Feature Img

চির রঞ্জন সরকারবহুদিন আগে থেকেই দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার কথা উঠছে। যুদ্ধাপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক আদালতে জামাত নেতাদের বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করার পর সারাদেশে তাদের কর্মী-সমর্থকদের বেপরোয়া সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষিতে জামাত নিষিদ্ধের দাবি আরও প্রবল হয়েছে।

যদিও এই নিষিদ্ধ করার পক্ষে বিপক্ষে নানা মত রয়েছে। জামাত নিষিদ্ধের বিপক্ষে যারা বলেন তাদের যুক্তি হল– জামাত অন্যসব দলের মতোই একটি রাজনৈতিক দল। এই দলেরও রাজনীতি করার অধিকার রয়েছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে।

জামাত সম্পর্কে এই আপাত নিরীহ মতটি এখন আর ধোপে টেকে না। সহিংস গণবিরোধী কর্মকাণ্ডের কারণে একে এখন আর দশটা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। সাম্প্রতিক ব্যাপক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি এই দলটির মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে মানবতাবিরোধী কার্যকলাপে অংশগ্রহণের দলিলভিত্তিক ইতিহাস রয়েছে।

স্বাধীনতার পরেও তারা এক ধরনের হিংস্র সাম্প্রদায়িক রাজনীতির চর্চা অব্যাহত রেখেছে। এই দলটির সদর দপ্তরও পাকিস্তানে। যুদ্ধাপরাধী ও জামাত নেতা কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর করার পর পাকিস্তানি পার্লামেন্টে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের প্রতিক্রিয়ায় তা স্পষ্ট হয়েছে। এই দলটিকে তাই বাকি দলগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখার বড় বেশি সুযোগ আছে বলে মনে হয় না।

জামাত বনাম নাৎসী

জামাতকে নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে অনেকে জার্মানিতে নাৎসী নির্মূলকরণের অভিজ্ঞতাকে বিবেচনায় আনার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এর বাস্তব ভিত্তিও রয়েছে। জার্মানির নাৎসী পার্টি এবং বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে বেশ কিছু চরিত্রগত মিল রয়েছে।

এরা ভিন্নধর্মালম্বীদের দমন করেছে। তাদের উপাসনালয়, বাসস্থান ধ্বংস করেছে। মানুষকে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করেছে। এই দুই দলই দেশের মানুষের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ, অর্থাৎ খুন-ধর্ষণ-লুটপাট-অগ্নিসংযোগে অংশগ্রহণ করেছে। রাষ্ট্রের মতাদর্শিক স্তম্ভগুলোকে অস্বীকার ও ধ্বংস করেছে। উদাহরণস্বরূপ জার্মানিতে পতাকাবদল, বইপোড়ানো উৎসব হয়েছিল। বাংলাদেশে পতাকা ছিঁড়ে ফেলা ও শহীদ মিনার ধ্বংসের কথা স্মরণ করা যেতে পারে।

মানবতাবিরোধী অপরাধে এদের যার যার নিজস্ব পদ্ধতি রয়েছে। নাৎসীরা তাদের গ্যাস চেম্বার, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নিপীড়ন ও কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের জন্য কুখ্যাত। জামাতিরা কুখ্যাত তাদের রগকাটা সংস্কৃতি, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নিপীড়ন, হত্যাযজ্ঞে ধারালো অস্ত্রের ব্যবহার ইত্যাদির জন্য।

জার্মানিতে নাৎসীদের মানবতাবিরোধী অপকর্মের বিচার হয়েছে। বাংলাদেশ চল্লিশ বছর পরে কাজটি শুরু করেছে। জার্মানরা ব্যাপক আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে নাৎসী এবং তাদের মানবতাবিরোধী দর্শন মুছে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য তাই জার্মানির অভিজ্ঞতা খতিয়ে দেখা যেতে পারে।

সেখানে নাৎসী পার্টিকে নিষিদ্ধের পাশাপাশি সহসংগঠনগুলোও অবলুপ্ত করা হয়। এরপর সংবিধান, আইন, নীতিমালা ও অধ্যাদেশগুলো থেকে নাৎসী ভাবাদর্শের সকল ধারাও বিলোপ করে নাৎসী-পরবতী যুগের জার্মানরা। নাৎসীবাদে বা সেনাতন্ত্রে বিশ্বাসী লোকেদের নামে নামকরণ করা হয়েছিল যেসব পার্ক, রাস্তা, হাঁটাপথ, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা ও স্থাপনার নাম– সেগুলোর নাম পরিবর্তন করা হয়। নাৎসীবাদ ও সেনাতন্ত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব ভাস্কর্য বা সৌধ ধ্বংস করে, সব জায়গা থেকে নাৎসী প্রতীক স্বস্তিকা মুছে ফেলা বা ভেঙে ফেলা হয়।

আরও কিছু পদক্ষেপ নেয় এরা। এর মধ্যে রয়েছে নাৎসী পার্টি ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর যাবতীয় অর্জিত বা লুণ্ঠিত সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ ও পদস্থ নাৎসীদের গ্রেফতার, নাৎসীদের যাবতীয় অবসর ও অন্যান্য ভাতার অধিকার রহিতকরণ, নাৎসী নেতা, প্রভাবশালী সমর্থক ও মিত্রবাহিনীর জন্য হুমকিস্বরূপ অন্যান্য নাগরিকদের গ্রেফতার।

তাছাড়া নাৎসী সমর্থকদের পাশাপাশি পাঁচটি শাখা সংস্থাকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। সরকারি পদ থেথকে বিদায়নিতে হয় সকল নাৎসী নেতা, সক্রিয় কর্মী ও সমর্থকদের। এমনকি আধাসরকারি ও বেসরকারি অফিসগুলোতে প্রভাবশালী কোনো নাৎসী থাকলে তাদেরকেও অপসারণ করা হয়। পরবর্তীকালে এই ধারাটা removal-from-office program নামে পরিচিত ছিল।

নাৎসীবিরোধী আরও কিছু নীতিমালা প্রণয়ন করা হয় জার্মানিতে। এর মধ্যে ছিল, কোনো ধরনের নাৎসী প্রোপাগাণ্ডা রেডিও টিভি বা অন্য কোনো প্রচারমাধ্যমে প্রচার করা যাবে না। এর আওতায় বিনোদন, থিয়েটার, শিক্ষা ও ধর্মও পড়ে। সেদেশের প্রচারমাধ্যমে কোনো নাৎসী সমর্থক কাজ করতে পারে না। নাৎসী প্যারেড বা নাৎসী সঙ্গীত প্রচার পুরোপুরি নিষিদ্ধ। সেই সঙ্গে যাবতীয় নাৎসী প্রতীক প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা হয়। এভাবে গত ছয় দশকে জার্মানিতে নাৎসীদের নাম-নিশানা মুছে দেওয়া হয়।

জামাত বিষয়ে করণীয়

বাংলাদেশে ইতোমধ্যে বহুবার প্রমাণিত হয়েছে যে জামায়াতে ইসলামী নামের দলটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি বিশ্বস্ত নয় এবং কার্যবিচারে এটি একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। রাষ্ট্রীয় স্থাপনাগুলো সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় সাম্প্রতিক হামলা, শত শত হিন্দু মন্দিরে হামলা্, পুলিশহত্যা, পেট্রোল বোমা মেরে মানুষহত্যা, রেললাইন উপড়ে ফেলা ইত্যাদি ঘটনার প্রেক্ষিতে দলটি নিষিদ্ধ করার দাবি বিভিন্ন মহল থেকে জোরেসোরেই উঠছে।

এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্টে পর্যন্ত সাম্প্রতিক হামলার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’কে নিষিদ্ধ করার দাবি উচ্চারিত হয়েছে। এই প্রবল চাপ ও দাবির মুখে আপাতত দলটির কার্যক্রম গুটিয়ে রাখা হয়েছে। জামাতের সবচেয়ে বড় দোসর বিএনপিও জামাতকে বাদ দিয়েই রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনে বাধ্য হচ্ছে।

জামাত নিষিদ্ধ করা একটি জনদাবিতে পরিণত হলেও এর বাস্তবায়ন কিন্তু মোটেও সহজসাধ্য নয়। একে নিষিদ্ধ করলে শাসক দলকে অনেক ধরনের প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হবে। কাজটা অত্যন্ত কঠিন।েএই দাবি যারা তুলছেন তাদের মতে, দেশের মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থেই সংগঠন হিসেবে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করতে হবে।

তবে করতে হবে এমনভাবে যাতে তারা অন্য কোনো নামে, অন্য কোনো দলের সঙ্গে মিশে কোনোভাবেই সুবিধা করতে না পারে। এর নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে, এদের অর্থনৈতিক উৎসগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো রাষ্ট্রের অধিকারে নিয়ে আসতে হবে, ন্যূনতমভাবে হলেও জামাতি প্রতিষ্ঠানগুলোর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ছাঁটাই করতে হবে, ছাঁটাই হওয়াদের নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাও সরকারি তদারকির মধ্যে নিয়ে আসতে হবে।

এছাড়া জামাতি প্রচারমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনতে হবে, বিচারিক ও শিক্ষাব্যবস্থায় জামাতি প্রভাব কমিয়ে আনতে হবে। স্কুল-কলেজ পর্যায়ের সিলেবাসে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আরও বেশি পাঠের আওতায় আনতে হবে। বিচারব্যবস্থা ও অন্যান্য প্রশাসনিক সেক্টরে জামাত সমর্থকদের বিতাড়ন করা জরুরি। ধর্মভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকীকরণ করে প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে জামাত কর্মীদের সরিয়ে দিতে হবে।

জামাতের রাজনীতি পাকিস্তানপন্থী ধর্মীয় রাজনীতি। এই পাকিস্তানপন্থীদের সমূলে উচ্ছেদ করাটা হবে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বন্ধ করার প্রথম ধাপ।

কাজগুলো মোটেও সহজ নয়। জননিরাপত্তার স্বার্থে জামাত নিষিদ্ধ করতে গিয়ে সেই নিরাপত্তা যেন আরও বেশি ঝুঁকির মুখে না পড়ে সেটা গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে। এ ব্যাপারে দীর্ঘমেয়াদী কঠিন ব্যবস্থা না নিতে পারলে উল্টো ফল ফলতে পারে।

আদালতের রায়ের আলোকেই নিষিদ্ধ জামাত

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পাশাপাশি জামাত নিষিদ্ধের দাবিটিও বর্তমান সরকারের কাছে গণদাবি হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। এ ব্যাপারে সরকারের উপর চাপও রয়েছে। বিষয়টির প্রতি সরকার ইতিবাচক বলেই নানা সূত্রে জানা যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরকার আদালতের রায় নিয়েই মওদুদীবাদী জামাত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করতে চায়। সরকারের প্রস্তুতিও তেমনি। যাতে ভবিষ্যতে আইনি বা অন্য কোনো জটিলতার সুযোগ নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী এবং পঁচাত্তর-পরবর্তী যাবতীয় সহিংস মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী দলটি।

এর আগে যুদ্ধাপরাধের বিচারসংক্রান্ত একাধিক রায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং হাইকোর্টের রায়ে জামাতকে সন্ত্রাসী সংগঠনই বলা হয়েছে। সরকারও এখন জামাতকে আর রাজনৈতিক দল বলে গণ্য করছে পারছে না। যে রিট আবেদনের রায়ে হাইকোর্ট জামাতের নিবন্ধন অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করেছেন, সে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল মামলা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারাধীন।

আবার ট্রাইব্যুনালের দেওয়া গোলাম আযমের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল আবেদনেও জামাত নিষিদ্ধ করার আরজি জানিয়েছে সরকারপক্ষ। ট্রাইব্যুনালের অন্য মামলাগুলোর রায়েও দলটিকে সন্ত্রাসী সংগঠন বলায় এসব রিট-মামলার চূড়ান্ত রায়ের দিকে তাকিয়ে আছে সরকার। যদিও অনেকে জামাতকে নিষিদ্ধের ব্যাপারে সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সংবিধান ও প্রচলিত আইন অনুযায়ীই একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামাত ও তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করা যায়। সরকারের নির্বাহী আদেশে জামাতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা সম্ভব।

এ ক্ষেত্রে সঙ্গত কারণেই সরকার খুব সতর্ক। এমন স্পর্শকাতর বিষয়ে সরকার কোনো ঝুঁকি নিবে না এটাই স্বাভাবিক। নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ করা হলে পরে জামাতবান্ধব কোনো সরকার ক্ষমতায় এলে অন্য একটি নির্বাহী আদেশে তাদের রাজনীতি করার অধিকার ফিরিয়ে দিতে পারে। যেমনটি হয়েছিল স্বাধীনতার পরে। বঙ্গবন্ধুর সরকার যুদ্ধাপরাধী জামাতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করলেও, জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে সংবিধান সংশোধন করে তাদের রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসন করেছিলেন।

সে ক্ষেত্রে আদালতের রায় ও আদেশ থাকলে তার আলোকে জামাত নিষিদ্ধ করা হলে ভবিষ্যতে সেটি কেউ রদ করতে পারবে না।

জামাত নিষিদ্ধের বিপক্ষের যুক্তি

যারা জামাতকে নিষিদ্ধ করার বিপক্ষে বলেন তাদের মত হচ্ছে, দীর্ঘ চল্লিশ বছরে রাষ্ট্রীয়-সামাজিক-আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতায় জামাতের সংগঠন অনেক সংগঠিত এবং তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। তাদের শক্তি, ভোট, নৈরাজ্য সৃষ্টির ক্ষমতা– এগুলো মোটেও উপেক্ষণীয় নয়।

এই বাস্তবতায় দলটি নিষিদ্ধ করলে কর্মীরা আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাবে। তখন এদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। এখনই সামনাসামনি এদের মোকাবেলা করা কঠিন। কারণ এরা অনেক আগ্রাসী। এখন বরং আমরা এদের চিনতে পারছি কিন্তু নিষিদ্ধ সংগঠন হয়ে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেলে প্রশাসনের পক্ষে এদের চিহ্নিত করে দমন করা আরও কঠিন হয়ে যাবে।

তখন তাদের অপতৎপরতা আরও বেড়ে যাওয়ার আশংকা থাকে। নতুন আল কায়েদার মতন সংগঠনের সৃষ্টি হতে পারে। তাদের নেতৃত্বে দেশ স্থায়ী জঙ্গিবাদের ঝুঁকির মুখে চলে যেতে পারে। কারণ জামাতের কোনো কোনো নেতার সঙ্গে আল কায়েদার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আছে।

অনেকে আবার মনে করে থাকেন, জামাত নিষিদ্ধ হলে এর নেতাকর্মীরা অন্য কোনো ইসলামি দলে চলে যাবে। ভিন্ন নামে তাদের কর্মকাণ্ড ঠিকই চালিয়ে যাবে। সে ক্ষেত্রে তারা আরও বেশি হিংস্র ও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে। এমনকি এই দলের নেতাকর্মীরা বিএনপি-আওয়ামী লীগেও ঠাঁই নিতে পারে। এতে এই দলগুলোর চরিত্র আরও বেশি কলুষিত হতে পারে।

এসব কথার পেছনে যুক্তি আছে অবশ্যই। কিন্তু এক ধরনের ভীতি সৃষ্টি করে জামাতকে রক্ষার যুক্তিও আছে এসব কথার মধ্যে। মনে রাখতে হবে যে, জামাতের কর্মকাণ্ড এবং ভূমিকাই আজ তাদের নিশ্চিত নিষেধাজ্ঞার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

অতঃপর

জামাত-শিবির নিষিদ্ধ করার পর মৌলবাদের অর্থনীতির কী হবে? ওই যে তাদের বছরে দুই হাজার কোটি টাকার নিট মুনাফা– সেটা কি বন্ধ হবে? তাদের যে অসংখ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, যেসব মাদ্রাসা জঙ্গি বানানোর কারখানা হিসেবে ব্যবহৃত হয়, সেগুলোর কী হবে? জামাত নিষিদ্ধ করতে হলে এসব প্রশ্নের যথাযথ উত্তর খুঁজে পেতে হবে।

একথা ঠিক যে কাজটা করলে এর রাজনৈতিক সুফল দল হিসেবে বিএনপির ঘরে যাবে বেশি। আগামীতে বিএনপি যদি জামাতকে ত্যাগ করে, তাহলেও জামাতের ভোট বিএনপির বাক্সেই জমা হবে। জামাত, হেফাজতের ভোট কোনোদিনই আওয়ামী লীগ বা তাদের জোটের বাক্সে যাবে না।

তবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং জামাতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী তরুণ প্রজন্মের অনেকে আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীল হবে। সবচেয়ে বড় কথা, একটি রাজনৈতিক অপশক্তিকে উচ্ছেদ করতে পারলে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী সব দলই উপকৃত হবে।

মানব শরীরের সঙ্গে যদি রাজনৈতিক বাংলাদেশের তুলনা করা হয় তাহলে দেশের রাজনৈতিক দলসমূহকে একেকটা অঙ্গ বলে মনে করা যায়। সে ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীও শরীরের ক্ষুদ্র একটা অংশ। আকারে ছোট হলেও তার যন্ত্রণাপ্রদান ক্ষমতা সর্বব্যাপী। কারণ ক্ষুদ্র অংশটি একটি জীবন্ত বিষফোঁড়া।

গত এক বছরে বাংলাদেশের মানুষ সেই বিষফোঁড়ার অস্তিত্ব টের পেয়েছে আতংকিত প্রতিটি মুহুর্তে। সে বাংলাদেশের সমস্ত শরীরে যন্ত্রণার বিষ ছড়িয়ে প্রমাণ করেছে কেন তার অস্তিত্বের বিরুদ্ধে এতটা সোচ্চার বাংলাদেশের সচেতন মানুষ ও শাহবাগে গর্জে ওঠা তরুণ প্রজন্ম। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের বাকি রাজনৈতিক দলগুলোর পার্থক্য।

রাজনৈতিক দাবি আদায়ের নামে এত বিধ্বংসী মনোভাবের নজির বাংলাদেশে অন্তত নেই। যারা এদেশকে নিজের দেশ মনে করে না, তাদের পক্ষেই এত ধ্বংসযজ্ঞ সম্ভব। এ রকম কোনো দলের অস্তিত্বই একটা দেশের জন্য কলংকজনক। শরীরে বিষফোঁড়া জিইয়ে রেখে কোনোদিন সুস্থ জীবনযাপন করা যায় না।

কাজেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্যান্সার হিসেবে বিরাজমান জামাতকে ‘অস্ত্রোপচারের’ মাধ্যমে ‘অপসারণ’ করা ছাড়া আমাদের সামাজিক সুস্থতার অন্য কোনো নিদান আছে বলে মনে হয় না।

(কৃতজ্ঞতা– হাসিব, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে জামাত নিষিদ্ধকরণ রূপরেখা)

চিররঞ্জন সরকার:কলামিস্ট।

চিররঞ্জন সরকারকলামিস্ট।