Feature Img

কাজী আহমেদ পারভেজ
কাজী আহমেদ পারভেজ
একটি মূলধারার রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে ওঠার উপকরণ কী কী?

প্রশ্নটা মাথায় এসেছিল কিছুদিন আগে, যখন অন্তর্জালকেন্দ্রিক একটি গোষ্ঠীকে দেখলাম গণজাগরণ মঞ্চের নেপথ্যের মানুষদের সম্পর্কে বিষোদগার করতে, তাদের যাবতীয় কৃতিত্ব অস্বীকার করতে, শাহবাগকেন্দ্রিক যাবতীয় অর্জন নিয়ে সন্দেহ পোষণ করতে।

খুবই অবাক হয়ে জানতে চাইলাম, “আন্তর্জাতিক ও মানবতাবিরোধী অপরাধ আইনের আপিল সংক্রান্ত ধারাটি যে কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় শেষ পর্যন্ত সংশোধন করা হল, সেটা শুরু করা, টেনে নিয়ে যাওয়া তাহলে কার কৃতিত্ব?”

উত্তর পেলাম, “ওটা ওই দাবির সঙ্গে একাত্মতা জানানো লাখ লাখ কোটি কোটি জনতার কৃতিত্ব, একক কোনো মঞ্চ-ফঞ্চের, ব্লগার-অ্যাকটিভিস্টের কৃতিত্ব নয়।”

মূল প্রসঙ্গে ফিরে যাই। যে কোনো রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশের জন্য প্রথমত কিছু নেতা থাকা জরুরি। নেতা না থাকলে আবার দল হয় নাকি? এরপরে তো অবশ্যই থাকতে হয় কিছু নিবেদিতপ্রাণ কর্মী যারা ওই নেতাদের চেতনা ও আদর্শ বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাবেন।

যদিও নিবেদিতপ্রাণ নেতা ও কর্মী থাকা একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে ওঠার সন্দেহাতীত পূর্বশর্ত, তবে তা মূলধারার রাজনৈতিক দল সৃষ্টি করার জন্য যথেষ্ট নয়। তা যদি হতই, তাহলে অনেক আগেই এদেশে সমাজবাদী বা ধর্মভিত্তিক মূলধারার দল সৃষ্টি হয়ে যেত।

আওয়ামী লীগ থেকে জনগণের উল্লেখযোগ্য অংশের মুখ ফিরিয়ে নেওয়াজনিত শূন্যতা থেকে জন্ম বিএনপির
আওয়ামী লীগ থেকে জনগণের উল্লেখযোগ্য অংশের মুখ ফিরিয়ে নেওয়াজনিত শূন্যতা থেকে জন্ম বিএনপির

একদল নিবেদিতপ্রাণ সার্বক্ষণিক নেতা ও কর্মীবাহিনীসমৃদ্ধ হয়েও, এই দলগুলো যে আজও কেন মূলধারায় আসতে পারেনি, তা বুঝতে কাউকে বিরাট গবেষক হতে হয় না। সাধারণ বিচার-বুদ্ধি দিয়েও যে কেউ বুঝতে পারবেন, মূলধারার রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে ওঠার যে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ ওইসব দলে অনুপস্থিত তা হল, জনসমর্থন। সে ধরনের জনসমর্থন যা গণমনে ওই দলের গ্রহণযোগ্যতা নির্দেশ করে।

এখন প্রশ্ন হল, এই গ্রহণযোগ্যতা-সূচক জনসমর্থন কি ওইসব নেতা-কর্মীরা তাদের কর্মকাণ্ড দিয়ে সৃষ্টি করতে পারেন? হয়তো ক্ষুদ্র পরিসরে, আঞ্চলিকভাবে পারেন, কিন্তু দেশজুড়ে জাতীয়ভাবে তা কেবলই নেতা-কর্মীরা তৈরি করেছেন, এমনটা ভাবার সপক্ষে যথেষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ আমি পাইনি।

যা পেয়েছি, তা থেকে বরং মনে হয়েছে, জনমনে কাউকে সমর্থন দেবার জন্য এক ধরনের শূন্যতা যে কোনো কারণে স্বতঃস্ফুর্তভাবে তৈরি হলেই কেবল ওই জাতীয় জনসমর্থন পাওয়া যায় যা একটি দলকে মূলধারার অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। কী সেই শূন্যতার স্বরূপ, আর কেনই-বা এই উপলব্ধি, একটু উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করছি।

বর্তমান সময়ে মূলধারার যে দুটি দল আছে তার একটি “বিএনপির জন্ম সেনানিবাসে গোয়েন্দাদের হাতে”– এটা বলে যারা বিএনপির মূলধারাভূক্তিকে অবজ্ঞা করতে চান তাদের কাছে প্রশ্ন– “সেনানিবাসে গোয়েন্দাদের হাতে একই প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট আরেকটা দল, জাতীয় পার্টি তাহলে কেন আজও মূলধারায় আসতে পারল না?”

মূলত একট আঞ্চলিক দল হিসেবেই তারা কোনোমতে তাদের অস্তিত্ব ধরে রেখেছে। এই প্রশ্নটির উত্তর খুব জটিল নয়। পঁচাত্তর-পরবর্তী নানা উত্থান-পতন, প্রচারণা-রটনার কারণে জনগণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যে আওয়ামী লীগবিরোধী হিসেবে নিজেদেরকে গণ্য করা শুরু করেছিল, তাদের কাছে ঘোষণা দিয়ে আওয়ামী লীগের বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিএনপির উত্থান ও আগমন ছিল তাৎক্ষণিকভাবে স্বাগত জানানোর মতো একটি বিশাল ঘটনা। ওই সময়কার শাসকদের আওয়ামী লীগবিরোধী বিভিন্ন কর্মকাণ্ড তাতে প্রভাব রেখেছিল, এটা সত্যি।

তবে মূলত যে কারণে বিএনপি মূলধারার রাজনীতির মঞ্চে তাদের পদচারণা দশকের পর দশক চালিয়ে গিয়েছে তা হল, আওয়ামী লীগ থেকে জনগণের একটা উল্লেখযোগ্য অংশের মুখ ফিরিয়ে নেওয়াজনিত শূন্যতা। এই শূন্যতা সৃষ্টিতে কার অবদান, তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে; বিপক্ষ মতবাদের কারও উপর দোষারোপ করা যেতে পারে; কিন্তু ওটাই যে বিএনপির খুঁটি গেড়ে বসার মূল চালিকাশক্তি তা নিয়ে বিতর্ক খুব একটা ধোপে টিকবে না।

একই প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি হয়েও জাতীয় পার্টির মূলধারায় না আসতে পারার কারণও সম্ভবত ওখানেই– জনমনের কোনো শূন্যতা নাগালে না পাওয়া। আবার ভিন্ন প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়েও মূলধারার অন্যদলটি অর্থাৎ আওয়ামী লীগ যে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই গণমানুষের দল হয়ে উঠতে পেরেছিল, তাও কিন্তু মূলত ওই একই কারণে, অর্থাৎ শূন্যতার সুযোগ গ্রহণ।

মুসলিম লীগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় সৃষ্ট শূন্যতা থেকে আওয়ামী লীগের জন্ম
মুসলিম লীগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় সৃষ্ট শূন্যতা থেকে আওয়ামী লীগের জন্ম

আবুল মনসুর আহমেদের লেখা থেকে জেনেছি, মুসলিম লীগের নেতৃত্বে পাকিস্তান সৃষ্টি করার পর কীভাবে দলটি একে একে বিতর্কিত কাজ ও সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নিজেদের জনবিচ্ছিন্ন ও গণবিরোধী শক্তিতে পরিণত করেছিল। তাদের ওই ভুল অবস্থানের কারণে তাদের একাংশের হাতে খুবই অল্প সময়ে যে আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম হয়, তা জনমনে দ্রুত গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে।

মুসলিম লীগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য সৃষ্ট শূন্যতা আওয়ামী লীগের তাৎক্ষণিক গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টির মূল উপকরণ—এ কথা বলা নিশ্চয়ই কোনো অতিরঞ্জন নয়। নেতা-কর্মীগণের নিষ্ঠা, সততা, সর্বোপরি নিবেদিতপ্রাণ কর্মকাণ্ড তাতে উত্তাপ ছড়িয়ে থাকবে নিশ্চয়ই। তবে মূল যে বিষয় এটা সম্ভব করেছে তা হল জনমনে থাকা রাজনৈতিক অবস্থানজনিত শূন্যতা।

গণজাগরণ মঞ্চের কৃতিত্ব আছে কী নেই তা নিয়ে প্রশ্নের সঙ্গে এসব বিশ্লেষণ ও গল্পগাঁথার সম্পর্ক কী? সম্পর্ক তো একটা আছেই। তা না-ই যদি থাকত তাহলে জনমনে প্রায় অপরিচিত গুটিকয়েক তরুণের উদ্যোগে গড়ে ওঠা একটি আহ্বানে হঠাৎ সারাদেশ কোন যাদু-মন্ত্রে নড়েচড়ে উঠল?

সেই যাদুটা হল, মূলধারার রাজনৈতিক দলসমূহের নানান কর্মকাণ্ডের কারণে তাদের থেকে জনগণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। আর এ থেকের সৃষ্ট যে শূন্যতা– তা ওই মঞ্চ ঘিরে থাকা মানুষগুলো তাদের নিষ্ঠা দিয়ে, নিরলস প্রচেষ্টা দিয়ে পূরণ করতে পেরেছে– প্রত্যাশার সৃষ্টি করেছে, স্বপ্ন দেখার সামর্থ্য জুগিয়েছে।

গণজাগরণ মঞ্চ হয়তো সবার সব প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। তাদের সব কর্মকাণ্ড হয়তো বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল না। তারপরেও তারা টিকে গেছে, টিকে আছে।

তার পিছনে যে কারণটা সবচেয়ে বেশি যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হয়েছে তা হল, তাদের উপরে সাধারণ মানুষের সেই আস্থা যে, এরা এতসব করে যাচ্ছে, তার কোনোটাই ব্যক্তিগত লাভালাভের জন্য নয়। ভূতে পাওয়া মানুষের মতো কী এক ঘোরের মধ্যে তারা সবকিছু ছেড়েছুঁড়ে দিনের পর দিন একে একে এমন সব দাবি-দাওয়া সামনে নিয়ে আসছে যা শুনলে বলতে ইচ্ছা হয়– এটা তো ‘আমারও ছিল মনে’, ওরা জানল কীভাবে?

মূলধারার দলগুলো থেকে জনগণের একটি অংশের মুখ ফিরিয়ে নেওয়াজনিত শূন্যতা পূরণ করছে মঞ্চ
মূলধারার দলগুলো থেকে জনগণের একটি অংশের মুখ ফিরিয়ে নেওয়াজনিত শূন্যতা পূরণ করছে মঞ্চ

মূলধারার রাজনৈতিক দল হবার জন্য যা যা উপকরণ প্রয়োজন তার সব ক’টিই এখন গণজাগরণ মঞ্চের নাগালের মধ্যে। উপরন্তু, নির্বাচনে অংশ না নেওয়া ও সেই সংশ্লিষ্ট বাড়াবাড়ি এবং যেনতেন একটা নির্বাচন করে ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকা জাতীয় প্রচারণার মুখে মূলধারার দুটি দলের থেকেই আরও কিছু মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেবার প্রক্রিয়ায় থাকতেই পারে।

এই অবস্থায় তারা একটি রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হলে তা হবে একটা সময়ের দাবি মেনে নেওয়া। তবে এখন পর্যন্ত তাদের সে রকম কোনো উচ্চাভিলাষ আছে বলে আমার মনে হয়নি।

তবুও কথাগুলো বলছি মূলধারার দলগুলিকে সচেতন করার জন্যই। কুড়িটা বছর ধরে তারা নিজেদের ইচ্ছেমতো দেশ চালিয়ে গিয়েছেন; এখন তাদের অস্তিত্ব রক্ষায় তা থেকে বেরুনোর চেষ্টা করা উচিত। তাদের বুঝতে চেষ্টা করা উচিত যে কারও দয়া-দাক্ষিণ্যে নয়, বরং জনগণের একটি বিরাট অংশের সস্নেহ প্রশ্রয়কেই পাথেয় করে গণজাগরণ মঞ্চের এতদূর পথচলা। সুসংগঠিত দল হয়েও তারা যদি নিষ্ঠায় ও জনস্বার্থ রক্ষায় একটি ক্ষুদ্র সংগঠনের থেকে পিছিয়ে পড়েন, জনগণের ধৈর্যচ্যুতি কিন্তু ঘটতেই পারে।

আমার চোখে গণজাগরণ মঞ্চের সবচেয়ে বড় সাফল্য রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে এই বার্তা পৌঁছুনো যে তারা যেন নিজেদের অপরিহার্য মনে না করে। তাদের ছাড়া জনগণের কোনো গতি নেই, এটা যে দলই মনে করবে, অচিরেই তাদের হতাশ হতে হবে।

দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এই পরিবর্তনটা সম্ভবত একটি দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রাখতে যাচ্ছে যা থেকে রাজনৈতিক দল ও জনগণ উভয়ই উপকৃত হবেন।

কাজী আহমেদ পারভেজ: শিক্ষক, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি।

কাজী আহমদ পারভেজফ্রিল্যান্স লেখক ও গবেষক

১৫ Responses -- “গণজাগরণ মঞ্চ কি রাজনৈতিক দল হয়ে উঠছে”

  1. কাজী আহমদ পারভেজ

    ঘটনা ঘটেছে একটাই, হাতেগোনা প্রায় অপরিচিত কয়েকজন ব্যক্তিগত ক্ষোভ জানাতে শাহবাগের মোড়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। তা থেকে যে বিস্ফোরনের সূত্রপাত, তাকে বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করবেন, এ আর এমন অবাক করা বিষয় নাকি?

    প্রত্যেকে নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে একে যেভাবে ব্যাখ্যা করতে চান, করুন। আমার কোনো আপত্তি নেই। তবে কিছু কিছু প্রশ্ন আছে–

    ১) অমি পিয়াল সাহেবের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আছে বুঝলাম, প্রমাণ কি আছে? প্রমাণ করবে কে? অভিযোগকারী নাকি অভিযুক্ত? প্রমাণটা দিতে হবে কোথায়? রাস্তাঘাটে, ওয়েবে নাকি আদালতে? অ

    ভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের একটা ব্যাপার থাকে, তার কী হবে? এইসব প্রক্রিয়া ছাড়াই একজনের নামে এমনভাবে অভিযুক্ত বলাটা যে তার জন্য সম্মানহানিকর বলে বিবেচিত হতে পারে। এজন্য তিনি যে আইনগত প্রতিকার চাইতে পারেন, তা দাবিকারীদের অবস্থান সবল নাকি দুর্বল করে?

    ২) উনি টাকা নিয়েছিলেন সেলিব্রিটি হবার অনেক আগেই। এতদিন তা নিয়ে কথা না বলে, সেলিব্রিটি হবার পরে কথা বলার অন্য কোনো উদ্দেশ্যও তো থাকতে পারে, নাকি?

    ৩) ৫ ফেব্রুয়ারি, ১৩-র আগে বোয়ান নামে কোন নিবন্ধিত সংগঠন ছিল কিনা, জানি না। তাদের কোনো লিখিত কনস্টিটিউশন, অফিসিয়াল অ্যাড্রেস, ইলেকটেড বডি ইত্যাদি ছিল কিনা তাও জানি না। এই নামে আদৌ কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন ছিল কিনা তাও খুব একটা কেউ জানত না।

    ৪-২-২০১৩ তে বোয়ান যদি একটা স্টেটমেন্ট দিত এই বলে যে, “তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সাধারণ নির্বাচন দেখতে চায়”– তো মানুষ হাসতে হাসতে খুন হয়ে যেত আর বলত, “হাতি ঘোড়া গেল তল, আর চামচিকা বলে কত জল?”

    অথচ কী অবাক করা কাণ্ড! একদিন পর থেকে এখন পর্যন্ত এই সংগঠনটা কী এক যাদুমন্ত্রবলে এমনই ক্ষমতাধর, শক্তিশালী হয়ে উঠল যে তারা দেশের শুধু নয়, পৃথিবীর যে কোনো বিষয় নিয়ে মন্তব্য করে, করতে পারে। করলে তা নিউজ হয়, মিডিয়া সেই নিউজ ছেপে নিজেদের কাটতি বা হিট বাড়ায়। মন্তব্য না এলে মানুষ ক্ষুণ্ন হয়। প্রশ্ন করে কেন ওরা এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলছে না। ওদের বিরুদ্ধবাদীরাও চায়, ওরা একটু কনফ্রন্ট করুক, তা থেকে যদি কিছু লাইম-লাইট পাওয়া যায়! তাজ্জব ব্যাপার…

    বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির চলমান প্রেক্ষাপটে নতুন কোনো শক্তির স্বতঃস্ফুর্তভাবে উত্থান ও মূলধারায় জায়গা করে নেওয়াটা আমার কাছে অসম্ভব বলে মনে হত। গণজাগরণ মঞ্চের উত্থানের ঘটনা আমাকে সেই ধারণাটা থেকে সরে আসতে সাহায্য করেছে। এই লেখাটার উদ্দেশ্য মূলত এই উত্থানপ্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করা।

    আমি তিনটা ফ্যাক্টর চিহ্নিত করে এটা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি। এই প্রক্রিয়াটাকে অন্য কেউ অন্য কোনোভাবে ব্যাখ্যা করতে চাইলে তাও আগ্রহ নিয়ে পড়তে চাই।

    আমার ফাইন্ডিংস হল–

    ১) সার্বক্ষণিক নেতৃত্ব জরুরি। নেতাগণের পূর্ব থেকে ব্যাপক পরিচিতি তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। উদাহরণ, ড. কামাল বা ড. ইউনূস মহাসেলিব্রিটি ইমেজ নিয়েও কোনো ধারা সৃষ্টিতে সাফল্য দেখাতে পারেননি।

    ২) কর্মীগণের সার্বক্ষণিকভাবে থাকার প্রয়োজন নেই, তবে দরকারের সময় যেন তাদেরকে নিবেদিতপ্রাণভাবে যেন পাশে পাওয়া যায়। নিবেদিতপ্রাণ মানে, খাওয়া-বিশ্রাম এইসব আয়োজন তাদের নিজেদেরকেই করতে হবে। নেতারা এইসব করবেন, এই আশায় বসে থাকা কর্মীরা আর যাই হোক নিবেদিতপ্রাণ নন। উদাহরণ, হেফাজতের কর্মীদের লজিস্টিকের ব্যর্থতাই তাদের ফেইলিওরের মূল কারণ বলে আমি এখনও মনে করি।

    ৩) এমন একটা সঠিক সময় বেছে বের করা যখন জনগণের উল্লেখযোগ্য একটা অংশ বিকল্প কিছু একটা অবলম্বন হিসেবে খুঁজছে। প্রচলিত ধারার বিপরীতে যা একটি গুড-এনাফ বিকল্প হতে পারে, পারফেক্ট না হলেও চলবে।

    উদাহরণ, অনেক ভুলভ্রান্তি, সমালোচনা-বিতর্ক থাকার পরেও জনগণের একটা অংশের যে আস্থা-মায়া জন্মেছে, এক বছরে তাদের মাঝে তা এক বিন্দুও কমেছে বলে মনে হয় না। আমি ইন্টারেস্ট গ্রুপের কথা বলি নাই। যারা নিঃস্বার্থভাবে গণজাগরণের ডাকে তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, তাদের কথা বলেছি।

    এই ভাবনাগুলো পূর্ণ অনুসন্ধানের পরে ভীষণ রকমের ভুল বলে মনে হতেও পারে। তবে এগুলোকে শুরুতে এক্সপ্লোরেশনের একটা বেসিস হিসেবে গণ্য করারও সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছি।

    পড়বার ও মতামত দেবার জন্য সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

    Reply
  2. সৈয়দ আলী

    শাহবাগ চত্বরের মূল উদ্যোক্তাদের খেওয়া-খেওয়ি (নাম ধরেই বলি, ডা. ইয়াজুদ্দিন, অমি রহমান পিয়াল ও শহীদুল হক মামা কর্তৃক ইমরান গং-এর বিরুদ্ধে প্রধানত অর্থ-আত্মসাতের সুষ্পষ্ট অভিযোগ) গণজাগরণ মঞ্চের উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। লেখক বিরোধিতা করলেও আমি বলব, বিয়াল্লিশ বছর ধরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার যে আকাঙ্ক্ষা বাংলাদেশের মানুষ ধারণ করে এসেছে, সরকারের পক্ষে গেছে বলে (উপরে M. H. Miaziর মন্তব্য উল্লেখ্য) সরকারের মদদে গণজাগরণ মঞ্চ সেই আবেগের সুযোগটি নিয়েছে মাত্র।

    Bangla2014-র সঙ্গে একমত। যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে সামাজিক, রাজনৈতিক ও বৈবাহিক সম্পর্ক বজায় রেখে আওয়ামী লীগের কলঙ্কের চিহ্ন মুছবে না।

    Reply
    • কাজী আহমদ পারভেজ

      জনাব সৈয়দ আলী,

      আপনার মন্তব্য পড়ে মূল লেখা পাঠে আপনি কতটা মনোযোগী ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায়। আপনার মন্তব্য যত বার পড়ি, ততবারই অবাক হই এই ভেবে যে এত ধৈর্য আপনি পান কোত্থেকে? সত্যিই প্রশংসনীয়।

      নিজেকে “জুম্মায়-জুম্মায় সাতদিন”-এর নবীন লেখক মনে করি। এর পরেও আপনার মতো একজন নিষ্ঠাবান পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারাটা বিরল সৌভাগ্য বলেই মনে করছি। সত্যি বলতে কী, আমার লেখালেখি যদি কখনও কোনো মান অর্জন করে, তাতে আপনার অবদান নিঃসংকোচে স্বীকার করে যাব আজীবন।

      একটা গোপন কথা বলি। আজকাল লিখতে বসে, আপনার কথা মাথায় রাখি। কোন কথাটার আপনি কী ব্যাখ্যা চাইতে পারেন আগে থেকেই সেটার উত্তর ভাবার চেষ্টা করি। আমার সৌভাগ্য যে আপনার মতো একজন কঠিন পাঠক পেয়েছি।
      বিনা প্রশ্নে এটা মেনে নিতে রাজি যে এমন পাঠক নাগালের মধ্যে থাকলে একজন লেখকের সুলেখক হয়ে ওঠা সময়ের ব্যাপার মাত্র। আমি পারব কিনা, সেটা ভিন্ন প্রশ্ন।

      অনেক ধন্যবাদ মন্তব্যের জন্য। পয়েন্টগুলো নোট করলাম। অন্য কোনো লেখায় প্রতিফলন থাকবে আশা করি।

      Reply
      • সৈয়দ আলী

        অধ্যাপক কাজী আহমদ পারভেজ,

        আপনার বৈষ্ণবীয় বিনয় নিঃসন্দেহে আমাকে মুগ্ধ করেছে। আপনি বিনয় করে যা বলেছেন তা উল্টো করে বরং বলা উচিৎ আপনি একজন সেলিব্রিটি লেখক, সর্বোপরি অধ্যাপক, আপনি যে আমার তুচ্ছ মন্তব্যের জবাব দিয়েছেন, তাতে আমি ধন্য। আমার কথা মাথায় রেখে আপনার মতো মহৎপ্রাণ লেখক লিখেন, এটি বিশ্বাসযোগ্য না হলেও, আমার সিনা ফুলে উঠেছে।

        হতে পারে রামপাল নিয়ে লেখায় আপনার বিপক্ষে অবগত বিশষেজ্ঞরা সরাসরি উত্তর না দিয়ে ভিন্ন বিষয়ের অবতারণার অভিযোগ করেছেন, তা আপনার লেখার গতিবেগ রুদ্ধ করতে পারেনি। তবে তা অত্যন্ত জটিল ও বৈজ্ঞানিক বিষয় ছিল বলে আমার অংশগ্রহণের কোনো সুযোগই ছিল না। সবসময় তো ফেরেশতা যেখানে যেতে ভয় পায়, নির্বোধ সেখানে ঢুকে যায় এটা হতে পারে না!

        আপনার বিনয়ের রসে টইটম্বুর জবাবে আপনি অবশ্য আমার একটি প্রধান প্রশ্ন, শহীদুল হক মামা, ডা. ইয়াজুদ্দিন এবং অমি রহমান পিয়াল ইমরান গংদের বিরুদ্ধে অর্থআত্মসাতের যে অভিযোগ করেছেন, তার জবাব দেননি। আপনার প্রতিশ্রুত পরবর্তী কিস্তিতে নিশ্চয়ই তার জবাব পাব। আমি খুব আশাবাদী মানুষ।

        আপনার সাফল্য কামনা করি।

    • ashraful alam

      আমাদের দেশে তাত্ত্বিকের অভাব নেই, আছে কাজের লোকের অভাব;
      যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে সঠিক ও কার্য্যকর ধারায় নিয়ে আসার কাজটি করার মত অসাধারণ কাজটি করেছে গনজাগরণ মঞ্চ
      আর এখন তাত্ত্বিক ভাইয়েরা নেমে পড়েছেন সমালোচনার কাজে!

      Reply
      • সৈয়দ আলী

        কথাটি আংশিক সত্য। সংসদ আলো করে বসে থাকা ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার মোসলেহউদ্দিন, চট্টগ্রামের মাদানী, পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর জিপে চড়ে ঘুরে বেড়ানো জাতীয় বেয়াই ও মাননীয় মন্ত্রী বাহাদুরেরও তো বিচার হয়ে গেছে, তাই না?

        সঠিক, সদুদ্দেশ্যে বিচার হোক, কেউ সমালোচনা করবে না, এমনকি আপনার নামেও জিন্দাবাদ দেবে।

  3. মুনির

    এখানে দুটি বিষয় উল্লেখ করব।

    প্রথমত এখানে একজন মন্তব্য করতে যেয়ে বলেছেন, দেশে স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা নেই– শুধু গণজাগরণ মঞ্চের কারণে জাতি আজ সুষ্ঠু বিচার পাওয়া গেছে। হ্যাঁ, এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। যদি সেদিন মানুষ জমায়েত না হত তাহলে হয়তো আইসিটির আইনটি বদলানো হত না।

    দ্বিতীয়ত, গণজাগরণ মঞ্চের পরবর্তী যেসব কার্যক্রম সেখানে দেখা যায় সম্পূর্ণভাবে একটি বিশেষ দলের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা এবং তাদের কাজগুলো সমর্থন করা। অনেকটা আজকে যেমন জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের ‘বি টিম’, তেমনি গণজাগরণ মঞ্চ আওয়ামী লীগের ‘বি টি ‘ হিসেবে কাজ করে গেছে। মজার বিষয় হচ্ছে, দেশে অনেক অনেক ইস্যু আছে বা ছিল কিন্তু তারা সেসব ইস্যু নিয়ে কোনো কথা বলেনি।

    যেমন, তারা লংমার্চ করেছে সংখ্যাঘুদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে, মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য। খুব ভালো কথা। কিন্তু রানা প্লাজায় যে ১২০০ মানুষ মারা গেল, কিছু মানুষ আহত এবং সারাজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেল, এমনকি তারা বেশিরভাগই ক্ষতিপূরণ পাননি– অথচ গণজাগরণ মঞ্চ এখানে কোনো টু শব্দটি পর্যন্ত করেনি।

    আওয়ামী লীগ বা বিএনপির কথা ভুলে যান। সাধারণ মানুষ কাউকেই বিশ্বাস করে না। তত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিএনপি আন্দোলন করেছে কিন্তু তারা সাধারণ মানুষকে কাছে পায়নি। কারণ সাধারণ মানুষ তাদের বিশ্বাস করে না। আমরা স্বীকার করি বা না করি বা সাধারণ আমজনতা হিসেবে আমরা বেশিরভাগই তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচনের পক্ষে ছিলাম, এমনকি যে নির্বাচনটা হয়েছে সেটাও তামাশা ছাড়া কিছুই নয়। কিন্তু গনজাগরণ মঞ্চকে এ নিয়ে একটা কথাও বলতে শুনিনি।

    আমাদের মনে হয় ৫ জানুয়ারি যা হয়েছে তা একমাত্র দলকানা লোক ছাড়া কেউ সাপোর্ট করতে পারবে না। সত্যিই যদি গণজাগরণ মঞ্চ সাধারণ মানুষের মনের কথা বলতে পারত তাহলে এসব নিয়ে তারা কিছু না কিছু বলত। কিন্তু এত বড় একটা ইস্যু তারা এড়িয়ে গেছে। তারা রাজনৈতিক দল হওয়া তো দূরের কথা বরং যে কোনো জায়গায় ১০০ টা মন্তব্য হলে ৭০ টিই গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে যাবে বা যায়।

    তারা কি বলতে পারত না যে আমরা আওয়ামী লীগ, বিএনপি বুঝি না, আমরা শান্তি চাই। খালেদা জিয়া, শান্তি দেন আমাদের, এসব অরাজকতা বন্ধ করুন। আর শেখ হাসিনা, আপনি নিরপেক্ষ নির্বাচন দিন।

    আর তাদের একবার লাঠিপেটা করা হয়েছিল গুলশানে পাকিস্তান হাইকমিশনে যাবার সময়। সেটা আইওয়াশ ছাড়া আর কিছুই নয়। যেমন সরকার হেফাজতে ইসলামের তাণ্ডবের দিনও গণজাগরণ মঞ্চ ভেঙে দিয়েছিল।

    অনেকেই বলে, গণজাগরণ মঞ্চে ৬ সংখ্যার বেতন পাওয়া মানুষ এসেছিল। কিন্তু বলেন তো, কয়জন খেটে খাওয়া মানুষ সেখানে ছিল? কয়জন কৃষক, দিনমজুর, রিক্সাওয়ালা ছিল? বাংলাদেশে শতকরা ৭০ ভাগ লোক তো ওই শ্রেণির। কিন্তু যদি ধরে নিই শাহবাগে গড়ে ২০ হাজার মানুষের উপস্থিতি ছিল, সেখানে ৫০ শতাংশ তো দূরের কথা, ২০ হাজারের মধ্যে ১০০০ কৃষক, কামলা (দিনমজুর), ঠেলাওয়ালা, রিক্সাওয়ালা ছিল কি না? আর এখন যে গণজাগরণ মঞ্চ মিছিল করে, সেখানে বাংলাদেশের আসল খেটে খাওয়া মানুষ কয়জন থাকে?

    যদ্দিন না গণজাগরণ মঞ্চ আওয়ামী লীগের লেজুড়বৃত্তি ছেড়ে বের হয়ে এসে সাধারণ মানুষের মনের কথা বলতে পারবে, তদ্দিন তারা আর কিছুই করতে পারবে না।

    সাদা চোখেই দেখা যায়, প্রথমদিকে গণজাগরণ মঞ্চে মানুষের উপস্থিতি, সমর্থন এবং বর্তমান অবস্থা। আকাশ-পাতাল ফারাক।

    Reply
    • ashraful alam

      জনাব মুনির,

      আপনার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আমার কিছু প্রশ্ন–

      ১. বিরোধী দলের কাজ শুধু সরকারের সমালোচনা করা নয়, দেশের স্বার্থে যে কোনো বিষয় নিয়ে এগিয়ে আসা; ঠিক তেমনি সরকার শুধু বিরোধী দল নিয়ে ভাববে কেন? গণজাগরণের নেতা-কর্মীরা গাড়ি পোড়ায়নি, সন্ত্রাস করেনি– তাদের নিয়ে সরকার যাই কিছু করুক তাতে যদি খারাপ কোনো কাজ না হয়ে থাকে, অসুবিধা কোথায়?

      ২. রাস্তায় বেরুনো যে কাউকে নিরাপত্তা দেওয়াটাই (যদিও সব সরকারই অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে) যেখানে সরকারের কর্তব্য, সেখানে গণজাগরণ কর্মীদের নিরাপত্তা দিতে গেলে আপনার আপত্তি কেন? লক্ষ্য করুন মোট ৯ জন গণজাগরণ কর্মী শহীদ হয়েছেন, যাদের নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যর্থতা কার?

      ৩. আপনি গণজাগরণের ভিতরে আশার কিছু দেখছেন না আবার লিখছেন– “যদ্দিন না গণজাগরণ মঞ্চ আওয়ামী লীগের লেজুড়বৃত্তি ছেড়ে বের হয়ে এসে সাধারণ মানুষের মনের কথা বলতে পারবে, তদ্দিন তারা আর কিছুই করতে পারবে না”— সরকারি পলিসিমেকারদের আইনি ব্যবস্থাপনায় কাদের মোল্লার দেওয়া যাবজ্জীবনকে শেষ পর্যন্ত সফলভাবে ফাঁসিতে নিতে রাস্তায় বের হয়েছিল কারা?

      Reply
      • মুনির

        আমার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আমাকে প্রশ্নই করে গেলেন, কিন্তু আমার বক্তব্যে যে অনেক প্রশ্ন ছিল সেগুলোর উত্তর দিতে পারলেন না। অবশ্য আমি জানি সেখানে আমার কথা মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই; কারণ উত্তর নেই আপনার কাছে। যাই হোক, আগে আপনার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে নিই।

        প্রথম প্রশ্নটা যে আপনি কী নিয়ে করেছেন সেটা খুব সম্ভবত আপনিই ভালো জানেন; কারণ সেখানে সবকিছু গুলিয়ে ফেলেছেন এবং আদতে সেটা কোনো প্রশ্নই নয়। গণজাগরণ মঞ্চ সন্ত্রাস করেনি, গাড়ি পোড়ায়নি ভালো কথা, কিন্তু সরকার যদি তাদের নিয়ে যা-ই কিছু করে থাকুক, অসুবিধা কোথায়? ভাই, আমি আপনার প্রশ্নটা বুঝলাম না। আসলে আপনি কী জানতে চেয়েছেন?

        দ্বিতীয় প্রশ্নটাও প্রাসঙ্গিক নয়। আমি কোথাও বলিনি যে সরকার গণজাগরণ কর্মীদের নিরাপত্তা দিতে গেলে আমার আপত্তি। বরং আমি বলেছি যে, গুলশানে যেদিন গণজাগরণ কর্মীদের পুলিশ দিয়ে আক্রমণ চালানো হয় সেটা আইওয়াশ; যেমন হেফাজতের সভার দিন সরকার গণজাগরণ মঞ্চও ভেঙে দিয়েছিল আইওয়াশ হিসেবে।

        তৃতীয়, আমি গণজাগরণ মঞ্চের ভেতর আশার কিছু দেখছি না, কেননা তারা আওয়ামী লীগের লেজুড়বৃত্তি করে। উত্তর আমি সেখানেই দিয়েছি। আর এটাও বলেছি, যখন তারা সাধারণ মানুষের মনের কথা বলতে পারবে তখনই তারা একটি শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। শুধু কাদের মোল্লার ফাঁসি চাওয়াটাও জনগণের শেষ চাওয়া নয়। কারণ নামটাই যার গণজাগরণ মঞ্চ। মানে মানুষের গণজাগরণ। শুধু রাজাকারের ফাঁসির দাবির মঞ্চ নয়।

        প্রথমদিকে এমনও দেখেছি যে, গণজাগরণ মঞ্চে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিকে গ্রহণ করা হয়নি, সেটা আওয়ামী লীগ কি বিএনপি। আওয়ামী লীগের হানিফ, সাজেদা চৌধুরীকেও ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কয়েক মাস পর যখন দেখি আশুলিয়াতে গণজাগরণ মঞ্চের সভায় সাভারের আওয়ামী লীগের সাংসদ এবং ছাত্রলীগের নেতারা এক মঞ্চে বসে বক্তৃতা করে তখন তারা কাদের লেজুড়বৃত্তি করে সেটা আর অপ্রকাশিত থাকে না।

        পরিশেষে, এটাই বলব যে আমার বক্তব্য পড়ে আবার খুব ভালোমতো আমাকে প্রশ্ন করুন। কারণ আমার মনে হয়েছে আপনি আমার বক্তব্য পড়েননি– না হলে এ রকম প্রশ্ন করতেন না।

    • সৈয়দ আলী

      জনাব মুনির,

      আপনি আগুনে ঘৃতাহুতি দিলেন, বুঝবেন ঠ্যালা। :দ বাংলাদেশের মানুষ গত বিয়াল্লিশ বছর ধরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আকাঙ্ক্ষা প্রাণে ধারণ করে রেখেছিলেন। যখন গণজাগরণ মঞ্চ এই আকাঙ্ক্ষাকে দাবিরূপে শাহবাগ থেকে ঘোষণা করল– ঢাকার মানুষ তো বটেই, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বয়েস নির্বিশেষে শাহবাগে জমায়েত হল। অতি শিগগিরই জমায়েত জনগণ যখন বিরিয়ানির প্যাকেট, প্রতিদিন ভিন্ন ডিজাইনের পাঞ্জাবি আর সরকারি দলের ছাত্রনেতা পাশে দাঁড়িয়ে গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ককে নির্দেশ দিলেন– সেদিনই জনগণের মোহভঙ্গ হয়েছে।

      এর পরে জমায়েতের জনসংখ্যা কীরূপ হ্রাস পেছে তা মিডিয়ায় দলিল হিসেবে আছে। সার্ধশতবর্ষ আগে বঙ্কিমচন্দ্র লিখে গেছেন, ‘চালাইকি দ্বারা কোনো মহৎ কর্ম সাধন হয় না’।

      একজন মন্তব্য করেছেন, গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরা গাড়ি ভাঙচুর করেনি, একদম সত্যি কথা। কিন্তু শ্লোগানদাত্রী লাকীর মাথায় লাঠির বাড়ি পড়তে ভুল হয়নি!

      Reply
  4. ashraful alam

    আপনি লিখেছেন–

    “তবুও কথাগুলো বলছি মূলধারার দলগুলিকে সচেতন করার জন্যই। কুড়িটা বছর ধরে তারা নিজেদের ইচ্ছেমতো দেশ চালিয়ে গিয়েছেন; এখন তাদের অস্তিত্ব রক্ষায় তা থেকে বেরুনোর চেষ্টা করা উচিত। তাদের বুঝতে চেষ্টা করা উচিত যে কারও দয়া-দাক্ষিণ্যে নয়, বরং জনগণের একটি বিরাট অংশের সস্নেহ প্রশ্রয়কেই পাথেয় করে গণজাগরণ মঞ্চের এতদূর পথচলা। সুসংগঠিত দল হয়েও তারা যদি নিষ্ঠায় ও জনস্বার্থ রক্ষায় একটি ক্ষুদ্র সংগঠনের থেকে পিছিয়ে পড়েন, জনগণের ধৈর্যচ্যুতি কিন্তু ঘটতেই পারে।

    আমার চোখে গণজাগরণ মঞ্চের সবচেয়ে বড় সাফল্য রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে এই বার্তা পৌঁছুনো যে তারা যেন নিজেদের অপরিহার্য মনে না করে। তাদের ছাড়া জনগণের কোনো গতি নেই, এটা যে দলই মনে করবে, অচিরেই তাদের হতাশ হতে হবে।”

    আমি একটু যোগ করি–

    ১৬ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার আয়োজনে যে জনস্রোত দেখেছি তাতে আমি নিশ্চিত, সঠিক ধারায় পরিচালিত হলে জাতির কল্যাণে গণজাগরণ মঞ্চ আরও অনেক অবদান রাখতে সমর্থ হবে। তবে মূল কাজ তথা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে গণজাগরণ ঘটানো– আপাতত এতটুকু সিরিয়াসলি নেওয়া উচিত। রাজনীতি রাজনৈতিক দলেরাই করুক, তবে তা অবশ্যই স্বাধীন বাংলাদেশের সঠিক ধারায়।

    এই মূহুর্তে জনহয়রানি দূর করতে সরকারকে বাধ্য করতে এগিয়ে আসতে পারে তরুণ সমাজ। আর এভাবেই স্বাধীনতার সুফল পেতে শুরু করবে জনগণ এবং দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের মর্ম এবং তাগিদ উপলব্ধি করবে।

    কোন কোন জনহয়রানি? সেসব যার জন্য জনগণ শঙ্কিত হয়, যেমন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, পুলিশি বাড়াবাড়ি, রাস্তায় চাঁদাবাজি করে পরিবহণ ব্যয় বাড়িয়ে কৃষকের পণ্য বাজারজাত করতে বাধা, স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় চাকরি পেতে বাধা, রাস্তা বেদখল-চাঁদাবাজির কারণে সৃষ্ট যানজটে ব্যয় বাড়া বা সময়ের অপচয়–

    Reply
    • সৈয়দ আলী

      “১৬ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার আয়োজনে যে জনস্রোত দেখেছি তাতে আমি নিশ্চিত, সঠিক ধারায় পরিচালিত হলে জাতির কল্যাণে গণজাগরণ মঞ্চ আরও অনেক অবদান রাখতে সমর্থ হবে।”

      — সে জনস্রোত কোনো মঞ্চ বা নতুন ডিজাইনের পাঞ্জাবির আকর্ষণে হয়নি। মানুষের প্রাণের আকুতি ও আকাঙ্ক্ষার প্রাবল্যে হয়েছিল।

      কোদালকে কোদাল বলুন!

      Reply
  5. গীতা দাস

    ‘মূলধারার দলগুলো থেকে জনগণের একটি অংশের মুখ ফিরিয়ে নেওয়াজনিত শূন্যতা পূরণ করছে মঞ্চ।’

    — আমি বিষয়টিকে এভাবে ব্যাখ্যা করার পক্ষপাতী নই। তাহলে গণজাগরণ মঞ্চের উদ্দেশ্য যেমন ব্যাহত হবে তেমন মঞ্চের কাছে আমাদের প্রত্যাশারও ভুল ব্যাখ্যা হবে।

    গণজাগরণ মঞ্চ মূলধারার রাজনীতির কোনো বিকল্প ক্ষেত্র বা দল কিংবা লীগ অথবা পার্টি নয়, এটা আমাদের দেশপ্রেম জাগিয়ে রাখার মন্ত্র, আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে জীবন্ত রাখার প্রেরণা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা সমুন্নত রাখার শক্তি।

    Reply
  6. M. H. Miazi

    — গণজাগরণ মঞ্চের ব্যাপারে– তাদের যাবতীয় কৃতিত্ব অস্বীকার করতে, শাহবাগকেন্দ্রিক যাবতীয় অর্জন নিয়ে সন্দেহ পোষণ করতে।–

    মাঝে মাঝে কোনো কোনো লেখক যাদেরকে তারুণ্যের পূজারী বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করতে দেখা যায়, হঠাৎ করে জেগে ওঠা কোনো এক গোষ্ঠীর আন্দোলনে ব্যাপক সমর্থন দেন, উৎসাহ জোগান তাদের লেখনীর মাধ্যমে। জনগণের সঙ্গে লেখকদের হুজুগে মাতাল হলে চলে কী করে?

    লেখায় যদি কোনো না কোনোভাবে এটা প্রতীয়মান হয় যে রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করেনি, বিচারকগণ চাপের মধ্যে পড়ে তাদের বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগে কিছুটা বিচ্যুত হয়েছেন এবং লেখায় এটা যদি প্রমাণিত হয় বা ইঙ্গিত থাকে যে সরকারও রাস্তার আন্দোলনের কারণে বাধ্য হয়ে মাঝপথে বিচার আইন পরিবর্তন করে বিচারের রায়টি তাদের পক্ষে নেওয়ার অশুভ কার্যটি সম্পন্ন করেছে বা কাঙ্ক্ষিত রায়টি পাওয়ার চেষ্টা করেছেন– বিশেষভাবে দায়িত্বশীল নিবন্ধকারের লেখায় যা জনগণের মনে প্রভাব বিস্তার করে– সে ধরনের লেখা কতটা মারাত্মক, তা চিন্তা করার বিষয় রয়েছে।

    উপরের একটি লাইনের কিছু অংশ লেখকের পুরো নিবন্ধ থেকে কেটে নিয়ে এখানে ছোট একটি অনুভূতি প্রকাশ করতে চাই যে যদি এটা সত্যি হয়ে থাকে যে গণজাগরণ মঞ্চের কিছুমাত্র সফলতা ছিল। তবে যে এটাই স্বীকার করে নেওয়া যে, দেশে স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা নেই– শুধু গণজাগরণ মঞ্চের কারণে জাতি আজ সুষ্ঠু বিচার পেল।

    তাহলে তো বলতে হয়, প্রতিটি বিচার সুপ্রীম কোর্টের আপিলে যাওয়ার আগে এ ধরনের একটা গ্রুপ রাস্তায় সংগঠিত হতে হবে, বিচারের বিরুদ্ধে ক্রমাগত অনাস্থা জানাতে থাকবে, সরকারের উপর ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করতে থাকবে। আর সে চাপের কারণে সরকার যদি মনে করে রাস্তার এ আন্দোলন তাদের টিকে থাকার সহায়ক, তবে রাস্তার ওই আন্দোলনের দাবি সমর্থন করবে সরকার, আইনি নিরাপত্তা দিবে, দাবি অনুযায়ী আইন পরিবর্তন করে বিচারাধীন বিষয়কে নিজের মতো করে রায় পাওয়ার ব্যবস্থা করবে।

    আর রাস্তার আন্দোলনের যে ধারাটি সরকারের স্থিতিশীলতার হুমকিস্বরুপ বলে সরকার মনে করবে, যখন মনে করবেন, ঠিক তখন থেকে তাদের পিছন থেকে সকল সরকারি ব্যাকআপ উঠিয়ে নিবে, নিরাপত্তা সরিয়ে নিবে; শুধু তাই নয় সরকারি বাহিনী দিয়ে প্রয়োজনে তাদের ডেমোলিস করে দেওয়ার চেষ্টা করবেন।

    তাই বিচারের রায়ের প্রতিক্রিয়ায় যে আন্দোলন, সেটার সফলতা ঢালাওভাবে সমর্থন বা প্রচার যে স্বাধীন বিচার ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা সেটা বেমালুম ভুলে গেলে চলবে কী করে।

    Reply
  7. Bangla2014

    গণজাগরণ মঞ্চকে একটি পরিপূর্ণ রাজনৈতিক দল হিসেবে পেলে হার্দিক সম্ভাষণ জানাব– যদি এটি একটি মধ্য-বাম, অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ দল হয়ে উঠতে পারে– যদি এটি একুশ শতকের উপযোগী বিজ্ঞানমনষ্ক, উদারতাবাদী ও মুক্তচিন্তার মতাদর্শ গ্রহণ করতে পারে।

    আমার উদ্দেশ্য এই দেশে একটি সত্যিকারের সেকুলার রাজনৈতিক দল গঠন করতে দেখা– যেটি হবে শক্তিশালী, যেটি সত্যিকারের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করবে এবং একাত্তর থেকে ওদের বিযুক্তও করবে। একাত্তর নিয়ে আওয়ামী লীগের মনোপলি দেশের অনেক ক্ষতি করেছে। এখন এটা বন্ধ হওয়া দরকার।

    বিএনপি এটা করতে পারত কিন্তু তার জন্য তাদের দলের ভেতর বিশাল সংস্কার দরকার (আমি নিশ্চিত নই বিএনপি এটা করতে পারবে কিনা)।

    জাতীয় পার্টির স্থান তো ঐতিহাসিক ডাস্টবিনে, তাই একে তুলনায় আনা চলে না।

    জামায়াতে ইসলামী একটি অপরাধী সংগঠন, তাই এরাও তুলনায় আসতে পারে না।

    তার মানে আমাদের রাজনৈতিক দিগন্তে বড় একটি শূন্যতা রয়ে গেছে। মঞ্চই একমাত্র ফোরাম যেটি এই ঐতিহাসিক শূন্যস্থান পূরণ করতে পারে।

    চলুন, আমরা যারা বাইরে থাকি, তারা মঞ্চকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করি। রাজনীতি করতে গেলে অর্থের দরকার হয়।

    জয় বাংলা। জয় বাংলাদেশ। জয় মঞ্চ।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—