Feature Img
ছবি. রাশেদুজ্জামান
ছবি. রাশেদুজ্জামান

আলুর দোকানে বেগুনের খোঁজ করলে পটল তুলতে হয়। চেয়ারম্যান জনপ্রতিনিধি হতে পারেন, কিন্তু আইন প্রয়োগে তার ক্ষমতা নাই, তা জনসাধারণের ভাবনার অতীত। কিন্তু প্রশ্ন হল, চাঁপা রানী যদি থানায় জিডি করতেন তবে কি তাঁর এভাবে প্রাণ যেত না ?

ইভ টিজিং বা নারীদের উত্ত্যক্ত করা এই দেশে কোন নতুন ঘটনা নয় এবং সেই কারণ ধরে অল্প বয়সে বিয়ে, স্কুলে যাওয়া বন্ধ, বাড়ির বাইরে যাওয়া বারণ ইত্যাদি অসংলগ্ন বিধি নিষেধের মধ্য দিয়েও এই ভূখন্ডের নারীরা প্রমাণ করেছেন তারা বিপ্লবী। পরিসংখ্যান মতে জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে নারীরা এগিয়ে, প্রশাসনিক কাজে নারী কর্মচারীরা তাদের পারদর্শীতা দেখিয়েছেন ইতিমধ্যে। প্রমাণ করেছেন, প্রতিকূলতাই গতিশীলতার চাবিকাঠি। কিন্তু এইরূপ রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম কি এই ভুখন্ডকে মধ্যযুগের জাদুঘর হিসাবে চিহ্নিত করে না ?

ভিন্নরকম উদাহরণ প্রসঙ্গে ঢাকার একটি বেসরকারি মহিলা কলেজের গল্প বলি। পাড়ার বখাটে যুবকেরা যেন উক্ত কলেজ ছাত্রীদের যাতায়াতে বাধা দিতে বা আইনী পরিভাষায় উত্ত্যক্ত করতে না পারে, সেই উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠানটির মালিক তথা চেয়ারম্যান একটি অভিনব পন্থা অবলম্বন করলেন। তিনি সেই সকল যুবকদের উক্ত কলেজে চাকরী দিলেন। তো, তাতে লাভ হুল দুটো। এক, কিছু বেকার যুবকের কর্ম সংস্থান হল। দ্বিতীয়, যারা উত্ত্যক্ত করতেন পক্ষান্তরে তারা প্রায় অভিভাবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। এই উদাহরণটি ইঙ্গিত দেয় যে, বেকারত্ব উত্ত্যক্ত করার একটি কারণ হতে পারে। প্রশ্ন দাড়ায়, এভাবে কি বেকারত্ব নিরসন বা উত্ত্যক্ত বন্ধ করা সম্ভব ?

এটি এমন একটি সমাজের চিত্র, যেখানে অতি আহ্লাদে লালিত পূত্র সন্তানটি নিজের ঘর গোছাতে শেখেনি, নিজের খাবার চুলায় চাপাতে চায় না, তাকে একটি অফিসের কাজ দিয়ে আইনমত ৮ ঘন্টা ইভ টিজিং থেকে বিরত রাখা যেতে পারে। আর বাকী ১৬ ঘন্টার হিসাব কে ঠিক করে দিবে ?

এই সমাজের অধিকাংশ পুরুষ তার জীবনের স্মৃতি থেকে বলতে পারবে কি “অমুক নারী দ্বারা উত্ত্যক্ত হইয়া আমি আমার সাধের তম্বুরা বাজানো ছাড়িয়া দিয়াছি?”


ধরুন একটি বালক। বয়স তার এগারো। ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র হবার কথা। সে প্রত্যহ সকালে উঠে বিছানা গুছিয়ে, নিজেকে তৈরি করে স্কুলে যায়। স্কুল থেকে দুপুরে বাসায় ফিরে, অতঃপর গোসল করে, খেয়ে নিজের প্লেটটি ধোয়। কিংবা বাসায় আরও ছোট বা বৃদ্ধ কেউ থাকলে তারটিও ধুয়ে গুছিয়ে রাখে। তারপর তো বিকালের খেলা বা গৃহশিক্ষকের লাঠি। পড়ালেখা শেষ করে, মাকে বা বাবাকে রান্নায় সাহায্য করে রাতের খাবারের ব্যবস্থা করা । দুপুরের ন্যায় থালা বাসন পরিষ্কার করে, রাতে ঘুমাতে যাবার সময় কেউ মনে করিয়ে দেয়ার আগেই দাঁত মেজে পরের দিনের স্কুল ব্যাগ গুছিয়ে ঘুমাতে যাওয়া। এই রকম একটি জীবন প্রণালীর মধ্যে দিয়ে বেড়ে ওঠা কোন কিশোর কি বখাটে বেকার যুবকে পরিনত হতে পারে ?

যেই সমাজে একজন নিজের কাজ থেকে অন্যের কাজ পৃথক করতে পারে না, বা এভাবে বলা যেতে পারে অধিকাংশই যখন পরজীবী, সেই সমাজে ইভ টিজিং বন্ধের জন্য আইন হবার এক বছরের মাথায় মাত্র ১২৬৯ উত্ত্যক্তকারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তো কোন অভিযোগই নয়। নারীরা তবে এখনো অভিযোগ করতেই শেখেন নি। কোথায় করবেন, তা তো অনেক দূরের প্রশ্ন।

মা’রা যদি তার ছেলে শিশুটিকে কাজ করতে শেখাতেন, তবে বোধ করি আজকের সময়, চাঁপা রানীকে তার মেয়ে শিশুটির ভবিষ্যতের কথা ভাবতে যেয়ে বেঘোরে প্রাণ দিতে হত না। হয়তো দেখতে হত না মা’র মৃত্যুতে ভাবী মা’দের আতঙ্ক আর কান্না জুড়ে থাকা কোন দৈনিকের প্রথম পাতা।

যখন নামে হয় প্রতিষ্ঠান এবং কাজ করলেই কর্মী, বসে থাকাও একটি কাজ বটে। জনসংখ্যার বিচারে পৃথিবীর উপরের সারির রাষ্ট্র ধরা যেতে পারে এই ভূখন্ডকে। এর রাষ্ট্র-পরিচালনায় যারা আছেন তাঁরা অবশ্যই সর্বজ্ঞানী হবেন। তাঁদের এই জ্ঞানের ব্যাপকতায়, সমাজের চিত্র পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে তথাকথিত চিন্তাশীলদের ছোট ছোট গোল টেবিল বৈঠক কতটুকুই বা আস্ফালন ফেলতে পারে? যখন সমাজের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লাগামধারীদের নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, জনসাধারণের সাধারণ থাকার অবস্থা লুপ্ত হয় বৈকি। অকুতোভয় কলেজ শিক্ষক, ন্যায় বিচারের দাবীতে বেঘোরে প্রাণ হারান। তখন অলেখক ও লেখক হয়ে ওঠেন। হন দেশছাড়া, দেশদ্রোহী নাম কাঁধে।

তানিয়া বুলবুল কিটি: কবি, লেখক, চিকিৎসা বিজ্ঞানী।

১২ Responses -- “চাঁপা রানী হত্যা ও আমাদের যা করণীয়”

  1. Rezaul Kabir

    কিটি, গঠনমুলক এই লেখাটির জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ। এই subject নিয়ে আমাদের আরো
    উদ্যোগ নেয়া উচিত।

    Reply
  2. Ershad Mazumder

    ধন্যবাদ প্রিয় কিটি। রাস্ট্রের কাজ হচ্ছে তার নাগরিক বা প্রজাদের নিরাপত্ত বিধান করা। নিরাপত্তার জন্যেই রয়েছে পুলিশ আনসার রেব গ্রাম পুলিশ চৌকিদার। কিন্তু এসব বাহিনীকে ব্যবহার করে নিজের ক্ষমতাকে মজবুত রক্ষা করার জন্যে। সমাজের অপরাধী মাস্তানরা দেখলো যাদের ক্ষমতা আছে তারাই সবকিছু নিয়ন্ত্রন করে।ফলে বেপরোয়া হয়ে উঠে। মেয়েদের যারা উত্যক্ত করে তারা পরিবারে কোন শিক্ষা পায়না। সমাজের কাছে কিছু শিখতে পায়না। ছাত্র সংগঠন গুলো বেপরোয়া। তাদের রাজনৈতিক দলগুলো ব্যবহার করে। কিছুদিন আগেইতো ইডেনের ঘটনা শুনেছেন। গ্রামে চেয়ারম্যান মেম্বারদের ব্যবহার কি রকম ? সংসদ সদস্যদের ব্যবহার কি রকম? ইভটিজারদেরওতো মা বোন আছে। তবুও তারা এরকম করছে কেন? কারন সমাজের সব বাঁধন ভেংগে গেছে।

    Reply
  3. Rashed Ahmed Jonak

    আমি জানিনা কেন ইভ টিজিং নিয়ে মিডিয়ার এত সমালোচনা…আইন করে কি ইভ টিজিং প্রতিরোধ সম্ভব! প্রয়োজন নারীর মানসিকতার পরিবতন..

    Reply
    • M.HASAN

      THIS IS RIGHT.I ALSO THINK THAT IF EVERY WOMAN CHANGE THERE DRESS COT & ATITUTE & TIME TABLE, THEN THE PROBLEM IS SOLVED.

      Reply
  4. জয়শ্রী সরকার

    “মা’রা যদি তার ছেলে শিশুটিকে কাজ করতে শেখাতেন, তবে বোধ করি আজকের সময়, চাঁপা রানীকে তার মেয়ে শিশুটির ভবিষ্যতের কথা ভাবতে যেয়ে বেঘোরে প্রাণ দিতে হত না।”- অবশ্যই এই আক্ষেপ ভাবনার দাবি রাখে। তবে এই আক্ষেপের তাল না বুঝে কেউ যদি ভেংচি কেটে বলেন যে, “হুহ্, নারীরাই যদি নিজেদের সর্বনাশের মূলে তো এত আদিখ্যেতার সমারোহ দেখে তো আর ভাল ঠেকবার কথা নয়!” তহলে তার প্রতি অনুরোধ রইল, চিন্তা করে দেখুন- ঘুড়ি ওড়ানোর প্রত্যক্ষ ভার সুতোর কাধে থাকলেও ঐ নাটাই-জোড়াটাই কিন্তু আদিতে আবির্ভূত হয়।
    কিটি আপা, আপনার এই আক্ষেপ কারও কাছে সাদাসিধে মনে হলেও; আমার মনে হয়, এর নৃতাত্ত্বিক শেকড়ের প্রোথিত সুলক্ষ চিন্তার দাবি রাখে।

    Reply
    • তানিয়া বুলবুল কিটি

      জয়শ্রী আপা, প্রতিক্রিয়া প্রকাশের জন্য ধন্যবাদ। সরল বর্ণনা চিন্তার বুদবুদ তৈরীর প্রতিবন্ধক নয়– জানা গেল। একটি ঘটনার বিশ্লেষণ একাধিক দিক উন্মোচন করতে পারে এবং কখনো কখনো পৃথক গবেষনারও দাবী রাখতে পারে।

      Reply
  5. rupa

    “আমরা তিন ভাইবোন যখন আব্বু আম্মু ছাড়া শহরে বসবাস শুরু করি তখন বাসায় কাজের লোক না থাকলে, নিজেরা কাজ ভাগ করে নিতাম, আমার ছোট ভাইটির জন্য বিকেলের নাস্তার পর ধোয়াটি করতে হত, আমার বড় বোন আর যুক্তি ছিল যেহেতু সে বাজার করার মত জঘন্য কাজ(আমার দুই বোন বাজারে যেতামনা আসলে যাওয়া সম্ভব ছিলনা অহেতুক গায়ে হাত(!) আমার মাথায় আগুন ধরে যেত, আমার বোন আমাকে নিয়ে এই অহেতুক(!) ঝামেলায় পরতে চাইতোনা)” আমাদের বাবা মার কাছ থেকে দেখে আমাদের শেখা। আমার বাসায় আমি আলাদা না কিন্তু বাইরে আমি শুধু মেয়ে। আমি দেশ ছাড়ি আমার সরকারী কর্মকতা মা চাননি,হইত মেয়ে বলে আমাকে আটকাতে পারেননি কারন সমাজ শেখায়, বিয়ের পর মেয়ের প্রতি বাবা মায়ের আর অধিকার থাকেনা! আমার ভাইকে কিন্তু আমার মা আবেগ প্রকাশ করে ঠিক আটকে দিয়েছেন। এই মানসিক আশ্রয়ের জন্য কি আমাদের সমাজে ছেলেদের এত প্রশ্রয় দেয়া হয়? আমাদের আসলে অনেক কিছু পরিবর্তন দরকার।

    Reply
  6. Mamun Chakroborty

    আপাকে অনেক ধন্যবাদ, অনেক সুন্দর লেখার জন্য। আসলে আমরা বা আমাদের দেশের অর্থব সরকার ইভ টিজিং নিয়ে শুধু কথাই বলে যাচ্ছে, কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার কোন উদ্যোগ নেই, এমনকি কি উদ্যোগ নেয়া উচিত সেটাও মনে হয় জানেনা।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—