

    আপডেট করুন নিজের জানাশোনার পরিধি। আপনি বহু পুরনো রেকর্ড বাজাচ্ছেন।

    Reply
  6. shamil

    অনেক ভালো লাগল। সঞ্জীবদাকে ধন্যবাদ। আসলে তথাকথিত নারীবাদীরা প্রকারান্তরে নারীদেরকে আরও পেছনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

    মুখে নারী সমতার ধূয়া তুলে নারীর সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে…

    Reply
  7. Fazlul Haq

    বিজ্ঞাপনে, মিডিয়ায়, সিনেমায় দেহ বিপনন চলবে এবং মর্যাদাও থাকবে, এর চেয়ে বড় ভণ্ডামি হয় না…..

    Reply
  8. SHAHRIAR

    আপনাকে ধনবাদ। কিন্তু এই কথাগুলা যদি ‍মুসলিম কেউ, যদি ধার্মিক মুসলিম কেউ বলত সে হত মৌলবাদী, চরমপন্থী, সেকেলে….

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—